মনোজ সেন

সে অনেকদিন আগেকার কথা। শম্পা নদীর ধারে আনন্দনগর বলে একটা রাজ্য ছিল। সে একটা ভারি সুন্দর দেশ। আনন্দনগরের দক্ষিণে দিগন্তবিস্তৃত ধান খেত, পশ্চিমে শম্পা নদী আর উত্তর ও পূর্বদিক ঘিরে ঘন জঙ্গলে ঢাকা শ্রাবণী পর্বতমালা। সেখানে তখন প্রতাপ সিংহ রাজত্ব করতেন। তিনি খুব ভালো রাজা ছিলেন, তাঁকে সবাই ভক্তি করত, ভালোবাসত।
সেই রাজ্যে সীতা বলে একটি মেয়ে থাকত। তার বাবা-মা দিনমজুর, তাঁরা শহরে কাজ করতেন আর ছুটি পেলে বাড়িতে আসতেন। সীতা থাকত তার বুড়ি পিসিমার সঙ্গে জঙ্গলের ভেতরে শম্পার ধারে একটা ছোট্ট কুঁড়েঘরে। সকাল বেলা সে তার পিসির কাছে পড়াশুনো করত, আর বাকি দিনটা পাহাড়ে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াত। সেখানকার যত পশুপাখি তার বন্ধু ছিল। সে নির্ভয়ে তাদের সঙ্গে খেলে বেড়াত।
সেদিন বিকেল বেলা দিনের পড়ন্ত আলোয় সীতা নদীর ধারে একটা পাথরের ওপরে বসে মালা গাঁথছিল আর গোটা ছয়েক টুনটুনি পাখি এধার-ওধার থেকে ফুল তুলে এনে ওর কোলের ওপর ফেলছিল। হঠাৎ ঝোপঝাড় ভেঙে একটা বাঘ হুড়মুড় করে দৌড়ে এসে ওর পায়ের কাছে বসে পড়ল। তারপর, হাঁপাতে হাঁপাতে হাউমাউ করে করুণভাবে কী যেন বলল ওকে।
সীতা নীচু হয়ে বাঘের গলা জড়িয়ে ধরে বলল, কোনো ভয় নেই তোমার, আমি থাকতে কেউ তোমার কিছু করতে পারবে না। তুমি এখানে চুপ করে বসে থাকো তো। বলে মুখ তুলে দেখল একটা গাছের নীচে তির-ধনুক হাতে একজন সদ্য গোঁফ গজানো ভারি সুদর্শন ছেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। নির্বাক বিস্ময়ে সে তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে।
সীতার চোখে চোখ পড়তেই ছেলেটি বলল— করছ কী তুমি? ওটা একটা বাঘ!
সীতা বলল— আমি জানি এটা একটা বাঘ। তুমি কে? তুমি এখানে কী করছ?
ছেলেটি কিছু বলবার আগেই বাঘটা গুরগুর করে কী যেন বলল। শুনে সীতা চোখ পাকিয়ে বলল— তুমি একে মারতে যাচ্ছিলে, না? কেন?
ছেলেটি আরও আশ্চর্য হয়ে বলল— কেন আবার কী? বাঘ মারব না?
—কেন মারবে? আমি তো সে কথাই জানতে চাইছি। ও তো তোমার কোনো ক্ষতি করেনি।
—না, তা করেনি। তবে, করতে তো পারে। সেইজন্যে বাঘ মারতে হয়, বুঝলে? তা ছাড়া, বাঘ মারতে না পারলে মৃগয়ায় খ্যাতি হবে কী করে?
—সে তো অনেক মানুষও তোমার ক্ষতি করতে পারে। যাও-না, তাদের মারো-না গিয়ে। স্রেফ নাম করার জন্য একটা জীবন্ত প্রাণীকে মেরে ফেলতে হবে? তার কথা, তার বাবা-মার কথা একবারও ভাববার দরকার নেই?
মাথা চুলকে ছেলেটি বলল— তা তো জানি না। তবে এমনই তো হয়।
—এ কখনো হতে পারে না। তুমি যাও-তো, বাড়ি যাও। এখানে এরকম খুনোখুনি করলে আমি কিন্তু মহারাজা প্রতাপ সিংহকে বলে দেব।
ছেলেটি যেন খুব ভয় পেয়েছে এমনিভাবে বলল— সর্বনাশ! তুমি মহারাজা প্রতাপ সিংহকে চেন না কি?
—না, চিনি না। তবে শুনেছি তিনি খুব ভালো লোক আর অন্যায়-অবিচারকে কক্ষনো প্রশ্রয় দেন না। কাজেই ভালো চাও তো এই মুহূর্তে বাড়ি ফিরে যাও।
ছেলেটি করুণ মুখে বলল— যাব-তো, কিন্তু আমি যে বাঘটাকে তাড়া করতে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেছি। তুমি আমাকে এই জঙ্গল থেকে বেরুবার রাস্তাটা দেখিয়ে দেবে?
মাথা নেড়ে সীতা বলল— আমি এখন যেতে পারব না। এই লবাই তোমাকে নিয়ে যাবে। বলে বাঘটাকে দেখিয়ে দিল।
—এর নাম লবাই? তোমার পোষা বুঝি?
—পোষা আবার কী? ও আমার বন্ধু।
—পোষা নয়, সর্বনাশ! বুনো বাঘ, মাঝপথে ও যদি আমাকে খেয়ে ফেলে?
—খামোখা ও তোমাকে খেতে যাবে কেন? ওর সঙ্গে বন্ধুর মতো যাও, কিচ্ছু হবে না। যদি ওর কোনোরকম ক্ষতি করতে চেষ্টা করো, তাহলে কিন্তু কী হবে তা আমি জানি না।
—ওরে বাবা! আর কি কেউ নেই যে আমাকে রাস্তা দেখাতে পারে?
বাঘটা গরগর করে শব্দ করল। সীতা বলল— ঠিক আছে। তুমি যাও, ডেকে নিয়ে এস। বলামাত্র বাঘটা উঠে জঙ্গলের ভেতরে চলে গেল।
ছেলেটি কপালের ঘাম মুছে ধপ করে একটা পাথরের ওপর বসে পড়ল। বলল— তোমার বন্ধু কাকে ডাকতে গেল?
সীতা মালা গাঁথতে গাঁথতে হাসতে হাসতে বলল— তোমাকে যে পথ দেখাবে অথচ খেয়ে ফেলবে না, তাকে। লবাই বুঝতে পেরেছে যে তুমি ওকে ভয় পাচ্ছ।
—বলো কী? তুমি বাঘের ভাষা বুঝতে পারো? কী করে?
—বাঃ, জন্ম থেকে এদের মধ্যে আছি আর এদের কথা বুঝতে পারব না? শুধু বাঘ কেন, আমি সব পশুপাখিরই ভাষা বুঝতে পারি। যদি না বুঝতুম তাহলে এরা কী আর আমার সঙ্গে খেলতে বা সুখ-দুঃখের ভাগ নিতে রাজি হত?
বলতে না-বলতেই ধুপধাপ করতে করতে গাছের ডালাপালা সরিয়ে একটা বিশাল দাঁতাল হাতি এসে সীতার পাশে দাঁড়াল। সীতা বলল— দমদম, এ পথ হারিয়ে ফেলেছে। যাও তো, ওকে বনের বাইরে রেখে এস।
দমদম চোখের নিমেষে বিস্ময়বিমূঢ় ছেলেটিকে শুঁড়ে জড়িয়ে তুলে নিল পিঠের ওপরে, তার তির-ধনুক পড়ে রইল মাটিতে। তারপর শম্পার ধার দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। ছেলেটির সন্ত্রস্ত হতচকিত মুখভঙ্গি দেখে সীতা হাসতে হাসতে পড়েই যাচ্ছিল। কোনোরকমে সামলে নিয়ে চেঁচিয়ে বলল— আমার নাম সীতা। তোমার নাম কী?
করুণ কণ্ঠে উত্তর এল, আমার নাম বিক্রম। তারপরেই দমদম গভীর জঙ্গলে ঢুকে গেল।
একটা দাঁড়কাক গাছের ডালে বসে ব্যাপারটা দেখছিল। সে এবার ঝুপ করে নেমে এসে সীতার সামনে ঘাড় বেঁকিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। সীতা তাকে কিছুক্ষণ লক্ষ করে বলল— কী রে মসুরি, কিছু বলবি?
মসুরি খানিক ইতস্তত করে বলল— হ্যাঁ, বলার তো ছিল। কিন্তু সেটা উচিত হবে কি না ভাবছি।
—বেশ। ভাবা শেষ হলে তখন বলিস।
—মানে, কী জানিস? মানুষদের ব্যাপারে আমরা তো কখনো নাক গলাই না, সেটা প্রকৃতিবিরুদ্ধ কাজ। তাই ভাবছিলুম কথাটা বলা ঠিক হচ্ছে কি না। আচ্ছা, এই যে ছেলেটি এখানে এসেছিল তাকে তুই চিনিস?
—না তো। কী করে চিনব? নাম তো বলে গেল বিক্রম।
—হ্যাঁ, মহারাজা প্রতাপ সিংহের ছেলে, আনন্দনগরের যুবরাজ।
—তা হতে পারে। একদম ক্যাবলা।
মোটেই না। দেখতে ছেলেমানুষ হলে কী হবে, ভীষণ বীর। ওর বীরত্বের কথা সবার মুখে মুখে ফেরে। ভয়ডর নেই। ইচ্ছে করে তোর সামনে ক্যাবলামি করছিল। বুঝিস না, প্রচণ্ড দুঃসাহসী না-হলে কেউ পায়ে হেঁটে বাঘের পেছনে তাড়া করে? ওর তোকে খুব ভালো লেগেছে। ওর কিন্তু ভীষণ বিপদ।
—বিপদ? কীসের বিপদ?
—আমরা শহরের কাকেদের কাছে খবর পেয়েছি যে ওর মামা, যাকে প্রতাপ সিংহ আশ্রয় দিয়েছিলেন, মহারাজাকে মেরে আর বিক্রম সিংহকে নির্বাসনে পাঠিয়ে নিজে রাজা হয়ে বসবার ষড়যন্ত্র করছে। এর জন্যে সে গুপ্তঘাতক নিয়োগ করবারও ব্যবস্থা প্রায় ঠিক করে ফেলেছে। এরকম নীচতা আর অন্নদাতার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা কেবল মানুষের মধ্যেই দেখা যায় রে, আর কোথাও নয়।
সীতা চোখ পাকিয়ে বলল— চুপ কর। সব মানুষই এরকম নয়, বুঝলি? কিন্তু, এ তো ভালো কথা নয়। এসব তো বন্ধ করা দরকার। তবে, এত দূর থেকে আমরা করবই-বা কী? এবার বোধ হয় আমার ভাবার পালা। কিংবা আমাদের দু-জনের।
—আমি অত ভাবতে-টাবতে পারিনে। এক কাজ করি। সড়সড়িকে ডেকে আনি? সে-ই এই সমস্ত বনের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান।
সীতা বলল— হ্যাঁ, সেই ভালো। যা, ডেকে আন। কাছেই কোথাও আছে। তাড়াতাড়ি যাবি। সন্ধে হয়ে আসছে, মনে থাকে যেন।
মনে থাকবে বলে মসুরি ফুড়ুৎ করে উড়ে গেল। ফিরে এল একটু বাদেই। তার পেছনে পেছনে এল একটা বুড়ো শকুন। বিরাট ডানা গুটিয়ে সে যখন আকাশ থেকে নেমে সীতার পাশে বসল, তাকে দেখাল ঠিক একটা টাকমাথা কালো চাদরমুড়ি দেওয়া বৃদ্ধের মতো।
সড়সড়ি থেমে থেমে বলল— মসুরি আমাকে সবকথা বলেছে। প্রতাপ সিংহকে যদি বাঁচাতে চাও, তাহলে তোমাকে এই ষড়যন্ত্রের কথা তাঁকে জানাতে হবে। কিন্তু ষড়যন্ত্র হচ্ছে, শুধু এইটুকু জানালেই তো চলবে না। রাজা তাঁর শালাকে অত্যন্ত স্নেহ করেন, বিশ্বাস করেন। তাঁকে অকাট্য প্রমাণ দিতে হবে। নইলে তিনি তোমার কথায় কিছুমাত্র বিচলিত হবেন না।
মসুরি বলল— অকাট্য প্রমাণ পাব কী করে?
—শহরের সব কাক আর প্যাঁচাদের বলে দে, যেন তারা রাজশ্যালক বিরুপাক্ষের ওপর দিনরাত নজর রাখে। সে কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে কথা বলছে, কী কথা বলছে, সব খবর আমার চাই। রোজকার রোজ খবর আনবি। তারপরে কী করতে হবে, আমি বলে দেব।
কিছুদিন পরেকার কথা। সকাল বেলা মহারাজা প্রতাপ সিংহ বসেছেন রাজসভায়। পাশে যুবরাজ বিক্রম। চারদিকে পাত্র-মিত্র, সেপাই-সান্ত্রী আর প্রজাদের ভিড়। রাজকার্য চলছে। মহামন্ত্রী কী যেন বলছিলেন, হঠাৎ একটা পায়রা সভাঘরের ঘুলঘুলি দিয়ে ঢুকে ফটফট করে উড়ে এসে রাজার সিংহাসনের হাতলের ওপর বসল। তার মুখে একটা তালপাতা। সেটা রাজার কোলের ওপর ফেলে দিয়েই সে উড়ে গিয়ে ঘুলঘুলির ওপরে বসল, কিন্তু বেরিয়ে গেল না।
রাজামশাই বিরক্ত হয়ে পাতাটা ফেলে দিতে গিয়ে দেখেন তার ওপরে ভুসোকালি দিয়ে কী যেন লেখা রয়েছে। সেটা পড়তে পড়তে তাঁর মুখ থমথমে হয়ে উঠল। তিনি পাতাটা বিক্রমের হাতে দিয়ে বললেন— পড়ে দ্যাখো। পরে এ নিয়ে তোমার সঙ্গে কথা বলছি।
বলে মুখ তুলে পায়রাটার দিকে তাকাতেই সে ঘুলঘুলি দিয়ে বেরিয়ে উড়ে চলে গেল, যেন পাতাটা রাজা পড়লেন কিনা সেটুকু দেখবার জন্যই অপেক্ষা করছিল।
মহামন্ত্রী ব্যাপারটা লক্ষ করছিলেন। বললেন— কী ওটা?
প্রতাপ সিংহ বললেন— ও কিছু নয়। কোত্থেকে কী তুলে এনেছে পায়রাটা। আপনি যা বলছিলেন, বলুন।
সেদিন রাজসভা শেষ হলে প্রতাপ সিংহ ছেলেকে নিয়ে মন্ত্রণাকক্ষে ঢুকলেন। তাঁর অনুমতি ছাড়া সেখানে আর কারুর ঢোকবার অধিকার নেই। বললেন— চিঠিটা পড়লে? আগামীকাল আমাকে প্রাতর্ভ্রমণ করতে বারণ করা হয়েছে কারণ উদ্যানে নাকি চারজন গুপ্তঘাতক থাকবে আমাকে হত্যা করবার জন্য। তারা আবার নাকি বিরুপাক্ষের দলে। এ কখনো সম্ভব? সে আমার সবচেয়ে অনুগত বিশ্বাসভাজন লোক। আমি একসময় তার প্রাণ বাঁচিয়েছিলুম। সে কখনো আমার পেছনে গুপ্তঘাতক লাগাতে পারে?
বিক্রম বলল— পারে। গুরুগৃহে থাকার সময় শুক্রনীতিসার আর অর্থশাস্ত্রে যেটুকু রাষ্ট্রনীতি পড়েছি তাতে তো মনে হয় সবচেয়ে বিশ্বস্ত লোকের পক্ষেই বিশ্বাসঘাতকতা করা কেবল সম্ভব নয়, স্বাভাবিক।
—শাস্ত্রে যাই লেখা থাক না কেন, মানুষের সততায় বিশ্বাস হারানো কোনো কাজের কথা নয়। আসলে, আমার মনে হয় কোনো শত্রু রাজ্য আমাদের পরিবারের মধ্যে ভেদ সৃষ্টি করবার চেষ্টা করছে। হাতের লেখাটা অপরিণত। বোধ হয় কোনো বাচ্চাকে দিয়ে চিঠিটা লেখানো হয়েছে। লক্ষ করে দেখো, বিরূপাক্ষ যখন তীর্থযাত্রায় গেছেন, ঠিক তখনই এই চিঠি এসে উপস্থিত। যাহোক, আমি কাল রোজকার মতো প্রাতর্ভ্রমণে যাব। চারজন গুপ্তঘাতক যদি থাকেও, তাদের ব্যবস্থা আমি করতে পারব।
—তা যান, তবে সশস্ত্র হয়ে যাবেন।
—কক্ষনো না। এরকম একটা উড়ো চিঠির অবাস্তব বক্তব্য পড়ে আমি ভয়ের চোটে তলোয়ার বগলে প্রাতর্ভ্রমণে যাব, এ তো হতে পারে না।
পরের দিন রাজসভায় হুলুস্থুল। সবাই প্রতাপ সিংহের কুশল জিজ্ঞাসা করার জন্য ব্যস্ত। রাজা বললেন— আপনারা চিন্তা করবেন না। আজ খুব ভোরে যখন আমি বাগানে হাঁটতে গিয়েছিলুম তখন জনাচারেক উন্মাদ ব্যক্তি আমাকে আক্রমণ করেছিল। সৌভাগ্যবশত, যুবরাজ হঠাৎ সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। তাঁর সামনে তারা দাঁড়াতে পারেনি, আহত অবস্থায় অস্ত্র ফেলে পালিয়ে যায়। কোটাল তাদের খুঁজতে গেছেন। তারা মুখ ঢেকে রেখেছিল তাই তাদের চেনা যায়নি। তবে অবিলম্বে ধরা পড়বে বলে মনে করি। আপনাদের অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে, আমরা দু-জনেই সম্পূর্ণ সুস্থ আছি।
সেদিনের মতো রাজকার্য চুলোয় গেল। মধ্যাহ্ন পর্যন্ত শুধু এই আলোচনাই চলল। বিকেল বেলা বিক্রম আবার একটা তালপাতায় লেখা চিঠি এনে রাজাকে দিল। বলল— পড়ে দেখুন।
রাজা জিজ্ঞাসা করলেন— কোথায় পেলে?
—আমার শোবার ঘরে, বিছানার ওপর। মনে হচ্ছে আবার কোনো পায়রাই এনে ফেলেছে।
রাজা বিরক্তভাবে চিঠিটা পড়তে শুরু করলেন। যখন শেষ করলেন তখন তাঁর মুখে স্তম্ভিত বিস্ময়। বললেন— একী আশ্চর্য ব্যাপার! শ্রাবণী পাহাড়ের জঙ্গলে নীলকণ্ঠ মহাদেব মন্দিরের ভগ্নাবশেষের কাছে গেলে ওই চারজন গুপ্তঘাতকের সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে। এর মানে কী? এখুনি কোটালকে সংবাদ দাও। সে সৈন্যসামন্ত নিয়ে ওখানে যাক আর তাদের ধরে নিয়ে আসুক। অবশ্য যদি তারা সত্যি-সত্যিই ওখানে থাকে। আমি তো এর মধ্যে কেমন একটা ষড়যন্ত্রের আভাস পাচ্ছি।
—মহারাজ, ষড়যন্ত্র আছে তো বটেই। তবে, আমার কেমন একটা অন্যরকম সন্দেহ হচ্ছে। কোটালকে পাঠাবেন না, তিনি কস্মিনকালেও শ্রাবণী পাহাড়ের গভীর জঙ্গলে মহাদেব মন্দিরের ভগ্নাবশেষ খুঁজে পাবেন না। তবে, আমি জানি সেটা কোথায়।
—আমিও মোটামুটি জানি ওই জায়গাটা কোথায়। ছেলেবেলায় শিকারে বেরিয়ে একবার ওখানে গিয়ে পড়েছিলুম। আজ অবশ্য খুঁজে পাব কি না সন্দেহ আছে।
—তবে চলুন, আমরা দু-জনে যাই। কাল সক্কালবেলা অশ্বারোহণে বেরোলে, দুপুর নাগাদ পৌঁছে যাব। মহামন্ত্রীমশাই না-হয় একদিন রাজসভার কাজ একাই সামলাবেন।
—সে ঠিক আছে। কিন্তু ওখানে আমাদের শত্রুরা অপেক্ষায় থাকতে পারে।
—তা পারে। তবে আমার সন্দেহ যদি ঠিক হয়, সেরকম কিছু হবে না। তবুও, আপনার যখন অন্যরকম মনে হচ্ছে তখন আমরা কোটাল আর তার সান্ত্রীদের নিয়ে যাব। তারা জঙ্গলের বাইরে অপেক্ষা করবে। আমরা দু-জন গভীর বনে ঢুকব। শম্পার ধারে ঘোড়া ছেড়ে দিয়ে চুপিসাড়ে মন্দিরের কাছে যাব। শত্রুরা যদি থাকে, আমাদের আচমকা আক্রমণ করতে পারবে না। উলটে, আমরাই তাদের চমকে দিতে পারব। যদি বিপদ গুরুতর হয়, তখন না-হয় কোটালকে খবর দেওয়া যাবে।
—উত্তম প্রস্তাব। তাই হবে। বেশ একটা উত্তেজনাপূর্ণ অভিযান হবে বটে। আর, যদি লোকগুলোকে ধরতে পারি, তাহলে ষড়যন্ত্রের নায়কটি যে কে, তা ওদের পেট থেকে টেনে বের করতে অসুবিধে হবে না।
নীলকণ্ঠ মহাদেবের মন্দিরটা আগে থেকে জানা না থাকলে খুঁজে বের করা সত্যিই কঠিন। ঘন জঙ্গলের ভেতরে একটা ছোট্ট খোলা জায়গা। সেখানে অতি প্রাচীন মন্দিরটার ধ্বংসাবশেষ নিঃসঙ্গভাবে যেন তার শেষ দিনটির প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে। মূল মন্দিরটাই শুধু দাঁড়িয়ে রয়েছে, তার নাটমন্দির আর চারপাশের বারান্দা ভেঙে পড়ে গেছে। মন্দিরের দরজা-টরজা কিচ্ছু নেই, ভেতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার।
প্রতাপ সিংহ আর বিক্রম নিঃশব্দে মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়ালেন। চারদিক দেখে প্রতাপ ফিসফিস করে বললেন— খুব সাবধান বিক্রম, একটু আগেই এখানে একপাল হাতি এসেছিল। আমার মনে হচ্ছে যে তারা এখনও কাছাকাছিই আছে।
কথাগুলো খুবই নীচু গলায় বললেন বটে কিন্তু ওই নির্জন জায়গায় তা যথেষ্ট নীচু হল না। তাঁর কথা শেষ হওয়ামাত্র অন্ধকার মন্দিরের ভেতর থেকে কাতর আর্তনাদ বেরিয়ে এল, বাইরে কে রয়েছেন? আমাদের বাঁচান। একপাল পাগলা হাতি আমাদের এখানে তাড়িয়ে নিয়ে এসেছে আর মারবার জন্য বাইরে ঘোরাঘুরি করছে। তাদের সঙ্গে আবার দুটো বাঘও রয়েছে। কেন যে জঙ্গলে গা ঢাকা দিতে এসেছিলুম!
বিক্রম চেঁচিয়ে বলল— তোমরা কারা? বাইরে এসো।
বলামাত্র চারটে লোক ঠেলাঠেলি করতে করতে দরজা দিয়ে বেরিয়ে রাজা আর বিক্রমকে দেখে 'ওরে বাবারে' বলে আবার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছিল। বিক্রম বলল— অ্যাই, ওদিকে কোথায় যাচ্ছ? বললুম না বাইরে আসতে? ভেতরে ঢুকে পার পাবে ভেবেছ? রাজাকে হত্যা করার চেষ্টা কত বড়ো অপরাধ তা জানো? তার শাস্তি এড়ানো এত সহজ নয়, বুঝেছ?
লোকগুলোর মধ্যে যেটা সবচেয়ে বোকামতন দেখতে, সে বলল— বাঃ, আমরা যে রাজাকে হত্যা করার চেষ্টা করেছি তা আপনি কী করে জানলেন? আমাদের তো মুখ ঢাকা ছিল।
—কী করে যে জানলুম তা আর তোমাদের বুঝে কাজ নেই। এখন চলো, তোমাদের শূলে চড়াবার সব ব্যবস্থাই প্রস্তুত।
বলতেই চারজন হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে প্রতাপ সিংহের পায়ে এসে পড়ল। সমস্বরে বলল— আমাদের ক্ষমা করুন, রাজামশাই। আমরা আপনার পাশের রাজ্যের সামান্য সৈনিক। ভীষণ গরিব, দু-বেলা খেতে পাইনে। আপনাকে হত্যা করতে পারলে আমাদের রাজা প্রধর্ষ আর বিরূপাক্ষ বলে একজন লোক আমাদের এত অর্থ দেবে বলেছেন যে, আমরা লোভ সামলাতে পারিনি। আর কখনো এমন কাজ করব না, রাজামশাই।
রাজার মুখ আষাঢ়ের মেঘের মতো হয়ে উঠল। বললেন— তোমরা এই বিরুপাক্ষকে দেখেছ? তাকে চিনিয়ে নিতে পারবে?
—পারব, রাজামশাই। আপনি যা বলবেন, তাই করব। দয়া করে আমাদের শূলে চড়াবেন না।
—সেটা যথাসময়ে বিবেচনা করা যাবে। কিন্তু বিক্রম, এই চারজনকে রাজধানীতে নিয়ে যাই কী করে বলো তো? আমাদের সঙ্গে তো মোটে দুটো ঘোড়া।
—বিক্রম বলল, এই বনের হাতিরা ওদের পৌঁছে দিয়ে আসবে।
বলতে বলতে সীতা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে মহারাজকে ভক্তিভরে প্রণাম করল। তারপরেই জিভ কেটে বলল, ওই যাঃ, ভুলে গিয়েছিলুম। মহারাজের জয় হোক।
প্রতাপ সিংহ স্তম্ভিত হয়ে ঘটনাটা দেখছিলেন। জয়োচ্চারণ শুনে অট্টহাসি হেসে বললেন— জয় তো হলই। কিন্তু, তুমি কে মা? এই ঘন বনের ভেতরে এমন নির্ভয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ? কার মেয়ে তুমি? না, না, আমি বুঝেছি। এমন রূপ তোমার। তুমি নিশ্চয়ই বনদেবী।
প্রবলবেগে মাথা নেড়ে সীতা বলল— না, না, আমার নাম বনদেবী নয়, আমি সীতা। এই বনেই আমার বাড়ি। আর আমার তো এখানে কোনো ভয় নেই। এখানে সবাই আমার বন্ধু। আর তুমি তো এখন আমার সঙ্গে আছ, রাজামশাই। তোমারও কোনো ভয় নেই।
হাতজোড় করে প্রতাপ সহাস্যে বললেন— তোমার এই অভয়বাণীতে বড়োই নিশ্চিন্ত হলুম, মা। কিন্তু আমাদের যে খুব ক্ষিদে পেয়েছে। কিছু খেতে দেবে না?
—হ্যাঁ, এক্ষুনি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
বলে মুখ তুলে সীতা বলল— যা তো মসুরি, লাখুটিকে খাবার আনতে বল। সাতজনের জন্য। ওই চারটে পাজিরও ক্ষিদে পেয়েছে। কাল থেকে খায়নি তো কিছু।
মসুরি অমনি সাঁ করে উড়ে চলে গেল। রাজা অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন— মসুরি, লাখুটি, এরা সব কারা?
—ওই দাঁড়কাকটা, ওর নাম মসুরি। আর লাখুটি হচ্ছে এই বনের সব হনুমানদের দলপতি।
—হনুমান? সত্যিকারের হনুমান?
—তা নয়তো কী? মিথ্যে হনুমান আবার হয় নাকি?
—না, তা হয় না। মানে, আমি ভাবছিলুম তুমি হয়তো এই বনের শবর বা কিরাতদের কথা বলছ।
—এ মা, রাজামশাই, তুমি কিচ্ছু জানো না। শবর বা কিরাতরা তো বনের ধারে থাকে। এমন ঘন বনের ভেতরে তারা আসে না তো। আচ্ছা, তোমরা দাঁড়িয়ে রয়েছ কেন? বসো না ওই পাথর দুটোর ওপরে। না, না, দাঁড়াও, আগে ও দুটো পরিষ্কার করে দিই। যা ধুলো পড়েছে! দমদম, পাথর দুটো পরিষ্কার করে দেবে?
মন্দিরের পেছন থেকে বিশালকায় দমদম বেরিয়ে এসে শুঁড় দিয়ে ফুঁ দিয়ে পাথর দুটোর ওপরের সব ধুলোবালি উড়িয়ে দিল। রাজামশাইকে আর দ্বিতীয় বার অনুরোধ করতে হল না। ব্যাপার-স্যাপার দেখে বিস্ময়ে কাঁপতে কাঁপতে ধপ করে বসে পড়লেন। বিড়বিড় করে বললেন— এ সব আমি কী দেখছি?
ওঁর পাশে বসে বিক্রম বলল— আমি যেটুকু জানি, আপনাকে বলছি। বলে রাজার কানে কানে ওর আগের দিনের অভিজ্ঞতার কথা বলল। রাজামশাই শোনেন আর বলেন, কী আশ্চর্য, কী অদ্ভুত!
এই কথার মধ্যে একপাল পাকানো পাকানো লম্বা ল্যাজওলা হনুমান হুপ হুপ করে গাছের ওপর থেকে লাফিয়ে নামল। তাদের কারুর হাতে বড়ো বড়ো পদ্মপাতায় কলা, আম, কাঁঠালের কোয়া ইত্যাদি, কেউ এনেছে ওইরকম পদ্মপাতায় জল।
রাজা আর এখন আশ্চর্য হচ্ছেন না। বেশ স্বচ্ছন্দে হনুমানদের হাত থেকে একটা পদ্মপাতা নিয়ে বেশ পরিতৃপ্তি সহকারে খেতে শুরু করলেন।
খেতে খেতে বিক্রম বলল— সীতা, আমাদের খাওয়া শেষ হলে দমদম যেন বন্দিদের জঙ্গলের বাইরে রেখে আসে। ওখানে কোটাল অপেক্ষা করছেন। তোমরা পায়রা দূতকে দিয়ে তাঁকে অগ্রিম খবরটা পাঠিয়ে দিও। যে চিঠিটা লিখবে তাতে একটা সংকেতবার্তা দেবে যাতে তিনি বুঝতে পারেন যে সেটা মহারাজের আদেশ। সেই সংকেতবার্তাটা আমি তোমাকে দিয়ে দেব।
রাজা বললেন— সীতা এ কাজ করতে পারবে?
—পারবে, মহারাজ। আপনার রাজকর্মচারীদের থেকে অনেক ভালো পারবে। দেখলেন না ও কীভাবে আপনার প্রাণ বাঁচাল আর গুপ্তঘাতকদের ধরিয়ে দিল?
দমদম আর তার দলবল বন্দিদের নিয়ে চলে যাবার পর সীতা বলল— তুমি কি ওদের সত্যি সত্যি শূলে চড়াবে, রাজামশাই? মেরে ফেলবে?
রাজা সহাস্যে বললেন— তুমি কী পাগল নাকি? জানো না, আমাদের রাজ্যে মৃত্যুদণ্ড নেই। কোনো শূলই নেই তো চড়াব কোথায়? বিক্রম ওদের মিছিমিছি ভয় দেখাচ্ছিল। তবে ওদের শাস্তি হবে। ওসব কথা ছাড়। এখন বলো তো তোমার বাড়িতে কে কে আছেন? তুমি তো দিব্যি লেখাপড়া জানো। কার কাছে পড়ো?

সীতা তার সবকথা বলল। তারপরে জিজ্ঞাসা করল— জানো তো রাজামশাই, পিসিমা আমাকে অঙ্কও শেখায়? পঁচিশকে পঁচিশ দিয়ে গুণ করলে কত হয়, বলো তো?
—কত হয়?
—জানো না? ছ-শো পঁচিশ। কী অদ্ভুত, তাই না?
—সত্যিই অদ্ভুত। আচ্ছা সীতা, তুমি আমাকে তোমার বাড়ি দেখাবে না?
—হ্যাঁ, দেখাব। এসো আমার সঙ্গে।
হাত ধরে নিয়ে যেতে যেতে রাজাকে তার নানা রকমের অভিজ্ঞতার কথা শোনাল সীতা। রাজা মুগ্ধ বিস্ময়ে সেইসব কাহিনি শুনলেন। একবারও বাধা দিলেন না।
শম্পা নদীর কাছে এসে সীতা বলল— ওই দ্যাখো, আমাদের পাতার কুঁড়েঘর। কী সুন্দর, তাই না? রাজামশাই, তোমার বাড়িটা এর চেয়েও বড়ো? আরও সুন্দর?
মহারাজের চোখে জল এল। বললেন— হ্যাঁ রে মা। আমার বাড়িটা তোর ওই বাড়ির চেয়ে বড়ো, কিন্তু ভীষণ বিচ্ছিরি। সেখানে কোনো সৌন্দর্য নেই। সেখানে সবসময় অন্ধকার, তার কোণায় কোণায় ভয় আর অবিশ্বাস জমাট হয়ে আছে। সেখানে কেউ হাসে না, সবাই ভুরু কুঁচকে গোমড়ামুখে ঘুরে বেড়ায় আর যত রাজ্যের নোংরা ঘাঁটে। তোদের বাড়ির একটা টুকরো যদি তুলে নিয়ে যেতে পারি, তাহলে আমার ঘরেও আলো জ্বলে উঠবে, সবাই হাসবে, মনের আনন্দে গান গাইবে।
—সেই ভালো। থেকো-না অমন বাড়িতে। আমার বাবা তো ঘর বানায়। বাবাকে বলব তোমাকে আমাদের মতো একটা ঘর তৈরি করে দেবে। তাহলে আর তোমার কোনো কষ্ট থাকবে না।
—ঠিক বলবি তো? আমিও বলব। আমি হলুম গিয়ে রাজামশাই, আমার কথা তোর বাবা ঠেলতে পারবেন না।
হঠাৎ বিস্ফারিত চোখে সীতা বলল— আরে! দাওয়ার ওপরে বাবার লাঠিটা। তাহলে বাবা-মা নিশ্চয়ই এসেছে। তুমি এখানে বসো, আমি ভেতর থেকে ওদের ডেকে নিয়ে আসছি।
দাওয়ায় বসে বিক্রম আর রাজা শুনতে পেলেন সীতা তার মার কাছে বকুনি খাচ্ছে, কোথায় থাকিস বল তো সারাদিন? ডেকে ডেকে পাই না।
সীতা বলল— শোনো-না মা, কী হয়েছে? বাবা তুমিও শোনো। তারপরে ঝড়ের বেগে সে কী সব বলে গেল। একটু পরেই ওর বাবা আর মা হুড়মুড় করে বেরিয়ে এলেন আর 'মহারাজের জয় হোক' বলে দু-জনে রাজাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন।
সীতার বাবা বললেন— মহারাজ, আমার এই পর্ণকুটিরে এসেছেন। আমি কী করে আপনার আপ্যায়ন করব?
রাজা বললেন— তোমার এই মেয়ে আমাদের যা আপ্যায়ন করেছে তা কোনো চক্রবর্তী সম্রাটের পক্ষেও সম্ভব হত না। শুধু কী আপ্যায়ন? সে দু-দু-বার আমার প্রাণরক্ষা করেছে। এক বার আততায়ীর হাত থেকে আর এক বার প্রবল ক্ষুধার থেকে।
জোড়হাত করে সীতার বাবা বললেন— নিজের মেয়ে বলছি না মহারাজ, সীতা কিন্তু সত্যিই অসাধারণ।
—তা আমি বুঝতে পেরেছি। ভেতরে চলো, তোমার কাছে আমার একটি ভিক্ষে চাইবার আছে।
সীতার বাবা-মা আর রাজা প্রতাপ সিংহ ঘরের ভেতরে চলে গেলে, সীতা বিক্রমের পাশে বসে জিজ্ঞাসা করল— মহারাজ আমার বাবার কাছে কী ভিক্ষা চাইছে, বলো তো? আমাদের তো দেবার মতো কিছুই নেই।
বিক্রম মৃদু হেসে বলল— উনি নিশ্চয়ই তোমার বাবার কাছে অত্যন্ত মহার্ঘ কিছু দেখেছেন। তাই চাইছেন।
—অত্যন্ত মহার্ঘ কিছু? বাবার কাছে? সেটা আবার কী?
উত্তরটা ভেবে বের করবার আগেই ঘরের ভেতর থেকে রাজার গলা শোনা গেল— হ্যাঁরে সীতা, একটা কথা বল তো। আমার বাড়িতে একটা ল্যাজকাটা হনুমান আছে। সেটা বেজায় দুষ্টু। কারুর কথা শোনে না, কেবল লাফিয়ে বেড়ায়। তুই তার ভার নিয়ে তাকে সামলাতে পারবি?
সীতা বলল— কেন পারব না? হনুমান যত দুষ্টুই হোক, আমার কাছে তার কোনোরকম জারিজুরি চলবে না।
বলামাত্র ঘরের ভেতরে রাজা অট্টহাসি হেসে উঠলেন আর তার পরেই একটা শঙ্খের গম্ভীর শব্দ ছড়িয়ে গেল সমস্ত বনভূমিতে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন