মনোজ সেন

কালিন্দী রাজ্যের মহারাজ সুজন সিংহের বরকন্দাজদের প্রধান ছিল মৃত্যুঞ্জয় নায়েক। তার ধ্যানজ্ঞান সব-ই ছিল মহারাজের সেবা করা। আর কোনো দিকেই তার কোনো খেয়াল ছিল না। শহরের একপ্রান্তে তার বাড়ি ছিল। তার স্ত্রী তাদের ছেলে জয়ন্তর জন্ম দিতে গিয়ে মারা গিয়েছিলেন, তাই ছেলের দেখাশোনার ভার দূরসম্পর্কের এক বৃদ্ধা বিধবা মাসির ওপর ছেড়ে দিয়ে সে দিনরাত রাজবাড়িতে পড়ে থাকত।
জয়ন্ত তার দশ বছরের জীবনে বাবাকে প্রায় দেখেইনি। তাদের পাড়ায় তার সমবয়সি কোনো বন্ধু ছিল না, তাই সে একা একাই বড়ো হয়ে উঠেছিল। ঘরের কাজ আর পড়াশুনো সেরে জয়ন্ত সারাদিন আপন মনে মাঠে-ঘাটে বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াত, ফুলপাতা তুলে এনে ঘর সাজাত, বৃষ্টিতে ভিজত, রোদে পুড়ত আর পাখিদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে গান গাইত। আকাশ, বাতাস, গাছপালা আর নদীর জল তার গান শুনত।
আর শুনতেন তার ঠাকুমা। যখন সন্ধে গড়িয়ে রাত আসত, তখন আলো আঁধারি দাওয়ায় বসে তিনি তাঁর নাতির গান শুনতে শুনতে তারাভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে আত্মনিমগ্ন হয়ে যেতেন। মাঝে মাঝে জয়ন্ত যখন তার বাবার কথা মা-র কথা জিজ্ঞাসা করত, তিনি গোপনে চোখের জল মুছে তার প্রশ্নের উত্তর দিতেন।
কখনো সখনো মৃত্যুঞ্জয় যখন বাড়ি আসত, তখন সে তার মাসিকে বলত— দেখো মাসি, জয়ন্ত যেন জঙ্গলের দিকে না-যায়।
তিনি বলতেন— আমি কি আর তোর ছেলের পেছনে দৌড়ে পারি? তোর ছেলের ভার আর কাউকে দে, বাবা। এই বয়সে আমি আর পারছি না।
মৃত্যুঞ্জয় বলত— হবে, হবে, যথাসময়ে সব হবে; বলে রাজবাড়িতে ফিরে যেত। কিন্তু সেইসময় হবার কোনো লক্ষণই দেখা যেত না।
কালিন্দীর সীমানার মধ্যে মৃত্যুঞ্জয়ের বাড়ি থেকে একটু দূরে একটা মস্তোবড়ো পাহাড়ি জঙ্গল ছিল। সবাই বলত উত্তরের জঙ্গল। একবার একটা ভয়ংকর রাক্ষস সেখানে কোত্থেকে এসে আশ্রয় নিল। জঙ্গলের ধারেকাছে যারা থাকে, তারা মাঝে মাঝে রক্তজলকরা ভীষণ গর্জন শুনতে পায়। তার ফলে, ভয়ের চোটে তারা সূর্যাস্তের আগেই যে যার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিতে শুরু করে দিল। যারা কাঠ কেটে জীবনধারণ করত, তাদের কাজকর্ম শিকেয় উঠল। একবার কয়েক জন ডাকাবুকো কাঠুরিয়া রাক্ষসটাকে মারতে জঙ্গলের ভেতরে চলে গিয়েছিল। তাদের প্রায় কেউই আর ফিরে আসেনি।
কথাটা রাজামশাইয়ের কানে গেল। তিনি ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে সবাইকে জানিয়ে দিলেন যে যদি কেউ নরখাদক রাক্ষসটাকে মারতে পারে তাহলে সে এক-শো স্বর্ণমুদ্রা পাবে। তাতে অবশ্য লাভ কিছুই হল না।
এই সময়ে রাজামশাইয়ের ছোটোছেলের ভীষণ অসুখ করল। রাজকবিরাজ অনেক ওষুধপত্র দিলেন বটে কিন্তু রাজপুত্রের অসুখ সারা তো দূরস্থান, বরং বেড়েই যেতে লাগল। শেষপর্যন্ত তিনি হাল ছেড়ে দিলেন। বললেন— আর আমার কিছু করবার নেই। মনে হচ্ছে, রাজপুত্রের আয়ু আর সাতদিনের বেশি নেই।
রাজবাড়িতে কান্নাকাটি পড়ে গেল। মহারানি মৃত্যুঞ্জয়কে ডেকে বললেন— তুমি একবার আমার বাপের বাড়ি পুষ্পিতনগরে যেতে পারবে? সেখানে মহর্ষিকে রাজপুত্রের অসুখের কথা সবিস্তারে বলবে, তাহলে তিনি নিশ্চয়ই এই ভয়ংকর বিপদের হাত থেকে আমাদের উদ্ধারের কোনো পথ বলে দিতে পারবেন। তবে, সময় তো আর বেশি নেই আর মহর্ষি যা বিধান দেবেন তার ব্যবস্থা করতে যে কতদিন লাগবে তা তো জানি না। তাই তোমাকে দু-দিনের মধ্যে ফিরে আসতেই হবে। অনেকটা পথ, কাজেই কোথাও দেরি করলে চলবে না। আমি তোমাকে চিনি, মৃত্যুঞ্জয়। আমি জানি, একমাত্র তুমিই একাজ করতে পারবে।
মৃত্যুঞ্জয় বলল— নিশ্চয়ই পারব, মহারানি। আপনি শুধু মহারাজকে বলুন তাঁর নিজের ঘোড়া মাতরিশ্বাকে আমায় দিতে। আমি ঠিক দু-দিনের মধ্যে আপনাকে সংবাদ এনে দেব।
মহারাজ এই প্রস্তাবে সানন্দে সম্মত হলেন। সেইদিনই মৃত্যুঞ্জয়কে পিঠে নিয়ে মাতরিশ্বা প্রচণ্ড বেগে ছুটে চলে গেল পুষ্পিতনগরের দিকে।
দু-দিন শেষ হবার আগেই ফিরে এল মৃত্যুঞ্জয়। তার সর্বাঙ্গ ধূলিধূসরিত, মাতরিশ্বার মুখ দিয়ে যেন ফেনা উঠছে। রাজামশাই তাকে বিশ্রাম নিতে বললেন; কিন্তু কথা না-শুনে সে ছুটতে ছুটতে চলে গেল মহারানির কাছে।
মৃত্যুঞ্জয় বলল যে মহর্ষির সঙ্গে তার দেখা হয়েছে। তিনি বলেছেন রাজপুত্রের অসুখের একটাই ওষুধ আছে। উত্তরের জঙ্গলের গভীরে একটি অতি প্রাচীন মহাকালের মন্দির আছে। কে যে সেটা বানিয়েছিল তা কেউ জানে না। বহু বছর ধরে সেটা পরিত্যক্ত ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে। সেই মন্দিরে যাওয়ার পথটিও অত্যন্ত দুর্গম। তাই, কেউ সেখানে যায় না। একপাশে একটা অত্যন্ত দুর্লভ আকাশপদ্মের গাছ আছে। রোজ সকালে তার একটি ফুল মহাকালের পায়ের কাছে পড়ে। সেই ফুল এনে রাজপুত্রের মাথায় ঠেকালে তার অসুখ সেরে যাবে।
মহারাজ তাঁর রাজ্যের সমস্ত শিকারিদের ডেকে পাঠালেন। দেখা গেল তারা কেউ সেই মন্দিরের হদিশ জানে না, বা জানলেও না-জানার ভান করছে। তখন ডাকা হল কাঠুরিয়াদের। তাদের মধ্যে কেবল একজনই একটা পাহাড়ের ওপর থেকে মন্দিরটা দেখছে। তার নাম কানাই। কিন্তু সে যা বলল তা শুনে রাজামশাই অত্যন্ত বিমর্ষ হয়ে পড়লেন।
কানাই বলল সে মন্দিরে যাবার পথটা যে কেবল দুর্গম তাই নয়, সেটা গেছে একটা অন্ধকার গুহার ভেতর দিয়ে। সেই গুহার ভেতরেই রাক্ষসটা থাকে। সেটা অতিকায়, অত্যন্ত হিংস্র, প্রচণ্ড শক্তিশালী আর অসম্ভব ধূর্ত। কাঠুরিয়াদের যে দলটি রাক্ষসটাকে মারতে গিয়েছিল, কানাই ছিল সেই দলে। তাকে তারা সবাই মিলে আক্রমণ করেছিল। তাদের সম্মিলিত কুঠারের আঘাতে তার তো কিছুই হল না, বরং কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সে সমস্ত দলটাকে মেরে ফেলল। একমাত্র কানাই পালিয়ে আসতে পেরেছিল। মহারাজ তাঁর সমস্ত সৈন্যদলও যদি পাঠান, তাহলেও কিন্তু রাক্ষসটা তাদের একজনকেও গুহা পার হতে দেবে না। আর, ওই পথ ছাড়া মন্দিরের কাছে পৌঁছনোর আর কোনো রাস্তাও নেই। পাহাড় ডিঙিয়ে যাওয়া হয়তো যায়, কিন্তু তাতে অনেক দিন লেগে যাবে।
রাজামশাই অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে মৃত্যুঞ্জয়কে নিয়ে মন্ত্রীদের সঙ্গে পরামর্শ করতে বসলেন। অনেকে অনেক প্রস্তাব দিলেন কিন্তু তার একটাও তাঁর পছন্দ হল না। শেষপর্যন্ত মৃত্যুঞ্জয় বলল— মহারাজ, আপনি আর একবার মাতরিশ্বাকে আমায় দিন। আমি আবার মহর্ষির কাছে যাই। তিনি নিশ্চয়ই রাক্ষসটাকে মারার কোনো উপায় বলে দিতে পারবেন। আর তো মোটে পাঁচদিন আছে। আমি ঘুরে এসে তিনি যা করতে বলবেন, তা নিজের প্রাণ দিয়ে হলেও করবার ব্যবস্থা করে ফেলব।
মহারাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন— ঠিক আছে, তাই করো।
দু-দিন পরে মৃত্যুঞ্জয় ফিরে এল। তার বিষণ্ণ মুখ দেখে রাজামশাই উৎকণ্ঠিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন— খবর কী মৃত্যুঞ্জয়?
মৃত্যুঞ্জয় বলল— খবর ভালো নয়, মহারাজ। মহর্ষি বলেছেন যে রাক্ষসটাকে মারার একটাই উপায় আছে; কিন্তু সেটা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার।
—কী সেই উপায়?
—মহর্ষি বলেছেন যে ওই ধরনের রাক্ষসদের একটাই দুর্বলতা। তারা গান শুনলে জেগে থাকতে পারে না, ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু, সে গানে কোনোরকম ভুলভাল থাকলে চলবে না। যদি সুর ভুল হয় বা ছন্দপতন ঘটে, তাহলে সে একেবারে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে।
—বলো কী! এ তো ভয়ানক দুঃসংবাদ। আমার সভা গায়করা সবাই তো ফুলের ঘায়ে মুচ্ছো যায়, ল্যাগব্যাগ করে হাঁটে আর বেড়াল দেখলে ভয় পায়। তারা কখনো রাক্ষসের সামনে দাঁড়িয়ে গান গাইতে পারবে? যাকেই এরকম গান গাইবার কথা বলব, সে তো ভয়েই মরে যাবে।
—আমি তা জানি মহারাজ। কিন্তু, ব্যবস্থা তো একটা করতেই হবে। হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে তো চলবে না। আমার একটা প্রস্তাব আছে। আমি কাল ভোর না-হতেই উত্তরের জঙ্গলে যাব। রাক্ষসটাকে এড়িয়ে মন্দিরে পৌঁছোনোর একটা-না-একটা পথ বের করবই। যদি দেখি যে দেরি হয়ে যাচ্ছে, তাহলে রাক্ষসটাকে সরাসরি আক্রমণ করব। সে হয়তো তার প্রকাণ্ড শরীর নিয়ে আমার ক্ষিপ্রতার সঙ্গে পেরে উঠবে না। আমি একাই যাব যাতে নিঃশব্দে কাজ সারতে পারি।
—সে কিন্তু ভীষণ ধূর্ত। তুমি কি বুঝতে পারছ যে তুমি সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখে এগিয়ে যাচ্ছ?

—ধূর্ততায় আমিও কিন্তু কম যাই না, মহারাজ। একটা জংলি রাক্ষসের কাছে বুদ্ধির লড়াই-এ আমি হেরে যাব না। আর, আপনি তো জানেন, আমার মৃত্যু ভয় বলে কিছু নেই।
রাজামশাই নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হলেন। মৃত্যুঞ্জয় বলল— তাহলে অনুমতি করুন, এখন আমি বাড়ি যাই। আমার মাসি আর ছেলেটাকে একবার দেখে যাই, আমার তিনকুলে শুধু ওই দু-জনই আছে। হয়তো তাদের আর দেখতে পাব না। একটা অনুরোধ, আমি যদি ফিরে না-আসি, তারা যেন একেবারে অর্ধাহারে না থাকে।
রাজামশাই ম্লান হেসে বললেন— তুমি না বললেও তাদের সমস্ত ভারই আমি নিতুম, মৃত্যুঞ্জয়।
অসময়ে মৃত্যুঞ্জয়কে বাড়ি আসতে দেখে তার মাসি খুব আশ্চর্য হয়ে গেলেন। সবকথা শুনে তিনি নীরবে অশ্রুবিসর্জন করতে লাগলেন। ঠিক তখনই জয়ন্ত এসে বাড়িতে ঢুকল। ঠাকুমাকে কাঁদতে দেখে আর বাবাকে বাড়িতে দেখে সে অবাক হয়ে গেল। চোখ পাকিয়ে বাবাকে বলল— তুমি ঠাকুমাকে বকেছ?
মৃত্যুঞ্জয় জয়ন্তকে কোলে নিয়ে বলল— না বাবা। আমি কাল ভোর বেলা একটা কাজে যাচ্ছি, হয়তো ফিরতে দেরি হবে। তাই তোর ঠাকুমা কাঁদছেন।
জয়ন্ত বলল— আমি সব শুনেছি, বাবা। তুমি রাক্ষস মারতে যাচ্ছ। কালিন্দীর সব্বাই এই কথা আলোচনা করছে। আমিও তোমার সঙ্গে যাব।
মৃত্যুঞ্জয় হেসে বলল— তুই যাবি কী করে? বাচ্চারা কি রাক্ষস মারতে পারে? তোকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলে আমার কি সুবিধে হবে, বল? রাক্ষসটা যখন আসবে তখন তোকে বাঁচাব না-সেটার সঙ্গে লড়াই করব?
—ওই রাক্ষসটাকে তুমিও মারতে পারবে না, বাবা। কিন্তু, আমি গেলে তুমি ঠিক একটা আকাশপদ্ম নিয়ে আসতে পারবে।
—বটে? কী করে সেটা সম্ভব হবে?
—প্রথমত খুব তাড়াতাড়ি আমি তোমাকে ওখানে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে পারব। আমি রাক্ষসের গুহাটা চিনি। অনেক বার গিয়েছি ওখানে। আগে ওখানে দুটো ভালুক তাদের দুটো বাচ্চা নিয়ে থাকত। তারা আমার বন্ধু ছিল। রাক্ষসটা এসে তাদের সবাইকে মেরে ফেলে গুহাটা দখল করে নিয়েছে। দ্বিতীয়ত আমি রাক্ষসটার সামনে দাঁড়িয়ে গান গাইব। সেই গান শুনে রাক্ষসটা ঘুমিয়ে পড়বে আর তুমি চট করে গিয়ে ফুলটা নিয়ে আসবে।
—তুই গান গাইতে পারিস?
—পারি, বাবা। ভালোই পারি। তুমি ঠাকুমাকে জিজ্ঞাসা করে দেখো।
একথা বলামাত্র ঠাকুমা হাহাকার করে উঠলেন। বললেন— না-না, ও একদম গান গাইতে পারে না। হায় ভগবান, এ রাজ্যে কী একজনও গাইয়ে নেই? এই দুধের শিশুটাকেই ওখানে যেতে হবে?
জয়ন্ত বলল— আমি দুধের শিশু নই, ঠাকুমা। আমি বড়ো হয়ে গেছি। তুমি কি বুঝতে পারছ না যে ওই রাক্ষসটাকে মারবার জন্য বাবাকে সবরকমভাবে সাহায্য করা আমার কর্তব্য? সে যে আমার বন্ধুদের অকারণে মেরে ফেলেছে। আমি তার প্রতিশোধ যদি সুযোগ পেয়েও না-নিয়ে ভয়ের চোটে ঘরের কোণে মুখ লুকিয়ে বসে থাকি, তবে আমি আরও বড়ো হয়ে বাবার মতো সৈনিক হবার যোগ্য হব কী করে? আমি বাবার সঙ্গে যাবই আর ফুল নিয়ে ফিরেও আসব। তুমি কান্নাকাটি কোরো না।
জয়ন্তর কথা শুনে মৃত্যুঞ্জয়ের চোখে জল এল। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল— ওই ভয়ংকর রাক্ষসটাকে আসতে দেখলে তুই তো ভয়েই অজ্ঞান হয়ে যাবি।
—কক্ষনো না। আমার বন্ধুদের কথা যখন ভাবব, তখন কোনো ভয় থাকবে না। তা ছাড়া আমি দূর থেকে রাক্ষসটাকে দেখেছি। আমার ভয় করেনি।
অনেক তর্কবিতর্ক হল, কিন্তু মৃত্যুঞ্জয় কিছুতেই ছেলেকে টলাতে পারল না। জীবনে এই প্রথম তাকে হার স্বীকার করতে হল।
ভোরের প্রথম আলো ফোটার আগেই মৃত্যুঞ্জয় জয়ন্তকে নিয়ে উত্তরের জঙ্গলের দিকে রওনা হল। সঙ্গে নিল অস্ত্রশস্ত্র, পাহাড়ে চড়ার জন্য দড়ি ইত্যাদি। ওরা যখন রাক্ষসের গুহার সামনে এসে পৌঁছল, তখন সূর্য প্রায় মাথার ওপরে। কাছাকাছি আসতেই, রাক্ষসটা হামাগুড়ি দিয়ে গুহার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। তাকে দেখে জয়ন্ত দাঁড়িয়ে পড়ে স্থির হয়ে গান গাইতে শুরু করে দিল। এ গান সে শিখেছে পাখিদের কাছে, গাছের পাতার মর্মরশব্দে, ঝরনার ঝরঝর আওয়াজে। স্তম্ভিত মৃত্যুঞ্জয় রোমাঞ্চিত হয়ে সেই গান শুনতে লাগল।
রাক্ষসটা হুংকার করে তার অতিকায় শরীর নিয়ে হুড়মুড় করে ছুটে আসছিল; কিন্তু জয়ন্তর গান শুনে তার গতি ক্রমশ কমে আসতে লাগল। রাগে বিকৃত তার কদাকার মুখটা আস্তে আস্তে কেমন যেন শান্ত হয়ে এল। তার চোখদুটো ঢুলঢুল হয়ে গেল। শেষপর্যন্ত জয়ন্তর প্রায় পায়ের কাছে এসে মাটিতে শুয়ে পড়ে হাসিহাসি মুখে নাক ডাকিয়ে ঘুমোতে শুরু করে দিল।
জয়ন্ত গান থামাল না, হাতের ইশারায় মৃত্যুঞ্জয়কে ফুল আনতে যেতে বলল। মৃত্যুঞ্জয় একদৌড়ে গুহার ভেতরে ঢুকে গেল আর প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই আকাশপদ্মের অপূর্ব একটা ফুল হাতে নিয়ে বেরিয়ে এল।
ফুলটা ছেলের হাতে দিয়ে পাহাড়ে চড়ার দড়ি দিয়ে মৃত্যুঞ্জয় রাক্ষসটাকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলল, যাতে গান থামার পরে তার উঠে দাঁড়াতে একটু সময় লাগে আর এই সময়ের মধ্যেই তারা যাতে যত দূরে সম্ভব পালিয়ে যেতে পারে। রাক্ষসটা কিন্তু একটুও বাধা দিল না। জয়ন্তর গান চলতে থাকল আর সে ঘুমিয়েই রইল।
এদিকে মৃত্যুঞ্জয়কে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে পাঠিয়ে রাজামশাই আর রানিমা সারারাত ঘুমোতে পারেননি। মনের কষ্টে আর বিবেকের দংশনে দু-জনে ছটফট করেছেন। কাজেই, ভোর হওয়ামাত্র রাজামশাই সসৈন্যে মৃত্যুঞ্জয়ের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হলেন। তিনি ভেবেছিলেন যে সবাই মিলে উত্তরের জঙ্গলে যাবেন, কিন্তু এসে যা শুনলেন তাতে তো রাজামশাই স্তম্ভিত। তার মাসিকে বললেন— আপনি ভাববেন না। আমরা যাচ্ছি, আপনার বোনপো আর নাতিকে উদ্ধার করে আনবই। তারপরে, একটা ওইটুকু বাচ্চা ছেলেকে অমন বিপদের মুখে নিয়ে যাবার জন্য মৃত্যুঞ্জয়কে খুব শাস্তি দেব।
মাসি বললেন— না, না, মৃত্যুঞ্জয় ওকে নিয়ে যেতে চায়নি। অনেক বাধা দিয়েছিল। কিন্তু আমার নাতি কোনো কথাই শোনেনি।
—সে দেখা যাবে। বলে, রাজামশাই ঘোড়া ছুটিয়ে বেরিয়ে গেলেন। তাঁর পেছনে পেছনে গেল তাঁর সৈন্যদল।
রাক্ষসের গুহাটার কাছাকাছি আসতেই, রাজামশাই একটা অপূর্ব গান শুনতে পেলেন। তিনি ইশারায় সৈন্যদের কোনোরকম শব্দ করতে বারণ করে ঘোড়া থেকে নেমে আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলেন। দেখলেন, ফুল হাতে নিয়ে জয়ন্ত নির্ভীক গলায় গান গাইছে আর মৃত্যুঞ্জয় দড়ি দিয়ে রাক্ষসটাকে বেঁধে ফেলছে।
বাঁধা যখন হয়ে গেল, রাজামশাই নিঃশব্দে সৈন্যদের নিয়ে এগিয়ে এলেন। ইশারায় জয়ন্তকে গান চালিয়ে যেতে বললেন আর ওইভাবেই সৈন্যদের বললেন, রাক্ষসটাকে কাছেই একটা খাদের কাছে টেনে নিয়ে যেতে। খাদটা অত্যন্ত গভীর, অনেক নীচে বয়ে যাওয়া বিশাল নীলাম্বরী নদীটিকে সূর্যের আলোয় একটা চকচকে সরু রুপোলি সুতো বলে মনে হচ্ছিল।
রাজামশাইয়ের আদেশে সৈন্যরা সবাই মিলে রাক্ষসটাকে ছুড়ে খাদের মধ্যে ফেলে দিল।
বাবার কাঁধে চড়ে বাড়ি ফিরছিল জয়ন্ত। বলছিল— জানো তো বাবা, রাজামশাই বললেন যে আমি বড়ো হলে তিনি আমাকে তাঁর দেহরক্ষী সৈন্যদলে ভরতি করে নেবেন। আমার কিন্তু এখনই বড়ো হয়ে গেছি বলে মনে হচ্ছে। এখান থেকে আমি কত দূর পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি। তুমি যখন রাজবাড়িতে চলে যাবে, আর আমি কষ্ট পাব না। আমি কেবল নিজেকে তোমার মতো বীর সৈনিক হবার জন্য তৈরি করব।
মৃত্যুঞ্জয় জয়ন্তর পা দুটো শক্ত করে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে বলল— না বাবা, আর আমি তোমাকে কষ্ট দেব না। এখন থেকে আমি রোজ বাড়ি চলে আসব আর রাত্রি বেলা তোমার গান শুনব।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন