বিনোদ ঘোষাল
কথার সঙ্গে সঙ্গে ঘরটার চারদিকে চোখ বোলাচ্ছিল বিকাশ। তথাগত ঠিক যেমনটা বলেছিল তেমনই। এতটুকু বাড়িয়ে বলেনি। বিশাল বড়ো ঘরখানা। যেমনই উঁচু ছাদ তেমনই চওড়া। ছাদে কড়িবরগা। তবে ফার্নিচার বিশেষ কিছু নেই। ঘরের ডানদিকের কোণে শ্বেতপাথার বসানো বড়োসড়ো, বেশ উঁচু একটা কালো কাঠের টেবিল। আর ঘরের মাঝখানে অতি সাধারণ কাঠের সস্তার একটা ছোটো টেবিল। তাকে ঘিরে দুটো পুরোনো কাঠের চেয়ার আর একটা প্লাস্টিকের। কড়িবরগা থেকে লম্বা একটা ইলেকট্রিকের তার ঝুলছে। তারের ডগায় বাল্ব। কোনও টিউব কিংবা ফ্যান নেই। দেয়াল দেখে আন্দাজ করা যায় আজ থেকে কম করে পঁচিশ বছর আগে সম্ভবত হলুদ রং করা হয়েছিল, তারপর আর হয়নি। ঘরে পেল্লায় সাইজের তিনটে জানলা একটা দরজা। জানলা-দরজার মাপ প্রায় এক। তিনটে জানলাই হাটপাট খোলা। একটা জানলার থেকে হু-হু করে হাওয়া ঢুকছে। বিকাশ জিজ্ঞেস করল ওদিকটায় কি কোপাই নদী?
হ্যাঁ। ছেলেটা উত্তর দিল।
এই তোমার নামটাই জানা হয়নি।
রমেশ। উত্তর দিল ছেলেটা। কথায় গ্রামের টান। তারপরেও বলল, আপনি হাতমুখ ধুয়ে নিন, আমি জলখাবার দিচ্ছি।
হুঁ যাচ্ছি। আচ্ছা রমেশ এই ছবিটা কার? সনাতনবাবুর? বলে প্রায় হাফ দেওয়াল জোড়া একটা অয়েলপেন্টিং-এর দিকে আঙুল তুলল বিকাশ। ছবিতে একজন খালিগায়ে সাদা ধুতি পরা মোটাসোটা প্রৌঢ় মানুষ সিংহাসন মার্কা চেয়ারে সামনের দিকে চটিপরা দু-পা বাড়িয়ে বসে। আর পাশে ঘরোয়া স্টাইলে শাড়ি পরা এক মহিলা দাঁড়িয়ে। মাথায় ঘোমটা। হাতে গলায় মাথায় একগাদা সোনার গয়না পরা। আন্দাজ করা যায় ইনি ভদ্রলোকের স্ত্রী।
না ওটি বাবুর নয়। বাবুর বাবার।
ও।
বাবুর ফোটো ওইটা। বলে বিকাশের ঠিক পিছনের দেওয়ালের দিকে আঙুল তুলল রমেশ। বিকাশ পিছন ফিরে দেখল। দু-ফুট বাই দু-ফুট দুটো ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট বাস্ট ফোটো পাশাপাশি। একজন পুরুষ, অপরজন মহিলা। পড়ে আসা বিকেলের আলোয় ফোটোর মুখদুটো খুব পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না।
বাবু আর কত্তামায়ের ফোটো।
আচ্ছা আচ্ছা। বলে বিকাশ আবার মুখ ঘুরিয়ে নিল। অতবড়ো দেয়ালে ছবিদুটো খুবই ছোট্ট-বেমানান লাগছে। ঘরটার ডেকরেশনটা খুব অগোছাল, গ্রাম্য। অবশ্য গ্রামে তো গ্রাম্যই হবে।
আসুন আপনাকে কুয়োপাড়টা দেখিয়ে দিই।
বিকাশ উঠল। একটু টায়ার্ড লাগছে। আজ আর মার্কেটে বেরিয়ে দরকার নেই, একেবারে কাল সকাল থেকে কাজ শুরু করতে হবে।
আসলে প্ল্যানটা দিয়েছিল তথাগত। বিকাশের ছোটোবেলার ফ্রেন্ড কাম কলিগ। বিকাশ আর তথাগত দুজনের বাড়িই মধ্যমগ্রাম। একই স্কুল। কলেজটা আলাদা হয়ে গেছিল, তারপর আবার একই কোম্পানি। অ্যাকাউন্টস অনার্স তথাগত আগে ঢুকেছিল এই বিস্কিট কোম্পানিটায়। বিকাশ তখন এম বি এ কমপ্লিট করে অন্য একটা ছোটো কোম্পানিতে বেশ কিছুদিন এক্সপিরিয়েন্স গ্যাদার করে ফেলেছে। চেঞ্জ চাইছিল। তথাগত একদিন বলল আমাদের ফার্মে চলে আয়। ভ্যাকান্সি আছে। বিকাশ চলে এল। মল্লিকবাজারের কাছে কর্পোরেট অফিস। স্যালারি মোটের ওপর খারাপ না। মেস ছেড়ে দিয়ে একটা সিংগল রুম ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিল। বাড়িতেও টাকা পাঠাতে শুরু করেছিল। বাড়ির লোক বলতে মা আর বাবা। বাবা রিটায়ার্ড। মার্কেটিং-এর কাজ। টাইমের ঠিক থাকে না। তাই ডেলিপ্যাসেঞ্জারির ঝামেলা কাটাতে বিকাশ আগে থেকেই কলকাতায় থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিল। কোম্পানিটা ভালোই। স্টেটে ভালো বিজনেস করছে। ডানকুনিতে ফ্যাক্টরি। প্রায় চার বছর কেটে গেল এই কোম্পানিতে। এখন ডেজিগনেশন এরিয়া সেলস ম্যানেজার। বিকাশের এরিয়ার মধ্যে বোলপুরটাও পড়ে। বেশ কিছুদিন ধরেই ওদিকের সেলস ফিগার ভালো আসছিল না। মার্কেট বসে যাচ্ছিল ওদিকের। একটা লোকাল রাইভ্যাল কোম্পানি বেটার প্রাোমো স্ট্র্যাটেজি নিয়ে মার্কেট গ্রিপ করতে শুরু করেছিল।
তিনদিন আগে সন্ধেবেলায় বস ডেকে বিকাশকে বললেন মার্কেটটা নিজে গিয়ে একবার ভিজিট করতে। বিকাশ রাজি হয়ে গেছিল। না বলার কোনও কারণও নেই। তথাগতর সঙ্গে কথায় কথায় জিজ্ঞেস করেছিল বোলপুরে গিয়ে কোথায় স্টে করলে ভিলেজসাইডটা কভার করতে সুবিধা হবে।
তখনই তথাগত বলেছিল একটা কাজ করবি? আমার পিসেমশাইয়ের বাড়িতে থাকবি?
তোর পিসেমশায়ের বাড়ি! সেটা আবার কোথায়?
এর পর মোটামুটি একটা ডিটেল দিয়েছিল তথাগত। বোলপুর স্টেশন থেকে চার কিলোমিটার পশ্চিমে আদিত্যপুর গ্রামের বহু পুরোনো বাসিন্দা সনাতন মিত্র। বনেদি পরিবার। পরিবার বলা অবশ্য ভুল। কারণ বিশাল একটা বাড়িতে মাত্র সনাতন বাবুই থকেন। বয়স প্রায় সত্তর। সঙ্গে একটি অল্পবয়সি চাকর সবসময়ের দেখাশোনা করে। ভদ্রলোক খুবই অতিথি বৎসল। একসময় তথাগত অনেকবার গেছে। তবে বছর দেড়েক আগে পিসিমা মারা যাওয়ার পর আর যাওয়া হয়নি।
তুই যদি যেতে রাজি থাকিস তো বল তাহলে আমি কালকেই একটা চিঠি পাঠিয়ে দিচ্ছি। বলেছিল তথাগত।
রাজি না হওয়ার কোনো প্রশ্নই নেই। অবশ্যই যাব। কিন্তু চিঠি কেন? ফোন করে দিলেই তো হয়।
ফোন! হাসালি। ও বাড়িতে ইলেকট্রিসিটি এসেছে কি না সন্দেহ, আর তুই ফোনের কথা বলছিস! আর হ্যাঁ, আর একটা কথা শুনেছি পিসি মারা যাওয়ার পর পিসেমশাই একটু ইয়ে টাইপ হয়ে গেছে। আমি নিজে লাস্ট যেবার গেছিলাম অবশ্য কিছুই টের পাইনি। আসলে সারাদিন চুপচাপ থাকে তো ...
এই রে কোনো প্রবলেম হবে না তো?
আরে না না ধুস কিস্যু না। আসলে ওই কাজের ছেলেটাই উলটোপালটা বকে। আমি স্পিডপোস্ট করে দিচ্ছি তাহলে। তুই শুক্রবার পৌঁছচ্ছিস। তার মানে আজ থেকে চারদিন পর। বাট আমি শিওর তোর জায়গাটা ভালো লাগবে। বাড়ির সামনেই কোপাই নদী। জানলা দিয়ে সারাক্ষণ হু হু করে ফ্রেশ ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছে। আগে একটা মস্ত বাগানও ছিল বাড়ির পিছনে। এখন আছে কি না জানি না। বল রাজি?
ডান।
বিকাশও হয়তো মনের কোথাও একটু রিলিফ চাইছিল। গত এক বছর ধরে শুধু কাজ আর কাজ, অফিস আর অফিস করে গেছে পাগলের মতো। একমুহূর্তের জন্যও একা ছাড়েনি নিজেকে। আসলে ভয় করে নিজেকে নিজের কাছে রাখতে। একা হলেই এক বছর আগের সেই ঘটনাটার অসহ্য ভাবনাগুলো যদি আবার বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে টুটি ছিঁড়ে ছিন্নভিন্ন করে দেয় শরীর-মন! একটা সময় সেই রকমই গেছে। বহু কষ্টে নিজেকে সামলেছে ও। ভুলতেও পেরেছে অনেকটা। এমনটাই বিশ্বাস করে বিকাশ। ভুলেছে হয়তো।
কিন্তু সব কাজই তো একটা সময়ের পর একটু ছুটি একটু আলস্য চায়। ভিতরে ভিতরে হাঁফিয়ে পড়ছিল ও। যন্ত্রের মতো একা জীবন কাটাতে চেয়েও ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল ইদানীং। তাই কাজের সূত্রেই হোক, একটা অচেনা গ্রামের অপরিচিতের বাড়িতে উঠতেও আপত্তি করেনি। ইলেকট্রিসিটি না থাকুক একটু হাওয়া তো আছে। নদীর হাওয়া, মাটির গন্ধ আর অজানা সব মানুষ।
কাল রাতে আর দেখা করতে পারিনি তোমার সঙ্গে। কোনও অসুবিধা হচ্ছে না তো? সকাল সাড়ে আটটার সময় নীচে বৈঠকখানার ঘরে বিকাশকে জিজ্ঞেস করলেন সনাতন। বিকাশ তখন সবে বাড়ির পেছনে কোপাই নদী দেখে এসে ফুরফুরে মেজাজে চেয়ারে বসে চা খাচ্ছে।
না না অসুবিধা কীসের? এত সুন্দর জায়গা। উত্তর দিল বিকাশ।
হুম। নিজের মতো করে থেকো আর যা দরকার ওই রমেশকে বলে দিও, করে দেবে। বলে আবার দোতলায় উঠে গেলেন সনাতনবাবু। চেহারা দেখে বোঝা যায় একসময় টানটান ছিল, এখন যেন একটু ঝুঁকে ঝরে গেছে। শ্যামলা রং, মাথায় কাঁচাপাকা পাতলা চুল। মাঝারি হাইট। লুঙ্গির মতো করে পরা ধুতি আর সাদা হাফহাতা গেঞ্জি। চেহারাটা গ্রাম্য হলেও কোথায় যেন একটা বনেদিয়ানার ছাপ রয়ে গেছে। কথায়-হাঁটায়। শুধু ভদ্রলোকের চোখদুটো কেমন যেন অস্থির। কথা বলতে বলতে বারবার এদিক ওদিক ঘোরান। যেন কাউকে খুঁজছেন। অস্বস্তি লাগে এমন লোকের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে। একবারও জিজ্ঞেস করল না তথাগতরা কেমন আছে, এমনকি বিকাশ সম্পর্কেও যেন কোনো আগ্রহ নেই। কয়দিন থাকবে কী কাজে এসেছে কিচ্ছু না। যাকগে। জায়গাটা তোফা। অনেকদিন পর একটু অন্য জায়গার হাওয়ায় বেশ লাগছে বিকাশের। বিকাশ ভেবেছিল বাইরে হোটেলে খেয়ে নেবে, কিন্তু রমেশ সকালবেলাই এসে বলে দিয়েছে বাবু বলে দিয়েছেন ও যেন খাওয়া দাওয়া বাইরে না করে, এখানেই খেতে। বিকাশ আপত্তি জানিয়েছিল। কী দরকার অকারণ ঝামেলা বাড়ানোর!
রমেশ পালটা প্রতিবাদ জানিয়েছে, বাবু বলে দিয়েছেন যখন আর না করবেন না, নইলে আমাকে দুনিয়ার কথা শুনতে হবে। এমনিতেই ... বলে থেমে গেছিল রমেশ।
মেনে নিয়েছে বিকাশ। ভাত-ডাল-পোস্ত-ফ্রেশ মাছের ঝোল খেয়ে ও যখন মার্কেটে বেরোতে যাবে হঠাৎ এমনিই চোখ পড়ল বৈঠকখানার দেয়ালের দিকে। দেওয়ালে সবকটা ফোটোই আছে, শুধু সেই মহিলারটা ছাড়া। কোথায় গেল? রমেশ খুলে রাখতে পারে পরিষ্কার করার জন্য।
প্রায় দু-বছর আগে তিস্তার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল বিকাশের। তিস্তা চক্রবর্তী। রবীন্দ্রভারতী থেকে মিউজিকে এম.এ। দেখতে শুনতে, গায়ের রং একটু চাপা। কিন্তু একটা আলগা চটক ছিল। কাটাকাটা চোখ-মুখ, ছিপছিপে চেহারা। স্মার্ট। কবিতা-টবিতাও লিখত আর সেগুলো পোস্ট করত ফেসবুকে। বিকাশের ফেসবুক-জীবন নেই। একবার বন্ধুদের চাপে পড়ে অ্যাকাউন্ট খুলেছিল ঠিকই, কিন্তু অপারেট না করতে করতে একসময় পাসওয়ার্ডও ভুলে গেছিল। আসলে টাকা রোজগার করার চাপটা ফেসবুক বিলাসের থেকে অনেক বেশি পরিমাণে ছিল বিকাশের। তো এই বিকাশ মুখার্জির সঙ্গে অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ হয়েছিল তিস্তা চক্রবর্তীর। পুরো ব্যাপারটা ঘটানোর দায়িত্বে ছিলেন বিকাশের বড়ো-জামাইবাবু। সম্বন্ধটা ওনারই আনা ছিল। ব্রাহ্মণ, মধ্যবিত্ত, ভালো ফ্যামিলি। মেয়ে এডুকেটেড, কালচারড। দেখতে শুনতে মন্দ না। সুতরাং আপত্তি কোথায়? কোনও দিকেই আপত্তি উঠল না। হয়ে গেল বিয়ে। আপত্তিটা উঠল বিয়ের মাস খানেক পর। বিকাশ দেখতো তিস্তা সবসময়ই কেমন ঝিমিয়ে থাকে, কোনও কিছুতেই তেমন উৎসাহ নেই। বিকাশ বুঝতে পারত না। ভাবত বাড়ির জন্য মন খারাপ। মন কিংবা শরীর সব কিছুতেই কেমন দায়সারা গোছের সাড়া দিত তিস্তা। তারপর একসময় বাধা দিতে শুরু করল তিস্তা।
প্লিজ এখন না।
কেন?
আমার ভালো লাগছে না।
কারণ ভাবতে ভাবতে ওপাশ ফিরে শুয়ে পড়ত বিকাশ। নিজের পৌরুষ সম্পর্কেও সন্দেহ জাগত একেকদিন।
তারপর আসল কারণটা জানা গেল যখন বাড়ির ল্যান্ড লাইন টেলিফোন বিল এল দু-হাত লম্বা। বিকাশ শিওর ছিল ভুল বিল এসেছে। ভি এস এন এল নয়, প্রাইভেট কানেকশন। কমপ্লেইন করার দু-দিনের মধ্যে টোটাল কললিস্টের প্রিন্ট আউট থ্রু ক্যুরিয়র বিকাশের হাতে। চোখ কপালে। একটি নির্দিষ্ট মোবাইল নাম্বারে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কল ডিওরেশন।
এ কার নাম্বার?
আমার বন্ধুর।
এত ফোন করেছ তাকে?
তো সারাদিন ধরে বাড়িতে একা একা কী করব আমি? আর আমার ছোটো বেলার বন্ধু।
তা বলে এত টাকার ফোন!
আমি বিয়ের আগেও করতাম। কেউ বারণ করেনি।
আমি করছি। এত টাকা বিল পে করা আমার পক্ষে খুব চাপের হয়ে যাবে। প্লিজ একটু বোঝার চেষ্টা কর।
না, তার পরের বারেও চেষ্টা করেনি তিস্তা। বিকাশ টেস্ট করার জন্য নিজের মোবাইল থেকে অফিস বা বাইরের থেকে মাঝেমধ্যেই বাড়িতে ফোন করত। বেশিরভাগ সময়ই এনগেজ টোন। অথবা কোনও কোনও দিন ফোন বেজে যেত। কেউ তুলত না। তার মানে বাড়িতে নেই।
পরের বারের বিলটাও প্রায় আগের মতোই। তিস্তার জন্য একটা মোবাইল আর প্রিপেড কার্ড ভরিয়ে বিকাশ একদিন বলল, ভাবছি ল্যান্ড লাইনটা ছেড়ে দেব। প্রতিবার ভুলভাল বিল আসছে।
ছেড়ে দেবে মানে? আমি সারাদিন চুপচাপ কী করব?
তোমার জন্য আমি ভাবি তিস্তা। বলে খুব স্টাইলে ব্যাগ থেকে মোবাইল সেটটা বার করে ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে মনে মনে ভেবেছিল এবার বোধহয় রেহাই পাওয়া যাবে।
তিস্তা সৌজন্যমূলক হাসি দিয়ে বলেছিল থ্যাঙ্কস। তবে আগের কানেকশনটা ছেড়ো না তা বলে। বাড়িতে একটা ল্যান্ড লাইন থাকা দরকার।
যা: শাল্লা! মুখ নয়, মন বলে উঠেছিল বিকাশের।
তুমি তাহলে চাকরি করবে তিস্তা!
না, চাকরি করতে আমার ভালো লাগে না। তবে...
কী তবে?
আমি বিয়ের আগে গ্রুপে নাটক করতাম।
হুঁ, জানি।
তুমি যদি রাজি থাক তাহলে আমি আবার গ্রুপটায় জয়েন করতে পারি।
সে তো তোমাদের ওখানে। অত দূরে যাতায়াত করবে কী করে?
সে আমি ম্যানেজ করে নেব।
একটু থেমে থেমে বিকাশ বলেছিল ঠিক আছে তাহলে ... যা ভালো বোঝ।
সেই প্রথমবার বিকাশকে জড়িয়ে ধরেছিল তিস্তা। মুখে বলেছিল থ্যাঙ্ক-ইউ।
ভীষণ আনন্দ পেয়েও সেদিন তিস্তার থ্যাঙ্ক ইউ শব্দটা কট করে কানে লেগেছিল। এ আবার কী! নিজের হাজব্যান্ডকে কেউ বারবার কার্টসি জানায়!
পুরোনো নাটকের গ্রুপে আবার জয়েন করল তিস্তা। তাই টেলিফোনের বিল এক ধাক্কায় আবার নর্মাল হয়ে গেলেও তিস্তার বাড়িতে থাকার সময়টাও অ্যাবনর্মালি কমে গেল। অনেক সময়ই রাত্রে বিকাশ অফিস সেরে বাড়ি ফিরে দেখত তিস্তা ফেরেনি। একেকদিন অনেক রাত। আবার সিজিনে দূরে শো থাকলে ফিরতও না। মন খারাপ করত, অভিমান হত বিকাশের। নিজেকে বোঝাত এটা তিস্তার নিজের জগৎ। এই এতকিছুর পরেও যতটা পারা যায় বিকাশ ভালোবাসত তিস্তাকে। বিশ্বাস করত। হয়তো এ ছাড়া আর কোনও দ্বিতীয় রাস্তা ছিল না ওর। কিন্তু দেয়ালের ইটে নোনা থাকলে যত দামি রং-ই লাগানো হোক ... তিস্তাও খসে পড়ল একদিন। বিকাশের বিশ্বাস-ভালোবাসার জামা-কাপড় খুলে সটান রাস্তার মোড়ে বসিয়ে দিয়ে চলে গেল এক সন্ধেয়। যাওয়ার আগে বিকাশের মোবাইলে একটা লম্বা মেসেজ করেছিল তিস্তা। রোমান হরফের বাংলায় লেখা ছিল, চলে যাচ্ছি। তোমার সঙ্গে থাকার কথাও নয় আমার। আমার যে নিজের পছন্দের অন্য একজন কেউ আছে আশা করি তুমি সেটা বুঝতে। কিংবা বুঝেও না বোঝার ভান করে থাকতে। তার সঙ্গেই যাচ্ছি। কারণ এভাবে আমার পক্ষে কিংবা হয়তো তোমার পক্ষেও সম্ভব হচ্ছে না। জানি এ বিয়েতে তোমার কোনও দোষ ছিল না। আমারও ছিল না। আমাকে জোর করে দেওয়া হয়েছিল নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে। তোমাকে এইসব কথা আগে জানানোরও সুযোগ দেওয়া হয়নি আমাকে, তাই জানাতে পারিনি। তবু যদি তুমি মনে করো তুমি ডিপ্রাইভড, তাহলে সরি। তবে এইটুকু সময়ে আমাদের মধ্যে কোনও ভালোবাসা ইত্যাদি গড়ে ওঠেনি সেটা দুজনেই শিওর। এনিওয়ে আমার মনে হয় ইস্যুটা নিজেদের মধ্যে মিউচ্যুয়ালি মিটিয়ে নেওয়াই বেটার। নেক্সট মান্থে পেপার পাঠাব তোমার অ্যাড্রেসে। সাইন করে দেবে আশা করি। তিস্তা।
বিকাশের মোবাইলে তিস্তার নাম সেভ আছে জেনেও নিজের নামটা মেসেজের শেষে কেন কে জানে লিখেছিল ও। যেভাবে অচেনা, আনসেভ মানুষ মেসেজ পাঠায় নিজের নামসহ।
সে পেপার সত্যিই এসেছিল। শুধু সাইন করার আগে একবার তিস্তার বাবাকে ফোন করে জানিয়েছিল বিকাশ। শ্বশুরমশাই চুপ করে শুনে বলেছিলেন, আমার আর কিছু বলার নেই। আমাকে তুমি ক্ষমা কোরো বাবা। বলে ফোনটা রেখে দিয়েছিলেন।
ব্যস তারপর এ-ক বছর। তিস্তা হারিয়ে যাওয়ার পরেও বিকল্প কোনও জীবন এখনও ভেবে উঠতে পারল না বিকাশ। নিজেরই আশ্চর্য লাগে। সত্যিই, যে মানুষটার সঙ্গে কোনও সম্পর্ক গড়ার সময়-সুযোগই হল না, তার কথা এখনও কেন না শুকোনো ঘায়ের মতো এত জেগে রয়েছে? একেকসময় নিজেকেই প্রশ্ন করে ও। এই ঘা-টা কি ও নিজেই খুঁচিয়ে জাগিয়ে রেখেছে সেই ভিখিরিদের মতো। কেন? তিস্তা কোনদিন ফিরে আসবে এই আশায়? এ প্রশ্নটা সরাসরি সামনে এলেই তাড়াতাড়ি মুখ লুকোয় বিকাশ। লজ্জা পায় ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে। এইভাবেই চলছে। বদলেছে খুব অল্প। এই যেমন কাজ আর মদ খাওয়ার সময় অনেকটা বেড়ে যাওয়া।
পরপর তিন দিন কেটে গেল আদিত্যপুরে। জায়গাটা এত সুন্দর যে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। নদীর হাওয়া, অচেনা মানুষ, রাস্তা — সব মিলিয়েই একটা আরাম, শান্তি। ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না একটুও। কিন্তু মার্কেট সার্ভে প্রায় শেষ। রিপোর্টও তৈরি। অফিস থেকে কাল বিকেলে একটা ফোনও এসে গেছে। সুতরাং আগামী কালকেই ফিরতে হবে।
এই ক-দিন বেশ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পড়ে বিকাশ বাড়ির পিছনের বাগানে, কোপাইয়ের ধারে ঘুরতে যেত। ভোরবেলার নদী এত সুন্দর হয়! নরম আলো আর হাওয়ায় মনটাও ঠান্ডা হয়ে যায় যেন। অনেকক্ষণ পর আবার ফিরে এসে বৈঠকখানার দেয়ালের দিকে তাকিয়ে ঠিক দেখে শুধু সনাতন বাবুর স্ত্রীর ফোটোটা নেই। আর রাত্রে ফেরার সময় আবার ঠিক দেয়ালে ফোটোটা ঝোলে। কারণ কী? প্রশ্নটা বারবার আসে। একবার রমেশকে জিজ্ঞেস করেও ছিল, কিন্তু কোনও উত্তর দেয়নি রমেশ। অন্য কথা বলে এড়িয়ে গেছে।
কিন্তু আজ রাত আটটা নাগাদ বিকাশ কাজ সেরে বাড়ি ঢোকার পর পরিস্থিতিটা একটু অন্যরকম দেখল। বৈঠকখানার ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সনাতনবাবু চিৎকার করছেন। তুমুল চিৎকার করছেন। সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে রমেশ। বিকাশ বুঝতে পারল চিৎকারের কারণটা হল রমেশ। এই ক-দিনের দেখা ঠান্ডা চুপচাপ মানুষটা হঠাৎ এত রেগে গেল কেন? কী হয়েছে?
হারামজাদা, তোকে পয়সা দিয়ে পুষছি কী জন্য? লাথ মেরে ঘর থেকে বার করে দেব। শোরের বাচ্চা এতবড় বাড়ি এত জায়গা আর এই কদ্দিনে সব জায়গা তোর পুরোনো হয়ে গেল অ্যাঁ? গাধা পেয়েচ আমাকে? আমি এত বছর থেকেও চিনলাম না সবখান আর তুই ... যার দূর হ সামনে থেকে। রোজ রোজ একই জায়গা একই জায়গা ... ইয়ার্কি হচ্ছে আমার সঙ্গে! কাল যদি কোনও নতুন জায়গা না দেখিস তো দেখবি ... দূর হ। রাগে কাঁপতে কাঁপতে সনাতনবাবু একনাগাড়ে কথাগুলো বলে চলেছেন। পুরো অচেনা লাগছে মানুষটাকে। বিকাশ যে এই ঘরেই এসে দাঁড়িয়েছে সেদিকে কোনো হুঁশই নেই। সনাতনবাবুর হাতে ওনার স্ত্রীর ফ্রেম বাঁধাই ফোটোটা, যেটা রোজ সকালে অদৃশ্য হয় আর রাত্রে ফিরে আসে।
বিকাশ খুব ধীরে ধীরে ওপাশ দিয়ে দোতলায় ওর নিজের ঘরে ফিরল। কী দরকার ওদের পারসোনাল ঝামেলার মধ্যে নাক গলানোর। কিন্তু মনের ভিতর কৌতূহলটা দু-তিনগুণ বেড়ে গেছে। নাহ, কাল চলে যাওয়ার আগে কেসটা একবার জানতেই হবে।
স্নান করে ফ্রেশ হয়ে খাটের ওপর বসল বিকাশ। কাল ভোরবেলা বিশ্বভারতী ধরবে। আজ তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়া দরকার। মন একটু খারাপ লাগছে। আবার কবে এখানে আসতে পারবে কে জানে। কলকাতায় ফিরে গেলেই আবার সেই একঘেয়ে মানুষগুলো, কাজ আর ...প্রাণপণ ভুলতে চাওয়া স্মৃতি।
একটু পরে রমেশ এল ঘরে। ওর চোখমুখ দেখে বোঝার উপায় নেই যে একটু আগে বাবার কাছে তুমুল ঝাড় খেয়েছে। একইরকম ভাবলেশহীন মুখে দাঁড়িয়ে রইল সামনে। এই সময়টায় রমেশ রোজই আসে। জিজ্ঞেস করে যায় রাত্রে বিকাশ কী খাবে। আজও এসেছে।
বিকাশ ওর দিকে তাকিয়ে যে প্রফেশন্যাল স্টাইলে মার্কেটে পার্টিদের কাছে হাসে, পাকা সেই স্টাইলে হেসে বলল, বল, রমেশ কী খবর!
রমেশ কোনও উত্তর না দিয়ে সামান্য ঘাড় কাত করল। এ বাড়িতে চাকর-মনিব দুজনেই বড্ড কম কথা বলে লোকের সঙ্গে। সে জন্যই বোধহয় বাড়িতে কেউ আসে না। প্রতিবেশীরাও না।
কাল ভোরবেলাতেই চলে যাব বুঝলে!
আচ্ছা। বাবু জানে?
না। বলব আরেকটু পরে। বলে বিছানার ওপর রাখা মানিব্যাগ থেকে একটা একশো টাকার নোট বার করে রমেশের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, নাও এটা রাখ। ...আরে নাও নাও ... এমনিই দিচ্ছি, মিষ্টি খেও।
এই প্রথম রমেশের ছোপ দাঁত দেখতে পেল বিকাশ।
ওষুধ কাজ দিচ্ছে। এইবার সুযোগ। আরে দাঁড়িয়ে কেন, একটু বোসো। তোমাদের কারও সঙ্গে তো কথাই বলা হল না।
আসলে বাবু চায় না আমি কারও সঙ্গে বেশি কথা বলি। গাঁয়ের লোকের সঙ্গেই বলতে দেয় না।
সে কী কেন?
বাবুর মাথায় ছিট তো তাই।
অ্যাঁ, বলো কী? কথাটা যেন এই প্রথম শুনল বিকাশ।
হ্যাঁ, পাগল তো। গাঁ-এর সব্বাই জানে। আসলে কত্তামা মরে যাওয়ার পরেই বাবুর এই খ্যাপামোটা হয়েছে। বড্ড ভালোবাসত তো কত্তামাকে। তাই মা চলে যাওয়ার পর ধাক্কাটা নিতে পারেনি বাবু।
কেমন খ্যাপামো বলো তো!
এই তো আপনি যখন কাজ সেরে এলেন তখন দেখলেন না আমাকে বকছে। ওটা খ্যাপামো ছাড়া আর কী?
কেন কী ব্যাপার? আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।
রমেশ আরও একটু কাছে এগিয়ে এল। মা সবে তখন কয়েকদিন হল মারা গিয়েছে। কাজকম্ম মিটে যাওয়ার পর আমি একদিন মায়ের ফোটোটা বৈঠকখানার দেয়াল থেকে নামিয়ে আমার ঘরে নিয়ে গেছি মোছামুছি করব বলে। একটু পরেই দেখি বাবু আমার ঘরে এসে উপস্থিত। চোখমুখ লাল। খুব চিল্লে আমাকে জিজ্ঞেস করল লীলা কোথায়? মায়ের নাম ছিল লীলাবতী। বাবু লীলা নামে ডাকতেন। আমার হাতে ফোটোটা দেখতে পেয়েই সঙ্গে সঙ্গে রাগ গলে জল। বলেন, এই তো তুমি। আর আমি সারা বাড়ি তোমায় খুঁজছি। ফোটোর দিকে তাকিয়ে এমনভাবে কথাটা সেদিন বলেছিল বাবু যেন সত্যি সত্যি কত্তামাকে খুঁজে পেয়েছেন। ফোটোটা আমার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেছিলেন বাবু।
সেই শুরু। তারপর দিন আমাকে ডেকে হঠাৎ বলেন কী, একটা খেলা খেলবি রমেশ? তুই এবার থেকে রোজ সকালে কত্তামায়ের ফোটোটা বাড়ির কোথাও একটা লুকিয়ে রাখবি আর আমি সেটা খুঁজে বার করব কেমন। রোজ নতুন নতুন জায়গায় লুকোতে হবে কিন্তু। পারবি না?
এমন কথা শুনে আমি তো হাঁ। মাথাটা কি বাবুর গেল? এমন খেলা তো বাচ্চারা খেলে! কিন্তু সেকথা তো আর বলতে পারি না। চাকর মানুষ। বাবু যা হুকুম করবে শুনতে হবে। তো শুরু হল এই খেলা। প্রথম দিকে ভাবতাম কয়েকদিন গেলে হয়তো পাগলামোটা কেটে যাবে। কিন্তু কমল তো না-ই বরং দিনে দিনে আরও নেশাটা যেন বাড়তে থাকল। রোজ সকালে আমায় গিন্নিমার ফোটো এই বাড়ির কোথাও একটা লুকিয়ে রাখতে হবে আর বাবু সেটা খুঁজে খুঁজে বার করবেন। আবার খুঁজতে খুঁজতে একা একা কথাও বলেন।
কী বলেন?
মায়ের নাম নিয়ে বলেন, লীলা এইবার তোমায় ঠিক খুঁজে বার করব। বলতে বলতে হাসেন। আর যখন খুঁজে পেয়ে যান, ফোটোটা দু-হাতে জড়িয়ে এমন ছেলে মানুষের মতো খুশি হয়ে ওঠেন যে দেখলে আপনারও মায়া লাগবে। টানা কথাগুলো বলে থামল রমেশ।
মিনিটখানেক দুজনেই চুপ। তারপর বিকাশ জিজ্ঞেস করল, তাহলে আজ এত রেগে গেছিলেন কেন?
প্রশ্নটায় এবার একটু বিরক্ত হয়েই রমেশ বলল, আরে আমিও তো মানুষ। মানছি বাড়িটা বড়ো। কিন্তু তাই বলে এই একই বাড়ির মধ্যে এতদিন ধরে রোজ রোজ আমি ফোটো লুকনোর নতুন জায়গা কোত্থেকে বার করব বলতে পারেন? আর না পারলেই বাবুর রাগ। যেদিন খুব কঠিন জায়গায় রাখি, বাবুর খুঁজে পেতে খুব সময় লাগে, সেদিন পাওয়ার পর বাবুর খুশিটাও যেন তত বেশি হয়। আর যেদিন হাতের সামনে তাড়াতাড়ি খুঁজে পেয়ে যান সেদিনই আমাকে এইভাবে ঝাড় দেন। শুনি। কী আর করব! পেটের দায়ও রয়েছে। তাছাড়া মানুষটা এমনিতে তো খুবই ভালো। তাই কাজ ছেড়ে চলে যেতে মায়া লাগে। কে দেখবে এমন খ্যাপাকে?
বিকাশ থ হয়ে তাকিয়ে ছিল রমেশের দিকে। তাই দেখে রমেশ এবার একটু হাসল। বলল, এই রকমই চলছে। এখন অভ্যাস হয়ে গেছে খেলাটা। মাঝেমধ্যে মন্দ লাগে না হে হে হে। যাকগে কী খাবেন বলুন? কালই তো চলে যাচ্ছেন।
একটু অন্যমনস্ক হয়ে উঠছিল বিকাশ। কিছু একটা ভাবছিল। রমেশের কথা শুনতে পেল না।
রমেশ আবার বলল, পরোটা আর মুরগির মাংস বানাই তাহলে আজ?
অ্যাঁ ... হ্যাঁ হ্যাঁ তাই বানাও।
রমেশ উঠতে উঠতে বলল, শুধু একটা কথা, যা বললাম এসব কিন্তু আর কাউকে বলবেন না। আপনার বন্ধুকেও না। বোঝেনই তো। সবাই তো আর ...
না না তুমি নিশ্চিন্তে থাকতে পার। আমি কাউকে বলব না।
ঘর ছেড়ে চলে গেল রমেশ। মনটা কেন যেন অস্থির লাগছে বিকাশের। খাট ছেড়ে উঠে ব্যাগ থেকে রয়্যাল চ্যালেঞ্জের পাঁইটটা বার করল।
চারটে লার্জ পেগ। অনেকদিন পর। তবু অস্থিরতাটা কাটছে না। বরং আরও বেড়ে চলেছে। বেড়েই চলেছে। তিস্তার মুখ, শরীর, ওর চলে যাওয়া সব কিছু এলোমেলোভাবে বারবার করে মাথার মধ্যে ভীষণভাবে নাড়া দিচ্ছে। এতদিন ধরে প্রাণপণ ভুলতে চাওয়া দৃশ্যগুলো আজ আরও দগদগে হয়ে বিকাশকে ধরে খামচাচ্ছে, কামড়ে ফালাফালা করে দিচ্ছে। খাট থেকে উঠে দাঁড়াল বিকাশ। টলতে টলতে ঘরের এ-মাথা ও-মাথা পায়চারি করতে থাকল। হঠাৎ আবার পা ঘষটে এগিয়ে এল বিছানার দিকে। বিছানায় ওর ওয়ালেটটা চিৎ হয়ে শুয়ে রয়েছে। কাঁপা হাতে ওটার ভিতর থেকে টেনে টেনে বার করতে লাগল সব কিছু। টাকা, পয়সা, ভাঁজ করা কাগজ ... খুঁজতে খুঁজতে ওয়ালেটের একটা অব্যবহৃত খাপের মধ্যে একটু ফ্যাকাসে হয়ে ওটা একটা পাসপোর্ট সাইজ ফোটো। তিস্তার। বহুবার চেষ্টা করেও যে ছবিটাকে ও আজ পর্যন্ত ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারেনি। বাড়িতে তিস্তার ব্যবহার করা যা কিছু ছিল স-ব কিছু ফেলে দেওয়ার পরেও নিজের অনিচ্ছার ভান করে শুধু রেখে দিয়েছিল এই ফোটোটা। কিন্তু কোনোদিন একবারের জন্যও বার করে দেখেনি। খুব ইচ্ছে হলেও না। আজ প্রথম কেন কে জানে ... তিস্তা হাসছে। ফোটোতে।
বিকাশ হঠাৎ চিৎকার করে উঠল। রমে-শ ... র-মে-শ। নিজের গলা শুনেই একটু চমকে উঠল। অবিকল সনাতনবাবুর মতো গলা! নেশায়?
কয়েকটা মুহূর্তের জন্য গোটা পৃথিবী চুপ। তারপরেই দোতলার বারান্দায় পায়ের শব্দ। রমেশ আসছে। বিকাশ তিস্তার ফোটোটা হাতে ধরে ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। এরপর কী বলবে ও নিজেও জানে না।
দেশ
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন