বিনোদ ঘোষাল
আজ সারাদিন ধরে ঝরেছে। বিকেলের দিকে সামান্য কমেছিল। এখন রাত্রি আটটা দশ। বেশ ভালো জোরেই পড়ছে বৃষ্টিটা। হুশহুশ করে চলে যাওয়া প্রাইভেট কার আর ট্যাক্সিগুলোর হেডলাইটের আলোয় পিচের রাস্তায় ঝাঁপিয়ে পড়া ধোঁয়ার মতো বৃষ্টি মাঝেমধ্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। আমি আর সুনন্দা ভিক্টোরিয়ার পাঁচিল লাগোয়া বাইরের ফুটপাথে একটা গাছের নীচে, সুনন্দার ফুলছাপ লেডিজ ছাতার তলায় দাঁড়িয়ে বারো আনা ভিজছি। দাঁড়িয়ে আছি এখানে একটা ট্যাক্সির আশায়। গাছের নীচটা ঝাপসা অন্ধকার। আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নিয়ন আলো একটা মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। রাস্তার ওপারে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড পার্কটা অন্ধকার। ঘোড়ার গাড়িগুলোও দাঁড়িয়ে নেই আজকে। আমার ডান হাত সুনন্দার কাঁধে রাখা। সুনন্দার বাঁ দিকের বুকটা আমার পাঁজরে বিঁধে রয়েছে।
এই মাত্র একটা ট্যাক্সি গেল। হাত দেখালাম, দাঁড়াল না। ট্যাক্সির হেডলাইটের ঝলকানিতে সুনন্দার মুখটা মুহূর্তের জন্য দেখতে পেলাম। ক্লান্ত মুখটায় বৃষ্টির জল স্প্রে করা। রোদে শুকিয়ে ওঠা ফুলকে বারবার জলের ঝাপটা দিয়ে যেভাবে তাজা রাখার চেষ্টা করা হয় ঠিক তেমনি ফুলের মতো লাগল ওর মুখ। আমি সুনন্দার গাল চেপে ধরে ওকে আবার একটা চুমু খেলাম। চ-ক করে শব্দ হল। আরাম লাগল শুনে। তবে ওর সঙ্গে বড়ো কাজটা হয়নি বলে মনটা খুঁতখুঁতে হয়ে আছে। আলগোছে বুকের ওপর পড়ে রয়েছে না পাওয়ার ব্যথাটা। আজ স্রেফ হালকাফুলকা প্র্যাকটিস ম্যাচ ছিল দুজনের। দুপুরবেলায় অফিস থেকে ওকে নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলাম সিটি সেন্টারে। ওখানে সন্ধে পর্যন্ত কাটিয়ে তারপর এসেছিলাম এদিকে। সিটি সেন্টারে আমার পকেটের বেশ খানিকটা হালকা করে দিয়েছে সুনন্দা। সে তুলনায় আজ আমি লসে রান করছি। অন্য একদিন পুষিয়ে নিতে হবে।
কী হচ্ছে রাস্তার মধ্যে! আমার হুট করে গজানো ফুলকো ভুঁড়িতে আঙুলের খোঁচা মেরে আদুরে গলায় বলল সুনন্দা।
ধ্যাসস ... ছাড়ো তো। ক্যা দেখছে? আমি তাচ্ছিল্যে উত্তর দিলাম।
ওই যে, দেখো না।
কে-এ বলে আমি তাকালাম। এতক্ষণ খেয়াল করিনি। আমাদের থেকে কুড়ি ফুট মতো দূরে দুটো মেয়ে দাঁড়িয়ে। একজন মোটা বেঁটে, আরেকজন লম্বা চিমসে। দুজনেই শাড়ি পরা। আমাদের মতোই একটা ছাতা দুজনে মাথায় দিয়ে ভিজেছে। ঝাপসা অন্ধকার বলে এতটা দূর থেকে বয়সটা আন্দাজ করতে পারলাম না। আমি সুনন্দাকে ভুরু নাচিয়ে বললাম কারা, চেনো?
নাহ, আমি কী করে চিনব?
লাইনের মেয়ে।
যাহ কীই যে বলো না! কীভাবে বুঝলে?
ওসব অমি খুব ভালো করে বুঝি।
মেয়েছেলে দুটো অবশ্য আমাদের একটুও পাত্তা দিচ্ছে না, ওরাও হাঁ করে তাকিয়ে আছে রাস্তার দিকে।
কী গো ওরাও ট্যাক্সি খুঁজছে না-কি? সুনন্দার গলায় বিস্ময়।
ট্যাক্সি নয়, ট্যাক্সির ভিতরে কাস্টমার খুঁজছে।
উঁ ... সুড়সুড়ি লাগছে' বলে সুনন্দা ওর বুকের ওপর রাখা আমার হাতটা সরিয়ে নিয়ে নিজের গালের ওপর রাখল। পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়ার সাহস এখনও ওর হয়নি।
দুজনে একসঙ্গে খুঁজছে?
হুম, অনেক কাস্টমার আছে যাদের এক পিস মালে পোষায় না। ব্লু- তে দেখো না।
সুনন্দা আমার কে? গোদা উত্তর দিলে বলতে হয়, আমার বন্ধু অনুপের প্রেমিকা। মানে ওই-ই হল আর কী। বিয়ে যখন করেনি তখন বউ তো আর বলতে পারব না। হ্যাঁ, পার্টনার বলা যায়। ওরা দুজনে কিছুদিন আগে পর্যন্তও একসঙ্গে থাকত। লিভ-টুগেদার। ইদানীং ওদের মধ্যে খুব কিচাইন চলছিল। আমার নজর সুনন্দার ওপর গোড়ার থেকেই ছিল। অনুপ প্রথম যেদিন আমার সঙ্গে সুনন্দার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল সেদিনই ঠিক করে নিয়েছিলাম এই আগুনের ছ্যাঁকা আমি একদিন খাবই খাব। অপেক্ষায় ছিলাম। দিন পনেরো আগে মওকা পেয়ে গেছি।
আমি অর্ক সেনগুপ্ত, জীবনে কোনওদিন হারিনি। ছিলাম একটা অ্যাড এজেন্সিতে অ্যাসিসট্যান্ট ক্যামেরাম্যান। সেখান থেকে বছর আটেকের মধ্যে আমি এখন স্টার অ্যাড এজেন্সির সোল প্রোপ্রাইটর। ডালহৌসিতে নিজের ছোট্ট অফিস। পাঁচজন এমপ্লয়ি। অবশ্য রিসেপশনিস্ট সোমাকে আমি শুধু এমপ্লয়ি বলব না। তাহলে ঠাকুর পাপ দেবেন। ও আমার থামস আপ। টেস্ট দ্য থান্ডার। প্রতি চুমুকে যেমন ঝাঁজ তেমন স্বাদ। তবু কিছুদিন ধরে একটু একঘেয়ে লাগছিল। ডিপ্রেসড হয়ে পড়েছিলাম। তার মধ্যে হুট করে জুটে গেল সুনন্দা। আমার ডান হাতের তালুতে শুক্রের স্থান বিশাল চওড়া। আসলে লিভ-টুগেদার কনসেপ্টটা বাঙালি এখনও ভালো করে ধরতে পারেনি। একেবার কাঁচা ইমপোর্টেড তো, রং শুকোয়নি ভালো করে। তার আগেই হাতে পেয়ে টক করে গিলে ফেলে হজম না করতে পেরে এখন বিষ গ্যাস ছাড়ছে। আরে বাবা একটানা একজনের সঙ্গে থাকা মানে তো সেই বিয়েরই জাতভাই। শুধু সিঁথিতে লাল ছাপের ডিফারেন্স। এই জমানায় কেউ কারও সঙ্গে একটানা থাকতে পারে, না থাকা উচিত? এসো, ক-দিন এনতার দুজন দুজনের মেডিকেল টেস্ট নাও, তারপর ফুটে যাও, এই হল পরিষ্কার হিসাব, এইতে জগতে শান্তি থাকে। সুনন্দা ভেবেছিল সারাজীবন অনুপের সঙ্গে মডার্ন ইনটেলেকচ্যুয়াল লাইফ কাটাবে, তাই আবার হয় ...!
অবশ্য এতবড়ো জ্ঞানের কলসি হয়ে ভুল আমি নিজেও করেছি। বিয়ে করার ভুল। কী করব মাইরি? তখন আমি সাড়ে ছ-হাজার মাইনের ছাপোষা ক্যামেরাম্যান, কিন্তু বয়সের চুলকানি তো আর মাইনে কম দেখে চুপ করে থাকে না। যার ফলে ঝ্যাং করে মেরে দিলাম বিয়েটা। তখন আমার বউ রত্নাই ছিল আমার শিল্পা শেঠি, ক্যাটরিনা কাইফ। কিন্তু তারপর যা হয়, একদিকে আমার চড়চড়িয়ে উন্নতি আর অন্যদিকে বিয়ের বছরখানেক বাদে ছেলেটা হবার পর থেকেই রত্নার ধড়ফড়িয়ে ফিগার হড়কানো। বছর চারেকের মধ্যে আমার বউ শ্বশুর-শাশুড়ি-পরায়ণা টিপিক্যাল ঢ্যাপ্পোস বাঙালি বউমা হয়ে গেল। পো-ষায়!
ওই— ওই যে আরেকটা আসছে। দেখো ফাঁকা আছে' বলে চেঁচিয়ে উঠল সুনন্দা। ট্যাক্সিটা স্পিড কমিয়েছে। তার মানে যাবে। আমি পৌঁছোনের আগেই হঠাৎ সেই মেয়ে দুটো আগে ঝাঁপিয়ে পড়ল ট্যাক্সির ওপর। আমি অবাক, এ কী রে, বেশ্যা চাপবে ট্যাক্সি! আমি এগিয়ে এসে গম্ভীর গলায় ট্যাক্সিওয়ালাকে বললাম হাওড়া যাব। যদিও খেয়াল করে নিয়েছি ওই মেয়ে দুটো তার আগেই হায়ার করে নিয়েছে। ট্যাক্সিওয়ালা বলল ভাড়া হয়ে গেছে।
আমি, অর্ক সেনগুপ্তকে টপকে ওই রাস্তার মেয়েছেলে দুটো ... দুশো টাকা দেব, চলো।
মিটার ডাউন করে ট্যাক্সিওয়ালা আরও গম্ভীর হয়ে বলল বললাম তো হয়ে গেছে। ঠান্ডা হাওয়াতেও আমার দুই কান গরম হয়ে উঠেছে ততক্ষণে। বললাম তিনশো। এবারে ড্রাইভার উত্তরই দিল না, একবার শুধু তাকাল আমার দিকে, কেন যে আমার মারুতি জেনটা আজ অফিসে আনলাম না। আসলে রোজ ওটা চালিয়ে কলকাতা আসি না। মাঝেমধ্যে বিশেষ কাজ থাকলে তবেই আনি। রোজ রোজ অত টাকার তেল পোড়ানোর দম বা ইচ্ছে আমার কোনওটাই নেই। ব্যাবসাটা আরও বাড়ুক তারপর দেখা যাবে। এসব ব্যাপারে আমি খুব হিসেবি।
ছাতা বন্ধ করে ট্যাক্সির পেছনের দরজা খুলে আগে মোটকা পেটওয়ালা মেয়েটা ঢুকল। এক হাতে ভিজে ঢোল একটা বিগ শপার্স। পঁয়ত্রিশের আশেপাশে বয়স হবে মেয়েটার। চিমসেটা ভ্যানিটি ব্যাগ বুকে জড়িয়ে ট্যাক্সিতে ঢুকতে গিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করল হাওড়া টেশন যাবেন?
গলাটা হিজড়েদের মতো। আমি অন্যদিকে তাকিয়ে বললাম হুঁ।
মেয়েটা জানালা দিয়ে উঁকি মেরে একটু দূরে দাঁড়ানো সুনন্দার দিকে একবার তাকালো। সুনন্দাও এদিকে তাকিয়ে কী ব্যাপারটা ঘটছে বোঝার চেষ্টা করছে।
ওই মেয়েটাও যাবে? মুটকি পাশ থেকে জিজ্ঞেস করল।
হুঁ।
ঠিক আছে উঠে আসুন তা-লে। আমরাও টেশন যাব।
শুনে হাঁ হয়ে গেলাম। ইরিহ ... অর্ক সেনগুপ্তকে দয়া দেখাচ্ছে বেশ্যা!
অ্যাহ!
কী হল, গেলে তাড়াতড়ি করুন। আমাদের টেরেন ধরতে হবে। চিমসেটা প্রায় ধমকাল আমাকে।
এক সেকেন্ড বলে আমি প্রায় দৌড়ে গেলাম সুনন্দার কাছে।
কী হল?
ট্যাক্সিটা হাওড়া যাবে। চলো
তা-লে ওই দুটো উঠল কেন?
ওরাও যাবে।
মানেহ চমকে উঠল সুনন্দা। আমাদের সঙ্গেই?
আমাদের সঙ্গে নয়। আমরা ওদের সঙ্গে যাব। ট্যাক্সিটা ওরা আগে হায়ার করেছে।
ইমপসিবল। তুমি অন্য ট্যাক্সি দেখো।
আবার কখন পাব ঠিক নেই। কলকাতায় তো ব্যাঙে পেচ্ছাব করলে গাড়িঘোড়া বন্ধ হয়ে যায়। আর না হলে ওই-ই থিয়েটার রোডের মুখ পর্যন্ত হেঁটে যেতে হবে। তাও আজ খালি পাব কি না সন্দেহ আছে।
ধুৎ ভাল্লাগে না।
তাহলে তুমি দাঁড়িয়ে থাকো। আমি চললাম। মাথা গরম হল আমার। এবার সুনন্দা নেহাত অনিচ্ছায় গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এল। ট্যাক্সির সামনে এসে আমি পিছনের দরজা খুললাম, ড্রাইভার আমার দিকে তাকিয়ে বলল একজন সামনে চলে আসুন। ইঙ্গিতটা আমাকেই।
আমি সামনে এগোতে যেতেই সুনন্দা আমার হাত চেপে ধরল কোথায় যাচ্ছ? আমি কি একা বসব না-কি? নেভার।
এই সস্তার মেয়েছেলে দুটোর সঙ্গে একই সিটে যেতে সুনন্দার প্রবল আপত্তি। খুব স্বাভাবিক। সুনন্দার স্ট্যান্ডার্ড অনেক হাই।
আরে ধ্যাত্তেরি! এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই মাইরি সকাল হয়ে যাবে। শুটকি ঝাঁজিয়ে উঠে বাইরে বেরিয়ে এসে বলল যান যান আপনারা ভেতরে যান। নাকের নথ চকচক করে উঠল মেয়েটার। এই মেয়েটার বয়স বোঝা সত্যি কঠিন। দড়ি পাকানো চেহারা। থ্যাবড়ানো বুক। খদ্দের পায়? আমি আর সুনন্দা সুড়সুড় করে পিছনে ঢুকলাম। চিমসে, সামনে ড্রাইভারের পাশে গিয়ে বসল। আর পিছনের সিটে মাঝখানে আমি। আমার ডানপাশে মুটকি আর বাঁ দিকে সুনন্দা। ট্যাক্সি স্টার্ট নিল।
বৃষ্টিতে কাচের জানালা ঝাপসা। সামনে ওয়াইপার চলছে সটাসট। ডাফরিন রোডে উঠতেই আমি সুনন্দার দিকে ঠেসে বসলাম। সুনন্দাও কাছে সরে এল। ভিতরটা উশখুশ করছে, এই ঢ্যামনা দুটো কপালে না জুটলে এই রাস্তাটুকুও দিব্যি দুজনে মুচুমুচু করতে করতে যাওয়া যেত। ট্যাক্সির ভেতরটা মেয়ে দুটোর গায়ের ঘাম আর সস্তার পারফিউমের গন্ধে গুমোট হয়ে আছে। ভীষণ রাগ হচ্ছে আমার। আমার শার্টে মাখানো হাজার টাকার পারফিউমের গন্ধ হেরে গিয়ে ক্যাবলার মতন তাকিয়ে আছে ওদের ঘামের গন্ধের দিকে। মেয়ে দুটো কেউ কথা বলছে না। বেশ ক্লান্ত মনে হচ্ছে ওদের। আমি আড়চোখে একবার আমার পাশেরটার দিকে তাকালাম। শ্যামলা গায়ের রং। লালচে চুল ভিজে সপসপে। চওড়া কপাল, শাড়ির আঁচলের সামনেটা ভিজে সরু হয়ে ধ্যাসড়ানো দুটো বুকের মাঝখানে চলে গেছে। এক আঙুল গভীর নাভি বার করা বিশাল উদোম ভুঁড়ির ওপর আলো পড়ে চিকচিক করে উঠছে। মনে হল আমি একটা ধেড়ে সাইজের কোলাব্যাঙের পাশে বসে আছি। ঘেন্না লাগল, আবার রাগ হয়ে গেল। এই হতভাগা দুটো না জুটলে সুনন্দাকে আরও খান পাঁচেক চুমু খেয়ে নিতে পারতাম এর মধ্যে। এই জমানায় সবই হিসাবকিতাবের ব্যাপার। আমি কি আর জানি না সুনন্দার নিজের কাজটা হাসিল হয়ে গেলে আমার পিছনে কিক মারবে। অবশ্য আমার তাতে কিসসু এসে যায় না। বরং বেশিদিন কাছে কামড়ে থাকলেই বিপদ। এক জিনিস কিছুদিন টানা ইউজ করলেই আমার ডিপ্রেশন আসে। আসলে সুনন্দা পড়েছে বিপাকে। মডার্ন খেলাঘর বাঁধবে বলে নিজের চালচুলো ছেড়ে চলে এসেছিল অনুপের কাছে। আর অনুপও তেমনই চিজ। মাসকয়েক ভালো করে রগড়ে ছেড়ে দিয়েছে। তারপর বেশ কিছুদিন ধোবি কা কুত্তা হয়ে এদিক ওদিক ঘুরছিল। একদিন কীভাবে যেন ঠিকানা জোগাড় করে আমার অফিসে। আমিও মওকা পেয়ে টোপটা ছেড়ে দিয়েছিলাম,আপনার এমন ফিগার। মডেলিং করেন না কেন?
— কে চান্স দেবে আমাকে? ... আপনি দেবেন?
— ওহ ... মাই প্লেজার।
সুনন্দার ব্যাকিং দরকার ছিল। আমি দিয়েছি। বিনিময়ে আমিও কিছু নেব। ব্যালেন্স ইকুয়াল। হিসাব চুকতা।
কটা বাজল রে? ধুমসিটা জিজ্ঞেস করল।
সামনের চিমসেটা হাতঘড়ি দেখে বলল, আটটা চল্লিশ।
ইস ... স টেরেনটা পেলে হয়। ফালতু ফালতু ট্যাক্সিতে উঠলাম। একগাদা পয়সা যাবে।
দেখা যাক। ও ডাইভারদা, এট্টু তাড়াতাড়ি চালাও গো। টেরেন ফেল করলে আর বাড়ি ফেরার বাস পাব না এরপরে।
রাস্তা চিনতে পারছিস না তো আমাকে বলবি তো। কাউকে জিজ্ঞেস করে নিতাম। কোথায় পিজি আর কোথায় আমরা চলে এসেছিলাম বল তো।
মুটকি গজগজ করতে করতে বলল।
চিমসেটা ওসব কথার উত্তর না দিয়ে পিছন ফিরে বলল আজ রাতে ছন্দার সঙ্গে আর কে থাকবে রে হাসপাতালে?
ধুমসি উত্তর দিল বেলা।
চেহারাটা আরও শুকিয়ে গেছে কমলার। ভাবছি কাল একটু ফলটল কিনে নিয়ে যাব।
মুটকি বলল, আয়াটা খচ্চর। নিজেই খেয়ে নেবে সব। তুই কমলাকে সামনে বসে খাইয়ে আসিস।
মোটামুটি একটা আন্দাজ করলাম। এদের লাইনের কেউ হাসপাতালে ভর্তি। পিজিতে। কোনও ভালো সোর্স আছে নিশ্চয়ই। এদের হাত তো অনেক দূর পর্যন্ত। তাকে নিয়েই কথা হচ্ছে এখন। কী রোগ হয়েছে কে জানে? এইডসও হতে পারে। আমি আরেকটু সুনন্দার দিকে ঘেঁষে এলাম। সুনন্দা খুশির ভাব দেখিয়ে একবার আমার দিকে তাকাল। আমি বাঁ হাতটা তুলে সুনন্দার বাঁ কাঁধের ওপর রেখে আলগোছে একবার ঘড়ির দিকে তাকালাম। তারপর চুঁইয়ে চুঁইয়ে হাতটা নামিয়ে আনলাম সামনের দিকে। সুনন্দার জিন্সের প্যান্ট আর সাদা স্লিভলেস শার্ট ভিজে সপসপে। শার্টের ভেতর দিয়ে ব্রা-এর আকৃতি স্পষ্ট। আমি ওর শার্টের প্রথম বোতামে হাত রেখে টুকুস করে বোতামটা খুলে আড়চোখে একবার ডানদিকের মুটকির দিকে তাকালাম। সে বাইরের দিকে উদাসভাবে তাকিয়ে আছে। আমাদের নিয়ে একটুও মাথাব্যথা নেই। আমি আর সময় নষ্ট না করে আমার ভেজা ঠান্ডা হাতটা সরীসৃপের মতো নি:শব্দে চালান করে দিলাম সুনন্দার জামার ভেতর। ও শুধু উঁ করে আলতো একটা আদুরে শব্দ করল। আমি নির্বিকার। সামনে রাস্তার দিকে চোখ। মিনিটকয়েক পর ট্যাক্সি স্ট্যান্ড রোডে উঠল। বিশাল জ্যাম। ভালোই হয়েছে। আরও কিছুক্ষণ সময় পাওয়া যাবে।
মুটকি চিমসেকে জিজ্ঞেস করল, ঘোষকে খুঁজে পেয়েছে?
না-নাহ, ও হারামি এখন আর এ তল্লাটে আসবে! কোন কুত্তার পেট থেকে বেরিয়েছিল কে জানে? চিমসেটা হঠাৎ এমন ফুঁসে উঠল কেন? ঘোষটাই বা কে? সুনন্দা ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকাল। মেয়েছেলে দুটোর স্ল্যাং-এ ও খুবই বিরক্ত। আমি ঠোঁট বেঁকিয়ে ওদের কথায় পাত্তা না দেওয়ার ইশারা করে আরেকটু চাপ দিলাম। বেশি হয়ে গেল বোধহয়। সুনন্দা উহ করে উঠল। আমার বাঁ হাত এখন সুনন্দার জামার ভেতর কবজি পর্যন্ত ডোবানো। কবজি ডুবিয়ে মাংস খাওয়া যাকে বলে ... হ্যা-হ্যাহ ... মুটকি আমার হাতের কন্ডিশন দেখেছে নিশ্চয়ই, দেখুক গে। এদের কাছে আবার সতীপনা দেখিয়ে কী হবে। এইসব তো ওদের কাছে জলভাত। ট্যাক্সি একটু একটু করে এগোচ্ছে। আর খুব বেশি হলে মিনিট পাঁচ-দশ। তারপর হাওড়া স্টেশনে ঢুকলেই সংসার, কে-কার। আমি উঠব ভিড়ে ঠাসা জেনারেলে। সুনন্দা লেডিসে। আজ বৃষ্টি হয়েছে, মানে ট্রেন লেটও থাকবে। ভিড়টাও বাড়বে। না-হ, এবার রোজই নিজের গাড়িটা নিয়ে যাতায়াত করতে হবে দেখছি। এই ঠেলাঠেলি এখন আর পোষায় না। আসলে এই কষ্টটুকু আমি এখন না করলেও পারি। তবু করি, যাতে বিজনেসের ক্যাপিটালটা আরও একটু বাড়ে। এখনও মাইলস টু গো। কিন্তু এই মেয়ে দুটোর পট্টি কোন লাইনে কে জানে। অবশ্য পট্টির নাও হতে পারে। আজকাল অনেকেই তো কলকাতায় ডেলি প্যাসেঞ্জারি করে। সারাদিন খেপ খেটে রাত্রে বাড়ি ফিরে যায়। ভালো বিজনেস র লেদারের। হা-হা-হা।
সুনন্দা এখন চন্দননগরে একটা লেডিজ হস্টেলে থাকে। ওই ঘটনার পর আর বাড়িতে ফেরেনি। আমি নামব উত্তরপাড়ায়। সেই একঘেয়ে পুরোনো একটা দোতলা বাড়ি। বাড়ির ভিতর আরও একঘেয়ে চারখানা মুখ। বাবা পুরোনো ঐতিহ্য সংস্কৃতির ইয়ে ধরে বসে আছে আর হোমিওপ্যাথির গুলি চুষছে। মা দিনরাত ঠাকুরঘরে বসে নিজের ছেলে ও জগতের কল্যাণ চেয়ে চলেছে। বউটা রান্নাঘরে। থাইরয়েডে ফুলে ঢোল। ছেলেটা খাটের ওপর বসে বইখাতা ছড়িয়ে পড়ার নাম করে সন্ধে থেকে চেল্লাচ্ছে। আ-র ভাল্লাগে না। ধ্যা-সস।
চিমসেটা এই শকুনের মতো চেহারায় কী করে কাস্টমার ধরে কে জানে! গোটা বডিতে মাল-মেটেরিয়াল বলে তো কিসসু নেই। ওর একটা হাত সিটের ওপর আড়াআড়িভাবে ড্রাইভারের পিছন দিয়ে রাখা। কবজিতে একটা লোহার চুড়ি ঢলঢল করছে। আঙুলে পলার আংটি। চিমসে বলল কমলা যদি সেরে ওঠেও, ডিউটি খুব শিগগির ধরতে পারবে বলে তো মনে হয় না।
মুটকি বলল, হুঁ, দেখা যাক। কথা তো বললাম দীপুদার সঙ্গে। মনে হয় একটা ব্যবস্থা হবে।
কীসের কথা?
ফ্যাক্টরির সবাই কিছু কিছু করে দেবে বলেছে। আসলে রোজগার একেবারে বন্ধ হয়ে গেলে ... ওর বাচ্চাটাও তো রয়েছে, না।
তা ঠিক সামনের দিকে মুখ ফেরাল চিমসে। নিজের মনে বিড়বিড় করল আমাদের শালা কপালটাই এমন।
আমি ওদের কথা শুনতে শুনতেই নিজের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।
সুনন্দা ফিসফিস করে বলল অ্যাই দেখছে কিন্তু।
দেখুক।
আজকের দুপুরটা পুরো লস হয়ে গেল। চিমসে বলল। হাজার পিস মালও পুরো কমপিলিট করতে পারিনি। দীপুদা তো আচ্ছাসে ঝাড়ল আমাকে। আসলে পুজোটা সামনে পড়ে গিয়েই ...
আমারও তো তাই, পুজোর টাইমটায় যাও বা ওভারটাইম করে বেশি পাব ভেবেছিলাম। উল্টে এবার মাস গেলে হাতে যা ঠেকবে, ঘরভাড়া দিতেই পুরো সাফ হয়ে যাবে।
যা — ক গেহ, মেয়েটা তো সুস্থ হোক আগে। টাকাপয়সা পরেও কামানো যাবে। কী বলিস?
ঠিকই। আমি ভাবছি কাল বি-শিফট ধরব, ওভারটাইমটা লস যাবে। ... যা-ক। কাল আমার পালা পড়েছে হাসপাতালে থাকার।
যা শালা ... এরা বেশ্যা নয়। ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। বুঝতেই পারিনি এতক্ষণ। সেল্ফ কনফিডেন্সে গুঁতো খেলাম। সুনন্দার জামার ভেতর ঢুকিয়ে রাখা হাতটা বার করে নিতে গিয়ে পৌরুষে লাগল। ধু-স, বেশ্যা না হোক ছোটোলোক তো বটে। এদের কাছে প্রেস্টিজ মারিয়ে কী হবে।
মুটকি হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে দুজনকে আপাদমস্তক মেপে নিয়ে পরিষ্কার গলায় বলল, আজ দেখেছিস কমলার বুকটা?
নাহ ... কষ্ট লাগে দেখলে।
ফোসকাগুলো গেলে গেছে। ডাক্তার বলল সেপটিক হয়ে গেছে। শোরের বাচ্চা, স্বামী হয়েছে ... স্বামী। একবার পাড়ায় ঢুকতে দেখি ঘোষটাকে, ওই সিগিরেট জ্বালিয়ে পোড়াব শয়তানটাকে, শালা — এক পয়সা রোজগারের মুরোদ নেই, বউ-এর পয়সায় বসে বসে খাস, তার ওপরেই আবার জোরজুলুম করিস। এত আস্পদ্দা!
চিমসে বলল স্বামী না রাক্ষস। মানুষ হলে এমন কাজ কেউ করতে পারে!
দুজনের ডায়লগবাজি শুনে যা মোটামুটি বুঝতে পারলাম — কমলা নামে একটা বউ এদের সঙ্গে ফ্যাক্টারিতে কাজ করে, তার বর ঘোষ কোনও কারণে সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়ে নিজের বউ-এর বুক দুটোকে ভালোমতো পুড়িয়েছে। মাথা গরম ছিল বোধহয়। তবে কেসটা ঠিক করেনি। এত পাওয়ারফুল ডোজ দেওয়া উচিত নয়। যদিও আমি নিজেও মনে করি মেয়েদের জাতটাকে ঢাকনা-চাপা দিয়ে রাখাই উচিত। বেশি বাড়তে দিলেই সোজা কপালে ছোবল মারবে।
তুই চিন্তা কর। এর পরও কমলা চুপটি ছিল। কাউকে কিছু বলেনি।
হ্যাঁ। বিশুর মা ওকে ডাকতে না গেলে তো কেউ ব্যাপারটা জানতেই পারত না।
সুনন্দা উশখুশ করছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম ও প্রাণপণ চাইছে আমি হাতটাকে বার করে ফেলি। ভয় পাচ্ছে ও। ভয় কীসের? আমার হাতে সিগারেট নেই।
হাওড়া ব্রিজে উঠল ট্যাক্সি। যাহ ... লাস্ট টাইম কিছু একটা করার জন্য ভাবতেই দেখি মুটকি একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বৃষ্টিটা থেমেছে। জানালা দিয়ে গঙ্গার ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছে হু হু করে। সকলেই চুপ। চিমসেটা হঠাৎ ফোঁস করে নিশ্বাস ছেড়ে বলল আর আমাদের কপালেও যে কী আছে ... কে জানে?
শুনেই মুটকি বেমক্কা ফুঁসে উঠল। দাঁতে দাঁত ঘষে বলল আমার কী ইচ্ছে হয় জানিস, সবকটা ব্যাটাছেলের বুকে অমন দুটো করে তাল বসিয়ে দিই। একবার বুঝুক শালারা জ্বালা কাকে বলে!
সুনন্দার জামার ভেতর ঢোকানো অর্ক সেনগুপ্তর হাত জীবনে প্রথমবার থিরথির করে কেঁপে উঠল। টেনে বার করে নিতে গেলাম, বেরল না। কীসে যেন আটকে গেছে। আচমকা অসহ্য জ্বালা করে উঠল।
আঙুলগুলোয় ... কীসে ছ্যাঁকা লাগছে ... ভীষণ ... উহ ... আ ... আহ!
সিনেমা এবং
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন