পুতুল গড়

দেবযানী বসু কুমার

এ গল্প বহু বছর আগেকার। আমি কাগজপত্র ঘেঁটে যা বুঝলাম এই পুতুল গড়ের ইতিহাস অন্তত একশো সত্তর-আশি বছরের পুরোনো। তার বেশিও হতে পারে তবে কম নয়। একটা তালা বন্ধ ঘরে কিছু কাগজ পেয়েছি কিন্তু তাদের এতই দৈন্যদশা যে প্রায় কিছুই পড়া যাচ্ছে না। তার ওপর সবটাই হাতে লেখা। দু’একটা ধুলোয় ঢাকা খাতা, অনেকটা ডায়েরির মতন পেয়েছি। ভেবেছিলাম ঝেড়েঝুড়ে বাড়ি নিয়ে আসব পড়বার জন্য। কিন্তু না, পারলাম না। একটা যেন শক্তি—শুভ না অশুভ বলতে পারব না, আমাকে পেছন থেকে টেনে ধরল। প্রথমবার খাতাগুলো টেবিল থেকে তুলতে গিয়ে আমি শুকনো ডাঙায় আছাড় খেয়ে পড়লাম। দ্বিতীয় বার তুলতে গিয়ে ধুলোয় আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল। তখন মনে হচ্ছিল প্রাণটাই বোধহয় বেরিয়ে যাবে। আর তৃতীয়বার খাতাগুলো তুলতে যেতেই মনে হল ঝুর ঝুর করে পড়ে যাবে। আর চেষ্টা করিনি। বুঝলাম কেউ বা কারা চাইছে না এগুলো ঘরের বাইরে যাক।

বেশ কয়েক প্রজন্মের অভিশপ্ত ইতিহাস। হ্যাঁ, এই বাড়িটা সম্বন্ধে অনেক কিছু শুনেই দেখতে এসেছিলাম। এখানে নাকি এখনও আত্মারা ঘুরে বেড়ায়। আমার আবার অতিপ্রাকৃত বিষয়ের প্রতি খুব আগ্রহ। সব কাজটাই আমি জোরালো টর্চের আলোয় করছিলাম। কিন্তু এভাবে তো পুরো খাতাগুলো পড়া সম্ভব নয়। বাধ্য হয়ে একজন ইলেক্ট্রিসিয়ানকে বলে একটা টেম্পোরারি আলোর ব্যবস্থা করতে হল। কারণ অনেক খুঁজে দেখা হল, এ ঘরে কোনওদিন বৈদ্যুতিক আলো পাখার ব্যবস্থা ছিল না। শীতকাল, তাই পাখার প্রয়োজন নেই বরং গঙ্গা থেকে ঠান্ডা হওয়া আসছে। তাতে বেশ শীত শীত করছে। আবার দরজাটা ভেজিয়ে দিলে কেমন গা ছম ছম করছে। যদিও আমি অস্বাভাবিক কিছুই দেখিনি বা অনুভব করিনি। সে যাক, আলোটা লাগাবার পর দেখলাম এটা একটা বিরাট ঘর আর কোনও এককালে এটা পারিবারিক গ্রন্থাগার ছিল।

পুতুল গড়ের কথা অনেকের মুখে শুনেছিলাম। শুনেছি অতৃপ্ত আত্মারা নাকি এ বাড়িতে ঘুরে বেড়ায়। বাড়ি না বলে গড় বলাই ভালো। বাড়ির নামও পুতুল গড়। গঙ্গার পাড়ে বিরাট চৌহদ্দির মধ্যে এই পুতুল গড়। পাঁচ মহলা। সামনে গাড়ি বারান্দা। কোনও একসময় চারদিকে চারটে ফটক ছিল। এখন তিনদিকের ফটক গায়েব যদিও কোনও লোক ঢোকে না, ভয় পায়। বাড়িটা নিয়ে প্রচুর কিছু রটনা আছে। রটনা না ঘটনা বলতে পারব না, তবে সামনের প্রধান লোহার ফটক এখনও আছে।

বাড়ির সমস্তটা জুড়ে অনেক পাথরের পুতুল আছে। তাদের নানান অঙ্গভঙ্গি। আর মুখের ভাব কেমন জীবন্ত। যেন কিছু বলতে চায়। বাড়ির ছাদ চুড়ো মতো। সেখানেও একটা বড় পুতুল লাগানো। ঢুকেই ডানদিকে দারোয়ানদের আউট হাউস। দারোয়ানদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, ওরা এই বাড়ির আদি মালিকের লতায় পাতায় আত্মীয়। আর্থিক অবস্থার জন্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম রয়ে গেছে কেয়ার-টেকার হয়ে।

বাড়ির ইতিহাস কিছুটা ওই খাতাগুলো, কিছুটা পাকা কাগজ অর্থাৎ দলিল দস্তাবেজ আর বাকিটা দারোয়ানদের মুখে শুনে এই লেখাটা লিখেছি। সত্যতা সম্বন্ধে আমার মনেও অনেক দ্বন্দ্ব আছে। সব ঘটনার কোনও হাতে গরম প্রমাণ আমি পাইনি। তবে হাতে লেখা খাতা পড়ে মনে হয়েছে পুতুল গড়ের গ্রন্থাগারে কোনও গ্রন্থাগারিক ছিলেন যিনি তার অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেছিলেন সেসময়। হতে পারে তিনি ওই পরিবারের কেউ ছিলেন।

ফিরে যাই অনেকটা পেছনে। ভাগ্য অন্বেষণে বাংলাদেশ থেকে এসে কুশারী পরিবারের বাস ছিল গঙ্গাসাগরে কপিল মুনি আশ্রমের আশেপাশে কোনও এক গ্রামে। নিম্নবিত্ত। শ্রাদ্ধ কার্যে প্রধান পুরোহিতের সহকারী ছিলেন। এছাড়া সুযোগ পেলে চাষের কাজ করতেন। যখন যেমন পেতেন তেমন কাজ করে সংসার নির্বাহ করতেন। মনে প্রচণ্ড দুঃখ ছিল, কোনও সন্তানাদি ছিল না বলে বিয়ের পনেরো বছর পর স্ত্রী গর্ভবতী হলে বাড়িতে আনন্দের জোয়ার লাগল। যথাসময় কন্যাসন্তান ভূমিষ্ঠ হল। ক্ষমতার বাইরে গিয়ে সমস্ত গ্রামে মিষ্টি বিলি করা হল।

মেয়ে দেখতে একেবারে পুতুলের মতো। তাই মেয়ের নামকরণ হল পুতুল। মেয়ে খুব সৌভাগ্যবতী। মেয়ে হতেই বাপের আয়ে পয় বাড়ল। ধুলো মুঠি করলেই সোনা। কয়েক বছরের মধ্যে পুতুল গড় তৈরি করে সপরিবারে উঠে গেলেন। মেয়ের নামের সঙ্গে নাম মিলিয়ে রাখা হল পুতুল গড়। মেয়ের কোষ্ঠিতে লেখা ছিল স্বল্পায়ু। একমাত্র কন্যা। সবেধন নীলামণি। এটাই ছিল স্বামীস্ত্রীর একটা কষ্টের জায়গা।

ষোলো বছর বয়সে সে মেয়ের বিয়ে হল। পাত্রের সন্ধান কোথা থেকে এসেছিল জানা নেই। ঘর জামাই রাখতে পারার আনন্দে কুশারী দম্পতি বিশেষ খোঁজ খবর নিলেন না। রাজা রায় বর্মন। রীতিমতো সুপুরুষ। কোনও পিছুটান নেই। সে ছেলের নাকি কেউ কোত্থাও নেই। এককথায় সবাই মেনে নিল। পরে বোঝা গিয়েছিল মানসিক রোগগ্রস্ত। সর্বদা যৌন তাড়নায় ভুগত। নিত্যনতুন নারী চাই। ব্যবহারে উদ্ধত। অত্যন্ত বিলাসী। ক’দিনেই একগাদা মোসাহেব জুটে গেল। স্বভাবেও উশৃঙ্খল। পর পর চার বছরে দুটো পঙ্গু ছেলে হয়েছিল। রক্তের দোষ। ছেলেগুলো হয়ে বেশিদিন বাঁচেনি।

বিয়ের বছর পাঁচেকের মাথায় পুতুল গড়ের রাজকন্যা পুতুল দেবী মারা গেলেন যৌন অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে। রতিক্রীড়ার সময় জান্তব হয়ে উঠত তার স্বামী। একমাত্র মেয়ের মৃত্যুতে শোকে পাথর হয়ে গেলেন কুশারী দম্পতি। সব কিছু ফেলে রেখে চলে গেলেন মথুরা বৃন্দাবনে। শেষ বয়সটা গোবিন্দের নাম গান করে কাটিয়ে দেবেন এই ভেবে।

পোয়াবারো হল রাজা রায় বর্মনের। নিত্যনতুন মেয়ে আমদানি তখন পুতুল গড়ে। বেশির ভাগ পালিয়ে যেত অত্যাচারের ভয়। আর যারা থেকে যেত, তাদের মরতে হত যৌন অত্যাচারে। খাতায় লেখা, একটা করে মেয়ে মরলেই একটা করে পুতুল গজিয়ে উঠত গড়ের যে কোনও জায়গায়। তাই নাকি এত পুতুল। গোড়ায় একটাই
মাত্র পুতুল ছিল। এবং সব পুতুলের মুখে নাকি যন্ত্রণার ভাব ফুটে উঠত।

দিনের বেলায় কিছু বোঝা যেত না কিন্তু রাত হলেই চাঁদের আলোতে মনে হত পুতুলগুলোতে প্রাণ আছে। পুতুলগুলো যেন নড়াচড়া করত। কেউ কখনো নড়তে দেখেনি কিন্তু হাত-পা মাথার অবস্থান পাল্টে পাল্টে যেত। আর রাত হলেই ভেসে আসত মেয়েলি কণ্ঠের তীব্র চিৎকার বা গোঙানির আওয়াজ। যা নাকি আজও মাঝে মাঝে শোনা যায়। খাতার লেখাগুলোতে সম্মতি জানাল ওই কেয়ার টেকারের পরিবার।

সে জামাই তারপর উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল। সারা শরীরে ঘা দগ দগ করত। ততদিনে ইয়ার বন্ধুরা সরে পড়েছে। কীসে মৃত্যু হয়েছিল জানা নেই। একদিন সকালে নাকি সবাই দেখেছিল, রায় বর্মন মার্বেলের শানে মরে পড়ে আছে।

কিন্তু যারাই থাকুক তারা নাকি কারও কোনও ক্ষতি করে না। অনেক চেষ্টা হয়েছে কিন্তু এ বাড়ি বিক্রি করা যায়নি। এ বাড়ি এখন একরকম মালিকানাহীন। কেয়ার টেকারের পরিবার ভয়ে মূল বাড়িতে ঢোকে না। বলল, এই আউট হাউসেই আমরা বেশ আছি। ওরাও ওদের পূর্বপুরুষদের কাছে এসব শুনেছে। আমাকে পুরো চাবির গোছা দিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু খুলতে পারিনি। এতদিন খোলা হয়নি, সেসব জং পড়ে গেছে। আর অযত্নে অবহেলায় এত বড় বাড়ি ভেঙে ভেঙে পড়ছে। তবে ওদের মুখে একটা অদ্ভুত কথা শুনেছি সেদিন। কেউ একটা মূর্তি নিয়ে গিয়েছিল বাড়িতে রাখবে বলে। কারণ, মূর্তিগুলো এখনও অটুট। যেদিন নিয়ে গিয়েছিল সে রাত্রে ভদ্রলোক ঘুমোতে পারেননি। সারারাত কেউ যেন ওনাকে অত্যাচার করেছে। লোকটিকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছিল। পরদিনই সে মূর্তি ফেরত চলে এসেছিল। গাড়ি বারান্দায় সে মূর্তি রাখা আছে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%