কালাহীরা

দেবযানী বসু কুমার

কালাহীরা কয়লাখনি ধানবাদ এলাকায়। বেশ পুরোনো খনি। এক সময় চাপ চাপ বেশ ভালো জাতের কয়লা ছিল। আজ অনেকটাই হালকা। যেহেতু পুরোনো তাই আধুনিকীকরণ হয়নি বিশেষ। মালিকের দাদুর আমলের খনি। মাঝে-মাঝেই ধস নামে। দুর্ঘটনা ঘটে। যেহেতু ব্যক্তিগত মালিকানা তাই নতুন কোনও ব্যবস্থা নেবার গা নেই মালিকের। মরলে শ্রমিক মরবে। মালিকের আরও কয়েকটা এরকম খাদান আছে। এটাই সবচেয়ে পুরোনো। এ গল্প আজ থেকে প্রায় ষাট বছর আগের। তখন কয়লাখনি সরকারের হাতে যায়নি।

আমি দিন সাতেকের জন্য বেড়াতে গিয়েছিলাম আসানসোল। ওখানকার পুলিশ অফিসার ছিলেন আমার জামাইবাবু দোর্দণ্ডপ্রতাপ শ্যামল কুন্ডু। এক-একদিন এক-একজায়গায় বেড়াতে যেতাম। কোনওদিন কল্যাণেশ্বরী, কোনওদিন তোপচাঁচি। ওই সময় একদিন শ্যামলদা যেতে পারেননি, আমি আমার দিদির সঙ্গে গিয়েছিলাম কোলিয়ারী দেখতে। এত বৃষ্টি যে সে রাতে ফিরতে পারিনি। আমি আর মিনুদিদি থেকে গিয়েছিলাম। রাতে খাওয়াদাওয়ার শেষে বাংলোতে কেয়ারটেকারের মেয়ে রুমকির কাছে শোনা এ গল্প। সত্যি মিথ্যে বলতে পারব না। কারণ, পরদিন আবার আর্দালির কাছে অন্য রকম শুনেছিলাম। সে বলল ওসব আত্মার উপদ্রব কিছু নেই। মাফিয়া রাজ চলছে। কোনও রাখঢাক নেই। একবারে দিনেদুপুরে। পুলিশ ওদের ভয় পায়। তাই কাউকে কিছু বলে না।

নানান গুজব রটিয়ে কালাহীরা কয়লা খাদান আর কালাহীরা কয়লা কুঠি ওরা বন্ধ করে দিয়েছে। রাতের অন্ধকারে ওই খাদান থেকে দিনের পর দিন কয়লা পাচার হচ্ছে। আর কয়লা কুঠির বন্ধ দরজার ওপারে চলে টাকা লেনদেন আর মদ মেয়েছেলে নিয়ে আসর। মতের অমিল হলেই দু’একটা খুন হয়ে যায়।

রুমকি ওর বুঢ়ামা অর্থাৎ দিদার কাছে শুনেছে এই গল্প। রুমকি তখন জন্মায়নি যখন এই ঘটনা ঘটেছিল। রুমকির দিদারা দুই বোন। ওরা আদিবাসী। রুমকির বুঢ়ামায়ের নাম শতাব্দী আর তার বোনের নাম ছিল সহস্রা দলপতি। মায়ের দাদু দুরাল দলপতি কাজ করত কয়লা খাদানে। গাঁইতি দিয়ে কয়লা কাটার কাজ। দুর্ঘটনা ছিল রোজকার ঘটনা। কিন্তু মালিকের কোনও হেলদোল ছিল না। খনির মালিকের কুলজর ছিল বুঢ়ামাসির উপর। অনেকবার কালাহীরা কয়লা কুঠিতে ডেকেছে। পরবে, মেলাতে শাড়ি কিনে দিতে চেয়েছে, গয়না দিতে চেয়েছে, সাজের জিনিস দিতে চেয়েছে। তার বদলে রাতে মালিকের সঙ্গে শুতে হবে। মালিক মাঝে মাঝে কুলকাতা থেকে এসে কালাহীরা কয়লা কুঠিতে থাকত। বুঢ়ামাসি ছিল অন্যরকম। মালিককে পাত্তাই দিত না। বুঢ়ামাসির মনে কুনো ভয়ডর ছিল না। দাদু কালাহীরা কয়লাখনিতে কাম করত। দাদু বুঝত মালিকের লজর ভালো না। তাই বুঢ়ামাসিকে খুব আগলে আগলে রাখত। যেদিন খাদানে দুর্ঘটনাটা ঘটে তার একমাস পরে পাশের গ্রামের এক আদিবাসী ছিলার সঙ্গে বুঢ়ামাসির বিয়া হবার কথা।

বুঢ়ামাসি ছিল পুরোম সুন্দরী। লম্বা, আঁটো সাটো পিটানো চেহারা। কুচকুচে কালো গায়ের রং। কিন্তু চামড়া একদম চকচক করত। সব সময় মনে হত তেল মেখে রয়েছে। বড় বড় কালো চোখ, পুরু ঠোঁট, হাঁটু ছোয়ানো কালো কুচকুচে লম্বা চুল। হাসলেই টোল খেত গালে। খুব সাজুনি ছিল বুঢ়ামাসিটা। খুব চনমনে চুলবুলে ছিল বুঢ়ামাসি। সবটা বুঢ়ামায়ের কাছেই শোনা।

আমার মায়ের দিদা একজন কোলিয়ারির বাবুর সঙ্গে চলে গিয়েছিল যখন মেয়েরা ছোট। মায়ের দাদুই মেয়েদের বড় করেছে। তাই মায়ের দাদু শহরের বাবুদের ঘেন্না করত। সারাদিন ভূতের মতো খাটত আর রাত হলেই হাঁড়িয়া, চোলাই, তাড়ি খেত। কিন্তু মেয়েদের খুব ভালো বাসত। বড় মেয়ের ভালোই বিয়ে দিয়েছিল। জামাই তখন কাজ করত বিহারের এক কয়লা খাদানে। ছিলা হবার সময় বুঢ়ামায়ের শরীল খুব খারাপ হয়েছিল। ছিলাটাও হবার দুদিন বাদে মরে গেল। বুঢ়ামায়ের শরীল আর ভালো হল না। সব সময় শুয়ে থাকে। তখন বুঢ়ামায়ের বর কেয়ারটেকারের কাজ নিয়ে ইখানে চলে এল।

যেদিন দুর্ঘটনাটা ঘটেছিল সে দিন কোলিয়ারির মালিক ইখানে ছিল। ধস নামল খাদানে। জলে ভেসে গেল। লোক লাগিয়ে মালিক সবাইকে বার করল কিন্তুক বলেছিল মায়ের দাদুকে নাকি খুঁজে পাওয়া যায়নি। অন্য কুলিরা বলেছিল মিথ্যা কুথা। বুঢ়া উদের সঙ্গেই ছিল। দুদিন পরে বুঢ়ার পচা বডি পাওয়া গেল।

তারপর আমার মায়ের দিদা আর ওর বুন দু’দিন আপিসে গেছিল কিন্তুক বুঢ়ার বকেয়া টাকা দিল না মালিকবাবু। জামাই তখন বিহারে। একদিন মালিক বুলল রাতে যেতে, টাকা দিবেক। বুঢ়ামা অনেক মানা করেছিল। কিন্তুক বুন শুনল না। বলেছিল অনেকগুলো টাকা, ছাড়া যাবেক না। সামনে বিয়া। অনেক টাকা লাগবে। কিন্তু তারপর বুঢ়ামাসিকে আর কেউ কুনোদিন দেখেনি। মালিককে জিগেস্য করতে বুলেছিল—তুমার বোন তো টাকা নিয়ে কাল রাত দশটার সময় ঘর চলে গেছে।

এর বছর পর মালিকবাবুর ছিলা এল বিদেশ থেকে কয়লা নিয়ে লিখাপড়া করে। সবাই বুলেছিল নাকি ইবার ওই মালিক হবে। খুব সোন্দর দিখতে ছিল সে ছিলে। খাদান দেখতে গেল বাপের সঙ্গে। দেখানো হয়ে গেলে বাপটা আপিসে এসে বসল জিরোতে আর ছেলে তখন খাদান দেখছিল। হঠাৎ খুব জোর আওয়াজ আর লোকেদের চিৎকার হই-হই। ধস নেমেছে আবার। ছিলাটাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি তারপর। যেন উপে গেল। একমাত্র ছিলা ছিল। মালিকবাবুটা পাগল হয়ে গেল ছিলার শোকে।

তারপর থেকে খাদান বন্ধ হয়ে গেল। আর কুঠি অনেকদিন বন্ধ পড়েছিল। দু’একবার কুলকাতা থেকে চাবি নিয়ে লোকে ঘুরতে এসেছিল। কিন্তু পুরো রাত ওখানে থাকতে পারেনি। সারারাত কান্নার আওয়াজ, চুড়ির আওয়াজ, ধস্তাধস্তির আওয়াজ, শোবার ঘরে, বসার ঘরে মদের গন্ধ। রাত শেষ হবার আগেই সবাই বেরিয়ে আসে ওই বাংলো থেকে। তারপর আর কেউ আসেনি। তালাবন্ধ পড়েই আছে কবে থিকে কেউ জানে না। আমার দাদু কেয়ারটেকার ছিল। আবার আমার বাপটাও কেয়ারটেকার। আর বুঢ়া মায়ের বাপের দেশ তো ইটাই। তাই আমাদের পরিবার অনেকদিন ধরেই ইখানে আছে। অনেক কুথা আমরা জানি।

গল্পটা পড়তে একটু অসুবিধে হতে পারে কারণ লেখাটার মধ্যে মিশ্র ডায়ালেক্ট আছে। কিন্তু আমি রুমকির মুখে যেমন শুনেছি তেমন লিখে দিয়েছি। যদিও জানি না একে গল্প বলা যায় কিনা। রুমকির কথা শুনে মনে হয়েছিল কিছুটা হলেও সত্যি। কতটা অশরীরী আর কতটা মাফিয়া রাজত্ব তা বলতে পারব না। ফেরার আগে রুমকির সঙ্গে বাংলোর সামনে গিয়েছিলাম। হয়তো কিছু না। কিন্তু কেমন একটা গা ছমছম করেছিল। বাংলোর বাগানটার হতশ্রী দশা। কিন্তু বাড়ির অবস্থা ততটাও খারাপ নয়। মিনুদিদি ভয় পেয়েছিল তাই আমরা বাগানে ঢুকিনি।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%