শৈলেন ঘোষ
সামনে সমুদ্র। এখন কত রাত কেউ বলতে পারে না। রাতের অন্ধকার জাপটে ধরেছে চারদিক। তুমি যে দু-দন্ড চোখ মেলে সমুদ্রে উছলে ওঠা ঢেউ দেখবে, তারও উপায় নেই। দেখে মনে হতে পারে, অন্ধকারটা যেন রাক্ষস। আর কিছু পায়নি আলোকেই গিলে খেয়ে ফেলেছে!
কিন্তু একটা কথা সবাই জানে, অন্ধকার আর যাই গিলুক শব্দকে গেলার সাধ্যি তার নেই। ওই যে সমুদ্রের বুকের ওপর ভয়ংকর ঢেউ গর্জন করছে, পেরেছে অন্ধকার ওই গর্জনকে কাবু করতে? না। এই কথাই বসে বসে ভাবছিল ‘সে’ একা।
সে! সে আবার কে?
একটি কিশোর। যখন পর্যন্ত রাত ঘন হয়নি, তখন পর্যন্ত কত মানুষের আনাগোনায় টইটই করছিল সমুদ্রতট। এখন কেউ নেই। একা সে-ই আছে। হয়তো সে তোমার মতো। নয়তো, হতেই পারে তোমার ভায়ের মতো ছোটো। কেন, তুমি দেখতে পাচ্ছ না তাকে?
না, এই অন্ধকারে দেখা যায় না। যেটুকু দেখা যায় সেটুকু তার ছায়া। সমুদ্রতট মানেই তো বালির রাজ্য। ঢেউ আছড়ে পড়ছে এই বালির ওপর। যেখানে ঢেউ পৌঁছোয় না, সেখানে শুকনো বালি। আশ্চর্য, ছেলেটা শুয়ে পড়ল সেই শুকনো বালির ওপর। এখন তার দৃষ্টি ছুঁয়ে আছে আকাশ। চাঁদ নেই, অসংখ্য তারা।
মনে হতেই পারে, এই গভীর রাতে একটা ছেলে একা এমন করে সমুদ্রতটে শুয়ে আছে কেন আকাশের দিকে চেয়ে! ছেলেটা কি বাড়িতে দুরন্তপনা করেছিল তাই বকা খেয়েছে। অভিমান করে পালিয়ে এসেছে সমুদ্রতটে। তাই ভাবছে বুঝি আকাশের দিকে তাকিয়ে কী করবে এবার! কে জানে!
ছেলেটা যে আজ প্রথম আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে তেমন না। সে অসংখ্যবার দেখেছে। আর মনে মনে ভেবেছে, কে গড়েছে এমন আকাশ! কে সাজিয়ে দিয়েছে আকাশ-ভরতি এমন আলোর তারা! কার কথায় ভোর নামে আকাশে। দিনে সূর্য ওঠে ঝলমলিয়ে। রাতে চাঁদ ওঠে জ্যোৎস্না ছড়িয়ে! ছেলেটা ভাবে আর অবাক হয়ে যায়।
কিন্তু আজ, হঠাৎ আজই তার মনে হল, যে গড়েছে আকাশ কে জানে কেমনতর দেখতে তাকে! কেমনতর তার মুখের হাসি, কেমনতর তার চোখের দৃষ্টি! সে কি রাজার মতো রূপবান! নাকি বাঘের মতো ভয়ংকর। হায় রে, কত কী দেখা যায় আমাদের চোখে, অথচ তাকে দেখা যায় না! তার বাড়ি কি তবে ওই আকাশেই! হবে হয়তো!
যে-ছেলেটা এতক্ষণ শুয়েছিল বালির ওপর, সে এবার আকাশ থেকে চোখ নামিয়ে উঠে বসল। ফিরে তাকাল সমুদ্রের দিকে। হয়তো কিছু ভাবল। উঠে দাঁড়াল। সমুদ্রের ঢেউ যেখানে বালির উপর আছড়ে পড়ছে, সেইদিকে পা বাড়াল। খানিক জল ছুঁয়ে সে তটের ওপর হাঁটতে লাগল। তবে কি সে এবার বাড়ি ফিরবে!
হাঁটতে হাঁটতে সে এবার অনেকটা বালুচর পেরিয়ে এসেছে। পথের যেমন শেষ নেই, সমুদ্রের গর্জনও তেমন যেন শেষ হয় না। ছেলেটা হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থামল। আচমকা তার মনে হল, হাওয়ায় যেন ভেসে আসছে কারও গানের সুর। অস্পষ্ট। সে চোখ ফেরাল এদিক-ওদিক সবদিকে। না, কাউকে তো দেখা যাচ্ছে না! বালুতটের কিনারে শুধু দেখা যাচ্ছে ছায়া-ছায়া ঝাউগাছ। সে তন্নতন্ন করে খুঁজল। কখনো সে দ্রুতপায়ে হাঁটে, কখনো ধীরে। আর যখনই তার মনে হয় সুরের কাছাকাছি সে পৌঁছে গেছে, তখনই দাঁড়িয়ে পড়ে। কিন্তু অবাক কথা সে কাউকে দেখতে পায় না।
এ কী হল, চকিতে থেমে গেল কেন গানের সুর। এখন সে তাকে খুঁজবে কোথায়! তবে একথা বলাই যায়, এতক্ষণ যে গান গাইছিল, বয়সে সে খুব একটা বড়ো নয়। হয়তো এই ছেলেটির মতোই হবে। তবু সে বুঝতে পারে না, এই শূন্য বালুচরে যেখানে একটিও মানুষ নেই, সেখানে গান শোনা যায় কার গলায়! কার এমন সাধ জেগেছে গান গাইবার। এ-গানে কি কান্নার সুর শুনি!
না, আর তাকে খুঁজে কাজ নেই। কী হবে দাঁড়িয়ে থেকে! এই জমাট অন্ধকারে এ যেন জমাটি রহস্য। সে হাঁটা দিল।
‘এই, শোন!’
কে যেন ডাকল। থতমত খেয়ে গেল ছেলেটা। দাঁড়িয়ে পড়ল। চটপট মুখ ফেরাল পেছনদিকে। কাউকে দেখতে পেল না।
এবার অদৃশ্যে যে ডাক দিল, সে হেসে উঠল খিলখিল করে। হাসতে হাসতে বলল, ‘আমাকে দেখতে পাচ্ছিস না তো! ওরে বোকা আমিও তোকে দেখতে পাচ্ছি না। অন্ধকারে দেখা যায়? তার ওপর আমি আবার ঝাউগাছের আড়ালে বসে আছি। গান গাইতে গাইতে হঠাৎ মনে হল, কার যেন ছায়া হেঁটে বেড়াচ্ছে! অন্ধকারে ভূতের মতো! তখনই গান থমকে গেছে আমার গলায়। তুই নড়িস না! যেখানে দাঁড়িয়ে আছিস সেখানেই দাঁড়িয়ে থাক! আমিই যাচ্ছি তোর কাছে।’
হ্যাঁ, সত্যি-সত্যিই সে এল। যা ভেবেছি ঠিক তা-ই। দু-জনে মাথায় এক। যতটা ছোটো হওয়ার কথা, ঠিক তেমনটাই। মনে হয়, মুখের আদলও যেন একই রকম।
সে হাসতে হাসতে জিগ্যেস করল, ‘কে রে, তুই, এই মাঝরাতে একা একা সমুদ্র কিনারে ঘুরে বেড়াচ্ছিস?’
ছেলেটা এতক্ষণ থ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মুখে টুঁ শব্দটি করেনি। এখন গম্ভীর গলায় উত্তর দিল, ‘আমিও তো ঠিক একই কথা তোকেও জিগ্যেস করতে পারি, তুই-বা কে, এই গভীর রাতে সমুদ্রঘেরা ঝাউবনে বসে লুকিয়ে লুকিয়ে গান গাইছিস?। কান্নার গান?’
সে হাসতে হাসতেই বলল, ‘আমার কথা ছেড়ে দে!’
ছেলেটা উত্তর দিল, ‘তবে তুইও আমার কথা ছেড়ে দে!’
‘সে কী রে, দু-জনেই দু-জনকে ছেড়ে দে, ছেড়ে দে বললে আমাদের যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবে! তোর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হবে কী করে?’ বলেই সেই গায়ক ছেলেটা হো হো করে হেসে উঠল।
ছেলেটা উত্তর দিল, ‘যাচ্চলে, তোকে আমি চিনি না, জানি না, হঠাৎ আমি তোর সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে যাব কেন?’
সেই গায়ক আবার হেসে উঠল। বলল, ‘ও, বুঝতে পেরেছি, তুই একটা আস্ত হাঁদা! তবে শোন, তোর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব নাহলে তুই কেমন করে জানবি, এই নিশুতিরাতে সবাই যখন ঘুমোয় তখন আমি কাকে গান শোনাই একা বসে এই সমুদ্র কিনারে? আর আমিই বা কেমন করে জানব, তুই কেন ঘুরে বেড়াস সমুদ্রতটে একা একা?’
ছেলেটা যেন সত্যিই কেমন বোকার মতো গায়ক-ছেলেটার মুখের দিকে চেয়ে থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকল। কোনো উত্তরই দিতে পারল না।
কিন্তু সে তেমনই হাসি-ঝরানো গলায় বলে উঠল, ‘কী রে, কী হল চুপ করে গেলি কেন?’
চমক ভাঙল ছেলেটার। মনে মনে ভাবল, তবে কি এতক্ষণ দুঃখে গান গাইছিল সে! তাহলে তো বন্ধুত্ব করতেই হয়। শুনতে তো হয়, কীসের দুঃখ তার। কাকে সে গান শোনায়! কেন শোনায়! তাই সে দোনোমনো না করে তক্ষুণি বলে উঠল, ‘দ্যাখ, আসলে কী জানিস, আমরা দু-জনে আগে কেউ কাউকে দেখিনি। চিনিও না, জানিও না। বন্ধুত্ব করতে গেলে প্রথমেই তো জানতে হবে কার কী নাম। কে কোথায় থাকি। কে কী করি, তবে না?’
সে বলল, ‘তা বটে, এটা তুই ঠিক বলেছিস। তাহলে তো আমার নামটাই তোকে আগে শোনাতে হয়। আমার নাম শুনে হাসিস না যেন! আমার নাম ফাঁক্কা!
ফাঁক্কা ‘হাসিস না যেন!’ বললেও ছেলেটা হাসি চাপতে পারল না।
ফিক করে হেসে ফেলল। হেসে ফেলেই অবশ্য তক্ষুণি তক্ষুণি জবাব দিল, ‘আমার নামটা কিন্তু অন্যরকম। আমার নাম অনন্তকুমার।’
সেই ফাঁক্কা নামের ছেলেটা বলল, ‘বাবা, কী সাংঘাতিক নাম রে তোর! অনন্তকুমার! অ-ন-ন্ত!’
অনন্ত ফাঁক্কাকে জিগ্যেস করল, ‘অনন্ত মানে জানিস!’
‘অ্যাই ভালো কথাই জিগ্যেস করেছিস—মানে!’ বলেই ফাঁক্কা হেসে গড়িয়ে পড়ল।
নাম শুনে তাকে হঠাৎ অমন করে হাসতে দেখে অনন্তকুমার ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে। পলকে নিজেকে সামলে নিয়ে জিগ্যেস করল, ‘হাসছিস কেন?’
‘হাসি পেল বলে হাসছি। কী জানিস, সত্যি বলতে কী যখন-তখন আমার হাসি পায়। আর হাসি পায় বলে সবাই বলে আমি পাগল। ওই যে তুই আমায় মাস্টারমশাইয়ের মতো জিগ্যেস করলি, ‘অনন্ত’ মানে জানি কি না, ওই শুনেই আমার হাসি পেয়ে গেল। আমার মনে হচ্ছে, তোরও মাথার গোলমাল আছে। তা না হলে তুই কেমন করে ভাবলি ‘অনন্ত’ মানে আমি জানব? সে বিদ্যে আমার নেই। লেখাপড়ায় আমি ফক্কা। সেইজন্যেই সবাই আমায় ফাঁক্কা বলে ডাকে। তুই নিশ্চয়ই জানিস তোর নামের মানে?’
ফাঁক্কার জবাব শুনে অনন্ত বলল, ‘হ্যাঁ, আমার নামের মানে আমি জানি।’
ফাঁক্কা জিগ্যেস করল, ‘কী মানে রে?’
‘যার শেষ নেই। ওই যেমন আকাশ, এই যেমন সমুদ্র।’
‘তুই ইশকুলে পড়িস বুঝি?।’
‘আগে পড়তুম।’
‘এখন পড়িস না?’
‘না’।
‘কেন?’
‘সে ওই আকাশ জানে।’
‘তুই তো ভারি অদ্ভুত কথা বলিস। তুই কেন ইশকুলে পড়িস না, আকাশ কেমন করে জানবে?’
‘অদ্ভুত বলছিস কেন? কথাটা কি মিথ্যে? আমাদের মাথার ওপর ওই আকাশ, পৃথিবীর আনাচে-কানাচে কোথায় কী হচ্ছে, সব দেখছে।’
তখন ফাঁক্কা অত্যন্ত উৎসুক হয়ে জিগ্যেস করল, ‘আমার মা আর বাবা যে সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাসে অতলে তলিয়ে গেছে সেটা তাহলে আকাশ দেখেছে বল?’
ফাঁক্কার কথা শুনে অনন্ত শিউরে উঠল। এই অন্ধকারেও দেখা গেল ভীষণ কষ্টে তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠেছে। অস্ফুট স্বরে সে বলে ফেলল, ‘তোরও তা হলে আমার মতোই দশা।’
‘কেন? তোরও বাবা নেই? মা নেই?’ অবাক হয়ে জিগ্যেস করল ফাঁক্কা।
‘না’।
‘কেন, তাঁদের কী হল?’
‘আমি জানি না।’ উত্তর দিল অনন্ত। ‘একদিন সকালে ঘুম ভেঙে যেতে দেখি, তাঁরা নেই। আমি একা বিছানায় পড়ে আছি। ধড়ফড় করে উঠে পড়েছি। তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। হাঁক পেড়ে ডাক দিয়েছি। এপাড়া-ওপাড়া ঢুঁড়তে ঢুঁড়তে ক্লান্ত হয়ে পথের ওপর বসে পড়েছি। কেউ কোনো খোঁজই দিতে পারল না। তাই এখন আমি আকাশে যাওয়ার পথ খুঁজব। আমি আকাশ থেকে তাঁদের সন্ধান করব।’
ফাঁক্কা একটু অবাক হয়েই জিগ্যেস করল, ‘আকাশে যাওয়ার পথ? আছে নাকি রে?’
‘জানি না। তবে খুঁজতে খুঁজতে পেয়েও যেতে পারি।’ উত্তর দিল অনন্ত।
ফাঁক্কা বলল, ‘ঠিক আছে, চ, আমিও তোর সঙ্গে আকাশের পথ খুঁজব। আমিও আকাশ থেকে সমুদ্রের অতলে যাওয়ার কোনো পথ পাই কি না দেখব। যদি পাই তা হলে সেই পথ ধরে সমুদ্রের অতলে ডুব দিয়ে আমার মা আর বাবাকে খুঁজে বার করব।’
অনন্ত বলল, ‘তবে আয়, আমার হাত ধর।’
ফাঁক্কা সঙ্গে সঙ্গে হাত বাড়িয়ে দিল অনন্তের দিকে। তারপর দু-জনে হাত ধরাধরি করে এগিয়ে চলল আকাশে যাওয়ার পথের খোঁজে।
আর যে ভোর হতে দেরি নেই সেটা বোঝাই যাচ্ছে। কেননা, ফিকে হয়ে আসছে অন্ধকার। সমুদ্রের বালুতট তারা অনেক আগেই পেরিয়ে এসেছে। এখন দেখা যাচ্ছে জনপদ। পথের এদিক-ওদিক হঠাৎ হঠাৎ একটি-দুটি মানুষকে চলতে ফিরতে দেখা যাচ্ছে।
ফাঁক্কা বলল, ‘দেখছিস আলো ফুটছে!’
অনন্ত উত্তর দিল, ‘এবার একটু বসলে হয়।’
ফাঁক্কার মুখে আবার ফুটে উঠল হাসি। বলল, ‘এতক্ষণে তোর মুখখানা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।’
অনন্ত উত্তর দিল, ‘আমিও দেখতে পাচ্ছি তোর মুখ। অমন সুন্দর মুখখানা শুকিয়ে এইটুকু হয়ে গেছে।’ ফাঁক্কা অনন্তের কথা শুনে ঠাট্টার সুরে বলল, ‘আর তোর মুখখানা বুঝি ভোরের ফুলের মতো ফুটফুট করছে!’ বলেই হা-হা করে হেসে উঠল।
অনন্তও হাসল। এবার অনন্তের হাসি শুনে মনে হল, ফাঁক্কার মতো প্রাণ খুলেই হেসেছ সে। হাসতে হাসতেই অনন্ত বলল, ‘কিন্তু বসবি কোথায়? এখানে বসবার মতো কোনো জুতসই জায়গা দেখছি না।’
‘ও বাবা তোর আবার জুতসই জায়গার দিকে নজর! এমনি জুটলে বর্তে যাই। জুতসই জায়গা খুঁজছিস কেন শুনি? ঘুম পাচ্ছে? গড়াবি?’ হাসতে হাসতেই জিগ্যেস করল ফাঁক্কা।
ফাঁক্কার কথা শেষ হবার আগে আচমকা দাঁড়িয়ে পড়ল অনন্ত। ফাঁক্কাও দাঁড়িয়ে পড়ল। জিগ্যেস করল, ‘কী রে, কী হল? দাঁড়ালি কেন?’
অনন্ত ঈশারায় ফাঁক্কাকে তার বাঁদিকের একটা বাড়ির খোলা বারান্দা দেখতে বলল। ফাঁক্কা সেদিকে তাকাতেই দেখল, এই ভোরের হাওয়ায় একটা ছেলে দিব্যি পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছে। ‘কে রে ছেলেটা?’
অনন্ত বলল, ‘চ, কাছে যাই, দেখি!’
ফাঁক্কা উত্তর দিল, ‘তাই চ! ওর পাশে অনেকটা জায়গা আছে। আমরাও শুয়ে পড়তে পারি। অক্লেশে ধরে যাবে।’
তারা এগিয়ে গেল। বারান্দায় বসে ছেলেটার আগাপাশতলা দেখতে লাগল। দেখতে দেখতে ফাঁক্কা বলে ফেলল, ‘দেখে আমার কেমন সন্দেহ হচ্ছে। ছেলেটা হয় ভিখিরি, না হয় চোর। এর পাশে আমাদের না থাকাই ভালো। ছেলেটা যদি চোর হয়, আর পুলিশে যদি ধরে, ওর পাশে থাকলে আমাদেরও রেহাই নেই। বরং আগে দেখি চ!’
কথাগুলো যত আস্তে বলা উচিত ছিল তার চেয়ে একটু বেশি জোরেই ফাঁক্কার গলা ফসকে বেরিয়ে পড়েছে। ছেলেটারও ঘুম গেছে ভেঙে। সে আড়মোড়া ভেঙে হাই তুলতে গিয়েই থতমত খেয়ে গেছে। ধড়ফড় করে উঠে বসেছে। উঠেই অবাক। ফ্যাল ফ্যাল করে একবার অনন্তের মুখে দিকে তাকায়, একবার ফাঁক্কার দিকে। তারপর প্রায় তোতলাতে তোতলাতে জিগ্যেস করল, ‘তোরা কে রে?’ ছেলেটার চেয়ে বেশি অবাক হয়ে ফাঁক্কা বলে উঠল, ‘তার আগে শুনি তুই কে? এখানে পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিস?’
‘আমাকে চোর ভাবছিস বুঝি?’ টাটকা ভাঙা ঘুমে গলার স্বর যেমন হয়, তেমন স্বরে জিগ্যেস করল ছেলেটা।
ফাঁক্কা ঠেস দিয়ে বলল, ‘তুই ভারি চালাক। আগেই গেয়ে রাখছিস যাতে তোকে চোর না ভাবি।’
‘দুর বোকা’, বলে ছেলেটা এমন হি-হি করে হেসে উঠল যে, অনন্ত আর ফাঁক্কা দু-জনেই হকচকিয়ে গেছে। পরক্ষণেই ছেলেটা হাসতে হাসতে বলল, ‘আয় বোস!’
ফাঁক্কা আর অনন্ত, বসব, কী, বসব না করতে করতে বসেই পড়ল। ছেলেটা বলল, ‘দ্যাখ, কথাটা আমিই প্রথম পেড়েছিলুম। জিগ্যেস করেছিলুম, তোরা কে? সে-কথার উত্তর না দিয়ে, তোরাই আমাকে ধাঁতিয়ে উঠলি। জানতে চাইলি, আমি কে? এটা তোদের অভয় দিয়ে বলতে পারি আমি চোর নই।’
অনন্ত মুখ খুলল, ‘তাহলে তুই এখানে পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিস কেন?’
‘অ্যাই, সেটাই হচ্ছে কথা!’ এটুকু বলেই ছেলেটা তার সকালের ঘুমভাঙা চোখের চাউনি, রাত্রিজাগা অনন্তের মুখের দিকে ফিরিয়ে জিগ্যেস করল, ‘তোরাই বা এই ভোরবেলায় দুটিতে রাস্তায় ঘুরঘুর করছিস কেন?’
‘কারণ আছে।’ উত্তর দিল অনন্ত।
সে বলল, ‘আমার বেলাতেও ঠিক তা-ই। কারণ আছে! অবশ্য আমার কারণটা বলব, তোদের কারণটা শুনলে।’
ফাঁক্কা এই ফাঁকে দুম করে বলে দিল, ‘আমরা সারারাত হেঁটে হেঁটে আকাশে যাওয়ার পথ খুঁজেছি। এখন একটু জিরোব বলে এখানে এসেছি। আমাদের দু-জনেরই আকাশে যাওয়ার খুব দরকার। একমাত্র আকাশ থেকেই দেখা যায় সারা পৃথিবীর আনাচ-কানাচ। আমি আকাশ থেকে খুঁজব, কোথায় আছে সমুদ্রের অতলে যাওয়ার সোজা রাস্তা। আর আমার এই বন্ধু খুঁজবে তার হারিয়ে যাওয়া মা-বাবাকে। খুঁজবে এই পৃথিবীর কোথায় আছেন তাঁরা!’
‘বলিস কী রে!’ বলতে বলতে ছেলেটা তড়বড় করে দাঁড়িয়ে পড়ল। দারুণ বলেছিস তো! তাহলে আমিও তোদের সঙ্গে যাব। আমিও তোদের সঙ্গে খুঁজব আমার থাকার মতো একটু ঠাঁই। আইলা যে আমার সব কেড়ে নিয়েছে! আমার ঠাঁই যেমন কেড়ে নিয়েছে, তেমনই কেড়ে নিয়েছে আমার মা-বাবার ভালোবাসা।’ বলতে বলতে ছেলেটার চোখ ছলছল করে উঠল যেন।
অনন্ত হতবাক হয়ে গেল শুনে। তার খুবই ক্ষীণ গলা দিয়ে বেরিয়ে এল, ‘তাহলে তোরও আমাদের মতো অবস্থা! তবে আয়, আমাদের হাত ধর! আমরা তিনজনেই আকাশে যাওয়ার পথের সন্ধান করব। সে-পথ আমরা খুঁজে পাবই।’ কিন্তু ওরা জানে না, সে-পথ খুঁজে পায় না কেউ। ওরা জানে না, যে নির্মল আকাশে ওরা যেতে চায়, খুঁজলে সে আকাশ তারা এই পৃথিবীর বুকেই পেয়ে যাবে!
না, অনন্ত আর ফাঁক্কার সেই খোলা বারান্দায় জিরানো হল না। না হোক, একজন সঙ্গী তো পাওয়া গেল। এ সঙ্গীটির নামও জানা গেল—শাওন। এখন তারা তিনসঙ্গী। সামনে এগিয়ে চলেছে। তবে একথা বলা যাবে না অনন্ত আর ফাঁক্কার হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল না। একটু জিরিয়ে নিতে পারলে ভালোই হয়।

‘তোমরা কোথায় যাচ্ছ বাবা?’ হঠাৎ যেন কে জিগ্যেস করল!
চমকে তারা দাঁড়াল। দেখতে পেল যেন মায়ের মতো একজন অজানা মানুষকে। স্নেহে ভরা হাসি-হাসি মুখ। উত্তর দিতে পারে না, তিনজনের একজনও। থমথমে চোখে চেয়েই থাকল তাঁর মুখের দিকে।
তিনজনের অমন শুকনো মুখ দেখে তাঁরও হাসি মুখটা কেমন যেন চুপসে গেল। তিনি ব্যস্ত হয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘কী হয়েছে বাবা তোদের? অমন শুকনো মুখে কোথায় যাচ্ছিস? কাল সারারাত ঘুমোসনি, নাওয়া খাওয়া হয়নি?’
শাওন আগ বাড়িয়ে আগেই বলে উঠল, ‘না, না, আমি ঘুমিয়েছি। পেয়ে গেলুম একটা খোলা বারান্দা, সেখানেই গড়িয়ে পড়লুম। খুব ঘুমিয়েছি। সকালে ঘুম ভাঙতে এই ফাঁক্কা আর অনন্তকে দেখতে পেলুম। এখন আমরা চলেছি আকাশে ওঠার পায়ে-চলার পথ খুঁজতে।’
তিনি চমকে উঠলেন শাওনের কথা শুনে। আকাশে ওঠার পায়ে চলা পথের কথা কে কবে শুনেছে! তিনি বুঝতে পারলেন, তিনটে ছেলেই কোনো বিপদে পড়ে কোথাও যা নেই, তারই খোজ করতে বেরিয়েছে। তিনি তাই আর কোনো কথা না বাড়িয়ে সরাসরি জিগ্যেস করলেন, ‘আকাশের পথ খুঁজছিস কেন বাবা তোরা?’
তখন অনন্ত প্রথম বলল, তার দুর্দশার কথা। তিনি শুনলেন।
তারপর ফাঁক্কা বলল তার দুর্গতির কথা। তিনি জানলেন।
সবশেষে তিনি শুনলেন শাওনের কথা। শুনে কী যেন ভাবলেন এক ঝলক। তারপর বললেন, ‘ঠিক আছে বাবা, তোদের আর এপথে ওপথে কষ্ট করে ঘোরাঘুরি করতে হবে না। আকাশের পথ আমার জানা আছে। আয় আমার সঙ্গে! আমি তোদের দেখিয়ে দেব!’
তিন সঙ্গীর এক সঙ্গী অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, ‘তুমি? দেখিয়ে দেবে?’
আর এক সঙ্গী জিগ্যেস করল, ‘সত্যি?’
তিনি উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ সত্যি।’
তখন মহা উৎসাহে তিনজনে তাঁর সঙ্গে চলল আকাশ পথের সন্ধানে।
খানিকটা হেঁটে এসে একটা ছোট্ট বাড়ির সামনে দাঁড়ালেন। তিনি দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন। ওদের ডাকলেন, ‘আয়!’
তিনজনে মুখ চাওয়া-চায়ি করতে লাগল অবাক হয়ে। অনন্ত অস্ফুট স্বরে জিগ্যেস করল, ‘এখানে কেন?’
তিনি বললেন, ‘এটা আমার বাড়ি। কেউ থাকে না। আমি একা।’
ফাঁক্কা একটু ভড়কে গিয়ে আমতা-আমতা করে জিগ্যেস করল, ‘ডাকছ কেন? তুমি তো আমাদের আকাশে যাওয়ার পথ দেখিয়ে দেবে বললে!’
‘হ্যাঁ বলেছি তো! আসলে এখান থেকে অনেকটা হাঁটতে হবে তো! বাড়িতে আমার কাজ আছে। তোদেরও একটু আয়েশের দরকার। তোরা চান কর। একটু পরিষ্কার হয়ে নে। আমি তোদের নতুন প্যান্ট-জামা দিচ্ছি। খাবার করে দিচ্ছি। পেটে দে। তারপর অন্য কাজ। আকাশে যাওয়ার পথ তো আর হারিয়ে যাচ্ছে না।’
অনন্ত জিগ্যেস করল, ‘তোমার ঘরে জামা-প্যান্ট এল কোত্থেকে? কেউ তো নেই!’
‘সে অনেক কথা। শুধু শুনে রাখ, যার জিনিস সেও আকাশে চলে গেছে। নে, আর কিছু শুনতে হবে না। পরিষ্কার হয়ে নে।’
তাঁর কথা শুনে বাধ্য ছেলের মতো তিনজনে চান করল। নতুন প্যান্ট-জামা পরল। তিনি খাবার করে দিলেন, খেল। বিছানা পেতে দিলেন, শুল। তারপর তিন বন্ধুতে বিছানায় শুয়ে ফিসফাস কথা বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়ল। ছিলই তো ক্লান্ত হয়ে, আর কতক্ষণ পারবে জেগে থাকতে!
অনেকক্ষণ ঘুমোল। যখন ঘুম ভাঙল, তখন সন্ধ্যে হয় হয়। ধড়ফড় করে উঠে পড়ল অনন্ত। চটপট ডেকে তুলল, ফাঁক্কা আর শাওনকে। তাদের সামনে তিনি দাঁড়িয়ে! মুচকি মুচকি হাসছেন। হাসতে হাসতে জিগ্যেস করলেন, ‘ঘুম ভাঙল?’
অনন্ত বলল, ‘ভীষণ ঘুমিয়ে পড়েছিলুম।’
ফাঁক্কা বলল, ‘যা:! কী হবে? সন্ধ্যে হয়ে আসছে যে! এখন কোথায় যাব? কেমন করে তুমি আমাদের আকাশের পথ দেখিয়ে দেবে? আমাদের ডেকে তুলে দিলে না কেন?
তিনি উত্তর দিলেন, ‘দেব কেমন করে? তোদের ঘুমে অচেতন তিনটে মুখ দেখতে দেখতে আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল।’ তারপর কথা ঘুরিয়ে বললেন, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, আজ হল না, কাল হবে।’ বলতে বলতে তাঁর মুখখানা কখনো মায়ায়, কখনো মমতায় উছলে উঠছিল। তিন বন্ধুর চোখে স্পষ্ট ভেসে উঠছিল তাঁর সেই মুখখানি। ভারি ইচ্ছে করছিল তাঁর বুকে লুটিয়ে পড়তে। তাঁকে ভালোবাসতে।
এমনই সময়ে শাওন কেমন যেন দোনোমনো করে জিগ্যেস করে বসল, ‘কাল হবে মানে তো, আজ তা হলে তোমার এখানে থাকতে হবে আমাদের।’
‘তাতো বটেই।’ তিনি উত্তর দিলেন।
অনন্ত বলল, ‘না, না, সকাল থেকে তুমি আমাদের জন্যে কত কষ্ট করলে। আর তোমাকে কষ্ট দেব না।’
তিনি বললেন, ‘আমি যদি তোদের মা হতুম, একথা বলতে পারতিস? ওরে কোন মা তাঁর ছেলেদের কষ্টে নিজে কষ্ট পান না? কোন মা ছেলেদের বুকে আগলে নিয়ে স্নেহ-মমতা উজাড় করে তাদের দুঃখ ঘোচানোর চেষ্টা করেন না?’
চমকে উঠল তিন বন্ধু। তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে মুখ দিয়ে কথা বেরোয় না তিন বন্ধুর। শুধু শোনা যায়, প্রাণময় তিন কিশোরের ঘন ঘন নি:শ্বাসের শব্দ।
হঠাৎ আকাশে মেঘ-ভাঙা বিদ্যুতের মতো চমকে উঠে ডেকে উঠল তিনজনে একসঙ্গে মা-আ-আ!’ প্রতিধ্বনি শোনা গেল, ‘মা-মা-মা!’ তারপরেই দেখা গেল যাঁকে তারা ‘মা’ বলে ডেকেছে, আদরে-শ্রদ্ধায় তাঁকেই জড়িয়ে ধরেছে।
হ্যাঁ তারা বুঝতে পেরেছে মা-ই তাদের আকাশ। মা-ই তাদের সমুদ্র। মা-ই তাদের আশ্রয়। না, তাদের আর আকাশে যাওয়ার পথ খোঁজার দরকার হল না। কেননা আকাশ তারা খুঁজে পেয়েছে এই মায়ের মধ্যে। এই মায়ের কাছেই তারা থেকে গেল চিরদিনের জন্যে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন