দেবযানী বসু কুমার

টনক নড়ল সবার কেওড়াতলা মহাশ্মশানে পৌঁছে। সবে বডিটা ভি আই পি চুল্লির সামনে রেখে দুচারজন গেছে ডেথ সার্টিফিকেটটা আনতে। বাকিরা শেষ ফাগুনের মাঝদুপুরের গরমটা এড়াতে এসি লাউঞ্জে গিয়ে বসেছে। আবার হই-হই—বিশ্বাসদার আসল নাম কী? এই নামেই তো পাড়া শুদ্ধু লোক ডাকে। নয় থেকে নব্বই সবার কাছে হয় বিশ্বাসদা বা বিশ্বাস। কিন্তু এই নামে তো শ্মশানের কাজ মিটবে না। আবার ছেলেপুলেরা সব ছুটল ত্রিধারার সামনে জগদ্ধাত্রী বাড়িতে। কোনও নাম ফলক নেই, লোকের মুখে মুখে নামকরণ হয়েছে জগদ্ধাত্রী বাড়ি। সে অন্য গল্প।
কারও ঠিক মনে নেই কবে বিশ্বাসদা এসেছিলেন এই এলাকায়। তবে নয় নয় করে বছর কুড়ি তো হবেই। তখন কার্গিল-বাড়ি তৈরি হচ্ছে। বাড়ি শুরুর বছর তিনেক বাদে তল্পি তল্পা নিয়ে হাজির প্রোমোটারের লোক হয়ে—নাকি মিস্ত্রি খাটাবেন, সাইটের দেখভাল করবেন। শেষ হল কার্গিল-বাড়ি শুরু হল জগদ্ধাত্রী বাড়ি। ওই বাড়ির ভীত খোঁড়া থেকে সেই যে গেঁড়ে বসলেন আর কখনো কোথাও যাননি। বাড়ি শেষ হবার পর হয়ে গেলেন ওই বাড়ির কেয়ার টেকার। না একদম ভুল কথা, কেয়ার টেকার বললে ওনাকে অসম্মান করা হয়। উনি ছিলেন ওই বাড়ির অতন্দ্র প্রহরী। মাছি গলবার উপায় ছিল না। আশপাশের সবার সঙ্গে সারাদিন চলত ভাবের গলাগলি আর রাগারাগির টানাপোড়েন।
ওনার ঘরটা ছিল পাড়ার গোডাউন। কেউ এসে বলল, বিশ্বাসদা ত্রিশ হাজার টাকা রেখে গেলাম ড্রয়ারে, আবার কেউ বলল দশটা জলের পেটি রাখলাম। পরক্ষণেই কেউ এসে রেখে গেল তারাপীঠ বা পুরীর প্রসাদ। এরকম সারাদিন, দিনের পর দিন প্রায় মাঝ রাত অবধি জমা পড়ত হরেক জিনিস, একটার সঙ্গে একটার কোনও মিল নেই—ফ্লেক্স, চাবি, ঠাকুরের ভোগ, হারমোনিয়াম, নাচের কস্টিউম, গাঁটরি বাঁধা কম্বল ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এর কোনও একটা যদি না পাওয়া যেত তাহলেই উনি নির্দ্বিধায় যাকে খুশি চোর সাব্যস্ত করতেন, মায় বাড়ির মালিকও বাদ যেত না। শুরু হত সেই নিয়ে গালিগালাজ শাপশাপান্ত আর সেই হুলুস্থুলুসের জের চলত তারপর আগামী কয়েক ঘণ্টা। এ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।
আবার ছেলে ছোকরাদের ভালোবাসার আদিখ্যেতারও অবধি ছিল না। হাতে ব্যথা—দুজন জোর করে টেনে নিয়ে গিয়ে চান করিয়ে জামা পাল্টিয়ে দাড়ি কামিয়ে ছাড়ল। মারা যাবার বছর ছয়েক আগে বিশ্বাসদার ক্যান্সার হয়েছিল। শোনা গেছে ওনার সবাই আছে, ছেলে দাদা বউদি দিদি জামাইবাবুরা। ওনার মুখ থেকেই শোনা কথা তারা কর্মজীবনে বেশ সুপ্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এই বিপর্যয়ের সময় যদি ঘাড়ে পড়ে, সেই ভয় কেউ উঁকি মারল না। পাড়ার ছেলেরাই বুক দিয়ে করেছে—কি অর্থে কি সামর্থে। যার কেউ নেই তার কেউ না কেউ আছে আবার প্রমাণিত।
শিশুমঙ্গল থেকে ফিরলেন রোগমুক্ত হয়ে। ভালোবাসা তো চোখে দেখা যায় না, অনুভব করতে হয়। বিশ্বাসদার ছিল দারুণ চা আর সিগারেটের নেশা। মাঝে মাঝে সিগারেট চুরির প্রমাণও পাওয়া গেছে। সিগারেট নিয়ে একটা মজার গল্প আছে। অপারেশনের সময় ওটির বাইরে ছিল পাড়ারই দুজন, সুসুয়া আর বাঙ্কু। জ্ঞান আসতেই বিশ্বাসদার প্রথম কথা, জানিস বাঙ্কু, ডাক্তাররা আমার সব বিড়ি চুরি করে নিয়েছে। হাসপাতাল থেকে ফেরার পর যখনি বিশ্বাসদাকে সিগারেট খেতে দেখত ছোট বড় কেউ—শুরু হত শাসন, নালিশ, ছুড়ে ফেলে দেওয়া, বকাবকি, এমনকী ছেলেরা দোকানে দোকানে গিয়ে বলেছিল ওনাকে সিগারেট না বিক্রি করতে। আবার উনিও এদের খুশিতেই খুশি থাকতেন। টিভিতে দেখাচ্ছে ছেষট্টি বছর বয়সে লোকাল কাউন্সিলর জিতেছে হঠাৎ সবাই দেখে গাড়ি ঘোড়ার পরোয়া না করে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাত-পা তুলে নাচছেন, খেয়াল নেই গাড়ির খেয়াল নেই নিজের ত্যাড়া ব্যাঁকা শরীরের। পাড়ার নাচের স্কুলের মেয়েরা প্রোগ্র্যাম করতে যাচ্ছে হিউস্টন, উনি আনন্দে আত্মহারা। এরকম ভাব-আড়ির প্রচুর নিদর্শন আছে।
এত লিখতে বসে খেই হারিয়ে ফেলছি। ছিলাম শ্মশানে আর এখন লিখতে বসে বিশ্বাসদার জীবন সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছি। ছেলেরা তো পড়ি কি মরি করে ছুটল জগদ্ধাত্রী বাড়ি। যে করেই হোক পেতে হবে বিশ্বাসদার আধার কার্ড। নাম ও বয়সটা জানা প্রয়োজন। কিন্তু সমস্যা আছে—বিশ্বাসদার স্বভাব ছিল নিজের জিনিস সব লুকিয়ে রাখা। কারও ক্ষমতা ছিল না কোথায় কী আছে জানে। কিন্তু অবাক কাণ্ড! তালা খুলেই দেখে টেবিলের ওপর সাজানো রয়েছে আধার ও প্যান কার্ড আর তার সঙ্গে ওনার মোবাইলটা। সবার মনে প্রশ্ন, মারা যাবার আগে দুমাস তো হসপিটালে ছিলেন। তাহলে এগুলো এখানে কে রাখল?
দাহ হলে সবাই জানল ওনার নাম তপন কুমার বসু বিশ্বাস। বিশ্বাস ওনাদের পৈতৃক উপাধি পাওয়া। বয়স প্রায় সত্তরের কোটায় কিন্তু দেখে লাগত নব্বইয়ের আশেপাশে। ঠিকানা—জগদ্ধাত্রী বাড়ি, মনোহর পুকুর রোড, কলকাতা। ওনার মুখ থেকেই শোনা—ছিলেন ভালো বাড়ির ছেলে। জন্ম যশোর জেলার সুখপুখুরিয়া গ্রামে। ওখানেই পড়াশুনো আর তারপর কর্মজীবন। একদিন দুপুরে শরীরটা বেঠিক লাগায় কর্মস্থল থেকে অসময়ে বাড়ি ফিরে দেখেন খাটের একপাশে ছেলে ঘুমোচ্ছে আর খুব আপত্তিকর অবস্থায় স্ত্রী এক পরপুরুষের সঙ্গে শুয়ে আছে। লোকটা কোনওমতে পালতে পারলেও স্ত্রীর রেহাই মেলেনি। খুন হতে হয়েছিল বিশ্বাসদার হাতে। খবর পেয়ে রে রে করে তেড়ে এসেছিল শালারা। শ্বশুরবাড়ি ছিল পাশের গ্রামে। শশুর ছিলেন চাল কলের মালিক। টাকার গদির ওপর শুয়ে থাকতেন। মেয়ের মৃত্যু সংবাদ পেয়েই সপরিবারে ছুটলেন পুলিশে খবর দিতে। বিশ্বাসদা সেই রাতেই পালালেন অজানার উদ্দেশে।
চোরা পথে কাঁটাতারের বর্ডার পেরিয়ে এলেন ভারতে অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গে। যদিও তখন ওনার সব ভাই বোনেরাই হয় কলকাতা বা কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা কিন্তু নিজের হদিস জানাজানি হবার ভয় কারও কাছে যাননি। অনেক ঘাটের জল খেয়ে শেষ ঠিকানা ত্রিধারা। অনেকদিন হয়ে গেছে তাই সাহস করে ভাই বোনেদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানতে পারেন, ছেলে মানুষ হয়েছে ছোট বোনের কাছে। এদের সঙ্গে যোগসূত্র বলতে এক ফোন ছাড়া আর কিছু ছিল বলে শুনিনি।
মারা যাবার পর ওনার ফোনে পাওয়া গেল অনেক নামি-দামি মানুষের নম্বর—গায়ক, নৃত্যশিল্পী, আবৃত্তিকার, লেখিকা এমনকী মন্ত্রী পর্যন্ত। জানা গেল তাদের কাছে ত্রিধারার নানান অনুষ্ঠানে কোনও বিশেষ কিছু শোনার বা দেখার আবদার করতেন ফোনে করে।
হয়েছে কী, জানুয়ারি মাসে ত্রিধারা উৎসবের সময় জগদ্ধাত্রী বাড়ির প্রবেশ পথটাকে চারদিক ঘিরে সোফা পেতে আর্টিস্ট লাউঞ্জ বানানো হত। তখন উনি সবার সঙ্গে গল্পগুজব করতেন আর ফোন নম্বর জোগাড় করতেন। একবার এই ত্রিধারা উৎসবের দ্বিতীয় দিনে সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়ে ভর্তি হলেন হসপিটালে। খুব নামকরা একজন গায়ক এসে খোঁজ করলেন বিশ্বাসদার—কী না, একটা বিশেষ গান শুনতে চেয়েছেন বিশ্বাসদা ফোন করে। তাতেই সব জানাজানি হল। নামকরা শিল্পী থেকে একশো দিনের কর্মী, সবার সঙ্গেই সমান যোগাযোগ। হাসপাতাল থেকে আর ফেরা হয়নি। একেবারে ত্রিধারা হয়ে চলে গেলেন কেওড়াতলা।
কিন্তু না, আছেন। ওনার উপস্থিতি সবাই হাড়ে হাড়ে টের পায়। কেউ সময়মতো ভুলে গেল পাম্প চালাতে, ঠিক পাম্পের আওয়াজ। ব্যস মনে পড়ে গেল পাম্প চালাতে হবে। এমন অনেকে আছে যারা ওনার মৃত্যু সংবাদ পায়নি, তারা জানায় বিশ্বাসদার হাতে চেকটা দিয়ে এসেছে বা কোম্পানি জানাচ্ছে কুরিয়ারের জিনিস মিস্টার বিশ্বাস রিসিভ করেছে। রিসিভারের জায়গায় ওনার সই আছে। এবং যথাযথ সব জিনিসই ওনার ঘরের টেবিলে পাওয়া যাচ্ছে। ওনার ঘরের দরজা খুললেই সবাই দেখছে ধূপ জ্বলছে, চারদিকে ধুনোর ধোঁয়া।
প্রতি শনিবার ঠাকুরের গলায় টাটকা ফুলের মালা। যেমন আগে দিতেন সকাল সন্ধে। জমাদার জহর জানায় প্রতিদিন ভোররাত থেকে বিশ্বাসদা ওকে ঘুমের মধ্যে জ্বালাতন করে সকাল সকাল বাড়ি পরিষ্কার করে দিয়ে যাবার জন্য। নাচের ক্লাসের মায়েরা বেশি হাসাহাসি বা হই-চই করলে পাখাটা আপনা থেকে বন্ধ হয়ে যায়। আর একটা ঘটনা তো না বললেই নয়।
জগদ্ধাত্রী বাড়ির মালিক মা জগদ্ধাত্রী হলেও উনি ওনার ভক্তদের ‘দাও দাও’ নিয়ে আর সেই ‘দাও’ পূরণ করতে এত ব্যস্ত থাকেন যে ওনাকে বাড়ির কোনও কাজেই পাওয়া যায় না। ওই বাড়িতেই থাকে এখনকার এক উঠতি রুপোলি পর্দার নায়িকা। সেই বকলমে মালিক। সই সাবুদগুলো করে। উঠতি বয়স তাই রাত করে বাড়ি ফেরার প্রবল ঝোঁক। একদিন এরকম বেশ রাত হয়েছে ফিরতে। কাজের লোকেরা অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছে। হঠাৎই ঘুম ভেঙে শোনে ছোট মালকিন তেতলায় বেল বাজাচ্ছে। সদর দরজা কে খুলে দিয়েছে জানতে চাইলে না তিনি, না তেনার ড্রাইভার বিনোদ, কেউই কিছু বলতে পারে না। জানায় কেউ একটা চাবি খুলে দিল। একে অন্ধকার তায় ঘুম চোখ, ঠিক মতো ঠাওর করিনি। বিশ্বাসদা ছাড়া এত সজাগ আর কে হবে? জগদ্ধাত্রী মন্দির ছিল ওনার প্রাণ। সারারাত মন্দিরের চাতালে পায়ের খস খস আওয়াজ। কেউ যেন হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে। কেউ যেন মন্দিরের পাথরের থামে হাত বুলোচ্ছে। শিবমন্দিরের সিঁড়িতে একটা খবরের কাগজ আর এক ভাঁড় চা বসানো রয়েছে। সব চেয়ে বড় কথা গেট দিয়ে ঢুকে অনেকেই দেখছে বিশ্বাসদা বেঞ্চে বসে ঢুলছেন কিন্তু কাছে গেলে কেউ কোথাও নেই।
আর কিছু নয়—একেই বোধহয় বলে মায়া। জগদ্ধাত্রী বাড়ি, ত্রিধারা ক্লাব, ১০০ দিনের লোকজন, নকুলের চায়ের দোকান, নাচের স্কুল লাই হারাওবার ছাত্রী, সবার সঙ্গে এক মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে আছেন। হয়তো চাইছেন কিংবা হয়তো চাইছেন না—মুক্তি।
আছেন, থাকুন না। কারও কোনও ক্ষতি তো করছেন না। বরং একজন কেউ এরকম নিজেদের লোক থাকলে সে জীবিতই হন বা আত্মাই, সবারই তো উপকার। একজন অতন্দ্র প্রহরী অলক্ষ্যে নজর রাখছে সিসিটিভির মতো।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন