দেবযানী বসু কুমার

আমি কাজলকণা চৌধুরী। আজ আমার শ্রাদ্ধ। দেওয়াল জোড়া আমার একটা সাদা কালো ছবি। চৌধুরী প্যালেস সাদায় সাদা। সাদা কালো ছাড়া অন্য রঙের চিহ্নমাত্র নেই। সবার পরনে দুধ সাদা পাজামা পাঞ্জাবি অথবা শাড়ি বা সালোয়ার কামিজ। কোনও কোনওটাতে অল্প কালোর ছোঁয়া। আমার চার বছরের ছেলেটাও সাদা শেরওয়ানি পরে দৌড়ে বেড়াচ্ছে সারা বাড়ি। তপন দুধ সাদা পাজামা পাঞ্জাবি পরে আমার পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম করছে পুরোহিত মশাইয়ের কথামতো। এমনকী তপনের নির্দেশে কেটারারের ছেলেগুলো ‘আছে দুঃখ আছে মৃত্যু’ লেখা সাদা টি-শার্ট আর কালো প্যান্ট পরে ইতিউতি লনে খাবার সার্ভ করছে। যদিও নিরামিষ কিন্তু এলাহী আয়োজন।
জ্যৈষ্ঠের মধ্যদিন। তাই কাগজি লেবু দেওয়া সাদা ঘোলের শরবতে সবাই প্রাণ ঠান্ডা করতে করতে শোক জ্ঞাপন করছে। অত বড় বাড়িটা জুঁই ফুল, বেল ফুল আর সবুজ সাদা পাতাবাহার দিয়ে কী দারুণ সাজানো হয়েছে। দামি ধূপের গন্ধ সারা বাড়িময়। মৃদু গুঞ্জন ছাড়া বিশেষ কেউ কথা বার্তাও বলছে না। তপনকে সবাই কত সাধ্য সাধনা করছে কিছু মুখে দেওয়ার জন্য, নিদেনপক্ষে একটু শরবৎ। কিছু মুখে দেয়নি ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে। খালি যখন পোশাক পাল্টাতে গিয়েছিল ঘরে তখন এক গ্লাস টাটকা বেদানার রস আর ওষুধগুলো খেয়েছে। কিন্তু কেউ সেটা জানে না আমি ছাড়া। আমাদের বিয়ের পর তপন এই বাড়িটা করেছে। বিয়ের পর ছ’মাস আমরা উত্তর কলকাতায় ওদের পৈতৃক বাড়িতে থাকতাম। তপন বলতো চৌধুরী প্যালেস নাকি ওর ভালোবাসার রাজপ্রাসাদ। তপনের ভালোবাসার রাজপ্রাসাদ আজ শোকাচ্ছন্ন। দেওয়াল জোড়া আমার ছবিটা কী জীবন্ত! প্রতিটা রোমকূপ দেখা যাচ্ছে। চোখের মণিটা যেন কথা বলছে। রং বলতে আমার কপালে একটা আধুলির মাপের লাল টিপ্।
এখনও মনে আছে এই ছবিটা তপন তুলেছিল আমার বিয়ের বছর দুয়েক পরে। সে সব দিনে তপন আমাকে চোখে হারাত। তখন আমি অন্তঃসত্ত্বা। সেদিন ছিল আমার পাঁচ মাসের পঞ্চামৃত। সব শেষ হতে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিলাম। আমাকে দেখে বেসামাল হয়ে পড়েছিল তপন। বেশ কয়েকটা ছবি তুলে আমাকে নিয়ে ঘরের দরজায় ছিটকিনি তুলে দিয়েছিল। আদরে আদরে ভরিয়ে তুলেছিল। সম্পূর্ণভাবে আমি তখন তপনের দখলে।
পাঁচমাসের সাধের জন্য বাড়িতে অনেক অতিথি। যদিও খুব লজ্জা করছিল কিন্তু কিছুতেই নিজেকে ওর বাহুবন্ধন থেকে ছাড়াতে ইচ্ছে করছিল না। সেদিন সময়ের কোনও হিসেবে ছিল না আমাদের দুজনের। কখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে খেয়াল ছিল না। এলমেলো অবশ দুটো শরীর কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল।
ছেলে হল। আরও আদুরী হয়ে উঠলাম বরের। ছেলের অন্নপ্রাশনের দিন আমার এক দূর সম্পর্কের বোন এল। আমাকে গলা জড়িয়ে ঠাট্টা করে বলে উঠল, জানি তুই খুব বর সোহাগী। অনেকদিন বরের আদর খেয়েছিস এবার থেকে তপনদা আমার। আর জানিস তো আমি যা চাই তা আমি নিয়েই ছাড়ি। কথাটা শেষ করে হো-হো করে হেসে গড়িয়ে পড়ল তপনের গায়ে।
বরাবরের ঢলানি আমার এই বোন—মনোবীণা দাশগুপ্ত। যদিও দূর সম্পর্কের তাও খুব আসা যাওয়া ছিল আমাদের বাড়িতে। ও যখন কথা বলত সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনত। চোখ ঝলকানো রূপ ছিল ওর। ও এসে দাঁড়ালে মনে হত সূর্যের ছটা বেরোচ্ছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল মেধাবী ছাত্রী। বিয়ে হয়েছিল কিন্তু বেশিদিন স্থায়ী হয়নি সে বিয়ে। বরকে ওর মনে হত খুব ম্যাদামারা গোবেচারা ধরণের। আমারও রূপ ছিল কিন্তু চাঁদের জ্যোৎস্নার মতো স্নিগ্ধ। পিঠ ছাপানো কোঁকড়া চুল। আর আমার প্রকৃতিও ছিল খুব শান্ত। আমার বিয়ের দিন তপনকে দেখে এক ঘর লোকের সামনে মনোবীণা বলেছিল, এ কী রে কাজল, এ তো বাঁদরির গলায় মণিমাণিক্যের মালা। সামলাতে পারবি তো? তারপর কোথা থেকে একটা মালা নিয়ে এসে তপনের গলায় পরিয়ে দিয়ে বলেছিল, মশাই অর্ধেকটা সেরে রাখলাম, কাজল আপনার কাছে পুরোনো হয়ে গেলে বাকি অর্ধেকটা সারব। সেদিন সবাই শালির ফাজলামি বলে ব্যাপারটা উড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু আমার ভালো লাগেনি। তপনেরও ভালো লাগেনি বুঝেছিলাম। খুব নিচু গলায় আমাকে বলেছিল—খুব গায়ে পড়া মেয়েটা।
কেমন যেন আস্তে আস্তে তপন পাল্টে যাচ্ছিল। প্রথমে ভাবতাম আমার মনের ভুল। পরে মনে হত না, এটা আমার বোঝার ভুল না, এটাই ঠিক। এক এক দিন ঝড়ের মতো মনোবীণা এসে তপনকে বলত—চলো কফি খেয়ে আসি। আর আমাকে বলত, তুই বরং তোর কাঁদুনে ছেলে সামলা। তারপর দুজনেই বেরিয়ে যেত। কফি খেতে গিয়ে ফিরত কয়েক ঘণ্টা পরে। ঘন-ঘন তপন বাইরে যেত ব্যবসার কাজে। ড্রাইভারের কাছে শুনেছি প্রতিবার নাকি মনোবীণাও যেত। সব জেনেও না জানার ভান করতাম শুধু আমার ছেলের কথা ভেবে।
দিনগুলো রাতগুলো বড় নিঃসঙ্গ লাগত। গল্প করত না। ভুলেও কখনো আমাকে কাছে টানত না তপন। সেদিন আমার জ্বর হয়েছিল। বিকেলে মনোবীণা এসেছিল। বাড়ি ফিরতে পারেনি দারুণ ঝড় জলের জন্য। বিকেলে কালবৈশাখী তারপর টানা ঘণ্টা দুয়েক বৃষ্টি। রাস্তা ঘাট জল জমে একসা। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে দেখি তপন পাশে নেই। বিছানা ছেড়ে উঠে বাইরে যেতেই দেখি তপনের কাজের ঘরে আলো জ্বলছে। দরজা হাট করে খোলা। ডিভানে দুজনে শরীরী খেলায় মত্ত। আমি শব্দ না করে টলতে টলতে ঘরে ফিরে এলেও ওরা বুঝেছিল আমি সবটা দেখেছি। তখনি মনে হয় দুজনে ঠিক করে নিয়েছিল, আর আমাকে বাঁচতে দেওয়া যাবে না।
খুব কড়া ওষুধ খেয়েছিলাম। তাই চোখ খুলে রাখতে পারছিলাম না সে রাতে। হঠাৎ কানে এল এই মাফলারটা নাও। তারপর অনুভব করলাম মাফলারের ওপর দুটো আঙুল চেপে বসছে আমার গলায়। আমি চিৎকার করতে চাইলাম। টুঁ শব্দ বেরোল না। পাশে আমার ছেলেটা ঘুমোচ্ছে। মাফলারটা তপনের জন্য আমার হাতে বোনা। বালিশের পাশে থাকত কারণ রাতে তপনের বেশ কাশি হয়। আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। আমি কেমন যেন তলিয়ে যাচ্ছিলাম। তারপর আমি হারিয়ে গেলাম অন্য একটা জগতে। আমার নিথর দেহটা পড়ে আছে বিছানায়। ডাক্তার এল। খুব পরিচিত আমাদের। তপনের বন্ধু বলা যেতে পারে। তাকে তপন সোজাসুজি মিথ্যে বলল। হঠাৎ কাজলের শরীরটা মাঝরাতে আনচান করে উঠল। তারপরেই সব শেষ। ডাক্তার হার্ট ফেল ‘ডেথ সার্টিফিকেট’ দিয়ে চলে গেলেন। দাহ হয়ে গেল আমার শরীর। কিন্তু আমি রয়ে গেলাম।
আজ শ্রাদ্ধে আমার বাবা-মা কেউ আসেননি। তপন নিজে গিয়ে বলে এসেছিল। একমাত্র ওনারাই মনে হয় মৃত্যুটা স্বাভাবিক নয় আন্দাজ করেছিলেন। কিন্তু ওনারা নিম্নবিত্ত। তাই সাহস করে কিছু বলতে পারেননি বা কোনও আইনি সাহায্যের কথা ভাবেননি। খালি আমার ছেলেটাকে চেয়েছিলেন। কিন্তু তপন দিল না। বলল, এত অভাবে ও বড় হয়নি। এখানে মানাতে পারবে না।
এই তেরো দিন দেখছি মনোবীণা আর তপনের ঘনিষ্ঠতার কোনও কমতি নেই। তার মধ্যে পরামর্শ করছে। ঠিক করেছে আমার শ্রাদ্ধ হয়ে গেলেই ছেলেকে কোনও আবাসিক স্কুলে পাঠিয়ে দেবে। ভেবেছিলাম কোনও প্রতিশোধ নেব না। কিন্তু না। একটা উচিত শিক্ষা দিতেই হবে।
আমার শ্রাদ্ধের দিন গভীর রাতে আমার বিছানায় দুজনে ঘুমোচ্ছিল। ছেলেটা পাশের ঘরে কাজের লোকের সঙ্গে। ভর করলাম তপনের ওপর। কোনও মাফলারের সাহায্য নিলাম না। তপন হঠাৎ জেগে উঠে দুই বুড়ো আঙুল দিয়ে চেপে ধরল মনোবীণার গলা। আঙুলের দাগ চেপে বসে গেল গলায়। যখন তপন বুঝতে পারল তখন অনেক
দেরি হয়ে গেছে।
মনোবীণার গোঙানির শব্দে কাজের লোকেদের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। তপন তখন ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছে। ঝি চাকরেরাই পুলিশে খবর দিল। তপনকে থানা থেকে ধরে নিয়ে গেল। আর মনোবীণার শরীর গেল কাটাপুকুরে। খুন তো প্রমাণ হবেই। তারপর তপনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। মা এসে ছেলেকে নিয়ে গেল। ছেলে এবার থেকে আমার মায়ের কাছে থাকবে। এবার আমি নিশ্চিন্তে ঘুমোব।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন