পুনশ্চ

দেবযানী বসু কুমার

সুখেন্দ্রনাথ বসু পড়াতেন মোমিনপুর বয়েজে। বিয়ের পাঁচ বছর পর কলকাতার পাট চুকিয়ে চলে আসতে হল বর্ধমানে। বর্ধমান রাজরাজেশ্বর কলেজে ইতিহাসের অধ্যাপক পদের চাকরিটা পেয়ে গেলেন। এত খুশির মধ্যেও একটা মনখারাপের রেশ। প্রাণের শহর কলকাতা ছাড়তে হবে। স্ত্রী সুতপা ও ছেলে দেবরূপকেও আসতে হল অনিচ্ছা সঙ্গে নিয়ে।

কিন্তু আসার পর ভালো লেগে গেল শহরটাকে। বেশ জমজমাট। সুখেন্দ্রনাথ বাড়ি ভাড়া নিল অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি রানি সায়রের কাছে। ব্যবস্থা সবই আগে থেকে সুখেনের কলেজের বন্ধু করে রেখেছিল। শহরটার গায়ে সবসময় একটা রাজনীতির গন্ধ লেগে থাকে আর তার থেকেই ছোটখাটো ঘটনার উৎপত্তি। যদিও তাতে ওদের কিছু যায় আসে না। পড়াশুনো জগতের লোক, ওই নিয়েই সময় কেটে যায়।

দেবরূপ ভর্তি হয় বর্ধমান নিউ টাউন স্কুলে। ছোট থেকেই খুব মেধাবী। কিছুদিনের মধ্যে পড়াশুনো, ক্রিকেট মাঠ, বন্ধুবান্ধব, পাড়া আর মা বাবাকে নিয়ে তৈরি হয় একটা ভালো লাগার জগৎ। এই শহর ছেড়ে থাকবার কথা আর ভাবতেই পারে না। আস্তে আস্তে মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক খুব কৃতিত্বের সঙ্গে পাশ করার পর ওর কথায় এল সেই কালো দিনটা, যেদিন জয়েন্ট এন্ট্রান্সে ভালো নম্বর পেয়ে চলে আসতে হল কলকাতায়। ভর্তি হল যাদবপুরে ইলেকট্রনিক্স বিভাগে। যতই মনটা বাড়িতে পড়ে থাকুক, সময় চলে যায়। বি টেক, এম টেকের পাট চুকিয়ে সপ্তাহান্তে একবার বর্ধমান যাবে বলে বিদেশে যাবার বহু হাতছানি উপেক্ষা করে চাকরি নেয় তারাতলার একটা সরকারি কোম্পানিতে।

ছেলে দাঁড়িয়ে গেছে এই ভরসায় সুখেনবাবু জমি কিনে রানি সায়রের পাড়ে বাড়ি করা মনস্থ করেন। রক্ত জল করা টাকায় এই বাড়ি তাই সময় পেলেই রোদ জল ঝড়ে স্বামী স্ত্রী এসে দাঁড়িয়ে মিস্ত্রী খাটান। অনুভব করেন ইট বালি নয় রক্ত মাংস দিয়ে তৈরি হচ্ছে এই মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু। বহু আকাঙ্ক্ষিত ধন বিশেষ করে সুতপার। অনেক বছর ধরে মনের নিভৃতে লালন করেছেন এই ছবি। অনেক বাছাবাছির পর রবীন্দ্র ভক্ত স্ত্রীর বাড়ির নামকরণ হয়—পুনশ্চ।

পরের কাজ ছেলেকে থিতু করতে হবে। ম্যাট্রিমোনি সাইট থেকে শুরু হয় পাত্রী খোঁজা। যোগাযোগ হয় এক রুচিশীল পরিবারের সঙ্গে। মেয়ে খুব উচ্চশিক্ষিত। চেহারা চলনসই। চাকরি করে রাজারহাটে
আইটি সেক্টরে। লোকের কাছে পরিচয় দেবার মতো কুটুম। বিয়ে হতে দেরি হয় না। কিন্তু বিধাতা বোধহয় অলক্ষ্যে হাসেন। মানুষের বাইরেটা দেখা যায়, ভেতরটা নয়। ছেলের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও সুখেনবাবু ক্ষমতার বাইরে গিয়ে আয়োজন করেন শুধু নতুন কুটুমের মান রাখবার জন্য।

দেবরূপ আর মধুমিতা নিজেদের সুবিধা মতো ফ্ল্যাট ভাড়া করে বাইপাসে ধারে।

অধীর আগ্রহে অপেক্ষার পর সপ্তাহান্তে ছেলে বউমা এলে সস্ত্রীক সুখেনবাবু খুশিয়াল হয়ে ওঠেন। সুতপা ভেবেই পায় না কী দিয়ে বউমাকে আদর যত্ন করবে। কিন্তু বর্ধমানে এলে মধুমিতা যে ভালো থাকে না সবাই বুঝতে পারে। মাস দেড়েক পর মধুমিতার আসা কমতে থাকে। তারপর একদিন সোজাসুজি দেবরূপকে জানায় সপ্তাহে দুটো ছুটির দিন ও গ্রামে গিয়ে নষ্ট করতে পারবে না। মনে মনে কষ্ট পেলেও দেবরূপ সবটা মেনে নেয় শান্তির জন্য। কিছুদিন যাবার পর ছন্দপতনটা টের পাওয়া যায়। ছেলের আসাও কমতে শুরু করে। কষ্ট চেপে রেখে প্রতিবেশীদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ওরা তো প্রতি সপ্তাহে আসতে চায় কিন্তু এখন ওদের নিজেদের সংসার হয়েছে কাজ বেড়েছে তাই আমিই বারণ করি ছুটে ছুটে আসতে। যেখানে থাকবে ভালো থাকুক। হাজার হোক মা তো! নিজের দৈন্য প্রকাশ্যে আনতে মরমে মরে যান।

ছেলের বিয়ের দেড়বছরের মাথায় সুস্থ মানুষ সুখেনবাবু সেরিব্রাল অ্যাটাকে তিনদিনের মাথায় মারা যান। যদিও চিকিৎসার কোনও ত্রুটি থাকে না তাও ছেলে যখন খবর পেয়ে আসে তখন অবস্থা আয়ত্তের বাইরে। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই আসে মধুমিতা ও বেয়াইবাড়ির সবাই আর কলকাতার আত্মীয় স্বজন। তবে নিয়মভঙ্গের পরদিন কাজের দোহাই দিয়ে বাড়ি খালি হয়ে যায়। যাবার আগে ছেলে বউমা জানায় প্রয়োজন মতো টাকা পাঠাবার কথা। কিন্তু বরাবরই স্বামীস্ত্রী ছেলের অর্থের মুখাপেক্ষী নন। তাই অল্প হেসে সুতপা জানান—প্রয়োজন হলে উনি নিজেই চেয়ে নেবেন।

কাজের অজুহাতে ছেলে বউমা কেউ দু’ঘণ্টার রাস্তা বর্ধমান আসার সময় পায় না। স্বামীর শখের বাড়ি, তাই সুতপা খুব যত্নে রাখেন তাকে। বাগান করা, বাড়ি সাজানো, সামান্য কিছু বিগড়োলে মিস্ত্রি ডাকা আর সন্ধে হলে টিভি সিরিয়াল—সময় কেটে যায় সময়ের মতো।

সুতপার জীবনে সবচেয়ে কষ্টের দিন যেদিন ছেলে এসে জানায় চাকরির জন্য বিদেশ যেতে হবে। স্বামীর মৃত্যু শোকের থেকেও এ খবর যেন ভারী। কিন্তু বাইরে তার কোনও প্রকাশ নেই। অত্যন্ত চাপা মহিলা। শোনেন পনেরো দিনের মাথায় পাড়ি দিতে হবে আমেরিকার মিশিগানে। অনেক অনেক দূরের পথ। দুদিন আদর যত্ন করে বিদায় জানান ওদের। ঈশ্বরকে বলেন, ওরা ভালো থাকুক।

সেই যে ওরা চলে গেছে তারপর পৌনে তিন বছর কেটে গেছে। অজুহাত অনেক—অনেক দূর দেশ, ওদেশে ছুটি পাওয়া বেশ কষ্টকর, আসা যাওয়ার জন্য প্রচুর সময় ও অর্থের প্রয়োজন ইত্যাদি। তাই কিছুতেই দেশে আসা হয়ে ওঠে না। তবে সপ্তাহান্তে বেশ কয়েকটা ফোন আসে ছেলে বউয়ের কাছ থেকে মায়ের খবরাখবর নেবার জন্য।

এদিকে দেবরূপ বউয়ের জোরাজুরিতে শ্বশুরের সাহায্যে কলকাতায় ফ্ল্যাট বুক করে সাদার্ন এভিনিউ এলাকাতে। কারণ মধুমিতা ভাবতেই পারেনা বর্ধমান গ্রামে গিয়ে থাকার কথা। দেশে ফিরে একটা বাসযোগ্য পরিবেশ ও বাসস্থান খুব জরুরি। দেবরূপ নিজের মনকে বোঝায় এই ভালো হল। ভুলতে চেষ্টা করে ছেলেবেলার হাজারো স্মৃতি।

অঘটন ঘটে যায় পুনশ্চতে। ভোররাতে কলঘরে যেতে গিয়ে পড়ে যান সুতপাদেবী। সকালে কাজের মাসি এসে কেউ দরজা খুলছে না দেখে ভয় পেয়ে পাড়ার লোকেদের খবর দেয়। দরজা ভেঙে হাসপাতালে নিয়ে গেলে জানা যায় কোমরে বিষম চোট, সারতে সময় লাগবে। বেশ বড় সড় ব্যাপার। সুতপা গোছানো মানুষ, সহজেই পাওয়া যায় মেডিক্লেমের কাগজ, ব্যাংকের চেক বই। প্রতিবেশীরাই ফোনে যোগাযোগ করে ওনার ছেলের সঙ্গে। এত বছরের যারা নিত্যসঙ্গী তারাই রাত দিন পাশে থাকে। চিকিৎসার কোনও ত্রুটি হয় না। সমস্ত খবরাখবর যথাযথ পাঠানো হয় বিদেশে।

দেড়মাস পর সুতপাদেবী বাড়ি ফেরেন হুইল চেয়ারে চেপে। ছেলে ফোন করাতে নিজের স্বভাবের বিরুদ্ধে গিয়ে বলেন দুজনকে একবার ঘুরে যেতে। ছেলেকে বলেন কতদিন তোদের মুখগুলো দেখিনি। তোরা এলে মনে বল পাব, উঠে দাঁড়াবার শক্তি পাব। ছেলে আমতা আমতা করে তখনকার মতো সামাল দেয়। কিন্তু দেবরূপের মনটা হু-হু করে ওঠে। মনের মধ্যে বর্ধমানের দিনগুলো নাড়াচাড়া করতে কষ্ট হয়। দেশ ছেড়ে বিদেশে থাকা কতটা ব্যথার সেটা কাকে বোঝাবে। নিজের ভেতর নিঃশব্দ কান্না। এর বেশি কিছু আর সাহসে কুলোয় না।

ওপরওয়ালা চান না তাই জীবিত অবস্থায় আর মা ছেলের দেখা হয় না। বেশ কিছুদিন পর ওদেশে খবর যায় সুতপাদেবী মারা গেছেন। উপায় নেই, আসতেই হয় দেবরূপ ও মধুমিতাকে। শ্রাদ্ধ শান্তি মিটে যাবার পর নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে বউয়ের কথায় বাড়ি বিক্রিতে মত দিতে বাধ্য হয় দেবরূপ। দালাল আসে। সব কিছু পাকাপাকি হলে কথা হয় সই সাবুদ ও চাবি দেওয়া হবে কলকাতায় গিয়ে। সময় নেই হাতে। আর দশদিন পর কর্মস্থলে ফিরতেই হবে।

বর্ধমান থেকে ফেরার দিন সকালে গাড়ি এসে গেছে। দেবরূপের গাড়িতে সব মালপত্র তুলছে আর মধুমিতা সব দরজায় তালাচাবি বন্ধ করছে। হঠাৎ দেবরূপর এর খেয়াল হয় অনেকক্ষণ হয়ে গেল মধুমিতা নামছে না কেন? তড়িঘড়ি ওপরে উঠতে গিয়ে দেখে মাঝ দোতলার সিঁড়ির চাতালে মধুমিতা পড়ে আছে। ভয় পেয়ে যায় দেবরূপ। কি হয়েছে প্রশ্ন করে জানতে পারে দোতলা থেকে নামার সময় সিঁড়িতে পেছন থেকে কেউ যেন লাথি মেরে ফেলে দিয়েছে। ভয় তখন মধুমিতার সারা শরীর থর থর করে কাঁপছে, মুখ ফ্যাকাসে, দেখে মনে হচ্ছে শরীর থেকে সবটুকু রক্ত কেউ যেন শুষে নিয়েছে। ভয়ার্ত গলায় আরও জানায় ও শুনেছে কেউ যেন বলল, দেখি কী করে এ বাড়ি বিক্রি হয়! দেবরূপের পিছু পিছু প্রতিবেশীরাও উঠে এসেছিল। মুখে না বললেও সবাই বুঝতে পারে এই বাড়ি বড় প্রিয় ছিল সুতপার। এই বাড়ির মায়া আজও উনি কাটিয়ে উঠতে পারেননি।

মধুমিতার অবস্থা বেশ শোচনীয়। অ্যাম্বুলেন্স করে বর্ধমান হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার জানান—multiple fracture from hip to toe of both the legs। পেশেন্ট মধুমিতা বসুর রিকভার করতে সময় লাগবে অন্তত বছর খানেক। একবারে হবে না। অনেকগুলো অপারেশন করতে হবে। দেশ ছেড়ে যাবার এখন কোনও প্রশ্নই নেই। অর্থোপেডিক বিভাগের বড় সার্জন জানালেন দেবরূপের আপত্তি না থাকলে এই হাসপাতালেই চিকিৎসা হতে পারে। আরও জানান—Infrastructure and OT is very much well equipped. So don’t worry। মধুমিতার বাবা-মায়ের বেশ বয়স হয়েছে। প্রায় অথর্ব। ওনারাও সাহস পান না মেয়ের দায়িত্ব নেবার। ছুটি শেষ হয়ে আরও বেশ কিছুদিন হয়ে গেছে। দেবরূপকে ভারাক্রান্ত মনে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে হয়।

এদিকে নিয়তির নির্মম পরিহাসে মধুমিতার আপাতত ঠিকানা বর্ধমান শহর নয়, ওর কথায় বর্ধমান গ্রামে।

আর বাড়ির গেটে নাম ফলকটা যেন জ্বলে ওঠে—

পুনশ্চ

সুখেন্দ্রনাথ বসু

সুতপা বসু রায় (রায় ওনার পৈতৃক পদবি)। বুঝিয়ে দেন উনি আছেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%