মারাত্মক প্রতিশোধ

দেবযানী বসু কুমার

একত্রিশে ডিসেম্বর। রাত পৌনে তিনটে। গাড়ির গতিটা কিছুতেই কব্জা করতে পারছিল না অরিজিৎ। নিজেকে কেমন বেসামাল লাগে। বুঝতে পারে অরিজিৎ নেশাটা মাত্রাছাড়া হয়ে গেছে। কোনও কিছুই আর বশে নেই। দু’চোখে যেন কালঘুম জড়িয়ে আসছে। চোখের পাতাদুটো এত ভারী হয়ে আসছে যে কিছুতেই খুলে রাখতে পারছে না। পাশে সুপর্ণা ভয় সিঁটিয়ে আছে। বার বার হাতের ওপর হাত রেখে গাড়ির গতি কমাতে ইশারা করছে কিন্তু অরিজিৎ কিছুতেই কিছু পেরে উঠছে না। হঠাৎ গাড়িটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মারল গিয়ে ব্রিজের পিলারের সামনে বসা একটা জটলাকে।

ঠান্ডায় কয়েকটা কুলিকামিন মেয়েমরদ খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোয়াচ্ছিল। মুঠোফোনে গান চালিয়ে বাংলা মদ সাজিয়ে নিয়ে বসে নেশাভাঙ করছিল। বাবুরা করলে ওরাই বা করবে না কেন? ওরা ওদের মতো করে ইঞ্জিরি ন্যু ইয়ার মানাচ্ছিল। পুলিশের কাছে সেটাই নাকি ছিল ওদের বক্তব্য। এবার একটু পিছিয়ে যাই।

ঘটনাটা যখন ঘটে তখন মাঝরাত অনেকক্ষণ পেরিয়ে নতুন বছরে পা রেখেছে সারা পৃথিবী। গাড়িটা সজোরে মারতে কোলে বাচ্চা নিয়ে বসা একটা যুবতী মেয়েছেলে নিমেষে শেষ। চারপাশে তখন তাজা লাল রক্ত আর রক্ত। মাথাটা তখন ঝিমঝিম করছে অরিজিতের। ততক্ষণে নেশা ছুটে গেছে। মগজ কাজ শুরু করেছে। ওর মধ্যেও মাথা ঠান্ডা রেখে গাড়ি না দাঁড় করিয়ে সজোরে গাড়ি ঘুরিয়ে বোঁ করে বেরিয়ে বাড়ি না গিয়ে সোজা যায় মুকেশচাচার বাড়ি নরেন্দ্রপুরে।

দাদুর আমল থেকে মুকেশচাচা ওদের গাড়ি চালাত। যদিও পরবর্তীকালে অরিজিৎ কোনও ড্রাইভার রাখেনি। মুকেশচাচার ছেলে মনোজ অন্য জায়গায় গাড়ি চালায়। ছোট থেকে কোলেপিঠে মানুষ হয়েছে বলে মুকেশচাচা ওদের দুই ভাই-বোনকে খুব ভালোবাসত। এমনি একটা ক্ষীণ যোগাযোগ ছিল মুকেশচাচার সঙ্গে অরিজিতের। পৌঁছেই মুকেশচাচার পা জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলে—আমাকে বাঁচাও। সবটা শুনে চাচা জানতে চায়—কী করতে হবে? মাথার মধ্যে ছকটা কষাই ছিল। বলে—পুলিশ এলে বলতে হবে ড্রাইভার মনোজ গাড়ি চালাচ্ছিল। কুয়াশার রাত তাই ঠাওর করতে পারেনি। কোর্টে কেস উঠলে ভালো উকিল দেব। যদি শেষ পর্যন্ত হাজতবাস হয় তাহলে জেলে থাকাকালীন মুকেশের সংসার খরচের সব ভার অরিজিতের আর জেল থেকে বেরোলে নিজের আপিসে মনোজকে একটা পাকা চাকরির ব্যবস্থা করে দেবে।

মনোজকে কোনও ভাবেই রাজি করাতে না পেরে ফের চাচার পায়ে ধরে অরিজিৎ। কপালের ফের। বাপের গালাগাল খেয়ে মনোজ রাজি হতে বাধ্য হয়। মনোজের মা ছেলের ঢাল হয়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করলেও কোনও ফল হয় না। মুকেশের এক কথা—বুড়াবাবুর নুন খেয়েছি। ওর নাতিকে বাঁচানো আমাদের কর্তব্য।

কিন্তু রাতটা বর্ষশেষ রাত। মাঝরাত হলে কী হবে, শহর খুব সজাগ ছিল। সরকারি নির্দেশে সারা শহর পুলিশে ছয়লাপ। অত গহীন রাতেও আরক্ষা দপ্তর সজাগ। অতন্দ্র প্রহরীর মতো পাহারা দিচ্ছে রাজপথ থেকে কানাগলি। তাই দুর্ঘটনা ঘটার সামান্য সময়ের মধ্যে হাজির হয় পুলিশ। কিন্তু ততক্ষণে সে খুনে গাড়ি বেরিয়ে গেছে। পালাচ্ছে জেনে ধাওয়া করে পুলিশ কিন্তু নাগাল পায় না কারণ এরকম একটা কিছু আন্দাজ করে অরিজিৎ কাছেই একটা গলির মধ্যে গাড়ি ঢুকিয়ে দেয়। চেনা ছিল সেই গলিপথ তাই সে ওলিগলি তস্য গলি দিয়ে গাড়ি চালিয়ে পৌঁছয় মুকেশচাচার বাড়ি। তবে ধরতে না পারলেও গাড়ির নম্বরটা ট্রাফিক ক্যামেরা থেকে উদ্ধার সম্ভব, জানে পুলিশ বিভাগ। অবশ্য তার জন্য পরদিন সকাল অবধি অপেক্ষা করতে হবে।

এদিকে একগাদা প্রতিশ্রুতি দিয়ে মনোজের কাছ থেকে দোষী সাজবার প্রতিশ্রুতি আদায় করে আধা নিশ্চিন্ত হয়ে ভোর পাঁচটার সময় স্বামী স্ত্রী যখন শুতে যায় তখন শরীর আর দিচ্ছে না, ক্লান্তিতে ভেঙে পড়তে চাইছে। কিন্তু ঘুমোলে চলবে না। অরিজিৎ জানে পুলিশ আসার আগেই পুলিশের কাছে ধরা দেওয়াটা ভবিষ্যতের জন্য অনেক বেশি কার্যকরী শুধু নয়, বুদ্ধিমানের কাজ হবে। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে স্নান সেরে তৈরি হয়ে দুর্ঘটনায় অল্প ক্ষতিগ্রস্ত গাড়িটা নিয়ে হাজির হয় চাচার বাড়ি। কিন্তু ওখানে গিয়ে আবার একটা অপ্রিয় অবস্থার সম্মুখীন হয় অরিজিৎ। ভরা পোয়াতি মনোজের বউ তখন আছাড়ি পিছাড়ি কাঁদছে। সে কিছুতেই তার মরদকে থানায় যেতে দেবে না।

মনোজের সবে তখন এগারোমাস বিয়ে হয়েছে। বউটা একটা আঠারো উনিশ বছরের কিশোরী মেয়ে। গা থেকে তখনও গেঁয়ো গন্ধ যায়নি। আগ্রার কাছে দেওরা গ্রামে ওর বাপের ঘর। একবার শ্বশুরের পা ধরে আর একবার অরিজিতের পা ধরে কাকুতিমিনতি করে মনোজকে ছেড়ে দেবার জন্য। কাঁদতে কাঁদতে বলে ওর পুলিশকে খুব ডর লাগে। ও জানে মনোজ একবার গেলে আর ফিরবে না। ওদিকে মনোজের বাপ তখন তড়পাচ্ছে। মনিবের ছেলের কথা না শুনলে দেশের সমস্ত সম্পত্তি থেকে মনোজকে বঞ্চিত করবে।

মুকেশচাচাদের দেশ আগ্রার কাছে রামপুরায়। ওখানে সামান্য খেতি জমি আছে। পাকা ঘর আছে। চাচার আর দুই ছেলে ওখানেই সপরিবারে থাকে আর খেতিতে কাজ করে। ওদের মোটামুটি চলে যায়। বরাবর কলকাতায় গাড়ি চালিয়েছে মুকেশচাচা তাই গাঁওতে মন টেকে না। এখন কাজ না করলেও ছোট ছেলের কাছে থাকেন।

একবুক ভয় নিয়ে মনোজ অরিজিতের সঙ্গে থানায় গিয়ে দোষ কবুল করতে বাধ্য হয়। সব আগে থেকে ভাবা ছিল, তাই জেরার আগেই অরিজিৎ জানায়, ড্রাইভার ভয় পাচ্ছিল তাই রাতে এসে ধরা দিতে পারেনি। সকাল হতেই তাই ওকে নিয়ে এসেছে অরিজিৎ। এদিকে এত কিছুর পর মনোজের মনে আশা—সংসারটা এবার দাঁড়িয়ে যাবে। আর ঠেলে নিয়ে যেতে হবে না। যখন কোর্ট কাছারি চলছে তখন বউ আর মাকে মনোজ এ কথাই বলে ভরসা দিয়েছে।

মনোজ বা মুকেশ অতটা না বুঝলেও মামলা লড়ার জন্য খুব মামুলি একজন উকিল খাড়া করে দায় সারে অরিজিৎ।

মনোজের বয়ান অনুযায়ী—

শীতের মধ্য রাত তায় রাস্তায় ঘন কুয়াশার জন্য কিছু ঠাওর করা যাচ্ছিল না। বাবুর বন্ধুর বাড়ি পার্টি শেষ হতে বেশ দেরি হয়েছিল তাই ফেরার পথে ঘুম জড়িয়ে আসছিল চোখে। সব পক্ষই বুঝেছিল মামলাটা বেশ করে সাজানো। কিন্তু ওই আনপড় কুলি পক্ষের কোনও হেলদোল না থাকাতে মহামান্য আদালত রায় দিলেন মনোজের ছ’বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। তার সঙ্গে ফাউ জুটল খুনের তকমা।

মনোজ যেদিন জেলে গেল সেদিন ওর ছেলের বয়স ছ’মাস। একদিন খালি ওর বউ আর মা মিলে এসে ওকে ছেলের মুখ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। সেই প্রথম আর সেই শেষ। সেই ক’মাস অরিজিৎ নিয়ম করে ওদের সংসারে টাকা পাঠিয়েছে, মাসে মাসে গিয়ে খোঁজখবর করেছে। তারপর আর ওমুখো হয়নি। শেষে যখন সংসার চলছে না তখন মুকেশচাচা অনেকবার এসে এসে ফিরে গেছে। কিন্তু ব্যস্ত আছে অথবা বাড়ি নেই অজুহাতে দেখা করেনি অরিজিৎ।

ছ’বছর পরে ঃ—

এর মধ্যে অনেক কিছু ওলটপালট হয়ে গেছে। সেদিন অরিজিতের ছেলের পাঁচ বছরের জন্মদিন। স্বামী-স্ত্রী মিলে বেশ কিছু পরিকল্পনা করেছে ছেলের জন্মদিন ঘিরে। আবার সেই দিন সকালে মুম্বাই আপিস থেকে ইমেল আসে অরিজিৎ সহ আরও দুজনের পদোন্নতির খবর নিয়ে। অরিজিৎ মনে মনে ভাবে সত্যি আজকের দিনটা খুব পয়া।

অরিজিতের একটু আপত্তি সত্ত্বেও কলিগরা আপিস ছুটির পর একটা ছোট্ট পার্টির আয়োজন করে কনফারেন্স রুমে। অরিজিতের খুব একটা সায় ছিল না কিন্তু এড়াতে পারেনি। বাড়িতে বেশ কিছু অতিথি আসবে। মনটা বাড়িতেই পড়ে আছে। সুপর্ণাকে পদোন্নতির ভালো খবরটা ফোনে জানিয়ে বলে—যথাসাধ্য তাড়াতাড়ি চলে আসবে, প্রথম দিকটা সুপর্ণা যেন সামলে নেয়। এত একটা ভালো খবরের জন্য পার্টি তাই সুপর্ণা আর বাধা দিতে পারে না। কিন্তু সবটা কীভাবে সামলাবে সেই নিয়ে একটু চিন্তায় থাকে।

ছেলের জন্মদিনের পার্টিতে অনেকেই আসবে তাই সেদিন অফিস পার্টিতে মদ স্পর্শ করে না অরিজিৎ। ফিরতে সময় লাগবে প্রায় ঘণ্টাখানেক। কলিগদের বাধা দেওয়া সত্ত্বেও সোয়া আটটায় বেরিয়ে পড়ে আপিস থেকে।

ছ’বছর বাদে আবার সেই আগের দুর্ঘটনার জায়গায় গাড়িটা দাঁড়িয়ে পড়ে ট্রাফিকের লাল আলোর কারণে। এই জায়গাটা পেরোনোর সময় প্রতিদিন মনে একটা খচখচানি হয় অরিজিতের কিন্তু পাত্তা দিতে চায় না। নিজেই নিজের মনকে বলে—ওসব আজ অতীত।

গাড়ির দরজায় লক থাকা সত্ত্বেও একটা লোক অনায়াসে হাতল ঘুরিয়ে দরজা খুলে পাশে বসে পড়ে। ততক্ষণে সবুজ আলো জ্বলে উঠেছে। গাড়ি এগোতে থাকে। পাশে তাকাতেই অরিজিৎ দেখে মনোজ বসে। মনোজের চাহনিটা কেমন পাথরের মতো। ঠান্ডা গলায় মনোজ প্রশ্ন করে, আমার বাপ তোমাকে বেটা বলে, তাহলে কেন এমন বেইমানি করলে সাহেব? বাতানুকূল গাড়িতে ততক্ষণে অরিজিৎ ঘামতে শুরু করেছে, হাত কাঁপছে, গাড়ি টালমাটাল। তার মধ্যে গাড়ি চালাতে চালাতে চেষ্টা করে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করার। এদিকে কথা চালাতে থাকে মনোজের সঙ্গে—কবে ছাড়া পেলে মনোজ ভাই? চেষ্টা করছি এই মাসেই আমার অফিসে তোমার একটা ড্রাইভারের চাকরির ব্যবস্থা করার। কান্না মাখা গলায় আরও বলে, আমি একদিন তোমাদের বাড়ি যাব মুকেশচাচার কাছে ক্ষমা চাইতে আর তোমাদের সব বকেয়া পাওনা আমি সেদিন মিটিয়ে দেব, খালি আজ আমাকে ছেড়ে দাও, আমার ছেলের আজ জন্মদিন।

পুলিশ এসে দেখে গাড়ি সজোরে ধাক্কা মেরেছে ব্রিজের একটা পিলারে। গাড়ি প্রায় তালগোল পাকিয়ে গেছে। বৈদ্যুতিন করাত দিয়ে গাড়ি কেটে বডি বার করতে হয়েছে যদিও মুঠোফোনটা প্রায় অক্ষত অবস্থায় পড়েছিল পায়ের কাছে। কোনওরকমে ফাঁক গলে একটা খাঁজে জায়গা করে নিয়েছিল।

পুলিশি জেরাতে কলিগরা জোর দিয়ে অস্বীকার করলেও ময়নাতদন্তের বিবরণে পরিষ্কার করে লেখা—মৃত্যুর সময় অতিমাত্রায় মদ্যপ ছিল অরিজিৎ। আর কাঁপা হাতে পুলিশকে ফোন করতে গিয়ে মনে হয় কোনওভাবে রেকর্ডিংটা চালু হয়ে গিয়েছিল তাই পুলিশের হাতে আসে অরিজিৎ আর মনোজের কথোপকথন।

পুলিশ তখনি খোঁজখবর শুরু করে আর বেরিয়ে আসে এক ভয়াবহ তথ্য। দুর্ঘটনার দিন সকালে মনোজ জেলের মধ্যে আত্মহত্যা করেছে গলায় ফাঁস লাগিয়ে। পুলিশ বিভাগ স্তম্ভিত হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে কোনও যুক্তি, পাল্টা যুক্তি কাজ করে না। সব কিছু যুক্তিতর্কের ওপরে। পুলিশ খোঁজ নিয়ে জানতে পারে মনোজের ছেলেটা জন্মানোর বছরখানেক পরে পরেই মারা গেছে আর মনোজের বউ সেই যে বাপের ঘর গেছে আর ফেরেনি বা কোনও যোগাযোগ রাখেনি। মনোজের মা ছেলের শোকে মারা গেলেও বাপটা এখনও ছেলের আশায় বেঁচে আছে বস্তির ঘর আগলে। জেল থেকে ছেলে মারা যাবার খবর দিতে গিয়েছিল কিন্তু সে বুড়ো এখন খ্যাপাটে হয়ে গেছে। সারাদিন বিড়বিড় করে আর বলে আমার দোষেই সব হয়েছে। এখন আর কোনও বোধ কাজ করে না। বস্তির অন্য পড়শিরা পুলিশকে বলেছে বুড়ো এখন মরে গেলেই ভালো, বুড়োর কষ্ট আর চোখে দেখা যায় না।

সব শুনে সুপর্ণা কান্না গিলে ভাবছে ছেলে বড় হলে তাকে তার বাবার কী পরিচয় দেবে?

এমন মারাত্মক প্রতিশোধের কথা ভাবলেই কেমন হাড়হিম হয়ে যায়, শিউরে ওঠে বুকের ভেতরটা।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%