দেবযানী বসু কুমার

ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপ্লোমা হাতে পাবার পর কাকার পরামর্শে ইংরেজ আমলে কাঁচরাপাড়া ওয়ার্কশপে হাতে কলমে কাজ শিখে, বেশ কিছুদিন বেকার বসে থেকে পছন্দমতো একটা কাজ জোটাতে না পেরে, একদিন একটা চিরকুটে—ভাগ্য অন্বেষণে বেরিয়ে পড়লাম লিখে রেখে, বোসবাটির সেজো ছেলে উঠে বসলেন মালবাহী জাহাজে এক বন্ধুর সাহায্যে। গন্তব্য যুক্তরাজ্য। পৌঁছলেন হাল নদীর ধারে কিংস্টন আপন হালে। বিশেষ কিছু সুবিধা করতে না পেরে লাট্টুর মতো ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়লেন গোথল্যান্ড। খুব ছোট কিন্তু গোথল্যান্ড মিল রেল ইস্টিশন বহু পুরোনো। স্টিম ইঞ্জিন চলে। দিনে কয়েকটা মাত্র যাত্রীবাহী রেলগাড়ি চলাচল করে কিন্তু বিশেষ যাত্রী থাকে না। আর গোটা কয়েক মালবাহী রেল গাড়িও থামে। সেই সময় তৎপরতা বাড়ে কারণ মাল ওঠা নামা করে। বাকি সময়ে ইস্টিশন সারাদিন নিঝুম হয়ে পড়ে থাকে।
অজয় তখন চব্বিশ বছরের টগবগে যুবক হলে কী হবে যেদিন জল থেকে ডাঙায় নেমেছে সেদিন থেকে একপ্রকার অর্ধাহারে দিন কাটছে আর তার সঙ্গে যে কোনও একটা কাজ জোটাবার জন্য সারা দিনরাত ছুটোছুটি। যত দিন যাচ্ছে ভয় গ্রাস করছে। হালকা ঠান্ডা পড়ছে সূর্যাস্তের পর থেকে। কিছু জোটাতে না পারলে কীভাবে দেশে ফিরবে তাও বুঝতে পারছে না।
বেশ কয়েকটা দিন যৎসামান্য খাবার আর কলের জলে ক্ষুন্নিবৃত্তি আর রাতে স্টেশনের ধারেপাশে কোথাও ঘুমিয়ে কেটে যাচ্ছিল। হঠাৎ জুটে গেল একটা কুলির কাজ। বেশির ভাগ দুধ, দুগ্ধজাত সামগ্রী ওঠা নামা করত। এর মধ্যে দুদিন খুব বকাবকি করেছে রেলের কর্মচারীরা ওভার ব্রিজের সিঁড়িতে ঘুমানোর জন্য। কিন্তু এ ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না। তাই চেষ্টা করত ভোর ভোর উঠে পড়তে।
একদিন মনমরা হয়ে বসে আছে স্টেশনের বেঞ্চিতে। কিছুতেই মন বসছে না এই বিদেশ বিভুঁয়ে। খালি দেশের জন্য মন কাঁদে। স্টেশনের পুরো চত্বর ঝিম ধরে রয়েছে। লোকজন নেই। মাঝরাত থেকে সমানে বৃষ্টি পড়েই চলেছে। ঠান্ডায় জমে যাবার অবস্থা। দুটো গরম জামা এনেছিল দেশ থেকে। দুটোই কুলি-উর্দির তলায় পরে নিয়েছে। হুঁশ ফিরল ট্রেন আসবার সংকেত ঘন্টি শুনে। যাত্রী আর চিঠি চাপাটি নিয়ে ট্রেন আসছে।
এই রকম মেইল ট্রেন দিনে একটা আসে। হঠাৎ খেয়াল হল প্রথম শ্রেণি থেকে নামতে গিয়ে এক মেমসাহেব পা পিছলে পড়ে যাচ্ছে। দৌড়ে গিয়ে একরকম কোলে তুলে নেয় অজয়। এনে বসায় স্টেশনের বেঞ্চিতে। ততক্ষণে খেয়াল হয় মহিলা ইংরেজ। বয়স্কা। সম্ভ্রান্ত বংশীয় বলে দিচ্ছে ওনার সাজপোশাক। পরে আছেন পা ঢাকা এমব্রয়ডারি করা সিল্কের গাউন। তার ওপর একটা গরমের ওভার কোট। পায়ে হিল জুতো। গলায় মুক্তোর মালা। মাথায় ফুল লাগানো হ্যাট। গায়ের রং দুধসাদা। মুখে বলিরেখা। নীল চোখ। সোনালি ফ্রেমের চশমা। কোঁকড়ানো সাদা চুল। হাতে বেশ সুন্দর দেখতে একটা কাপড়ের ঢাউস ব্যাগ।
উনি নিজে থেকেই বলেন রেলের আপিস ঘরে পৌঁছে দিতে। স্টেশন মাস্টার স্যাম পালিটের স্ত্রী জেন ওনার বোনঝি। সামনেই জেনের জন্মদিন তাই উনি কিছু উপহার নিয়ে এসেছেন। আগে থেকে বলা আছে। স্যাম ওনার জন্য আপিসে নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছে। ব্যাগটা নিজে নিয়ে অজয় খুব সাবধানে ওনাকে পৌঁছে দেয় স্টেশন মাস্টারের আপিসে। কিন্তু কে জানত সামান্য এই কাজের জন্য ওর কপাল খুলে যাবে।
কিছুক্ষণ বাদে ডাক আসে আপিস থেকে। সাহেব ওর বৃত্তান্ত জানতে চাইলে খুলেই সব কথা বলে অজয়। ও বাঙালি শুনে তো আরও অবাক কারণ সাহেব বা ওনার পূর্বপুরুষ বাঙালি। পদবি পালিত। ওনার পুরো নাম সোমনাথ। সোমনাথ পালিতের অপভ্রংশ স্যাম পালিট।
ওনার বাবা অমরনাথ পালিত ছিলেন ইংরেজ আমলে সেনা বিভাগে। চাকরির সূত্রেই দেশ ছেড়ে এ দেশে আসা। একরকম শাস্তির কারণে বদলি। অবসরের পর আর ফিরে যাননি। মায়ের নাম শেফালী পালিত। ইংরেজদের দেশে একজন বাঙালি তায় মহিলা হাই স্কুলের ইংরিজি ভাষার শিক্ষিকা ছিলেন। সোমনাথ একমাত্র সন্তান তাই দেশে সেরকম কোনও পিছুটান নেই। তারপর ইংরেজ রমণীর সঙ্গে প্রেম। তারপর বিয়ে করে হয়ে গেছেন ব্রিটেনের নাগরিক। বুঝতে পারেন কিন্তু আর বাংলা বলতে পারেন না।
তারপর যত দিন গেছে আরও অনেক কথা জানতে পেরেছেন সাহেব সম্পর্কে। পালিত দম্পতির এক ছেলে এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়েছে আয়ারল্যান্ডে। সে সেখানেই সপরিবারে থাকে। আর ছেলে সস্ত্রীক থাকে স্কটল্যান্ড। বৃদ্ধা মেমসাহেবের পীড়াপীড়িতে আর রেল সংক্রান্ত কাজ জানে শুনে তৎক্ষণাৎ চাকরি হয়ে গেছে রেল দপ্তরে। রেল ইয়ার্ডে কাজ। মাস তিনেক পরে কাজ দেখে তো পালিত সাহেব মহা খুশি। তারপর থেকে অজয় খেয়াল করেছে প্রচ্ছন্ন স্নেহে সাহেব ওকে আগলে রাখে। নতুন কাজ শিখতে খুব উৎসাহ দেয়। ভুলচুক করলে নিজেই সামলে নেন।
তখন অনেকটা নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে অজয়। এক কামরার একটা ঘর ভাড়া করেছে গোথল্যান্ডের এক গ্রামে মাল্ল্যান স্পাউট জলপ্রপাতের কাছে। রোজ যাতায়াত করতে হয় বটে তবে ভাড়াটা সামান্য। সাহেবের প্রশ্রয়ে আর উৎসাহে তরতরিয়ে উন্নতি হয়েছে। এখন অজয় রেল লাইনের জন্য যোগ্য শংসাপত্র দিলে ইয়ার্ড থেকে ইঞ্জিন বেরিয়ে ট্রেনের সঙ্গে যুক্ত হয়। খুব দায়িত্বের কাজ। পাঁচটা বছর কীভাবে যেন স্বপ্নের মতো পেরিয়ে গেছে ইতিমধ্যে।
এদিকে সেই ইংরেজ বৃদ্ধা মেমসাহেব যখনি বোনঝি আর বোনঝি জামাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে গোথল্যান্ড আসেন, ডাক পড়ে অজয়ের। সাহেবের স্ত্রী জেনের কাছ থেকে অজয় জেনেছে ওনার মাসির নাম মনিমা। পাক্কা ইংরেজ সন্তান। বিবাহ করেননি। থাকেন ইয়র্কের একটা ছোট্ট গ্রাম লিটল উইটনে। পৈতৃক সূত্রে পেয়েছেন হোটেল রাউলি ম্যানর। হোটেলের একটা বিলাস বহুল ঘরে ওনার বসবাস শীত গ্রীষ্ম বসন্ত। হোটেলে সারা বছর ভিড় লেগেই থাকে। লেগেই থাকে ইংরেজদের বিয়ে, নয়তো জন্মদিন। বসন্ত উপভোগ করতে আসে অনেক নবদম্পতি। সামারে রোদ পোহাতে সপরিবারে আসে অনেকে ইংলিশ। এছাড়া বৃদ্ধ দম্পতিরা আসেন রাউলি ম্যানরের সান্ধ্যকালীন চা খেতে আর নিজেদের মতো সময় কাটাতে।
হোটেলটা গথিক শৈলীতে তৈরি। বাড়িটা প্রায় দু’আড়াইশো বছরের পুরোনো কিন্তু একেবারে অক্ষত। হোটেল লাগোয়া সবুজের সমারোহ। যে দিকে দু’চোখ যায় শুধু সবুজ ঘাসের আস্তরণ। হোটেলের বাইরেই আছে ঘোড়ার আস্তাবল। অনেকেই সময় পেলে ঘোড়ায় চড়ে গ্রামের পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। মিস মনিমাও অসাধারণ আশ্বারোহিণী। হোটেল চৌহদ্দির মধ্যেই আছে বহু পুরোনো সেন্ট পিটার্স রাউলি চার্চ।
মিস মনিমার কোনও এক পূর্বসূরি জেরেমিয়া নরথেন্ডকে চার্চের পাশেই সমাধিস্থলে প্রায় দুশো বছর আগে প্রোথিত করা হয়েছিল। তারপর থেকে ওনার পরিবারের সবাই মৃত্যুর পর ওখানে শায়িত। মনিমার পরিবারের যে কেউ রাউলি ম্যানরে এলে ফুল দিয়ে আসে পারিবারিক সমাধিতে। হোটেলটা এত বেশি জমজমাট এই চার্চের জন্যই। প্রার্থনা তো আছেই। প্রতি রবিবারের সকালটা তাই ভিড় জমায় ক্যাথলিকরা। এছাড়া প্রচুর বিয়ে অথবা ব্যাপটিসিম হয় চার্চে আর তারপর অতিথি আপ্যায়ন রাউলি ম্যানর হোটেলে। মিস মনিমা মাঝে মাঝে হিমশিম খেয়ে যান। সব গল্প জেন মেমসাহেবের কাছে শোনা। সময় পেলে মনিমা হাল স্টেশন থেকে ট্রেনে করে গোথল্যান্ড আসেন। বেশি না, সোয়াঘণ্টার পথ। অজয়ের মাঝে মাঝেই ডাক পড়ে সাহেবের বাড়িতে বাঙালি রান্না করে দেবার জন্য। তখনি এসব গল্পগুজব চলে।
এর পর সত্যি যেন কোনও গ্রহের ফেরে ভাগ্যের চাকাটা ঘুরে যায় একশো আশি ডিগ্রি। স্যাম সাহেব অবসর প্রাপ্ত হয়ে সস্ত্রীক চলে যান ওয়েকফিল্ড। ওনার বহুদিনের স্বপ্ন হোটেলের ব্যবসা খুলে বসেন। ওনার জায়গায় আসেন স্টেশন মাস্টার জন ব্রুস। যাবার আগে স্যাম সাহেব অনেক প্রশংসা করে গেলেও কোনও কারণ ছাড়াই ব্রুস সাহেব প্রথম থেকে ওকে ভালো চোখে দেখতেন না। ওনার ধারণা হয়েছিল, জাতভাই বলে অজয়ের এত কম বয়সে এত উন্নতি হয়েছে। তার ওপর ভারতীয় বলে একটা তাচ্ছিল্য তো ছিলই। যদিও অজয়ের গায়ের রং ছিল ফর্সা তা সত্ত্বেও অপমান করার জন্য কারণে অকারণে ব্ল্যাকি বলে ডাকতেন। তখন অজয়ের খুব মন খারাপ হত স্যাম সাহেবের জন্য।
ব্রুস সাহেব নিজেও রেলের কলকব্জা ভালো বুঝতেন। এমনকী রেলগাড়ি চালাতেও পারতেন। ছিলেন অত্যন্ত বদমেজাজি। মুখে গালাগালির ফোয়ারা ছুটত। দিনরাত মদ খেতেন। তার মধ্যেই সপরিবারে চলে এলেন ব্রুস সাহেব। ব্রুস সাহেবের সঙ্গে দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী আর দ্বিতীয় পক্ষের কন্যা লুসি মরিস। লুসি মরিসের তখন বয়স ষোলো বছরের আশেপাশে। ব্রুস সাহেবের স্ত্রী তখন অন্তঃসত্ত্বা। লুসি মরিস স্কুলে যায়। একটু বেপরোয়া গোছের। অনেক সময় অজয় খেয়াল করেছে, লুসি মরিস আর ব্রুস সাহেবকে কথা কাটাকাটি করতে। মেয়ে সৎ বাবার কথা শুনত না আর বাপ তড়পাত। এ ভাবেই দিন কাটছিল। সাহেবের কারণে অজয় কিছুতেই কাজে মন দিতে পারত না। মনটা সদাই পালাই পালাই করত।
ছুটি কাটাতে যেত পালিত সাবের কাছে নয়তো মিস মনিমার কাছে রাউলি ম্যানরে। এই সময় ঘটল একটা অঘটন। একদিন অজয়ের কাজ নেই, বরফ পড়া দেখছে স্টেশনের বাইরে দাঁড়িয়ে। চারদিকটা সাদায় সাদা। জানুয়ারি মাসের শেষ। হঠাৎ দৌড়ে এসে লুসি মরিস হাতে চিঠি গুঁজে দিয়ে মুহূর্তে হাওয়া। অজয় দুরু দুরু বক্ষে খুলে দেখে প্রেম পত্র। ছত্রে ছত্রে এক খাঁটি ইংরেজ ললনার তার প্রতি প্রেমের প্রকাশ।
অজয় বরাবরের ভীতু। কিন্তু লুসির অভিধানে ভয় বলে কিছু নেই। অনেক বোঝাবার চেষ্টা করেছে, মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, দূরে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সে মেয়ে নাছোড়বান্দা। যখন তখন এসে চড়াও হত। বন্ধুর বাড়ির নাম করে অজয়ের বাড়িতেও চলে আসত। বাধা দেবার আগেই চুমু খেত, আদরে আদরে ভরিয়ে দিত। ততদিনে অজয়ের সাহস বাড়তে শুরু করেছে। শুরু হল লুকিয়ে চুরিয়ে আড়ালে আবডালে উদ্দাম প্রেম।
এসব রসের খবরাখবর চাপা থাকে না। ওদের প্রেমের ঘনঘটা নিয়ে পুরো এলাকায় চর্চা হত। ধরা পড়লে লুসি বেদম মার খেত ব্রুস সাহেবের কাছে আর অজয়ের কপালে জুটত অপমান আর হেনস্থা। এই ভাবে বছর চারেক কেটে গেছে। হঠাৎ লুসি একদিন কাঁদতে কাঁদতে এসে হাজির। সে মা হতে চলেছে। অজয়ের মাথায় তো বজ্রাঘাত। কী হবে ভেবেই দুজনেরই বুক কাঁপছে।
কোনও দিশা না পেয়ে দিন দুয়েকের ছুটি নিয়ে অজয় গেল মিস মনিমার কাছে। সত্যি উনি ওকে সন্তানের মতো স্নেহ করতেন। মিস মনিমা পরামর্শ দিলেন লুসিকে নিয়ে পালিয়ে যেতে ওনার কাছে। সেন্ট পিটার চার্চে বিয়ে দিয়ে উনি যতদিন না সব স্বাভাবিক হয়, ওদের দুজনকে লুকিয়ে রাখবেন রাউলি ম্যানরে। যাতে কিছু জানাজানি না হয় তাই এক জন ফাদারকে বলে রাখলেন মিস মনিমা যাতে যত রাতেই ওরা আসুক, তখনি বিয়েটা দিতে হবে। আশ্বাস দিলেন স্যাম পালিটকে বলে একটা কাজ জুটিয়ে দেবেন স্যামের হোটেলে। সেই মতোই সব ঠিকঠাক করে অজয় ফিরে এল গোথল্যান্ড। কিন্তু সব কিছু ঠিকঠাক করেও একটা প্রচণ্ড ভয় চেপে বসেছিল অজয়ের শরীরে ও মনে।
ফিরে এসে দিন চারেক পরে পিওনের হাতে একটা চিরকুট পাঠাল লুসিকে। পিওনটা ছিল অজয়ের খুব পেয়ারের। যদিও লুসি ওকে দু’চক্ষে দেখতে পারত না। ওর হাত দিয়ে অনেকবার অজয় চিঠি চালাচালি করেছে। আর সেটাই হল কাল। লুসিকে চিঠিটা দিল ঠিকই কিন্তু পালিয়ে যাবার খবরটা ব্রুস সাহেবের কানে তুলে দিল। চিরকুটে লেখা ছিল—
আমার আদরের লুসি
আগামীকাল রাত সাড়ে এগারোটার সময় প্লাটফর্ম যেখানে শেষ হচ্ছে তার থেকে পাঁচ-দশ পা দূরে অন্ধকারে রেল লাইনের পাশে দাঁড়িয়ে থেকো। আমি ইঞ্জিন পরীক্ষার নাম করে ইঞ্জিন নিয়ে বেরোবো। তোমাকে তুলে নেব। তারপর ইঞ্জিন সাইডিংয়ে রেখে ঘোড়া থাকবে তৈরি আমাদের জন্য। সব ব্যবস্থা করা আছে। তুমি তো ঘোড়া চালাতে পারো। আমি আর তুমি পালিয়ে যাব মিস মনিমার কাছে। বাকিটা ওনার দায়িত্ব। কাল থেকে তোমাকে আমাকে কেউ আর আলাদা করতে পারবে না। তারপর আমাদের সন্তান হলে আমরা দুজনে মিলে তোমার বাবার মায়ের কাছে এসে ক্ষমা চেয়ে নেবো। নতুন অতিথিকে দেখলে নিশ্চয়ই ওনারা আমাদের মাপ করে দেবেন।
শুধু তোমারই অজয়।
ব্রুস সাহেব ছিলেন হাড়ে বজ্জাত। তার ওপর লুসি ওনার নিজের সন্তান ছিল না। কোনও মায়া মমতা ছিল না ওর ওপর। খবরটা পেয়েই কূট চাল চাললেন। যে ইঞ্জিনটা নিয়ে রাতে বেরোবার কথা অজয়ের, নিজে গিয়ে ঠান্ডা মাথায় সেটার কলকব্জা ভালোমতো গড়বড় করলেন।
ঠিক সময়ে রাতে অজয় ইঞ্জিন নিয়ে বেরোল। লুসি জায়গামতো দাঁড়িয়ে ছিল। কালো ধোঁওয়া ছেড়ে ইঞ্জিন সামনে আসতে লুসি হাত বাড়িয়ে দিল। ওদিকে অজয় হাত বাড়িয়ে দিল লুসিকে তুলে নেবার জন্য। কিন্তু হাতে হাত অধরাই রয়ে গেল। কিছুতেই অজয় ইঞ্জিন দাঁড় করাতে পারল না। অজয়ের পাগলপ্রায় অবস্থা ওদিকে ইঞ্জিন পাগলের মতো ছুটছে। কিছুতেই ব্রেক ধরছে না। এদিকে পিছনে উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটছে আসছে লুসি। ইঞ্জিন গিয়ে ধাক্কা মারল একটা পরিত্যক্ত রেলগাড়ি কে। কী যেন হয়ে গেল! বিকট আওয়াজের সঙ্গে ইঞ্জিনটাতে আগুন লেগে গেল। পড়ে গেল লুসি। তারপর আর কিছু জানে না। হাসপাতালে চোখ মেলতে শুনল বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে গেছে। পরে শুনেছিল অজয়ের আধপোড়া ছিন্নভিন্ন দেহটা মর্গে নাকি রেলের লোকেরাই চালান করে দিয়েছিল।
সময়টা ছিল ইউরোপের বসন্ত কাল। রাউলি ম্যানরের বাগানে তখন ফুলের আগুন লেগেছে। রাতটা ছিল পূর্ণিমা। আকাশে রুপোর থালার মতো পূর্ণচন্দ্র। মিস মনিমা মনের মতো করে হোটেলের একটা ঘর সাজিয়েছিলেন বিয়ের পর দুটিতে প্রথম রাত কাটাবে বলে। মালি বাগান থেকে ফুল তুলে সাটিন রিবন বেঁধে কাট গ্লাসের ভাসে রেখে ছিল। হাউস কিপার রাত বারোটা বাজতেই রুপোর বাতিদানে মোম জ্বালিয়ে দিয়েছিল। মিস মনিমার সব দিকে নজর। একটুও এদিক ওদিক হবার উপায় নেই। তাড়াহুড়ো করে লুসির জন্য আন্দাজে একটা সাদা গাউন আর অজয়ের জন্য রেডিমেড স্যুট কিনেছিলেন। তিনদিনের জন্য রাউলি ম্যানর বন্ধ রেখেছিলেন যাতে কথা পাঁচকান না হয়।
ওয়েডিং কেক, শ্যাম্পেন সব কিছুর ব্যবস্থা ছিল। কুক হরেক পদ রান্না করেছিল তিন জনের জন্য। ডাইনিং টেবিল সাজানো ছিল রুপোর বাসন আর কার্টলারি সেটে। টেবিলের ওপর সুন্দর করে পাতা ছিল মিস মনিমার মায়ের হাতে কুরুশে বোনা ফুল তোলা লেসের টেবিল কভার। খুব স্নেহ করতেন অজয়কে। তাই কোনও ত্রুটি রাখতে চাননি। নিজের একটা মুক্তোর আংটি রেখেছিলেন ভেলভেটের বাক্সে। অজয় লুসিকে পরাবে বলে। আর নিজের বাবার স্যাফায়ার কাফলিং সেটটা ভেবেছিলেন অজয়কে দেবেন। রাত বারোটা থেকে রাউলি ম্যানরের মালকিন অপেক্ষা করছিলেন অজয় আর লুসির জন্য হোটেলের গেটে ওদের অভ্যর্থনা জানাবেন বলে। তারায় বোনা কালো আকাশ আর চরাচর জুড়ে বানভাসি জ্যোৎস্না। রাত কেটে গেল। কেউ এল না। উষা ভোরে সূর্যের লাল আভা দেখে ক্লান্ত পায়ে ভারাক্রান্ত মনে মনিমা ফিরে গেলেন হোটেলে। কিছুদিন পর স্যামের কাছে ঘটনাটা শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন। মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। যীশুর কাছে অজয়ের জন্য প্রার্থনা করেছিলেন সেন্ট পিটার চার্চে।
হাসপাতাল থেকে বাড়ি আসার পর লুসির মনে হত রাত সাড়ে এগারোটার সময় ওর জন্য অপেক্ষা করছে অজয়। প্রতিদিন চলে যেত রেল স্টেশনে, ঝড় জল বৃষ্টি হলেও। দাঁড়িয়ে থাকত অজয়ের ইঞ্জিনের অপেক্ষায়। তবে শুধু লুসি নয়, অনেকেই দেখত একটা ইঞ্জিন এগিয়ে আসছে। একটা হাত ইঞ্জিন থেকে বেরিয়ে আসছে ওদিকে লুসি একটা হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। ব্যস, তারপরেই সব মিলিয়ে যেত। লুসি ফিরে আসত ক্লান্ত পায়ে। কিছুদিন পর থেকে কেউ ওই সময়টা আর ওইদিকে যেত না ভয়। খবরটা এমন চাউর হয়ে গেল যে রেল কোম্পানি পর্যন্ত ওই সময়টা কোনও রেল গাড়ি ওইখান দিয়ে যাতায়াত বন্ধ করে দিল একদম লিখিত ভাবে। অবশ্যই অন্য কারণ দেখিয়ে। কারণ অপেক্ষারত যাত্রীরা ও রেলকর্মীরা ভয় পেত। লুসি বলত প্রতিদিন অজয় আসে ওকে নিয়ে যাবার জন্য কিন্তু শেষ অবধি আর যাওয়া হয় না। তারপরেও লুসি আরও ঊনচল্লিশ বছর বেঁচে ছিল। প্রতিদিন হাত বাড়িয়ে অপেক্ষা করত অজয়ের জন্য কিন্তু হাত অধরাই রয়ে যেত।
সব ঘটনা জানাজানির পর লুসি যখন ব্রুস সাহেবের দিকে ঠান্ডা চোখে তাকাত তখন কেমন যেন কুঁকড়ে যেত স্টেশন মাস্টার ব্রুস। তারপর ওনাকে ভয় রোগে ধরল। সব সময় সব কিছুকেই ভয় পেতেন। কেঁপে কেঁপে উঠতেন। কোথায় গেল সেই দম্ভ? কোথায় গেল সেই হাঁকডাক? চাকরিটা চলে গেল। মা মারা গেলে সৎ ভাই আর সৎ বাবাকে শেষ দিন অবধি লুসি দেখা শোনা করেছে। তারপর ঊনষাট বছর বয়সে রাত সাড়ে এগারোটার কিছু পরে প্লাটফর্ম শেষে নির্দিষ্ট জায়গায় ইঞ্জিনের অপেক্ষায় থাকাকালীন হার্ট ফেল করে মারা গিয়েছিল লুসি। বড় একাকিত্বের জীবন। শুধুই অপেক্ষার জীবন।
দুর্ঘটনার পর অজয়ের কোনও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হয়নি। অজয়ের আত্মা ঘুরে ঘুরে বেড়ায় গোথল্যান্ডের আকাশে বাতাসে। লুসির হাত ধরবে বলে যুগ কেটে গেছে। কিন্তু অধরাই রয়ে গেছে সে হাত। তাই দুজনের আত্মাই মায়া কাটাতে পারেনি গোথল্যান্ডের। আজও ওখানকার স্থানীয় মানুষজন বলে, রোজ রাতে কালো ধোঁওয়া ছেড়ে ইঞ্জিন আসে। দুটো হাত কাছাকাছি এলেও মিলতে পারে না। অধরাই রয়ে যায়। তারপর সব কিছু মিলিয়ে গিয়ে স্বাভাবিক গোথল্যান্ড ইস্টিশন।
আমি দিন দুয়েকের জন্য আমার বোন মহুয়া, ওর স্বামী রাজা আর আমার মায়ের সঙ্গে গোথল্যান্ড গিয়েছিলাম বেড়াতে। আমার বোনপো যেতে পারেনি। কারণ, ও তখন ওয়ারিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চলে গেছে। ভারি মনোরম জায়গা। বিশেষ করে ইস্টিশনটা আমার খুব পছন্দ হয়েছিল। সময় পেলেই প্ল্যাটফর্মে ঘুরে বেড়াতাম। ওখানে আলাপ হয়েছিল এক রেলকর্মীর সঙ্গে। তিনি আমাদের পুরো ঘটনাটা বলেছিলেন। বলতে পারব না গল্পটাতে কতটা জল মেশানো আছে। আমি খুব জেদ ধরেছিলাম রাতে একবার ওই জায়গাটাতে যেতে কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষ অনুমতি দেয়নি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন