দেবযানী বসু কুমার

এ যে অবিশ্বাস্য! এ যে অসম্ভব! নিজেদের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না দুজনে। এ কী করে সম্ভব? কথাকলি আর শোভন দুজনেই হতবাক। শেষ দু’মাস ডেট মিস করাতে এসেছিল ডাক্তারের কাছে। মনের মধ্যে একটা চাপা ভয় ঘোরাফেরা করছে। কী না কি হয়েছে? শরীর নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হতে আর ভালো লাগে না। কিন্তু ডাক্তার যখন বললেন মিসেস সিনহা কন্সিভ করেছেন তখন বুকের মধ্যে মা হতে না পারার চাপা কষ্টটা মনে হল ফেটে বেরিয়ে আসবে। আর শোভনের মনে হল একদম বাজে ডাক্তার। কিচ্ছু বোঝে না। ওরা এটাই শুনতে অভ্যস্ত যে সন্তান সুখ ওদের কপালে নেই। বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। আর তার ফলাফল দুজনেই ত্রুটিপূর্ণ। সন্তান হওয়া অসম্ভব। এমনকী চিকিৎসা শাস্ত্রের নতুন সব দিগন্তের হাত ধরলেও নয়। ফলাফলের কাজগপত্র ওদের কাছে মজুত। সে কথা ডাক্তারকে জানাতে উনি হেসে বলেন পৃথিবীতে কত কী মিরাকেল ঘটে। একটু ঘোরের মধ্যে বাড়ি ফেরে দুজনে। কী করে সম্ভব? প্রশ্নটা মনের অলিগলিতে ঘুরপাক খায়।
পনেরো বছর হল ওদের বিয়ে হয়েছে। সম্বন্ধ করে বিয়ে। শোভন তখন রিসার্চ করতে স্টেটসে। ছেলে একা থাকবে। বাড়ি থেকে চাপ দেয় বিয়ে করার জন্য। উপায় কিছু না দেখে বিয়েতে মত দিতেই হয়। শোভনের মা-বাবাই খোঁজখবর করেন। কথাকলির সবে তখন বাইশ বছর বয়স। একবছর আগে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে বসে আছে। পড়াশুনো করতে একদম ভালো লাগে না তাই ও পথ আর মাড়ায়নি। পাশের বাড়ির কাকিমা সম্বন্ধটা এনেছিলেন।
নিজের বিয়ে আনন্দটা সবার সামনে মেলে ধরতে পারেনি কিন্তু নিজের ঘরে এক পাক নেচে নিয়েছিল কথাকলি। মন তখন আহ্লাদে আটখানা। পছন্দ, খোঁজখবর, কেনাকাটা আর তারপর বিয়ে মিটতে প্রায় বছর শেষ। লোক দেখানি বিয়ের ছ’মাস আগেই সইসাবুদের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। তাই একদম বরের সঙ্গেই তল্পিতল্পা বেঁধে বিদেশ যাত্রা। মন প্রাণ খুশিতে ভরপুর। কথাকলি বরাবরই গোছানি ধাঁচের মেয়ে। ঘর গেরস্থালি ভালোবাসে। তাই নিজের সংসারের কথা ভেবে মনটা তখন খুশিতে ডগোমগো।
শোভনের চাকরির জন্য বেশ কিছু জায়গা পাল্টাবার পর স্থায়ী বসবাস নিউ ইয়র্ক শহরে। তারপর গুছিয়ে সংসার। বেশ কিছু বছর কাটবার পর দুজনেই বোঝে কোনও একটা সমস্যা আছে। নিজেদের চেষ্টার ওপর আর আস্থা না রেখে ডাক্তারের দ্বারস্থ হয় সন্তানের আশায়। ওদিকে দুবাড়ির থেকেই আসতে থাকে আবদারের নামে চাপ। সবাই নাকি দিন গুনছে পরিবারের নতুন সদস্যের আশায়।
তারপর এক অসহ্যকর অন্তহীন চিকিৎসা। হাজারো পরীক্ষা, কয়েকশো ওষুধ। কিন্তু ফলাফল শূন্য। সন্তানের কোনও আশা নেই। সমাধান দূর অস্ত কারণ সমস্যা দুজনেরই। তারপর থেকে কথাকলি মাঝে-মাঝেই অবসাদে ভোগে। ওকে সামলাতেই তখন শোভনের প্রাণান্ত। নিজেকে সান্ত্বনা দেবার আর সময় অবশিষ্ট থাকে না। তাও সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটনির পর বাড়ি ফিরে চেষ্টা করে কথাকলিকে সময় দিতে। ওর মন ভালো রাখতে।
সে বছর চৌঠা জুলাইয়ের সপ্তাহে হঠাৎই শোভন ঠিক করে কথাকলিকে নিয়ে কোনি আইল্যান্ড যাবে। ওই সময় নিউ ইয়র্কে দারুণ ভিড়। সারা দিন-রাত শহর লোকে লোকারণ্য। আর এই বিচ শহরটা সামান্য দূরে। দু’একদিন কাটিয়ে চলে আসবে। শোভনের মনটাও ছুটি চাইছে।
জুলাইয়ের চার তারিখ, বুধবার। সোমবার কাজ থেকে ফিরে কথাকলিকে তুলে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে শোভন, আশায় আছে, গিয়ে একটা হোটেলের ঘর ঠিক জোগাড় করতে পারবে। ফুরসৎ পায়নি আগে থেকে বুক করার। যখন পৌঁছল তখন সন্ধে তার ওপর টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। এদের এই উৎসবের চক্করে কোথাও কোনও ঘর খালি নেই। গাড়ির ভেতর থেকে হঠাৎই কথাকলির চোখে পড়ে একটা বাড়িতে বোর্ড ঝোলানো বি এন্ড বি। বাড়ির সামনের ছোট্ট লনটায় দুটো সাহেব বাচ্চা খেলা করছে বল নিয়ে। গাড়িটা পার্ক করে হাঁকডাক করতে কেয়ারটেকার বেরিয়ে আসে। ততক্ষণে বাচ্চা দুটো উধাও। অনেক করে বলাতে নিমরাজি হয় বটে ঘর খুলে দিতে কিন্তু জানায় ব্রেকফাস্টের কোনও ব্যবস্থা নেই। মালিক অনেকদিন আগেই এই ব্যবসা তুলে দিয়েছে, খালি বোর্ডটাই খোলা হয়নি। কথাকলির চোখ দুটো খালি বাচ্চাদুটোকে খুঁজছে। বিশ্রাম নিয়ে তারপর সমুদ্রের ধারে এক প্রস্থ হেঁটে, ডিনার সেরে ফিরে কেয়ারটেকারকে বাচ্চা দুটোর কথা জানতে চাইলে তিনি খুব গম্ভীর ভাবে জানান এবাড়িতে বাচ্চা কেন, কেউ থাকে না উনি আর ওনার স্ত্রী ছাড়া। তখন শোভনও জানায় ও কোনও বাচ্চা দেখেনি গাড়ি থেকে। নিজেরই কিছু ভুল হচ্ছে ভেবে কথাকলি চুপ করে যায়।
সে রাতে অনেক দিন বাদে শোভনের সোহাগে আদরে কথাকলি ভেসে যায়। একটা মিষ্টি ভালো লাগা নিয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়ে। আর ঘুমোতে ঘুমোতে বারবার কথাকলির মনে হয় ওদের দুজনের মাঝখানে দুটো বাচ্চা শুয়ে আছে।
পরদিন সকালে কথাকলি দেখে ঘরময় খেলনা ছড়ানো। যত্ন করে যতবারই তুলে রাখে কিছু সময় পর দেখে আবার সব লণ্ডভণ্ড করা সারা জায়গায়। সিঁড়ির নিচে দুটো ট্রাই সাইকেল রাখা। মাঝে-মাঝেই তার বেলগুলো ক্রিং ক্রিং করে বেজে ওঠে। সব কিছু ওকে কেমন টানতে থাকে। বাড়িময় যেন বাচ্চার উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। হাওয়ায় বাচ্চার গায়ের গন্ধ ভাসে। দুদিন পরে কিছুতেই ফিরে যেতে মন চায় না কথাকলির। বাড়িটার ওপর কেমন একটা মায়া পড়ে গেছে যেন। বাধ্য হয়ে শোভনকে ফেরাটা দু’দিন পিছোতে হয়।
ফেরার আগেরদিন সন্ধ্যাবেলা শোভন গেছে একটু সমুদ্রের ধারে হাঁটতে। কথাকলি কেয়ার টেকারকে এড়িয়ে গেস্ট এরিয়া ছেড়ে ওপরে উঠে যায়। দেখে ঘরের দেওয়ালে দুটো মোটা মোটা সাহেব বাচ্চার নানান ফটো। ঠিক যেমন দেখেছিল প্রথমদিন গেটের কাছে খেলতে। একটুও ভয় করে না কথাকলির। ছবির গায়ে হাত বোলাতে মনটা খুশি খুশি হয়ে ওঠে। নিচে নেমে কেয়ারটেকারকে সরাসরি ছবির বাচ্চা দুটোর কথা জিগ্যেস করে। ততক্ষনে শোভন ফিরে এসেছে। ভারাক্রান্ত ভাবে লোকটা জানায় ওই বাড়িটা ব্রায়ান সাহেবের। উনি মেমসাহেব আর দুটো যমজ বাচ্চা নিয়ে থাকতেন এই বাড়িতে।
একটা জরুরি কাজ পড়ায় বাচ্চা দুটোকে গভর্নেসের কাছে রেখে স্বামী স্ত্রী যায় লাস ভেগাস। বাচ্চা দুটো বিকেলবেলা বল নিয়ে খেলছিল বাড়ির লনে। আর গভর্নেস একটু দূরে বেঞ্চে বসেছিল। সন্ধে হয় হয়, এমন সময় একটা নেশাগ্রস্থ আফ্রো-আমেরিকান হঠাৎই এলপাথাড়ি গুলি ছোড়ে। নিমেষে বাচ্চাদুটো লুটিয়ে পরে। তারপর থেকে মাঝে-মাঝেই বাচ্চা দুটোকে দেখা যায় বাড়ির যেখানে সেখানে। মাঝে-মাঝেই সারা ঘরে ছড়ানো থাকে খেলনা, ছবির বই, বল। দেখলে মনে হবে এই মাত্র বাচ্চাগুলো খেলা ছেড়ে ঘর থেকে বেরিয়েছে। টুরিস্টরা ভয় পায় তাই ব্রেড এন্ড ব্রেকফাস্টের ব্যবসা তুলে দিতে হয়েছে। মালিক চেষ্টা করছে বাড়িটা বিক্রি করতে। কারণ মেমসাহেব এই বাড়িটা সহ্য করতে পারছে না। এলেই শোকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এছাড়া একলা থাকতেই পারেন না এ-বাড়িতে, সব সময় ওনার ভয়ভয় করে। ওনারা আপাতত অন্য শহরে থাকেন।
এই কারণেই বুড়ো কেয়ার টেকার ঘর ভাড়া দিতে চাননি প্রথমদিন।
ভেবে ছিল অনেকটা ভালোলাগা নিয়ে ফিরবে তার বদলে দুজনেই ফিরল একটা মন খারাপের রেশ নিয়ে।
তারপরই দু’মাস পর পর ডেট মিস। সন্তান হওয়া কোনওদিন সম্ভব নয় জেনে বহুদিন সে চিকিৎসাও বন্ধ করে দিয়েছে। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ইউরিন টেস্ট আর তারপরই রিপোর্ট পসিটিভ। তার চেয়েও বড় কথা, পাঁচ মাস পর আল্ট্রাসনোগ্রাফি রিপোর্টে লেখা—যমজ বাচ্চা।
এর কোনও ব্যাখ্যা না ভাবাই ভালো।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন