ধানকোড়া

দেবযানী বসু কুমার

বাড়ির নাম ধানকোড়া। বাড়ির সর্বময় কর্ত্রী বীণাপানি মিত্র। নিঃসন্তান বিধবা। অত্যন্ত রাশভারী। চেহারাতে ছিল সৌন্দর্যের সঙ্গে আভিজাত্যের মিশেল। অগাধ সম্পত্তি পেয়েছিলেন শ্বশুরবাড়ি সূত্রে। ওনার স্বামী ছিলেন একমাত্র সন্তান। মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে স্বামীকে হারিয়ে ছিলেন শ্বশুর শাশুড়ির ছত্রছায়ায়। তারপর ওনারা মারা যাবার পর ভাইয়ের পরামর্শে বীণাপানির শ্বশুরবাড়ি বিহারের ধানকোড়া গ্রামের সমস্ত জমিদারি বিক্রি করে চলে এলেন বাপের বাড়ির শহর কলকাতায়। বাড়ি করলেন ভবানীপুরের কাঁসারি পাড়ায়। যেহেতু ধানকোড়া গ্রামের সম্পত্তি বিক্রির টাকায় এই বাড়ি, তাই নামকরণ হল ধানকোড়া। যদিও এখন বাড়ির বেশ ভগ্নদশা কিন্তু তার অবয়ব দেখে বোঝা যায় বাড়ির মালকিন একজন সৌখীন মানুষ ছিলেন।

এক অন্ধ গলির শেষ প্রান্তে তিনতলা গাড়িবারান্দাওয়ালা বহু পুরোনো বাড়ি। বাড়ির সামনে পিছনে অনেক জমি। বোঝা যায় একসময় সুন্দর বাগান ছিল। দু’মানুষ উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা পুরো চৌহদ্দিটা। তবে এখন অযত্নে অবহেলায় বাগানের করুণ অবস্থা। চারদিক আগাছায় ভর্তি। বড় বড় কাঁঠাল নিম শিউলি এমন ভাবে জীর্ণ বাড়িটাকে ঘিরে রেখেছে যে বাইরে থেকে ভালো করে আর আগের মতো দেখাই যায় না। কিন্তু একসময় এরকম ছিল না, বাড়ি গম গম করত মানুষজনের ভিড়ে।

আর্থিক অবস্থা বেশ ভালো ছিল বলে খুব দেমাক ছিল। প্রতিবেশীদের সঙ্গে তাই মেলামেশা ছিল না। উল্টোদিকে প্রতিবেশীরাও ধানকোড়াকে এড়িয়ে চলত। চাকর বাকর ছাড়া মালিক শ্রেণির কেউ কখনো হেঁটে ঢুকত বেরোত না। বীণাপানি একা না, বাড়ি করে এসে উঠলেন ভাইয়ের পরিবারকে নিয়ে। ভাই ভাইবউ আর দুই ভাইঝি। এছাড়া ছিল কিছু অভাবী তুতো আত্মীয়স্বজন। সবাই মালকিনের কাছে জোড়হস্ত। ওনার কথাই ধানকোড়া বাড়ির শেষ কথা। হঠাৎ কোথাও কিছু নেই, সন্তান হতে গিয়ে মারা গেলেন ভাজ। বাড়িতে শোকের ছায়া নামল। ভাই সদ্যোজাত সন্তানকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে এসে বোনের হাতে দিয়ে বললেন, আজ থেকে ও তোর। যদিও ভাজ খুব আদরের ছিল ননদের কাছে, তাহলেও মনে একটু আনন্দই হল নিঃসন্তান পিসির। ভাইঝিরা আর বিশেষ করে ভাইপো বীণাপানি দেবীর প্রাণ। ওদের মানুষ করাই ওনার একমাত্র ধ্যান জ্ঞান হয়ে উঠল। ওদের বড় করার মধ্যেই উনি পেলেন সন্তান সুখ। পিসির আদরে মায়ের অভাবটা ভাই বোনেরা সেভাবে বুঝল না। ভাইঝিরা বড় হয়েছে। তাই ভাইয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে খুব ঘটা করে দুই ভাইঝির বিয়ে দিলেন। বড়জন পাড়ি দিল ইংল্যান্ড আর ছোট চলে গেল সুদূর কানাডা।

ইতিমধ্যে আশ্রিত আত্মীয়রাও নিজেদেরটা গুছিয়ে নিয়ে চলে গেছে তাদের সুবিধেমতো। কখন যেন বাড়িটা বড় ফাঁকা হয়ে গেছে। কেমন যেন মনখারাপ করা নির্জনতা। সেরিব্রাল অ্যাট্যাক, দু’ঘণ্টার নোটিসে ভাইও মারা গেল। বোন মনে মনে খুব ভেঙে পড়লেও ভাইপোকে নিয়ে মন শক্ত করে উঠে দাঁড়ালেন, দুঃখ ভুললেন। এত বড় খাঁ-খাঁ বাড়িতে প্রাণী বলতে পিসি ভাইপো ড্রাইভার রাঁধুনি আর ঠিক কাজের লোক। সবাই সারাদিন কাজ করে বিকেলে চলে যায় আবার পরদিন আসে।

ইতিমধ্যে ভাইপো ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে চাকরিতে ঢুকেছে। পাসপোর্ট তৈরি হচ্ছে দেখে জানলেন এ যা কাজ, যে কোনওদিন বিদেশ যেতে হতে পারে। সে শুনেই পিসি তো উঠেপড়ে লাগলেন ভাইপোর বিয়ে দেবার জন্য। উনি একটু পুরোনো ধ্যান ধারণার মানুষ। বিয়ে না দিয়ে একা কিছুতেই যেতে দেবেন না বিদেশে। যাই হোক কপাল গুণে পেয়েও গেলেন মনের মতো ভাইপো বউ। কিন্তু যে ভয়টা পেয়েছিলেন সেটাই হল। বিয়ের দুবছরের মাথায় বউকে নিয়ে ভাইপো পাড়ি দিল পৃথিবীর আর এক প্রান্তে, আমেরিকার লস এঞ্জেলেস।

মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেও বাইরে তা প্রকাশ পেল না। অত্যন্ত শক্ত মনের মহিলা বীণাপানি। মেনে নিলেন একাকিত্ব। ফোনে যোগাযোগ রইল ভাইপো ভাইঝির সঙ্গে। একদিন কলকাতায় তখন মাঝরাত, ফোনে গেল লস এঞ্জেলেস—শরীরটা ভালো লাগছে না। খুব দেখতে ইচ্ছে করছে তোদের। সময় করে তিন ভাই বোন একবার ঘুরে যা। ওখান থেকেই ফোনে যোগাযোগ করে কলকাতা অফিসের কলিগদের সাহায্যে মাঝরাতেই পিসিকে ভর্তি করা হল হাসপাতালে। পাড়া প্রতিবেশী এমনকী বাড়ির কাজের লোকেরাও কিছু টের পেল না।

কর্মক্ষেত্রে নানান সমস্যা থাকায় তিনজনের কেউই কলকাতায় আসতে পারল না। ধানকোড়া আগের চেয়ে আরও চুপচাপ। কেমন যেন একটা ছমছমে ভাব। বীণাপানিদেবী পারতপক্ষে ঘর থেকে বেরোন না। সবাই বোঝে বার্ধক্য ওনাকে গ্রাস করেছে। পুজো পার্বণেও বাইরে আসেন না। কাজের লোকেদের বলা আছে অকারণে বিরক্ত না করতে। এবাড়িতে আর কাজ করতে কারও মন লাগে না। কিন্তু এতদিন মালকিনের নুন খেয়েছে তাই এই অসময়ে ছেড়ে যেতেও পারে না। প্রতিদিন ড্রাইভার এসে গাড়ি বার করে, অপেক্ষা করে আবার বিকেলে চলে যায়। মাসের শেষে মাইনেটা গাড়ির চাবি চাপা দেওয়া থাকে। রান্নার মাসি আসার পথে মালকিন যা ভালোবাসে সেসব বাজার করে এনে নিজের খুশি মতো রান্না করে রেখে যায়। ঠিকে দিদিও ঘরদোর ঝাড়পোঁছ করে রোজকার মতো। মাসের শেষে সবাই দেখে খাবার টেবিলে মাইনে চাপা দেওয়া আছে।

রান্নার মাসি একটু ভিতু মানুষ। এই আধ পোড়ো ভূতুড়ে বাড়িতে কাজ করতে তার কেমন ভয় ভয় করে। নিজেদের মধ্যেও কথা বলতে কেমন কিন্তু কিন্তু লাগে। সাড়াশব্দহীন নিঝুম পুরীতে নিজেদের নিশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কিছু শুনতে পায় না ওরা তিনজন। যদি বা ন’মাসে ছ’মাসে মালকিন বেরোন তো আরও বুক দূর দূর করে। সাদা থানে মোড়া এইটুকু একটা রোগা শরীর, ফ্যাকাসে মুখ, ঘোলাটে চোখ। সেটাও ভালো করে ঠাওর করা যায় না কারণ বিরাট ঘোমটাতে মুখ ঢাকা থাকে। আর রান্নার মাসিকেই অন্যদের থেকে একটু বেশিক্ষণ একা কাটাতে হয়। আগুপিছু না ভেবেই এতদিনের কাজটা ছেড়ে দেয় সে। অনেকদিন বাদে আবার গিন্নি ঘর থেকে বেরিয়ে ঠিকে দিদিকে বলেন একজন ভালো রাঁধুনির খোঁজ করতে। নতুন মাসি বহাল হয়। আবার সেই একই ছন্দহীন ধানকোড়া। খালি একদিন গিন্নি বেরিয়ে এসে সব কিছু বুঝিয়ে দিয়ে বলেন, নিয়ম সব আগের মতোই চালু থাকবে।

একদিন কথাচ্ছলে ঠিকে দিদি রান্নার মাসিকে বলে এখানে মাইনে বাড়ে না, কাজ ছেড়ে দেব ভাবছি। পরের মাসে সবাই দেখে পাঁচশো টাকা করে মাইনে বেড়ে গেছে। অজানা ভয়ের একটা স্রোত সারা শরীর দিয়ে নামে ওদের। এভাবেই প্রায় বছর খানেক পেরিয়েছে। হঠাৎ বীণাপানিদেবীর ভাইপো ভাইঝিরা বিদেশ থেকে এসে হাজির ধানকোড়াতে। অবাক হয়ে যায় সদর দরজা, বাগানের লোহার ফটক কোথাও তালা নেই দেখে। আরও অবাক হয় ড্রাইভার, ঠিকে দিদি, নতুন রান্নার মাসিকে দেখে। জানতে চায় তোমরা কোথা থেকে? কী করে জানলে আজ আমরা আসব? উত্তর শুনে তো হতবাক যে ওরা রোজই কাজে আসে।

সেদিন প্রথম জানাজানি হয় বীণাপানিদেবী বছরের গোড়ায় মারা গেছেন। হাসপাতাল থেকেই সোজা কেওড়াতলা নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বাড়িতে কেউ নেই বলে। আর যাদের ওপর দায়িত্ব ছিল বাড়িতে খবর দেবার, তারা মনে হয় প্রয়োজন মনে করেনি কাজের লোকেদের খবর দেবার। তখন কাজের চাপে আসতে পারেনি কিন্তু এখন ওদেশে লম্বা শীতের ছুটি তাই সবাই এসেছে। ভাইপো বলে যে প্রায় প্রতি রাতেই স্বপ্ন দেখতাম পিসি বলছে—বাবুসোনা আর পারছি না সব আগলে রাখতে, আমাকে মুক্তি দে। তাই এসেছি পিসির পিণ্ড দান করে বাড়িটার একটা বিক্রি ব্যবস্থা করতে। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে সবাই বাড়িতে ঢুকে দেখে সব যেমন ছিল ঠিক তেমনি আছে। এমনকী ভাইপোর প্রিয় সব পদ অবধি খাবার টেবিলে ঢাকা দেওয়া। রান্নার দিদি বলে আজকেই মালকিন বলেছেন এই পদগুলো রাঁধতে। খালি এঘর সেঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখে পিসি কোথাও নেই। একেই বলে মায়া। একেই বলে স্নেহ অতি বিষম বস্তু।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%