হাসির উপহার

মনোজ সেন

ওষুধের স্যাম্পেলের ব্যাগটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে শ্যামল বলল— তুমি অকারণে ভয় পাচ্ছিলে, প্রতিমা। দ্যাখো তো, রুমা কী আনন্দেই না রয়েছে। সন্ধে হয়ে গেল, এখনও কেমন খেলে যাচ্ছে, বাড়ি আসার নাম নেই। অথচ তুমি ভেবেছিলে এরকম একটা নির্জন ফাঁকা জায়গায় ও হাঁপিয়ে উঠবে। শুনতে পাচ্ছ ওর হাসির শব্দ? আসতে চাইছিলে না। না-এলে এমন মুক্ত প্রকৃতির মধ্যে মেয়েটা এরকম খেলবার সুযোগই হয়তো কোনোদিন পেত না।

প্রতিমা কিন্তু গম্ভীর হয়ে রইল। কোনো কথা না-বলে চায়ের কাপটা এগিয়ে দিল। চা খেতে খেতে শ্যামল প্রশ্ন করল— কী হল তোমার? এমন ব্যাজার হয়ে আছো কেন? মনে হচ্ছে যেন তুমি নিজেই হাঁপিয়ে উঠেছ। আর তো মোটে তিনটে দিন। এর মধ্যে আমি এই অঞ্চলের সব কটা ডাক্তার আর হাসপাতাল ঘুরে নেব। মাঝে একদিন যাব উশ্রী ফলস দেখতে। সেখানে পিকনিক করব। ব্যস, তারপর কলকাতা।

প্রতিমা বলল— আমি হাঁপিয়ে উঠিনি। আমার কেমন যেন ভয় করছে।

—ভয় করছে? সে কী, কেন? এই গণেশমুণ্ডায় না-আছে কোনো বাঘ-ভালুক, না-আছে চোর-ডাকাত। তোমার কীসের ভয়?

—আচ্ছা, শহরের ভেতরে স্টেশনের কাছে কোনো বাড়ি পেলে না?

মাথা নেড়ে শ্যামল বলল— নাঃ, পেলুম না। ওই প্রাণজীবন লজে হয়তো ঘর পাওয়া যেত। আমি একা এলে হয়তো ওখানেই থাকতুম। কিন্তু তোমাদের নিয়ে তো ওই নোংরা জায়গায় থাকতে পারি না। এই বাড়িটা কেমন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, চারদিক ফাঁকা। অথচ শহর তো বেশি দূরে নয়। আমি তো ভেবেছিলুম এখানে থাকতেই তোমাদের বেশি ভালো লাগবে।

—ভালো হয়তো লাগত, কিন্তু...

—কিন্তু কী? কীসের ভয় পাচ্ছ বলো তো? একা থাকতে?

—ভয় আমাকে নিয়ে পাচ্ছি না, পাচ্ছি রুমাকে নিয়ে।

—রুমাকে নিয়ে ভয়? কেন, কী করেছে সে?

—তুমি তো দেখো না। আমি সারাদিন ওকে খেলতে দেখি। সবসময় আমার মনে হয় যেন ওর সঙ্গে আর একজন কেউ আছে। ও তার সঙ্গে কথা বলে, হাসিঠাট্টা করে। এমনকী ঝগড়াঝাঁটি পর্যন্ত করে। অথচ কাউকে দেখতে পাই না। জিগ্যেস করলে বলে, ওর একজন বন্ধু আছে। সে নাকি খুব সুন্দর দেখতে। তার খুব লম্বা চুল আর সুন্দর সুন্দর জামা পরে। আমি জানি ও খুব কল্পনাপ্রবণ। বাগবাজারেও ও যখন একা-একা খেলে, একটা পুতুল বা নিদেনপক্ষে একটা পাউডারের কৌটোর সঙ্গেও অনর্গল কথা বলে যায়, যেন সেটা একটা জ্যান্ত মানুষ। সে জন্য প্রথম প্রথম আমি ভয় পাইনি। কিন্তু, লক্ষ করছি,এখানকার ব্যাপারটা সেরকম নয়।

—কীরকম ব্যাপার?

—কীরকম জানো? হালে দেখছি, ওর কাল্পনিক বন্ধুর কাছে শুনে এসে ও যেসব কথা বলছে, সেসব কথা ওর জানার কথা নয়। পরশুদিন তোমার ফিরতে দেরি হচ্ছিল বলে চিন্তা করছিলুম। রুমা এসে আমাকে বলল, চিন্তা কোরো না, বাবার সাইকেলরিকশার চাকা পাংচার হয়ে গেছে, তাই ফিরতে দেরি হচ্ছে। কথাটা নাকি ওকে ওর বন্ধু বলেছে এবং কথাটা দেখলুম সত্যি। আর আজ সকালে হঠাৎ দৌড়ে এসে বলল, চৌবাচ্চার জলে একটা বিছে পড়েছে, সাবধানে গায়ে জল ঢেলো। এও দেখলুম সত্যি এবং এটাও ওকে বলেছে ওর এই বন্ধু।

প্রতিমার কথা শুনে একটু চিন্তিত হয়ে পড়ল শ্যামল। বলল— একটি পাঁচ বছরের কল্পনাপ্রবণ আর সংবেদনশীল বাচ্চার পক্ষে এই ধরনের কথা বলা বোধ হয় খুব একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। টেলিপ্যাথি জানো? এটা বোধ হয় সেই ব্যাপার। যারা খুব সেনসিটিভ, তাদের মধ্যে এই ক্ষমতাটা থাকে। স্বাভাবিকভাবেই থাকে। আমাদের দেশে মুনিঋষিদের আছে। তাঁদের বলে ভবিষ্যৎদ্রষ্টা। বিদেশে তো এ নিয়ে রীতিমতো গবেষণা চলেছে।

প্রতিমা বলল— টেলিপ্যাথি হলে তো ভালোই। তবে কলকাতায় তো ওর এই ক্ষমতা কখনো দেখিনি। এখানে এসে সেটা চাগিয়ে উঠল কেন, কে জানে। আমার ভালো লাগছে না। টেলিপ্যাথিই হোক আর যে প্যাথিই হোক, এতে কোনো বিপদ-আপদ না হলেই হল। চল, আমরা কালই কলকাতায় ফিরে যাই।

মাথা নেড়ে শ্যামল বলল— তুমি মিথ্যে ভয় পাচ্ছ। দেখি আজ আমি ওর সঙ্গে কথা বলে সমস্যাটা বোঝবার চেষ্টা করি।

যাওয়ার সময় কথাটা পাড়ল শ্যামল। রুমাকে জিগ্যেস করল— তোমার কেমন লাগছে এখানে?

মাথা নেড়ে রুমা বলল— খুব ভালো বাবা।

—বন্ধু হয়েছে?

—হ্যাঁ। আমি রোজ তার সঙ্গে খেলি।

—কী নাম তোমার বন্ধুর?

রুমা একগাল হেসে বলল— ওর নাম হাসি। ও না সবসময় হাসে। রাগ করলেও হাসে। খেলতে খেলতে মাঝে মাঝে চিটিং করে আমাকে খেপায়।

—কোথায় থাকে তোমার বন্ধু?

—তা তো জানি না। এখানেই কোথাও হবে। আমি যখনই খেলতে যাই, দেখি ও দাঁড়িয়ে আছে।

—ও যে তোমার সঙ্গে সারাদিন খেলে বেড়ায় তাতে ওর বাবা-মা রাগ করেন না?

—নাঃ। ওর বাবা-মা এখানে তো নেই। হাসি বলছিল, ওর বাবা-মা ওকে এখানে রেখে কলকাতায় চলে গেছে। ওর কী একটা অসুখ করেছিল। তারপরে ওর বাবা-মা ওকে রেখে চলে গেল।

—তুমি ওকে বাড়িতে ডেকে আনো না কেন? আমরা তো ওর সঙ্গে গল্প করতে পারি।

—তা হবে না। হাসি বলেছে, তোমরা ওকে দেখতে পাবে না।

কম্পিতকণ্ঠে শ্যামল বলল, কেন? আমরা দেখতে পাব না কেন?

—হাসি বলেছে, আমি তো ওর বন্ধু, তাই শুধু আমি ওকে দেখতে পাব। তোমরা পাবেই না। বলে রুমা হাসতে লাগল। তারপর হঠাৎ হাসি থামিয়ে বলল— জানো তো বাবা, হাসি না আমাকে একটা প্রেজেন্ট দেবে বলেছে। খুব সুন্দর প্রেজেন্ট। আর, খুব দামি।

—তাই নাকি? কী প্রেজেন্ট দেবে?

—তা জানি না। তবে খুব সুন্দর বলেছে। বলেছে, মাটির নীচে আছে। ওর মা যাওয়ার আগে রেখে গেছিল। মাটি কেটে বের করে আনতে হবে। আমরা যেদিন যাব, তার আগের দিন ও দেখিয়ে দেবে কোথায় মাটি কাটতে হবে।

রুমা ঘুমিয়ে পড়ার পর শ্যামল আর প্রতিমা বসবার ঘরে এসে বসল। প্রতিমা উদবিগ্ন গলায় জিগ্যেস করল— কিছু বুঝলে?

শ্যামল গম্ভীর মুখে, চিন্তিতভাবে বলল— আমি তোমার সঙ্গে একমত যে, ব্যাপারটা ঠিক সুবিধের নয়। এই ঘটনাটা বোধ হয় টেলিপ্যাথির পর্যায়ে পড়ে না। এখানে কিছু একটা আছে, বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা চলে না। তবে, ভরসার কথা এই যে, যা কিছুই থাক, সেটা অনিষ্টকর নয়। যদি তা হত তা হলে তোমাকে স্নানের আগে সাবধান করে দিত না।

—তা হোক, তবু আর থেকে কাজ নেই। চলো, আমরা কালই সকালের গাড়িতে কলকাতায় ফিরে যাই।

শ্যামল মাথা নাড়ল। বলল— না কাল নয়। পরশুই চলে যাব। কাল একটা কাজ করতে হবে।

—আবার কীসের কাজ? থাক-না এখন! পরে একবার এসো না-হয়। দু-দিন দেরি হলে তোমার ওষুধ কোম্পানি উঠে যাবে না।

—আমি অফিসের কাজের কথা বলছি না। বলে শ্যামল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপরে বলল— আমি ভাবছি প্রেজেন্টটা কী হতে পারে।

প্রতিমা যেন স্বগতোক্তি করছে এইভাবে বলল— আমিও ঠিক সেই কথা ভাবছিলুম। বলেছে, খুব সুন্দর আর খুব দামি। কী জানি কী জিনিস। নাঃ, এসবে লোভ করতে নেই। চলো, কালই চলে যাই।

শ্যামল একথার কোনো জবাব দিল না। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল— যখ কাকে বলে জানো?

প্রতিমা কম্পিতকণ্ঠে বলল— জানি। মাটির তলায় মণিমুক্তো পুঁতে তার সঙ্গে একটা বাচ্চাকেও চাপা দিয়ে দিত আগেকার দিনে। সেই বাচ্চাটা নাকি যখ হয়ে সেই গুপ্তধন সামলাত। যে এই গুপ্তধনের দিকে হাত বাড়াত, সেই যখ তার ঘাড় মটকাত। ওরে বাবা! তুমি আর এসব কথা ভেব না তো। চলো, আমরা কালই চলে যাই।

শ্যামল হাত নেড়ে বলল— ধ্যাত্তেরি। তখন থেকে শুধু কাল চলে যাই, কাল চলে যাই করছে। সব ব্যাপারে অত ভয় পেলে চলে? আর ঘাড় মটকানোর তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না। আমরা তো আর চুরি করছি না। ওই হাসি না কে, সে তো নিজের থেকে দেবে বলেছে। প্রেজেন্ট! প্রেজেন্ট দিয়ে কেউ ঘাড় মটকায়?

—হ্যাঁ, তাও তো বটে। আচ্ছা, প্রেজেন্টটা কী হতে পারে গো? আমার তো মনে হয় জড়োয়ার হার হবে। লাখখানেক টাকা দাম তো নিশ্চয়ই হবে। হবে না? আমি কিন্তু হারটা বেচে দেব। ওসব যখের ধন-টন বাড়িতে রেখে কাজ নেই বাবা!

—একটা হার হতে পারে, একাধিকও হতে পারে। আগে বের তো করি। এখন আমাদের কী করণীয় সেটা তোমাকে বলছি, শোনো, তুমি রুমাকে বলে দাও যে, পরশু সকালে আমরা কলকাতায় ফিরে যাচ্ছি। দুখিয়া বলে যে কাজের লোকটি আছে, তার পাওনাগণ্ডা মিটিয়ে দিয়ে আজ দুপুরের মধ্যে বিদেয় করে দাও। রুমাকে বলো যে প্রেজেন্টটা কোথায় আছে সেটা আজ বিকেলের মধ্যে জেনে নিতে। আমরা সন্ধে বেলা মাটি কাটা শুরু করব।

—তুমি নিজে মাটি কাটবে? পারবে? কোদাল চালানো বড়ো সহজ ব্যাপার নয়।

—জানি সহজ ব্যাপার নয়। কিন্তু পারতেই হবে। এসব ব্যাপারে অন্য কারুর সাহায্য নেবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

—তা বটে। আচ্ছা, সন্ধে বেলা মাটি না-কেটে দুপুরে কাটলে হয় না? সন্ধে বেলা যদি সাপখোপ বেরোয়?

—দূর! এই শীতকালে সাপ কোত্থেকে বেরুবে? বিছে-টিছে বেরোতে পারে। তবে, আমি জুতো-মোজা আর ফুলপ্যান্ট পরে মাটি কাটব। তা হলে আর কোনো ভয় থাকবে না। তুমি শুধু নজর রাখবে, কেউ যেন এসে না পড়ে। ওই প্রান্তিক বাড়িটার প্রফেসর নন্দদুলাল ঘোষ আর সন্ধ্যার কুলায় বাড়িটার যদুনাথ মিত্তিরকেই আমার ভয়।

—যা বলেছ। দুই বুড়োর কাজকর্ম কিছু নেই। দিনরাত সামনের রাস্তা দিয়ে হাঁটছে আর মাঝে মাঝে গলা বাড়িয়ে, বউমা, ভালো আছ তো? বলে হাঁক দিয়ে যাচ্ছে।

—ওরা যদি আসে, কিছুতেই গেটের ভেতরে ঢুকতে দেবে না। আমার কথা জিগ্যেস করলে বলবে যে, আমার স্বামীকে বাগানে পেয়েছে, তাই মাটি কোপাচ্ছে। আর অন্য কথা বলে আটকে রাখবে।

—তা না-হয় রাখব। কিন্তু রুমা কী করবে? সন্ধে বেলা তো আর তাকে ঘুম পাড়াতে পারব না।

—ঘুম পাড়াতে যাবে কেন? রুমা তো আমার সঙ্গেই থাকবে। ভালো করে গরম জামাকাপড় আর জুতো-মোজা পরিয়ে দিও। ও-ই তো আমাদের গ্যারান্টি যে, আমরা ওর জন্যেই গুপ্তধন খুঁজছি। আমরা যে কোনো উটকো লোক নই, ওর উপস্থিতি তো সেটাই প্রমাণ করবে।

—আমার কেমন ভয় করছে। রুমার কোনো বিপদ-আপদ হবে না তো?

—না, না, কী বিপদ হবে? আমি তো সঙ্গে আছি। তা ছাড়া, এসব ব্যাপারে একটু ঝুঁকি তো নিতেই হয়। ভাগ্য তো আর এমনি-এমনি খোলে না। কিছু ভয় নেই তোমার।

সারারাত ঘুমোল না দু-জনে। পরদিন সকাল হতে না-হতেই ব্রেকফাস্টের জন্য তাড়া লাগাল শ্যামল। বলল— তাড়াতাড়ি করো। আমাকে যে বেরুতে হবে।

প্রতিমা বলল— এত সকালে বেরুবে? ডাক্তারবাবুদের তো ঘুমই ভাঙবে না এখন।

—দুত্তোর ডাক্তার! ডাক্তার-ফাক্তার নয়, আমি যাব মাটি কাটার যন্ত্রপাতি কিনতে।

চট দিয়ে মোড়া যন্ত্রপাতি নিয়ে শ্যামল সাইকেলরিকশা চড়ে ফিরল দশটা নাগাদ। ফিরেই গেটে একটা মস্ত তালা লাগাল। তারপর চলল উদগ্রীব প্রতীক্ষা। বিকেল বেলা রুমার কাছে খবর পেল যে, বাড়ির পিছনে একটা বটগাছের নীচে হাসির উপহার লুকোনো আছে।

সূর্যাস্তের একটু আগে, শ্যামল সপরিবারে বটগাছটার নীচে গিয়ে দাঁড়াল। উত্তেজনায় কম্পিত হাতে শাবল বাগিয়ে ধরে রুমাকে প্রশ্ন করল— কোথায় খুঁড়তে শুরু করি বল তো?

—বলছি বাবা। বলে রুমা একদৌড়ে বাড়ির সামনের দিকে চলে গেল। একটু বাদে ফিরে এসে একটা ঢিবির ওপর বসে একটা আঙুল তুলে বলল— ওইখানে বাবা। ওই জায়গাটায় খোঁড়ো। তা হলেই পাবো।

শ্যামল একটা লম্বা নিঃশ্বাস টেনে শাবল দিয়ে মাটি খুঁড়তে শুরু করল।

সূর্যাস্তের শেষ আলোটুকু ম্লান হতে হতে অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার একটু আগে ফুট দেড়েক গর্তের তলায় একটা শক্ত বিন্দুতে শাবলটা ঠেকল। আবছা আলোয় মনে হল সেটা একটা কাঠের বাক্স, লম্বা-চওড়ায় একটা জুতোর বাক্সের সমান হবে।

ঢিবির ওপর থেকে রুমা চেঁচিয়ে উঠল— ওই বাক্সটা বাবা! ওটা বের করো।

শ্যামল ধমকে উঠল, চুপ কর। চেঁচাসনি। বলে শাবলটা ফেলে দিয়ে পাগলের মতো কোদাল দিয়ে মাটি সরাতে লাগল। একটু বাদে গর্তের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে একটা কাঠের বাক্স উঠিয়ে নিয়ে এল। তারপর কোনোদিকে না তাকিয়ে বাক্সটা বগলদাবা করে হনহন করে হাঁটা লাগাল বাড়ির দিকে। তার পিছনে পিছনে দৌড়ল প্রতিমা।

রুমা ঢিবির ওপর থেকে লাফিয়ে নেমে বাবা-মার পিছনে পিছনে দৌড়তে দৌড়তে বলতে লাগল— ও বাবা! ওটা কিন্তু আমার, ওমা, তুমি নেবে না কিন্তু! ওমা! ওটা কিন্তু আমার।

শ্যামল পিছন ফিরে রক্তচক্ষু করে চেঁচিয়ে উঠল— চোপ! তোকে না চেঁচাতে বারণ করলুম। একটি শব্দ করবি না। চ্যাঁচালে ভীষণ মার খাবি।

রুমা তার বাবার এই রুদ্রমূর্তি দেখে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর নিঃশব্দে কাঁদতে কাঁদতে ফিরে গিয়ে ঢিবিটার ওপর বসে পড়ল।

রান্নাঘরে গিয়ে একটা কাটারি বের করে চাড় দিয়ে বাক্সটা খুলে ফেলল শ্যামল। ভেতর থেকে বেরুল একটা বিবর্ণ খবরের কাগজের মোড়ক আর তার ভেতরে একটা অপূর্ব সুন্দর বিলিতি পুতুল। তার চুলগুলো সোনালি, নীল চোখ, টুকটুকে লাল ঠোঁট, গোলাপি গালে টোল পড়া আর মুখটি হাসি-হাসি।

বিতৃষ্ণ দৃষ্টিতে পুতুলটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ হেসে উঠল শ্যামল। বলল— কী আশ্চর্য! আমার খেয়ালই ছিল না যে হাসি একটা বাচ্চা মেয়ে। আমারই ভুল... হি হি হি... আমারই ভুল। কতদিন এখানে সে একা রয়েছে, কে জানে। তার নতুন বন্ধুকে সে এর চেয়ে দামি উপহার আর কী-ই বা দিতে পারে? এটা নিশ্চয়ই তার সবচেয়ে প্রিয় পুতুল ছিল। ডাকো প্রতিমা, তোমার মেয়েকে ডাকো। তাকে প্রেজেন্টটা দেবে না?

কোথায় মেয়ে? সারা বাড়িতে কোথাও রুমাকে পাওয়া গেল না। পাগলের মতো দু-জনে ছুটে বাগানে বেরিয়ে এল। তারার আলোয় দেখা গেল একটা ঢিবির ওপরে পাথরের মূর্তির মতো বসে রয়েছে ছোটো মানুষটি। দু-হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজে কান্না চাপার প্রবল চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

শ্যামল দৌড়ে এসে মেয়ের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। বলল— এ কী রুমা এখানে বসে রয়েছ কেন? তোমার প্রেজেন্টটা বের করেছি। নেবে না সেটা? ভীষণ সুন্দর প্রেজেন্ট।

প্রবলবেগে মাথা নেড়ে রুমা বলল— না, নেব না। আমার চাই না প্রেজেন্ট।

—কেন? নেবে না কেন? আমি যে এত কষ্ট করে তোমার জন্যে মাটি খুঁড়ে বের করলুম।

—না, আমার চাই না। তুমি আমাকে বকেছ কেন? কী করেছি আমি?

শ্যামল দু-হাতে মেয়েকে কোলে তুলে উঠে দাঁড়াল। বলল— তুই কিচ্ছু করিসনি রে, মা! আর বিশ্বাস কর, আমিও তোকে বকিনি।

—হাঁ, বকেছ! বলেছ, মারবে আমাকে।

—সে কথা আমি বলিনি রে। আমার বুকের ভেতরে কতকগুলো ভূতপ্রেত দত্যিদানব ঢুকে পড়েছিল। ওসব কথা তারা বলেছে, বিশ্বাস কর।

কথাটা রুমা খুব যে বিশ্বাস করল তা মনে হল না, কিন্তু তার কান্নার বেগটা কমে এল। বলল— কী করে ঢুকল ওগুলো?

শ্যামল বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল— আমার নাক-চোখ-মুখ দিয়ে।

—সেগুলো এখনও আছে?

—নাঃ! একেবারে ঘাড় ধরে তাড়িয়ে দিয়েছি। তবে অনেকগুলো ঢুকেছিল তো। দু-একটা হয়তো এদিক-ওদিক লুকিয়ে রয়েছে। তবে, সেগুলোকে ঠিক শায়েস্তা করব, দেখে নিস।

চোখের জল মুছে হেসে উঠল রুমা। নিশ্চিত নির্ভরতায় দু-হাতে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বলল— তাহলে আর আমাকে বকবে না তো, বাবা?

এবার শ্যামলের চোখে জল আসার পালা। বলল— কখনো না। কোনোদিনও না। তারপর প্রতিমাকে বলল— চট করে তৈরি হয়ে নাও। রাত কিছুই হয়নি। চলো মি. মিত্র আর প্রফেসর ঘোষের সঙ্গে দেখা করে আসি। কাল চলে যাচ্ছি তো।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%