দেবযানী বসু কুমার

রংদার মানুষ। জীবন কাটে ছবি তুলে, কারণে অকারণে গুচ্ছের বই পড়ে আর মেয়েবাজি করে। একসময় ছবি তোলা ছিল নেশা। সেই নেশাই এখন পেশা। তরুণ চৌধুরী পেশায় ফ্রিলান্সার ফটোগ্রাফার। ছোটবেলা থেকেই ছবি তোলা নেশা। এই নিয়ে বহু অশান্তি জীবনে কিন্তু কিছুতেই এই নেশা কাটাতে পারেনি। যদিও পরীক্ষার ফলাফল কেন্দ্রিক পড়াশুনো কোনওদিন ধাতে সয় না তাও বাড়ির চাপাচাপিতে মুখ্যু হওয়া হয়নি।
পাশ করার পর বহু চাকরি ধরেছে আবার কিছুদিনের মধ্যে ছাড়াও হয়ে গেছে। সেদিকেও মুশকিল কারণ কারও তাঁবেদারি করা পোষায় না। বয়স বাড়ার এই এক সুবিধে, কেউ বিশেষ ঘাঁটায় না। নিজের মর্জিমতো ছবি তোলে আর চড়া দামে বিকোয় সেগুলো। জীবনে দায়িত্ব নেওয়া একেবারে না পসন্দ। তাই বয়স চল্লিশের কোঠায় হলেও এখনও অবধি বিয়ে করা হয়ে ওঠেনি। কাজল নয়নাদের নিয়ে লং ড্রাইভ বা স্খলিত বসনাদের নিয়ে লাল নীল সবুজ জলে সাঁতরানো অবধি ঠিক আছে, তাই বলে বেবিফুড বা মাসকাবারি বাজারের চক্করে নৈব নৈব চ।
পম্পেইয়ের ওপর একটা বই পড়তে পড়তে আর তার ছবি দেখে হঠাৎই মনের খেয়ালে তরুণের শখ জাগে ইতালির পম্পেই শহরে গিয়ে ছবি তোলার। কেমন যেন একটা টান অনুভব করে। নিজের মনেই হাসে আর ভাবে পম্পেইয়ের ঘুমন্ত শহরের সঙ্গে যেন এক আত্মিক সম্পর্ক আছে ওর।
রোম হয়ে পম্পেইয়ের ঘুমন্তপুরীর চৌহদ্দির বাইরে একটা ঘরের ব্যবস্থা করতেই দিনটা কাবার। আপাতত দিন পনেরো এখানে থিতু। যদিও তিন মাসের ভিসা পাওয়া গেছে তাও অতদিন থাকার কোনও যৌক্তিকতা, ইচ্ছে বা উৎসাহ কোনওটাই নেই। কাজ হয়ে গেলেই পালাবে। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগের ঘেরাটোপের মধ্যে ঢুকতেই কেমন যেন মনে হয় সব চেনা-চেনা। নাকে লাগে একটা পোড়া পোড়া গন্ধ। কিন্তু কিছুতেই কিছু মেলাতে পারে না মনের মধ্যে।
প্রথম রাতে ভালো ঘুম হয়নি। দ্বিতীয়দিন সারাবেলায় তোলা ছবিগুলো দেখতে দেখতে চোখটা কেমন লেগে গেছে। ভোল্টেজ কমের জন্য আলোর জোর নেই। ঘর আলো আঁধারি। হঠাৎ একটা আওয়াজে চোখ মেলতেই সারা শরীরে একটা শিহরন খেলে যায়। চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে হয় দেবী না হয় পরী। অপূর্ব দেহ সৌষ্ঠব, রেশমের মতো মসৃণ চামড়া, অসামান্য মুখশ্রী, ইতালীয় মেয়েদের মতো একরাশ পিঠজোড়া কালচে সোনালি কোঁকড়ানো চুল। মনে হয় শয়ে শয়ে সাপ ফনা তুলেছে। খালি পরিধেয়টি যেন কোন আদ্যিকালের।
হাত ধরে ওকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলে ঘুমন্ত নগরের চৌহদ্দির মধ্যে পাঁচিলের একটা ভাঙা অংশের ভেতর দিয়ে। পৌঁছয় একটা আধভাঙা বাড়ির একটা ছোট্ট ঘরে। অবলীলায় খুলে ফেলে দেহের সব আবরণ। তরুণের কেমন নেশা লাগে চোখে। মহিলা তখন সম্পূর্ণ নগ্ন। মাথা ঝিম ঝিম করে। চিন্তা শক্তি অবশ হয়ে পড়ে। শুরু হয় শরীরী খেলা। প্রতিমুহূর্তে যেন নতুনত্ব। শরীরের তৃপ্তি যখন কানায় কানায় পৌঁছয় তখন শেষ হয় আদিমতা। অন্ধকার থাকতেই আবার ফেরার পালা। দেহ মন তখন এক ভালো লাগায় পরিপূর্ণ।
চলতে থাকে এই শরীরী খেলা প্রতি রাতে। সারাদিন ছবি তোলার পর তরুণ অপেক্ষা করে ওই নিশির ডাকের জন্য। উপলব্ধি করে এ বড় ভয়ঙ্কর নেশা। স্বল্প চাঁদের আলোয় ওই নিরাবরণাকে দেখলে সারা শরীর মাতালের মতো টলে। নিশিরাতের অতিথির আদুর গায়ে যখন চাঁদের আলো পিছিল খায় তখন টাল সামলানো মুশকিল হয়। চুনী রঙের ভেজা ভেজা ঠোঁট দুটো যখন চেপে ধরে তরুণের ঠোঁট, তখন ইচ্ছে করে আজীবন এরকম থেকে যেতে। মনে হয় এই সমস্ত প্রাণ শক্তির উৎস। প্রতিরাতেই ফেরার সময় দেখে চাঁদকে সাক্ষী রেখে মহিলা মাউন্ট ভিসুভিয়াসকে অভিশাপ দেয়। সব কেমন গোলমেলে লাগে।
দিন পাঁচ ছয় কাটবার পর হঠাৎই একদিন দিনের বেলায় ছবি তোলার সময় খেয়াল করে সে দাঁড়িয়ে আছে প্রতি রাতের আধভাঙা বাড়িটার সামনে পুরাতত্ত্ব বিভাগের চৌহদ্দির মধ্যে। একজন গাইডকে জিগ্যেস করে জানতে পারে, বাড়িটা ৭৯এডি-তে ভিসুভিয়াস থেকে ভয়াবহ অগ্নুৎপাতের সময়কার পম্পেই নগরের ব্রথেল, নাম লুপানর।
মনের মধ্যে জমতে থাকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন। কার কাছে পাওয়া যাবে এই গোলক ধাঁধার উত্তর? রাত বাড়লেই মনের মধ্যে উৎকণ্ঠা—আসবে তো নিশির ডাক? সেই রাত থেকেই আস্তে আস্তে খুলতে থাকে নেপথ্য কাহিনি।
জানে না কোন ভাষায় কথা বলে প্রতিরাতের অতিথি কিন্তু সব বুঝতে পারে তরুণ। মহিলা বলে যায় আর তরুণ একমনে শোনে। শরীরী মাতামাতি যখন তুঙ্গে তারপরই শরীর জুড়ে নামে ভালো লাগার এক আবেশ। পরিতৃপ্তির এক ক্লান্তি। তখন ছোট এক পাথরের খাটে পাশাপাশি শুয়ে শোনে এক অতৃপ্ত আত্মার গল্প।
মহিলার নাম আফ্রা। ছিল পম্পেই নগরের খুব গরিব ঘরের মেয়ে। কিন্তু অসামান্য সুন্দরী হওয়ায় মাঝবয়সি এক ধনী ব্যবসাদার মার্কাস সেলার ওকে বিয়ে করবে বলে কিনে নিয়েছিল ওর বাবার কাছ থেকে বেশ কিছু টাকার বিনিময়ে। করেও ছিল বিয়ে। কিন্তু কিছুদিন যাবার পর আফ্রা বুঝেছিল মানুষটা রাঙামূলো। পুরুষত্বহীন অক্ষম এক কামহীন পুরুষ। কিন্তু আফ্রা তখন ভরা যুবতী। যৌবন কানায় কানায়। সারা শরীরে আগুন জ্বলত। অপেক্ষা করত কখন মার্কাস এসে আদরে সোহাগে ভরিয়ে তুলবে। ঠান্ডার প্রলেপ পড়বে ওর শরীরে। রাতের পর রাত কেটে যেত উপোষী শরীরটাকে নিয়ে।
তখন পম্পেই ছিল সমুদ্রের কাছে। একদিন মার্কাস বাড়িতে নিয়ে এল টিটাস নিওকে। ব্যবসার সূত্রে টিটাস জাহাজে করে ইতালির অন্য শহর থেকে এসেছিল পম্পেইতে। আফ্রা আর টিটাসের প্রথম দেখাতেই প্রেম। এরপর লুকিয়ে-চুরিয়ে চলতে লাগল অবৈধ মিলন। টিটাস ছিল বিবাহিত। অন্য শহরে ছিল স্ত্রী পুত্র পরিবার বাড়িঘর। কিন্তু ব্যবসার জন্য অন্যান্য শহরে যেতেই হত। কিন্তু আফ্রাকে দেখার পর ভুলে গেল সব। ভিলা নিল পম্পেই নগরে। তখন দুজনে প্রেমের জোয়ারে ভাসছে।
প্রেম যখন বেপরোয়া তখন একদিন মার্কাসের হাতে নাতে ধরা পড়ল। ক্রোধে অন্ধ মার্কাস টিটাসের কিছু করতে পারল না কিন্তু অমানবিক ভাবে চাবুক পেটা করল আফ্রাকে। যদিও ওদেশে তখন বিবাহ বিচ্ছেদ হত কিন্তু যেহেতু মার্কাস টাকা দিয়ে কিনেছিল আফ্রাকে ওর বাপের কাছ থেকে, তাই ছাড়া পেল না। শেকল বেঁধে রেখে দিল অন্ধকার ভাড়ার কুঠুরিতে। কিন্তু সুযোগ একদিন এল। পাখি সেদিন শেকল কেটে ফুড়ুৎ। গিয়ে উঠল লুপানরে। নাম লেখালো একজন বারবনিতা হিসেবে। টিটাস কোনওদিন বিয়ে করতে পারত না দেশের আইন অনুযায়ী কারণ ওর ভরা সংসার আছে। সব দিক দিয়ে ভালো হল। টিটাস হল আফ্রার বাঁধা খরিদ্দার। রইল না কোনও আড়াল। ভালোবাসার মানুষকে নিজের করে কাছে না পাবার একটা ব্যথা রয়েই গেল কিন্তু দেহজ সুখই সুখ।
পরস্পর কাছাকাছি আসার আগেই টিটাস গেল কাছেই অন্য শহর মাইসেনিয়ামে একটা কাজের প্রয়োজনে। আফ্রার ছাড়তে একদম মন চায়নি। কিন্তু পম্পেই শহরে সে সময়ে কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছিল। সেই জন্য লুপানর বেশ্যালয়টি দুদিন বন্ধ। সেই দুদিন কোনওভাবেই এক হতে পারবে না আফ্রা ও টিটাস। সেই সুযোগটাই নিয়েছিল টিটাস।
আফ্রা কোনও সাল তারিখ বলেনি কিন্তু তরুণ জানত দিনটা ছিল ২৪শে অগাস্ট ৭৯এডি। কয়েকশো বছর আগে। ও বইয়ে পড়েছিল। আফ্রা বর্ণনা দিল ভয়াবহ অগ্নুৎপাতের। মাউন্ট ভিসুভিয়াসের প্রকান্ড হাঁ থেকে বেরিয়ে এল গলন্ত লাভা, গরম ছাই, ফুটন্ত পাথুরে কাদা আর আগুনের লেলিহান শিখা। অগ্নিদগ্ধ হল পম্পেই নগর। ছাই চাপা পড়ে গেল সব জীবন্ত প্রাণ। পৃথিবীর বুক থেকে চিরদিনের মতো হারিয়ে গেল একটা প্রাণোচ্ছল সমৃদ্ধ নগর।
মানুষজন এই মৃত শহরের খোঁজ পেয়েছে বহু বছর পর। যুগ যুগ ধরে অতৃপ্ত আত্মারা মুক্তির জন্য হাহাকার করছে। রাতের অন্ধকারে তারা কেঁদে কেঁদে ফেরে পম্পেইয়ের আকাশে বাতাসে। শয়ে শয়ে মানুষের প্রাণ এক নিমেষে শেষ হয়ে গিয়েছিল। আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল পালাবার কিন্তু পারেনি। বুক ভরা আকুতি ছিল বাঁচবার কিন্তু বাঁচা হয়নি। তরুণ ভাবে একেই বলে বোধহয় রেসিডুয়াল স্পিরিট। বুকের মধ্যে একটা যন্ত্রণা অনুভব করে—কে দেবে এদের মুক্তি। আফ্রার চোখ দিয়ে টপ-টপ করে জল পড়ছিল তরুণের বুকে।
একটু একটু করে সব মনে পড়ছিল তরুণের। কয়েক জন্ম আগে সেই ছিল পম্পেই নগরের টিটাস। আফ্রার প্রেমিক। তাই প্রায় হাজার বছর ধরে খুঁজে চলেছে আফ্রাকে। তা না হলে কেন এল এই পম্পেই নগরে? মনে পড়ে যাচ্ছিল, যেদিন ফেরার কথা ছিল মাইসেনিয়াম থেকে পম্পেই নগরে, খবর এল ভোজবাজির মতো উবে গেছে পম্পেই। টিটাস পাগলের মতো ছুটে আসতে চেষ্টা করেছিল মাউন্ট ভিসুভিয়াসের পাদদেশে। কিন্তু আগুনের হলকার জন্য কাছে যেতে পারেনি। তারপর আফ্রার জন্য একবুক হাহাকার নিয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াত অর্ধোন্মাদ পথভোলা এক পথিক হয়ে। তারপর কী হয়েছিল আর জানা নেই।
কখন যেন তিনমাস কেটে গেছে। ভিসা শেষ হবার আগের দিন রাতে আত্মহত্যা করেছিল তরুণ। আফ্রাকে আবার ছেড়ে যাবার কথা ভাবতেই পারেনি সে। এ বন্ধন জন্মজন্মান্তরের। এ ভালোবাসার টান অমোঘ। হাজার হাজার বছরেও ফুরোয় না এই প্রেম।
সবটাই জানা গিয়েছিল তরুণের ডায়েরি থেকে। দিনপঞ্জি লেখার শখ ছিল। আর কিছু ছবি পাওয়া গিয়েছিল তরুণের ক্যামেরাতে। সবই শুধু অর্ধ বা পূর্ণ বিবস্ত্র কোনও মহিলার অবয়ব মাত্র। আবছা সিল্যুটে। এর বেশি কিছু নয়। যেটা আশ্চর্যের, সবটা তরুণের কল্পনা যদি ধরে নেওয়াও যায়, ছবিগুলো তবে কার? এল কোথা থেকে ওর ক্যামেরাতে?
আশায় থাকব প্রতি রাতে এই অবৈধ মিলন নয়, আফ্রা আর টিটাস বা তরুণের আত্মা নিশ্চই মুক্তি পেয়ে কোনও এক জন্মে বৈধ স্বামী স্ত্রী হবে বা একে অপরকে ভালোবাসবে জনসমক্ষে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন