ভূতের কিল

হিরণ্ময় ভট্টাচার্য

কথায় বলে সুখে থাকতে ভূতে কিলোয়। আমাদের সেজমামা বেশ ছিলেন। দু-বেলা পোয়াটাক চালের ভাত খেয়ে, নাকে সরষের তেল দিয়ে দিব্যি বারো ঘণ্টা ঘুমোতেন। এম এ, এল এল বি পাশ করার পর এই ডামাডোলের বাজারেও তিন তিনটে চাকরি ধরেছেন আর ছেড়েছেন। কোনোটা বারো দিনের বেশি করেননি। ‘তেরো’ শব্দটা আনলাকি বলেই কিনা কে জানে।

আসলে মামা স্বভাবশিল্পী। গোটা জীবনটা কাব্যচর্চায় নি:শেষ করবেন এই ছিল তাঁর ‘চিতোর রানার পণ’। দু-চার লাইন কাব্য রচনা না করে তিনি জলস্পর্শ করতেন না। একান্নবর্তী পরিবারের এক অন্য পুরুষ হিসেবে বেশ সুখেই দিন কাটছিল তাঁর।

সেদিন যে কী হল। সন্ধ্যায় ত্রিকোণ দিঘি থেকে বাড়ি ফেরার সময় ভূতে গন্ডাকয়েক কিল মারল তাঁকে। কয়েক কিলো কিল খেয়ে বাড়ি ফিরলেন। কিল খেয়ে কিল হজম করার লোক সেজমামা নন। তাই রাগে-অপমানে কাঁপতে কাঁপতে বাড়ির গাড়ি-বারান্দায় গোঁ গোঁ শব্দে মামার সেই যে মূর্ছা ও পতন—উঠলেন পাক্কা একঘণ্টা বাদে। পথচারীরা ভাবল গোরুর বাছুর হয়েছে। উঠেই বীরবিক্রমে শুধোলেন, ‘কোথায় সে? এই তো পেয়েছি। বাছাধন, এখানে ট্যাঁ ফোঁ চলবে না। এবার পালাবে কোথায়?। ঘুঘু দেখেছ ফাঁদ দ্যাখোনি?’ এই বলে যাঁর কলার চেপে ধরলেন, তিনি হলেন মালোপাড়ার হোমিয়োপ্যাথি ডাক্তার বঙ্কু সমাদ্দার। নিরীহ, নিপাট ভদ্রলোক। শীর্ণ পেশির ডৌল দেখে অনুমান করা কঠিন নয়, তিনি কস্মিনকালেও বাহুবলের আস্ফালন করেননি। ট্যাঁ ফোঁ তো করেন না, পালানোর মতো কাজও করেন বলে মনে হয় না। ঘুঘু এবং ফাঁদ কোনোটা দেখারই তাঁর আগ্রহ নেই যতদূর জানা যায়। যাই হোক, সেজমামার থাবার করাল গ্রাস থেকে তো ডাক্তারকে উদ্ধার করা গেল। অতঃকিম? সেজমামা কাকে খুঁজছেন? কে মামার পাকা ধানে মই দিয়েছে? আসল কথা হল, সেজমামার কাব্য। মামার ধারণা কেউ তাঁর উচ্চমানের কাব্যের প্রশংসা করতে চায় না। তিনি যাদেরই ডেকে ডেকে শোনান, তারা বসে বসে পিঠ চুলকোয়, কান খোঁচায়, নয়তো হাই তোলে কিংবা মুখ ব্যাজার করে গোঁজ হয়ে বসে থাকে। ইদানীং সেজমামার ধারে-কাছে কেউ ঘেঁষতে চায় না কাব্যাঘাতের ভয়ে। আর সেজমামা বিলাপের সুরে বলেন, ‘না মরলে এদেশে প্রতিভার মূল্যায়ন হয় না। আমি মরলে তোরা পাঁচমাথার মোড়ে মূর্তি বসাবি, অথচ বেঁচে থাকতে কেউ আমল দিলিনে। থাকতে দিলে না ভাতকাপড় মরলে করবে দানসাগর। তাহলে জিনিয়াস হয়ে লাভটা কী হল আমার?’ আমরা ছোটো ভাগ্নে-ভাগ্নিরাও ভাবি, সত্যিই তো। পাড়ার লোকেরা ফালতু আড্ডা মেরে কত সময় অপচয় করে। সে সময় সেজমামার কাব্য শুনলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়? অগত্যা আমরা অপরিণত ভাগ্নেভাগ্নিরাই মনপ্রাণ সমর্পণ করে মামার উচ্চগুণসম্পন্ন কাব্যের রস আস্বাদন করার চেষ্টা করি। কারণ, জানি, কাব্যরস আস্বাদনের ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলেই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে অন্য রস। চকোলেট, ক্যাডবেরি বা অন্য কিছুর রস। কাব্য শুনতে শুনতে রসে আমাদের জিভের প্রত্যন্ত প্রদেশ লালায়িত হয়ে ওঠে।

বাছাধন...পালবে কোথায়?

সেজমামার এই কাব্যগুণ বা বৈগুণ্য খেদাবার বহুল প্রচেষ্টা করেছেন বড়োমামা। কিন্তু হা হতোস্মি। যে কে সেই। গ্যালিলিয়ো কথা প্রত্যাহার করে নিলেও পৃথিবী ঘোরে। হয়তো দিন সাতেকের জন্য সেজমামা লেখা ছাড়েন। কিন্তু পুনর্মূষিক ভব। আসলে ওই সাতদিন লেখা ছাড়া হল, সেজমামার বিরাট কিছু শুরু করার আগের একটা বিশ্রাম। যদিও বড়োমামা হাল ছাড়েননি বা লেগে থাকায় ক্ষান্ত দেননি। সেজমামা এমন গদ্য লেখেন যা পড়লে নাকি, (বড়োমামার কথায়) ‘হজম হয়ে যাওয়া ভাত পর্যন্ত চাল হয়ে উঠে আসে।’ একটু নমুনা নেওয়া যাক—

‘তুষ্ণিভাবাপন্ন তৃণের তূর্ণ তেজে আথিবিথি অপোহ ক্ষোদনে পয়োমূক বেলেস্তারায় জাজ্জ্বল্যমান হর্ষক্ষ...’। এই দিয়ে সেজমামার ‘উচ্চক্কা’ উপন্যাসের শুরু। সেজমামার ধারণা একবিংশ শতাব্দীতে এই উপন্যাস বেস্টসেলার হবে। কাড়াকাড়ি পড়ে যাবে একটা কপির জন্য। ঔপন্যাসিকের নামে শুরু হয়ে যাবে আন্তর্জাতিক ঢক্কা-নিনাদ। তবে মামা বলেন, তাঁকে লোকে ভার্সেটাইল জিনিয়াস বললে কী হবে, তিনি মূলত কবি। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিতব্য। নাম—‘অমোঘ সাধ্বস’। তার প্রথম কবিতাটি অতি উপাদেয়। যেমন তার ছন্দ, তেমন অর্থ।

হৃদয় বল্কলে প্রভু নিদাঘের হিম

আস্তাবলে খাস্তা হলে অশ্বের ডিম।

নিদাঘ বল্কলে কভু হৃদয়ের হিম

অশ্বডিম্ব ভস্মাশিম্ব দাড়িম্ব রহিম।

যাই হোক, আমরা সকলে চিন্তিত। এ হেন গুণবান উদার সেজমামাকে ভূতে কেন কিল মারতে যাবে? ভূতেদের কাব্যসাহিত্যের প্রতি আক্রোশ আছে বলে তো কোনোদিন শোনা যায়নি। আমরা সব কাজিনরা মেঘ না চাইতেই জলের মতো কমিকসের বই, বাবলগাম, পেস্তাবাদাম পেয়ে যাই। বাইরের লোকজনও সেজমামার কাছে কিছু চেয়ে কোনোদিন বিমুখ হয় না। ভূতেদের যদি সত্যিই তেমন কোনো দাবিদাওয়া থাকে তা সেজমামাকে প্রকাশ্যে বললেই পারে। এত ঢাকঢাক গুড়গুড় কীসের? ভূত বলে সেজমামা নিশ্চয়ই নাক সিঁটকোবেন না। বরং ভূতেদের ধরে দু-চার ডজন কবিতাও শুনিয়ে দিতে পারেন বলা যায় না। ‘ফিরে এসে কবিতা শুনব’ এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে একজন সেজমামার সাইকেল নিয়ে গিয়ে তিনদিন ফেরত দেয়নি।

ভূতেরা বড্ড বোকা। দিঘির পাড়ে নিরিবিলিতে মামার নিসর্গপ্রেমে খামোকা বাধা সৃষ্টি করিস কেন? বড়োমামা সেজমামাকে ডেকে পাঠালেন। সেজমামার থেকে বছর দশেকের বড়ো তিনি। তাই একটু হম্বিতম্বি করতে ভালোবাসেন। ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন—

—হ্যাঁ রে ভূতটা কেমন দেখতে?

—ভালো দেখতে...‘পাইনি’ শব্দটা গলার কফের সঙ্গে জড়িয়ে গেল।

—ভালো দেখতে? বড়োমামা আঁতকে উঠলেন।

—না, মানে দেখতে পাইনি।

—যাক বাঁচোয়া। ‘বাঁচোয়া’ শব্দ কেন বললেন বড়োমামা আমরা পরে বুঝেছি।

—একজন ছিল না দল বেঁধে?

—একজন।

—আস্তে মেরেছে না জোরে?

—আস্তে।

—লাগেনি তো?

—না।

—ভূতে কোনো উপদেশ বা পরামর্শ দিয়েছে?

—না।

—চেপে যাচ্ছিস না তো, সত্যি কথা বল?

সেজমামা কিছু না বলে মাথা নীচু করে রইল। বড়োমামা বললেন, ‘ভূতে অনেকসময় ভালো পরামর্শও দেয়। কালু বোসের বড়ো ছেলেকে একবার ভূতে ধরে আটার কল খুলতে বলেছিল। সেই কথা শুনে কালু বোসের আঙুল ফুলে কলাগাছ। ভূতেরা মানুষদের শুধু অনিষ্টই করে, এটা মানুষদের ভুল ধারণা। আচ্ছা যা। সাবধানে চলিস।’

বাড়ির পুরোনো কাজের লোক নিধিরামকে সেদিন বিকেল থেকেই দেখছি না। আমরা চার ভাগ্নেভাগ্নি রাতে খাওয়াদাওয়ার পর বাড়ির পিছনে বাঁধানো ঘাটে গিয়ে বসব বলে খিড়কির দরজা দিয়ে বেরোলাম। চমৎকার ফুটফুটে জ্যোৎস্না। প্রমিতা হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, ‘ওই যে সেই ভূতটা, সেজমামাকে খুঁজছে বোধহয়। জলে পা ডুবিয়ে বসে আছে। আমরা চমকে উঠলাম।

সত্যিই তো। দেখি ভূতটা আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে। ঝকাই দারুণ সাহসী। কোমরে হাত দিয়ে তরোয়াল খোলবার কায়দায় ও বলল, ‘চল তো যাই। বড়োমামা বলেছে, ভূতেরা নাকি ভালো পরামর্শ দেয়। চল তো পরীক্ষার কোনো প্রশ্ন যদি বাগানো যায়।’ আমরা ভয়ে ভয়ে কাছে যেতেই দেখি, ভূতটা কাঁদছে। চোখের জল মুছে নিয়ে বলল, ‘দিদিমণি, আমি ভূত নই, নিধে। বড়দাভাই আমারে দিয়ে সেজদাভাইরে মার খাওয়ালেন। নাকিসুরে বলতি বললেন, কবিতা লিখা ছাড়ো। তাই বললাম। সেই থেকে বড়ো ক্লেশ হতিছে। সেজদাভাইরে আমি কোলেপিঠে মানুষ করিছি। তারে কিল মারতি প্রাণে ব্যথা লাগল গো। না পারি বড়দাভাইয়ের কথা ফেলতি, না পারি সেজদাভাইরি...’ কথা শেষ না করে হাউহাউ করে কেঁদে উঠল নিধিরামদা। আমাদের কাছে সমস্ত ব্যাপারটা জলবৎ তরলং হয়ে গেল। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো ক্লাস এইটের ছোড়দা জানত নিধিরামদা পুকুরের পাড়ে বসে আছে। বলল, ‘চলো নিধেদা, দিদা খেতে ডাকতে পাঠিয়েছে। পরে আবার সময় পেলে কেঁদে নিও।’

অধ্যায় ১ / ২৫
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%