দেবযানী বসু কুমার

এই ঘটনা কি সত্যি সত্যি ঘটা সম্ভব? কিন্তু ঘটেছিল তো। এ কোনও শয়তানের কারসাজি হতেই হবে। সাময়িক ভাবে সেই সময় অরণি ও যূথিকার রিপুর ওপর দখল নিয়েছিল কোনও শয়তান। আর কিছু নয়; নিজের ক্ষমতা প্রদর্শন।
সকাল থেকেই সেদিন আকাশটা ছিল মেঘলা। রাত আটটা নাগাদ মেঘ ভাঙা বৃষ্টি। আর মেঘ ভাঙা বৃষ্টি যে সে বৃষ্টি নয়। মনে হল এক আকাশ জল কেউ যেন উপুড় করে দিল মুম্বাই শহরের ওপরে। শহর জুড়ে চারিদিকে জল তা তা থই থই, রাস্তা যেন ওগো নদী আপন বেগে পাগল পারা।
বেচারা অরণি কী কুক্ষণেই সেদিন বেরিয়েছিল বাড়ি খুঁজতে। চাকরি করে এক মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে। পদমর্যাদাতেও বেশ ওপরের দিকে। অফিসের নতুন শাখা খোলা হবে মুম্বাই শহরে তাই বদলি। স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা। একেবারে বাসস্থানের ব্যবস্থা করে নিয়ে আসবে কলকাতা থেকে। এদিকে রোজই কলকাতা থেকে তাগাদা আসছে, একা থাকতে ভালো লাগছে না বলে। তাই সময় সুযোগ পেলেই বাড়ি বাড়ি করে শহর চষে ফেলছে।
এক কলিগের কাছে খবর পেয়েই অফিসের পর খোঁজ করতে এসেছে জুহুর কাছে চৌপাটি এলাকায়। একটা দু’কামরার ছোট্ট ফ্ল্যাটের। এ শহরে যা বাড়ির ভাড়া, একটাও মনমতো জুটছে না। দেখেই চলেছে একটার পর একটা। বৃষ্টির জন্য বাড়ি তো দেখা হলই না তার মধ্যে এই বিপত্তি। রাত আটটা থেকে একটা রংচটা বাড়ির দরজার সামনে কার্নিশের তলায় ঠায় দাঁড়িয়ে। নাজেহাল অবস্থা। ভিজে একসা। তার সঙ্গে সমুদ্রের ঠান্ডা হাওয়ায় রীতিমতো শীত করছে। হঠাৎই এক মহিলা রাতে বাড়ির সদর দরজায় তালা দিতে এসে অরণিকে ওই অবস্থায় দেখে ভেতরে যেতে বলে। শহরের যা হাল ভোরের আগে হোটেলে ফেরার কোনও উপায় নেই। তখন ঠক-ঠক করে কাঁপুনি হচ্ছে। মহিলা একটা তোয়ালে আর মেয়েদের একটা পাজামা এগিয়ে দেন। কথা বলতে বলতে অনেক কিছুই জানতে পারে অরণি। ওনার নাম যূথিকা সরকার। বয়স আন্দাজ চল্লিশের কোঠায়। নিজেই জানান তিনি অবিবাহিতা। একাই থাকেন ওই এক কামরার ফ্ল্যাটে। প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করেন।
ধাতস্থ হয়ে খেয়াল হয় মহিলা একাই মদ্যপান করছিলেন। অনুমতি নিয়ে অরণিকেও এগিয়ে দেন একটা গ্লাস। সেদিন ওরা নেশা করেনি, নেশা ওদের বশ করেছিল। না যূথিকা সরকার না অরণি সেনগুপ্ত কেউই সেরকম স্বভাবের নয়। জীবনে অত্যন্ত সংযমী দুজনেই। মাত্রাতিরিক্ত নেশার জন্যই হোক বা অন্য কোনও কারণে, দুজনে হঠাৎই ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ে আর এক সময় সংযম হারিয়ে তলিয়ে যায় অতল অন্ধকারে।
সম্বিৎ ফিরতে দুজনেই কোনও কৈফিয়ত খাড়া করতে পারে না। নিজেরা নিজেদের মুখোমুখি হতে সাহসে কুলোয় না। আত্মগ্লানিতে ভোগে।
অরণি মনে মনে অনুতাপে পুড়তে থাকে কারণ সত্যি ও নন্দিতাকে ভালোবাসে। নিজেকে ক্ষমা করতে পারে না। আর যূথিকা নিজেকে বোঝায় ভুলটা ভুলই।
ইতিমধ্যে প্রায় মাস চারেক কেটে গেছে। আন্ধেরিতে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করে নন্দিতাকে নিয়ে এসেছে। তখন ভরা মাস। সময় এগিয়ে আসছে। একাই যতটা পারে যত্ন-আত্তি করে নন্দিতার।
হঠাৎ একদিন মুঠোফোনে একটা অচেনা নম্বর বেজে ওঠে। ওপ্রান্তে যূথিকা সরকার। জরুরি প্রয়োজন, চায় সেদিনই দেখা করতে। নেশার ঘোরে কখন যে মহিলাকে ফোন নম্বর দিয়েছে অরণির মনেই পড়ে না। ভয়ে গলাটা কেমন শুকিয়ে যায়। উত্তর দেবার আগেই ওপ্রান্ত থেকে লাইনটা কেটে যায়।
সন্ধ্যাবেলা জানতে পারে যুথিকা দেবী অন্তঃসত্ত্বা। ঠান্ডা গলায় জানানো হল এই বাচ্চা অবাঞ্ছিত, ক্ষণিক উত্তেজনার ফল, কিন্তু বাচ্চা এই পৃথিবীর আলো দেখবেই। অরণি না চাইলে কোনওদিন পিতৃত্ব দাবি করবেন না ঠিকই কিন্তু প্রয়োজনে পাশে থাকতে হবে। যূথিকার হিমশীতল আওয়াজ কেমন আদেশের মতো শোনায়। কুল কুল করে ঘামতে থাকে অরণি। অসহায় বোধ করে। কী করে বোঝাবে যূথিকাকে যে, ঘরে তার স্ত্রী আছে। আর অরণির সন্তানের মা হতে চলেছে সে। প্রথমে অনুনয় বিনয় পরে অনুরোধ উপরোধ শেষে ধমকিতেও কাজ হয় না। এক ইঞ্চিও টলানো যায় না মহিলাকে। কিছুতেই অরণি বোঝাতে পারে না যে, এ কোনও ভালোবাসার সন্তান নয়। এমন সন্তানের পৃথিবীর আলো না দেখাই শ্রেয়। রোজই চলতে থাকে এই নিয়ে আলোচনা বাক্বিতণ্ডা। এদিকে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। প্রমাদ গোণে অরণি।
মনের মধ্যে চলতে থাকে ছটফটানি। কী করে সারাজীবন দু’নৌকোয় পা দিয়ে কাটাবে? কে বলতে পারে ভবিষ্যতে এই অবৈধ সন্তানের পিতৃত্ব দাবি করবে না ওই মহিলা? আর প্রমাণ করা—সে তো এখনকার দিনে বাঁ-হাতের খেল। তখন কী জবাব দেবে নন্দিতাকে? তখন ওর ভালোবাসার ঘর তো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।
ওর মতো ঘরোয়া ছাপোষা মানুষকেও অন্য কিছু ভাবতে হয়। শুরু হয় অভিনয়। প্রতিদিন অফিস ফেরতা আসে যূথিকার ফ্ল্যাটে। সময় কাটায়, সঙ্গে থাকার আশ্বাস দেয়, ভরসা জোগায়। বিশ্বাস অর্জন করতে দেরি হয় না।
একদিন বেড়াতে যাবার নাম করে নিয়ে যায় আরব সাগরের নির্জন কিনারায়। তখন ভরা জোয়ার। ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় সমুদ্রে। মুখটা চেপে ধরে সাগরের লোনা জলে। একটু ছটফট তারপরেই নিথর। দেহটা পড়ে থাকে বালুতটে। অরণি আর পিছন ফিরে তাকায় না।
প্রমাণের এভাবে মৃত্যুর কোনও কিনারা হয় না। সব ধামা চাপা পড়ে যায়। অরণি সব ভুলতে চায় কিন্তু যূথিকা কি এত সহজে ভুলতে দেবে অরণিকে?
এদিকে নন্দিতার প্রসবের সময় আসন্ন। ভর্তি হয় মুম্বাইয়ের এক নার্সিং হোমে। ডাক্তারের কথা অনুযায়ী সমস্ত রিপোর্ট ঠিকঠাক থাকা সত্ত্বেও লেবার রুম থেকে বেরিয়ে ডাক্তার জানায় মৃত সন্তানের জন্ম হয়েছে। মা ও বাচ্চা সুস্থ থাকা সত্ত্বেও জন্মের পর দেখা যায় বাচ্চার ওজন খুব কম আর পাঁচ মাসের পর শারীরিক গঠন আর বাড়েনি। হতাশায় ভেঙে পড়ে স্বামী-স্ত্রী। ডাক্তার বিশেষ সদুত্তর দিতে পারে না এমন অদ্ভুত ঘটনার।
পরের বার আরও সতর্কতা। কিন্তু ফল সেই একই। আবার মৃত সন্তান, আবার সেই একই শারীরিক ত্রুটি। ডাক্তাররা বিশেষ বৈঠক করে কিন্তু ফলাফল শূন্য।
বারবার পাঁচবার শারীরিক গঠনগত ত্রুটি নিয়ে মৃত সন্তান প্রসব। ডাক্তাররা অথৈ জলে। জটিল সমস্যা। সবার মনে অসংখ্য প্রশ্ন যার নেই কোনও ব্যাখ্যা।
একটা কথা কাউকে বলতে পারে না অরণি। প্রতিবার মৃত সন্তান প্রসবের খবর আসার পর অরণিকে দেখা দেয় যূথিকার অবয়ব। ক্রুর হেঁসে বলে আমাদের সন্তানকে তুমি পাঁচমাসের বেশি বেঁচে থাকতে দাওনি তাই ভুলেও কোনওদিন সন্তানের মুখ দেখার আশা কোরো না। বারবার ক্ষমা চায় অরণি। ভিক্ষে করে একটা সন্তান। ততক্ষণে মিলিয়ে গেছে যূথিকা। সমুদ্রের সেই নির্জন কিনারায় গিয়ে একা একা কান্নায় ভেঙে পড়ে অরণি। কিন্তু সবার সামনে একবুক যন্ত্রণা পাথর চাপা দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। একটা কথাও বলতে পারে না নন্দিতাকে।
একটা ক্ষণিক উত্তেজনার গুনগার দিতে হয় সবাইকে। তিন-তিনটে জীবন বরবাদ। একজন মৃত আর দুজন জীবন্মৃত। বাকি জীবনটা দুজনকে এই ভাবেই কাটাতে হবে।
এ খোদ শয়তানের শয়তানি ছাড়া আর কী?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন