অনুভবে তোমাকে যে চাই

দেবযানী বসু কুমার

মহারাণী বিড়লা কলেজে ফেস্ট। ছাত্রীরা সব সেজেগুজে মহা ব্যস্ত। জয়ন্তী তখন ওই কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। এস্থেটিক সেন্সটা ওর বেশ আছে বলে দায়িত্ব পড়েছে স্টেজ সাজাবার। ফেস্ট বলেই অন্যান্য কলেজ থেকেও অনেক ছাত্র ছাত্রীরা এসেছে। আর পাঁচটা দিনের মতো খুব কড়াকড়ি নেই আজ। কলেজের আইডি দেখাতে পারলেই সবার জন্য অবারিত দ্বার।

এত ভিড়ের মধ্যেও জয়ন্তী অনুভব করে কেউ যেন আলাদা করে বারে বারে ওর ফটো তুলছে। খেয়ালও করেছে একটা ছেলেকে। বেশ ঝকঝকে চেহারা। খবর নিয়ে জানতে পারে কলেজের তরফে অফিসিয়াল ফটোগ্রাফার হয়ে এসেছে। অনুষ্ঠান শেষে যখন অডিটোরিয়াম থেকে বেরোতে যাবে, হঠাৎ ছেলেটি সামনে এসে বলে—আমি চঞ্চল, অনেক ছবি তুলেছি আপনার। পাঠিয়ে দিতাম যদি আপনার ফোন নম্বর দিতে আপত্তি না থাকে। এত ভালো সাবজেক্ট পেয়ে লোভ সামলাতে পারিনি। অনুমতি না নিয়েই অনেক ছবি তুলেছি।

জয়ন্তী বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে। চেহারাতে আদুরে আদুরে ভাব তবে সত্যি ফটোজেনিক। পড়াশুনোতে তেমন মন নেই। করতে হবে বলে করা। আর্থিক সচ্ছলতাতে মানুষ। বাবা-মা’র সঙ্গে থাকে কাঁকুলিয়ায় নিজেদের বাড়িতে। আর চঞ্চল অতি সাধারণ ছেলে। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে ফটোগ্রাফি শিখেছে। হাত বেশ ভালোই তাই মন্দ রোজগার হয় না। কালীঘাটে ভাড়া বাড়িতে থাকে বাবা-মা ও পাঁচ ভাই-বোন মিলে। চেষ্টা করে সারাদিন পারতপক্ষে বাড়িতে না ফিরতে কারণ সত্যি জায়গার খুব অভাব।

কিন্তু তাতে প্রেমে পড়তে কোনও অসুবিধে হয় না। ছবি দেবার নাম করে প্রথমে দেখা সাক্ষাৎ আর তারপর প্রেম গাঢ় থেকে গাঢ়তর হতে থাকে। প্রথম যেদিন জয়ন্তীর বাড়িতে জানাজানি হয়, সে এক দারুণ অশান্তির পরিস্থিতি। বাবা মেয়েকে যতই বোঝায়, প্রেমে অন্ধ মেয়ে তখন ততই অবুঝ। শেষে একমাত্র আদুরে মেয়ের জেদের কাছে হার মানতে হয়। যদিও মনের সঙ্গে অনেক লড়াই করে ওনারা বিয়েতে মত দেন কিন্তু মনে মনে বোঝেন, এই বিয়েটা না হলেই ভালো হত। ততদিনে জয়ন্তীর গ্র্যাজুয়েশন শেষ। এত তাড়াতাড়ি বিয়েতে অমত থাকলেও মাত্র বাইশ বছর বয়সে মেয়ের আবদারে বিয়ে দিতে বাধ্য হন ওনারা।

অগত্যা সানাই বাজে, চার হাত এক হয়। এই ছেলের রোজগারেই সংসারের অনেকটা চলে বলে ছেলের বাড়ির খুব একটা আগ্রহ ছিল না এই বিয়েতে। তাই ধুমধাম না হলেও বিয়ের উৎসব শেষ হয়।

শ্বশুর বাড়িতে জায়গা অকুলান। কিন্তু জয়ন্তীর খুব অমত চঞ্চলের ঘর জামাই হয়ে থাকার। তাই বাবা-মায়ের হাজার অনুরোধ সত্ত্বেও ছোট্ট ফ্ল্যাট ভাড়া করে মনোহর পুকুরে। বছর না ঘুরতেই সংসার বাড়ে দুজন থেকে তিনজনে। ঋক আসে ওদের জীবনে। প্রাচুর্য না থাকলেও সচ্ছলতা আছে। তাই হেসে খেলেই দিনগুলো কাটে বেশ।

ইতিমধ্যে জয়ন্তীর মা মারা গেছেন। ছেলে ভর্তি হয়েছে দামি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে। চঞ্চলের কাজ বেড়েছে সঙ্গে বেড়েছে অর্থ সমাগম, কমেছে সংসার দেওয়ার সময়। এই কাজের জন্যই গেছে একটা জন্মদিনের অনুষ্ঠানের ছবি তুলতে। আর সেখানেই আলাপ অর্পিতার সঙ্গে। অর্পিতা ডিভোর্সি, সুন্দরী, শিক্ষিতা। এছাড়া আছে নিজের একটা অ্যাড এজেন্সির ব্যবসা। অর্পিতার সম্মোহনী স্বভাব চঞ্চলকে আকৃষ্ট করে। চঞ্চলের সংসারের সব কথা জেনেও অর্পিতা সরে দাঁড়ায় না। উল্টে শুরু হয় গোপন প্রেম। চঞ্চল পাকে পাকে জড়িয়ে পড়ে। ছিন্ন করতে পারে না অর্পিতার আকর্ষণ।

জয়ন্তী কিছুই জানতে পারে না এসবের। বরাবরই উচ্ছল প্রকৃতির সে। ছেলে বর সংসার বন্ধুবান্ধব নিয়ে হইচই করে দিন কাটায়। একদিন চঞ্চলের ফোনে অর্পিতা চঞ্চলের একটা ঘনিষ্ঠ ছবি দেখে জয়ন্তী পৃথিবীটা যেন দুলে ওঠে। চঞ্চল বোধহয় ভুলে গিয়েছিল ডিলিট করতে। শুরু হয় অশান্তি।

যত দিন যায় অশান্তি চরম আকার ধারণ করে। কারও কথা না ভেবেই জয়ন্তী আত্মহত্যা করে গলায় দড়ি দিয়ে।

তিন মাসের মাথায় জয়ন্তীর বাবা শোক সহ্য করতে না পেরে মারা যান। ঋকও কেমন কুঁকড়ে গেছে। কারও সঙ্গে কথা বলে না। বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে পারে না। স্কুল থেকে প্রায়ই অভিযোগ আসে পড়াশোনাতে অমনোযোগী বলে। বরাবর মার কাছে পড়ার অভ্যাস। বাড়িতে টিউটর রেখেও কোনও সুরাহা হয় না। ঋককে নিয়ে চঞ্চল কাঁকুলিয়াতে জয়ন্তীদের বাড়ি উঠে আসে।

যেদিন অর্পিতা আসে সে দিনগুলোতে একটা অস্বস্তি হয় চঞ্চলের। কেমন গা ছমছম করে। বেশি বেশি করে মনে পড়ে জয়ন্তীকে। চঞ্চল মনে মনে ভাবে আগে তো কখনো এমন হত না। নিজেরই কেমন রহস্য লাগে। কে কীভাবে নেবে এই ভেবে কারও কাছে মন খুলে হালকা হতে পারে না।

আর ভালো লাগে না অপেক্ষা করতে। অর্পিতার তাগাদায় আর আবদারের কাছে হার মানতে হয় চঞ্চলকে। জয়ন্তীর মৃত্যুর এগারো মাসের মাথায় কাগজে সই করে বিয়ে হয়ে যায়। ওদের নির্লজ্জতায় সবাই ছিছিক্কার দেয়। বন্ধুরা যবে থেকে শুনেছে অর্পিতার সঙ্গে সম্পর্কের কথা তবে থেকে বয়কট করেছে চঞ্চলকে।

বিয়ে করে অর্পিতা এসে ওঠে জয়ন্তীর বাড়িতে। বিয়ের প্রথম রাতে একটা অজানা ভয় গ্রাস করে চঞ্চলকে। কিন্তু অর্পিতার মন রাখার জন্য যতবার ছুঁতে যায় ওকে, হাতটা কিছুতেই পৌঁছয় না অর্পিতা অবধি। অনুভব করে ওদের মাঝখানে তৃতীয় কারও উপস্থিতি। ঘুমের অজুহাতে চঞ্চল শুয়ে পড়ে। কিন্তু এটা হয়ে ওঠে নিত্যদিনের সমস্যা। চঞ্চল অর্পিতা যেই কাছাকাছি আসতে চায়, কিছু না কিছু ঘটে ওই চরম মুহূর্তে। কোনওদিন চঞ্চল অসুস্থ হয়ে পড়ে, কখনো ছেলে দরজা ধাক্কা দিয়ে বলে ভয় করছে। আবার কখনো গভীর রাতে ফোনে ব্ল্যাঙ্ক কল আসে। একদিন মন শক্ত করে সবে অর্পিতাকে জড়িয়ে ধরেছে দেখে, সামনের মানুষটা অর্পিতা নয় জয়ন্তী। ভয় পেয়ে বিকট চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে যায় চঞ্চল।

এদিকে অর্পিতা এসবের কিছুই বুঝতে পারে না। অবুঝ হয়ে ওঠে দিন দিন। বিশ্রী ভাবে অপমান করে চঞ্চলকে। একটা একটা করে দিন চলে যায় কিন্তু ওরা একদিনও এক হতে পারে না। কয়েকমাস পরে তিতিবিরক্ত হয়ে একদিন অর্পিতা চঞ্চলকে মানসিক ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে ডাক্তার জানান ভয়ের কিছু নেই। একদম জয়ন্তীর কথা ভাববেন না। কিছু ওষুধ লিখে দেন। বলেন, আপনি মনে মনে অপরাধ বোধে ভুগছেন। সব ঘটনা মনের ভুল। যে চলে গেছে সে কী করে আসবে। বরং কদিন বাইরে থেকে ঘুরে আসুন। পরিবেশ বদলালে সম্পর্কটা সহজ হবে। নিজেরা কাছাকাছি আসতে পারবেন।

মুশকিল হয় ছেলে কোথায় থাকবে? শেষে চঞ্চল অনেক বুঝিয়ে নিজের বোনের কাছে কালীঘাটে ছেলেকে রেখে দুজনে মিলে পাঁচদিনের জন্য আরাকু ভ্যালি বেড়াতে যায়। হোটেলে ওঠার পরপরই চঞ্চলের ধুম জ্বর আসে। জ্বর লাফিয়ে ১০৩। চোখ মেলতে পারে না। লোকাল ডাক্তার আসে। ওষুধ খেয়েও একই অবস্থা। রিজার্ভেশন করা আছে তাই পাঁচদিনের দিন ওই অবস্থায় ট্রেনে উঠতে হয়। ওঠার একঘণ্টার মধ্যেই একদম সুস্থ বোধ করে চঞ্চল।

অর্পিতার কাছে মরমে মরে যায় চঞ্চল। কোনও যুক্তি দিতে পারে না। আর অর্পিতা ভাবে চঞ্চলের এই আচরণ ইচ্ছাকৃত। প্রথমে মনে মনে তারপর প্রকাশ্যেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে অর্পিতা। শুরু হয় চরম অশান্তি। চঞ্চল অসহায় হয়ে অর্পিতাকে বোঝাবার চেষ্টা করে। কিন্তু সব বিফলে যায়। নিজের অক্ষমতার জন্য লজ্জিত হয় নিজের কাছে। তাও চেষ্টা করে অর্পিতাকে একা পাবার কিন্তু তখনি দুজনের মাঝে অশরীরী জয়ন্তীর ছায়া হাজির হয়। জয়ন্তীর এই উপস্থিতি কাউকে বোঝাতে পারে না চঞ্চল—না ডাক্তারকে না অর্পিতাকে না নিজের মনকে।

আড়াই বছরের মাথায় অর্পিতা ডিভোর্সের জন্য দরখাস্ত করে। কারণ দেখায় চঞ্চল পুরুষত্বহীন।

ইচ্ছে করলে চঞ্চল এই অভিযোগ মিথ্যে প্রমাণ করতে পারত কিন্তু নিজের প্রতি ঘৃণায় সব অভিযোগ মাথা পেতে নেয়। অর্পিতা চঞ্চলকে ছেড়ে চলে যায়।

চঞ্চল একা হয়ে পড়ে। অর্পিতার জন্য ছেলের সঙ্গে ততদিনে এক বিরাট দূরত্ব তৈরি হয়েছে। সে বড় হয়েছে, নিজের মতো থাকে। মায়ের মৃত্যুর জটটা ততদিনে খুলতে শিখেছে। তাই বাবার কাছে সহজ হতে পারে না। চঞ্চল এখন মনে মনে চায় জয়ন্তী আসুক। বারবার আসুক। অশরীরী জয়ন্তীকে ও কাছে পেতে চায়। জয়ন্তীর অভাবটা পাগল করে ওকে। কিন্তু যেদিন অর্পিতা চলে গেছে তারপর থেকে আর একদিনও জয়ন্তী আসেনি। কিন্তু জয়ন্তীর ছবির সামনে প্রতিদিন চঞ্চল আকুতি জানায়—অনুভবে তোমাকে যে চাই।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%