প্রাণ

বিনোদ ঘোষাল

বাচ্চাটা এখনও বেঁচে আছে। অথচ হাসপাতালের সকলে অপেক্ষা করছে ওর মৃত্যুর জন্য। আজ সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ জন্মেছে। গোটা পিঠ জুড়ে মস্ত একটা টিউমার। সেখান থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে শরীরের সব ফ্লুইড বেরিয়ে যাচ্ছে। বাঁচবার আশা প্রায় নেই-ই। অথচ বেঁচে আছে। গতকাল ভোর পাঁচটার সময় আমার স্ত্রী শ্রীময়ীও একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছিল। দীর্ঘ নয়-দশ মাস আগে থেকে গত পরশু রাত্রি পর্যন্তও সব কিছু ঠিক ছিল। ডাক্তার বলেছিলেন এভরিথিং ওকে। নর্মাল ডেলিভারিতে কোনও প্রবলেম নেই। যদিও শ্রীময়ী চেয়েছিল সিজার হোক। নর্মাল ডেলিভারির যন্ত্রণা ও নিতে চায়নি, তবু আমি আর ডাক্তার মিলে রাজি করিয়েছিলাম ওকে। গতকাল ভোরবেলা, পৃথিবীর সব জীবিত প্রাণী, যখন সবে ঘুম থেকে উঠছে কিংবা উঠব উঠব করছে, তখন শ্রীময়ী একটি মৃত শিশু প্রসব করেছে। ডাক্তার, নার্স, ম্যানেজার সকলে মিলে আমাকে আপ্রাণ বুঝিয়েছেন যে এটা আসলে একটা অ্যাক্সিডেন্ট, নইলে সবকিছুই সত্যি সত্যি ঠিক ছিল। আমি মেনে নিয়েছি শেষ পর্যন্ত। হৃৎপিণ্ডে ঝাঁকে ঝাঁকে বোলতা কামড়ানোর মতো সেই যন্ত্রণাকেও মেনে নিয়েছি। আমাদের বিয়ের দু-বছর পরের প্রথম ইস্যু। আমি মনেপ্রাণে চেয়েছিলাম একটা ছেলে হোক। তাই-ই হয়েছিল। সদ্যপ্রসূত মৃত পুত্রসন্তানকে আপাদমস্তক সাদা কাপড়ে মুড়ে আমি নিজের কোলে তাকে ... নাহ ... আমি প্রাণপণে ভুলতে চাই গতকালের সেই দৃশ্যগুলো। আমি যে এত কাঁদতে পারি কাল প্রথম জেনেছিলাম। কিন্তু শ্রীময়ী কাঁদেনি। একটুও কাঁদেনি। চুপ হয়ে গেছিল। এমন চুপ, যে ওর দিকে তাকাতে ভয় করছিল আমার কাল সারাদিন নার্স ও আয়ারা মিলে ওকে ওষুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। আর আমি সারাটা দিন এলোমেলো উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়িয়ে আবার সন্ধেবেলা হাসপাতালে ফিরেছি। মোবাইলটাও ইচ্ছে করে বন্ধ রেখেছিলাম সারাদিন। ফেরার পর হাসপাতালের সকলে আমার দিকে এমন সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল যে আমার ইচ্ছে হচ্ছিল ওদের চোখগুলো জন্মের মতো গেলে দিই। আমি রঙ্গিত দে, আদি সপ্তগ্রামে নবপল্লি গ্রাম পঞ্চায়েতের সহায়কের চাকরি করি। চৌত্রিশ বছর বয়স। এখনও পারমানেন্ট হইনি। শ্রীময়ীর বত্রিশ চলছে। প্রতি বছর স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা দেয়। কবিতার বই পড়তে ভালোবাসে। আমি ওসব বুঝি না। আমার জীবনে একমাত্র শখ দিঘা বেড়াতে যাওয়া। বহুবার গেছি। আরও যাব। সস্তায় পুষ্টিকর বলে বন্ধুরা আড়ালে প্যাঁক দেয়। আমার যা রোজগার তাতে শ্রীময়ীকে বড়ো কোনও নার্সিংহোম-এ ভরতি করার দম ছিল না। যদিও শ্রীময়ীর ইচ্ছে ছিল। দু-একবার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আমাকে জানিয়েওছিল সে ইচ্ছের কথা। আমি এড়িয়ে গেছি। তাছাড়া শ্রীময়ীর প্রেগন্যান্সিতে কোনোরকম কমপ্লিকেশনও ছিল না। তাই পরশু রাতে ওর পেইন শুরু হবার পর বাড়ি থেকে অটোয় করে এই নবপল্লি সেবাসদনেই ভরতি করেছিলাম ওকে। এই সেবাসদনটা পঞ্চায়েতের টাকায় চলে। এমনিতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, প্রচুর পেশেন্ট হয়। দুর্নামও নেই তেমন। গতকালও প্রায় তিন-চারটে ডেলিভারির কেস হয়েছে। সবকটি সুস্থ, শুধু আমার ছেলেই মৃত প্রসব হয়েছে। আর আজ সকালে একটা বিহারি ফ্যামিলির শিশু, সে প্রাণ নিয়ে জন্মেছে ঠিকই, কিন্তু সে প্রাণ কতক্ষণের কেউ জানে না। প্রাণরস ধীরে ধীরে বেরিয়ে যাচ্ছে শরীর থেকে। আর সবাই শিশুটির থেকেও অসহায় হয়ে সেই মৃত্যুদৃশ্য দেখছে। গতকাল সারারাত আমি সেবাসদনের নীচে পেশেন্ট পার্টিদের রেস্টরুমে নির্ঘুম বসে কাটিয়েছি। রাত্রি প্রায় একটা নাগাদ ওই ফ্যামিলিটির প্রায় নয়-দশজন স্ত্রী-পুরুষ মিলে এসেছিল এক সন্তানসম্ভবাকে ভরতি করতে, শীর্ণ চেহারা সে মহিলার। কেমন নেতিয়ে ছিল। যে ছেলেটি আসন্ন সন্তানের বাবা, তার বয়স আমার থেকে মনে হয় একটু বেশিই হবে। দুজন বয়স্কা মহিলার কোলে দুটি তিন-চার বছরের মেয়ে ছিল, যারা ওই লোকটাকে পাপা ডাকছিল। আজ সকাল সাড়ে সাতটার সময়, বাচ্চাটা জন্মানোর আগে পর্যন্ত ওরাও কেউ এতটুকু ঘুমোয়নি। নিজেদের মধ্যে ক্রমাগত গ্রাম্য হিন্দি ভাষায় বকবক করেছে, হাসাহাসি করেছে। একজন মহিলা ওই লোকটাকে হাসতে হাসতে বলেছিল, তু সোচ মত বিড্ডু, তেরো লেড়কোই হোগা, হম কহথনি, মান লো। উত্তরে শুধু গালভরা হেসেছিল ছেলেটা। সেই হাসিটা এখনও মনে আছে আমার তারপর আজ সকালে যখন সেই ভয়ংকর খবরটা এসে পৌঁছোল, সে দৃশ্যটাও আমি সামনে থেকে সহ্য করতে পারিনি। প্রায় দৌড়ে পালিয়ে এসেছিলাম বাইরে। গোটা ফ্যামিলিটার সবাই চিৎকার করে কাঁদছিল। বাচ্চা দুটোও ওদের পাপাকে দেয়ালে মাথা ঠুকতে দেখে বীভৎস, তীক্ষ্ণ শব্দ করছিল মুখ থেকে। রাস্তায় এসে একটা সিগারেট ধরাতেই গতকাল ভোরবেলায় ছবিগুলো আবার লাফিয়ে পড়ল আমার মাথার ভিতর। ঠিক ভোর হচ্ছিল তখন, মিহি ঠান্ডা হওয়া বইছিল, যখন আমার কাছে খবর এসেছিল আমি এক মৃত পুত্রের পিতা। কথাটা শোনার পর বেশ অনেকক্ষণ বধির হয়ে গেছিলাম আমি। কানের ভেতর যেন লক্ষ লক্ষ ঝিঝি পোকা ডাকতে শুরু করেছিল। আমি আমার মৃত ছেলের মুখ দেখতে চাইনি। তবু দেখতে হয়েছিল। নিয়ম। কোনোমতে একমুহূর্তের জন্য তাকিয়েই দুই চোখ অসম্ভব চিপে বন্ধ করে ফেলেছিলাম। আমার গোটা শরীরের সমস্ত শিরা-উপশিরাকে কে যেন উপড়ে ফেলছিল পটপট শব্দ করে। ... শ্রীময়ী কি দেখেছিল ওর মুখ? ... যদি দেখে থাকে ... কীভাবে দেখল জানা নেই। এই হাসপাতালটার সব মিলিয়ে খান চল্লিশেক বেড। আমি শ্রীময়ীকে কেবিনে ভরতি করেছিলাম। বেলা দশটা নাগাদ ভিজিটিং আওয়ার শুরু হতে আমি ওকে দেখার জন্য করিডোর দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে এক কোণে চারদিক সবুজ পর্দা দিয়ে ঢাকা আজ সকালে জন্মানো, মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকা সেই শিশুটাকে আচমকা এক ঝলক দেখতে পেলাম আমি। ছোট্ট, লোহার খাঁচার মতো বেডে চিৎ হয়ে শুয়ে। স্থির। ঘুমোচ্ছে? কতক্ষণ আয়ু কে জানে? শিশুদের কান্নায় হঠাৎ ভরে উঠছে হাসপাতালের ঘর-বারান্দা-হাওয়া। অসহ্য শব্দ! আমি শ্রীময়ীর কেবিনে পৌঁছে পর্দা সরিয়ে ভিতরে ঢুকলাম। ও একবার স্থির দৃষ্টিতে তাকাল আমার দিকে। তারপর চোখ বুজে ফেলল। এই একদিনেই ওর টলটলে ভরাট মুখটা কেমন শুকনো, কালো, অচেনা হয়ে উঠেছে। আমি কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে ফেল করা ছাত্রের মতো মাথা নীচু করে কেবিনের বাইরে বেরিয়ে এলাম। কী বলব ওকে? কে দায়ী আমাদের প্রথম সন্তানের মৃত্যুর জন্য, আমার জানা নেই। তবু কেন যেন ওর সামনে নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। অকারণ। গত আট-নয় মাসের দাম্পত্য জীবনটা মনে পড়ল আমার। শ্রীময়ীর শরীরের ভিতর আরও একটি প্রাণের খোঁজ পাওয়ার সেই চরম আনন্দের দিন থেকে শুরু করে একেক দিনের স্বপ্ন-পরিকল্পনা, রাতের পর রাত ওর পেটের ওপর সাবধানে কান রেখে নিজের সন্তানের জলজীবনকে অনুভব করা ... সব যেন দীর্ঘ সময় ধরে হতে থাকা একটি নাটকের ঠিক শেষ দৃশ্যের আগে আচমকা পর্দা পড়ে যাবার মতো শেষ হয়ে গেল। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে আমি বেখেয়ালেই অফিসঘরের সামনে এসে দাঁড়ালাম। কয়েকজন ডাক্তার, নার্স ও হাসপাতালের ম্যানেজার সবাই মিলে সেই বিহারি ছেলেটিকে খুব করে বোঝাচ্ছে ওদের বাচ্চাকে দ্রুত এখান থেকে শিফট করতে। আসলে ওরা কেউই চাইছে না, মৃত্যুটা এখানেই হোক। পরপর দু-দিন দুটি শিশুর মৃত্যুতে হাসপাতালের বদনাম হতে পারে। ভয় পাচ্ছে ওরা। ছেলেটার সঙ্গে একজন বয়স্ক লোকও রয়েছেন। লোকটা বলল, নহি নহি ডক্টরবাবু, আপ লোগ হি দেখিয়ে ... কিরপা কিজিয়ে... কাঁহা জায়ে হাম লোগ, আপ জো চাহে ... বলতে বলতে লোকটা বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে উঠল।আহা ব্যাপারখানা বুঝুন। আমাদের এখানে তেমন কোনও ব্যবস্থাও তো নেই। ছোটো হাসপাতাল, ... আরে অসীম তুমি একটু বোঝাও না ওদের। বলে একজন ডাক্তার কাতরভাবে তাকালেন ম্যানেজারের দিকে। ম্যানেজার বললেন, আইয়ে আপ লোগ, ইধর আইয়ে, ... দেখিয়ে বলতে বলতে দুজনকে অন্যদিকে নিয়ে গেলেন। কী বোঝাবে ওদের? ভাবতে ভাবতে হাসপাতাল ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। আমি একা। আমার বাবা-মা আত্মীয়স্বজন কেউ নেই। শ্রীময়ীর বাপের বাড়ি রামপুরহাট। বাবা মারা গেছেন অনেকদিন। মা থাকেন শ্রীময়ীর ছোটো বোনের বাড়িতে। পরশু সন্ধেবেলায় আমি শালিকে ফোন করে ওর দিদিকে ভরতি করার কথা জানিয়েছিলাম। তারপর আর ফোন করিনি। কী জানাব? জানি ওরা দুশ্চিন্তায় আছে। আমি মোবাইলও আর অন করিনি। ভালো লাগছে না ওটাকে ছুঁতে। ভয় হচ্ছে। বিকেলে সেবাসদনের মেইন গেটে পা রাখতেই আমার মনে হল ওই সেই ফ্যামিলিটা এতক্ষণে নিশ্চয়ই আর নেই। বাচ্চাটাও বোধহয় শেষ হয়ে গেছে। যাক। ওর যন্ত্রণা আমাকে আরও অস্থির করে তুলছিল। আমি মনেপ্রাণে চাইছিলাম একটা কিছু ঘটে যাক। কিন্তু নীচে অফিসঘরের সামনে পৌঁছাতেই আমি আবার সেই বয়স্কা দুজন মহিলাকে বসে থাকতে দেখলাম। এখন আরও কয়েকজন নতুন মুখও এসে জুটেছে ওদের সঙ্গে। তবে সেই লোকটাকে দেখলাম না। হেড নার্স অফিসঘর থেকে বেরোনোর সময় আমাকে দেখতে পেয়ে ইশারায় কাছে ডাকলেন। বললেন, দেখুন আমি আপনাদের সিচুয়েশনটা বুঝতে পারছি। কিন্তু আপনার স্ত্রী কিছু খাচ্ছেনও না, ওষুধ, ইনজেকশনও দেওয়া যাচ্ছে না। এভাবে তো উনি আরও অসুস্থ হয়ে পড়বেন। আপনি বরং ওঁকে আগামীকাল রিলিজ করিয়ে নিয়ে যান। বাড়ি ফিরলে যদি ওঁর ট্রমাটা একটু ঠিক হয়। আর বাড়িতে যতটা সম্ভব হয় বেশ কিছুদিন সবসময় ওঁর সঙ্গে সঙ্গে থাকবেন সবাই। পেশেন্ট একা যেন না থাকে। বুঝেছেন। আমি নি:শব্দে ঘাড় কাত করলাম। বললাম, ঠিক আছে। আপনি রিলিজটা করিয়ে রাখবেন।

সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে উঠতে আমার মনে হল শ্রীময়ী কি আজ কথা বলবে? এই আঘাত কতদিনে কাটিয়ে উঠবে কে জানে? এমনিতেই বড়ো সেনসেটিভ মেয়ে। ঈশ্বর বেছে বেছে তাদেরই আঘাত দেন যাদের দু:খবোধ বেশি। করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখতে পেলাম সেই এক কোণে সবুজ পর্দা ঢেকে আড়াল করা জায়গাটার ভিতর থেকে একজন নার্স বেরিয়ে এল। আমার মুখোমুখি হতেই আমি হঠাৎ জিজ্ঞেস করে ফেললাম, ওই বাচ্চাটার কী খবর?

আর বলবেন না, আচ্ছা লোক এরা। বারবার বলা হচ্ছে বেবিকে এখানে থেকে শিফট করুন। অন্য কোনও বড়ো নার্সিংহোমে নিয়ে যান। আমাদের এখানে জানেন তেমন কোনও ভালো ব্যবস্থা নেই-ই। তবু এরা কিছুতেই শুনবে না, কিছুতেই শুনবে না। খালি বলে আপ লোগো বাচাইয়ে, আরে বাবা, যা কন্ডিশন এই বেবি এমনিতেই ... গলগল করে অভিযোগগুলো বলতে বলতে একটু থামল নার্সটা। তারপর গলা নামিয়ে বলল, এখনও সারভাইভ করছে। জানি না আর কতক্ষণ ... কথাটা শুনে কেমন যেন গায়ে পাক দিয়ে উঠল আমার। কোনও উপায়ই কি নেই? আছে হয়তো। তবে আমাদের জানা নেই। সেসব ব্যবস্থাও নেই কিছু এখানে। ভগবান জানেন আর কতক্ষণ কষ্ট লেখা আছে বাচ্চাটার কপালে।

আমাদের কথার মাঝখানে একজন আয়া এসে দাঁড়ালেন। দিদি এই বেবিকে দুবার ডেক্সোল্যাক দিয়েছি। ব্রেস্টমিল্ক এখনও আসেনি মায়ের। নার্সটা একটু বিরক্তির সঙ্গে উত্তর দিল, আসবে কী করে, মায়েরও যা অবস্থা। এত আন্ডারওয়েট, ইস্যু নেওয়ার সাহস পায় এরা কী করে কে জানে বাবা! আলট্রাসোনোও তো একবারও করেনি মনে হয়। নইলে কি আর এই দশা হয়! গজগজ করতে করতে উনি চলে গেলেন। আমি কিছুক্ষণ একা এমনিই দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে ধীরে হেঁটে গিয়ে শ্রীময়ীর কেবিনের দরজা ঠেলে ঢুকলাম। একজন আয়া ওকে ওষুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করছিল। শ্রীময়ী দু-হাত দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছিল ওগুলো। আমি বললাম, প্লিজ ... শ্রী, এমন কোরো না। দয়া করে এবার শান্ত হও। ওষুধটা খাও ... প্লি ... জ। কথাগুলো বলতে বলতেই হঠাৎ আমার চোখ পড়ল শ্রীময়ীর বুকের দিকে। হালকা হলুদ রঙের নাইটি পরে ছিল ও। দুটো বুকেরই ঠিক মাঝখান গোল হয়ে ভিজে উঠেছে। ... ব্রেস্টমিল্ক এসে গেছে। দাঁত দিয়ে আমার নীচের ঠোঁটটাকে প্রচণ্ড কামড়ে ধরে আমি কিছু একটা আটকাতে চেষ্টা করলাম, আপ্রাণ।

জ্যান্ত গোটা শরীরটা ছিঁড়েখুঁড়ে খাওয়ার যন্ত্রণা নিয়ে আরেকটা অসহ্য রাত্রি কোনওমতে পার করে আমি সকাল আটটার মধ্যে সেবাসদনে চলে এলাম। শ্রীময়ীকে বাড়ি নিয়ে ফিরব। এই জায়গাটা আরও কয়েকদিন এলে আমি সত্যি সত্যি পাগল হয়ে যাব। আজ থেকে আর কিচ্ছু ভাবব না। কিচ্ছু না। শ্রীময়ী একটু সুস্থ হয়ে উঠলে ওকে নিয়ে একটু দিঘা ঘুরে আসব। অন্য কোথাও-ও যেতে পারি। নতুন কোথাও। অফিসঘরের সামনে সেই ফ্যামিলির লোকগুলো এখনও বসে। শুধু একজন বয়স্কা মহিলা নেই। এরা কি আজীবন এখানেই বসে থাকবে? কেন যাচ্ছে না? থাকুক বসে। আমি আর কিছু দেখব না। ভাবব না। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার মুখে সেই ছেলেটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। আর লোকটা আমাকে দেখে নড়েচড়ে উঠে দু-হাত জড়ো করে নমস্কার জানাল, চোখ দুটো কৃতজ্ঞতায় যেন টলটল করছে। এই দু-দিনে লোকটার সঙ্গে বা এদের ফ্যামিলির কারও সঙ্গে আমার একটা কথাও হয়নি। আজ হঠাৎ ...? আমি প্রত্যুত্তরে আলতোভাবে আমার হাত দুটো বুকের কাছে একবার তুলেই নামিয়ে নিয়ে দোতলায় উঠলাম। শ্রীময়ীর কেবিনের সামনে গিয়ে নেহাত অনিচ্ছাতেও একবারের জন্য করিডোরের প্রান্তে সেই বিশেষ কোণটার দিকে একমুহূর্ত তাকালাম। সবুজ পর্দাগুলো আর নেই। লোহার ছোট বেডটা শূন্য পড়ে আছে। লোকগুলো তা হলে এখনও ...? বিঁধে যাওয়া প্রশ্নটা নিজের শরীর খুঁটে তুলে ফেলতে ফেলতে কেবিনের পর্দা সরাতেই ভীষণভাবে চমকে উঠলাম আমি। এ কি ..., সেই শিশুটা এখন শ্রীময়ীর কোলে শুয়ে। গোটা শরীর মোটা সাদা কাপড়ে জড়ানো। শুধু মুখটুকু বার করা। শ্রীময়ী নাইটির বুকের বোতাম সবকটা খুলে দিয়ে একটা বুক সম্পূর্ণ বার করে বাচ্চাটাকে দুধ খাওয়াচ্ছে। আর নীচে দেখতে না পাওয়া সেই বয়স্কা মহিলা সামনে প্রায় হুমড়ি খেয়ে শিশুটার খাওয়া দেখছে, পি লে বেটা ... রাজা বেটা ... পি ... তু ঠিক হো গায়ে গা। ... পি ... আপন মনে বিড়বিড় করে যাচ্ছে প্রৌঢ়া। আমি কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকলাম দৃশ্যটার দিকে। ওই দুজনেরও কোনও হুঁশ নেই যেন। হঠাৎ সংবিৎ ফিরল আমার। সোজা ঘরের ভিতর ঢুকে বললাম — কী ব্যাপার?

আমার প্রশ্নে বয়স্কা একটু থতমত খেলেন। কিছু একটা বলতে গেলেন। আমি বেশ বিরক্তি নিয়ে বললাম, আপ থোড়া বাহার জাইয়ে গা।

হাঁ-হাঁ জরুর, বেটা। বেশ সংকোচ নিয়ে মাথা নীচু করে উনি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। আমি শ্রীময়ীর দিকে তাকিয়ে বললাম, এসব কী? চলো রেডি হও। বাড়ি ফিরবে।

না। দু-দিন পর আমার সঙ্গে প্রথম কথা বলল শ্রীময়ী।

মানেহ! কী পাগলামি করছ শ্রী! এবার একটু ...

দেখতে পাচ্ছ তো কী করছি।

হ্যাঁ দেখছি। কিন্তু তুমি কি জানো না ... একটু থেমে বললাম, শোনো এই বাচ্চাটা বাঁচবে না, ... শুনতে পাচ্ছ? ... এই বাচ্চাটা ...

আর আমি? আমি এত দুধ নিয়ে কী করব বলতে পারো? ... পারো বলতে? অস্বাভাবিক গলায় ককিয়ে উঠল শ্রীময়ী। শিশুটার ঠোঁট থেকে নিপলটা সরে যেতেই আমি দেখলাম সাদা রঙের দুধ ফিনকি দিয়ে গড়িয়ে পড়ল ওর ছোট্ট নাকে-মুখে-গালে। ক্ষীণ কেঁদে উঠল বাচ্চাটা। স্তনবৃন্ত আবার তার ঠোঁটে গুঁজে দিতে দিতে শ্রীময়ী বলল, তুমি যাও প্রায় পা ঘষে কোনওমতে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসতে আসতে আচমকা আমার মনে হল, শ্রীময়ীর সমস্ত দুধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কী বাচ্চাটা বাঁচবে তো?

সিনেমা এবং

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%