ঘটনা তাজপুরে

দেবযানী বসু কুমার

সেদিন অনেক রাতে এসে পৌঁছেছিল তাজপুর। রাস্তায় গাড়ি খারাপ হওয়াতে সময়ের চেয়ে প্রায় ঘণ্টা তিনেক বেশি লেগেছিল। তাছাড়াও ছিল রাস্তা জুড়ে লরির ভিড়। তখন আর বাছাবাছির মন বা ইচ্ছে কোনওটাই ছিল না কারও। সামনেই কৃষ্টি রিসর্ট পেয়ে ওখানেই একটা কটেজ ভাড়া করেছে। কিন্তু ঢোকার পরে তিন বন্ধুর, না বন্ধু না বলে কলিগ বলাই ভালো, দারুণ লাগে সবটা মিলিয়ে। যেমন গোছানো ঘর তেমন সাজানো বাগান। রাতে আলো আঁধারিতে যতটা ঠাওর করা গেছে আর কী। তিনজনেই একটা কিন্ডারগার্টেন ক্রেসে কাজ করে। শুধু তো পড়ানোই নয়, দেখভালও করতে হয় বাচ্চাদের। শারীরিক ধকলের সঙ্গে আটকে থাকার সময়টাও অনেক লম্বা। রত্নার বরের এত সামান্য টাকার জন্য রোজ বাইরে বেরোনো বেশ অপছন্দের কিন্তু শাশুড়ি মায়ের জেদের জন্যই কাজটা টিকিয়ে রাখতে পেরেছে। বিয়ের পর যত দিন গেছে ততই বুঝেছে, নিজের জন্য এই বেরোনোটা খুব দরকার। হঠাৎই তিনদিন ছুটি পাওয়াতে হুজুগে চলে আসা। ছেলে রেখে চলে আসার আপত্তি ছিল রত্নার। কিন্তু শাশুড়িমায়ের জোরাজুরিতে ওর না বলাটা ধোপে টেঁকেনি। মনীষাদেবী ফোনটা ধরেছিলেন। আর রত্নার কোনও সম্মতি না নিয়েই হ্যাঁ বলে দিয়েছিলেন একই ক্রেশের আর দুই শিক্ষিকা সঞ্চিতা পাল ও কঙ্কনা কুমারকে। ওনার যুক্তি, উনি আছেন, রত্নার ঠাকুরঝি আছে, ছেলের কোনও অযত্ন হবে না। ঠিক দেখে রাখবেন। সারাবছর স্কুল, সংসার ছেলে নিয়ে একঘেয়ে জীবন। মন শরীর দুটোকেই মাঝে মাঝে ছুটি দিতে হয়। বউমাকে একরকম ঠেলেই পাঠান দুটোদিন জিরিয়ে আসার জন্য। বরং রত্নার খারাপ লাগে ছেলের সব ঝক্কি শাশুড়ি ননদের ওপর ফেলে চলে আসতে। স্বামীটিও অফিসের কাজে গৌহাটি গেছেন। তবে তিনি মাসের বেশির ভাগ দিন কাজের জন্য ট্যুরে থাকেন।

বিয়ের ন’বছর পরেও রত্না বোঝে স্বামীর মনের হদিশ আজ অবধি ও পায়নি। কেমন যেন একটা আলগা ভাব। শ্যামল সারা দিনরাত আপিসের কাজ নিয়েই নিজেকে ব্যস্ত রাখে। মনে খুব লোভ হয় মানুষটার মনের কোণে একটা জায়গা পেতে কিন্তু বোঝে সেটা সম্ভব নয়। একটা কল্পিত রেখা আছে দুজনের মাঝে যেটা শ্যামল কোনওদিন পেরোতে দেয় না। চেষ্টা করলে আরও নির্লিপ্ত হয়ে যায়। রত্না নিজেকেই প্রশ্ন করে এতই যদি অপছন্দ তাহলে সায় দিয়েছিল কেন এই সম্পর্কে? কে বলেছিল বিয়ে করতে?

শরীর খুব ক্লান্ত থাকায় কখন যেন চোখ লেগে গিয়েছিল। পরদিন একটু বেলাতেই ঘুম ভেঙে দেখে আর দুজন তখনও ঘুম থেকে ওঠেনি। দরজাটা আলতো করে ভেজিয়ে দিয়ে বাইরে চলে আসে রত্না। ঘর লাগোয়া খোলা চত্বরে গিয়ে দাঁড়াতেই সারা পৃথিবী দুলে ওঠে। ওর স্বামী যার এখন আসামে থাকার কথা, সেই শ্যামল খুব অশালীন ভাবে ওরই মাসতুতো ননদ মেরীকে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে উল্টোদিকে রিসর্টের সাঁতার পুকুরের পাড়ে। দুজনে তখন দুজনায় মত্ত। দেখলে মনে হবে সম্পূর্ণ বেঁহুশ দুটো মানুষ একাত্ম হয়ে গেছে। খেয়ালই নেই ওদের বাইরে একটা জগৎ আছে। হুঁশ ফেরাতে পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় রত্না। যেন সাপে কামড়েছে, ওকে দেখেই এমনভাবে ছিটকে ওঠে দুজনে। তারপরেই শ্যামল নোংরা গালাগাল দিয়ে রত্নাকে সাবধান করে—মায়ের কানে কথাটা উঠলে ফল ভালো হবে না। তার ঘণ্টাখানেকের মধ্যে রত্না দেখে শ্যামল আর মেরীদিকে হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে যেতে।

কিচ্ছু যেন ভালো লাগে না আর। কী মরতে তাজপুরে এসেছিল ভাবতেই একটা বিস্বাদ যেন ছড়িয়ে পড়ে শরীরে মনে। বোবা কান্নায় গলা বুজে আসে। শরীর ভালো লাগছে না বলে বাকিদের কোনও রকমে কাটিয়ে জলের ধারে নির্জনে গিয়ে বসে একা। কথাটা এতটাই ব্যক্তিগত যে বাকি দুজনকেও বলা সম্ভব নয়। হয়তো তাহলে ফিরে গিয়েই কর্মজগতে রাষ্ট্র হয়ে যাবে। তখন ওসব কাদা ঘাঁটাঘাঁটি শুনতে ভালো লাগবে না। মনের মধ্যে তখন একটা ঝড় বইছে—বাকি জীবনটা নিয়ে কি করবে? যতই ভাবতে থাকে সব যেন জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। এই জন্যই শ্যামলের এত অনীহা ছিল বিয়েতে।

রত্না খেয়াল করত যখনই মেরীদি ওদের বাড়ি আসত, শ্যামলের মা আর বোন অহেতুক বিরক্ত হতেন আর প্রায়শই অকারণে মন্দ ব্যবহার করতেন। যদিও রত্নার খুব ভালো লাগতো মেরীদিকে। যেমন সুন্দর দেখতে তেমন চৌখশ কথাবার্তা। মফস্‌সল কলেজের অধ্যাপিকা। অবিবাহিত। একাই থাকেন নিজের ফ্ল্যাটে। রত্না ওর ননদের কাছেই
শুনেছে মেরীদির যখন আট বছর বয়স তখন ওনার মা মারা যাওয়াতে মেরীদির বাবা আবার বিয়ে করেন। তখন মাসি বোনঝিকে অর্থাৎ মেরীদিকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন। ওরা তিনজন একসঙ্গেই বড় হয়েছে। তারপর চাকরি পাওয়াতে মেরীদি অন্যত্র চলে গেছে। কিন্তু রত্না খেয়াল রাখে এখনও প্রতিমাসেই মেরীদি এসে দু’চারদিন কাটিয়ে যায়। প্রতিবার এসেই বলে একা একা ভালো লাগে না তাই ক’দিন থাকতে এলাম।

ননদের কাছে এও শুনেছে, শাশুড়ি মেরীদির বিয়ের অনেক চেষ্টা করেছেন কিন্তু সব সম্বন্ধই নাকচ করে দিয়েছে মেরীদি। এর মধ্যে যে অন্য গল্প আছে তা কোনওদিন মাথায়ও আসেনি রত্নার। আজ বুঝতে পারে রত্না, ওদের সম্পর্কের কথাটা শাশুড়িমা জেনে গিয়েছিলেন। তাই ছেলের অনিচ্ছা সত্ত্বেও তড়িঘড়ি কোনওরকমে বিয়েটা সেরে ফেলেন। কিন্তু বিবেক দংশনের কাছে হার মানতে হয়। তাই রত্নার প্রতি একটা বিশেষ স্নেহ আছে ওনার। সব সময় আগলে রাখেন। চাকরিটাও ওই জন্যই ছাড়তে দেননি।

কত কথা মনে ভিড় করে আসে। তখন সবে এই চাকরিটা জুটেছে। তাই বাবা মায়ের সঙ্গে গোমুখ দর্শনে যেতে পারেনি। বাবা মা আর ফেরেননি। খবর আসে ফেরার সময় যাত্রী শুদ্ধু বাস খাদে পড়ে গিয়েছিল গঙ্গোত্রীর কাছে। সামলে নিতে সময় লেগেছিল। শোক কাটিয়ে উঠে বোঝে বয়স যাই হোক, এত বড় শহরে একা থাকা সমস্যার। ঠান্ডা মাথায় ভাড়ার বাসস্থানটা ছেড়ে দিয়ে ওঠে গিয়ে একটা মেয়েদের হোস্টেলে। সেই হোস্টেলের মেট্রন রুপা চৌধুরী ওর সম্বন্ধ করেছিলেন তার বন্ধু মনীষা সরকারের ছেলের সঙ্গে। লক্ষ নয়, হাজার নয়, শ’নয়, খুব সামান্য কিছু কথার পরেই চার হাত এক হয়ে যায় শ্যামল ও রত্নার, একদম অনাড়ম্বর ভাবে।

তাজপুর চষে ফেলে সঞ্চিতারা। বেলাবেলি ফিরে এসে দেখে রত্নার কোনও পাত্তাই নেই। যত দিনের আলো পড়তে থাকে ততই পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে বিরক্তি। রত্না যে এত বেয়াক্কেলে সেটা ওদের ধারণার বাইরে। কিন্তু রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা ভয় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। বাকি দুজন তখন আতান্তরে। কোনও কূলকিনারা না পেয়ে কলকাতায় মানিষাদেবীকে জানিয়ে যোগাযোগ করে স্থানীয় থানার সঙ্গে।

এলাকা জুড়ে শুরু হয় তোলপাড়। কিন্তু রত্না যেন উপে গেছে। কে বলে পুলিশ প্রশাসন কাজ করে না? তাজপুরের প্রতিটি কোনায় খোঁজা হয় রত্না কে। কিন্তু মেলে না কোনও চিহ্ন। বেঁচে আছে না মারা গেছে তারও কোনও হদিশ পাওয়া যায় না। সবশুদ্ধু যেন লোপাট।

কিন্তু শ্যামলকে খবর না দিলেও সময়ের আগেই আপিসের কাজ শেষ হয়ে গেছে কৈফিয়ত দিয়ে সে ফেরত আসে পরদিনই। যতই হোক মা তো, শ্যামলের আচরণে কেমন খটকা লাগে। চেষ্টাও করেন কিন্তু কোনও কথাই বার করতে পারেন না।

এদিকে রত্না নিখোঁজ হবার তেরোদিনের মাথায় মেরী কলেজের চাকরিটা ছেড়ে ফিরে আসে মাসির কাছে। যে কোনওদিন রত্নার ছেলেকে গাল টিপেও আদর করেনি তাকেই আঁকড়ে ধরে পরম মমতায়। আগলে রাখে মাতৃস্নেহে। বাড়ির তিন সদস্যই দেখে মেরীর মধ্যে কেমন যেন রত্নার ছায়া—হাবে ভাবে, চলায় ফেরায়, কাজে কম্মে। শ্যামলের ত্রিসীমানায় ঘেঁষে না। মেরীর মধ্যে একটা যেন আমূল বদল। একাই ছেলেকে নিয়ে থাকতে ভালোবাসে। ছোট্ট ছেলে মেরীর কাছে যেতে চায়না কিন্তু মেরী এক মিনিট ছেলেকে চোখের আড়াল করে না।

যত দিন যায় পরিবর্তনটা বড় বেশি প্রকট হয়ে ওঠে। আর শ্যামলও যেন পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায় মেরীর থেকে। চরম ঘটনা ঘটে যেদিন ছেড়ে আসা কলেজের একটা কাগজে মেরীর সইয়ের দরকার হয় বকেয়া পাওনা আদায়ের জন্য। ভুলভাল লিখছে দেখে বার বার ওকে মনে করিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও মেরী কাঞ্জিলালের বদলে রত্না সরকার নাম দস্তখত করে। আরও অদ্ভুত লাগে যখন দেখে, হুবহু মিলে যাচ্ছে রত্না সরকারের সইয়ের সঙ্গে।

বুকটা ভারী হয়ে ওঠে। মনীষাদেবী বুঝতে পারেন বউমা আর বেঁচে নেই। কিন্তু রত্নার আত্মা সন্তানের টানে ফিরে এসে মেরীর দেহে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু খটকা একটা থেকেই যায় মনীষাদেবীর মনে—এটা হত্যা না আত্মহত্যা? কোনওভাবে কি রত্না এই অবৈধ সম্পর্কের কথা জানতে পেরে নিজেকে সরিয়ে ফেলছে, নাকি ওরা দুজন মিলে পথে কাঁটা সরিয়েছে?

একদিন অপ্রত্যাশিত ভাবে মনের কাঁটাটা দূর হয় মনীষাদেবীর। নাতি কিছুতেই মেরীর কাছে শোবে না। দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর উনি বারান্দায় বসে একটা পত্রিকাতে চোখ বোলাচ্ছিলেন। বারান্দার দরজা আলগা করে ভেজানো কারণ নাতি ওনার খাটে ঘুমোচ্ছে। হঠাৎ একটা আওয়াজে চোখ চলে যায় ঘরের ভেতর। দরজার সরু ফাঁক দিয়ে দেখেন ঘুমন্ত ছেলেকে জড়িয়ে ধরে মেরী কাঁদছে আর বলছে—আমার যতই কষ্ট হোক, তোকে ছেড়ে আমি মরতে চাইনি। কিন্তু ওরা দুজন আমাকে বাঁচতে দিল না। সরিয়ে দিল ওদের পথের কাঁটা।

স্তব্ধ হয়ে যান মনীষাদেবী। বুঝতে পারেন এটা হত্যা। এ আত্মাকে সরানো খুব সহজ নয়। আর উনি সারাতেও চান না। সরকারি মতে সাত বছর বা হিন্দু মতে বারো বছর পর ওর ছেলে যা ভালো বুঝবে তাই করবে। উনি উপযাজক হয়ে কোনও শান্তি সস্তয়ন বা পারলৌকিক কাজের কথা বলবেন না। মনে মনে বলেন, এটাই শ্যামল আর মেরীর পাপের প্রায়শ্চিত্ত।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%