অভিশপ্ত দেবদেউল

দেবযানী বসু কুমার

আমি বেড়াতে ভালোবাসি। ঐতিহাসিক স্থান আমাকে দারুণ ভাবে আকর্ষণ করে। বিশেষত কারুকার্যখচিত পরিত্যক্ত পাথরের দেবদেউল, পুরোনো দেবমূর্তি, দেবপীঠের ধ্বংসাবশেষ, মন্দির গাত্রের ক্ষয়ে যাওয়া খোদাই করা ঘটনা।

আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বান্ধবী স্বর্ণালী ভাদুড়ী সপরিবারে থাকে মহীশূরে। ওর আমন্ত্রণে দিন কয়েকের জন্য গিয়েছিলাম ছুটি কাটাতে। স্বর্ণালীর পুত্রবধূ দক্ষিণী। চমৎকার মেয়ে। আয়ুর্বেদিক হাসপাতালের ডাক্তার। নাম অনুজা। ভাঙা ভাঙা বাংলা আর গড়গড়িয়ে ইংরিজি বলে। জানালো মহীশূর থেকে আড়াই তিন ঘণ্টার পথ পেরিয়ে একটা পরিত্যক্ত নটরাজের মন্দির আছে। সচরাচর কেউ যায় না। ঘুরে আসতে পারেন। আমার ধারণা আপনার ভালো লাগবে।

এই মন্দিরে যাওয়া স্বর্ণালীর একদম মত নেই। ও সমানে নিরুৎসাহ করছে দেখে পরদিন সকালে একাই বেরিয়ে পড়লাম। কোনও গাড়ি যেতে রাজি না হওয়াতে বাসে করে রওনা দিলাম। কন্ডাক্টর জানালো একটা জায়গায় নামিয়ে দেবে, সেখান থেকে আমাকে মিনিট কুড়ি হাঁটতে হবে।

পৌঁছে শুধু মন্দির আর চারপাশের সবুজের সমারোহ দেখে আমি মোহিত হয়ে গেলাম। পরিবেশটার কেমন যেন একটা চৌম্বক শক্তি আছে। যদিও বাসস্ট্যান্ডে বেশ কিছু লোক আমাকে আসতে না করেছিল। কিন্তু অদেখা জায়গাটা আমাকে টানছিল এত নিষেধের বেড়াজাল দেখে। এসে বুঝলাম না এলে খুব ভুল করতাম।

মুগ্ধ হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। বিশাল কিছু না হলেও বড়সড় বেলে পাথরের তৈরি মন্দির। মন্দিরের অবস্থা ততটাও খারাপ নয়। তবে কারুকার্য ঝড় জল বৃষ্টিতে অনেকটা ক্ষয়ে গেছে। খালি মন্দিরের প্রাচীর আড়াই দিকে আছে। মন্দিরে কয়েকটা ভাগ—গর্ভ মন্দির, তার সামনে নাটমন্দির অথবা মণ্ডপম যেখানে প্রতি চতুর্দশীতে দেবদাসীরা নৃত্য গীত বাদ্য প্রদর্শন করত দেবতার সামনে। আশপাশে বসে থাকত দর্শকরা, এমনকী রাজরাজড়ারাও আসতেন।

মন্দির গাত্রে অসাধারণ খোদাইয়ের কাজ। বেশিরভাগ বিভিন্ন ভঙ্গিমায় নৃতরতা নারী, নাচের মুদ্রা, নানান পশুপাখি আর নারীপুরুষের শারীরিক সম্পর্কের মূর্তি উষ্ণ করে দর্শকের রক্ত। গর্ভ মন্দিরে বিশাল কালো গ্রানাইট পাথরের নটরাজ মূর্তি। দেখে যা বুঝলাম, এ মন্দিরে দেবতার পুজো হয় না বহুকাল। মন্দিরের এলাকা একেবারে পরিত্যক্ত। কিন্তু গতকাল অনুজার কাছে শুনেছিলাম এই জাগাটা ছিল দক্ষিণ ভারতের মন্দিরকেন্দ্রিক এক উপনগরী। একসময় এই জনপদ ছিল রীতিমতো বর্ধিষ্ণু। দুই ধরনের মানুষের বসবাস ছিল—অত্যন্ত গরিব নিচু জাতের, আর এক শ্রেণি ছিল উচ্চ বর্ণের ব্রাহ্মণ। মন্দিরের সমস্ত ক্ষমতা ছিল এদের করায়ত্তে। এমনকী স্থানীয় রাজারা এদের সমীহ করে চলত।

ভারি সুদর্শন এক দক্ষিণী যুবক সাদা ধুতি উল্টে পরে আর গায়ে সাদা উড়ুনি জড়িয়ে হঠাৎ কোথা থেকে উদয় হল। আমি ততক্ষণে একচক্কর দিয়ে ছায়াতে বসেই জিরোচ্ছি। প্রচুর কারুকার্য তাই দেখতে বেশ সময় লাগছে। তার সঙ্গে রোদের তেজ। তাই বেশ কাহিল লাগছিল। নড়বড়ে ইংরিজিতে বলল—অনেক্ষণ ধরে দেখছি আপনি একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। চলুন আপনাকে ঘুরে দেখাই। মন্দিরটা মাঝারি কিন্তু এর কারুকার্য অতুলনীয়। কেন যে সরকার অধিগ্রহণ করে না কে জানে! তাহলে রক্ষণাবেক্ষণ ভালো হবে আর পর্যটক বাড়বে। আমার একাকিত্ব কিছুটা কমবে। কথার মধ্যে বেশ কিছুটা ক্ষোভ মিশে আছে। কিন্তু আমি খেয়াল করলাম মন্দির চত্বর একেবারে ঝকঝকে আর মন্দির ঘিরে বড় বড় গাছ গাছালিতে স্নিগ্ধ সবুজায়নের প্রলেপ। বোধহয় আমার মনের কথা আন্দাজ করে যুবকটি জানাল—এ মন্দির আমার প্রাণ। নিজেই যথাসাধ্য দেখভালের চেষ্টা করি। মন্দির দেখাতে দেখাতে অনর্গল কথা বলছিল সে।

এ মন্দিরের দেবদাসীরা ছিল দক্ষ নৃত্য পটিয়সী। ছোট থেকে তাদের তালিম দেওয়া হত। অবাক লাগল দেখে নাটমন্দিরের পাথরের স্তম্ভগুলো আজও ঘোরে। আগে খেয়াল করিনি ছেলেটি দেখাল, মন্দির থেকে সামান্য দূরে সার-সার কয়েকটা পাথরের ঘর, অনেকটাই ভেঙেচুরে গেছে। শুনলাম দেবদাসীরা থাকত। তারা সংসার ছেড়ে একবার বেরিয়ে এলে আর পরিবারে ফিরতে পারত না। ঘরগুলোর নিচে দিয়ে সুড়ঙ্গ ছিল। সে পথেই দেবদাসীরা মন্দিরে যাতায়াত করত কারণ শুধু নাচ নয়, পুজো বাদে মন্দিরের যাবতীয় কাজের দায়িত্ব ছিল ওদের ওপর। যদিও সে পথ এখন চলা ফেরার অযোগ্য। সাপখোপের আড্ডা। মন্দির গাত্রে খোদিত চিত্রের বিভিন্ন কাহিনি বলার ভঙ্গিমায় প্রকাশ পাচ্ছিল ছোকরা বেশ রসেবশে। দেখা শেষে দুজনে বসলাম নাটমন্দিরে।

ছোকরা জানতে চাইল আমার হাতে সময় আছে কিনা। হ্যাঁ বলাতে শোনাল এই মন্দির সম্পর্কিত মর্মস্পর্শী হৃদয় বিদারক এক কাহিনি—

যুগ যুগ আগে ব্রাহ্মণরা নিম্ন বর্ণের নিম্নবিত্তের পরিবার থেকে রূপসী সুলক্ষণা কন্যা বাছাই করত নটরাজের দেবদাসী হবার জন্য। এতই প্রতাপশালী ছিল এই ব্রাহ্মণ শ্রেণি যে কারও না বলার ক্ষমতা ছিল না। তাহলে একঘরে করে দিয়ে ধোপা নাপিত বন্ধ করে একরকম শ্বাসরোধ করে ছাড়ত। বয়স পাঁচ পেরোলেই শুরু হত নৃত গীতে তালিম আর তার সঙ্গে সঙ্গে কঠোর অনুশাসন। পরিবর্তে মন্দিরের অর্থ ভাণ্ডার থেকে প্রতিপালিত হত সেই সব দুস্থ পরিবার। চোখের জলে আদরের কন্যাদের কামোত্তক পিশাচদের ডেরায় নিজে হাতে সাজিয়ে-গুছিয়ে পাঠিয়ে দিতে হত।

ব্রাহ্মণরা ব্যাখ্যা দিয়ে ভক্তদের বলত—পাথরের মূর্তি ভোগ করতে পারে না কিন্তু তাদের খিদে, তেষ্টা, যৌন তাড়না সব কিছু আছে। পুরোহিতরা দেবতাদের প্রতিভূ। তাই ওরা তুষ্ট হলেই দেবতা তুষ্ট। এই সব মেয়েদের অনেক পুণ্যের ফল যে দেবতার দেবদাসী হতে পেরেছে। বহু ভাগ্যের ফেরে জীবদ্দশায় দেবদাসীরা বিধবা হয় না। এলাকার সাধারণ মানুষ অশিক্ষিত হলেও সবটা বুঝত কিন্তু প্রতিবাদের ক্ষমতা ছিল না।

বয়স্কা দেবদাসীরা রূপ যৌবন হারিয়ে নিযুক্ত হত কুঁড়িদের নৃত্য গীতে তালিম দেবার জন্য, বদলে তারা পেত আমৃত্যু ভরণপোষণ। কিন্তু এদের মৃত্যু পরবর্তী পর্বে ছিল অমানবিক ব্যবস্থা। দেহ সৎকার হত না, শেয়াল কুকুর ছিঁড়ে খেত। আর দেবদাসী হবার পর রাতের পর রাত নটরাজের নামে ব্রাহ্মণরা চালাত এত অবাধ যৌন অত্যাচার যে মাঝবয়সেই তাদের সৌন্দর্যের কিছুমাত্র অবশিষ্ট থাকত না।

এরকম একটা পরিবারে ছেলের আশায় আশায় সাত মেয়ে। অত্যন্ত দারিদ্র। একবেলা অন্নসংস্থান হত না কোনও কোনও দিন। অসুন্দর পরিবারে দুই কন্যা জন্মেছিল রূপের ডালি নিয়ে—পদ্মাবতী ও প্রমীলা। শৈশবেই নজরে পড়েছিল ব্রাহ্মণদের। সাত বছর বয়সে প্রমীলা কলেরাতে মারা গিয়ে বেঁচে গেল। পদ্মাবতীর শুরু হল নৃত্য গীতের তালিম। ছিল অসামান্য সুন্দরী। সে সৌন্দর্যের পরিমাপ অসম্ভব। পদ্মাবতীর শরীরে নাচ কথা বলত। যেমন ছিল দেহ ভঙ্গিমা, তেমন হাতের মুদ্রা আর তাল পায়ে খেলা করত। কোকিলের মতো মিষ্টি ছিল গানের গলা। শিশুবয়সেই সপ্তসুর পদ্মাবতীর গলায় বশ মেনেছিল। শশীকলার মতো পদ্মাবতীকে বেড়ে উঠতে দেখে ব্রাহ্মণদের চোখ লোভে চকচক করত। অপেক্ষা করছিল আরও পুরুষ্ট স্তন, ভারী নিতম্ব, মেঘের মতো ঘন কেশভারের আশায়, কিন্তু শ্যেন দৃষ্টি দিয়ে নজরে রাখত পদ্মাবতীর গতিবিধি।

সেই সময় ভিনরাজ্য থেকে সুধাকর রাও নামে এক খোদাই কর্মী এল মন্দিরের প্রাচীর গাত্রে কারুকার্য ফুটিয়ে তুলতে। কবির ভাষায়—প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে কে কোথা ধরা পড়ে কে জানে...কোন মহালগ্নে হল পদ্মাবতী আর সুধাকরের চার চোখের মিলন। প্রথম দর্শনেই প্রেম। কিন্তু লুকিয়ে চুরিয়ে প্রেম বেশিদিন সম্ভব ছিল না ব্রাহ্মণদের চোখ এড়িয়ে। পদ্মাবতী জানত ওর ভবিতব্য। সব কথা জানিয়েছিল সুধাকরকে। একদিন সুযোগ পেয়ে নটরাজের সামনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে পদ্মাবতীর মায়ের মদতে বাবাকে লুকিয়ে পালাল দুজনে। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারল না, ধরা পড়ে গেল।

ব্রাহ্মণরা সালিশি সভায় ওদের জানালো যেহেতু পদ্মাবতী দেবতার মনোরঞ্জনের জন্য শিশু বয়সেই উৎসর্গিত, তাই আগে সমস্ত নিয়ম মেনে নটরাজের সঙ্গে বিয়ে সম্পন্ন হবে তারপর সুধাকরের সঙ্গে। সুধাকর সরল মনে বিশ্বাস করলেও পদ্মাবতী জানত অন্য কিছু ঘটবে, এ ব্রাহ্মণদের কোনও চাতুরী। কিন্তু সুধাকরের প্রাণ সংশয়ের কথা ভেবে টুঁ শব্দ করেনি সেদিন। দেবদাসী জীবন শুরুর দিনে শুভ তিথি নক্ষত্র মেনে নববধূর সাজে পদ্মাবতী গোধূলি লগ্নে পৌঁছেছিল মন্দিরে। পুরোহিত পরিবেষ্টিত হয়ে বিবাহ বাসর বসেছিল সন্ধ্যা অতিক্রম করে। সুধাকর নিজেই বরবেশে পৌঁছে গিয়েছিল মন্দিরে কিন্তু পদ্মাবতীর ধারেপাশে ঘেঁষতে পারেনি।

মুগ্ধ চোখে দেখছিল সারা মন্দির প্রদীপের আলোকমালায় সজ্জিত। কিন্তু ফুল আর গয়নার ভারে কিছুতেই পদ্মাবতীর মুখটা দেখতে পাচ্ছিল না দূর থেকে। তখন নিজেকেই সান্ত্বনা দিচ্ছিল, আর একটু পরেই তো বরাসনে গিয়ে বসবে, তখন প্রাণভরে দেখবে ওর পদ্মাবতীকে। মহা ধুমধামের সঙ্গে সমস্ত নিয়ম বিধি মেনেই বিয়ে সম্পন্ন হল নটরাজের সঙ্গে। এদিকে কথা কথাই রয়ে গেল—বিয়ে হল না পদ্মাবতী আর সুধাকরের।

কে যেন বিয়ের শেষে সমস্ত প্রদীপ নিভিয়ে দিয়ে নিষ্প্রদীপ করে দিল মন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে প্রবেশ পথ অবধি। অন্ধকারের মধ্যে হুড়োহুড়ি ধাক্কাধাক্কিতে তখন সুধাকরের পাগলপ্রায় অবস্থা। তারপর মন্দির খালি হয়ে গেলেও সুধাকর আর ওর পদ্মাবতীকে কোথাও খুঁজে পায়নি সে রাতে। পদ্মাবতীর অনাঘ্রাত পেলব কুসুম কোমল কিশোরী শরীর তখন দানবের মতো ভোগ করছে মন্দিরের প্রধান পুরোহিত। ভোররাতে আস্তাকুঁড়ে ছুড়ে ফেলার মতো করে প্রধান পুরোহিত বলেছিল, চাইলে এখন যেতে পারে সুধাকরের কাছে। কিন্তু পদ্মাবতী আর যায়নি কারণ ওর মনে হয়েছিল ওর শরীরটা এঁটো হয়ে গেছে। ও জানত স্বামী দেবতা সমান। আর দেবতাকে কখনো উচ্ছিষ্ট নিবেদন করা যায় না। এদিকে সুধাকরের বুকভাসি চোখের জলে সে রাতে নটরাজের মন গলেনি। রাত কাটতে সুধাকর বুঝতে পেরেছিল ব্রাহ্মণদের ষড়যন্ত্র। তার দুদিন পর কাবেরির শাখানদী সুবর্ণবতীতে সুধাকরের পচাগলা দেহ ভাসতে দেখেছিল এলাকাবাসী। পদ্মাবতীর শোকে আত্মহত্যা করেছিল সুধাকর। তাই মন্দিরের প্রাচীর অর্ধসমাপ্ত।

কথাটা কানে যেতে পাষাণবৎ হয়েছিল পদ্মাবতী। কিন্তু দেবদাসীদের কোনও শোক থাকতে নেই। সে রাতেই পালা করে তিন বৃদ্ধ লোলচর্ম পুরোহিতদের যৌন লালসা মেটাতে হয়েছিল পদ্মাবতীকে। এভাবেই চলতে লাগল রাতের পর রাত, বছরের পর বছর, নারীখাদক পুরোহিতদের শারীরিক ভাবে তুষ্ট করে।

খেয়াল করছিলাম বলার মধ্যে দক্ষিণী ছোকরা কেমন মাঝে মাঝেই সূত্র হারিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে। আমি আবার খেই ধরিয়ে দিচ্ছিলাম।

দেবদাসী হবার পর প্রায় ষাট বছর বেঁচেছিল পদ্মাবতী। বহুবার গর্ভপাত করতে হয়েছে জড়িবুটির সাহায্যে অদক্ষ দাইদের হাতে। অখণ্ড পরমায়ূর জোরে বেশ কয়েকবার মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে এসেছে। খালি প্রতি চতুর্দশীর রাতে অপরূপ সাজে সজ্জিত হয়ে পদ্মবতী নৃত্য প্রদর্শন করত নটরাজের সামনে আর সোচ্চারে উগরে দিত মনের মধ্যে জমানো ক্ষোভ। অভিশাপ দিত নটরাজকে—দিন আসবে যেদিন তুমি হেলায় পড়ে থাকবে পাথরের পুতুলের মতো, কোনও পুজো পাবে না। আর ব্রাহ্মণদের দিত নির্বংশ হবার অভিশাপ।

এদিকে সুধাকর মারা গিয়েও ছেড়ে যেতে পারেনি ওর পদ্মাবতীকে। সুধাকরের আত্মা ঘুরে ঘুরে বেড়াত মন্দির চত্বরে। অদৃশ্য ছায়ার মতো সঙ্গে থাকত ওর প্রেয়সীর। পদ্মাবতী অনুভব করত সুধাকরের উপস্থিতি আর একলা নির্জনে চোখের জল ফেলত। কিন্তু নিজের জীবদ্দশাতেই প্রতিশোধ নিয়েছিল পদ্মাবতী। দেবদাসী হবার প্রায় বছর কুড়ি পর রটে গেল পদ্মাবতীর সঙ্গে যে সব ব্রাহ্মণ অথবা পুরোহিতরা শারীরিক মিলনে কোনও না কোনও সময় লিপ্ত হয়েছে, তারা সবাই একে একে কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত। একটা সময়ের পর এলাকা ভরে উঠল কুষ্ঠ রোগীতে। ফলতে শুরু করল পদ্মাবতীর অভিশাপ। এলাকায় কমতে থাকল ব্রাহ্মণদের সংখ্যা। সন্তানহীনতা অথবা অসময়ে, অপঘাতে, অকারণে মৃত্যু মিছিল নেমে এল ব্রাহ্মণদের পরিবারে। খবরগুলো এলেই নাটমন্দিরের চাতালে বসে খল খল করে হাসত পদ্মাবতী। ধিকি ধিকি জ্বলা বুকের আগুনটা একটু হলেও ঠান্ডা হত, জুড়োত মনটা। ওকে ডাইনি ঠাউরে মানুষজন পালাতে শুরু করল। খালি পড়ে রইল অসহ্য রোগ যন্ত্রণা নিয়ে কুষ্ঠ রোগীরা। দাহ করার কেউ প্রায় রইল না। মরলে শেয়াল কুকুরে টেনে নিয়ে যেত।

নিজে থেকেই এই নটরাজ মন্দিরের দেবদাসী যুগের অবসান হল। নিম্নবর্ণের মানুষজন মন্দির এলাকা থেকে দূরে সরে গেল। কেউ আসত না দেবদর্শনে অথবা পূজা নিবেদন করতে। পদ্মাবতী বেঁচে থাকতেই এই মন্দির পরিত্যক্ত হল আজ থেকে কত দশক, কত শতক বা কত যুগ আগে তা আজ আর কারও হিসেব নেই। তবে যতদিন বেঁচে ছিল, অবহেলা করেনি নটরাজকে। নিজে হাতে মার্জনা করত, পুজো নিবেদন করত আর প্রতি চতুর্দশীতে নিখুঁত সাজে সজ্জিত হয়ে পায়ে ঘুঙুর বেঁধে নটরাজকে একাই নাচ দেখাত। এখন লোক বলতে কখনো কখনো পর্যটকরা আসেন।

তারপরেই ছেলেটি বলল একটা অদ্ভুত কথা—আপনি এবার ফিরে যান। সূর্যাস্ত হবে। আজ চতুর্দশী, পদ্মাবতী আসবে নটরাজকে নাচ দেখাতে। তাই সুধাকরও আসবে। দুজনে নিভৃতে একটু সময় কাটাবে। ওই ঘুঙুরের আওয়াজ কানে না যাওয়াই ভালো। যারাই জোর করে থাকতে চেয়েছে তারাই মূক বধির হয়ে গেছে তারপর। আর শেষ বাসের সময় হয়ে এসেছে। তাড়াতাড়ি যান না হলে বাস পাবেন না।

টাকা দিতে গেলে করজোড়ে নিতে অস্বীকার করল। নাম ঠিকানা জিজ্ঞাসা করতে জানাল—সুধাকর রাও। আর ঠিকানার কথায় করুণ হেসে বলল এখানে এলেই আমাকে পাবেন। কেমন যেন খচ্ করে লাগল শুনে। কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে আর একবার বিদায় জানাব বলে হাত নাড়তে পেছন ফিরতে দেখলাম কেউ কোত্থাও নেই। একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল আমার সারা শরীর বেয়ে। পা চালিয়ে বাস স্ট্যান্ড পৌঁছে একটা চায়ের দোকানে বসলাম। হাঁপ ধরে গিয়েছিল। দোকানি বলল ওই মন্দিরে তো কোনও গাইড নেই। দুর্নাম আছে তাই লোকজন বিশেষ আসে না। আমার কথা শুনে জানালো আমি আজ যার সঙ্গে সারাদিন ছিলাম সে আর কেউ নয় পদ্মাবতীর প্রেমিক সুধাকর রাও।

প্রতি চতুর্দশীতে মন্দিরে আসে পদ্মাবতীর সঙ্গে মিলিত হতে। কেউ দেখেনি কোনওদিন কিন্তু সবাই জানে প্রতি চতুর্দশীতে পদ্মাবতী নাচ দেখাতে আসে নটরাজকে। স্থানীয় মানুষ ভয় পায় তাই মন্দিরের ত্রিসীমানায় ঘেঁষে না কিন্তু দূর থেকে অনেকেই নাকি দেখেছে মন্দিরের দিক থেকে আসা প্রদীপের আলোর ক্ষীণ রেখা চতুর্দশীর রাত্রে। তবে লোকমুখে শুনে দু’একজন অসীম সাহসী পর্যটক চতুর্দশীর রাতে মন্দিরে গিয়েছিল, ফিরেও এসেছিল কিন্তু তখন সম্পূর্ণ মূক ও বধির। তাই ওদের কাছেও কিছু জানা যায়নি। পদ্মাবতীর মৃত্যুর পর ওর মৃতদেহ নাকি কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। যুগ যুগ ধরে লোকের মুখে মুখে ফেরে এসব কথা। তবে এসব গালগল্পের মধ্যে কতটা সত্যাসত্য আছে তা যাচাই করার কোনও উপায় নেই।

একটা চাপা কষ্ট আর ভারী মন নিয়ে সেদিন রাতে ফিরলাম স্বর্ণালীর বাড়ি। কিছুতেই ভুলতে পারছিলাম না পদ্মাবতী আর সুধাকর রাওকে। তার দুদিন পরেই আমার ফিরে যাওয়া। পরদিন ছিল শনিবার। স্বর্ণালীর পুত্রবধূ হাসপাতাল যায়নি, ওর ডে অফ ছিল। অনুজার কাছে শুনলাম পদ্মাবতী ওদের বংশের পূর্বনারী ছিল। পদ্মাবতীর একই রক্ত বয়ে চলেছে ওরও শরীরে। কত প্রজন্ম আগে সে বিষয়ে ওর কোনও ধারণাই নেই। পদ্মাবতীর বোনেদের পরবর্তী প্রজন্মরা এখন ছড়িয়ে আছে সারা দেশে। অনুজা সবটাই লোকমুখে শুনেছে আর মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে প্রতি চতুর্দশীতে পদ্মাবতী আর সুধাকর মিলতে আসে নটরাজ মন্দিরে যুগ যুগ ধরে। তাই কেউ এলেই অনুজা একবার ওই নটরাজ মন্দিরে ঘুরে আসতে বলে। ওর ধারণা প্রেমিক যুগলের আত্মারা কারও কোনও অকারণ ক্ষতি করবে না। তারপর অনুজার আড়ালে স্বর্ণালী জানালো অনুজাও নাকি অপূর্ব নাচ করে কিন্তু কোথাও শেখেনি। কিন্তু ওদের বংশে বারণ তাই কোনও অনুষ্ঠানে কখনো নৃত্য পরিবেশন করে না।

অনুজা চায় প্রেমিক যুগলের আত্মারা এবার শান্তি পাক।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%