মনোজ সেন

রাজকন্যা স্বর্ণরেণু সকাল বেলা চিন্তিত আর বিষণ্ণ মুখে রাজবাড়ির বাগানে পায়চারি করছিল আর মাঝে মাঝে এক একটা ফুলগাছ থেকে ফুল তুলে তার পাপড়িগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে মাটিতে ফেলছিল। তার মুখ দেখে বেশ বোঝাই যাচ্ছিল যে সে কোনো কারণে মনে মনে খুব কষ্ট পাচ্ছে।
এইসময় সেনাপতি প্রদ্যুম্ন বাগানের পাশ দিয়ে রাজবাড়িতে যাচ্ছিলেন। প্রদ্যুম্নের বয়েস বেশি নয় কিন্তু বীরত্ব, সাহস আর তীক্ষ্ন বুদ্ধির জন্যে তাঁর খুব সুনাম। তাঁর বাবা দুর্মদ সিংহও ছিলেন মহাবীর আর এ রাজ্যের সেনাপতি। তিনি রাজামশায়ের একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুও ছিলেন। সেইজন্য দুর্মদ সিংহ অবসর নিলে, রাজামশাই প্রদ্যুম্নকেই সেনাপতি পদে বরণ করে নিয়েছেন।
স্বর্ণরেণুকে দেখে প্রদ্যুম্ন দাঁড়িয়ে গেলেন। বললেন— কী রে রেণু, এই সাতসকালে এমন হাঁড়িপানা মুখ করে আছিস কেন রে? রানিমা বকেছেন, না কাল একগাদা কুল খেয়েছিস, তাই পেট কামড়াচ্ছে? নইলে, চারদিকে এত ফুল ফুটেছে, পাখি-টাখি ডাকছে, এখন তো তোর চিত্ত প্রফুল্ল হবার কথা।
রাজকন্যা চোখ পাকিয়ে বললেন— তুমি থামো-তো প্রদ্যুম্নদা। পাখি কেন, হাতি ডাকলেও আমার চিত্ত আর কোনোদিন প্রফুল্ল হবে না, বুঝলে?
—বটে? তবে তো ব্যাপার খুব গুরুতর বলে মনে হচ্ছে। কী হয়েছে বলবি?
স্বর্ণরেণু কাঁদো কাঁদো হয়ে বললে— দেখো না, প্রদ্যুম্ন দাদা, বাবা আমার বিয়ে ঠিক করেছেন।
প্রদ্যুম্ন পুলকিত হয়ে বললেন— সে তো খুব ভালো কথা রে। তোর নিশ্চয়ই কোনো রাজার সঙ্গে বিয়ে হবে। ব্যস, অমনি তুই রাজকন্যে থেকে একলাফে রাজরানি হয়ে যাবি। তখন আর সারাদিন আমাদের রানিমার কথামতো চলতে হবে না, এই ঠান্ডায় সকাল-সন্ধে চন্দন মেখে পদ্ম ফুলের পাপড়ি ভেজানো জলে চান করতে হবে না, যত খুশি কুল আর লঙ্কার আচার খেতে পারবি। আর তোর বিয়েতে আমরাও কবজি ডুবিয়ে খাব। আর চারদিন নেমন্তন্ন তো হবেই বল, তাই না? অনেক দিন রাজবাড়িতে পাত পেড়ে খাওয়া হয়নি।
—তুমি চুপ করবে? তোমার খালি খাওয়ার চিন্তা। তুমি জানো, কার সঙ্গে আমার বিয়ের কথা চলছে? চূড়ামণি রাজ্যের রাজা গজগোবিন্দ সিংহের সঙ্গে। মা কাল থেকে অনবরত কেঁদে যাচ্ছে।
এইবার প্রদ্যুম্নের হাসি শুকিয়ে গেল। বললেন— গজগোবিন্দ? বলিস কী রে? সে ব্যাটার তো তিনটে রানি বর্তমান; আরও একটা চাই? লোকটার ধামার মতো পেট, মুখ ভরতি জঙ্গুলে দাড়িগোঁফ, বয়েসের কোনো গাছপাথর নেই, তার সঙ্গে তোর বিয়ে? কী হয়েছে আমাদের রাজামশায়ের?
—কী হয়েছে? বলিদান দিচ্ছেন মেয়েকে, বলিদান! তাঁর কাছে প্রজাদের মঙ্গল মেয়ের মঙ্গলের চেয়ে অনেক বেশি বড়ো।
—খুলে বল।
—গজগোবিন্দ বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছে। বলেছে বিয়ে না-দিলে সসৈন্যে এসে আমাদের রাজ্য ছারখার করে দেবে।
শুনে প্রদ্যুম্ন অট্টহাসি হেসে উঠলেন। বললেন— গজার সৈন্যেরা আমাদের রাজ্য ছারখার করে দেবে? সেদিন তো সূর্য সন্ধে বেলা পশ্চিম দিকে উঠবে। অন্য কেউ না-হোক, ওরা আমাদের আক্রমণ করলে হেরে ভূত হয়ে তো যাবেই, ওদের একজনও চূড়ামণিতে হেঁটে ফিরে যাবে না, হামাগুড়ি দিয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত দেখবি গজাব্যাটা রাজামশায়ের শোবার ঘর ঝাঁট দিচ্ছে।
—তুমি এত নিশ্চিত হচ্ছ কী করে?
—নিশ্চিত হব না? ওদের সেনাপতি কে জানিস? আমাদের উত্তর দিকে একটা রাজ্য আছে, তার নাম কাঞ্চনপুরী। তার রাজার ছোটো ভাইয়ের ছেলে, নাম অচলাদ্রি। একেবারে সার্থকনামা। পাহাড়ের মতোই অচল, ওকে নড়ায় কার সাধ্যি। ওর দিদিই তো গজার মেজোরানি। যেমন রাজা তার তেমনি সেনাপতি। ওকে তোর মনে নেই?
—না তো। কে অচলাদ্রি?
—তোর অবশ্যি মনে না থাকারই কথা। তুই যে বছর থেকে তপোবন গুরুগৃহে যেতে শুরু করলি, আমি আর অচল তো সেই বছরেই কৌশাম্বীতে চলে গেলুম যুদ্ধবিদ্যা শিখতে। অচল ছিল আমাদের মধ্যে সবচেয়ে গবেট, হাঁদাস্য হাঁদা। চার বছরেও কোদণ্ড আর কার্মুকের পার্থক্যই শিখে উঠতে পারল না। একটা পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হতে পারেনি। ওকে দেখলেই আমাদের গুরুমশায়ের শিখা খাড়া হয়ে যেত, চোখ লাল করে চিৎকার করতে শুরু করতেন। শেষপর্যন্ত আর পারলেন না, ওকে বিদ্যাশ্রম থেকে বেরই করে দিলেন। তখন দিদিকে ধরে গজার সৈন্যবাহিনীর সেনাপতি হয়ে গেল। ও একটা অস্ত্রই চালাতে পারে, সেটা হল বাঁটুল বা গুলতি।
স্বর্ণরেণু চিন্তিত হয়ে বলল— কিন্তু বাবা বোধ হয় এসব কথা জানেন না। তুমি একবার ওঁর সঙ্গে কথা বলে দেখো-না, প্রদ্যুম্ন দাদা। উনি তোমার কথা খুব মানেন। পারলে তুমিই পারবে। তোমার মনে নেই, ছেলেবেলায় তুমি আমার নাগালের বাইরে থাকা আম বা পেয়ারা পেড়ে দিতে? সেই রকম।
প্রদ্যুম্ন বললেন— রাজামশায়ের সঙ্গে আমি এখনই গিয়ে কথা বলছি। তুই এখানেই থাক, আমি এসে তোকে কথাবার্তা কী হল তা জানাচ্ছি।
বেশ কিছুক্ষণ বাদে প্রদ্যুম্ন রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন। উদবিগ্ন স্বর্ণরেণু এগিয়ে এসে বলল— কী কথা হল, প্রদ্যুম্ন দাদা? তোমাকে এমন গম্ভীর আর চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন?
প্রদ্যুম্ন বললেন— দ্যাখ, ব্যাপারটা যতটা সহজ ভেবেছিলুম তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুতর। ঘটনাটা হল, গজা রাজামশায়ের কাছে তুই যেমন বলেছিলি সেরকমই বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। তুই তো জানিস, আমাদের রাজামশাই যেমন মহাবীর আবার তেমনি দয়ালু আর শান্তিপ্রিয় মানুষ। উনি যুদ্ধ একেবারেই পছন্দ করেন না বরং ঘৃণা করেন। তাই উনি ভাবলেন তুই স্বয়ংবরা হতে চাস বললে গজা পেছিয়ে যাবে আর কোনো গণ্ডগোল হবে না। কারণ, ও অন্তত এটুকু বোঝে যে কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের রাজকন্যা ওর গলায় স্বেচ্ছায় মালা দেবে না। কিন্তু, সেই প্রস্তাবটা শোনার পরে এখন ও একটা নতুন চাল চেলে বসেছে। ও বলে পাঠিয়েছে যে ওর কাছে না কি একটা ধনু আছে যেটা ও ছাড়া আর কেউ তুলতে পারে না। ওই ধনুটা না কি রাবণ রাজার ধনু। রাম-রাবণের যুদ্ধের পর সেটা বিভীষণের হাতে যায়। বিভীষণ সেটা নিয়ে হিমালয়ে চলে যান তপস্যা করতে। গজা যখন হিমালয়ে গিয়েছিল তীর্থ করতে তখন সেখানে ওর সঙ্গে বিভীষণের দেখা হয়। তা, বিভীষণ না কি গজাকে দেখে এতই পছন্দ করে ফেলেন যে তাকে ধনুটা উপহার দিয়ে দেন।
—বাবা এই আষাঢ়ে গল্পটা বিশ্বাস করলেন? এতদিন ধরে বিভীষণ টিকে থাকতে পারেন কখনো?
—শাস্ত্রমতে কিন্তু থাকবারই কথা। রামচন্দ্রের বরে বিভীষণ তো অমর। কাজেই তাঁর সঙ্গে দেখা তো হতেই পারে। আর তাঁর তো গজাকে পছন্দ হবেই। ওকে দেখে তাঁর নিশ্চয়ই দাদার কথা মনে পড়ে গিয়েছিল, অমন রাক্ষুসে চেহারা তো মানুষের মধ্যে সচরাচর নজরে পড়ে না। তাই ভালোবেসে দাদার ধনুটা ওকেই দিয়ে দিয়েছেন।
—তোমার রসিকতা রাখো তো। এই ধনুর সঙ্গে স্বয়ংবরের কী সম্পর্ক?
—গজা বলেছে যে স্বয়ংবর হোক, কিন্তু তাতে একটা শর্ত থাকতে হবে। ওই ধনু নিয়ে গজা এখানে আসবে। স্বয়ংবর সভায় যে ওই ধনু তুলতে পারবে, তোকে তার গলায় মালা দিতে হবে। অনেকটা সীতার স্বয়ংবরের মতন আর কী! বোঝাই যাচ্ছে, ওটা গজা ছাড়া আর কেউ তুলতে পারবে না। তাহলে স্বয়ংবর সভায় তোকে ওর গলায় মালা দিতেই হবে আর সঙ্গে সঙ্গে এটাও প্রমাণ হবে যে ভারতবর্ষের সবচেয়ে শক্তিশালী লোক হল রাজা গজগোবিন্দ।
—তুমি বাবাকে ওই রাজাটির সৈন্যদল আর তার সেনাপতির কথা বলোনি?
প্রদ্যুম্ন হাত নেড়ে বললেন— বলিনি আবার? কিন্তু রাজামশাই কিছুতেই যুদ্ধ করতে রাজি নন। বললেন, যুদ্ধে হার-জিত যারই হোক না-কেন, কিছু সৈন্যের তো মৃত্যু হবেই। আমার ব্যক্তিগত সমস্যায় তারা কেন প্রাণ দেবে? তাদের পরিবার পরিজনকে আমি কী সান্ত্বনা দেব? তারা যে আমার প্রজা, আমার সন্তান। আমার মেয়ের সুখের জন্যে আমি এতজনের সুখ আর আনন্দ সারা জীবনের মতো কেড়ে নিতে পারি? ভারতবর্ষের কত রাজারই তো একাধিক স্ত্রী। তাঁরা সবাই যদি সুখে স্বচ্ছন্দে থাকতে পারেন তো আমার মেয়ে পারবে না কেন? কী জানিস রেণু, তোর বাবার কথা শুনতে শুনতে আমার তাঁর ওপরে রাগ আর শ্রদ্ধা দুটোই হচ্ছিল। আমি সৈনিক, যুদ্ধই আমার পেশা। তাই, যুদ্ধ যে কী একটা অর্থহীন জঘন্য ব্যাপার তা আমার চেয়ে বেশি আর কেউ জানে না। তাই, ওঁর কথা শুনতে শুনতে আমার মন শ্রদ্ধায় ভরে যাচ্ছিল। তবু রাগ হচ্ছিল এই ভেবে যে, এ যুগে তোর বাবার মতো একজন নির্লোভ আদর্শবান মানুষ জন্মান কেন? ওঁর কথায় আমাদের নিজেদের খুব খারাপ ধরনের অমানুষ বলে মনে হচ্ছিল।
—তাহলে কী হবে, প্রদ্যুম্ন দাদা?
—কী আবার হবে? স্বয়ংবর হবে।
স্বর্ণরেণু চেঁচিয়ে উঠল— স্বয়ংবর হবে? তার মানে আমাকে ওই রাক্ষসটাকে বিয়ে করতে হবে?
প্রদ্যুম্ন আবার হাত নেড়ে বললেন— আহা, স্বয়ংবর হবে মানেই যে তোকে গজাকে বিয়ে করতে হবে তা তো নয়।
—কী বলতে চাইছ তুমি?
—শোন, এই ধনু-তোলা ব্যাপারটার মধ্যে কোথাও একটা চালাকি আছে, সে বিষয়ে তো কোনো সন্দেহ নেই। গজা আর যাই হোক রামচন্দ্র নয়। যে ধনু কেউ তুলতে পারে না, সেটা ও তুলবে, একথা আমি মরে গেলেও বিশ্বাস করব না। ওর বিশাল ভুঁড়ি দেখলে কেউ তা করবেও না। আমি স্বয়ংবর সভায় ওর সেই মিথ্যাচারটা ধরে ফেলতে পারব বলে মনে করি। গজা এমন বুদ্ধিমান নয় যে, ওর কূটকৌশল আমি ধরতে পারব না। তাহলে ওর বিবাহ করার আশা তো যাবেই, নাকটা মাটিতে ঘষে যাবে সমস্ত রাজাদের সামনে।
—ব্যাপারটা তো ইন্দ্রজালও হতে পারে, কিংবা মন্ত্রশক্তি? সেক্ষেত্রে তুমি কিছু করতে পারবে কী?
—চুপ কর। আজকের যুগে ওসব ইন্দ্রজাল বা মন্ত্রশক্তিতে কেউ আবার বিশ্বাস করে না কি? ওসব মানুষের তৈরি ধাঁধা, লোক ঠকানোর জন্যে। এ ব্যাপারে আমি চার্বাক ঋষিদের কথাই মেনে চলি। তুই চুপচাপ থাক-তো। দেখ না, যদি রহস্যটা ধরতে নাও পারি, এমন একটা গণ্ডগোল বাঁধিয়ে দেব যে সব ভেস্তে যাবে। তারপরে কী হয়, সেটা তখন দেখা যাবে। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিলেই হবে।
—এরকম গণ্ডগোল বাবা পছন্দ করবেন কি? উনি কিন্তু অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হবেন।
—মনে হয় না। ওঁর মুখ দেখলে সন্দেহ থাকে না যে উনিও মনে মনে ভীষণ কষ্ট পাচ্ছেন। এরকম যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেলে উনি যতটা অসন্তুষ্ট হওয়া উচিত ততটা হয়তো হবেন না। তুই যাই বলিস না কেন, নিজের নীতিবোধের কাছে আসলে উনি নিজেকেই বলি দিচ্ছেন। সেটা তুই বুঝতে পারছিস না। সত্যি, আশ্চর্য মানুষ এই আমাদের রাজামশাই।
—আমার কিন্তু ভীষণ ভয় করছে, প্রদ্যুম্ন দাদা।
—আবার বলে ভয় করছে। বলেছি না যে ব্যাপারটা আমার হাতে ছেড়ে দে। তোকে আম আর পেয়ারা পেড়ে দিয়েছি আর এই কাজটা করতে পারব না?
স্বয়ংবরের দিন এসে গেল। রাজধানী পতাকা আর ফুলের স্তবকে সাজানো হয়েছে। পথগুলি জল দিয়ে ধোয়া হয়েছে, তার ওপরে ফুল ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিদ্যাশ্রমগুলিতে অনধ্যয়ন বা ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। ছেলে মেয়েরা বাসন্তী আর লাল রঙের কাপড় পড়ে, মাথায় নানা রকমের ফুলের অলংকার পরে হো হো করছে। স্বয়ংবর সভার জন্যে রাজবাড়ির পাশেই সুদৃশ্য বিশাল মণ্ডপ তৈরি হয়েছে। সেখানে ভোর না-হতেই উৎসবের সংগীত বেজে উঠেছে। রাজপথের দু-ধারে শিরস্ত্রাণ পরে সৈন্যদল সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে অভ্যাগত রাজাদের অভ্যর্থনা করবার জন্যে। তাঁদের দেখবার জন্যে রাজপথের দু-ধারে সমস্ত বাড়ির ছাদে ভিড় করে উত্তেজিত পুর নারীরা কলরব করছেন।
একটু পরেই ডঙ্কা আর শিঙ্গা বেজে উঠল। রাজাদের ফুল আর পতাকায় সাজানো রথগুলি একের পর এক রাজপথে এসে ঢুকল। প্রত্যেক রাজার রথ ঘিরে পায়ে পা মিলিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত শূলধারী দেহরক্ষীদল সগর্বে এগিয়ে এল। তাদের আগে আগে খোলা তলোয়ার হাতে প্রধান দেহরক্ষী চিৎকার করে তার রাজার নাম আর গুণাবলি ঘোষণা করতে করতে চলল। যেমন— সুপর্ণ রাজ্যের মহারাজ মহাবীর জয়লক্ষ্মীর বরপুত্র মহাধনুর্ধর মহারথ পরমকান্তিমান শ্রীমান ক্ষেমধর্মা আসছে-এ-এন। রথগুলি এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গেসঙ্গে বাড়িগুলির ছাদে ছাদে কোন রাজার ভাগ্যে বরমাল্য জুটতে পারে, তাই নিয়ে পুর নারীদের প্রবল আলোচনা চলতে লাগল।
সবশেষে এল চূড়ামণি রাজ্যের রাজা গজগোবিন্দের রথ। রথের ভেতরে সুখাসনে বসে তিনি খুব অহংকৃত মুখে এদিক-ওদিক দেখতে লাগলেন বটে, কিন্তু তাঁকে দেখে নাগরিকদের আলোচনাটা কেমন যেন থিতিয়ে গেল।
গজগোবিন্দের রথের পেছনে পেছনে এল একটা গোরুর গাড়ি। তার ওপরে রাখা মস্ত একটি জটিল কারুকার্য করা কাঠের পেটিকা। সেটার মধ্যেই না কি রাবণ রাজার ধনুটা থাকে। এসেছে চূড়ামণি থেকে রাজা গজগোবিন্দের সঙ্গে। ওটা কখনো কাউকে দেখতে দেওয়া হয় না, তবে এখন স্বয়ংবর উপলক্ষ্যে সবাইকে দেখাবার জন্যে সেটা পেটিকাটার ওপরে রাখা আছে।
পেটিকাটি লম্বায় প্রায় পাঁচহাত, চওড়ায় আর উচ্চতায় দু-হাত। তার ওপরে পাটের দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা আছে একটি ধনু। সেটি লম্বায় চারহাত, মাঝখানে যেটা মুষ্টি বা ধরবার জায়গা সেটা কালো শিঙের, বাকিটা সাদা কাঠের। ধনুটা কিন্তু খুবই সাধারণ, দেখলে নতুন বলেই মনে হয়, পুরাকালের বলে একেবারেই মনে হয় না। সবাই কৌতূহল নিয়ে সেটা দেখল বটে কিন্তু কেউ কোনো মন্তব্য করল না। গজগোবিন্দকে দেখে সকলেই যেন বেশ বিমর্ষ হয়ে পড়েছে বলে মনে হল। এবার একে একে দর্শকদের সবাই যে যার কাজে চলে গেল।
মণ্ডপের ভেতরে রাজারা অর্ধচন্দ্রের আকারে সাজানো আরামপ্রদ আসনগুলিতে বসেছেন। তাঁদের পাশে নিমন্ত্রিত অতিথিদের বসবার জায়গা। মণ্ডপের ওপরে প্রকাণ্ড কারুকার্য করা চন্দ্রাতপ, নীচে কাশ্মীরের মোটা রাজাস্তরণ। তাঁদের সামনে অসংখ্য পুষ্পস্তবকে সাজানো বিস্তীর্ণ ফাঁকা জায়গা। সেখানে কিছুটা দূরে পেটিকার ওপরে ধনুটা রাখা আছে। সেটা পাহারা দেবার জন্যে তার একপাশে সেনাপতি প্রদ্যুম্ন আর অন্যপাশে স্বর্ণরেণুর মামা রাজা অনঙ্গদেব খোলা তলোয়ার হাতে স্থির মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রয়েছেন। প্রদ্যুম্নের মুখ অভিব্যক্তিহীন কিন্তু তাঁর তীব্র আর চঞ্চল দৃষ্টি দেখলে বোঝা যায় যে তাঁর মনের ভেতরে কোনো একটা চিন্তা প্রবলভাবে কাজ করে চলেছে।
এদিকে সৈন্যরা সমস্ত মণ্ডপটি ঘিরে রেখেছে যাতে অনিমন্ত্রিত কেউ ঢুকে পড়তে না পারে। তাদের পেছনে কৌতূহলী জনতা উঁকিঝুঁকি মারছে আর উত্তেজিত আলোচনা করছে। রাজারাও নীচু গলায় নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন। ফলে উৎসব সংগীত ছাপিয়ে মণ্ডপের ভেতরে বেশ একটা গুন গুন করে গুঞ্জন চলছিল।
হঠাৎ দামামা বেজে উঠল। একজন ঘোষক মণ্ডপে ঢুকে উচ্চৈস্বরে ঘোষণা করলেন— আমাদের মহারাজা তাঁর কন্যা রাজকুমারী স্বর্ণরেণু সমভিব্যাহারে আসছেন।
সঙ্গেসঙ্গে গুঞ্জন বন্ধ হয়ে গেল। সবাই উৎসুক চোখে রাজপুরীর দিক থেকে মণ্ডপে ঢোকার প্রবেশপথের দিকে তাকিয়ে রইলেন। রাজামশায়ের পাশে পাশে রাজকন্যা স্বর্ণরেণু সভায় ঢুকলেন। তাঁদের পেছনে পেছনে এল রাজকন্যার সখীরা আর রাজামশায়ের দেহরক্ষীরা। সালঙ্কারা স্বর্ণরেণুর পরনে লাল চিনাংশুক, হাতে সাদাফুলের মোটা স্বয়ংবরের মালা। অপূর্ব সুন্দর দেখাচ্ছিল তাকে। সবাই নির্বাক হয়ে তাকে দেখতে লাগলেন।
রাজামশাই নিস্তব্ধ সভার মাঝখানে এসে তিনবার উচ্চকণ্ঠে বললেন— এই আমার একমাত্র মেয়ে স্বর্ণরেণু। আজ তার স্বয়ংবর অনুষ্ঠিত হবে। এই যে ধনুটি এখানে রাখা আছে, এটি এই সভায় উপস্থিত যিনি পেটিকার ওপর থেকে প্রথম তুলে ধরতে পারবেন, স্বর্ণরেণু তাঁর গলায় মালা দেবেন।
এই ঘোষণা করে রাজামশাই মেয়েকে নিয়ে পেটিকার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। প্রদ্যুম্ন সামনে দিকে তাকিয়ে খুব নীচু গলায় বললেন— ভয় পাসনি। সব ঠিক হয়ে যাবে।
কথাটা স্বর্ণরেণু আর রাজামশাই, দু-জনেরই কানে গেল। কিন্তু দু-জনেই চুপ করে রইলেন। রাজামশাইয়ের মুখটা গম্ভীর বিষণ্ণ হয়ে রইল।
এইবার একজন একজন করে রাজারা আসন থেকে উঠে হাসতে হাসতে পেটিকার দিকে আসতে লাগলেন। সঙ্গেসঙ্গে ঘোষক ঘোষণা করতে লাগল— এইবার চিত্রগঙ্গা রাজ্যের মহারাজ কীর্তিধর আসছেন। এইবার রজতগিরি রাজ্যের রাজকুমার অগ্নিদেব আসছেন। ইত্যাদি।
হাসতে হাসতে আসছেন তো বটে, তবে একটু পরেই মাথা নীচু করে ফিরেও যাচ্ছেন। রোগা-মোটা-বেঁটে লম্বা সব রাজারাই দু-হাতে ধনুটা ধরে হেঁইয়ো হেঁইয়ো করে অনেক টানাটানি করেও একচুল নড়াতে পারলেন না।
সবশেষে এলেন গজগোবিন্দ। বিরাট ভুঁড়ি দুলিয়ে থপ থপ করতে করতে ধনুটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ দু-হাত ঘষে চারবার তালি দিলেন। তারপর, কোনোরকমে সামনে ঝুঁকে এক হাতে ধরে ধনুটা তুলে ধরলেন। সেটা মাথার ওপরে তুলে বিজয়গর্বে সকলের দিকে তাকালেন। তারপর খুব সন্তর্পণে ধনুটা যথাস্থানে রেখে বিজয়গর্বে দু-বার হাততালি দিয়ে দাঁড়িগোঁফের ভেতর দিয়ে দন্তবিকাশ করতে করতে স্বর্ণরেণুর দিকে এগিয়ে গেলেন। সমস্ত সভা স্তব্ধ স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইল।
ঠিক তখুনি প্রদ্যুম্নর হুংকার শোনা গেল— একটু দাঁড়ান, রাজা গজগোবিন্দ। আপনার এই ধনু তোলবার ব্যাপারটা একটা কপটতা ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি এক্ষুণি সেটা প্রমাণ করে দিচ্ছি আর প্রমাণ করে দিচ্ছি যে আপনি এই স্বয়ংবর সভায় সমবেত সকলকে অন্যায়ভাবে প্রতারণা করেছেন।
গজগোবিন্দ দাঁড়িয়ে গিয়ে নাক কুঁচকে বললেন— এই কথা বলবার তুমি কে হে? তুমি তো একজন সামান্য সৈনিক। তুমি তো রাজা নও। এই প্রশ্ন তুলতে পারেন একমাত্র রাজারা। তোমার তো তোলবার অধিকার নেই।
—কে বলেছে আপনাকে যে অধিকার নেই? আমাদের রাজামশাই তো একবারও বলেননি যে এই স্বয়ংবর অনুষ্ঠান শুধু রাজাদের। তিনি স্পষ্ট বলেছেন যে এখানে উপস্থিত যে-কেউ এতে অংশ নিতে পারে। আমার মতে একজন সামান্য সৈনিকও পারে। কাজেই এই স্বয়ংবরে কেউ দুর্নীতির আশ্রয় নিলে, সেই অন্যায় কাজ প্রকাশ করে দেবার অধিকার এখানে সকলেরই আছে।
বলামাত্র সভার বাইরে সমবেত প্রজারা আর গজগোবিন্দের শত্রুপক্ষের রাজারা সমস্বরে বলে উঠলেন— ঠিক ঠিক, একদম ঠিক কথা।
রাজারা বললেন— তুমি এগিয়ে যাও তো। আমরা জানতে চাই রাজা গজগোবিন্দ আমাদের বোকা বানিয়েছেন কিনা।
গজগোবিন্দ পূর্ববৎ নাক কুঁচকে বললেন— ঠিক আছে। দ্যাখো, আমি কোনো অন্যায় করেছি কি না। তবে, যদি কিছু প্রমাণ করতে না পারো, তাহলে আমি তোমাদের রাজামশাইকে বলে তোমার মুণ্ডু কাটার ব্যবস্থা করব। এই কথাটা মনে রেখো।
প্রদ্যুম্ন সহাস্যে বললেন— মনে রাখব, রাজা গজগোবিন্দ।
প্রদ্যুম্ন দৃঢ়পদে ধনুটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তীব্র দৃষ্টতে ধনুটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে পর পর চারটে তালি দিলেন। তৎক্ষণাৎ গজগোবিন্দ চিৎকার করে উঠলেন— অ্যাই, অ্যাই, হাততালি দিচ্ছ কেন? হাততালি দেবে না, বলে দিচ্ছি।
প্রদ্যুম্ন গজগোবিন্দের কথায় কর্ণপাতও করলেন না। জোরে জোরে বললেন— ধনুটা একটু নড়েছে।
বলে একহাতে ধনুটা ধরে টেনে মাথার ওপরে তুলে ধরলেন। রাজাদের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন— এটা অত্যন্ত হালকা। একটা বাচ্চা ছেলেও এটা তুলতে পারে। আমার কখনোই সন্দেহ ছিল না যে গজগোবিন্দ আর যেই হন, মহাবীর নন। তিনি একটা প্রতারক। গজগোবিন্দের রামচন্দ্র হবার বাসনা হয়েছিল, যদিও তিনি তাঁর পায়ের নখেরও যোগ্য নন। তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে ইঁদুরের গোঁফ গজালে সে সিংহ হয় না।
একজন রাজা চিৎকার করে বললেন— গজগোবিন্দ ইন্দ্রজাল বা তান্ত্রিক মন্ত্র অবলম্বন করে আমাদের প্রতারণা করেছেন।
প্রদ্যুম্ন বললেন— না, ইন্দ্রজালে আমি বিশ্বাস করি না, তন্ত্রমন্ত্রে তো নয়-ই। এটা সোজাসুজি প্রতারণা। কীভাবে উনি এটা করলেন সেটাও এখুনি বের করে দিচ্ছি।
বলে প্রদ্যুম্ন খুব ভালো করে ধনুটা পরীক্ষা করলেন। তাঁর মুখে একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠল। তারপরে পেটিকাটা খুঁটিয়ে দেখলেন। এবার রাজাদের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন— দেখুন, এই ধনুর মাঝখানে মুঠো করে ধরবার জায়গা দু-পাশে দুটো ছোট্ট ছোট্ট লোহার পাত লাগানো আছে। দেখলে মনে হবে যে ধনুর্ধরের হাতের মুঠো যাতে পিছলে না যায় তার জন্যেই এই ব্যবস্থা। এই পাত দুটোর ডগায় একটা করে ছোটো ছিদ্র করা আছে। এবার দেখুন, এই পেটিকার ওপরে কারুকার্যের ভেতরে দুটো ছোটো ছিদ্র করা আছে যার ভেতর দিয়ে এই পাত দুটো গলে পেটিকার ভেতরে ঢুকে যাবে যদি সাবধানে ধনুটা এর ওপরে রাখা যায়। এখন যদি পেটিকার ভেতর থেকে এই দুটো ছিদ্রের ভেতরে একটা লোহার শলাকা ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে ওপর থেকে সহস্রবার টানলেও ধনুটা ওঠানো যাবে না।
রাজারা প্রশ্ন করলেন— তাহলে কি পেটিকার ভেতরে কোনো যন্ত্র রাখা আছে?
প্রদ্যুম্ন বললেন— দেখছি।
বলে পেটিকার ওপরের ভারী ডালাটা টেনে সরিয়ে দিলেন। দেখা গেল, ভেতরে একটা বেঁটে লোক লম্বা হয়ে শুয়ে রয়েছে। প্রদ্যুম্ন তাকে চুল ধরে টেনে তুলে বের করে আনলেন। এক চড় মেরে বললেন— কে তুই? ওখানে কী করছিলি?
লোকটা হাউমাউ করে বলল— আমি ছিদাম। আমি তো শলাকা পরাচ্ছিলুম।
—বটে? কে তোকে শলাকা পরাতে বলেছিল?
—আমাদের মহারাজ গজগোবিন্দ। আমাকে বললেন যে চারবার হাততালি শুনলে আমি যেন শলাকাটা ছ্যাঁদার ভেতর থেকে বের করে নি আর দু-বার হাততালি শুনলে আবার সেখানে ঢুকিয়ে দি।
তখন সভার ভেতরে-বাইরে ভীষণ গণ্ডগোল শুরু হয়ে গেল। গজগোবিন্দের পক্ষের রাজারা চিৎকার করে বললেন যে যুদ্ধে আর বিবাহে প্রতারণা করলে দোষ হয় না। বিপক্ষের রাজারা ততোধিক গলা ফাটিয়ে বললেন, বাজে কথা। যেকোনো অবস্থাতেই প্রতারণা অপরাধ এবং প্রতারককে শাস্তি পেতেই হবে।
এদিকে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রজারা এক এক পক্ষকে সমর্থন করে চিৎকার করতে লাগল। তারা এমন হুড়োহুড়ি লাগাল যে তাদের মণ্ডপের বাইরে রাখতে সৈন্যরা গলদঘর্ম হয়ে উঠল। গোলমালে কান পাতা দায় হয়ে উঠল।
তা, ক্ষত্রিয়রা তো বেশিক্ষণ তর্কাতর্কি করতে পারেন না। একটু পরেই সড়াক সড়াক করে কোষ থেকে তরোয়াল বেরিয়ে এল আর চোখের পলকে দু-পক্ষে প্রবল অসিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। সবাই মণ্ডপের ফাঁকা জায়গাটায় নেমে এলেন। খানিক বাদে কে যে কার সঙ্গে যুদ্ধ করছেন বোঝা দুষ্কর হয়ে উঠল।
ঠেলাঠেলি ধাক্কাধাক্কিতে অভ্যাগতদের বসবার আসনগুলো উলটেপালটে একাকার হল। রাজামশায়ের দেহরক্ষীরা তাঁকে ঘিরে ফেলে একপাশে নিয়ে গেল। রাজকুমারীর সখিরা এদিক-ওদিক ছিটকে গেল। স্বর্ণরেণু মালা হাতে কোথায় যাবে ঠিক করতে না-পেরে সন্ত্রস্তমুখে তাড়াতাড়ি প্রদ্যুম্নের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
প্রদ্যুম্ন তখন একসঙ্গে তিনজন রাজার সঙ্গে অসিযুদ্ধ করছিলেন। হঠাৎ, অন্য দুই যুযুধান রাজার ধাক্কায় স্বর্ণরেণুর হাত থেকে মালাটা ছিটকে গিয়ে প্রদ্যুম্নের গলায় পড়ে গেল।
প্রদ্যুম্ন চমকে উঠে বললেন— ওই যা, এটা আবার কী? ওরে বাবা, এটা যে স্বয়ংবরের মালা দেখছি। ওরে রেণু, কোথায় গেলি?
স্বর্ণরেণু বলল— এই তো, তোমার পাশেই আছি।
—এই মালাটা তাড়াতাড়ি খুলে নে তো।
—তুমি খুলে নাও না।
—যুদ্ধ করছি যে, একহাতে খুলতে গেলে ছিঁড়ে যেতে পারে। শিগগির কর।
—আমি খুলতে টুলতে পারব না।
—দূর বোকা! খুলবি না, মানে কী? এটা কী যে সে মালা নাকি? এটা হল স্বয়ংবরের মালা। এ মালা কি আমার গলায় মানায়?
—কেন মানাবে না? দিব্যি মানিয়েছে। অমন মোটা ফুলের মালা গলায় দিয়ে তোমার আগে কেউ বোধহয় অসিযুদ্ধ করেনি।
—এ তো আচ্ছা পাগলের পাল্লায় পড়া গেল দেখছি।
ঠিক এইসময় দেখা গেল রাজা গজগোবিন্দের সেনাপতি অচলাদ্রি তরোয়াল হাতে ভয়ে ভয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে কোথায় যেন যাচ্ছে।

প্রদ্যুম্ন গর্জন করে বললেন— এ্যাই অচা, ওদিকে কোথায় যাচ্ছিস?
অচলাদ্রি চমকে উঠে দাঁড়িয়ে গেল। আমতা আমতা করে বলল— না, মানে ওই ইয়ে, তোদের রাজামশাইকে বন্দি করতে যাচ্ছি। মানে, জামাইবাবু বললেন কিনা।
—সাবধান, আর এক পা এগোলে তোকে ওপর থেকে দেড় বিঘৎ ছেঁটে দেব, বলছি। তোকে তখন আর কেউ চিনতে পারবে না। যা! যেখান থেকে এসেছিস সেইখানে ফিরে যা।
বলতেই অচলাদ্রি বেশ কিছুটা যেন নিশ্চিন্ত হয়ে 'অ জামাইবাবু, অ জামাইবাবু' বলে চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে একদিকে চলে গেল।
তখন প্রদ্যুম্ন তার প্রতিপক্ষ তিনজন রাজাকে খুব বিনীতভাবে বললেন— আপনারা একটু দাঁড়াবেন? আমি এই রাজকুমারীর সঙ্গে একটু কথা বলেনি।
তিনজন রাজাই খুবই অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন— এ সব খুব খারাপ। চমৎকার যুদ্ধটা হচ্ছিল, তার মধ্যে যত সব ঝামেলা! ঠিক আছে, কথা শেষ করে নিন, আমরা দাঁড়াচ্ছি। তারপরে আবার শুরু করা যাবে।
প্রদ্যুম্ন রাজাদের ধন্যবাদ জানিয়ে স্বর্ণরেণুর দিকে ফিরে বলল— শোন রেণু, ছেলেমানুষী করিসনি। এই মালা কি আমার জন্যে? তুই এ মালা পরাবি কোনো রাজপুত্রকে কিংবা কোনো দিগ্বজয়ী রাজার গলায়। আমাকে পরালে সেটা ঠিক হবে না তো।
স্বর্ণরেণু বলল— কেন হবে না? তুমি রাজা বা রাজপুত্তুরের চেয়ে কম কীসে? রাজা বা রাজপুত্রদের কি মাথায় দুটো শিং আছে না পেছনে একটা ল্যাজ আছে?
অপেক্ষমান রাজাদের একজন বললেন— রাজকন্যা তো ঠিক কথাই বলেছেন। আপনি দেখতে শুনতে ভালো, খ্যাতনামা বীর, অনায়াসে তিনজনের সঙ্গে অসিযুদ্ধ করে যাচ্ছেন, আপনার তীক্ষ্ন বুদ্ধির কথা এতদিন শুনেই এসেছি, আজ স্বচক্ষে দেখেছি। আপনি রাজা বা রাজপুত্তুরদের চেয়ে কোন অংশে কম?
প্রদ্যুম্ন চোখ পাকিয়ে বললেন— আপনি চুপ করুন তো মশায়। মেলা জ্ঞান দেবেন না। দেখছেন এদিকে মা মনসা, আর আপনি তার ওপরে ধুনোর গন্ধ দিয়ে যাচ্ছেন। শুনুন, সেনাপতি হই আর যাই হই, আসলে আমি একজন বেতনভোগী সৈনিক। রাজামশাই যে বেতন দেন, তাতে আমি, আমার ছোটো ভাই, বাবা আর মা এই চারজনের সংসার সুখে-স্বাচ্ছন্দেই চলে যায়। আমি যদি এখন রাজকন্যে বিয়ে করি তাহলে আমরা সবাই কী আতান্তরে পড়ব, সেটা বুঝতে পারছেন? ঘটি-বাটি বিক্রি করে সকলকে যে পথে দাঁড়াতে হবে।
পেছন থেকে একটা গম্ভীর গলা শোনা গেল— সেটা পরেকার কথা। আপাতত রেণু এই স্বয়ংবর সভায় সর্বসমক্ষে তোমার গলায় মালাটা যখন দিয়েই ফেলেছে, তখন তোমার ওকে বিয়ে করা ছাড়া গত্যন্তর নেই।
বলে রাজামশাই উচ্চকণ্ঠে বললেন— সবাই শান্ত হন, অস্ত্র সংবরণ করুন। এই সভায় আমার একমাত্র মেয়ে রাজকন্যা স্বর্ণরেণু আমার পরম বন্ধু দুর্মদ সিংহের জ্যেষ্ঠপুত্র সেনাপতি প্রদ্যুম্ন সিংহের গলায় বরমাল্য দান করেছে। আমি তাদের আশীর্বাদ করছি এবং তাদের বিবাহে আপনাদের সবাইকে সপরিবারে নিমন্ত্রণ করছি। আপনারাও ওদের আশীর্বাদ করুন। আর ঘোষণা করছি যে এই বিবাহে যৌতুকস্বরূপ আমি আমার অর্ধেক রাজত্ব আমার জামাতা বাবাজীবনকে দান করছি।
সবাই সহর্ষে অনুমোদন জানালেন।
রানিমা কেঁদে কেঁদে শয্যা নিয়েছিলেন। স্বর্ণরেণুর সখীদের মুখে সব শুনে উঠে বসলেন। বললেন— আমার খুব ইচ্ছে ছিল যে রেণুর ঠিক প্রদ্যুম্নের মতো বুদ্ধিমান আর সাহসী একটি বর হোক। ভগবান যে আমার সেই ইচ্ছে পূর্ণ করবেন তা আমি ভাবতেও পারিনি। ওকে ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছি। বড়ো ভালো ছেলে। সৎ আর তেজস্বী। আমাদের রেণুকে ভয়ংকর বিপদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যেই বোধ হয় ভগবান ওকে পাঠিয়েছেন।
শুনে সখীরা হেসে গড়িয়ে পড়ল।
রানিমা আশ্চর্য হয়ে বললেন— হাসছিস কেন রে তোরা? এতে হাসির কী আছে?
সখীরা বলল— হাসব না? রাজামশাই হঠাৎ অর্ধেক রাজত্ব আর রাজকন্যের ঘোষণা করতেই মহাবীর প্রদ্যুম্ন দাদার হাত থেকে তরোয়ালটা ধুপ করে খসে পড়ল যে।
রানিমা সস্নেহে বললেন— তাতে হাসবার কী আছে? রেণুর মতো অমন একটা ডানপিটে দুষ্টু মেয়েকে বিয়ে করতে হবে শুনলে অনেক রথী-মহারথীরও বুকের রক্ত শুকিয়ে যাবে। আমাদের প্রদ্যুম্ন তো তাদের তুলনায় একেবারে ছেলেমানুষ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন