জন্মদিন

বিনোদ ঘোষাল

এখন রাত এগারোটা কুড়ি। আর ঠিক চল্লিশ মিনিট বাকি। তার পরেই ১৩ই জুন। আমার জন্মদিন। আমি ইচ্ছে করেই এই দিনটাকে বাছলাম। জন্ম আর মৃত্যুদিন এক হওয়ার মধ্যে একটা মজা আছে। মনে রাখতে সুবিধা হয়। তবে আমার জন্ম বা মৃত্যু যে কেউ মনে রাখবে না তা জানি। আরও একটা কারণ আছে। যারা জন্মেই মরে যায় তাদেরও জন্ম আর মৃত্যুদিন একই হয়। আমিও আমার বেঁচে থাকাটাকে মনে রাখতে চাই না। সেইজন্যই এই দিনটাকে বাছলাম। হয়তো। অনে-ক দিন পর ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালাম। বেশ হাওয়া দিচ্ছে। ঠান্ডা হওয়া। আমার মুখে, ঠোঁটে, চোখে হাওয়া ছুঁয়ে যাচ্ছে।

এই ব্যালকনিটা আমার বড়ো প্রিয়। এখানে দাঁড়ালে সামনের বট গাছটাকে দেখতে পাই। বিশাল বড়ো গাছটা। অনেক পুরোনো। গাছটায় অসংখ্য পাখির বাসা। হাজার হাজার পাখি। আর গাছের নীচে মস্ত একটা কোটর। সেই কোটরের মধ্যে থাকে জাহিরুল চাচা। আমি আরও অনেক কিছু দেখতে পাই, যা আর কেউ পায় না। কেউ না।

আমি যে অ্যাপার্টমেন্টে থাকি তার নাম ভালোবাসা। ভালোবাসার ফোর্থ ফ্লোরে আমি থাকি। একা। আজ থেকে সাত মাস আগে আমি এই ফ্ল্যাটটায় এসেছিলাম। ভাড়া ছ-হাজার টাকা। দু-বছর আগেও আমি এই টাকা রোজগারের কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারতাম না। আর এখন অনায়াসে এই টাকা ফ্ল্যাটভাড়া দিতে পারি। সব ম্যাজিক। আজ অনেক দিন পর আমার নিজের কথা, স্রেফ নিজের কথা খুব ভাবতে ইচ্ছে করছে। একেবারে ছোট্টোবেলা থেকে।

না, খুব ছোটোবেলাটা আমার একটু ঝাপসা হয়ে গেছে। শুধু মনে আছে আমাদের পাড়ার শেষে মস্ত একটা মাঠ ছিল। সবুজ ঘাস। মাঠ শেষ হলে একটা মস্ত বাঁশবাগান আর ডোবা ছিল। আমরা বন্ধুরা সেই মাঠে রোজ বিকেলে খেলতাম। তারপর সেই ডোবায় গা ধুয়ে বাড়ি ফিরতাম। আমার মনে আছে বর্ষাকালে একেকদিন যখন মেঘ করে আসত মাঠটার ওপর। কী যে সুন্দর লাগত তখন মাঠটাকে! মাঠের সবুজ রংটা অদ্ভুত দেখতে হয়ে যেত। ঠিক স্বপ্নের রঙের মতো। একদিন হয়েছে কী খেলার পর আমরা সবাই বসে গল্প করছি, হঠাৎ দেখি আকাশের এককোণ থেকে কালো বিশাল একটা দৈত্যের মতো কী যেন একটা আমাদের দিকে চারদিক অন্ধকার করে ছুটে আসছে। আমরা কিছু না বুঝেই মাঠের ওপর দিয়ে ছুটতে শুরু করলাম। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আমরা ভিজে ঝুপ্পুস। তখন বুঝলাম ওটা আসলে জলভরা মেঘ ছিল। বৃষ্টি ঢালতে ঢালতে আসছিল। ভিজে যাওয়ার পরে আমরা সবাই মিলে কী হাসি! আজও মনে আছে আমরা আগে দৌড়াচ্ছি আর পেছনে বৃষ্টি তাড়া করেছে।

আমার মা মারা গেছিল যখন আমি ক্লাস ফোর-এ পড়ি। টাইফয়েড হয়েছিল। বাবা বাঁচাতে পারেনি মাকে। আমাকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়নি। মা চলে যাওয়ার পর থেকে বাবা-ই আমার সবসময়ের বন্ধু হয়ে উঠেছিল। ছুটির দিনে আমাকে সাইকেলের রডে বসিয়ে বেড়াতে নিয়ে যেও। একদিন আমাকে গঙ্গার ঘাটের পাশের শ্মশানটার দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলেছিল, বুঝলি পলু তোর মাকে তো এখানেই দাহ করেছিলাম। আমি মরে গেলে আমাকেও এখানেই দিস। মায়ের মতো করে কাঠেই পোড়াস আমাকে। চুল্লিতে দিস না। বলে সামান্য হেসে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল বাবা। আমি উত্তর দিইনি। আমার খুব ভয় লেগেছিল শুনে। অনেক কষ্ট করেও ভুলতে পারিনি কথাটা। মাঝেমধ্যেই মনে পড়ত।

বড্ড কম নিয়ে বেঁচে থাকতে ভালোবাসত আমার বাবা। অতসী নামের একটা লোকাল সিনেমা হল-এ লাইটম্যানের চাকরি করত; মফসসলের হলগুলো যেমন হয়, তেমনই ছিল। অল্প মাইনে, অল্প ভাড়ার বাড়িতে বাবা আর মেয়ের সংসার চলে যাচ্ছিল মোটামুটি। তারপর আমার ক্লাস এইটের সময় সিনেমা হলটা ধুঁকতে শুরু করল। মিটিং, ধর্না, পার্টি অফিস অনেক চেষ্টা করেও আটকানো গেল না, শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেল হলটা। পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার একটু আগে থেকেই বাবার আচরণে কেমন অস্বাভাবিকতা খেয়াল করতাম। তারপর যখন একেবারেই সত্যি সত্যি বন্ধ হয়ে গেল বাবাও আর আগের মতো রইল না। রোজ বেলা হলেই আগের মতো টিফিন বক্সে আমার বানানো রুটি তরকারি নিয়ে বেরিয়ে পড়ত। তারপর বন্ধ হলটার গেটের সামনের চায়ের দোকানের বেঞ্চে চুপ করে বসে থাকত সারাদিন। এক সময় চায়ের দোকানেও আর বসতে দিত না বাবাকে। তখন সিনেমা হলের পাঁচিলের গায়ে হেলান দিয়ে সারাদিন। আমি প্রথম দিকে অনেক চেষ্টা করতাম বাবাকে বাড়ি ফেরাতে। অনুরোধ, বকাঝকা, হাত ধরে টানাটানি করেও বাড়ি ফেরানোর চেষ্টা করেছি কয়েকবার। কোনো লাভ হত না। বাবা গোঁজ হয়ে বসে থাকত। আশপাশের সবাই হাসত আমাকে অমন বাবার হাত ধরে টানাটানি করতে দেখে। খুব লজ্জা করত আমার। তারপর থেকে আর যেতাম না।

এক সময় সিনেমা হলটা ভাঙা শুরু হল। ওখানে ফ্ল্যাট উঠবে। বাবার পাগলামি আরও বেড়ে গেল। সারা দিন সারা রাত বাবা পড়ে থাকত ওই হলটার সামনে। দিনের বেলায় যেসব লেবাররা হলটাকে ভাঙার কাজ করত তাদের দিকে ইট, খোয়া ছুড়ত বাবা। আর রাত্রে চারদিক ফাঁকা অন্ধকার হয়ে যাওয়ার পর একা একটা টর্চ জ্বালিয়ে সেই ভাঙা স্তূপের ঢুকে এদিক ওদিক এমন ভাবে লাইট ফেলত যেন অন্ধকারে দর্শকদের বসার চেয়ার দেখিয়ে দিচ্ছে। আমি নিজে চোখে দেখেছি। আর আশ্চর্য সিনেমা হলটা পুরো ভেঙে সাফ হয়ে যাওয়ার পর থেকে বাবা হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল। খুব শান্ত, স্বাভাবিক ... না ঠিক স্বাভাবিক নয়, কারণ বাবা আগে এতটা শান্ত ছিল না। আর তারপর থেকে খুব একটা বাড়ির বাইরেও বেরোত না।

জমানো টাকা খরচ হতে হতে যখন প্রায় তলানিতে আমি তখন এইচ এস দিয়েছি। দুটো টিউশনি করি, যা পাই তাতে নিজের বই খাতাও ঠিক মতো কিনে উঠতে পারি না। আর্টস নিয়েছিলাম। ছট্টুদা মাঝেমধ্যে বাড়িতে এসে নোটস দিয়ে যেত। আমাদের কয়েকটা বাড়ি পরেই ছট্টুদার কোচিং সেন্টার। অনেকে পড়তে যেত, আমিও যেতাম। ছট্টুদা ফিজ নিত না। উলটে আমাকে স্পেশাল কেয়ারও করত। বদলে কিচ্ছু চাইত না কোনওদিন। একদিন চাইল। সেদিন গোটা পাড়ায় লোডশেডিং। আমি হ্যারিকেন জ্বালিয়ে পড়ছিলাম। বাবা বাড়িতে ছিল না। ছট্টুদা এসে আমাকে বলল, দে। আমি যেন মনে মনে এতদিন ধরে প্রস্তুতই ছিলাম। দিয়ে দিলাম নিজেকে। ছট্টুদা যত আমাকে এফোঁড় ওফোঁড় করছিল, একটা অদ্ভুত আরাম ... না ঠিক শরীরের নয়, বরং ভিতরে অনেক দিন ধরে জমে ওঠা ঋণ যেন কমে আসার অনুভূতি হচ্ছিল। হালকা হয়ে যাচ্ছিলাম আমি। যে খাটটায় রোজ আমি আর বাবা শুই, সেখানেই শুয়ে ছিলাম আমি আর ও। দরজায় বেখেয়ালে কপাট দিতে ভুলে গেছিলাম। বাবা হঠাৎ ঢুকে পড়েছিল ঘরে। আমাকে আর ছট্টুদাকে এই অবস্থায় দেখে কয়েক সেকেন্ডের জন্য অবাক হয়ে তাকিয়েছিল। তারপর মাথা নীচু করে আবার বাইরে চলে গেছিল। আমি কুঁকড়ে গেছিলাম লজ্জায়।

ছট্টুদা চলে যাওয়ার পর আমি ভেবেছিলাম রাত্রে বাবা আমাকে মেরে গুঁড়ে গুঁড়ো করে ফেলবে। অথচ আমাকে সম্পূর্ণ অবাক করে দিয়ে বাবা কিচ্ছু বলল না। রোজের মতোই রাত্রে মাথা নীচু করে মাটিতে বসে ভাত খেল। জীবনে সেই প্রথমবার বাবাকে ভীষণ ঘেন্না করছিল আমার। ভীষণ ঘেন্না। এইচ এস পরীক্ষা আর দিলাম না। স্কুলও ছেড়ে দিলাম। সতেরো বছর বয়সের ভরতি শরীর নিয়ে আস্তে আস্তে নামতে শুরু করলাম রোজগারে। অনেকটা বাবাকে আরও দু:খ আরও যন্ত্রণা দেওয়ার জন্যই। পাড়া-বেপাড়ার ছেলে জুটিয়ে লোকাল ট্রেনে করে কলকাতায় সারাদিন। পার্কে, সিনেমা হলে। কড়ায় গণ্ডায় নিজের হিসেব বুঝে নিতে নিতে অনেক চালাক হয়ে উঠছিলাম। একদিন খবরের কাগজে চোখে পড়ল, নিবিড় আনন্দ, প্রেমের উষ্ণতা অনুভব করুন হাই প্রাোফাইল মহিলাদের সঙ্গে। ১০০%নিরাপদ। মহিলাদের রেজিস্ট্রেশন ফ্রি। কল করুন এই নাম্বারে ... সটান গিয়ে যোগাযোগ করলাম। নিজের নামটাও পালটে ফেললাম আমি। পল্লবী নামটা দিয়েছিল বাবা। আমি নিজের নাম দিলাম রেশমি। একটা অদ্ভুত জগৎ এই এসকর্ট সার্ভিস। মিডল ক্লাসের টিপিক্যাল পাপ পাপ ভাবটা প্রাণপণে রবার দিয়ে মুছে ফেলে সত্যি সত্যিই রেশমি হয়ে উঠলাম আমি, খুব তাড়াতাড়ি। অন্তত বিশ্বাস করতাম আমি আর পল্লবী নই।

অচেনা অজানা কত টাইপের পুরুষের সঙ্গে শরীর দিয়ে মিশতে মিশতে একসময় আমি বুঝতে পারলাম পৃথিবীতে সব থেকে সোজা শব্দ হল ভালোবাসা। আর দশটা-পাঁচটা সরকারি কেরানি জীবনের মতোই পুরুষের আদর বড়ো একঘেয়ে, ক্লান্তিকর। আমি কিন্তু কোথাও রাত্রে থাকতাম না। ডিউটি সেরে বাড়ি ফিরে আসতাম। আসলে সত্যি বলতে বাবার জন্য চিন্তা হত। রাত্রে যদি কিছু না খায় ... যদি বাড়ি না ফেরে ...? চোখে কম দেখত বাবা। চুপ করে খাটের ওপর বসে থাকত সন্ধে থেকে। একটা লোক ঘণ্টার পর ঘণ্টা কী করে একা সারা সন্ধে রাত্তির কিচ্ছু না করে বসে থাকত? বাবা কি অপেক্ষা করত আমার জন্য? কেন?

পুরোনো ভাড়াবাড়িটা ছেড়ে স্টেশন রোডের সামনে একটা বাড়ির নীচের তলায় ভাড়া চলে এসেছিলাম। তিনটে ঘর, আমার পারসোনাল ঘরের খুব দরকার ছিল। যখন তখন ফোন আসত ক্লায়েন্টের, এজেন্টের। তা ছাড়া ঘরে ফার্নিচার বাড়ছিল। টিভি, ফ্রিজ, ডিভিডি, কুলার। আরও একটা ব্যাপার, বাবা যদিও অনেকদিন ধরেই আমার চোখে চোখ রেখে কথা বলা ছেড়ে দিয়েছিল, খুব প্রয়োজন না হলে কথাও বলত না। আমিও বলতাম না তেমন দরকার ছাড়া। তবু বাবার সামনাসামনি হতে আমার কেমন যেন একটা অস্বস্তি হত। কখনও আমার দিকে মোটা চশমার ভিতর দিয়ে তাকালেও কেমন যেন ছাঁৎ করে উঠত ভিতরটা। বাবা কি বুঝত কিছু? ঠিক বুঝতে পারতাম না। তবে আমার মনে হতো বাবা শুকিয়ে যাচ্ছে। আমার কি খারাপ লাগত? ... লাগত আবার লাগতও না। তবে আমি আরও আরও অনেক টাকা রোজগারের কথা ভাবছিলাম। নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড় করালেই আমি বুঝতে পারতাম অনেক অ-নে-ক টাকা অর্জন করার জন্য আমি জন্মেছি। অনেক টাকা। সব দু:খ, না পাওয়াকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার মতো টাকা। এত সুন্দর শরীর আমার!

ওই এজেন্সিটা ছেড়ে দিলাম। বেটার অপারচুনিটি। অনেক দামি একটা এসকর্ট সার্ভিস। পার আওয়ার দশ হাজার, টু আওয়ারস হলে ফিফটিন। আমি অবশ্য হাতে পেতাম সিক্সটি পারসেন্ট। বাকিটা এজেন্সির কমিশন আমার সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রেমোটিং-এর জন্য। এলিট হয়ে গেলাম আমি ... হুহ! দামি হোটেলের ঘর থেকে মার্সিডিজ বেনজের কালো কাচের ভিতর আমার জীবন, আমার ওয়াক্স করা ওয়েলগ্রুমড শরীর। প্লেজার ট্রিপে ও গেছি কয়েকবার। এক্সটা পেমেন্ট। রাত্রে কখনও একা হলে আমার হারিয়ে যাওয়া অভাবকে চুলের মুঠি ধরে হিড়হিড় করে সামনে টেনে নিয়ে এসে বলতাম, এই দেখ আমি। কেমন লাগছে বল? সে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকত। তাকিয়ে থাকত আমার দিকে। বাবার মতোই।

এখানে পৌঁছনোর জন্য অনেক পরিশ্রম করেছি আমি। স্পোকেন ইংলিশ থেকে শুরু করে এলিট কালচার অনেক কিছু শিখতে হয়েছে। এমনকি বিছানায় শুয়ে ক্লায়েন্টকে হান্ড্রেড পারসেন্ট স্যাটিসফাই করার জন্য পর্নো দেখে লাভ মেকিং এর শাউটিং প্র্যাকটিস করেছি। চারটে লার্জ পেগেও নিজেকে কন্ট্রোলে রাখতে পারি। তিন-চারটে স্পেশাল পোজ জানি। ছেলেদের এজ গ্রুপ ওয়াইজ ফোর প্লে-র টাইমিং সব স-ব কিছু আমার মুখস্থ। ক্লায়েন্টরা আমাকে বার বার চায়। আর আমি চাই ... খুব সামান্য হলেও একটু যেন গুলিয়ে যেতে শুরু করেছিল আমার চাওয়াটা।

বাসে ট্রেনে ট্রাভেল করা ছেড়ে দিয়েছিলাম। ট্যাক্সিতে যাতায়াত। নিজের রুমের জন্য একটা উইন্ডো এসি কিনেছিলাম। বাইরের গরম আর ধুলো সহ্য হত না। এই বাড়িটাও ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছিলাম আমি। ফ্ল্যাট আর একটা ছোটো গাড়ি কেনার ইচ্ছে হচ্ছিল, ঠিক তখনই বাবা অসুস্থ হল। জ্বর। খুব জ্বর। কী একটা যেন ইনফেকশন। নামটা আর মনে নেই। আমার কাজকম্ম সব পণ্ড। লোকটার জন্য এত সময় নষ্ট করার ইচ্ছে না থাকলেও কেন কে জানে ডাক্তার আর ওষুধের জন্য মুঠো মুঠো টাকা খরচ করলাম আমি। আমি হয়তো চাইতাম বাবা বেঁচে থাকুক। আরও দেখুক আমাকে। আরও অনেক শাস্তি পাওনা রয়েছে লোকটার। বাবা সুস্থ হচ্ছিল না। কলকাতার অনেক নামিদামি ডক্টর দেখালাম, তাও। আমি জানতাম না বাড়িতে না থাকলে বাবা কোনও ওষুধ খেত না। নার্সিংহোমে অ্যাডমিট করার কথাও সাজেস্ট করেছিলেন ডক্টররা। পারিনি। ভয়ঙ্কর রিয়্যাক্ট করছিল বাবা। কিছুতেই ভরতি হয়নি। একদিন রাত্রে এই নিয়ে তুমুল ঝগড়া হল। ঠিক ঝগড়া নয়, আমিই চিৎকার করছিলাম। আর বাবা শুধু তাকিয়েছিল আমার দিকে। বিড়বিড় করছিল কী যেন। চোখদুটো অন্যরকম লাগছিল সেদিন। সেদিন রাত্রে আমি বাড়িতেই ছিলাম। বাইরে নাইট স্টে করছিলাম না কয়েকদিন ধরে। হঠাৎ বাবার ঘর থেকে অদ্ভুত একটা গোঙানোর শব্দ পেলাম। যাব না ভেবেও শেষ পর্যন্ত ঘরে ঢুকে দেখি বাবা বিছানায় কুঁকড়ে শুয়ে কাতরাচ্ছে।

— কী হয়েছে তোমার? ... বাবা!

বাবা উত্তর দিচ্ছিল না। শরীরে অসম্ভব জ্বর নিয়ে প্রলাপ বকছিল। আমি কান ঠেকিয়ে শুধু শুনতে পেয়েছিলাম, পুড়ে যাবে ... সব পুড়ে যাবে। জ্বলে যাবে সব ... সব পুড়িয়ে দেব ...

এই সবের মানে কী? কথাগুলো অনর্গল বিজবিজ করে বলতে বলতে বাবা হঠাৎ একবার লাল টকটকে চোখে আমার দিকে সটান তাকাল। ভয় পেয়ে গেছিলাম আমি। সত্যি ভয় পেয়ে গেছিলাম। আমি জীবনে কোনওদিন বাবাকে ওইভাবে আমার দিকে তাকাতে দেখিনি। কয়েক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল। ভোর রাতে চলে গেল। ডক্টর বললেন, কার্ডিয়াক অ্যাটাক।

সকালে পাড়ার কিছু লোক জড়ো করে আমার বাবাকে নিয়ে গেলাম সেই শ্মশানটায়। পাড়ার লোকেরা বলেছিল ইলেকট্রিক চুল্লিতে দিতে। আমি দিইনি। জীবনে ওই একটা জিনিসই তো লোকটা সরাসরি চেয়েছিল আমার কাছে। চ্যালা কাঠগুলো দিয়ে যখন ঢেকে দেওয়া হয়েছিল, সত্যিই বাবাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। শুধু হাঁটুর থেকে পা দুটো বাইরে বেরিয়ে ছিল। কাঠের মতোই শুকনো। দাউ দাউ করে যখন আগুন জ্বলে উঠেছিল, আমি তাকিয়েছিলাম। এক মুহূর্তের জন্যও চোখ সরাইনি। বাবার মাথা, বুক, পেট সব পুড়ে যাওয়ার পর আধপোড়া পা দুটো এমন ভাবে বাইরে বেরিয়েছিল, ঠিক যেভাবে জ্বলন্ত উনুনের নীচে পাটকাঠি বেরিয়ে থাকে। ডোম এসে বাঁশ দিয়ে ওই পা দুটোকে ভাঁজ করে আগুনে ঠেলে দিচ্ছিল যখন, আমি চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলাম।

আর কোনও পিছটান থাকল না আমার। বাড়িটা ছেড়ে দিয়ে চলে এলাম কলকাতায়। ভালোবাসা ফ্ল্যাটের খোঁজ দিয়েছিল প্রিয়াঙ্কা। আমি যে এজেন্সিটায় আছি, প্রিয়াঙ্কাও সেখানেই কাজ করে। আমার থেকে দু-বছরের বড়ো। ডিভোর্সি। ইস্যু নেই। একদিন কথায় কথায় আমি শিফট করার কথা ভাবছি শুনে এই অ্যাপার্টমেন্টের খোঁজটা ওই এনে দিয়েছিল। ভালোবাসার ফার্স্ট ফ্লোরে থাকত ও। এই অ্যাপার্টমেন্টে বেশ কয়েকজন আমার মতো মেয়ে থাকে। তাদের মধ্যে দু-জন ম্যারেড। মানসী আর কেয়া। মানসীর একটা চার বছরের ছেলে আছে। মিষ্টি দেখতে। নামি স্কুলে পড়ে। কেয়ার হাজব্যান্ড দুবাইতে চাকরি করে, মানসীর পাঞ্জাবে। ওদের অনেক টাকা। তবু এসকর্টে জয়েন করেছে। ওরা বলে জাস্ট ফর ফান, টাইম কাটানো। আমি জানি সময়ের খুব অভাব আর অতিরিক্ত সময়, দুটোই বড্ড অস্থির আর একা করে তোলে মানুষকে।

এই ফ্ল্যাটে আসার পরদিনই আমি আবিষ্কার করেছিলাম আমার ব্যালকনির ঠিক সামনের বটগাছটা আর জাহিরুলকে, যার সামনে আমি এখন দাঁড়িয়ে রয়েছি। বহু পুরোনো বটগাছটায় পাখি থাকে। অনে-ক পাখি। ঠিক যেমন আমরা এই অ্যাপার্টমেন্টটার একেকটা ফ্ল্যাটে থাকি। আর গাছটার নীচে মস্ত একটা কোটরে জাহিরুল চাচার বাসা। প্রথম যেদিন দেখি আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। একলা একটা বুড়ো মানুষ এই শহরে কীভাবে গাছের নীচে ভিতরে তার সংসার পেতে বসেছে। কয়েকদিনের মধ্যেই বেশ বন্ধু হয়ে উঠেছিলাম দুজনে। সারাদিন গাছের নীচে বসে একমনে ছেঁড়া জুতো, চটি সেলাই, পালিশ করত চাচা আর সন্ধের মধ্যেই রান্না-বান্না সেরে খেয়ে দেয়ে ওই কোটরে ঢুকে শুয়ে পড়ত। পুরোটা ঢুকতে পারত না। গুটিয়ে শোওয়ার পরেও হাঁটুর পর থেকে বাইরে বেরিয়ে থাকত। একেক দিন অনেক রাত্রে বাড়ি ফেরার সময় আমি দাঁড়িয়ে দেখতাম। অদ্ভুত লাগত, একটা মানুষ এত কম নিয়ে বেঁচে থাকে কী করে? ঠিক আমার বাবার মতো। ওই কোটরটার ভিতরেই চাচার গোটা সংসার থাকত। খানকয়েক বাসনপত্র, জামাকাপড়, জুতো মেরামতের জিনিস। মরা ডালের মতো শুকনো চেহারাটা অবিকল আমার বাবার মতো। আমি বেশ কয়েকবার চাচার কাছে আমার ব্যাগ সারাই করাতে গিয়ে কোটরের ভিতরে যতটা সম্ভব উঁকি দিয়ে দেখতাম। আর প্রত্যেকবার অবাক হতাম। কেয়ার কাছে জেনেছি জাহিরুল নাকি বহুদিন ধরে এখানেই থাকে। লোকটার ওপর আমার একটা অকারণ আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। কেন হয়েছিল আমি নিজেও জানি না। বটগাছটার মতোই চাচার বয়স বোঝা যেত না। শুধু অনেক পুরোনো এইটুকুই আন্দাজ করা যেত। এত শান্ত কোনো মানুষের চোখ হতে পারে! আমি যেচে মাঝেমধ্যেই যাওয়া আসার পথে কথা বলতাম। একদিন জিজ্ঞেস করেই ফেলেছিলাম, চাচা তুমি গাছের মধ্যে থাকো কেন? কী করে থাকো এইভাবে?

সামান্য হেসে উত্তর দিয়েছিল, একা তো থাকি না, এত পাখি রয়েছে।

মানুষ আর পাখি কি এক হল? প্রশ্নটা আর করে উঠতে পারিনি।

আচ্ছা চাচা কি জানে আমি কী কাজ করি? জানে না। জানার কথাও নয়। আর জানলেই বা কী? কোথায় ও আর কোথায় আমি। হেভেন অ্যান্ড আর্থ ডিফারেন্স। অথচ গভীর রাত্রে ট্যাক্সি থেকে বাড়িতে নামার সময় আমার চোখ অকারণ চলে যেত ওই গাছের নীচে। আমার তো আর কাউকে কোনো কৈফিয়ৎ দেওয়ার নেই ... তবু আশ্চর্য আমার খালি মনে হত কোটরের ভিতর থেকে চাচা আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এই তাকানো কি আমাকে কোনওদিন রেহাই দেবে না? অসহ্য। আমিই এইভাবে লোকটাকে জড়িয়ে ফেলছিলাম নিজের সঙ্গে। চেষ্টা করেও ছাড়াতে পারছিলাম না। আরও জড়িয়ে যাচ্ছিল। কেন? কে ও? ধীরে ধীরে অসহ্য লাগতে শুরু করেছিল মানুষটাকে। ভীষণ রাগ হত। ও কেন আমারই বাড়ির সামনে থাকবে? সারাক্ষণ আমাকেই কেন ওইভাবে দেখবে? কাজে মন বসত না। ক্লায়েন্ট ভিজিটের সময়ও খালি মনে হত একজোড়া চেনা চোখ আমাকে দেখছে। মাঝেমধ্যে চমকে উঠতাম। ক্লায়েন্ট বিরক্ত হত। আর আমি ভয় পেতাম। পারফরম্যান্স খারাপ হতে শুরু করছিল আমার। কল কম পেতে শুরু করলাম।

একদিন কেয়া আর মানসীকে বলে ফেললাম সব কথা। বললাম লোকটা আমাকে দিনরাত ইরিটেট করছে। ওরা শুনে বলল আমাকে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাতে। এই লাইনে নাকি অনেকেই সাইকো পেশেন্ট হয়ে ওঠে। ওরা কি ভাবছিল আমিও পাগল হয়ে যাচ্ছি?

না যাইনি। কোনও ডাক্তারের কাছেই যাইনি। কিন্তু নিজের ঘর থেকেও আর বেরোতে ইচ্ছে করত না আমার। আচমকা সব কিছু কেমন যেন পালটাতে শুরু করে দিল। কিচ্ছু ভালো লাগত না। কিচ্ছু না। শুধু অলসভাবে বিছানায় পড়ে থাকতাম। বাইরে বেরোতে কেমন ভয় লাগতে শুরু করল আমার। ঘরে লাইট জ্বালিয়ে প্রত্যেকটা জানলা সবসময় বন্ধ রাখতাম। বাইরে কোটি কোটি চোখ অপেক্ষা করে আছে আমাকে গিলে খাবে বলে। অসহ্য ঠান্ডা কতগুলো চোখ। কেয়া, মানসী, প্রিয়াঙ্কা আমাকে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছিল ডক্টরের কাছে নিয়ে যেতে। আমি কিছুতেই যাইনি। বাইরের রোদ্দুরটাকেও ভয় পেতে শুরু করেছিলাম আমি। আমার এতদিনের কষ্ট করে হয়ে ওঠা রেশমি শুকনো চামড়ার মতো গা থেকে খসে খসে পড়তে শুরু করেছিল। আমার চেনা পৃথিবীটা কবে যেন পালটে গেল। আমি ...

সবাই ভাবে আমি নাকি পাগল হয়ে গেছি। হি হি। পাগল একটা। ওরা জানেই না আমি পাগল নয়, আবার পল্লবী হয়ে যাচ্ছি। প-ল-ল-বি-ঈ। আমার বাবার দেওয়া নাম। আমি একটুও চাই না। আই হেট পল্লবী। আয়নার সামনে দাঁড়ালেও রেশমি নয়, আমি পল্লবীকে দেখতে পাই। হোয়াই? ভীষণ ভীষণ ঘেন্না করি ওকে ...

সত্যি সত্যিই আর ভাল্লাগছে না। আমি এত কিছু দেখতে পাই আর কেউ তা দেখতে পায় না কেন? এই তো কাল সকালে পাশের ফ্ল্যাটের কুকুরটা হঠাৎ দেয়াল ভেদ করে আমার ঘরে চলে এল। বিছানায় উঠে আমার মুখ শুঁকল, তারপর বুক চেটে দিয়ে পা তুলে আমার গায়ে আচমকা হিসি করে দিয়ে আবার দেয়াল ফেঁড়ে ওই দিকে চলে গেল। সত্যি সত্যিই হল, কিন্তু আমি ছাড়া আর কেউ দেখল না। এত ভয় করছিল আমার যে গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছিল না। আর ভয় পেতে ভালো লাগছে না আমার। ভা-ল-লা-গ-ছে-না-আ। আমার দেয়াল ঘড়িটায় বেল পড়ল বারোটার। এবার আমি যাব। চলে যাব। খুব আনন্দ হচ্ছে। পল্লবী রায়কে আমি নিজে হাতে খুন করব। উহ! ব্যালকনির দরজাটা খোলা রেখে ঘরে ঢুকলাম। ইচ্ছে করে খোলা রাখলাম। আমি দেখতে পেয়েছি, গাছের ভেতর থেকে একজোড়া চোখ আমাকে দেখছে। খাটের ওপর রাখা একটা বহু পুরোনো শাড়ি। আমার মায়ের। কোনোদিন পরিনি। আজ বার করেছি। টুলটা টেনে নিয়ে সিলিং ফ্যানের সামনে এনে রাখলাম। তারপর শাড়িটা পাকিয়ে ফ্যানের দিকে ছুড়ে দিলাম। দুটো ধারকে একসঙ্গে করে বিনুনির মতো পাকিয়ে দড়ি বানালাম শাড়িটাকে। বারোটা দুই বাজে। খুব শীত করছে আমার। শাড়ির প্রান্তটা গলায় পেঁচিয়ে আমি ব্যালকনির খোলা দরজাটার দিকে মুখ করে তাকাতেই ভীষণ শিউরে উঠলাম। ও কী, সামনে বটগাছটায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে কেন! আকাশ ছুঁয়ে যাচ্ছে আগুন আর পাখিগুলো অন্ধকারে এলোপাথাড়ি উড়ে পালাতে গিয়ে আগুনে পুড়ে মরছে। পট পট করে শব্দ হচ্ছে ওদের পুড়ে যাওয়ার। বাসাগুলো পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। ছাই হয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রিয়াঙ্কা, মানসী, কেয়াও পাখির মতো ডানা ঝাপটাচ্ছে। ডানায় আগুন লেগে মুখ থুবড়ে পড়ছে দাউ দাউ গাছটার মধ্যে। আর ... আর ... চোখ বন্ধ করে পায়ের নীচের টুলটাকে ঠেলে ফেলে দেওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে আমি দেখতে পেলাম জ্বলন্ত গাছটার কোটরে উনুনে গোঁজা পাটকাঠির মতো দুটো পা।

শারদীয় প্রতিদিন

অধ্যায় ২৫ / ২৫
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%