বিনোদ ঘোষাল
বাচ্চাকে দেখে যান, একজন নার্স সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে নামতে বলল,
সিগারেট ধরা হাতটা সঙ্গে সঙ্গে কেঁপে উঠল অনুপমের।
সদ্য জ্বালানো সিগারেটটা ফেলে দিতে গিয়েও মনে পড়ল সবে মাত্র একটা টান দেওয়া হয়েছে। পাঁচিলে আগুনটা ঘসে নিভিয়ে আধপোড়া সিগারেটটা পকেটে ঢুকিয়ে তিন লাফে নার্সিংহোমের ফার্স্ট ফ্লোরে উঠল। করিডরে একটা খাঁচার মতো ছোট্ট লোহার বেডে পালক ছাড়ানো মুরগি রঙের ফুট খানেক লম্বা একটা প্রাণী শুয়ে। প্রাণীটির নাভির থেকে সাদা প্যাঁচানো প্যাঁচানো একটা আট-নয় ইঞ্চি লম্বা নল বেরিয়ে রয়েছে, যার মুখটা ক্লিপ দিয়ে আঁটা। অনুপম বুঝল ওটাই নাড়ি। চোখ পড়ল বাচ্চাটার লিঙ্গের দিকে। পুংলিঙ্গ। সে আনন্দটুকুর সময় পেল না ও। কয়েকজন ডাক্তার মিলে গম্ভীর মুখে বাচ্চাটাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। শিশুটার মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। ডাক্তারগুলোর পরনে সবুজ গাউন। মুখের মাস্কও খোলেনি কেউ। অনুপম আন্দাজ করল, কিছু একটা গড়বড় হয়েছে নিশ্চই। বুক কেঁপে উঠল ওর।
— কী হয়েছে?
— এদিকে আসুন, বছর ষাট বয়সের চাইল্ড স্পেশালিস্ট ডা: দাশ অনুপমকে অন্য দিকে ডেকে নিয়ে গেলেন। বললেন, দেখুন ব্যাপার হচ্ছে আপনার বেবি থারটি সিক্স উইকসে হয়েছে, মানে প্রায় বর্ডার লাইনে। কিছুটা প্রিম্যাচিওরড। ব্রিদিং ট্রাবল হচ্ছে। কাঁদতে পারছে না। ডিস্ট্রেসড। আমরা বেবিকে আরও কিছুক্ষণ অক্সিজেন চালিয়ে দেখব, যদি নরমাল স্টেট এ এসে যায় তো ভালো, আদারওয়াইজ ইম্প্রুভ না করলে ওকে কলকাতার কোনও ওয়েল ইক্যুইপড নার্সিংহোমে ট্রান্সফার করতে হবে। বলে ডাক্তার একটু চুপ থেকে বললেন, নার্ভাস হবেন না। ক্রিটিকাল কোনও কেস নয়, সিজারিয়ান বেবিদের অনেক সময় এমনটা হয়ে থাকে।
— অনেকের মধ্যে আমিই কেন? এই তো গতকাল আমার বন্ধু বিশ্বজিতের ওয়াইফের এই নার্সিংহোমেই সিজার হয়ে ছেলে হয়েছে, কই ওর তো কোনও প্রবলেম হয়নি! বিশ্বজিতের তো অনেক টাকাও আছে তবু কিছু হল না, সব ঝামেলা কেন বার বার আমার সঙ্গেই ... চিৎকার করে কথাগুলো বলতে গিয়ে অনুপম বুঝল ওর গলা দিয়ে শুধু ঘড় ঘড় শব্দ বের হচ্ছে। — আমার স্ত্রী কেমন আছেন?
— শি ইজ কোয়াইট ও. কে। লেট আস ওয়েট ফর দ্য বেবি, বলে ডা: দাশ চলে গেলেন। উত্তরপাড়ায় এই নার্সিংহোমটা ওনারই। ছোটো নার্সিংহোম। মেটারনিটি কেসই বেশি। তার থেকেও বেশি হয় অ্যাবরশন। বাইরে গ্লোসাইনে লেখা আছে, নো এমারজেন্সি। অনুপম ধীরে ধীরে হেঁটে এসে সিঁড়ির রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকল চুপচাপ। অক্সিজেন মাস্কে মুখ ঢেকে থাকা, নিজের সদ্য জন্মানো শিশুর দিকে তাকিয়ে এই মুহূর্তের অনুভূতিটা বুঝতে চেষ্টা করল। সম্পূর্ণ নতুন একজনের জন্য একেবারে নতুন একটা অনুভূতি? ... পিতৃত্ব? ... না ... হ বোধহয়। অনুপমের স্ত্রী সুলগ্নার সিজার করেছেন যে লেডি ডাক্তার, তিনি বাচ্চাটার পা দুটো আলতো করে তুলে ছেড়ে দিলেন। পা দুটো একটু গুটিয়ে নিল গোলাপি রঙের এইটুকু শরীরটা।
— মঞ্জু তুমি এখানটায় বসে মাস্কটা ধরে থাক। বলে ডাক্তাররা সব চলে গেলেন পরের ডেলিভারির প্রস্তুতি নিতে। মঞ্জু নামের সবুজ পাড় সাদা শাড়ি পরা মেয়েটা অনুপমের ছেলের মুখে অক্সিজেন মাস্ক ধরে বসে রইল। অভিব্যক্তিহীন মুখ। অনুপম মনে মনে হিসাব করছিল, ওর সঙ্গে এখন ক্যাশ কুড়ি হাজার রয়েছে। কলকাতায় যদি শিফট করতেই হয় তাহলে মোটামুটি কত খরচ হতে পারে? ... ইস ... স ... সুলগ্নার কাছ থেকে কিছু ক্যাশ নিয়ে রেখে দিলে হত। এখন কোত্থেকে জোগাড় হবে? অফিসে ফোন করে যদি কিছু ক্যাশলোন পাওয়া যায়। দেখা যাক।
— আপনি নীচে গিয়ে বসুন দাদা, ডাক্তারবাবু ডেকে নেবেন, মঞ্জু বলল।
অনুপম কোনও উত্তর দিল না। নীচে নেমে এল আবার। রিসেপশনে শ্বশুরমশাই থম মেরে বসে আছেন। হাই প্রেশারের রুগি। টেনশনমুক্ত থাকার জন্য দুবেলা প্রাণায়াম করেন। এখন চোখ বুজে দেয়ালে ঠেস দিয়ে বেঞ্চে বসে আছেন। আজ সকাল সাতটার সময় সুলগ্নাকে ভরতি করার সময় অনুপমের সঙ্গে উনি এসেছিলেন। শাশুড়ি বাড়িতে গত দুই দিন ধরে বিছানায়। অনুপমের বাবা-মা কেউ-ই ওর সঙ্গে উত্তরপাড়ায় ফ্ল্যাটে থাকেন না। দেশের বাড়িতে, তারকেশ্বরে।
— বাবা আপনি চিন্তা করবেন না, সে রকম ভয়ের কিছু নেই, অনুপম বলল।
— আ ... র আমার মেয়েটার কপালটাই ... পর্যন্ত বলে থেমে গেলেন উনি। অনুপমের মতো প্রাইভেট ফার্মের ছাপোষা অফিস স্টাফের প্রেমে খাবি খেয়ে, তার বরাবর ঝকঝকে রেজাল্টঅলা সুন্দরী মেয়ে বাপ-মার অনিচ্ছায় বিয়ে করেছে, সেই শোকটাই বোধহয় চার বছর পর আবার উথলে উঠল ভদ্রলোকের।
যদি কলকাতায় শিফট করতেই হয়, তাহলে কীভাবে কী অ্যারেঞ্জ করবে ভেবে পাচ্ছিল না অনুপম। সঙ্গে কেউ নেই এখন। আসলে এমনটা ঘটতে পারে আন্দাজ থাকলে বন্ধুবান্ধব দু-চার জনকে বলে রাখতে পারত আগে থেকে। কিন্তু এখন তো সব অফিস চলে গেছে। প্রায় দুপুর দুটো, কাকে ডাকবে? কেই বা আসবে? কখনই বা পৌঁছাবে? ভাবতে ভাবতে আবার নার্সিংহোমের বাইরে এসে পকেট থেকে পোড়া ভাঁজ খাওয়া সিগারেটটা বার করে ধরাল। দু-টান দিয়েই ফেলে দিল। সকাল থেকে কিচ্ছু খাওয়া হয়নি। তার ওপর এই টেনশনে গা গুলোচ্ছে। ধু ... সস ... ভাল্লাগে মাইরি! কোথায় ভেবেছিল আজ বাবা হয়ে যাবার পর রাত্রে চুটিয়ে মাল খেয়ে লাট হয়ে থাকবে। একটা ম্মার্নঅফের পাঁইট গতকাল রাত্রেই কিনে সুলগ্নাকে লুকিয়ে ফ্রিজের পিছনে লুকিয়ে রেখে দিয়েছিল। সব প্রাোগ্রাম ভোগে। অনুপম আবার দোতলায় উঠল।
— আপনাকে ডাক্তারবাবু খুঁজছেন, কোথায় গেছিলেন?
— এই তো সামনেই ... কোথায় ডাক্তারবাবু?
— ওই যে সোজা ঘরটায় চলে যান।
অনুপম ঘরটার দিকে যাবার সময় এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে বাচ্চাটার দিকে তাকাল। মঞ্জুকে জিজ্ঞেস করল, একটু ঠিক হয়েছে?
— নাহ, একইরকম।
ডা: দাশ নিজের চেম্বারে বসে কী সব লিখছিলেন। অনুপমকে দেখে বললেন, হ্যাঁ বসুন।
বসল অনুপম। ভিতরটা খুব ছটফট করছে।
— দেখুন আমরা তো প্রায় এক ঘণ্টার মতো এখানে দেখলাম, বাট বেবির কোনও ইম্প্রুভমেন্ট নেই। আপনি ইমিডিয়েট কলকাতার কোনো ওয়েলইক্যুইপড নার্সিংহোমে শিফট করুন। আমরা অ্যাম্বুলেন্স বলে দিয়েছি। চলে আসবে।
— কোথায় নিয়ে যেতে সাজেস্ট করেন আপনি? গলা খাঁকরে জিজ্ঞেস করল অনুপম।
— বেহালায় যে স্মাইল নার্সিংহোম আছে, ওখানকার পেডিকারডিওলজিস্ট ডা. সোম আমার বিশেষ বন্ধু। ভালো ডাক্তার। আর ওখানে ব্যবস্থাও খুব ভালো। তবে বুঝতেই পারছেন, বেশ এক্সপেন্সিভ। এবার আপনি যদি পারমিট করেন তো আমার মনে হয়...
— আপনি প্লিজ সোমের সঙ্গে কথা বলুন, আমি ওখানেই নিয়ে যাচ্ছি। কিছু না ভেবেই অনুপম বলে দিল।
— ওক্কে ... এ, আচ্ছা আপনার সঙ্গে যাওয়ার মতন আর কে আছেন?
— কেউই তো নেই। মানে শ্বশুরমশাই আছেন। বয়স্ক, প্রেশারের রুগী।
— না, না, কোনও মহিলা নেই? বেবিকে ধরবে কে?
— নাহ ... আপনার এখানে কাউকে পাব? নার্স বা আয়া? অসহায়বোধ করল অনুপম।
— হুম ... ম, বুঝেছি, ঠিক আছে দেখছি কী করা যায়।
অনুপম উঠে দাঁড়াল। অফিসে একবার ফোন করা দরকার। ম্যানেজার গোয়েঙ্কাজিকে বলে যদি অন্তত হাজার পঞ্চাশেক ওর স্যালারি অ্যাকাউন্টে অ্যাডভান্স হিসেবে জমা করানো যায়, এ টি এম থেকে তুলে নেওয়া যাবে। কিন্তু অতো টাকা কি স্যাংশন করবেন এম ডি? গোয়েঙ্কাজিকে ফোন লাগাল। নাম্বার বিজি। একটা অ্যাম্বুলেন্স এসে দাঁড়াল নার্সিংহোমের সামনে। অন্য একজন আয়া এসে জানাল, ডাক্তারবাবু আপনাকে ডাকছেন। শুনে আবার ডাক্তারের কাছে গেল।
— হ্যাঁ শুনুন, আমি মঞ্জুকে বেবির সঙ্গে দিচ্ছি। অনুপমকে দেখে বললেন ডা. দাশ। আর সোমের সঙ্গে কথা বলে নিয়েছি। এতে কেস হিস্ট্রিটা লেখা আছে। বলে একটা হিজিবিজি লেখা কাগজ অনুপমের দিকে বাড়ালেন। কাগজটা ভাঁজ করে পকেটে ঢুকিয়ে অনুপম দেখল মঞ্জু উঠে দাঁড়িয়ে দু-হাত পিছনে তুলে টাইট করে খোঁপা বাঁধছে। সবুজ ব্লাউজটার বগলের কাছদুটো গোল হয়ে ভিজে। ভারী বুকদুটো টান খেয়ে আরও উঁচিয়ে উঠেছে। এক মুহূর্তের জন্য অনেকদিন পর গোটা শরীর শিরশিরিয়ে উঠল অনুপমের। একজন বয়স্কা আয়া এখন বাচ্চার মুখে মাস্ক ধরে বসে আছে।
— আমার স্ত্রীকে একবার দেখতে পারি? ডা. দাশকে বলল অনুপম।
— ওহ, শিওর, এই মঞ্জু ওনাকে একবার বেড ফোর-এ নিয়ে যাও।
— আসুন। করিডোর দিয়ে সোজা দশ পা হেঁটে একটা রুমে ঢুকে মঞ্জু বলল, এই যে, আপনি পেশেন্ট দেখুন আমি বেবিকে রেডি করছি গিয়ে। বলে অনুপমের প্রায় গা ঘেঁসে বের হল মেয়েটা। আর একটু হলেই বুকের ঘসা লাগতো। মেয়েলি ঘামের গন্ধ লাগল নাকে। সুলগ্না সবুজ গাউন পরে শুয়ে আছে। চোখ বোজা। স্যালাইন চলছে। এই ক-মাসের ঢাউস পেটটা আচমকা চুপসে যাওয়াতে অন্যরকম দেখতে লাগছে ওকে। সুলগ্নার কপালে হাত রেখে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল অনুমপ।
— দাদা আসুন হয়ে গেছে। আজ সকালে বাড়ি থেকে আনা পরিষ্কার, কাচা, সুলগ্নার প্রিয় নীল রঙের বেডশিটটা নিয়ে অনুপমের ছেলেকে রোল করে পেঁচিয়ে বুকের কাছে ধরে বলল মঞ্জু। নীচে নামল দুজন। অ্যাম্বুলেন্সে ঢুকে মুখোমুখি বসল। ডা. দাশ গাড়ির ভেতর ঢুকে অক্সিজেন চালিয়ে মঞ্জুকে নির্দেশ দিয়ে নেমে গেলেন। অ্যাম্বুলেন্স স্টার্ট নিল। অনুপম পিছনে তাকিয়ে দেখল, শ্বশুরমশাই দুইহাত জড়ো করে কপালে ঠেকাচ্ছেন। ট্যাঁওট্যাঁও শব্দে ছুটতে শুরু করল গাড়ি। রাস্তার লোক আগ্রহে তাকাচ্ছে। কেউ কেউ চেনা। অনুপম অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিল এতদিনের মিলে আসা হিসেবটা আচমকা গরমিল হয়ে যাওয়াতে। যে বছর সুলগ্না ক্যাগ এ চান্স পেল সেই বছরই সঙ্গীতাকে বরাবরের জন্য না করে দিয়েছিল ও। যদিও সঙ্গীতার ফিগারটা ছিল একঘর। সে তুলনায় সুলগ্না দিল্লী বহুত দূর। বিয়ের বছরখানেক পর থেকেই ইস্যু নেওয়ার জন্য বায়না শুরু করেছিল সুলগ্না। কিন্তু অনুপম চায়নি। বাচ্চাকাচ্চার হাজার ঝামেলা। তাছাড়া এর মধ্যেই বাবা-টাবা হয়ে গেলে একটা বুড়োটে ভাব চলে আসতে পারে। মেয়েরা হয়তো আর তেমন পাত্তাই দেবে না। এইসব সিরিয়াস প্রবলেমগুলো সুলগ্নাকে বোঝানো যাবে না বলেই দুবার অ্যাবরশনও করিয়েছিল ওকে। তারপর থেকেই সুলগ্নার ওই রোগটা শুরু হল। রোগ মানে উদ্ভট সব স্বপ্ন। প্রথম দিকে খুব একটা পাত্তা দিত না অনুপম। স্বপ্নগুলো শুনে হেসে উড়িয়ে দিত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা রেগুলার প্র্যাকটিসের মতো হয়ে দাঁড়াতে সুলগ্নাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। সুলগ্নার দেখা স্বপ্নগুলোর মধ্যে দু-একটা এখনও মনে আছে। যেমন ওই স্বপ্নটা, কতকগুলো অস্বাভাবিক বড়োমাথাওলা লিলিপুট মানুষ, যারা দলবেঁধে একটা বাড়ির দোতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে আসছে। বাড়িটার উঠোনের মাঝখানে সুলগ্না দাঁড়িয়ে। ওই প্রাণীগুলো সুলগ্নার কাছে আসতে চাইছে, কিন্তু চারদিকে থইথই জল বলে কাছে আসতে পারছে না। কীই পিক্যুলিয়ার ...!
ডাক্তার পুরো কেসটা শুনে সুলগ্নাকে কাউন্সেলিং-এর বদলে অনুপমকেই হালকা করে রগড়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, অনেকদিন তো হল, আর কতদিন ঝাড়া হাত-পা থাকবেন? এবার বাবা-টাবা হয়ে যান। দেখবেন সব দায়িত্বের একটা সুন্দর দিকও আছে। ইস্যু নেওয়ার সুন্দর দিক কী হতে পারে ভাবতে চায়নি অনুপম, তবে সরকারি চাকুরে, নিশ্চিন্ত জীবনের গ্যারান্টিদানকারী বউ-এর জন্য স্যাক্রিফাইসটা যে এবার করতেই হবে, সেটা বুঝে গেছিল ও। যার রেজান্ট বেরল আজকে, অনুপম কে ভীষণ চিন্তিত করে।
আজ গরমটা খুব। গাড়ির মধ্যে বাচ্চাটার মুখটা টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। মঞ্জু অক্সিজেনের নলটার একপ্রান্ত ছেলেটার এইটুকু পুঁচকি নাকের সামনে ধরে বুকে ঠেসে রেখেছে ওকে। এক মুহূর্তের জন্য খুব কষ্ট হল বাচ্চাটার জন্য। বাঁচবে তো? ... শব্দটা মনে আসতেই বুকে ঝিলিক দিল।
— ও ঠিক আছে তো? একটুও শব্দ করছে না তো আর ...?
— হ্যাঁ ঠিক আছে, অল্প হেসে মঞ্জু উত্তর দিল। আপনি অত চিন্তা করবেন না। ভগবান আছেন, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার ছোটো ছেলেটা হওয়ার সময়ও বুকে জল ঢুকে এমনটা হয়েছিল।
অনুপম বলল, ও আচ্ছা ...
প্রায় একঘণ্টা অসহ্য রাস্তা পার করে বেহালায় প্রাসাদের মতো বিশাল নার্সিংহোমটায় ঢুকল অ্যাম্বুলেন্স। এমারজেন্সিতে নামধাম লিখে লিফটে করে সোজা পাঁচতলায় এন আই সি ইউ-তে। মঞ্জুর থেকে প্রথমবার বাচ্চাটাকে কোলে নিল অনুপম। অদ্ভুত একটা অচেনা অনুভূতি ছড়ালো গোটা শরীরে। এই প্রাণটা আমার দেওয়া ... সম্পূর্ণ আমার ... মুখ নামিয়ে বাচ্চাটার কপালে নাক ঠেকাল। কেমন একটা গন্ধ। চোখ বুঝল অনুপম।
— এক্সকিউজ মি, একজন সুন্দরী নার্স এসে অনুপমের কাছ থেকে বাচ্চাটাকে নিতে যাবে, তক্ষুনি ভীষণ অবাক করে দিয়ে এক মুহূর্তের জন্য চোখ খুলে অনুপমের চোখে চোখ রাখল ওর ছেলে। রেখেই আবার চোখ চিপে বন্ধ করে ফেলল। নার্সের কোলে দিতে গিয়ে অনুপম জিজ্ঞেস করল, ও কি এখন দেখতে পায়? কোনো উত্তর না দিয়ে একবার শুধু মেক্যানিকাল হাসল নার্সটা।
তারপর প্যাঁচানো চাদরটা ছাড়িয়ে মঞ্জুর হাতে দিয়ে বাচ্চা কোলে ভিতরে চলে গেল। এন আই সি ইউ টা অস্বাভাবিক নি:শব্দ। বাইরে থেকে কাচের ঘরটার ভেতরে চোখ রাখল অনুপম। ওর ছেলেকে বিশেষ এক রকমের বেডে শোওয়ানো হয়েছে। মুখে অক্সিজেন মাস্ক। একজন ডাক্তার গভীর মনোযোগ দিয়ে বাচ্চাটাকে বিভিন্ন ভাবে পরীক্ষা করছেন। সঙ্গে দুইজন নার্স। মস্ত ঘরটা। পাঁচ-ছয়খানা বেড। প্রত্যেকটাতেই একটা করে অনুপমের ছেলের সাইজের বাচ্চা শুয়ে আছে। কারও পায়ের পাতায় নল ব্যান্ডেজ দিয়ে বাঁধা, কারও হাতে স্যালাইন, কারও বা চোখদুটো তুলো ব্যান্ডেজে মোড়া আর শরীরে বেগুনি আলো দিয়ে রাখা রয়েছে। কাউকে আবার পুরোটাই কাচের বাক্সে ঢাকা। এরা প্রত্যেকে একা। হঠাৎ তীক্ষ্ণ কান্নার শব্দ হল কাচের দেয়াল ভেদ করে। একটা বেডের দিকে ছুটে গেল নার্স। অনুপমের বুকের ভিতর অসম্ভব ঢিব ঢিব করছে। অন্যদিকে চোখ সরিয়ে নিল। খানিক বাদে ডাক্তারবাবু বাইরে এলেন। অনুপমকে বললেন, আমি অপূর্ব সোম।
— ও আচ্ছা নমস্কার। অনুপম হাতজোড় করল। প্রত্যুত্তরে উনিও ডানহাতটা সামান্য বুকের কাছে তুলেই নামিয়ে নিয়ে বললেন, ডিস্ট্রেসড বেবি। তবে ভয়ের কিছু নেই। ফেটাল কোনো কেস নয়। ভয় নেই। ঠিক হয়ে যাবে।
— কদ্দিন রাখতে হবে স্যার?
— এখন তো বেবি পার আওয়ার দশ লিটার অক্সিজেন টানছে। ওটা যখন জিরো হবে, তারপর বেবিকে ফিড করিয়ে ডিসচার্জ করব।
— আচ্ছা স্যার। আর ইয়ে ... বলছিলাম কী যে রাত্তিরে কি থাকতে হবে আমাকে?
— না না সে রকম কোনো প্রয়োজন নেই। আপনার কনট্যাক্ট নাম্বার তো দিয়ে রেখেছেন, রিসেপশনে। নিশ্চিন্তে বাড়ি যান। আমরা তো আছি। বলে একটা মৃদু প্রফেশন্যাল হাসি দিয়ে চলে গেলেন সোম।
যা ... ক। টেনশনের তাহলে সত্যিই কিছু নেই। মাথাটা হালকা হল অনুপমের। মঞ্জুর দিকে তাকাল। বাচ্চাটাকে যে চাদরটা জড়িয়ে আনা হয়েছিল, সেটাকে মেয়েটা এখনও আঁকড়ে রেখেছে বুকে। কত বয়স হতে পারে মঞ্জুর? পঁচিশ-ছাব্বিশ খুব জোর। মুটিয়ে যাবার ঠিক আগের মুহূর্তে থেকে গেছে। এইরকম ফিগার সাংঘাতিক প্রিয় অনুপমের। সুলগ্না এর থেকে অনেক বেশি মোটা। সবই আছে, কিন্তু কেমন যেন ... আসল ইয়ে ব্যাপারটাই নেই। মঞ্জুর শ্যামলা রং। ঘন কালো চকচকে চুল টান করে বাঁধা। সিঁথিতে সিঁদুর। হাতে কব্জিতে লাল পলা। গলায় রুপোর চেন। পেটের দুপাশে হালকা চর্বির ঢেউ।
— ভয় নেই দাদা। ডাক্তারবাবু বললেন তো সব ঠিক হয়ে যাবে। একটা নিশ্চিন্তিমাখা হাসি দিয়ে দলা পাকানো চাদরটা আরও একটু বুকে চেপে ধরে বলল মঞ্জু।
অনুপম বলল, দেখি কপালে কী লেখা আছে। চল কিছু খেয়ে নিই এবার। খুব খিদে পেয়েছে।
— আমি কিন্তু কিছু খাব না। আসলে আমার খুব দেরি হয়ে গেল আজ।
— তাই-ই? কটা পর্যন্ত ডিউটি তোমার?
— আমার তো কাল নাইট ছিল। রাত আটটা থেকে সকাল আটটা। আজ আমার রিলিভার আসতে দেরি করেছিল, তারপর আপনার বাচ্চার জন্য ...
— এহহে তার মানে আজ আমার জন্যই লেট হয়ে গেল তোমার। ভেরি স্যরি!
— না-না এমা ... ছি ছি। অ্যাক্সিডেন্ট তো হতেই পারে। কার হাত আছে বলুন? বাচ্চাটা তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে উঠুক। বেচারা জন্মেই মা-কে ছেড়ে থাকল।
— হ্যাঁ দেখি কবে ঠিক হয় ... কিন্তু আমি একা একা খাব সেটা তো দেখতে ভালো লাগে না। অল্প কিছু হলেও খাও।
উত্তর দেওয়ার আগেই মঞ্জুর কাঁধে ঝোলানো সস্তার সাইড ব্যাগের ভিতর থেকে মোবাইল বেজে উঠল। চাইনিজ সেট। কানে দিয়ে হাসিহাসি মুখে সুর করে বলল, হ্যাঁ ... বল। ও ... আমি ভুলে গেছি। মোটেও নয় ... হুমম ... হি হি হি ... আবার বাজে কথা ... কানে ফোন রেখে খিল্লি খেতে খেতে মঞ্জু অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটতে শুরু করল ধীরে ধীরে। পিছনে অনুপম। পিত্তিটা অল্প জ্বলছিল ফোনটা এই সময় আসার জন্য। ... এই-ই এখন না রাখছি, পরে কথা হবে।। হুমম ... টা টা ... ফোনটা রেখে দেওয়ার পরেও হাসিটা সস্তার ক্যাটক্যাটে রঙের লিপস্টিকের মতো ছড়িয়ে থাকল দুই ঠোঁট জুড়ে। মেয়েটা ঠিক কোন ক্যাটাগরির ধরা যাচ্ছে না।
চলুন তাহলে, কিন্তু অল্প একটু খাব।
— চল।
ক্যাশ কাউন্টারে গিয়ে আগে দশ হাজার জমা করে দিল অনুপম। কপালে কত লেখা আছে কে জানে? এক দিনের বেবির কোনোও নাম নেই। রিসিভ দেওয়া হল বেবি অফ সুলগ্না রায় নামে। গ্রাউন্ড ফ্লোরে হসপিটাল ক্যান্টিনে গিয়ে দুটো মিলের অর্ডার দিল ও। ঝকঝকে ক্যান্টিন। দামগুলো আরও চকচকে। প্রায় সাত-আট মাস ধরে পুরোপুরি অযৌনজীবন যাপনের পর আজ মঞ্জুর শরীরটায় হোয়াইটওয়াশ করার মতো চোখ বোলাতে বোলাতে ভীষণভাবে জেগে উঠছিল। সত্যি কথা বলতে সুলগ্নার ওপর ওই ইচ্ছেটাও আর বছর দেড়েক ধরে আসত না ওর। খানিকটা দায়সারা খুশিকরা মনোভাব নিয়েই মাঝেমধ্যে রাত্রে ফিল্ডে নামতে হত ওকে। কেসটা যতক্ষণ চলতে থাকতো, আনন্দের থেকে পরিশ্রমবোধটাই হত বেশি। কিন্তু কিছু করার নেই। অনুপমের কোম্পানিতে চাকরির কোনও ভরসা নেই। মঞ্জুর ভরাট তেলতেলে কাঁধটার দিকে তাকিয়ে চিকেনের নরম পিসে কামড় দিল ও। বেশ খেতে। খিদেটাও পেয়েছে ভালোই। মঞ্জুও খাচ্ছে হাপুস হুপুস। এই সব ভালো খাবার তো তেমন জোটে না। অনুপম হালকা করে এবার টোপটা ছাড়ল।
— তোমার বাড়ি কোথায় মঞ্জু?
— আদিসপ্তগ্রাম।
— এ্যআহ ... সে কী ... এত্তদূর! রোজ যাতায়াত কর?
— হুঁ, বলে হাসল মেয়েটা।
— বাব্বাহ ...! আচ্ছা তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
— হ্যা, করুন না।
— এখানে মাসে কত মাইনে পাও?
— আমি তো টেম্পোরারি। রোজ কাজ থাকে না। ডেইলি একশো কুড়ি টাকা।
— মাত্র একশো কুড়ি! চলে ওতে?
— চলে কী আর? কিন্তু কী করব বলুন, সংসার আছে, দুটো ছেলে। ওদের মানুষ তো করতে হবে। আমার বর তো আসতেই দিতে চায় না। আমি-ই আসি জোর করে। উপায় কী?
— তোমার দুটো ছেলে?
— হ্যাঁ। বড়োটা চার বছর আর ছোটোটা এই দেড়-এ পা দিল। ক-দিন ধরে বরের খুব লুজ মোশন হচ্ছে বলে বেরোতে পারছে না।
— হুম ... গা-টা ঘুলিয়ে উঠল ঘেন্নায়। কী করে তোমার হাজব্যান্ড? প্রশ্নটা করেই অনুপমের মনে হল হাজব্যান্ড শব্দটা একটু ভারী হয়ে গেল।
— ও তো রাজমিস্তিরির হেল্পারি করে।
— আচ্ছা ... তো দেখ তোমাকে যেটা বলছিলাম, তুমি একটা কাজ করতে পার। আমার বাড়িতে সবসময়ের একজন আয়া তো লাগবেই বাচ্চার জন্য। তুমি যদি কাজটা কর তো ভালো হয়। আমি তোমাকে নার্সিংহোমের থেকে বেশিই দেব, প্লাস আমার বাড়িতেই খাওয়াদাওয়া করবে। সপ্তায় একদিন ছুটিও পাবে।
মঞ্জু জলের গ্লাস তুলে চুমুক দিয়ে বলল, দেখি আমার বরকে বলে।
মাথাটা একটু গরম হল অনুপমের। মুখে বলল, বেশ, কথা বলে জানিও।
সন্ধে সাতটা নাগাদ ট্যাক্সিতে উঠে এবার খুব ক্যাজুয়ালি মঞ্জুর গা ঘেঁষে বসল অনুপম। মেয়েটা সরল না। একটু সামনের দিকে ঝুঁকে বসেছে, শাড়ির আঁচলের ফাঁক দিয়ে তলতলে, সামান্য স্ফিত পেটটা দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে চোখ সরিয়ে নিয়ে অনুপম ভাবল উফফ আজ সারাদিন যা টেনশন গেল। যাক এখন সবকিছু আউট অফ ডেঞ্জার। যা যা কর্তব্য সব পুরোটা করা হয়েছে। সুলগ্না যে নার্সিংহোমে ভরতি, সেখানের ভিজিটিং আওয়ার পৌঁছাতে পৌঁছাতে শেষ হয়ে যাবে। সুতরাং আজ আর ওখানে গিয়ে কাজ নেই।
— মঞ্জু আজ তো তোমার খুব লেট হয়ে গেল। বাড়ি ফিরবে কী করে?
— সেটাই তো ভাবছি। দেখি কী করি। ও-ও চিন্তা করবে খুব। বাড়ির মোবাইলটাও ক-দিন হল খারাপ হয়ে পড়ে রয়েছে।
— চিন্তা করবে কেন? এমনটা তোমার নিশ্চই মাঝেমধ্যেই হয়ে থাকে?
— হুমম ... তা হয়, বলেই হঠাৎ মনে পড়ার মতো করে মঞ্জু বলে উঠল, আচ্ছা দাদা আপনি কিন্তু বউদিকে গিয়ে বলবেন বাচ্চা খুব ভালো আছে। আর কোনো কষ্ট নেই। ... খারাপ লাগছে বউদির জন্য। বাচ্চাটার মুখ কবে দেখবে কে জানে?
— হুম ... ম, সে আমি বুঝিয়ে দেব।
— আসলে মায়ের মন তো। আমারই খারাপ লাগছে এত। বাচ্চাটা এখানে একা একা কদ্দিন পড়ে থাকবে?
কিছুক্ষণ চুপ থাকল অনুপম। মঞ্জুর কথায় এই প্রথম নিজের ছেলের জন্য একদলা কষ্ট গলার কাছে ঠেলে উঠল। ঢোঁক গিলল ও। দলাটা নামল খানিকটা।
— মঞ্জু তুমি এক কাজ করতে পার। আজকের রাত্তিরটা তুমি আমার বাড়িতে থেকে যেতে পার।
ট্যাক্সি ব্রেক কষল। সামনে জ্যাম।
মঞ্জু হেসে বলল, না না দরকার নেই। আমি নার্সিংহোমেই থেকে যাব। আজ বরং নাইট করে নিয়ে কাল ছুটি নিয়ে নেব ভাবছি। শরীরটাও ভালো নেই আজ।
— এহ হে তাহলে ডিউটি করবে কেন শরীর খারাপ নিয়ে? আমাদের বাড়িতে দুটো বেডরুম আছে। একটায় শুয়ে পড়বে। আজ তো তোমারও খুব চাপ গেল আমার ছেলের জন্য।
— এ মা ছি ছি কীই যে বলেন, ওইটুকু শিশু, ওর কী দোষ বলুন! কত কষ্ট পাচ্ছে ... আহা ...
— হুম ... ম তবু তুমি আমার জন্য এতটা করলে, আমাকেও কিছু করার সুযোগ দাও। নইলে ঋণ থেকে যাবে যে। বলে দাঁত বার করল অনুপম।
— কিন্তু আমি আপনার বাড়িতে গেলে আপনার খাটুনি আরও বেড়ে যাবে।
— না-না-নাহ, খাটনির কী আছে? দোকান থেকে রাত্রের খাবার কিনে নেব।
ফ্রিজের পিছনে রাখা পাঁইটের বোতলটার কথা মনে পড়ল ওর।
— আপনার বাড়িতে কে কে আছেন?
— বাড়িতে ... ওই তো ... মা ... আমার মা আছে।
— আমি হঠাৎ করে গেলে উনি কিছু মনে করবেন না?
— ধুস...স, মা সেই রকম মানুষই না। তাছাড়া বয়স্কা, চোখে কম দেখেন, বলেই ভাবল একটু বেশি বলা হয়ে যাচ্ছে। উৎসাহে ভেতরটা ফুটছে। মঞ্জু ঠোঁট টিপে হেসে বলল, বেশ চলুন তাহলে, আমিও একদিন একটু আরামে ঘুমুই। বলেই আবার লেজ জুড়ল, আমার বরকে কাল কী বলব ভাবছি।
— আরে বলে দিও যে আরজেন্ট ডিউটি পড়ে গেছিল।
... তাই বলব আর কী।
অনুপম আন্দাজ করল এই মেয়ে তৈরি জিনিস। এতদিন পর ঠিকঠাক জায়গাতেই জাল ফেলেছে বুঝে প্যান্টে নিজের ঘেমে ওঠা হাতের তালু মুছল।
বেহালার স্মাইল নার্সিংহোম থেকে উত্তরপাড়ায় অনুপমের ফ্ল্যাট পর্যন্ত টানা মিটার ট্যাক্সি নিল সাড়ে ছশো টাকা। তা নিক গিয়ে, একদিনের ব্যাপার। থার্ডফ্লোরে ফ্ল্যাটের ভেতর ঢুকতেই মঞ্জুর প্রথম প্রশ্ন, আপনার মা?
... তাই তো দেখছি ... কোথায় গেল বলোতো? বলে ঠোঁট টিপে হাসল অনুপম।
— উনি আছেন তো আদৌ? না কি আমাকে ঢপ দিয়েছেন? বলে পালটা একই স্টাইলে হাসল মঞ্জু।
অনুপম বলল, দেখা যাক।
ড্রইংরুম পেরিয়ে মঞ্জু নিজেই গড়গড় করে ঢুকে গেল বেডরুমে। অনুপম পিছনে গিয়ে লাইট জ্বালাল। মঞ্জু বলল, যদ্দিন আঁতুড় না ওঠে, এই ঘরটাই বউদির পক্ষে ভাল হবে বাচ্চা নিয়ে থাকার জন্য। বুঝলেন দাদা?
— বুঝলাম, এবার তুমি বল কী খাবে রাত্রে?
— যা খুশি। আপনি যা খাওয়াবেন।
— বেশ, আমাদের পাড়ার দোকানটায় খুব ভালো রুমালি রুটি আর চিকেন করে। চলবে?
— হ্যাঁ হ্যাঁ কোনোও অসুবিধা নেই। ... ওহ, আর একটা কথা ...
— বল।
— বাচ্চার জন্য কিন্তু অনেক কাঁথা লাগবে। বাড়িতে পুরোনো শাড়ি, ধুতি থাকলে ...
— ঠিক আছে ও সব পরে দেখা যাবে, অধৈর্য হয়ে বলল অনুপম, তুমি টয়লেটে ... ইয়ে বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও, আমি খাবারের অর্ডার দিচ্ছি, বলে অনুপম ভাবল, মালের বোতলটা এখনই বার করবে কি না। মেয়েটা মাল খায় নিশ্চয়ই। হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়ই খায়। এ পাক্কা লাইনের মেয়ে আছে, নইলে কি আর এমনই এমনই অচেনা একটা লোকের বাড়িতে চলে আসে রাত্রে?
অনেক মাস পর, ... না না অনেক বছর পর আসন্ন সুখের লোভে শরীর থিরথির করে কাঁপছিল অনুপমের। হাত পায়ের চেটো ঘেমে উঠছিল।
— তা-লে আমি একটু গা টা ধুয়ে আসি, বলে দু-হাত পিছনে তুলে অনুপমকে সাংঘাতিক উত্তেজিত করে মেয়েটা আড়মোড়া ভাঙল। তারপর টয়লেটের দিকে পা বাড়াতেই আবার ওর সাইডব্যাগের ভেতর থেকে মোবাইল বেজে উঠল।
— ধ্যাস ... শাহহ, বিরক্তিটা মুখ থেকে বেরিয়েই গেল অনুপমের। আব্বার কে?
মঞ্জু ব্যাগ থেকে ফোন তুলে স্বাভাবিক গলায় বলল, হ্যালো ... ওহহ হ্যাঁ, তুই ... ই! কোত্থেকে ফোন করছিস? ... ও আচ্ছা বল ... সে কী রে! থার্মোমিটার দিয়েছিস? ... এ্যা ... হ ... এত্ত ... ও! ঠাকুমাকে বল, মাথায় জলপট্টি দিতে ... ওহ আচ্ছা দিচ্ছে ... না না ঠিক আছে ... আমাকে আগে জানাবি তো ... হ্যাঁ হ্যাঁ ঠাকুমা কে বল চিন্তা না করতে, আর ওই সাদা ট্যাবলেটটা গোটা একটা খাইয়ে দিতে। আমি আসছি ... হ্যাঁ বললাম তো আসছি। বলিস একটু রাত হবে পৌঁছতে। এখনও বেরোতে পারিনি। ... এই বেরচ্ছি ... হুম ... ম রাখলাম। ফোনটা কেটে দিয়ে মঞ্জু খুব সামান্য হেসে বলল, আরামে ঘুমুনো আমার কপালে নেই দাদা। ভাবলাম একদিন একটু ... ... আমাকে এখন বাড়ি ফিরতে হবে।
— কারণটা জানতে পারি? চোয়াল শক্ত করে জিজ্ঞেস করল অনুপম।
— বরের শরীরটা খুব খারাপ হয়েছে। তুমুল জ্বর। ভাবুন সারাদিনে আমাকে কেউ কিচ্ছু জানায়নি। বড়ো ছেলেটা এখন ফোন করে বলছে, বাবা জ্বরে বেহুঁশ। কেমন লাগে শুনতে! কী চিন্তা হয় বলুন দেখি! এত রাত্তিরে ... আমি চললাম দাদা। বউদি ছেলে নিয়ে ফিরুক তারপর একদিন আসবখন।
কোনো উত্তর দিল না অনুপম। নিজেকে গুছিয়ে ক্যালাতে ইচ্ছে করছে।
— আসি, বলে সাইডব্যাগ কাঁধে নিয়ে আর প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগ হাতে ঝুলিয়ে ফ্ল্যাটের দরজা খুলে বেরিয়ে গেল মঞ্জু। অটোলক হয়ে গেল দরজা। ঘরের মাঝখানে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল অনুপম। দাঁতে দাঁত ঘষার জন্য মুখের ভিতর কট কট শব্দ হচ্ছে। মিনিটখানেক দাঁড়িয়ে থেকে কী করবে ভেবে না পেয়ে ধীরে ধীরে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল। রাগে মাথার ভিতর ঝিঁঝি ধরে গেছে। নীচে তাকিয়ে দেখল, মঞ্জু হাঁটতে হাঁটতে ফ্ল্যাট কম্পাউন্ডের গেট পর্যন্ত পৌঁছেও হঠাৎ আবার পিছন ঘুরে ফিরে আসছে।
... আ ... আ হ। আসবে না মানে! এইসব মেয়েদের খুব ভালো করে চেনা আছে। শুধু ভাও বাড়ানোর জন্য এইসব নৌটঙ্কি। বেশ তো অনুপমও ওকে খুশি করে দেবে। একটা লাল পাত্তিই কাফি এর জন্য। মেয়েটা এসে ফিক করে হেসে বলবে, ফিরেই এলাম আপনার জন্য, কিংবা অন্য কোনো অজুহাত। অনুপম সাঁ করে ব্যালকনি ছেড়ে ড্রইংরুমে এসে দাঁড়াল। বুকের ভিতর হাতুড়ি পিটছে। অসহ্য দু-তিন মিনিট। টিং টং করে বেল বাজল। দরজা খুলতেই মঞ্জু। ক্লান্ত হাসি মুখ। বলল, আবার ফিরতে হল আমায়।
— হ্যাঁ হ্যাঁ জানি। ভিতরে এসো। ঠোঁট বেঁকিয়ে সামান্য মুচকি হেসে বলল অনুপম।
— না ভিতরে আর যাব না। আসলে খেয়ালই ছিল না, আপনার এটা নিয়েই চলে যাচ্ছিলাম, যদি কাল ডিউটি না আসি তবে বাড়িতেই পড়ে থাকবে। বলে হাতে ঝোলানো প্লাস্টিকটার ভিতর থেকে সকালের সেই দলা পাকানো বেডশিটটাকে বার করে অকারণ সাবধানে, যত্নে, আদরে সামনে তুলে ধরল আর ঠিক তখনই হ্যা ... ট শা ল ... লাহ বলে অনুপম উপোসি বেড়ালের মতো থাবা মারল মঞ্জুর বুকে। খামচে ধরে একটানে ফরফর করে ছিঁড়ে ফেলল ব্লাউজ, হলদেটে হয়ে যাওয়া সস্তার সাদা ব্রেসিয়ার। এতক্ষণ ভিতরে ঠেসে গুটিয়ে থাকা মঞ্জুর শামুক রঙের বুকদুটো আচমকা ছাড়া পেয়ে যেন হইহই করে অনুপমের সামনে প্রাণপণ মেলে ধরল নিজেদের। নখ গেঁথে গিয়ে চামড়া উঠে মঞ্জুর দুটো বুকের ঠিক মাঝখানে নিমেষে রক্ত জমে উঠল দেখল অনুপম। অথচ মঞ্জু যেন কিছুই টের পেল না। শুধু চুপ করে স্থির দাঁড়িয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল অনুপমের দিকে। অসহ্য তাকিয়ে থাকাটা। চাদরটা গুটলি পাকিয়ে মেঝেতে পড়ে রয়েছে। মঞ্জুকে এক হাতে নিজের সামনে টেনে এনে অন্য হাতে ফ্ল্যাটের দরজাটা বন্ধ করতে করতে অনুপম হঠাৎ অদ্ভুত গলায় ঝাঁঝিয়ে উঠল, কী দেখছ কী? আমি জানি তুমিও জানো ওরা দুজনেই কিন্তু বেঁচে গেছে। ... তাহলে?
সানন্দা
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন