চুল্লি থেকে মুঠো ফোনে

দেবযানী বসু কুমার

আমার অতি পরিচিত একজন মানুষ লাহিড়ীদা ছিলেন পঁয়ষট্টি বছর বয়সেও চির যুবা, চির নবীন, চির সবুজ। চলনে-বলনে হাবে-ভাবে কথা-বার্তায় বেশ একটা হিরো হিরো ভাব ফুটে উঠত। এ হেন লাহিড়ীদা বছর কয়েক আগে দুর্গা পুজোর ষষ্ঠীর দিন ভোর রাত্রে দুম করে দাঁড়ি হয়ে গেলেন এই নবীন বয়সে। নায়কোচিত হাবভাবের জন্য জনপ্রিয় ছিলেন এলাকা জুড়ে। তাই সবার বেশ মন খারাপ। পুজো মণ্ডপে শুধু ওনাকে নিয়েই চর্চা চলছে। কেউ বলছে দিলদরিয়া ছিলেন, কেউ বলছে আড্ডাবাজ, কেউ বলছে রসিক আবার কেউ বলছে রমণীমোহন। তাই মহিলা মহলে যেন একটু বেশি শোকের ছায়া। কিন্তু মারা গিয়ে উনি আরও বড় নায়ক হয়ে গেলেন। সেই গল্পেই আসছি।

দক্ষিণ কলকাতা অঞ্চলে ওনার পৈতৃক বিশাল বাড়ি। সে বাড়িতেই আমৃত্যু বসবাস। শুধু অল্প বয়সেই না, মৃত্যুকালেও ছিলেন সুপুরুষ, কিঞ্চিৎ চামড়ায় ঢেউ খেলতে শুরু করেছিল বয়সোচিত কারণে। চুলে তো নিশ্চিত রুপোলি রেখা ধরেছিল কিন্তু কেউ কোনওদিন একটাও দেখতে পায়নি কারণ সর্বদা কলপের কল্যাণে চুল ছিল চিকন কালো। শেষ দিন অবধি বেশভূষায় ছিলেন খুব নিখুঁত। ভালোবাসতেন নিজেকে সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখতে। কৈশোর থেকে শেষযাত্রা অবধি রমণী পরিবেষ্টিত থাকতে পছন্দ করতেন। ঘন ঘন প্রেমে পড়তেন। উল্টোটাও ঘটত। মেয়েরাও ওনার প্রেমে হাবুডুবু খেত। কিন্তু ওনার দুর্ভাগ্য, শেষ পর্যন্ত উনি কোনও একজনকে বেছে উঠতে পারেননি। তাই এই জীবনে আর বিয়েটাও করা হয়নি।

একে একে দাদা দিদি বোনেদের বিয়ে পর্ব চুকলে, মাতৃ বিয়োগের পর থাকতেন দাদাদের সংসারে। অন্যভাবে বলা যায়, ওনার সংসারে সবাই থাকত। আরও পরবর্তী কালে ভাইপো ভাইপো-বউমারা ছিল ওনার প্রাণ। তারাও কাকা বলতে অজ্ঞান। কাকার যত্নের এতটুকু ত্রুটি হতে দিত না।

লাহিড়ীদার নানারকমের ব্যবসা ছিল কিন্তু ঠিকটা কেউ জানত না। জিগ্যেস করলে কেমন হেঁয়ালিতে উত্তর দিতেন। তবে কানাঘুষোয় যতটা জানা যায় হোটেল, জামাকাপড়, চশমা, বইয়ের এরকম নানাবিধ ব্যবসার উনি ছিলেন আংশিক মালিক। যেমন ছিল অগাধ রোজগার তেমন ছিলেন দিলদরিয়া হাতখোলা স্বভাবের। দু’হাতে আয় করতেন, ওড়াতেনও দু’হাতে। অফেরত যোগ্য জেনেও ফুটপাতের হকারদের প্রয়োজনে টাকা ধার দিতেন।

পাড়ার যত বুড়ো-বুড়ি থেকে ছোড়া-ছুঁড়িদের সঙ্গে ছিল ওনার দোস্তি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সবার সঙ্গে সময় কাটাতেন। সকাল থেকে মাঝরাত অবধি পাড়া বেড়াতেন। লাহিড়ীদা যেমন ছিলেন আমুদে তেমন আড্ডাপ্রিয়।

সেকার দেবীপক্ষ পড়ে গেছে, মণ্ডপের ঢাক বাজছে এমন সময় খবর এল লাহিড়ীদা আর নেই। ভোররাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। পুজোর মধ্যে এমন একটা নিদারুণ খবর তায় লাহিড়ীদার মতো আমুদে মিশুকে মানুষ—পাড়াসুদ্ধ সবার মন খারাপ। একটু বেলা বাড়তে জানা গেল রাত চারটের সময় বুকে ব্যথা শুরু হয়। কাকার জন্য ঘুমের মধ্যেও ভাইপোরা খুব সতর্ক থাকে। তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিল কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ডাক্তার এসে বলেছিলেন অবস্থা ভালো নয় কিন্তু হাসপাতাল নিয়ে যাবার সময়টুকু পাওয়া যায়নি। বাড়িতেই সব শেষ।

নিয়মমাফিক সব কাগজপত্র পাওয়ার পর দুপুর একটা নাগাদ দাহকার্য শেষ হয়। এদিকে পাড়ার তিনজন অল্পবয়সি বউ সন্তোষী, ছায়া আর কৃষ্ণা চোখ বড় বড় করে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে হাজির। গলা দিয়ে তখন ওদের স্বর বেরোচ্ছে না। এক নিশ্বাসে কয়েক গেলাস জল খেয়ে জানায় ওরা জানত না লাহিড়ীদা মারা গেছেন। দশটা নাগাদ সে বছরের মতো শেষ পুজোর কেনাকাটা করতে বেরিয়েছিল তিনজনে একসঙ্গে। বারোটা নাগাদ সন্তোষীর ফোনে লাহিড়ীদা ফোন করে জানান মমতা শাড়ির দোকানে ওদের জন্য শাড়ি রাখা আছে। আর সবাই নিয়ে গেছে কিন্তু ওদেরটা দেওয়া হয়নি। ওরা যেন তাড়াতাড়ি নিয়ে নেয়। আরও জানান লাহিড়ীদা যে, ওনার শরীরটা ভালো নয়।

ওরা খুশির চোটে আর বাড়ি ফেরেনি। একেবারে দোকানে গিয়ে শাড়ি নিয়ে পাড়ায় যখন ঢুকছে তখন দেখে শ্মশানযাত্রীরাও ঢুকছে। তখনি ওরা জানতে পারে সব কথা। আসলে হয়েছে কী, লাহিড়ীদা পাড়ার অল্পবয়সি মেয়ে বউদের পুজোয় শাড়ি দিতেন। কিন্তু ঢাক পিটিয়ে বলে বেড়াতেন না। এমনকী, বাড়িতেও কেউ জানত না।

একথা কৃষ্ণার মুখে শুনে তো সবার শরীর তখন কাঁপছে। ফোনের কথা শুনে সবাই তো সন্তোষীর ফোনের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। সত্যি তাই। লাহিড়ীদার ফোন থেকে ফোন এসেছে বারোটা নাগাদ। কোনও মিথ্যে নেই এর মধ্যে।

বড়রা শুনে বলেন এতে ভয়ের কিছু নেই, লাহিড়ীদা শাড়ি কিনে রেখেছিলেন। ওরা পাবে না ভেবে লাহিড়ীদার মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তাই মারা যাবার পরেও জানান দিলেন যে এবছরেও ওদের শাড়ি কেনা আছে। ওরা যেন নিতে ভুলে না যায়। বউ তিনটে তো কেঁদেকেটে একসা। শ্রাদ্ধের দিন তিনজনে ওনার দেওয়া শাড়ি পড়ে গিয়ে লাহিড়ীদার ছবিতে ফুল দিয়ে এসেছে।

কী অদ্ভুত না? অনাত্মীয়দের জন্য ওনার আত্মা পৃথিবীর মায়া কাটাতে পারছে না। পরপারে গিয়েও উনি দ্বিধাগ্রস্ত—আহা রে, মেয়েগুলো যদি শাড়ি না পায়! কিনে রাখা তো আছে কিন্তু ওরা তো জানে না।

কথায় আছে স্বভাব যায় না মলে। চুল্লিতে উঠেও হিরোগিরি করে গেলেন লাহিড়ীদা।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%