দেবযানী বসু কুমার

যখন বুঝতে পারল তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। বুঝতে পারল যে সে এক বিরাট চক্রান্তের শিকার আর সব কিছুই তখন হাতের বাইরে। কিছুক্ষণ কেঁদে বুক ভাসাবার পর একসময় চোখের জলও শেষ। তখন মাঝরাত। বিমান বন্দরে নেমে ট্যাক্সি নিয়ে এসেছিল শহরের জনবহুল রাস্তায়। জায়গাটা কম্বারলান্ড নদীর পাশে হার্ড রক ক্যাফের উল্টোদিকে বাস গুমটির কাছে। বেঞ্চে বসিয়ে সেই যে চলে গিয়েছিল আর ফেরেনি। তখন এসব চিনতাম না। পরে শুনেছিলাম।
তখন রাত বারোটা। ঝমাঝম গান বাজনা চলছে। চারদিকে আলোয় আলো। নিজের দেশ ছেড়ে এত দূরে উড়ে এসেছে লোকটার হাত ধরে। এদের চালচলন কথাবার্তা কিছুই বুঝতে পারছে না। কত লোক এসে কত কি বলে যাচ্ছে কিন্তু ও শুধুই ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। বাংলা আর দু’একটা ইংরিজি কথা ছাড়া অন্য কিছুই বোঝে না যে, সে এই ভিনদেশিদের কথা কি করে বুঝবে? আর যে লোকটার সঙ্গে এতদূর এল, সে ওকে বসিয়ে রেখে যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।
বেণী একদম অজপাড়াগাঁ বর্ধমান জেলার তেলো গ্রামের দশ ক্লাস পড়া মেয়ে। হঠাৎ বিয়েটা হয়ে গেল বলে আর পরীক্ষাটাও দিয়ে ওঠা হল না। অনেক হাতে পায়ে ধরে ছিল বাবা মায়ের, অনেক কান্নাকাটি করেছিল পরীক্ষাটা দেবার জন্য কিন্তু কেউ কানেও তোলেনি।
আছে বলতে বাপের একটা মুদির দোকান, তাতে না আছে বিক্রিবাটা না আছে টাটকা মাল। সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। নিজেরা তিন বোন।
বড় দুজন আকাট মুখ্যু। দুজনেরই বিয়ে হয়ে গেছে। মেজো দিদি বিয়ের পর বিধবা হয়ে ছেলে কোলে আবার বাপের ঘাড়ে। মা চিররুগ্না। বাপকেও দোষ দেওয়া যায় না। সংসারের যা হাঁড়ির হাল, যেন তেন ভাবে পার করতে পারলেই বেঁচে যান। আর তার সঙ্গে ইন্ধন ছিল মেজদির। সেও ভাবতো ভাতের পাত একটা কম হলে ওর ছেলের মুখের গরোসটা একটু বড় হবে। তাই যেচে যখন সম্বন্ধটা এল তখন কাউকে থামানো গেল না। বড় জামাইদাদা মিনমিন করে আপত্তি জানাতে চেয়েছিলেন কিন্তু ধোপে টেঁকেনি।
বেণী শুধু দেখতেই সুন্দর নয় পড়াশুনোতেও মাথা ছিল ভালো। কিন্তু যে গুণটা ভগবানদত্ত তা হল গানের গলা। না শুনলে বোঝানো যাবে না সে রসের ভাণ্ডার। ওর গলায় সুর ওপরওয়ালা মেপেজুপে দেননি। দু’হাত ভরে উজাড় করে দিয়েছিলেন। ওর গান মানুষকে নেশা ধরায়। যে নাচ জানে না তারও কোমরটা দুলে ওঠে, পা দুটো পাক খায়।
বেণী ছিল অলিখিত লোক-গানের সাম্রাজ্ঞী। পায়নি কোনও তালিম ছিল না কোনও সহায়। আশেপাশের বাড়িতে বেতারে বা দূরদর্শনে শুনে শুনে শিখত। আসলে শিখতে ওকে হয়নি, একবার শুনলে গান আপনি ওর গলায় উঠে আসত। এছাড়াও এ গ্রাম সে গ্রামের যাত্রাপালা, গানের মজলিশ থেকেও শিখেছে অনেক। ওর গানের ঝুলি ভরা ছিল সারি, ঝুমুর, বাউল, লালন, কেত্তন গানে। ও তো নামও জানত না, যেখানে যা লোকগান শুনত বোঝাই করত গানের ঝুলিতে। সুযোগ পেলেই গ্রামের নানা উৎসবে বিনাপয়সায় গান গাইত। এই বিনাপয়সায় গান করে বলেও বাড়িতে শুনতে হত গালমন্দ। কিন্তু কী করবে? ওর যে গাইতে ভালো লাগে। যন্ত্র বলতে মাটির হাঁড়ি, দোতারা আর একটা ভাঙা হারমোনিয়াম। সেটাও পেয়েছিল গ্রাম সুবাদে এক কাকার কাছ থেকে। সামান্য হলেও অন্য ভাবে দাম দিতে হয়েছিল তার জন্য।
আবার এই গানই হল কাল।
গ্রামের শিবমন্দিরে শিবরাত্রির রাতে গানের জলসায় এসেছিল অনেক নামি-দামি শিল্পী কলকাতা আর সুদূর পূববাংলা থেকে। বেণী মাতব্বরদের জন্য কয়েকটা গান গাইবার সুযোগ পেয়েছিল সেইদিন নাটমন্দিরে সন্ধে রাতে। আর তখনি চোখে লেগে যায় এক বাজনদারের। যেমন ঝকঝকে চেহারা তেমন মন মজানো কথাবার্তা। সে রাতের পর সবাই চলে গেলেও তিনি রয়ে গেলেন। দু’দিনেই হাত করলেন গ্রামের ছোট থেকে বড় সবাইকে। অভাবের সংসারে দু’হাতে টাকার বৃষ্টি করে আর হাবেভাবে ঘরের ছেলে সেজে বাবা মায়ের মনে বেশ পাকাপোক্ত ভাবে গেঁড়ে বসলেন। তারপরেই বেণীর সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব। একটাই শর্ত বাংলাদেশ থেকে কারও আসা সম্ভব নয় আর নিজেও ব্যস্ত মানুষ তাই একেবারেই বিয়ে সেরে বউ নিয়ে ফিরবেন। কানাকড়িও খরচ না করে ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গেল চৌধুরীর সঙ্গে। বিয়ের আটদিনের মাথায় নতুন বরের হাত ধরে রওনা দেয় পূর্ববঙ্গে।
বাংলাদেশ পৌঁছে গিয়ে ওঠে এক কামরার একটা ঘরে। প্রশ্ন করে জানতে পারে শ্বশুড়বাড়ির লোকজন থাকে অনেক দূরে এক অন্য জেলায়। থাকার জায়গা, আশপাশটা দেখে বেণী কেমন সিঁটিয়ে যায়। মনটা যেন কেমন কেমন লাগে। সংসারে একটা ছন্নছাড়া ভাব। সারাদিন ইয়ার দোস্তের আনাগোনা। রাত হলেই ডুব ডুব ডুব ফুর্তি সাগরে শরীর মন। ইচ্ছে না থাকলেও তাতে শরিক হতে হয়। তারপর একদিন শোনে যেতে হবে আমেরিকা। ওখানেই নাকি চৌধুরী চাকরি করেন।
মনে একরাশ ভয় নিয়ে একদিন সত্যি সত্যি বরের হাত ধরে পাড়ি দেয় বেশি। আর তারপরেই বুঝতে পারে কোনও একটা জালে জড়িয়ে পড়েছে। এর থেকে কেটে বেরোনো ওর মতো অর্ধশিক্ষিত মেয়ের পক্ষে কোনও মতেই সম্ভব নয়। পুরুষ জাতটার ওপর তৈরি হয় একটা ক্রোধ, একটা ঘৃণা, একটা অবিশ্বাস তা সে বাবাই হোক বা স্বামী বা পরপুরুষ।
সকাল থেকে অপেক্ষা করতে করতে বেণীর একটু ঝিমুনির ভাব এসেছে। তখন বেশ রাত, এসে দাঁড়ায় কালো দৈত্যের মতো একটা লোক। কত কথা বলে যায়, তার মধ্যে চৌধুরী কথাটাই শুধু বেণী বুঝতে পারে। আর কোনও উপায় না দেখে একরাশ ভয় বুকে চেপে লোকটার পিছু-পিছু এগিয়ে যায়। এগিয়ে যায় নিজের সর্বনাশের
দিকে। মনকে বোঝায় শক্ত হতে হবে। বিদেশ বিভূঁইয়ে আত্মহত্যা করাও শক্ত।
এরপর বহুবছর কেটে গেছে। ওর গলায় লোক-গানের কথা মানুষের মুখে-মুখে ফেরে। ও যেদিন যে পাবে গান গায় সেইদিন সেই পাব মালিকের তিন গুণ রোজগার। দোকানের বাইরে ভেতরে সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শোনে। দেখে মনে হয় গুড় পড়েছে আর তাতে মাছি ভন ভন করছে। বেণীর গলায় বাংলার লোকগান বিদেশি ছেলে বুড়োকে করে ঘর ছাড়া পাগল। কখনো লালনগীতি শুনে নেশায় বুঁদ, কখনো বাউল শুনে কৃষ্ণ প্রেমে মাতোয়ারা আবার কখনো সারি শুনে নদীর ঢেউয়ের মতো ছলাৎ করে ওঠে গেলাসের রঙিন পানীয়। আজ দিন পাল্টেছে। ও এখন সত্যি লোকগান সম্রাজ্ঞী। যৌবন প্রৌঢ় সবাই ওকে শুধু একটু ছুঁতে চাইছে, পান করতে চাইছে ওর গলার সুধারস, হারিয়ে যেতে চাইছে ওর অতল শরীরের মাদকতায়। কিন্তু এখন ওর দিন। তাই ওর কথাই শেষ কথা।
আঠারো বছর বয়সে এসেছিল আর আজ ওর প্রায় ঊনতিরিশ ছুঁই ছুঁই। এগিয়ে চলেছে একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে। মরণ রোগ বাসা বেঁধেছে ওর রক্তে। মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও মৃত্যু গুহায় ঢুকতে পারছে না ওষুধের কল্যানে। কিন্তু মরতে ওর ভয় নেই। মরতেই তো চায়। এই ঘৃণ্য জীবন রাখার থেকে মৃত্যু অনেক আপনার। কিন্তু কোন ছোটবেলা শুনেছিল আত্মহত্যা মহাপাপ। বেঁচে থেকেও পাপের জীবন আবার মৃত্যুতেও পাপ! এত পাপ রাখবে কোথায়? তাই ও কথা ভাবতে মন সায় দেয়নি।
এই মারণ রোগ ওর শরীরে খেলে বেড়াচ্ছে বলে একটা উৎকট আনন্দ পায়। এই ওর প্রতিহিংসা নেবার একমাত্র হাতিয়ার। হেসে হেসে জানোয়ারের অধম পুরুষগুলোকে কাছে টেনে নেয়, পরিবর্তে ওদের শরীরে অল্প অল্প করে ঢেলে দেয় এই মারণ রোগের বিষ। যখন শয়তানগুলো টের পায় রক্তে রোগের চিহ্ন তখন দিশেহারা হয়ে পড়ে। শুধু এই দিশেহারা ভাবটা দেখার জন্য বেণীর অনেকদিন বাঁচতে ইচ্ছে করে।
এসব তো অনেক পরের কথা। যে লোকটার হাতে প্রথম পড়েছিল, তাকে অতটাও খারাপ মনে হয়নি। যদিও ওকে নিয়ে বেশ কিছুদিন ফুর্তি করেছিল কিন্তু লোকটার কাছেই জানতে পেরেছিল অনেক কথা। শহরটার নাম ন্যাশভিল—মানে লোকগানের শহর। বেণীর স্বামী চৌধুরী আসলে একজন দালাল। বাংলাদেশে স্ত্রী সন্তান পরিবার সংসার সব আছে। যেখানে যেমন অশিক্ষিত অথচ ভালো গাইয়ে পায়, তাদের সঙ্গে মেকি বিয়ের অভিনয় করে এদেশে নিয়ে এসে পাব মালিকদের কাছে বেচে দেয়। শুধু এখানেই নয়, পৃথিবীর অন্যান্য শহরেও এই কারবার করে যেখানে যেমন দরকার। এ এমন একটা শহর যেখানে দিন থেকে রাত, রাত থেকে দিন চলে গান বাজনা।
ভোরের দিকে একটু ঝিমোলেও পাবগুলো কখনো বন্ধ হয় না। ভেতর বাইরে সব ঠাসা নেশাগ্রস্থ সুস্থ গান পাগল সব উঠতি তরুণ তরুণীদের। চেহারা দেখে মনে হবে সব বাপে তাড়ানো মায়ে
খেদানো। সবাই লোকগানের সুরে বিভোর। বেশিরভাগের এক হাতে গিটার অন্য হাতে মদের বোতল। গান যখন দমকে পড়ছে গ্লাস থেকে রঙিন তরল তখন ছলকে উঠছে। এছাড়া রাস্তায় রাস্তায় অলিতে গলিতে দেশি ভিনদেশি আগন্তুকের ভিড়ে জায়গাটা সদা সরগরম। এছাড়া এখানকার গিটার খুব বিখ্যাত তাই দেশ-বিদেশের খরিদ্দারের ভিড় লেগেই আছে।
প্রথম ক’দিন কাঁদার পর বেণী বুঝতে পারে কেঁদে কোনও লাভ নেই। কেউ ওর চোখের জল মোছাতে আসবে না। মনকে এবার শক্ত করে বেণী। ইতিমধ্যে ও চালান হয়ে গেছে এক পাব মালিকের কাছে। কী কাজ? না দিনরাত গান গাইতে হবে আর প্রয়োজনে বেশ্যা বৃত্তিও করতে হবে। তবে লড়াইটা খুব কঠিন ছিল না। দু’দিনেই ওর নাম লোকের মুখে মুখে ফেরে। এখানে ওর নতুন নামকরণ হয়েছে বেণী চৌধুরী থেকে বিনো। ততদিনে ওকে নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে গেছে পাব মালিকদের মধ্যে। যে মালিকের কাছে গেছে তারই আঙুল ফুলে কলাগাছ। তবে বছর চারেক পর থেকে মালিক বদল হয় ওর মর্জিতে আর সাত-আট বছরের মাথায় ও নিজেই এক পাব এর মালকিন। আর মালকিন হবার পর ওর একমাত্র কাজ, যে সব উঠতি মেয়েকে জোর করে ফুসলিয়ে গানের শিল্পী বানাবার লোভ দেখিয়ে আনা হয় তাদের আগলে রাখা। আর ওই দালালগুলোর শরীরে মারণ রোগের বিষ ঢেলে দেওয়া। যেই ওর সঙ্গে রাত কাটায় তার শরীরে পাওয়া যায় সুচের চিহ্ন। শুধু শরীরী খেলার ওপর ভরসা রাখতে পারে না, খদ্দেরকে মদের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে নিজের রক্ত চালান করে ভোগী পুরুষটার দেহে।
যত দিন যায় বেণী বোঝে নিস্তেজ হয়ে আসছে শরীর। মরণ শিয়রে জেনে মনে মনে ওর ঈশ্বরকে বলে মৃত্যুর পর আমার আত্মার মুক্তি চাই না। এভাবেই নারীমাংসলোলুপ পুরুষ পিশাচগুলোকে যেন শাস্তি দিতে পারি। তারপর সত্যি-সত্যি একদিন যমদূত এসে বেণীর দরজায় কড়া নাড়ে।
মৃত্যুর পর বেণীর আত্মা ন্যাশভিলের আকাশে বাতাসে ঘুরে বেড়ায়। আগলে রাখে নিষ্পাপ মেয়েগুলোকে বদ লোকের খপ্পর থেকে। অশরীরী হয়ে ঘুরে বেড়ায় পানশালায়, পাবে, বেশ্যাপল্লীর চোরা কুঠুরির অলি গলিতে যেখানে চলে অসহায় মেয়েগুলোর ইচ্ছের বিরুদ্ধে অবাধ রাতখেলা। তবে সারা শহর বিনো জ্বরে কাবু। নরপিশাচরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে বেরিয়ে এসেই বলে লাস্যময়ী বিনোকে দেখেছে ওদের গায়ে সুচ ফোটাতে। সবাই ভাবে নেশার বিকার কিন্তু না কিছুদিনের মাথায় তাদের শরীরে মারণ রোগের চিহ্ন প্রকট হয়ে ওঠে।
বেণীর আত্মা অপেক্ষা করে আছে কবে দেখা পাবে ওর সাজানো স্বামী চৌধুরীর? ওর শরীরে রোগটা ঢুকিয়ে দিতে পারলেই ওর আত্মার ছুটি।
বেণী জানে অনেক ভালো কাজ ও করেছে তাই স্বর্গপ্রাপ্তি ওর হবেই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন