বিনোদ ঘোষাল
এখনই একটা ট্রেন গেল। লোকাল ট্রেন দুই ধাতুর প্রচণ্ড সংঘর্ষে ঝমঝম শব্দটা বড়ো বেশি তীব্র মনে হল তূণীরের। ফাঁকা ছিল ট্রেনটা। ওইজন্যই হয়তো শব্দটা বেশি মনে হচ্ছিল। তূণীর উঠতে গিয়েও বসে রইল। আর-একটু সময় যাক। অবশ্য কী-ই বা লাভ সময় নিয়ে। সিদ্ধান্ত যা নেবার তা তো নেওয়া হয়েই গিয়েছে। আকাশে দ্বাদশীর চাঁদের আলো রেললাইনে পড়ে চিকচিক করছে। দুটো লাইন কতকাল পাশাপাশি নি:সঙ্গ, কতদূর চলে গিয়েছে। বেশ খানিকটা দূরে প্ল্যাটফর্মের আলো দেখা যাচ্ছে। এখানে গুমোট অন্ধকার। চারিদিকে ঝোপজঙ্গল, লোকজনের আসা- যাওয়া প্রায় নেই-ই। মশা আছে আর সঙ্গে কোনও একটা কিছু পচে ওঠা দুর্গন্ধ। লাইন থেকে কয়েক ফুট দূরে একটা মোটা জামগাছের কাটা গুঁড়ির উপর বসেছিল তূণীর। মাথার ভিতর কেমন অদ্ভুত ঝিঁ-ঝিঁ শব্দ হয়ে চলেছে একটানা। কিছু একটা ভাবতে চাইছে ও। কিন্তু কোনও ভাবনা মাথায় আসছে না। একনম্বর লাইন দিয়ে থ্রু ট্রেনে যাবে। যাত্রীসাধারণকে অনুরোধ লাইনের ধার থেকে সরে দাঁড়াবেন। একনম্বর লাইনসে ... বাংলা-হিন্দি-ইংরেজিতে মানুষকে সাবধান করল মাইক। নাহ আর নয়! নিজের মাথাটা দু-হাতে সজোরে চেপে ধরে বারকয়েক ঝাঁকিয়ে উঠে দাঁড়াল তূণীর, লাইনের সামনে এল। মাথার ঝিঁ-ঝিঁ শব্দটা অসহ্যভাবে বেড়ে উঠেছে। মনে হচ্ছে গোটা পৃথিবী জুড়ে একটাই শব্দ। লাইনের একেবারে সামনে এল। অনেক দূর থেকে ট্রেনের আলোটা দেখা যাচ্ছে। দ্রুত এগিয়ে আসছে কাছে।
তূণীর আবার কিছু একটা ভাবতে চাইল। কিছু মনে এল না। শুধু কান ফাটানো ঝিঁ-ঝিঁ শব্দটা। ট্রেন অনেক কাছে। ... আরও চোখ ঝলসে দেওয়া তীব্র আলো, হুইসেল। দু-লাইনের মাঝে পা বাড়াতে যাবার মুহূর্তে বুঝতে পারল কে যেন পিছন থেকে ওর কাঁধটা খামছে ধরেছে। শিউরে উঠে তাকাল তূণীর। একজন লোক। মানুষের মুখ দেখতেই ঝিঁ-ঝিঁ শব্দটা কমতে থাকল। কমে আসতে লাগল একটু একটু করে। ট্রেনটা চলে যাক, তারপর লাইন ক্রস কোরো, ভদ্রলোক বললেন। তূণীর আচ্ছন্নের মতো মাথা নাড়ল। প্রচণ্ড শব্দ করতে-করতে পাশ দিয়ে চলে যেতে থাকল মেল ট্রেনটা। কাঁধে হাতটা না পড়লে এই ট্রেনটাই ... বুকের ভিতরটায় ঝড়ের মতো দাপাদাপি হচ্ছিল তূণীরের। হাঁ করে হাঁপাচ্ছিল সে। মুঠোয় নিয়ে আসা শেষ মুহূর্তটাকে আবার শরীরকে ফেরত দিতে গিয়ে আনত হাঁটু ভেঙে যাচ্ছিল ওর। তোমাকে খুব টায়ার্ড লাগছে। ঘেমে স্নান করে গিয়েছ, দু-মিনিট বোসো না। আমিও লাইন পার হব। ভালোই হয়েছে তোমাকে সঙ্গে পেয়ে। ঠিকমতো চোখে দেখি না। অন্ধকারে। বসবে দুটো মিনিট?
তূণীর আবার সেই গাছের গুঁড়িটার ওপর ধপ করে বসে পড়ল। ওঠা-নামা করতে থাকল বুক। ভদ্রলোক ওর পাশে বসলেন। দুজনে বেশ কিছুক্ষণ চুপ। তূণীর একটু সুস্থ হয়ে উঠতে লোকটার দিকে তাকাল। আবছা আলোতে দেখল বয়স ষাটের আশপাশে। সাদা ধুতি আর পাঞ্জাবি। কাঁচা পাকা পাতলা চুল। চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা। চেহারায় বেশ ব্যক্তিত্বের ছাপ। লোকটাকে চেনার চেষ্টা করল। পিঠের ওপর আলতো হাত রাখলেন ভদ্রলোক, তুমি তো ওপারেই যাবে, তাই না?
উত্তর দিল না তূণীর।
কী, তাই তো?
হুঁ, এর চেয়ে সংক্ষেপ মিথ্যে জানা ছিল না তূণীরের। কিন্তু আচ্ছা জ্বালাতন তো! এ আবার কোত্থেকে জুড়ে বসল।
ওঠা যাক, বলে উঠতে যাচ্ছিল তূণীর।
আরে বোসো না একটু। আমি তো তোমার সঙ্গেই যাব। অনেকটা হেঁটে এসেছি তো, হাঁপিয়ে গিয়েছি। বয়স হয়ে গিয়েছে যে। তোমার কি খুব তাড়া?
না-না, মানে তেমন কিছু ... ইয়ে একটু ছিল। আপনি কোথায় যাবেন?
আমিও লাইন পেরিয়ে ওপারে যাব, তোমার মতো।
এমন অন্ধকার দিয়ে পার হতে পারবেন?
হুঁ। তুমি আছ তো সঙ্গে!
যদি না থাকতাম?
তা হলে একাই পার হতাম অবশ্য, বলে হাসলেন ভদ্রলোক; শান্ত হাসি, তোমার নামটা জানতে পারি?
তূণীর ব্যানার্জি।
বাহ, সুন্দর নাম তো! কটা তির রেখেছ এখন? আমার নাম শিবতোষ। শিবতোষ স্যান্যাল। তোমার বাড়ি কি লাইনের ওপারে?
হ্যাঁ, ওদিকে।
অ। বেশ বেশ। তো কী কর তুমি?
গলায় এমন অদ্ভুত আন্তরিকতা, উত্তর না দিয়ে পারছিল না তূণীর। বলল, এ বছর এইচএস দেব।
দেবে? তা-লে পরীক্ষা তো খুব কাছেই।
হুঁ।
কী সাবজেক্ট?
সামান্য ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল, কমার্স।
বাহ খুব ভালো।
না ভালো নয়, সোজা কথাটা ছুঁড়ল তূণীর।
তোমার ভাল্লাগে না? তা হলে পড়ছ কেন?
চুপ করে থাকল তূণীর। চোয়াল শক্ত হচ্ছে।
কেউ বলেছে বুঝি পড়তে?
হুঁ।
কিন্তু ভালো না লাগলে তো তা নিয়ে পড়াশোনা করা মুশকিল। এইচ-এস পাশ করে কী করবে ঠিক কিছু করেছ?
নাহ।
সে কী! কেন?
তূণীর বিড়বিড় করে বলল, আমার আর কোনও কিছুর ইচ্ছে নেই।
কী বললে? ঠিক বুঝলাম না।
তূণীর তাকাল লোকটার দিকে। অচেনা একজনকে হঠাৎ কেনই বা বলতে যাবে ওর সব কথা।
কী, বলবে না? আচ্ছা থাক, যদি না চাও!
সত্যিই তো আর কোন কিছুরই কোনও ভ্যালু নেই তূণীরের কাছে। আর তো হাতে গোনা খানিকটা সময়! না হয় একজন অপরিচিতকেই জানিয়ে গেল তার আজীবনের না বলা জমে ওঠা কথা।
আমি আসলে এনএসডিতে পড়তে চেয়েছিলাম।
এন-এস-ডি? সেটা কী গো?
ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা, দিল্লিতে।
বাহ, দারুণ ব্যাপার তো, তুমি কি অভিনয় করতে ভালোবাস?
খুব।
নাটক কর রেগুলার?
নাহ, করতে পারি না।
কেন? পড়াশোনার চাপে?
না বাবা করতে দেয় না। আমাকে কোনোদিনই কিছু করতে দেয় না বাবা। আমি ছোটো থেকে যা চেয়েছি ঠিক তার উলটোটাই হয়ে এসেছে!
কেন, তোমাকে আর পড়াতে চান না তিনি?
ম্যানেজমেন্ট পড়াতে চান।
হ্যাঁ, সেটাও আজকের দিনে খুব ভালো সাবজেক্ট। আমি নিজেই আমার ছেলেকে বিজনেস ম্যানেজমেন্ট পড়িয়েছি। অবশ্য ছেলে পড়তে চেয়েছিল বলেই পড়িয়েছিলাম। তবে সবার জন্য তো সব বিষয় নয়।
সেটা আমার বাবা কোনোদিন বোঝেনি। শ্লেষ্মার মতো থকথকে রাগটা গলা দিয়ে ঘড়ঘড়ে শব্দে বেরিয়ে এল তূণীরের। কাল এনএসডিতে ফর্ম ফিলাপের লাস্ট ডেট।
করেছো?
নাহ, কী হবে ফালতু করে। আমার তো আর অত টাকা নেই যে, ওখানে থেকে পড়ব!
বাবা দেবে না?
নাহ।
বলেছ কখনও?
হুঁ। সারাজীবন শুধু নিজের ইচ্ছেটাই চাপিয়ে গেল আমার ঘাড়ে। আমিও যে একটা মানুষ ... থেমে গেল তূণীর। কাপালের রগ দপদপ করছে।
এক কাজ করতে পার। মাকে দিয়ে যদি ...
কিস্যু লাভ নেই। আমার বাড়িতে মায়েরও কোনো বক্তব্য নেই। ওই লোকটার কথাই শেষ কথা! দু-বেলা খেতে পরতে দেয় যে।
না-না ওভাবে ভাববার দরকার নেই। আর-একবার বরং বোঝানোর চেষ্টা করো না! আসলে তোমার বাবা ভয় পাচ্ছেন। এই লাইনটার ব্যাপারে অতটা পরিচিত হয়তো নন তিনি। তবে আজকাল তো অভিনয় মানে শুধু পাড়ার ক্লাবে নাটক করা নয়। যথেষ্ট ফিউচার। আসলে উনি তোমার কেরিয়ারের কথা ভেবেই ...
বুঝবে না, কিছুতেই বুঝবে না। কোনোদিন বোঝেনি ... আর সহ্য হয় না ...
দাঁতে দাঁত চিপল তূণীর।
মাথা ঠান্ডা রাখো। কী করেন তোমার বাবা?
সফটওয়্যার কোম্পানির সেলস ম্যানেজার।
মানে ওয়েল এস্ট্যাবলিশড, একটু থেমে ভদ্রলোক বললেন, তুমি গল্পের বই-টই পড়?
পড়তাম। এখন আর ভাল্লাগে না কিছু।
খালিল জিব্রানের একটা বই আছে দ্য প্রফেট, নাম শুনেছ?
তূণীর মাথা নাড়ল।
বিশ্ববিখ্যাত বই। পারলে পড়ে ফ্যালো। খুব সুন্দর লাগবে। ফিলজফির বইও যে এত লিরিক্যাল হতে পারে... শুনবে দু-লাইন?
এখন? বলেই চুপ করল তূণীর। তারপর অলসভাবে বলল, আচ্ছা বলুন।
জানি তোমার এখন শোনার মুড হয়তো নেই। কিন্তু আমার যে শোনাতে খুব ইচ্ছে করছে।
না-না, আপনি বলুন না।
দেখি, আবার মনে আছে কিনা। কতকাল আগে পড়েছি, বলে বলতে শুরু করলেন,
‘‘Your children are not your children
They are the sons and daughters of life longing for itself.
They come through you but not from you
And through you but not from you
And though they are with you yet they belong not to you.
You may give your love but not your thoughts.
For they have their own thoughts.
You may house their bodies but not their souls.
For their souls dwell in the house of tomorrow
Which you can not visit, not even in your dreams —
You may strive to be like them, but seek not to make them like you,
For life goes not backward nor tarries with yesterday’’
কিছুক্ষণ চুপ থেকে ভদ্রলোক হেসে বললেন, নাহ, আর মনে পড়ছে না।
তূণীর হাঁ করে শুনছিল কবিতাটা। এত সুন্দর কথাগুলো। এত সহজভাবে সত্যি! বাবা যদি একবার শুনত।
কেমন লাগল বলো? অবশ্য তোমার বদলে তোমার বাবা শুনলে বোধহয় বেশি ভালো হত। সব বাবা-মায়েদের জন্যই এই কবিতাটা। বইটা কিনে বাবাকে পড়িও।
আমার বাবা বিজনেস ম্যাগ ছাড়া আর কিছু পড়েন না। বাকি সবকিছু তাঁর কাছে সময় নষ্ট, বলল তূণীর।
যাক গে! কী আর করা যাবে না পড়লে। এক একজনের সময়ের মূল্য এক-এক রকম। আচ্ছা, তোমাকে একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে পারি?
প্রৌড়ের মুখের দিকে তাকাল তূণীর, করুন?
হৃদয়ঘটিত প্রশ্ন বলে মিটিমিটি হাসলেন উনি।
করে ফেলুন।
কোনো মেয়েকে ভালোবাস নাকি?
নাহ, একেবারে সংক্ষেপে উত্তর দিল তূণীর।
সে কী! এমন হ্যান্ডসাম ছেলে, তার গার্লফ্রেন্ড নেই! ভেরি ব্যাড। নাকি আমি বুড়ো দাদু বলে বলতে লজ্জা! আমরা তো বন্ধু। বলে ফ্যালো!
না না লজ্জার কী আছে। ছিল একজন এককালে ...
এককালে?
হুঁ।
বেশ তাই-ই শুনি। কী নাম ছিল তার?
নাম? বিরক্তি নিয়ে তাকাল তূণীর।
না বলতে চাইলে থাক।
প্রৌঢ় মানুষটার দিকে একঝলক তাকিয়ে নিয়ে তূণীর বলল, মহুয়া।
কোথায় আলাপ?
ইংলিশ কোচিংয়ে।
তারপর কী হল?
কী আবার হবে! বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আরও ভালো অফার পেয়ে গেল। শমীক তালুকদার। বাপের ঢালাও পয়সা। গাড়ি-বাড়ি ... মুখ নীচু করে দাঁতের ফাঁক দিয়ে থুতু ফেলল তূণীর। মুখের ভিতরটা তেতো লাগছে।
ভালো অফার! এ কি চাকরি নাকি?
ওইরকমই কিছু ভাবতে পারেন।
কিছু মনে কোরো না। তোমরা, মানে এই ইয়ং জেনারেশন ভালোবাসা শব্দটাকে ঠিক বুঝতে পারছ না। এটা জয় করার নয়। বেটার অপরচুনিটির ব্যাপার নেই। বরং যে কাছে এসেছে, তাকেই নিজের মতো করে সাজিয়ে তোলা। আমার যখন তোমার মতো বয়স, তখন বাবা আমাকে একটা কথা বলেছিলেন যে ভালোবাসা ঠিক পাওয়া নয়, চাওয়া। এই চাওয়াটা যত তীব্র, ততই তুমি গভীর প্রেমিক। বলেই আবার চোখ মিটমিট করে বললেন, কথাগুলো আমাকে কেন বলেছিল জানো? আমারও তোমারই অবস্থা হয়েছিল সেই সময়, প্রেমের পরীক্ষায় ফেল!
তূণীর দেখছিল ভদ্রলোককে। পাওয়া নয়, চাওয়াটাই আসল! এমন অদ্ভুত কথা আগে শোনেনি তো! কী আরাম লাগছে শরীরে। মহুয়াকে তো আজও ভুলতে পারেনি ও। এক মুহূর্তের জন্যও। এই ভুলতে চেয়েও না ভুলতে পারাটাই কি তবে প্রেম?
শের-শায়রি পড়?
পড়েছি একসময় টুকটাক।
খর্জকে খত দিয়ে জিন্দগী কে দিন, অ্যায় দোস্ত উয়ো তেরি ইয়াদ মে হো ইয়া তুঝে ভুলানে মেঁ ... গালিবের লেখা! হে বন্ধু, বলতে গেলে আমার গোটা জীবনটাই তোমাকে কাছে চেয়ে কিংবা তোমাকে ভুলতে চেয়ে কেটে গেল। ভাবো তো, প্রেম কী!
দুজনেই কিছুক্ষণ একদম চুপচাপ।
আপনি কি এদিকেই কাছাকাছি থাকেন?
আমাকে দেখেছ আগে কখনও?
ঠিক মনে পড়ছে না।
আমি ঠিক তোমাদের এখানকার নয়। আমার বাড়ি তোমাদের পরের স্টেশনে। আসলে ক-দিন ধরে বিকেলের দিকে ট্রেনে চেপে চলে আসছি। তোমাদের রেল স্টেশনটা খুব ভালো। পশ্চিমদিকটা পুরো ফাঁকা বলে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখি। এত সুন্দর লাগে। মাঠের ওপারে সূর্যর চলে যাওয়া ...,
চুপ করলেন উনি। তারপর খুব শান্তভাবে তূণীরের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি একসময় একটা সরকারি ব্যাঙ্কের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার ছিলাম। রোজগার যে ভালোই ছিল, বুঝতেই পারছ। আমার একমাত্র ছেলে সঞ্জয়। ছোট্ট থেকে ও যা-যা চেয়েছে, দিয়েছি। পড়াশোনায় দারুন শার্প। অনেক ডিগ্রি পেয়ে কানাডায় চলে গেল। অবশ্য যাবার কথাই ছিল। এত ভালো কেরিয়ার, কত সুযোগ ওখানে! তোমার চেয়ে বয়স বেশ খানিকটা বেশি। কিন্তু গড়নটা তোমার মতোই, বলে তূণীরের মাথায় আলতো হাত রেখেই সরিয়ে নিলেন। আবছা অন্ধকারেও ওর চোখটাকে দেখার চেষ্টা করছিল তূণীর।
ওখানেই থাকে?
হ্যাঁ-হ্যাঁ, কী-ই বা করবে এখানে এসে, লোডশোডিং, মশা, নোংরা রাজনীতি পলিউশন, ট্রাফিক জ্যাম। ওখানে মেমসাহেব বিয়ে করেছে। গত বছর একটা মেয়ে হয়েছে। এক্কেবারে পুতুলের মতো আমার নাতনি। পোস্টে একটা ফোটো পাঠিয়েছিল।
ওরা একেবারেই কি আসে না?
সময় পায় না। কোনো কিছুর সময় পায় না ওরা। খুব ব্যস্ত, আবার কয়েক মুহূর্তে চুপ। আসলে এসব কথা আমি কখনও কাউকে বলি না, বুঝলে তো! এই তোমাকেই ... মানে ... গলা ঝাড়লেন প্রৌঢ় তোমাকে বোর করছি না তো?
এমা না না, চমকে উঠল তূণীর, এখানে তা-লে আপনারা ... মানে ...
আমার স্ত্রী বছরচারেক আগেই আমাকে চিরতরে ছেড়ে দিয়ে হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছেন। আমি শুধু আমার সঙ্গেই থাকি।
ছেলের কাছে চলে যাননি কেন? উদ্বেগে গলা চড়ে গেল তূণীরের।
চাইলেই কি আর সব জায়গায় যাওয়া যায়? একে তো ষাট পার করে ফেলেছি। তার ওপর বুকের ব্যামো, ভিসাই জুটবে না।
ট্রাই করেছিলেন?
নাহ, সেটা অবশ্য করা হয়নি।
তা হলে আগে থেকেই ...
হ্যাঁ, দোষ তুমি আমাকে দিতেই পার। হয়তো অতটা ইচ্ছে আমার ... কিংবা ঠিক এমনটা চাইনি ... জানি না ..., শেষের কথাগুলো যেন নিজের সঙ্গেই বিড়বিড় করে বললেন।
সঞ্জয়ের ওপর বেশ রাগ হল তূণীরের, কিছু মনে করবেন না। আপনার ছেলেরও কিন্তু উচিত হয়নি আপনাকে এভাবে এখানে একা ...
না ... না, ওর দোষ নেই। কষ্ট করে পড়াশোনা করেছে এত! বড়ো হয়েছে। নিজের কেরিয়ার গড়বে না?
তা বলে ... থেমে গেল তূণীর। মাথার ভিতর সব যেন জট পাকিয়ে যাচ্ছে।
আপনি ... মানে পুরোপুরি একা এখন!
পুরোপুরি না। একজন কাজের লোক। একটা বাড়ি। খানিকটা ব্যাঙ্ক-ব্যালান্স। আর কিছু সহৃদয় প্রতিবেশী... অনেকেই আছে, এবারের হাসিটা একটু দোমড়ানো শোনাল।
কোথায় যাবেন এখন? বাড়িতে?
না-হ।
তা হলে?
তুমি যেখানে যাবে, আমারও সেখানেই যাওয়ার ইচ্ছে!
মানে? তড়াক করে উঠে দাঁড়াল তূণীর।
আমি ... আমি কোথায় যাব? আপনি কী করে ...
ভদ্রলোক খুব শান্তভাবে বললেন, একটা ট্রেনের আলো দেখা যাচ্ছে।
আপনি ... আপনি কেন? আপনি ... না ... না, কিছুতেই না ... যান ফিরে যান।
তোমারই বা কী বয়স বলো? কতটুকু দেখেছ জীবনটাকে? তুমি যদি এখনই ডিসিশন নিয়ে ফেলতে পারে, আর আমি বুড়োহাবড়া ... সাতকুলে কেউ নেই ... আমার অসুবিধেটা কোথায়?
কিন্তু?
আর দেরি করে লাভ নেই। ট্রেনটা অনেকটা চলে এসেছে। তুমি আজকের দিনটা আমার জন্য ছেড়ে দাও। যাও ফিরে যাও। বাড়ি গিয়ে ভাবো আর একবার!
অনেকক্ষণ ধরে ঝিমিয়ে থাকা রাগটা আবার ধড়মড় করে জেগে উঠল তূণীরের, নাহ, আমারও ভাবার আর কিছু নেই।
বেশ তালে চলো। ট্রেনটা একেবারে কাছে চলে এসেছে।
পরস্পর প্রায় অপরিচিত অসমবয়স্ক দুজন সাপের মতো হিলহিলে দুটো লাইনের মাঝখান দিয়ে অন্ধকারে হাঁটতে শুরু করল নি:শব্দে। ট্রেন ছুটে আসছে মুখোমুখি। কাছে ... আরও কাছে ... কান ফাটানো শব্দ করতে করতে লাইনের উপর দিয়ে অনেক দূরে চলে গেল ট্রেনটা।
আর লাইনের থেকে কয়েক ফুট দূরে দুটো মানুষ পরস্পরের হাত ধরে দাঁড়িয়েছিল স্থির হয়ে।
আমার হাত ধরে টেনে সরিয়ে আনলে কেন? জিজ্ঞেস করল শিবতোষ।
আমি টানলাম! আপনিই তো আমাকে টেনে সরিয়ে দিলেন ... ক্লান্ত অভিযোগ তূণীরের গলায়।
আমি! ... কিন্তু ... যাকগে, ছাড়ো টানাটানির কথা। বেঁচেই যখন গিয়েছি, কথা বলতে-বলতেই থেমে গেল শিবতোষ। সঞ্জয়ের একটু অল্প বয়সের হাতের তালু কি এই ছেলেটির মতোই উষ্ণ আর মসৃণ ছিল? নরম বড়ো বেশি। আর তূণীরের মনে পড়েছিল ছোটোবেলায় কোনো ভিড়ের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় ও যাতে হারিয়ে না যায়, সেজন্য বাবা ঠিক এমন করেই শক্ত করে ধরে থাকত তূণীরের হাত।
উনিশ কুড়ি
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন