দেবযানী বসু কুমার

প্রতিবার ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে অর্থাৎ চব্বিশে ডিসেম্বর থেকে পয়লা জানুয়ারি বেটভিক কটেজের তত্ত্বাবধায়ক রঘুর পাগলা পাগলা লাগে। ভেবেই পায় না কোথা থেকে টুরিস্ট জোগাড় করবে। আজকাল লোকজনের হাতে অঢেল পয়সা। কেউ আর ছুটি কাটাতে কয়েকদিনের জন্য এসে এইসব মান্ধাতার আমলের সাহেবি বাংলোতে থাকতেই চায় না। যতই সুখ সুবিধে দেওয়া হোক না কেন, সবাই চায় বিলাসবহুল হোটেল।
সমুদ্দুরের শহরে এসেও সবাই চায় হোটেলের নিজস্ব সাঁতার পুকুর থাকবে জলকেলী করার জন্য, রঙিন বোতলে সাজানো বার থাকবে, মাল্টিকুইজিন ব্যবস্থা থাকবে। দুদিনের জন্য এসেও বাবুবিবিরা নাকি জিম না করে থাকতে পারেন না। শীতকালে ঠান্ডা ঝোড়ো হাওয়া সত্ত্বেও নাকি ঠান্ডা মেশিন ঘরে ঘরে না থাকলে ঘুম আসে না। ওদের বাংলোতে তো খালি নিচের দুটো ঘর আর ওপরের একটা ঘরে লাগোয়া কলঘরে স্নানের জন্য গরম জলের মেশিন বসানো আছে সেই মেমসাহেবের আমল থেকে। খারাপ হলে হয় সারিয়ে নেয়, আর না সারানো গেলে কয়েক বছর অন্তর নতুন কিনে লাগিয়ে নেয়। এই বয়সেও স্বামী স্ত্রী মিলে বাড়ি টিপটপ রাখার চেষ্টা করে।
পুজোর পর থেকেই শুরু করে দেয় ঝাড়াঝুড়ির কাজ। ঝাড়লণ্ঠন বাতিদান সব মেজে চকচকে করে। ঘরগুলো প্রতিবার না হলেও লাউঞ্জটা রং করে ফি বছর। পিয়ানোটা ঝেড়েমুছে টিপে টিপে দেখে বাজছে কিনা। না হলেই লোক ডাকতে হবে। গ্রামাফোনটা আর ক’দিন চলবে জানা নেই। গতবারই মিস্ত্রি বলে গেছে আর সারানো যাবে না। এসব নাকি এখন আর চলে না তাই পার্টস পাওয়া যায় না।
ডিসেম্বরের গোড়া থেকে শুরু করে রান্না ঘর আর খাবার ঘরের ধোয়া মোছা। বড়জোর তিনটে মাত্র পরিবার আসতে পারে তার জন্য বার করতে হয় চিনামাটির ডিনার সেট, ব্রেকফাস্ট সেট, লাঞ্চ সেট, ছুরি কাঁটা চামচ, মদের গেলাস, ওয়াইনের গেলাস, প্রতি ঘরে ফুল সাজাবার জন্য ফুলদানি। মাসের মাঝামাঝি যীশুর নানান ছবি নামিয়ে টেবিল ক্লথ পেতে পেতল আর কাটগ্লাসের মোমবাতি দান আর ফুল রাখবার ভাস সাবধানে নরম কাপড়ে মুছে ছবির সামনে পাশে রাখতে হয়।
খ্রিস্টমাসের সময় প্রতিদিন প্রভুর ছবির সামনে মোমবাতি জ্বালিয়ে বাগান থেকে ফুল তুলে এনে বসার জায়গাটা সাজাতে হয়। কম জ্বালা? কাচের আলমারি খুলে মেমসাহেবের পোর্সিলিনের পুতুল বার করে ঝুলনের মতো যীশুর জন্ম সাজাতে হয়। আগে আগে এই কাজে মুনমুন হাত লাগাতো কিন্তু একবার আস্তাবলের পুতুলের পাঁশুটে রঙের গাধাটা মুনমুনের হাত থেকে ঠোক্কর খেয়ে পড়ে ভেঙে গিয়েছিল। সারা সন্ধেটা সেদিন মেমসাহেব দাপিয়েছিলেন। তারপর থেকে আর ভরসা পায় না, সব একা হাতেই করে।
বছরে এই দশ দিন বাদ দিয়ে বলতে গেলে বাকি সময়টা বন্ধই পড়ে থাকে। কালে ভদ্রে কেউ আসে। কিন্তু যেহেতু ওরা কেয়ারটেকার তাই ওদের এ বাড়িতে থাকার অনুমতি নেই। ঝড়, ঝঞ্ঝা, তুফান, সাইক্লোন যাই হোক, ওদের থাকতে হবে আউটহাউসেই। একবার ছেলে বায়না ধরেছিল বাংলোতে থাকার। পুরো এক রাত থাকতে পারেনি। মেমসাহেব এমন রে-রে করে উঠেছিলেন যে জীবনের মতো ওই বাড়িতে থাকার সাধ মিটে গেছে। রঘু গজ গজ করে—মালিকরা সব সময় মতো কেটে পড়ল আর যত ঝামেলা দিয়ে গেল ওর ওপর। কেন রে বাবা, এসব বিক্রি করে ভাইপো ভাইঝিদের সব দিয়ে দিলেই তো ভালো হত। এদিকে টুরিস্ট জোগাড় করতে না পারলে মেমসাহেব তাণ্ডব শুরু করবেন। এক জ্বালা। কাউকে এসব বলাও যায় না। তাহলেই ভূতের বাড়ি বলে কেউ আর এ বাড়ির ত্রিসীমানায় আসবে না। আসল ঘটনা জানে একমাত্র স্ত্রী মুনমুন। এ বাড়িতে থাকে স্বামী স্ত্রী। ছেলে সায়ন বেরহামপুরের কলেজে পড়ে। ছুটিছাটাতে আসে।
রঘুনাথ মান্না জন্মসূত্রে বাঙালি হলে কী হবে, কত যুগ হয়ে গেল দক্ষিণ উড়িষ্যার গঞ্জাম জেলার এই ছোট্ট সৈকত শহর গোপালপুরে। কত বছর হয়ে গেল এই পরিবেশে। এখন এই লোনা হাওয়া মেছো গন্ধ আর বালিয়াড়ি ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেই পারে না। এই শহরের কত্ত রদবদল দেখেছে তার কোনও ইয়ত্তা নেই। প্রথম জীবনে নিজের শহর কলকাতার জন্য খুব মন টানত। কিন্তু এখন আর যেতে মন চায় না। ওদিকের পাট কবেই চুকেবুকে গেছে।
আত্মীয় স্বজন কে কোথায় আছে তার কোনও খোঁজ ওর কাছে নেই। বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন, যোগাযোগ রাখতেন। বছরে এক দুবার যাওয়া হত কলকাতায়। তারপর একটাই বোন মারা গেলে বোনাই যখন আবার বিয়ে করল তখন তাদের সঙ্গেও সব সম্পর্ক কাটান ছেঁড়ান হয়ে গেল। আর ওর বউ পাশের জেলার মেয়ে তাই রইল না জন্মভিটের সঙ্গে যোগাযোগ।
অনেক কথাই বাবার কাছে শোনা। জুঁই দিদিমনি থুড়ি, বেটি মেমসাহেব যখন ভিক্টর সাহেবের সঙ্গে সংসার করবে বলে এদেশে চলে এলেন তখন থেকে ওদের মান্না পরিবার এখানে। মেমসাহেবের বাবা অলোক দাদুই ওদের পাঠিয়েছিলেন মেয়ের সাহায্য হবে বলে। ও তখন কিশোর। প্রথম প্রথম কলকাতার জন্য, চেনা পরিচিতদের জন্য মন কেমন করত কিন্তু কালে দিনে সে সব স্মৃতি ফিকে হয়ে এল। তাই এ দেশটাই এখন ওর দেশ। যখের মতো বাড়ি আগলে বসে আছে। মেমসাহেবের কাছে ওর বাবা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তাই এবাড়ি ছেড়ে ওরা কোনওদিন যেতেও পারবে না।
ওরা এক অদৃশ্য শেকলে বাঁধা। এ শেকল ভাঙার ক্ষমতা ওদের নেই। তবে রঘু নিজের মতো বলে চলে—রঘু নেমকহারাম নয়। মেমসাহেব ওদের বৃদ্ধ বয়সের জন্য, ছেলেকে ভালো করে মানুষ করার জন্য, ওর বাবা মায়ের চিকিৎসার জন্য এত টাকা দিয়েছেন যে ওর পরের কয়েক প্রজন্ম চাইলে না কাজ করে বসে খেতে পারবে। এ বাড়ির ইট কাঠ পাথরের সঙ্গে এক মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে পড়েছে রঘু। খুব ধীর গতিতে সমুদ্রের পাড় ভাঙছে। যতদিন না সাগরের করাল গ্রাসে এ বাড়ির অবলুপ্তি ঘটে ততদিন ওদের পরিবার এ বাড়িতেই থিতু। ছেলেকেও রঘু ভালো করে এ কথা বুঝিয়ে দিয়েছে।
ব্যানার্জী দম্পতির দুই মেয়ে জুঁই ও মল্লিকার জন্ম কলকাতায় হলেও বাবা মায়ের সঙ্গে চলে যায় ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ার অঞ্চলে স্কারবোরো এলাকায় ইস্ক নদীর মোহনায় ছোট্ট বন্দর শহর হুইটবিতে। আলোকনাথ বাবু বিলেতে ডাক্তারি পাশ করে দেশে ফিরে এসেছিলেন। এখানেই বিয়ে করে বেশ কিছু বছর পর আবার ফেরত যান। বহুবছর ওই শহরেই ছিলেন। মেয়েরা ওখানেই বড় হয়েছে পড়াশোনা করেছে। প্রায় কলেজ জীবনের শেষের দিকে জুঁইদিদিমনি প্রেমে পড়েন ভিক্টর সাহেবের।
ভিক্টর বিলেতের নাগরিক কিন্তু জন্ম ভারতবর্ষে। ওনার বাবা এলবার্ট ছিলেন মিলিটারিতে কর্মরত। সেই সূত্রেই স্ত্রী ফ্লোরেন্সকে নিয়ে এদেশে এসেছিলেন। সেই সময় ভিক্টরের জন্ম। তার বেশ কিছুদিন পর ওনার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে সপরিবারে নিজ দেশে ফেরত যান। ভিক্টর ফিশিং নিয়ে পড়াশোনা শেষে ফিশিং ইন্ডাস্ট্রিতে চাকরি নিয়ে চলে যায় হুইটবি। সে সময় দুজনের আলাপ।
তখন অলোকবাবুর বয়স হয়ে যাচ্ছে। জন্মভূমির অমোঘ টানে দেশে ফেরার জন্য মন অস্থির। মনোগত ইচ্ছে, শেষ নিঃশ্বাসটা উনি মাতৃ ভূমিতেই ত্যাগ করবেন। এদিকে জুঁই তখন চুটিয়ে প্রেম করছে ভিক্টরের সঙ্গে। অলোকবাবু দুজনের চার হাত এক করে দিয়ে সস্ত্রীক ছোট মেয়ে মল্লিকাকে নিয়ে ফেরত আসেন।
দিদিমনির মুখেই রঘু শুনেছে, ভিক্টর সাহেবের আপত্তি সত্ত্বেও বাপের অনুমতি নিয়ে ধর্ম পাল্টায় দিদিমনি। নতুন নাম হয় বেটী। তাই এই ভিলার নাম ভিক্টর সাহেব আর বেটী মেমসাহেবের নাম মিলিয়ে হয়েছে বেটভিক হাউস। ভিক্টর সাহেব মেমসাহেবকে বেটী বলেই ডাকতেন। তাই এই এলাকায় দিদিমনির জুঁই নামটা প্রায় কেউ জানে না।
যেহেতু জন্ম এবং এখানে বেশ কিছুটা বছর বেড়ে ওঠা তাই একটা টান থেকেই গেছে এই দেশটার ওপর। আবার বিবাহ সূত্রেও এদেশের জামাই। তাই স্ত্রীকে খুশি করার জন্য গোপালপুর ফিশিং ইন্ডাস্ট্রিতে চাকরি নিয়ে ওদেশ থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে চলে আসেন অন্ধ্র উড়িষ্যার সীমানায় বন্দর শহর গোপালপুরে। সমুদ্রের পাড়ে সৈকত শহর গোপালপুর এখন পর্যটকদের বিচরণ ভূমি হলে কী হবে, অতীতে এমনটা ছিল না। প্রচুর বাঙালি তখন এখানকার ওয়েরহাউস আর কারখানায় কাজ করত। তখন এখানে ছিল এক জমজমাট বন্দর। নিত্য বাণিজ্য হত বার্মার সঙ্গে জলপথে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জলপথে লেনদেন বন্ধ হওয়াতে বন্দর তার ঐতিহ্য হারাল। সাতচল্লিশের পরে প্রায় সব বাঙালি বাংলায় ফিরে গিয়েছিল আর সাহেবরা বিলেতে। সাহেব চাকরি নিয়ে এলেও পরে নিজের ফিশিং ইন্ডাস্ট্রি খুলেছিলেন। এছাড়া জাহাজ কিনেছিলেন জলপথে আমদানি রফতানির ব্যবসা করবেন বলে। এসব অবশ্য রঘুর শোনা কথা বাবা আর মেমসাহেবের কাছে।
ওখান থেকে এসে একবছর সস্ত্রীক ছিলেন আলবার্ট হোটেলে। সে সময় সাহেবের খবরদারিতে, বালিয়াড়ির ধার ঘেঁষে, লাইট হাউসের পাশে তৈরি হয় বেটভিক হাউস। এত বছর পরেও সত্যিই চমৎকার আছে। কটেজ ধাঁচের বাড়ি। নিচে দুটো আর ওপরে একটা ঘর। একতলায় বিরাট একটা হলঘর আছে যেখানে বৎসরান্তে নাচাগানা খানাপিনা চলে একসপ্তাহ ধরে। দোতলার ঘর লাগোয়া ছাদ আর একতলায় অর্ধডিম্বাকৃতি লাল রোয়াক। সারা বাড়িতে চকচকে লাল মেঝে। বাড়ির বাইরের দেওয়াল লাল ইটের গাঁথনি। কটেজের সব আসবাব মেহগিনি কাঠের ভিক্টোরিয়ান নকশায় তৈরি। বিরাট জমির মধ্যে বেটভিক হাউস। পাঁচিল বরাবর কাজু, ঝাউ আর বেঁটে নারকেল গাছ। বাড়ির সামনে ততটা না হলেও পেছনে অনেক জমি যেখানে নানান ফুল ও সবজি বাগান। এছাড়া সাহেব আর মেমসাহেবের সমাধি আছে পেছনের বাগানে।
রঘুদের কোয়ার্টারও পেছেনের বাগানেই শেষ প্রান্তে। সামনের ছোট জমিতে শেকড়ের চাপে বেশ কয়েক জায়গায় চিড় খাওয়া গ্রানাইট দিয়ে বাঁধানো সত্যিকারের খ্রিস্টমাস ট্রি অর্থাৎ চিরসবুজ কনিফার পরিবারের পাইন গাছ। রঘু মেমসাহেবের কাছে শুনেছে, যেদিন ডাক্তার জানিয়ে দিয়েছিল যে মেমসাহেব কোনওদিন মা হতে পারবে না, সেদিন সাহেব দিদিমনির কষ্ট ভোলাবার জন্য এই গাছ নিয়ে আসেন। দুজনেই একসঙ্গে পুঁতেছিলেন এই গাছ। মেমসাহেব সত্যি একে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। বরাবর দেখে আসছে তাই খ্রিস্টমাসে রঘু গাছটাকে সাজায় লাল গোলাপ, টুকটুকে লাল আপেল, রাংতা, চকলেট, কাগজের শিকলি, হরেক রঙের বল, আর টুনি বালব দিয়ে। গাছের একদম মাথায় লাগিয়ে দেয় রুপোলি রঙের বড় একটা তারা। পাথরে সাদা রং লাগিয়ে বরফ করে তার ওপর স্লেজ গাড়িতে দাঁড়িয়ে থাকে লাল জামা লাল টুপি পরে সান্তা বুড়ো। চারপাশে ফেলে রাখা হয় রঙ্গিন কাগজের মোড়কে অনেক ছোটখাটো উপহার। স্থানীয় বস্তির বাচ্চারা ঠিক খেয়াল রাখে। কোনও না কোনও সময় এসে তারা তুলে নিয়ে যায়। এসব কেনা কাটাও রঘুকেই করতে হয় বেরহমপুর বাজার থেকে।
সারাবছর ফটকের দরজা দিনরাত বন্ধ থাকলেও এই দশদিন অবারিত দ্বার সবার জন্য। সারা বাড়ি আলো দিয়ে সাজানো হয়। তাই ভিলা ঝলমল করে। স্থানীয় মানুষ থেকে পর্যটক সবাই দেখতে আসে বেটভিক হাউসের যীশুপুজোর সাজ। সারাদিন গ্রামাফোনে খ্রিস্টমাস ক্যারল বাজানো হয়। এই ক’দিন যে আসবে তার এক খণ্ড ফ্রুট কেক প্রাপ্য। এই অলিখিত নিয়ম কবে থেকে চলে আসছে তা আর মনে নেই রঘুর।
মেমসাহেব ওকে নিজে হাতে কেক বানানো শিখিয়েছিলেন। প্রায় মে জুন মাস থেকে বড় কাচের বয়ামে ড্রাই ফ্রুট রামে চোবানো থাকে। তবেই না খুসবু বেরোবে। এক বছর কেক-বিভ্রাট ঘটেছিল। সেবার মুনমুন দায়িত্ব নিয়েছিল কেক বানাবার। কিন্তু ড্রাই ফ্রুট বার করার সময় বয়াম হাত পিছলে ভেঙে চুরমার। সে বছর মেমসাহেব এমন ক্ষেপে গিয়েছিলেন যে যতবার বেক করা হয়েছিল কোনওবার কেক বসেনি। শেষকালে কিনে আনতে হয়েছিল বাজারি কেক।
আমার কর্তাটি রাজনীতির মানুষ। অকাজ নিয়ে সদাব্যস্ত। তাই ওনার পক্ষে আসা সম্ভব হয় না। আমার একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। সে তার সংসার নিয়ে হিমশিম। তাই সময় সুযোগ পেলে আমি একাই বেরিয়ে পড়ি। আগে কোনওদিন গোপালপুরে আসা হয়নি। রোজ বিকেলে হাঁটতে বেরিয়ে চোখে পড়ে বেটভিক হাউস। বাড়িটা আমার মনে একটা জায়গা করে নিয়েছে। দূর থেকে বাড়িটা কিছুক্ষণ দেখে আবার ফিরতি পথ ধরি। জেলেদের কাছ থেকে শুনেছি মালিক নেই। বাড়িটা থাকে কেয়ার টেকারের জিম্মায়। আর দিন দুয়েকের মধ্যে ফেরত যাব। তাই আজ সকালেই এসেছি বেটভিক হাউস। বাইরেটা দেখেই এত মোহিত যে ভেতরটা দেখার লোভ সামলাতে পারিনি।
বুঝতেই পারলাম রঘুবাবু কোনও বাঙালি পান না গল্প করার জন্য। তাই আমার মতন নীরব শ্রোতা পেয়ে আর ছাড়তে চাইছেন না। এদিকে আমিও উসখুস করছি হোটেলে ফেরার জন্য। আর দেরি করে গেলে দুপুরের খাবার মিলবে না। শেষ হয়ে যাবে। তখন হরিমটর খেয়ে থাকতে হবে। এছাড়া সময়টা পচা ভাদ্র। সমুদ্রে বৃষ্টি উপভোগ করব বলে এসেছিলাম ক’দিনের জন্য। কিন্তু নির্মেঘ আকাশ। রোদের খুব তেজ। এতটা পথ আবার ফিরতে হবে।
ইতিমধ্যে আমার ইচ্ছে শুনে রঘুবাবু পুরো বাড়িটা ঘুরে দেখিয়েছেন শুধু না, বাগানের গাছের ডাবের মিষ্টি জলে প্রাণ ঠান্ডা হয়েছে। একরকম ওনাকে থামিয়ে দিয়ে জানাই যে যদি দরে পোষায় তবে আমি বাড়িটা কিনতে চাই। কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে? শুনেছি মালিকরা আর আসে না। বলা মাত্র কী হল বুঝলাম না, জানলার কাচের বড় সার্সিটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। আর কারেন্ট গেল চলে। আমি বেশ অপ্রস্তুত। সমুদ্রে কোনও হাওয়া নেই তা সত্ত্বেও কি করে সার্সিটা ভাঙল বুঝতেই পারছি না। হঠাৎই রঘুবাবু বেশ বিরক্ত হয়ে বললেন—এবার আপনি আসুন ম্যাডাম। মেমসাহেব আপনাকে পছন্দ করছেন না। আমি তো হাঁ। বেশ রুক্ষ ভাবেই বললেন, বাগানে চলুন বলছি।
জানালেন ওনার বেটি মেমসাহেব বাড়ি বিক্রির কথা শুনে রেগে গেছেন। উনি তখন ওখানে ছিলেন। তাই কাচ ভেঙে জানালেন ওনার অমতের কথা। আরও বললেন, এ বাড়ি বিক্রির কথা মুখেও আনবেন না। মেমসাহেব এমনিতে খুব ভালো কিন্তু রেগে গেলে মা কটক চণ্ডি। সাহেবের কথা অতটা বলতে পারব না কিন্তু মেমসাহেব কোত্থাও যান না। সারাদিন এ বাড়িতেই থাকেন। এঘর, ওঘর, বাগান, ছাদ, সর্বত্র ঘুরে বেড়ান।
আমি কিছুই মাথামুন্ডু বুঝতে পারছি না দেখে আমাকে নিয়ে বসলেন বাড়ির বাইরের লাল রোয়াকে।
বেটি মেমসাহেব বহুদিন আগে মারা গেছেন। তার বেশ কয়েক বছর আগে সাহেব মারা গেছেন। দুজনে মিলে খুব বড় করে খ্রিস্টমাস পালন করতেন। অনেক অতিথি অভ্যাগত আসতেন। মেমসাহেন নতুন নতুন গাউন পরতেন। চব্বিশ তারিখে রাত বারোটায় মোম জ্বালিয়ে প্রার্থনা শুরু হত। তারপর প্রায় দশদিন ধরে চলত রোজ সন্ধেবেলা প্রার্থনা, তারপর গ্রামাফোন চালিয়ে ইংরেজি গানের সঙ্গে জোড়ায় জোড়ায় নাচ, মদের ফোয়ারা ছুটত, কাচের গ্লাসের টুংটাং মিষ্টি আওয়াজ আর তারপর রাতের ডিনার শেষে পার্টি ভাঙত। যে যার গাড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরত। সাহেব মারা যাবার পর মেমসাহেব ছোট করে হলেও পার্টি দিত দশদিন ধরেই। নিজেই সব ব্যবস্থা করতেন।
মেমসাহেব ছিলেন খুব হুল্লোড়ে। সারাবছর এই কদিনের জন্য কত প্ল্যানিং করতেন। মারা যাবার আগে আমাকে বলেছিলেন, পার্টি যেন কোনওদিন বন্ধ না হয়। বলেছিলেন বাড়ি ভাড়া দিতে ট্যুরিস্টদের। অন্য সময় না হলেও বছরের শেষ ক’দিন যেন বাড়ি ভর্তি থাকে লোকজনে। তাতে খরচ উঠে আসবে আর বাড়িটাও ক’দিন গম গম করবে। মেমসাহেবের এক বোন ছিলেন মল্লিকা দিদিমনি। ফোন বা চিঠিতে যোগাযোগ থাকলেও আসা যাওয়া ছিল না। কিন্তু মেমসাহেব মারা যাবার পরেই ওনার বোনপো বোনঝিরা বেটভিক হাউস বিক্রি করার জন্য এসে হাজির। মেমসাহেব এমন ভয় দেখিয়েছিলেন যে মাঝরাতে বেরিয়ে গিয়ে হোটেল উঠতে হয়েছিল। তারপর ওনারা মেমসাহেবের আইনজীবীর কাছ থেকে জানতে পারেন উইলে লেখা আছে, বাড়িটা রঘুরা বংশপরম্পরায় ভোগ করবে কিন্তু কোনওদিন মালিক হতে পারবে না। তার সঙ্গে একটাই শর্ত, ক্রিসমাস বড় করে পালন করতে হবে। প্রভু যীশুর প্রার্থনা যেন বন্ধ না হয় এবং জেলে বস্তি আর নুলিয়া বস্তির বাচ্চারা যেন প্রতিবার উপহার পায়।
রঘু কাউকে দেখতে পায় না কিন্তু বুঝতে পারে গাউন আর হিলতলা জুতো পরে কেউ ইংরেজি গানের সঙ্গে নাচছে। টুরিস্টদের অনুরোধে হিন্দি গান চালালেই কারেন্ট চলে যায়। দেখে হিসেবের বাইরে একটা বেশি মোমবাতি জ্বলছে যীশুর ছবির সামনে। ওয়াইনের বোতল বার করাই হয়নি অথচ রাতে সব পরিষ্কার করার সময় খেয়াল পড়ে একটা খালি বোতল আর একটা ওয়াইনের গ্লাস বার কাউন্টারের এক কোণে পড়ে রয়েছে। বাসন মাজতে গিয়ে দেখে সিঙ্কে হিসেবের বাইরে একটা এঁটো ডিনার প্লেট।
রঘু বলে চলে, সাহেবের কথা বলতে পারব না কিন্তু মেমসাহেব যে খ্রিস্ট পুজোয় প্রতিবার থাকেন তা আমি ভালোমতো জানি। উনি শুধু থাকেন না, এ ক’দিন খুব আনন্দে মাতেন। এবং টুরিস্টরাও অনেকে ওনার উপস্থিতি টের পেয়ে আমাকে জিগ্যেস করেছেন। যদি কথাটা ছড়িয়ে যায় আর ভয় পেয়ে কেউ না আসে তাই আমি অস্বীকার করি।
সব শুনে বেরিয়ে যাবার সময় পেছন ফিরে আর একবার বাড়িটাকে দেখে মনে মনে বলি তুমি যখন কারও ক্ষতি করছ না তাহলে যেমন আছ তেমন থাকো। এভাবেই আনন্দে থাকো আর সবাইকে আনন্দ দাও। এও অনেকদিন আগের কথা। তারপর আর কখনো যাওয়া হয়নি গোপালপুরে। জানি না বেটভিক হাউসের কি খবর বা রঘুবাবু এখনও সে ভাবেই কর্তব্য করে যাচ্ছেন কিনা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন