ফিরে ফিরে যাওয়া আল্পসের কোলে

দেবযানী বসু কুমার

আজ প্রায় আঠারো বছর ধরে স্বাতী বছরের এই সময়টা জার্মানি আসে। কিন্তু এটা বোধহয় ঠিক বেড়াতে আসা নয়। ও যখনি নিজেকে প্রশ্ন করে আসার কারণটা, মুখ স্বীকার করুক বা না করুক, মন উত্তর দেয় হান্সের সঙ্গে দেখা করতে। আজও ভুলতে পারেনি হান্সকে। স্মৃতি এখনও টাটকা জুঁই ফুলের মতো। সেই গন্ধে এখনও আমোদিত হয় শরীর মন।

এখনও অনুভব করে প্রেমিকের সান্নিধ্য। স্বাতী এখন ভুলতে চায় পুরোনো কথা। কলকাতায় নয় মাস পাগলের মতো নিজেকে ব্যস্ত রাখে চেম্বার, হাসপাতাল, পেশেন্ট, লাইব্রেরি নিয়ে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কাজ করে স্মৃতিগুলো ঠেকিয়ে রাখতে। এ এক নিদারুণ প্রয়াস। কিন্তু বাকি তিনমাস হান্সের অমোঘ টানে ফিরে ফিরে যেতেই হয়।

স্বাতী বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে। উচ্চমাধ্যমিকে ভালো ফল করে সাইকোলজি নিয়ে ভর্তি হয় নামকরা কলেজে। আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। টপাটপ একটার পর একটা সিঁড়ি ভেঙে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমিয়েছে কিছু দামি দামি ডিগ্রির লোভে। সুযোগও পেয়ে গেছে এঘামের বিখ্যাত রয়াল হলওয়ে কলেজে। মনে একটা সুপ্ত বাসনা, দেশে ফিরে সাইকো অ্যানালিস্ট হয়ে প্র্যাকটিস করবে।

কলেজ হস্টেলে বছর খানেক কেটেছে। এঘাম জায়গাটা খুব সুন্দর কিন্তু একটু প্রাণহীন। সারাদিন কলেজের পর সময় কাটতেই চায় না। বন্ধুর পরিধি বেড়েছে। একঘেয়েমি কাটাতে বন্ধুরা মিলে উইকেন্ডে হাজির ইংল্যান্ডের সাউথ কোস্টে প্রাকৃতিক বন্দর শহর পুলে। ছোট্ট জায়গা কিন্তু খুব ব্যস্ত। দিনটা রোদ ঝলমলে তাই অতিরিক্ত পর্যটকের আনাগোনা। সামনে নীল সমুদ্র আর কিনারায় নোঙর ফেলেছে জাহাজরা। চমৎকার আবহাওয়া তাই দোকানিরা সকাল থেকে পসরা সাজিয়েছে ভালো ব্যবসার আশায়।

কোথাও কিছু নেই হঠাৎ শুকনো ডাঙায় আছাড় খেল স্বাতী। ফুটপাথ থেকে রাস্তায় নামতে গিয়ে পা মচকে বিশ্রী পরিস্থিতি। দেখতে দেখতে পা ফুলে ঢোল। পায়ের যন্ত্রণায় হাপুস নয়নে কেঁদে চলেছে স্বাতী। সেই সময় দেবদূতের মতো হাজির হান্স হ্যাচেল।

এ মনে হয় মদনদেবের কারসাজি। নিজে অলক্ষ্যে থেকে পঞ্চশর ছুড়েছিলেন। একটু ভয় ভয় করছিল একজন অচেনা মানুষের গাড়িতে উঠতে। কিন্তু উপায় নেই। সবাই তখন আতান্তরে। আসার সময় সবাই ওয়াটারলু থেকে ট্রেন ধরে এসেছে। কিন্তু এখন স্বাতীকে নিয়ে ট্রেনে ফেরা অসম্ভব। হান্স পাঁজাকোলা করে স্বাতীকে গাড়িতে তুলল। সবাই মিলেই লন্ডন গেল। তিন সপ্তাহ ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে চিকিৎসার পর আবার স্বাভাবিক হাঁটাচলা।

এদিকে যা হবার তাই হয়েছে। মদনবাণে দুজনেই কাত। প্রেমে হাবুডুবু সুদূর কলকাতার স্বাতী সেনগুপ্ত আর গ্রসস্থিয়াম শহরের হান্স হ্যাচেল।

আস্তে-আস্তে পরিচয় বিনিময়। হান্স জার্মানি থেকে লন্ডন এসেছে ইকোনমিক্স নিয়ে মাস্টার্স করতে। বাবা-মা থাকেন জার্মানির গ্রসস্থিয়াম শহরে। ছ’ফিটের ওপর লম্বা। চেহারাটা পাক্কা খেলোয়াড়দের মতো। খেলাধুলোতেও খুব ভালো। কিন্তু সবচেয়ে তুখোড় স্কিয়িং-এ। ভীষণ নেশা ওর। সময় সুযোগ পেলেই পৌঁছে যায় আল্পসের কোলে।

পড়ার শেষে হান্স চাকরি নেয় লন্ডনে আর স্বাতী শুরু করে ওর গবেষণা। এরমধ্যে বেশ কয়েকবার স্বাতী ঘুরে এসেছে জার্মানি। হান্সের বাবা খুব গম্ভীর মানুষ। পড়াশুনো নিয়ে থাকতেই ভালোবাসেন। কিন্তু মা বিদেশিনী হলে কী হবে বেশ মা মা ভাব। প্রেমে মন মজেছে তাই ওদেশের সব কিছুই ভালো লাগে হান্সের সঙ্গে সঙ্গে। খালি দু’একবার যখন স্কিয়িং দেখতে গেছে হান্সের জবরদস্তিতে, একদম ভালো লাগেনি। কেমন যেন ভয় ভয় করে। অনেকবার বারণ করেছে এই খেলাটা না খেলতে। স্বাতী যত ভয় পায় তত মজা পায় হান্স। আরও বেশি বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

এই প্রেমের পরিণতিতে দু’বাড়ির কোনও অমত নেই। স্বাতীর বাবা-মা জার্মানি আসেন হ্যাচেল পরিবারের সঙ্গে বিয়ে নিয়ে পাকা কথা বলতে। যদিও সবাই মনে মনে জানে এই আসাটা অর্থহীন তাও চিরাচরিত বাঙালি বাড়ির মানসিকতা—একবার চোখে দেখা কেমন হবে একমাত্র আদরের মেয়ের ঘর বর। হিন্দু পাঁজিপুঁথি দেখেই বিয়ের
তারিখ ঠিক হয় বৈশাখের শুরুতে। হিন্দু মতেই প্রথমে বিয়ে হবে কলকাতায় তারপর এপ্রিলের শেষে কিছু নিয়মকানুন মেনে অনুষ্ঠান হবে জার্মানিতে। হিন্দু রীতি মেনে বিয়েতে হ্যাচেল পরিবার খুব
উৎসাহী। কোথায় নাকি পড়েছেন, ভারতবর্ষে বিবাহ বিচ্ছেদ হাতে গোনা যায়।

বিয়ের প্রস্তুতি শুরু দু’দেশেই। সেদিন ছিল চৈত্র সন্ধ্যা। স্বাতী একটার পর একটা রক্ত লাল বেনারসি গায়ে ফেলে দেখছিল কোনটা পরলে সবচেয়ে বেশি ঘায়েল হবে ওর হান্স। হঠাৎ নির্মেঘ আকাশে কালবৈশাখীর মাতামাতি আছড়ে পড়ল গড়িয়াহাটের মোড়ে। কীসের ইঙ্গিত? কেউ যেন “ঘোর পরিহাসে হাসিল অট্টহাস্য”। বেজে উঠল স্বাতীর মুঠোফোন। আওয়াজটা যেন কেমন নির্মম লাগে সবার। খবর আসে স্কি করাকালীন মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কবলে হান্স। আর কিছু মনে নেই স্বাতীর।

জার্মানি গিয়ে স্বাতী জানতে পারে ওর হান্স আর নেই। বরফে ঢাকা আল্পস রাজ্যে ওর হান্স হারিয়ে গেছে। কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি ওর দেহ। সব শেষ। আর কোনও আশার আলো নেই। শরীর মন অবসাদে ভেঙে পড়ে। ভালো লাগে না কোলাহল। ভালো লাগে না কোনও মানুষের উপস্থিতি। ছুটে চলে আসতে ইচ্ছে করে নিজের জায়গায়। ইচ্ছে করে নিজের সঙ্গে একা সময় কাটাতে। কত কিছু দেওয়া নেওয়ার ছিল দুজনের। সবই আজ অসমাপ্ত। কিন্তু না, পারে না ওই ভাঙাচোরা মানুষ দুটোকে একলা ফেলে দেশে ফিরে আসতে। হান্স ছিল ওদের একমাত্র সন্তান।

হান্সের মা মিসেস হ্যাচেল অনুরোধ ফেরাতে পারে না। এপ্রিলে হান্সের জন্মদিন। ঠিক হয় তার পর ও দেশে ফিরবে। হ্যাচেল দম্পতির খুব ইচ্ছে বাড়িটা স্বাতীকে দেবে। কিন্তু আইন পথ আটকে দাঁড়ায়। স্বাতী তো এদেশের নাগরিক নয়। আল্পসের কিনারায় নিজেদের জন্য একটা বৃদ্ধাশ্রমের ব্যবস্থা করে বাড়িটা স্কি ইনস্টিটিউটকে দান করেন হান্সের নামে।

হান্সের জন্মদিনের দিন প্রথম স্বাতী ওর উপস্থিতি টের পায়। একটা চেনা স্পর্শ পায়। স্বাতী হান্সের ঘরে গিয়েছিল ওর ছবির সামনে ফুল সাজিয়ে একটা মোম জ্বালিয়ে দেবে বলে। মিসেস হ্যাচেল ছেলের জন্য স্ট্রবেরি কেক বানিয়েছিলেন কিন্তু এক টুকরো কেউ মুখে তুলতে পারেনি। স্বাতীর চোখে পড়ে কেকের একটা কোণ ভাঙা। হঠাৎই একটা অনুভবে, শিহরিত হয় শরীর মন। এ স্পর্শ যে খুব চেনা। হান্স ওর গালের সঙ্গে নিজের গালটা ঠেকিয়ে রেখেছে। স্বাতী হারিয়ে যায় নিজের মধ্যে। বিহ্বল হয়ে পড়ে। স্বাতীর আবার বাঁচতে ইচ্ছে করে। মনে পড়ে গতবছরের কথা। হান্সের জন্মদিনের দিন স্বাতী প্রতিরোধ করতে পারেনি। ভারতীয় সংস্কার হার মেনেছিল পশ্চিমের কাছে। প্রথম ভালোবাসার স্পর্শ। মনে পড়ে সেদিনও হান্স ওর গালটা স্বাতীর গালের সঙ্গে চেপে ধরেছিল আর ওইটুকুতেই স্বাতী যেন গলে গলে গিয়েছিল ভালো লাগায়।

স্বাতী ঘরের মধ্যে টের পায় ওর ভালোবাসার উপস্থিতি। সচেতন হয়ে ওঠে, ঘরটা ভরে আছে হান্সের অতিপ্রিয় সুগন্ধির গন্ধে। হান্স পারফিউম পছন্দ করে না। ওর প্রিয় আতর। মনস্থির করে, রাতটা ওই ঘরেই কাটাবে তাহলে আরও কিছুক্ষণ পাবে হান্সকে। আতরের গন্ধ ওকে আচ্ছন্ন করে ফেলে।

হ্যাচেল দম্পতি খুশি মনেই হান্সের ঘরের চাবি স্বাতীর হাতে তুলে দেন ও দেশে ফেরার আগে। স্বাতী শুধু এই ঘরটার মালিকানা পায় অলিখিত ভাবে। সেই ভাবেই কাগজপত্র তৈরি হয়।

তারপর থেকে বরাবরই মার্চ এপ্রিল মাসে স্বাতী জার্মানি চলে আসে ক’টাদিন হান্সের সঙ্গে কাটাবে বলে। প্রথমে এসেই ও চলে যায় আল্পসের কোলে, যেখানে দুর্ঘটনা ঘটেছিল। ক’দিন বসে বসে দেখে স্কিয়িং। কেউ না পাক স্বাতী কিন্তু হান্সকে স্কিয়িং করতে দেখতে পায়। সবাই স্বাতীকে বলে, এটা ওর মনের ভুল কিন্তু স্বাতী মানতে চায় না। তারপর হান্সের জন্মদিনটা গ্রসস্থিয়ামে কাটিয়ে ফিরে যায় কলকাতা। এক বছর পর এসে যখন দরজার তালা খুলে ঘরে ঢোকে, দেখে ঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। ও আসবে বলে কেউ যেন সাজিয়ে গুছিয়ে রেখেছে।

ঘরে ঢুকেই টের পায় সেই চেনা আতরের গন্ধ। আসার পরেই নিজের শরীরেও সেই একই গন্ধ পায়। সেই আগের মতো হান্স যখন জোর করে ওর গায় সুগন্ধি লাগিয়ে দিত। চড়া গন্ধ স্বাতীর অপছন্দের কিন্তু হান্সের আবদারের কাছে হার মানত। সেই ছেলেমানুষি আজও যায়নি। এখন আর অবাক হয় না।

প্রতিবারই দেখে স্কিয়িংয়ের সরঞ্জাম যেন সদ্য ব্যবহৃত। বছরের পর বছর চলে যাচ্ছে, খেলার পোশাকে এখনও হান্সের গায়ের গন্ধ। চোখটা একটু টেনে গেলে ধড়মড় করে উঠে দেখে কেউ ওর চুলটা এলোমেলো করে দিয়েছে। খালি স্বাতীকে রাগানোর ফন্দিফিকির। স্বভাবটা এখনও গেল না। ওর লম্বা চুল বলে হান্স চুলে মুখ ডুবিয়ে বসে থাকত আর জট পড়ে যেত। খুব রেগে যেত স্বাতী তখন। মনে মনে হাসে আর ভাবে এখন আর কার ওপর রাগ করবে! তাও মাঝে মাঝে ছবির দিকে চোখ কটমট করে তাকায়। বুঝতে পারে হান্স আশেপাশেই রয়েছে। একটুও একা মনে হয় না। বেশ কাটে কয়েকটা দিন। ফিরে গিয়ে আবার সেই একঘেয়ে ক্লান্তিকর জীবন। মাঝে মাঝে মনে হয় বেশ হত এখানে থেকে যেতে পারলে। আর কিছু না হোক, সারাক্ষণ হান্সকে তো কাছে পেত।

একবার শরীর খারাপ থাকায় হান্সের দেশে যেতে পারেনি স্বাতী। কলকাতায় নিজের মতো করে জন্মদিন পালন করেছিল। কিন্তু মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল খুব। হান্সের প্রিয় স্ট্রবেরি কেকও এনেছিল কিন্তু তাও আসেনি। ছবির চোখটা ছবির মতোই ছিল, খুশিতে পিট্ পিট্ করেনি। বুঝতে পেরেছিল হান্স আসেনি।

বয়স হয়েছে স্বাতীর তাও প্রতিবছর ছুটে ছুটে যায় ভালোবাসার মানুষের দেশে বছরের এই কয়েকটা দিন হান্সের সান্নিধ্যের লোভে।

হোক না সে সান্নিধ্য রক্তমাংসের না, কিন্তু আত্মার তো বটে!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%