দেবযানী বসু কুমার

শ্রুতিলেখা মুল্লাপুডি জনস্বাস্থ্যে স্নাতকোত্তর হবার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপিকার চাকরি পেয়ে আপাতত মা-বাবার নিশ্চিন্ত আশ্রয় ছেড়ে ভাইজাগে একদম সমুদ্রের ধারে এক বহুতলের চোদ্দ তলায় একটা দু’কামরার ফ্ল্যাটে একলাই থাকে। অন্য দিনের মতো ফিরে এক কাপ কফি নিয়ে বারান্দায় বসে সমুদ্র দেখছিল। দিনটা ছিল বৃষ্টি ভেজা। সকাল থেকে অঝোর বৃষ্টিধারা ধূসর করে রেখেছে শহরটাকে। তাই সমুদ্র খুব উত্তাল, খুব চঞ্চল।
চোখ বন্ধ করে আরাম কেদারায় বসে থাকতে থাকতে কাছাকাছি কোথাও বিরাট একটা বজ্রপাতের আওয়াজ। আর বিদ্যুৎ রেখাটা মনে হল আকাশ ভেদ করে ওর কপালের মধ্যে মিশে গেল। কয়েক মুহূর্ত হুঁশ ছিল না। কোনও রকমে দরজা ধরে টলতে টলতে এসে শুয়ে পড়েছিল। আর তারপরেই ওর কত কথা মনে পড়তে লাগল। যার সঙ্গে ওর জীবনের কোনও মিল নেই। ও যেন অন্য কেউ। কিছুতেই কিছু মেলাতে পারছিল না।
আগেও এরকম অনেক বার হয়েছে। প্রথম হয় যখন ও বারো ক্লাসে পড়ে। বন্ধুদের সঙ্গে কলেজ কেটে রভি টকিজে একটা দক্ষিণী সিনেমা দেখতে গিয়েছিল। নায়িকাকে দেখে মনে হয়েছিল খুব চেনা। শুরু হয়েছিল কপাল যন্ত্রণা। তারপর থেকে ওই নায়িকার সিনেমা দেখলেই মনে হত ভীষণ চেনা। তারপরেই শুরু হত কপালের ভ্রু সন্ধিতে অসহ্য যন্ত্রণা। আবার দেখত ওই নায়িকার সিনেমা দেখালেই মা টেলিভিশনটা বন্ধ করে দিতেন। এর কারণ জিগ্যেস করলেই উত্তর না দিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতেন। শ্রুতিলেখাকে নেশার মতো টানত ওই নায়িকার সিনেমা। শুরু হল লুকিয়ে চুরিয়ে সিনেমা দেখা।
গুগল ঘেঁটে শ্রুতি জানতে পারে, ওই নায়িকার নাম ছিল চণ্ডীপ্রভা ভেঙ্কটেসরলু। ভুবনেশ্বরে এক তামিল পরিবারে জন্ম। সতেরো বছর বয়সে বাবার অবাধ্য হয়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যায় চিত্রাভিনেত্রী হবার বাসনায়। অপূর্ব সুন্দরী ছিলেন। ভরতনাট্যম নাচে ছিল বেশ ভালো রকমের দক্ষতা। এক অনুষ্ঠানে ওনার ধ্রুপদী নৃত্য পরিবেশনা দেখে মুগ্ধ হয়ে যান এক দক্ষিণী চলচিত্র প্রযোজক। অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু চণ্ডীপ্রভা দেবীর পরিবার ছিল অত্যন্ত রক্ষণশীল হিন্দু পরিবার। বাবার অমতকে অগ্রাহ্য করে বেরিয়ে যান সেই মুসলমান প্রযোজকের সঙ্গে। বাবা ত্যাজ্য কন্যা করেন। বিয়ে না করেই ওনার সঙ্গে থাকতেন কারণ সেই প্রযোজক ছিলেন বিবাহিত। তিন সন্তানের পিতা। চেণ্ডীবীর থেকে অন্তত কুড়ি বছরের বড় বয়সে।
পর পর তিনটে ছবি বাজার পেলো না। তারপরের একটা ছবিতে খলনায়িকার চরিত্রে অভিনয় করে কিছু খ্যাতি এলেও বসে গেলেন। কাজ পাচ্ছিলেন না। ততদিনে সেই প্রযোজকের মোহভঙ্গ হয়েছে। কাজ পাবার আশায় ঘুরতে লাগলেন দরজায় দরজায়। কাজ দেবার নাম করে সবাই শয্যাসঙ্গী করতে চায়। ততদিনে বাবার বাড়ির দরজা চিরতরে বন্ধ। ইতিমধ্যে আরও দু’তিনটে ছবিতে ছোটখাটো কাজ করেছেন। নায়িকা হবার লোভে তখন একের পর এক প্রযোজক বা পরিচালকের হাত বদল হচ্ছিলেন। সবাই কাজ দেবার অছিলায় রতিসুখ চায়। প্রায় প্রতিরাতে শয্যা বদল।
বাইশ বছর বয়সে কালান্তক মরণ ব্যাধি কামড় বসল দেহে। এইডস হল। কোথাও জায়গা পেলেন না। বিষাক্ত দেহের ঠাঁই হল রাস্তায়। কোনও ওষুধ নেই, চিকিৎসা নেই। রোগ বাড়তে লাগল। স্টেশনের পাশে বসে ভিক্ষা করতেন। যা জুটত। তিন বছর পর মারা গেলে চলচ্চিত্রের পরিচিতরা দেহ পাঠিয়ে দিল ভুবনেশ্বরে চণ্ডীদেবীর বাবার কল্পনা টকিজের বাড়িতে। সঙ্গে এসেছিল একটা ডায়েরি। যতই হোক সন্তান বলে কথা। মুখ ফিরিয়ে নিতে পারলেন না। অন্তিম সৎকারের ব্যবস্থা করলেন।
শ্রুতি সবটা গুগল ঘেঁটে জানতে পারেনি। মা’কে যখন শ্রুতি বাজ পড়ার কথাটা বলে বলেছিল নায়িকা চণ্ডীপ্রভাকে ওর ভীষণ চেনা মনে হয়, তাছাড়া ওর অনেক ঘটনা মনে পড়েছে বিদ্যুৎ চমকাবার পর থেকে, তখন শ্রুতির মা অনেকটা বলেছেন। বাকিটা জানতে পেরেছে সেই পুরোনো ডায়েরি থেকে যেটা গৌরীদেবী তুলে রেখেছিলেন যত্ন করে।
শ্রুতির মায়েরা দুই বোন। বড় চণ্ডীপ্রভা আর সাত বছরের ছোট গৌরী প্রভা। থাকত ভুবনেশ্বরে লুইস রোডে হাউসিং বোর্ড কলোনিতে। বড় মেয়ে গৃহত্যাগ করলে প্রতিবেশীদের টিকাটিপ্পুনি, সহানুভূতি, অহেতুক কৌতূহল সহ্যের সীমা ছাড়ালো। কল্পনা টকিজের কাছে একটা আবাসনে বাড়ি কিনে চলে গেলেন।
বাড়িতে চণ্ডীপ্রভার নাম উচ্চারণ বারণ ছিল। কিন্তু অন্তরে সন্তান স্নেহ ফল্গুধারার মতো বইত। বাড়ির দোতলাটা বড় মেয়ে চণ্ডীপ্রভার নামে রাখলেন। যদি কোনওদিন বৃদ্ধ বয়সে ফিরে আসে তাহলে থাকবে। কিন্তু পাঁচ বছরের মধ্যেই মেয়ের মৃতদেহ বাড়ি এল। বড় মেয়ের মৃত্যুতে ওদের বাবা মা অর্থাৎ শ্রুতির দাদু দিদা খুব ভেঙে পড়েছিলেন।
গৌরীপ্রভা ছিল খুব মেধাবী। নিজের লেখাপড়ার শেষে বাণীবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন। বিয়ে হয়েছিল বাণীবিহারেই। বাবা মায়ের বৃদ্ধ বয়সে স্বামী কন্যা নিয়ে পিতৃগৃহ কল্পনা টকিজের আবাসনে পাকাপাকি ভাবে চলে আসেন। তখন শ্রুতি ছোট। কিন্তু শ্রুতির জন্মের আগে অদ্ভুত ভাবে সবাই স্বপ্নেতে দেখেছিল চণ্ডীপ্রভা আবার আসছে। আর শ্রুতিকে নাকি অবিকল মাসির মতো দেখতে।
তখন ব্যাপারটা অনেকটা জলের মতো পরিষ্কার নিজের কাছে। মনের মধ্যে অদ্ভুত ধারণা হয়, আগের জন্মে ওই ছিল চলচ্চিত্র নায়িকা চণ্ডীপ্রভা। আগের জন্ম নয়, আসলে চণ্ডীপ্রভার আত্মা শ্রুতির ওপর ভর করেছে শোধ নেবার জন্য।
প্রতিহিংসার আগুন ধিকি ধিকি জ্বলে ওঠে বুকের মধ্যে। প্রতিশোধ নিতে হবে, নিতেই হবে। যারা ওর মাসির যৌবন নিয়ে ছেলেখেলা করেছিল, তাদের ও নিজেই চরম শাস্তি দেবে। যারা মিথ্যে প্রতিশ্রুতি, মিথ্যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তাদের ধ্বংস যতদিন না দেখছে ততদিন ও থামবে না। নিজের কাছেই নিজে প্রতিশ্রুতি দেয় শ্রুতি। ততদিনে আবার ফিরে গেছে কর্মস্থল ভাইজাগে। খালি বাবা-মাকে এসব জানানো যাবে না। ওনারা ভয় পেয়ে যাবেন।
শুরু করে জাল বিস্তার করা। নিজের নাম পাল্টে হয়—বেবি রাও। কর্মক্ষেত্রে লিখিত আবেদন করে মাদ্রাজে ট্রান্সফার নেয়। তারপর কখনো মাদ্রাজ, কখনো মুম্বাই আবার কখনো হায়দ্রাবাদ। যারা ওর দুর্দশার জন্য দায়ী ছিল, একে একে সেই সব পরিচালক ও প্রযোজকের নাম বের করে ডায়েরি থেকে। যদিও ততদিনে শ্রুতির গত জন্মের কথা সবটাই মনে পড়ে গেছে। কিন্তু মনে মনে ঠিক করে শাস্তি দেবে ওদের সন্তানদের। কারণ ওদের জীবন শুরু হচ্ছে। সেই সব পরিচালক বা প্রযোজকরা আজ হয় বৃদ্ধ অথবা প্রৌঢ় অথবা কেউ মৃত। তাদের জীবন শেষের পথে। তাদের আর শাস্তি দিয়ে কি লাভ? শ্রুতির লক্ষ্য তাই পরের বা তার পরের প্রজন্ম।
ঠিক সূত্র বার করে মিশতে থাকে রঙিন জগতে। অপিসের পর নিজের ভোল বদল করে প্রায় প্রতিদিন যায় নানান পার্টিতে। ধীর গতিতে এগোতে থাকে। পুরুষ রমণী নির্বিশেষে বন্ধু সেজে মদের সঙ্গে ওষুধ মিশিয়ে তাদের বেহুঁশ করে আধা বিবস্ত্র বা পুরো বিবস্ত্র অবস্থায় ছবি তুলে রাখে। পাঠিয়ে দেয় তাদের কর্মক্ষেত্রে, পাঠিয়ে দেয় তাদের বাবা-মায়ের কাছে। পাঠিয়ে দেয় সেসব ছবি পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছে। শোরগোল শুরু হয়। ছিছিক্কারে তখন কান পাতা দায়। মেয়ে বন্ধুদের নেশায় চুর করে ঠেলে দেয় আগে থেকে ঠিক করে রাখা অচেনা পুরুষদের সঙ্গে হোটেলের ঘরে। পরদিন কারও কিছুই মনে পড়ে না। আর সেই পুরুষরা মজা লুটে হারিয়ে যায় জনতার ভিড়ে। তারা সব টাকা খেয়ে কাজ করছে। বেশ কিছুদিন পরে ধরা পড়ে কেউ অন্তঃসত্ত্বা কেউ বা এইডসে আবার কেউবা বিষাক্ত রোগে আক্রান্ত। হারিয়ে যায় জীবনের আনন্দ। বেঁচে থাকা তখন অর্থহীন হয়ে পড়ে। সংসারগুলোতে আগুন জ্বলতে থাকে।
পুরুষদের ক্ষেত্রেও তাই। নেশায় বুঁদ করে ঢুকিয়ে দেয় সিফিলিস ক্ল্যামিডিয়া অথবা গনোরিয়া আক্রান্ত গণিকাদের ঘরে। পরিচয় করিয়ে দেয় নিজের বান্ধবী বলে। শরীর ভরে ওঠে পুঁজ রক্তে। পুরুষাঙ্গ গলে গলে পড়ে। এর জন্য ভেক ধরে দীর্ঘদিন ঘোরা ফেরা করতে হয় বেশ্যাপল্লীতে। নিতে হয় মিথ্যার আশ্রয় ওদের মনে আস্থা আনতে। হরদম ভেক বদলও করতে হয়। যে সব পরিচালক বা প্রযোজকের সন্তান রঙিন দুনিয়া থেকে দূরে, তাদের সঙ্গে কাজের নাম করে বন্ধুত্ব তারপর সম্পর্কে উষ্ণতা আনতে ছলা কলার আশ্রয় নিতে হয় অবশ্যই ছদ্মবেশে। তারপর পতঙ্গের মতো সেইসব পুরুষকে টেনে নিয়ে যায় নরকের দরজায়। নিজে ধরা দেয় না।
সময় কাটিয়ে মদের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে নিজে উদোম হয়ে তুলে নেয় অজস্ৰ ছবি। বলাই বাহুল্য নিজের মুখটা রাখে আড়ালে। তারপর সেসব ছবি পাঠিয়ে দেয় তাদের স্ত্রীদের কাছে। তাদের সন্তানদের স্কুল কলেজে। বড় বড় পোস্টার করে রাতারাতি সাঁটিয়ে দেয় শহরের আনাচে-কানাচে। সংসার ভেঙে তছনছ। কেউ আত্মহত্যা করে, কেউ ততদিনে উন্মাদ, সন্তানদের চোখে উপচে পড়া ঘৃণা, পাড়া প্রতিবেশী বন্ধুবান্ধবদের ছিছিক্কার সমাজে একঘরে হয়ে পড়ে তারা কিন্তু কেউ শ্রুতির টিকি ছুঁতে পারে না।
এত কাণ্ডের পর শুরু হয় শহর জুড়ে তোলপাড়। পুলিশের টনক নড়ে। নড়েচড়ে বসে প্রশাসন ও পুলিশের ওপর মহল। কিন্তু ততদিনে শ্রুতির সব কাজ হাসিল। কেউ ওর টিকিও ছুঁতে পারে না। সব যোগাযোগের সূত্রগুলো নষ্ট করে দিয়ে কিছুদিনের জন্য ভুবনেশ্বরে ছুটি কাটাতে যায় বাবা-মায়ের কাছে। ওখান থেকেই বদলির দরখাস্ত পাঠায়। পাঁচ বছর হয়ে গেছে। সহজেই মঞ্জুর হয় বদলির আবেদন। নতুন কর্মস্থল পণ্ডিচেরী।
কিন্তু অদ্ভুত লাগে শ্রুতির আগের স্মৃতি ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যাচ্ছে মন থেকে। তেমন করে আর কিছুই প্রায় মনে পড়ে না। মনে করালেও ওর কিছু মনে পড়তে চায় না। উল্টে মাথার ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি হয়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন