পাপের শাস্তি

দেবযানী বসু কুমার

আমি ডাক্তার জয়া ঘোষ। সময় পেলেই স্বামীর সঙ্গে পাঁচ সাত দিনের জন্য কাছাকাছির মধ্যে এ দিক সে দিক ঘুরতে বেরিয়ে পড়ি। একমাত্র ছেলের বিয়ে হয়ে গেছে। সে তার স্ত্রী কন্যা সংসার চাকরি নিয়ে সদা ব্যস্ত। আমার স্বামী সাধারণ চিকিৎসক। ডাক্তার সৌমেন ঘোষ। আর আমি স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ। কাজের ফাঁকেই আমরা সময় বের করে নিই। একঘেয়ে শহুরে জীবনে কেমন জানি হাঁপিয়ে উঠি।

বছর কয়েক আগের ঘটনা। গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম দুজনে। গন্তব্য পুরুলিয়ার কেন্দুগাড়ি। ঘণ্টা চারেকের পথ। কলকাতা থেকেই সরকারি আবাসে থাকার ব্যবস্থা করে গিয়েছিলাম। সরকারি আবাসগুলোর এখন এত ভালো অবস্থা যে বেসরকারি গেস্ট হাউসগুলোতে আর থাকতে ইচ্ছে করে না। কলকাতা থেকেই আমার পিএইচই-র ম্যানেজারের সঙ্গে কথা হয়েছিল। তাই গিয়েই দেখলাম মধ্যাহ্ন ভোজন তৈরি। বাংলো দেখে তো চোখ জুড়িয়ে গেল। চারদিকে শুধু গাছগাছালি আর পাখির কলকাকলি। এছাড়া নিস্তরঙ্গ, নিস্তব্ধ, নিঝুম চারপাশ। বিশেষ কিছু দেখার নেই। কিন্তু সকাল বিকেল হাঁটতেই ভালো লাগত।

চারপাশটা শুধুই গ্রাম। জমিতে চাষ হচ্ছে। বেশ কয়েকটা বড় বড় পুকুর। পুকুরে মাছ চাষ হয়। পুকুরের জল বা ঘাটগুলো বেশ অপরিচ্ছন্ন। পুকুর ঘাটেই একটু-আধটু গজল্লা চলছে অর্থাৎ বাসন ধুতে বা স্নান করতে এসে মেয়ে বউরা গল্পগুজব হাসি মশকরা করছে।

রোজ খেয়াল করার পর একদিন খটকা লাগল। একটা বেশ বড় পুকুর তাতে পরিষ্কার টলটলে জল। চার পাশে চারটে লাল সিমেন্টে বাঁধানো ঘাট। আশ পাশটা ঝকঝকে তকতকে। কিন্তু গ্রামের লোকেরা পুকুরটা ব্যবহার করে না। এমনকী, পাশ দিয়েও বিশেষ লোক চলাচল করে না। ভাবলাম কারও হয়তো ব্যক্তিগত সম্পত্তি। যদিও কোনও পাঁচিল তোলা নেই। জায়গাটা ফাঁকা বলে আমি আর আমার কত্তা হেঁটে ফেরার পর উত্তর দিকের লাল বাঁধানো ঘাটে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যা নামলে বাংলোতে ফিরে চা খেতাম। কিন্তু ওখানে বসলেই মনটা কেমন খারাপ হয়ে যেত।

একদিন সৌমেনকে বলতে ও বলল, ওরও নাকি মনটা ভারী হয়ে যায়। বেড়ানোর আনন্দটাই মাটি হয়। সেদিন ফিরে কেয়ারটেকার বাপিকে জিগ্যেস করতে ও বলল—মেমসাহেব ও দিকে না যাওয়াই ভালো। পরদিন আর এক গ্রামের বউকে জিগ্যেস করতে সে মুখ বেঁকিয়ে বলল, বেশি বেশি কৌতূহল শহরের মানুষের। বলে ধোয়া বাসন নিয়ে ফর ফর করে চলে গেল। আমার কৌতূহল আরও বেড়ে গেল। সৌমেনকে বলতে পারছি না হাসাহাসি করবে সেই ভয়ে।

সেদিন বিকেলে হেঁটে ফিরছি। পরের পরদিন আমাদের কলকাতা ফেরা। জায়গাটা সত্যি ভালো লেগে গেছে। সেটাই দুজনে আলোচনা করছিলাম। পরে সময় পেলে আবার একবার আসব। সূর্য অস্ত যাচ্ছে। বাইরের আলো নিভু নিভু। দূর থেকে দেখলাম আমরা যে ঘাটটাতে বসে জিরোই, সেখানে কেউ বসে আছে।

কাছে যেতেই হাত জোড় করে এগিয়ে এল বছর তিরিশের এক যুবক। পায়জামা আর শার্ট পরা। মুখটা ভারি বিষণ্ণ। বলল শুনলাম—আপনি ডাক্তার। একবার আমার মাকে দেখবেন। সৌমেন জিগ্যেস করল, কী হয়েছে? উত্তরে জানাল—কয়েক বছর ধরে সারা শরীরে অসহ্য জ্বলুনি আর বড় বড় ফোস্কা। পুড়ে গেলে যেমন হয়। ফোস্কা শুকিয়ে যায় আবার নতুন করে হয়। আমার মা খুব সুন্দরী ছিলেন কিন্তু এখন পোড়া কাঠের মতো লাগে। সব চুল প্রায় উঠে গেছে। বাবার এখন বয়স হয়েছে আর মাকে কলকাতা নিয়ে যেতে পারেন না। আগে অনেক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কেউ কিছু ধরতে পারেনি। সবাই বলে মানসিক রোগ। মা সারাদিন জ্বলে গেল জ্বলে গেল বলে চিৎকার করেন। চোখে দেখা যায় না সে কষ্ট। সারাদিনে প্রায় পনেরো-কুড়িবার চান করেন জ্বালা কমাতে। এক এক সময় মনে হয় এর থেকে মা মারা গেলেই ভালো। আমি জিগ্যেস করলাম, প্রথম কবে শুরু হয়েছিল আর কীভাবে? তাতে ছেলেটি বলল, আপনাদের কি সময় হবে? তাহলে একটু আগে থেকে বলতাম। হ্যাঁ বলাতে শুরু করল—

আমি এই গ্রামের ছেলে। এখানেই পড়াশুনো উচ্চ মাধ্যমিক অবধি। কলেজে পড়তে কলকাতা গেলাম। মা অনেক বাধা দিয়েছিল। আমরা এক ভাই এক বোন। মায়ের ছিল আমার প্রতি পক্ষপাত রকমের অন্ধ ভালোবাসা। ছেলে সর্বস্ব জীবন। এমনকী বোনকেও বলত—আমার ছেলেই সব। কিন্তু বাবার সঙ্গে পেরে ওঠেনি।

আমি কলকাতা গেলাম। কিন্তু মানাতে পারছিলাম না। আমার গাঁইয়া হাবভাবের জন্য সবাই কলেজে হাসাহাসি করত।

সেই সময় স্মৃতিকণা সিনহা নামে একজন সহপাঠিনী আমাকে খুব আগলে রাখত। সব সময় ঢাল হয়ে দাঁড়াত। এর আগে আমার কোনও মেয়ে বন্ধু ছিল না তাই প্রথম দিকে আমি খুব আড়ষ্ট হয়ে পড়তাম। বড়লোক বাপের একমাত্র মেয়ে। আমাদের মেলামেশাটা ওদের বাড়িতে খুব ভালো ভাবে নিত না। কিন্তু বারণ করলে ওই মেয়ে শুনত না। আমারও ভালো লাগত না। সরে থাকার চেষ্টা করতাম। মনে হত বড়ই বৈষম্য। কিন্তু স্মৃতি তা হতে দিত না। ঘনিষ্ঠতা বাড়ল। সময়ের সঙ্গে আমিও শহুরে হতে থাকলাম।

তখন আমরা চুটিয়ে প্রেম করছি। স্নাতকোত্তরের পরে দুজনেই ভালো চাকরি পেলাম। স্মৃতি কলেজের অধ্যাপিকা আর আমি সরকারি দপ্তরে প্রথমেই একজন গেজেটেড অফিসার। পরীক্ষা দিয়েই পেয়েছিলাম। ঠিক করলাম এবার বিয়ে করব। বাড়িতে জানাতে মা প্রথমেই বলল এ বিয়ে হলে—আমি বউকে বাড়ির চৌকাঠ মাড়াতে দেব না। আমার পছন্দের বিয়ে না করলে আমি বিষ খাব। বাবা শুনে তো খুব খুশি। এত বিদুষী বউমা। নিজেও হাই ইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। জানালেন, তোমরা বিয়ে করে ওখানেই সংসার করো। গ্রামে তুমি এলেও
বউমাকে আনতে হবে না। আমার বিয়ের খবর শুনে মা ঘুমের ওষুধ খেয়েছিলেন। ঠিক সময়ে হাসপাতাল নিয়ে যাওয়াতে সে যাত্রায় বেঁচে গিয়েছিলেন।

বিয়েতে আমার বোন এসেছিল বাবার আশীর্বাদী সোনার গয়না নিয়ে। ভগ্নিপতি আসেনি কারণ আমার বোনের বিয়েটা ভালো হয়নি। বোনের দুই মেয়ে তখন। ওর বর আর ওর শাশুড়ি শাসিয়েছিল এরপর ছেলে না হলে বাপের বাড়ি ফেরত পাঠাবে। আমার মাও সায় দিয়ে বলেছিল, ছেলে না হলে সংসারের সার্থকতা কোথায়?

আমাদের বিয়ের প্রায় এগারো মাস পর যখন বোন আবার অন্তঃসত্ত্বা, ওরা পরীক্ষা করে জানলো আবারও মেয়ে। ভগ্নিপতি বলল নষ্ট করে ফেলতে হবে। না হলে থাকতে দেব না। স্মৃতির জোরাজুরিতে আমি বোনকে নিয়ে কলকাতা চলে এলাম, সঙ্গে দুই ভাগ্নি। যদিও মানসিক চাপে বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে গেল। কয়েকমাস যেতে স্মৃতি ওকে একটা প্রাথমিক স্কুলে ঢুকিয়েছিল ওর বাবার প্রভাব খাটিয়ে। আর নিজের টাকায় একটা এক কামরার ফ্ল্যাট কিনে দিয়েছিল চিনা মন্দিরের কাছে। ওখান থেকে বোনের স্কুলটাও কাছে ছিল। ভগ্নিপতি তারপর কয়েকবার এসেছিল ওকে নিতে কিন্তু আমার বোন ওকে ঢুকতেও দেয়নি। সেই শুনে আমার মা বলেছিলেন—আমি আর আমার মেয়ের মুখদর্শন করব না।

সব ঠিকঠাক চলছিল। এর বছর দেড়েক পরে তখন স্মৃতি পাঁচমাসের অন্তঃসত্ত্বা, হঠাৎ জেদ ধরে বসল শ্বশুরবাড়ি অর্থাৎ আমাদের গ্রামে যাবে। বাবাকে জানালাম। কিন্তু উনি নিষেধ করলেন। আমিও মানা করলাম। কিন্তু শুনল না। স্মৃতি একটু বেয়াড়া রকমের জেদি ছিল। বলল আমি গিয়ে ঠিক তোমার মায়ের মন জয় করে নেব। মাও ওকে বেশ ঠান্ডা মাথাতেই গ্রহণ করলেন। টুকটাক কথাও বলতেন। কিন্তু স্মৃতি মাকে জোর করে জড়িয়ে ধরত, হাতে পায়ে বিদেশি ক্রিম লাগিয়ে দিত, জোর করে দু’দিন ঘুরতে নিয়ে বেরিয়েছিল। হাতের
কাজ কেড়ে নিয়ে সংসারের কাজ করে দিত। মায়ের ভেতরটা ঠিক বোঝা যেত না। খালি বাবা প্রথম দিন আমাকে বলেছিলেন বউমাকে তোমার মায়ের সঙ্গে কখনো এক ঘরে রাখা যাবে না। হয় আমি বা তুমি বাড়িতে থাকব। যদিও সেটা বুঝতে পেরে স্মৃতি একটু বিরক্ত হয়েছিল।

স্মৃতির কলেজের সপ্তাহ তিনেকের ছুটিতে আমরা গিয়েছিলাম। সেদিন সন্ধ্যাবেলা বাবা গেছেন বটতলা মোড়ে চা খেতে। আমি ল্যাপটপে কাজ করছিলাম। এক বন্ধু এসেছিল দেখা করতে। তাকে এগিয়ে দিতে গিয়েছিলাম। বেরোবার সময় দেখলাম মা ঠাকুর ঘরে সন্ধে দিচ্ছেন আর স্মৃতি রান্না ঘরে রাতের রান্না করছে। একটুই এগিয়েছিলাম এই রাস্তা ধরে। হঠাৎ শুনি হই হট্টগোল চিৎকার চেঁচামেচি। ছুটে বাড়ি গেলাম। কিন্তু ততক্ষণে যা হবার হয়ে গেছে। প্রতিবেশী কাকিমা বললেন, তোমার বউ বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করতে করতে সোজা গিয়ে পুকুরে ঝাঁপ দিয়েছে। তখন নাকি স্মৃতির সারা শরীরে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল। আমি দিশেহারা।

স্মৃতি সাঁতার জানত না। বাবা তখনি জেলেদের ডেকে জাল ফেললেন। কিন্তু না, স্মৃতিকে পাওয়া গেল না। এমনকী পরদিন বা তার পরদিনও দেহ ভেসে উঠল না। আমি ঠায় এই লাল সিঁড়িটাতে বসেছিলাম। পরদিন ভেজানো দরজার এপার থেকে বাবা শুনলাম চাপা গলায় মা’কে জিজ্ঞাসা করছে—সত্যি করে আমাকে বলো কী হয়েছিল। না হলে কিন্তু তোমার হাজতবাস হবে। মা স্বীকার করলেন পিছন থেকে আঁচলে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলেন। পুলিশ এসেছিল। কিন্তু ভেবেছিল দুর্ঘটনা।

অপঘাতে মৃত্যু তাই চারদিনে কাজ হবার কথা। কিন্তু পুরুতমশাই বললেন দেহ পাওয়া যায়নি তাই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হবে না। চতুর্থীর রাতে এই ঘাটে বসে আমি জলের ওপর একটা আগুনের গোলা দেখেছিলাম। তারপর থেকেই এই পুকুরের জল খুব গরম থাকে সব সময়। চান করতে নামলে গায়ে পোড়ার মতো জ্বলুনি হয়। তাই কেউ আর এই পুকুরের জল ব্যবহার করে না। ভয় পায়। এমনকী মাছ চাষ করলেও সব মাছ মরে যায়।

ছেলেটার কথা শুনতে শুনতে বেশ দেরি হয়ে গেল সেদিন। তাই বললাম কাল সকালে তোমার মাকে একবার দেখব। আজ অনেক রাত হয়ে গেছে। তুমি সকালে ন’টার সময়ে এখানে থেকো, আমরা যাব।

পরদিন দুজনেই গেলাম। এক ঘণ্টা দাঁড়াবার পরেও ছেলেটি এল না। আগেরদিন দূর থেকে আমাদের দেখিয়েছিল ওর বাড়িটা, পুকুরের ঠিক ওপারে। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম। দরজার কাছ থেকে শুনলাম জ্বলে গেল জ্বলে গেল বলে চিৎকার। এক বৃদ্ধ দরজা খুলে দিলেন। সামনেই দেখলাম বড় একটা ছবি। আমি আর সৌমেন দুজনেই মনে মনে চমকে উঠলাম। কে জিগ্যেস করতে বললেন আমার একমাত্র ছেলে স্বপন। ছেলে এখন কোথায় জানতে চাওয়াতে একটু যেন বিরক্ত হয়ে বললেন, আমার পুত্রবধূ আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছিল কয়েক বছর আগে। বউমার মৃত্যুর চারদিন পর আমার ছেলে শোক সহ্য করতে না পেরে কোথায় যেন চলে গেছে। তারপর তার আর কোনও সন্ধান পাইনি। সৌমেন আমাকে ইশারা করতে আমি চুপ থাকলাম। এবার বৃদ্ধ বললেন, আপনারা? আগের সন্ধের কথা এড়িয়ে গিয়ে বললাম, এলাকায় শুনলাম আপনার স্ত্রীর অসুখের কথা। আমরা দুজনে ডাক্তার, তাই একবার দেখতে এলাম। উনি ম্লান হাসলেন। রুগি প্রায় আধ পাগল। সারা শরীরে নতুন পুরোনো ফোস্কা। রুগি পরীক্ষা করে বললাম, এ জ্বালা অনেক গভীরে বাসা বেঁধেছে। এ সহজে সারবে না। সত্যি বলতে আমরা দুজনে সেদিন কিছুই বুঝতে পারিনি। বাইরে বেরিয়ে নিজের মনেই বললাম, পাপের উচিত শাস্তি হয়েছে। পরদিন ফিরে এলাম।

আমরা দুজনেই বিজ্ঞান মনস্ক। এসব অশরীরী, আত্মা, অলৌকিকে বিশ্বাস করি না। কিন্তু সেদিনের ঘটনার কোনও যুক্তি, পাল্টা যুক্তি খাড়া করতে পারিনি আজও। সে ছেলে যদি বেঁচেও থাকে তাহলে সেদিন কোথা থেকে এল? আমার তো মনে হয় ছেলের আত্মা মায়ের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে একবার শেষ চেষ্টা করতে এসেছিল। আর সে রাতের সেই আগুনের গোলাই স্বামীকে টেনে নিয়েছিল নিজের কাছে। যদিও আমার এই উদ্ভট চিন্তা সৌমেনকে আর বলিনি।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%