ভয়

বিনোদ ঘোষাল

লাথিঝাঁটা খেয়ে বড়ো হয়েছে বকুল ছোটোবেলায় বাপ-মার কাছে। এগারোয় পা দেবার সঙ্গে সঙ্গে ওর বাবা স্টেশন বাজারের কাছে একটা লোহার রডের দোকানে ঢুকিয়ে দিয়েছিল, সেই থেকে এখন বকুলের উনত্রিশ চলছে, একই জায়গায় দোকান মালিকের কাছে ঝারমার খেয়ে রয়ে গেছে। ভগবান ওর কপালে যদ্দিনের আয়ু টাইপ করে দিয়েছেন হয়তো সে ক-দিন এখানেই কাটাবে। সকাল থেকে রাত্তির পর্যন্ত রডের ওজন করা, ভ্যানে তুলে দেওয়া, দরকার পড়লে নিজেই ভ্যান চালিয়ে খদ্দেরের বাড়ি পৌঁছে দেওয়া, উদয়অস্ত পরিশ্রম, মাইনে একশো থেকে এখন নশো হয়েছে। মা-বাপ দুজনেই কবে ফুট। একার সংসার গ্যাটিস মেরে চলে যায়। সকাল বিকেলের টিফিনটা দোকান থেকে ফ্রি। এলাকার সবাই বকুলকে মানুষ বলে ভাবেই না। পাড়ার ছোট্ট বাচ্চাগুলো পর্যন্ত পিছনে লাগে। দাদা বলাতো দূরের কথা, এই ভিতু বকুল, ... ভিতু বকুল ... বকুল ওই দেখ তোর পায়ের সামনে কী? বলে ওকে ভয়ানক চমকে দেওয়ার মজা পায় সবাই।

হ্যাঁ বকুল ভিতু। যাকে বলে রাম ভিতু। কেন ভিতু কারো জানা নেই। অনেকে বলে তুই ব্যাটা খুব ভয়ে ভয়ে জন্মেছিলি, আবার কেউ বলে না না, জন্মেই ভয় পেয়ে গেছিল সেজন্য। সঠিক কারণটা এখনও আবিষ্কার হয়নি। বকুল নিজেও জানে না। ভয়ের কারণ বোঝার আগেই বকুল ভয় পেয়ে যায়। পৃথিবীর সব কিছুকে ও ভয় পায়। মানুষ থেকে ইঁদুর, ছুঁচো, পিঁপড়ে কেউ ওর লিস্টি থেকে বাদ নেই। শুধু বাপ-মার ভয়ই লিস্টি থেকে কাটা গেছে। আর বেচারার কপালেই যত বিদঘুটে কাণ্ড। এইতো সেদিন সকালে নপাড়ায় ওর বাড়ি থেকে বাবার সেই ঝরঝরে সাইকেলটায় চেপে ধানজমির আল দিয়ে আসছিল, হঠাৎ একটা দেড় ফুটের আলকেউটে পড়বি তো পড় বকুলেরই সাইকেলের চাকার স্পোকে জড়িয়ে যাচ্ছেতাই কাণ্ড। বকুল সাইকেল থেকে পড়েই মাঠে অজ্ঞান। সাপটা নিজেই অতিকষ্টে নিজেকে ছাড়িয়ে বকুলকে ক্ষমাটমা করে দিয়ে কখন চলে গেছে। কিন্তু বকুলের জ্ঞান ফেরেনি। পাড়ার লোকে ঠ্যাং ধরে চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে গিয়ে টিউকল পারে বসিয়ে জল ঢেলে ওর জ্ঞান ফেরায়। জ্ঞান ফেরা মাত্র ধমকানি তুই ব্যাটা মানুষ হবি কবে বলত?

বিয়ে করে ফেল। দু-দিন বউ-এর ঠ্যাঙানি খেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। হুহ বিয়ে করবে! এ তো মেয়েছেলেরও অধম, কে করবে ওকে বিয়ে! নানা মন্তব্যের মধ্যে বকুলের কানে একটা কথাই শুধু ঢুকে গেছিল বউ-এর ঠ্যাঙানি। যার জন্য কখনো সখনো আস্ত একটা মেয়ের সঙ্গে থাকার ইচ্ছেটা মাঝেমধ্যে শরীর-মনে প্রবলভাবে চাগাড় দিলেও স্রেফ ভয়েতে আর বিয়ের কথা ভাবেনি। কিন্তু রাগ হয় বকুলের। খুব রাগ হয় সবার ওপর। সে রাগ কারও ওপর আছড়াতে না পেরে নিজেকেই একলা একলা ছোবলায় বকুল। আঁচড়ে কামড়ে একশা করে দেয় নিজেকে। দোকানের মালিক বিনয়বাবু বকুল আর সুড়সুড়ি পিঁপড়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য বোঝেন না। নশো টাকায় এ বাজারে দিনরাত এক করে খাটার লোক পাওয়া যে ভাগ্যের ব্যাপার সেটা খুব ভালো করে জানেন বিনয় মণ্ডল। কিন্তু এও জানেন বকুলকে ওর দোকান থেকে কান ভাঙিয়ে কেউ নিয়ে যেতে পারবে না। আর নিজে থেকে ও অন্য কোথাও কোনোদিনই যাবে না। কারণ বকুল ভিতু। নতুন যে কোনো কিছুতে তার ভয়। সারা দিনে মুখে কথা বড়ো জোর চারটে থেকে ছটা। শুধু প্রশ্নের উত্তর। নিজে থেকে কোনো কথা নেই।

এভাবে উনত্রিশ বছর পার করে ক-দিন আগে দোকান থেকে রাত্রে বাড়ি ফিরছিল। মেন রাস্তা ছেড়ে ঢাল বেয়ে নীচে নেমে ধানজমির আলপথে নামতেই কুঁইকুঁই শব্দটা পেল। অন্ধকার চারদিক। প্রথমটায় স্বভাববশে ঘাবড়াল। খুব ক্ষীণ শব্দটা। একটু কান খাড়া করে শুনেই বুঝতে পারল কীসের শব্দ। চলেই যাচ্ছিল, হঠাৎ সাইকেলটা থামাল। ধানের চারা বসানো হয়েছে সদ্য। জমিতে জল। বিড়বিড় করে লতা লতা বলতে বলতে একরাশ সাহস সঞ্চয় করে এগিয়ে গেল শব্দটার দিকে। কাদায় পড়েছিল প্রাণীটি। উঠতে পারছিল না। আহা রে সারারাত্তির এভাবে থাকলে নিশ্চয়ই মরে যাবে। ঘাড়ের চামড়া ধরে তুলল কুকুর বাচ্চাটাকে। কাদায় মাখামাখি। আলের ওপর বসিয়ে দিয়ে চলে যেতে গিয়েও আবার ফিরে এসে তুলল ওটাকে। কাঁউ কাঁউ করে ভয় জানালো প্রাণীটা। বেশ মজা লাগল বকুলের। বাড়ি নিয়ে চলে এল। কলপাড়ে নিয়ে গিয়ে চান করিয়ে একটা ছেঁড়া গামছা দিয়ে ভালো করে গাটা মুছিয়ে দিয়ে দেখল সাদার মধ্যে লাল ছোপ। শীতে ঠকঠক করে কাঁপছে। দাঁড়াতে পারছে না। খিদে পেয়েছে বোধহয়। বকুলের নিজেরও পেট চোঁ চোঁ করছে। বাড়া ভাত পাবার ভাগ্য নিয়ে তো জন্মায়নি। রোজের মতো স্টোভ জ্বালিয়ে ভাত বসিয়ে হাঁড়িতে একটা ডিম ছেড়ে দিয়ে বসল বকুল। আজ সকাল থেকে মনটা ওর উদাস হয়ে আছে। বিনয়বাবু আজ খুব খিস্তিয়েছে ওকে। দুবার ওজন ভুল করেছে। আরেকবার এক খদ্দেরের মাল অন্যের বাড়ি দিয়ে এসেছে। ভুল হবে নাইবা কেন? মনের আর দোষ কী? আজ শ্যামা যে শাড়িটা পরে দোকানে চা দিতে এসেছিল দেখেই মনে মনে অজ্ঞান হয়ে গেছিল বকুল। মাইরি কী লাগছিল দেখতে! চব্বিশ পঁচিশ বয়স। গায়ের রংটা শ্যামলা, কিন্তু চেহারাটা। ... উহ কোনো লবাবের বিটি মনে হয় দেখলে। বড়ো বড়ো টানা চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে কথাই বলতে পারে না বকুল। অন্যদিকে তাকিয়ে চায়ের ভাঁড় নেয় ওর হাত থেকে বরাবর। মুখটা একেবারে লক্ষ্মীঠাকুর। আজ বিনয়বাবু পর্যন্ত বলেছেন, আজ তোকে বেশ লাগছে দেখতে। হেসেছে শ্যামা। দোকান সেরে বন্ধুর বিয়েতে যাবে। সে হাসি আড়চোখে দেখেছে বকুল। আর সেই ছ্যাঁকা খেয়ে সারা গায়ে ফোস্কা। এখনও জ্বলছে চিড়বিড় করে। দেখলে কার বাপের সাধ্যি বোঝে যে মেয়েটা ছিটে বেড়ার চায়ের দোকান চালায়। বিনয়বাবুর দুটো দোকান পরেই শ্যামার দোকান। আশপাশের দোকানগুলোয় নির্দিষ্ট সময় অন্তর নিজেই কেটলি আর ভাঁড় নিয়ে চা দিয়ে যায়। মাসকাবারি। বকুলের মনের একদম ভেতরে খুব ইচ্ছে ... কিন্তু ভয় করে। নিজেকেও ঠিকঠাক জানাতে ভয় করে। ... কেন যে করে! কুকুর বাচ্চাটা একটু সামলে উঠে বকুলের কোলে চাপতে যাচ্ছিল, হ্যাট করতেই বাচ্চাটা চার পা আকাশে তুলে কুঁইকাঁই করে ভয়ে অস্থির। ভালো লাগল বকুলের। আবার হাত তুলে হুশ হ্যাট শব্দ করল। আরও কাঁউ কাঁউ। হা-হা করে হেসে উঠল ও।

থেকে গেল কুকুরটা। সারাদিন দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকত ঘরের সামনে। দুপুরে-রাতে বকুলের সঙ্গেই খেত। বিনিময়ে শুধু বকুলের ইচ্ছে হলে ভয় পেতে হত কুকুরটাকে। একটা লাঠি রেখেছিল বকুল। ইচ্ছে হলেই ওটা তুলে মারের ভয় দেখাত। কখনো দু-এক ঘা দিয়েও দিত মনপসন্দ ভয় না পেলে। কান্নাকাটি করত দড়িবাঁধা কুকুরটা। আরাম লাগত বকুলের। ভয় পা ... শাহ ... পেলি ভয়, ... দেব...

শ্যামার বাড়িও নপাড়ায়। আসা যাওয়ার পথে কোনো কোনোদিন দেখা হয়ে যেত দুজনের। শ্যামা কোনদিন বলত সাইকেলে নিয়ে চল আমাকে। বকুল ঢিবঢিবে বুকে ওকে সাইকেলে বসাতো। শ্যামা বসেই পটরপটর শুরু করে দিত। সাতরাজ্যের গল্প। ওর দোকানের বিক্রিবাটা থেকে, কে কেমন খদ্দের, পঞ্চায়েত প্রধানের বজ্জাতি থেকে ওর নিজের জীবনের দু:খগাথা। সব কিছুই থাকত। বকুলের কানে কিছুই ঢুকত না। ওর তখন শ্যামার চুলের গায়ের গন্ধে ঝিমঝিমে মাথা। খুব ইচ্ছে করে সামনের রডে বসা শ্যামার তেল চকচকে নিটোল কাঁধটায় থুতনি রাখতে। কিন্তু.... ভয়। অনেকক্ষণ পর শ্যামা বলে উঠত কীরে শুনছিস না?

উঁ

ছাই শুনছিস। লাস্ট লাইনটা কী বললাম বলত?

বকুল পড়ত মহা ফাঁপরে। হে-হে ... ঠিক মনে পড়ছে না।

বলদ' কোথাকার!

শ্যামার বাপ মারা গেছে ছোটোবেলায়। চায়ের দোকানটা ওর বাপেরই ছিল। তারপর মা চালাত। এখন শ্যামা চালায়। এতটা রাস্তা মা আর আসতে পারে না রোজ রোজ। বয়স হয়েছে। এইটুকু বয়সের মেয়ে সারাদিন শুধু কাজ আর কাজ আহা রে! বিনয়বাবু একদিন বললেন শ্যামার বিয়েতে কবজি ডুবিয়ে মাংস খাব। কীরে খাওয়াবি তো?

বিয়ে কেন, এমনিই খাবেন একদিন।

না, বিয়েতেই খাব। হ্যাঁরে কবে করবি? আমরা সব মরে ভুত হবার পর?

চা-ওয়ালিকে কে বিয়ে করবে? আর বিয়ে করে চলে গেলে মাকে, এ দোকানটা কে দেখবে? এমন অদ্ভুত দু:খ-দু:খ হাসি হাসতে হাসতে কথাগুলো বলেছিল শ্যামা যে বকুলের বুক মুচড়ে গেছিল।

তো কাছাকাছি কোনও ছেলে দেখে কর। সবদিক থাকবে।

দে-এ-খি। আর কথা বলেনি শ্যামা।

ইস বকুলের যদি একটু সাহস থাকত। কব্বে বলে দিত কথাটা। কেন যে আটকে যায়! কীসের যে এত ভয় তল পায় না বকুল। ঢেঁকুরের মতো কথাটা গলার সামনে ঠেলেঠুলে এগিয়ে এসেও আবার পেটে সেঁদিয়ে যায়। খুব অস্বস্তি হয়। সুতরাং রাগ। আর রাগ হলেই এখন সব ঝাল গিয়ে পড়ে কুকুরটার ওপর। সারাটা রাত্তির ধরে কুকুরটাকে লাঠি দিয়ে ভয় দেখাতে দেখাতে এক সময় বেদম ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ে। ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে বকুল। কুকুরটা হাঁ করে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে।

দিনে দিনে অস্থির হয়ে উঠতে থাকে বকুল। ইদানীং শ্যামা ওকে অকারণ খুব তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। কথায় কথায় ঠোকে। কেন কে জানে! দোকানে সবার সামনে দুম করে ভ্যাঙায়। এইতো পরশু দিন রাত্রি সাড়ে নটা নাগাদ বকুল দোকানের শাটার নামাচ্ছে। দেখতে পেল শ্যামা হেঁটে বাড়ির দিকে ফিরছে। এমনি দিনে ও আটটার পরেই দোকানের ঝাঁপ ফেলে বাড়ি চলে যায়। একা মেয়েমানুষ এতটা পথ। তারপর বাড়ি ফিরেও অনেক কাজ থাকে। বিনয়বাবু দেখতে পেয়ে বললেন কীরে, এত রাত্তির করলি আজ?

একটা বড়ো অর্ডার ছিল। খুব দেরি হয়ে গেল। রিকশাও পেলাম না। যেতে যেতেই উত্তর দিল শ্যামা।

তা বলে এতটা রাস্তা অন্ধকারে হেঁটে ফিরবি? আজে বাজে সব ছেলে ...

কী আর করব?

না না একা যাস না। এইতো বকুল ফিরবে। ওর সাইকেলে চলে যা।

প্রস্তাবটা বকুলের কাছে বুকে ঝিং ধরানো। কিন্তু বিনয়বাবু কথাটা এমনভাবে বললেন যেন বকুল ভরপুর জোয়ান কোনো ছেলেই নয়। তারপর আবার দাগা মারল শ্যামা, ওর সঙ্গে! তার চেয়ে একা ফেরা ভালো। ওকে কে সামলায় ঠিক নেই। ... হেসে উঠলেন বিনয়বাবু। গোটা গা চিড়বিড়িয়ে উঠল বকুলের। এত্তটা অপমান! ছেলে না হয় নাই ভাবলি, একটা মানুষতো রে বাবা! আমি পোকামাকড় তো নয়।

তিরিক্ষে মেজাজ নিয়ে বাড়ি ফিরে লাঠিটা হাতে নিয়ে কুকুরটাকে মারতে যাবার আগেই কেঁউ কেঁউ করে বেশি বেশি নাটক শুরু করে দেয় কুকুরটা। ও-ও এখন আর ভয় পায় না বকুলকে। দুবেলা ভরপেট খাওয়া পায় বলে মনিবকে খুশি করতে স্রেফ অভিনয় করে ভয় পাওয়ার। ব্যাপার বুঝতে পেরে দাঁতে দাঁত ঘষে কষিয়ে বকুল এক লাথি মারে কুকুরটার পেটে। আচমকা আঘাতে খ্যাঁক করে ওঠে কুকুরটা। আরেকটা লাথি মারতে যাবার আগেই মদ্দা কুকুরটা বড়ো বড়ো দাঁত বার করে ফেলে গড় গড় করতে থাকে। অর্থাৎ মনিব হও আর যাই হও, আর বেশি বাড়াবাড়ি কোরো না। নইলে এই দাঁত দেখছ ... সাত-আট মাস বয়স হয়ে গেল কুকুরটার। এখন আর খুব ছোটো নেই। শিরশির ভয়টা পেতেই কেঁদে ফেলল বকুল হাউ হাউ করে।

পরদিন সকালেই কুকুরটার গলার চেন খুলে দিল। যেখানে খুশি চলে যাক। কুকুরটা পুরোপুরি চলে গেল না অবশ্য। খাবার দু-টাইম ঠিক চলে আসে বকুলের সামনে। কোনোদিন জোটে, কোনোদিন মেলে না। কুকুরটা চলে যাবার পর থেকে সারাদিন একটা নিষ্ফল আক্রোশ ছুটোছুটি করতে থাকে বুকলের পা থেকে মাথা পর্যন্ত। কাজে মন লাগে না। জীবনে প্রথম দু-একদিন কামাই করে ফেলে। কিছু একটা ভয়ংকর করে ফেলতে তীব্র ইচ্ছা করে।

বেস্পতিবার দোকান বন্ধ। সারাটা দিন ঘরবার করতে করতে মনে হাঁফ ধরে গেছিল বকুলের। মাথাটা হালকা করার জন্য ভাবল গঙ্গার ধারে শিবতলার মেলায় যাবে। মেলায় ঘুরলে টুরলে যদি মনটা একটু ভালো লাগে! ভাবামাত্র সাইকেল চালিয়ে সটান মেলায়। এমনিই এলোপাথাড়ি মেলায় ঘুরছিল। সবই দেখছিল কিন্তু কিছুই ভালো লাগছিল না। ফিরে আসতে গিয়ে একটা দোকানের সামনে প্রায় হোঁচট খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল বকুল। লোহার বঁটি, কাটারি, খুন্তির দোকান। ওর মধ্যেই চকচকে, প্রায় ছয় ইঞ্চি ফলার ভয়ানক জিনিসটা চোখে পড়ে গেল। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ জিনিসটার দিকে তাকিয়ে দেখল। তারপর গুটিগুটি এগিয়ে গিয়ে চারদিক দেখে নিয়ে গলা খাঁকরে বলল ওটা দেখি। হাতে নিতেই হাত শিরশির। ছুঁতেই শরীর জুড়ে কেমন একটা ...! বাঁকানো ফলা। রক্ত খাওয়ার জন্যই যেন জন্মেছে। দরদাম না করে হুট করে কিনে ফেলে ছোরাটা। প্যান্টের গেঁজে ঢোকাতেই অদ্ভুত একটা অচেনা মেজাজও ঢুকে পড়ে বকুলের ভিতর। নিজেকে একেবারে অন্যরকম মনে হয়। বা-হ! ফুল স্পিডে সাইকেল চালাতে থাকে ও জীবনে প্রথম। আজকে যদি ... শ্যামার দোকানের পাশ দিয়ে যেতে একঝলক দেখল শ্যামা দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করছে। আচমকা ব্রেক কষে বকুল। সটান শ্যামার কাছে এসে জিজ্ঞেস করে কীরে বাড়ি ফিরবি?

হুঁ, অন্যদিকে তাকিয়ে উত্তর দেয় শ্যামা।

চ, সাইকেলে চেপে পড়।

গলার টোন শুনে এক মুহূর্ত তাকাল শ্যামা। তারপর বলল না - না তুই চলে যা।

আরে চলত। গলায় এমন একটা চোরা হুকুম ছিল বকুলের, শ্যামা না বলতে পারল না আর। অবাক হয়ে সাইকেলে চেপে বসল। আবার সাঁই সাঁই চালাতে থাকল বকুল। লজঝড়ে সাইকেল তার বার্ধ্যক্যের প্রতি আচমকা এমন অবিচারে তীব্র প্রতিবাদ জানাতে জানাতে চলল বকুলের পায়ের হুকুমে।

এত জোরে চালাচ্ছিস কেন?

এমনিই।

হাঁপাচ্ছিস তো, আস্তে চালা।

ঠিক আ-ছে। আবার দুজন চুপ। ঘেমে সপসপে হয়ে উঠছিল বকুল উত্তেজনায়। মেন রাস্তা ছেড়ে মাঠের আলে সাইকেল নামতেই সাইকেল থামিয়ে দিল। একবার নামত।

কেন?

নাম না।

নামল শ্যামা। বেশ হকচকিয়েই ছিল বকুলের এমনধারা আচরণে। এখন আরেকটু বাড়ল। নির্জন ধানক্ষেত। আকাশে ঘসা আবছা আলো।

... তোকে একটা কথা বলব?

বল।

দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ। কী হল বল কী বলবি?

বকুল ততক্ষণে উত্তেজনার চাপে প্রায় বেঁকে গেছে। প্যান্টের গেঁজে থেকে থরথরে কাঁপা হাতে ছোরাটা বার করে আনল শ্যামার মুখের সামনে। শুকনো খটখটে জিভে অনেক চেষ্টায় খানিকটা থুতু মাখিয়ে ঠোঁট চেটে কিছু একটা বলতে যাবার আগেই শ্যামা বলে উঠল মেলা থেকে কিনলি?

উঁ।

মেলা থেকে কিনলি?

হুঁ ... হুঁ ... তো-তোকে ... এ ...

তো ঘরের কাজের জন্য মানুষ মারার ছুরি কিনেছিস কেন?

কে ... কে ... ন ভয় করছে তোর? ... এ্যাঁ ভয় করছে? চিকচিক করে ওঠে বকুলের চোখ মুখ। শ্যামা অদ্ভুতভাবে হাঁ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল বকুলের ভিখিরি চোখদুটোর দিকে। কী যেন বোঝার চেষ্টা করল। তারপর ফিসফিস করে বলে উঠল তো, ভয় করবে না! অমন একটা ভয়ংকর জিনিস হাতে নিয়ে রাত্তিরে ফাঁকা মাঠে আমার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছিস। ... ফ্যাল ওটাকে।

ভয় করছে! ... সত্যি-ই! প্রায় চিল্লে ওঠে বকুল।

হ্যাঁ ... সত্যি সত্যি-ই। বলতে বলতে বকুলের হাত থেকে ছোরাটা কেড়ে নিয়ে মাঠে অ-নেক দূরে ছুঁড়ে ফেলে দেয় শ্যামা। তারপর আচমকা চেপে ধরে বকুলের হাত। ঘন হয়ে আসে ওর কাছে। আবার শিরশির করে ওঠে বকুলের গোটা শরীর। ভয়ে? ... নাহ, ঠিক তা নয় বোধহয়!

রোববার, বর্তমান

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%