বিনোদ ঘোষাল
সময় করে একদিন চলে আসিস। ভালো লাগবে। বারো বছর পর। একটু আগে আমাকে এই কথাটা বলে গেল শুভময়। সেই শুভময় দত্ত যে একটা সময় বছরের পর বছর আমাদের বিষ্ণুর পঞ্চম অবতার নামে পরিচিত ছিল। মানে বামন অবতার। কারণ শুভময়ের হাইট ছিল চার ফুট আট ইঞ্চি। পুরো বারো বছরের গ্যাপ দিয়ে আমি আর শুভময় কলেজস্ট্রিটের কফিহাউজে চিকেন কাটলেট আর কফি নিয়ে ঝাড়া দেড়ঘণ্টা আড্ডা দিলাম। বিল আমি দিতে গেছিলাম। ও দিতে দিল না। বলল, তোকে আমি আইডেন্টিফাই করেছি। সুতরাং আজকের দায়িত্বটাও আমার। বিল মিটিয়ে শুভময় যাওয়ার আগে বলে গেল, সময় করে একদিন চলে আসিস। ভালো লাগবে।
ও চলে যাওয়ার পরেও অ্যাস্টেতে ওর নিভিয়ে যাওয়া সিগারেট থেকে ধোঁয়া উঠছিল। আমারটা এখনও হাতে। আরও দুটো-তিনটে টান দেওয়ার পরে ফেলব। আমি একা বসে শুভময়ের কথা ভাবতে শুরু করলাম। আর সেই সঙ্গে ভাবলাম আমি সত্যিই একদিন যাব। ভাবনাটা খুব বেশি এগোল না। কারণ ভাবনা শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার সামনের ফাঁকা চেয়ারগুলো টাপাটপ ভরতি হয়ে গেল। অর্ণব আমাকে বলল, কী স্যার এত কী ভাবছেন?
আমার এইসময়ের বন্ধুবান্ধবরা আমাকে স্যার বলে ডাকে। কারণ আমি একটি কলেজে পার্ট টাইম পড়াই। পিএইচডি কমপ্লিট করে, নেট কোয়ালিফাই করে পার্ট টাইম করি এবং কবে কমিশনের ডাক পাব সেই আশায় দিন গুনি। সঙ্গে আরও একটা কাজ করি শখে। কয়েকজন বন্ধুবান্ধব মিলে নিজেদের টাকায় একটা লিটল ম্যাগ। নাম ফল্গু। প্রতি শনিবার এই কফি হাউসে আমাদের ম্যাগ নিয়ে মিটিং বসে। আজ শনিবার।
আমি বললাম, আজ বারো বছর পর আমার এক বন্ধুর সঙ্গে হঠাৎ দেখা হল।
কোথায় সে?
তোরা আসার দু-মিনিট আগেই চলে গেল।
সাত্যকি ফুট কাটল ভাগ্যিস বারো বছর। কুড়ি হয়ে গেলে আর হত না।
কেন?
আরে কবির বাণী ভাই, কুড়ি বছর পরে তোমারে নাই মনে। সিম্পল কেস।
সবাই সামান্য হেসে ওঠার পরে সাত্যকি জিজ্ঞেস করল? তা ছোটোবেলার বন্ধু নাকি?
হ্যাঁ, সংক্ষেপে উত্তর দিলাম আমি। আমাদের পাড়ার বন্ধু ছিল। এক স্কুল এক ক্লাস। একটা সময় আমরা সবাই ভাবতাম শুভময় বড়ো হয়ে আমাদের বন্ধুদের, গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করবে।
কারণ? প্রশ্ন ছুঁড়ল বিপ্রতীপ।
কারণ শুভময় ছিল আমাদের ব্যাচের মধ্যে এক্সট্রা অর্ডিনারি। অসামান্য অভিনয় প্রতিভা ছিল ওর মধ্যে। পাড়ার যাত্রা-থিয়েটার, একাঙ্ক সব কিছুতে শুভময় মাস্ট। যে কোনো রোলে ফাটাফাটি অভিনয় করত। কিন্তু একটু খ্যাপাটে আর রগচটা ছিল বলে বেশিদিন আরও সঙ্গে বনত না। আরও একটা মেজর সমস্যা ছিল ওর হাইট। যথেষ্ট বেঁটে। সেই কারণে ওর মধ্যে একটা কমপ্লেক্সও ছিল। অনেক রোলই ও জাস্ট হাইটের কারণে পেত না। তাই শুভময়ের ইচ্ছে ছিল ও নির্দেশক হবে। নাট্য নির্দেশক। নিজে নাটকও লিখেছিল কয়েকটা।
বাহ তারপর?
তারপর কলকাতায় একটা নামকরা নাট্যগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হল। কিছুদিন পরে শুনেছিলাম সেই গোষ্ঠীর ডিরেক্টরের সঙ্গে তুমুল ক্যাচাল বাঁধিয়ে ফেলেছিল।
মানে ঝগড়া?
না শুধু ঝগড়া নয়, কেসটা নাকি হাতাহাতি পর্যন্ত চলে গেছিল। এবং শুভময় সেই নামকরা ডিরেক্টরের গালে সর্বসমক্ষে সাঁটিয়ে একটি থাপ্পড় মেরে গায়ে থুতুও দিয়েছিল।
সর্বনাশ। কারণ?
কারণটা জেনেছি অবশ্য অনেক পরে। শুভময়ের মুখেই। ওর বক্তব্য ছিল সেই নির্দেশক নাকি অভিনয়ের কিছু না বুঝে ভুলভাল শেখাতেন এবং গ্রুপের সকলকে সেইরকম করতে বাধ্য করতেন। দ্য গ্রেট ডিক্টেটর আর কি। এবং শুভময় প্রথম প্রতিবাদ জানাতে ঝামেলার সূচনা।
ফলশ্রুতি?
কলকাতার নাট্যমহলে শুভময়ের ধোপা-নাপিত বন্ধ হয়ে যাওয়া। এবং খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন।
এবং অভিনয়-নির্দেশনা জীবনের যবনিকা পতন।
হ্যাঁ সেটা বলতে পারিস। কারণ তারপর থেকে শুভময় আর কোনোদিন অভিনয় করেনি। তবে আমরা পুরোনো বন্ধুরা যোগাযোগ রাখতাম। মাঝেমধ্যেই যেতাম ওর বাড়ি। কিন্তু শেষদিকে যেতে ইচ্ছে করত না। কারণ আমরা বুঝতে পারছিলাম শুভময় অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে। সিনিক, খানিকটা সাইকো। ও গ্রাম ছেড়ে আচমকা একদিন চলে যাওয়ার আগে আমাদের বেশ কয়েকবার বলেছিল, শালা পুরো নিজের একটা পৃথিবী বানাব। সব আমার পায়ে গড়াগড়ি খাবে। সবকটাকে ইচ্ছেমতো লাথি মারব। ওর কথাগুলোর আমার এতদিন পরেও মনে রয়েছে। নিজেই কিছুটা চমকে গেলাম আমি।
ইন্টারেস্টিং। তারপর কী হল? ব্ল্যাক কফিতে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করল অর্ণব।
তারপর একদিন কাউকে কিছু না বলে গ্রাম ছেড়ে চলে গেল একদিন। কিছুদিন পর আমরা ভুলে গেলাম ওকে। আজ বারো বছর পর দেখা হল ওর সঙ্গে একটা পুরোনো বইয়ের স্টলে। আমি চিনতে পারিনি। ওই আইডেন্টিফাই করল।
কোথায় থাকে এখন?
খন্যান।
কী করে কিছু বলল?
হুঁ বলল। নার্সারি চালায় একটা।
মানে স্কুল?
না না গাছের নার্সারি।
হুম, গাছগাছড়ার বিজনেস।
যাহ শালা নাটক ছেড়ে গাছ! হেব্বি ইন্টারেস্টিং ক্যারেকটার তো।
হ্যাঁ তা ঠিক। আমাকে যেতেও বলে গেছে ওর বাড়িতে। বলল, আয় মজা পাবি। ঠিকানা, ফোন নাম্বার দিয়ে গেল।
তাহলে যা ঘুরে আয় একদিন। ইন্টারেস্টিং কিছু পেলে আমাদের ম্যাগের কভার স্টোরি হয়ে যেতে পারে। বলল সাত্যকি।
বলছিস? সিগারেট ধরিয়ে খানিকটা অন্যমনস্ক হয়েই বললাম আমি।
অফকোর্স। দেখ কোনো বিকল্প পৃথিবী সত্যি সত্যিই বানিয়ে ফেলেছে হয়তো।
প্রায় ঘণ্টাদেড়েক হয়ে গেল আমি শুভময়ের পেছন পেছন ঘুরছি আর ও ক্রমাগত বলে যাচ্ছে এই দেখ এইগুলোকে বলে ব্রুম, ছাতার মতো দেখতে হয়, আর এগুলো হল রুট ওভার রক। আর এটা রুট এক্সপোজ। শিকড়গুলো কেমন মাটির ওপর বেরিয়ে ছড়িয়ে রয়েছে দেখেছিস। এটা মালটিট্রাঙ্ক, ওটা ইনফরমান অ্যাব্রাইট।
শক্ত শক্ত নামগুলো শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত হয়ে উঠছি সেটা একসময় খেয়াল করল শুভময়। বলল, হাঁপিয়ে পড়ছিস, না রে? স্বাভাবিক। দুজনেই চল্লিশ বছর পার করে ফেললাম প্রায়। চল এবার একটু বসবি চল।
হ্যাঁ, তাই চল। আমি এককথায় রাজি হলাম।
আসলে হাওড়া থেকে সেই ভোরবেলার ট্রেন ধরে খন্যান নেমেছি। তারপর রিকশায় মাইল দেড়েক পার করে পাগলা বসুর বাগান। হ্যাঁ রিকশায় উঠে এই নামটাই বলতে বলেছিল শুভময়। এই এলাকায় শুভময় বসু যে পাগলা বসু নামে পরিচিত হয়েছে সেটা আমার বুঝতে অসুবিধা হয়নি। শুভময় যে বিয়ে করেনি সেটা আগের দিন জেনেছিলাম। কিন্তু ওর সংসার যে এত বড়ো সেটা ভাবতে পারিনি। প্রায় দেড় বিঘা জমির ওপর পাঁচিলে ঘেরা শুভময়ের নার্সারি। আর নার্সারি জুড়ে শুধুই গাছ আর গাছ। না, নর্মাল গাছ নয়। সব বামন। বনসাই। বাগানটায় ঢোকার কিছুক্ষণ পরে কখন যেন ঘোর লেগে গেছিল আমার। ঝুড়ি নামা বট গাছ কিংবা হিজল অথবা আস্ত একটা বাঁশ ঝাড় যখন আমার হাঁটুর নীচেই শেষ তখন ঘোর লাগাটা কিছু অস্বাভাবিক নয়। সেই সঙ্গে শুভময়ের ক্রমাগত নেপথ্য ভাষণ, কীরে নিজেকে গ্যালিভার মনে হচ্ছে না? সব কেমন তোর পায়ের নীচে লুটোপুটি খাচ্ছে দেখ। এই যে এই যে বটগাছটাকে দেখ। শালা কত ঝুড়ি নেমেছে দেখেছিস। কম বয়েস না কিন্তু। নর্মাল হলে এদ্দিনে তোকে ঘাড় উঁচু করে দেখতে হত মালটাকে। আমি কেমন হাঁটুর তলায় রেখে দিয়েছি দেখেছিস।
তবে গ্যালিভার নয় আমার কেমন যেন গর্জিলা কিংবা কিংকং-এর মতো মনে হচ্ছিল। সত্যি মনে হচ্ছিল আমি বিশাল বিশাল বড়ো হয়ে গেছি। আমার মাথা আকাশ ছুঁচ্ছে। আচমকা এতটা বড়ো হয়ে যাওয়ায় আমার ভয় করতে শুরু করেছিল। ছিকছিকে একটা অজানা ভয়। না আসলেই ভালো হত বোধহয়।
ইচ্ছে মতো ঘুরি বুঝলি, এই বাগানের আমিই রাজা। কে কেমন হবে, কার কত সাইজ হবে স-ব আমি ঠিক করি। বারান্দায় বসে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল শুভময়।
সত্যি বলতে আমার কেমন যেন একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। না, বনসাই বাগান দেখে নয়, যদিও এটা সত্যি যে এত বড়ো শুধু বনসাই গাছের বাগান আমি এযাবৎ দেখিনি, কিন্তু বনসাই গাছ তো দেখেছি। আসলে শুভময়ের আচরণ, ওর কথাবার্তা আমার কেমন যেন মনে হচ্ছিল। ঠিক প্রকৃতস্থ নয়।
তুই কী করিস? শুধু বাগান বানাস? মানে রোজগারপাতি ...
আরে এটাই তো আমার রোজগার বস। বাড়ি ছেড়ে তো চলে এলাম। কী করি কী করি ভাবছি। তবে ঠিক করে নিয়েছিলাম এমন কিছু করব যেখানে সব বিগ বসেরা আমার পা চাটবে পা। ঘাড় উঁচু করে দেখবে এই পাঁচফুটের শুভময় বোসকে। কিন্তু অনেক ভেবে দেখলাম মানুষকে বসে আনা খুব কঠিন বুঝলি। কারণ মানুষ প্রতিবাদ করতে জানে, চিৎকার করতে জানে। এই যেমন আমি, কোনোদিন নিজের মতের বিরুদ্ধে কিস্যু মেনে নিইনি বাওয়া। হুঁ হুঁ। তাহলে? ... তাহলে হঠাৎ একদিন মনে এল, শাল্লা গাছ। ইয়েস গাছ। বলে চায়ে কাপটা ঠকাস করে বলল কোনো ট্যাঁ ফো নেই। যা খুশি কর একবারের জন্যও তোমার দিকে আঙুল তুলবে না। বলবে না তুমি আমার সঙ্গে অন্যায় করছ। শুধু চুপ করে মেনে নিতে জানে শালারা। আর কিস্যু পারে না। ব্যাস লেগে পড়লাম।
শুনেছি খুব খাটনি এই বনসাইয়ের কাজে।
হ্যাঁ ঠিকই শুনেছিস। খুব খাটনি। বনসাইয়ের মাটি বানানো বহুৎ ঝক্কির কাজ। মাটিতে হাড়ের গুঁড়ো কিংবা ইটের গুঁড়োর পরিমাণ একটু এদিক-ওদিক হলেই গাছ পুরো ভোগে। তারপর ধর তুই একটা গাছকে কেমন শেপ দিতে চাইছিস সেইভাবে আগে থেকেই তারজালি দিয়ে জড়িয়ে রাখা, আবার ওই জালির মধ্যে দিয়ে যেন গ্রোথ না থামে সেটা খেয়াল রাখা। অনেক ব্যাপার রয়েছে। ট্রিম করাটা বেশ তুলি চালানোর মতোই সূক্ষ্ম কাজ বুঝলি। কারণ ও কতটা ডালপালা ছড়াবে, কীভাবে ছড়াবে সেটা ওরা নয়, আমি ঠিক করি তো। কঠিন কাজ তবে এখন অভ্যেস হয়ে গেছে। হে হে ওই পাঁঠাকে খাসি করার মতো আর কি। খুব কঠিন অথচ ভীষণ সোজা।
আমি খেয়াল করছিলাম শুভময় যখন এইসব কথাগুলো বলছিল তখন বারবার মেঝেতে থুতু ফেলছিল। এই স্বভাবটা ওর ছিল না। চিকিৎ চিকিৎ করে কথায় কথায় থুতু ফেলা। এর আগে যেদিন কলেজস্ট্রিটে দেখা হয়েছিল সেদিনও রাস্তায় ঠিক এইভাবে থুতু ফেলছিল।
আচ্ছা শুভময় আমি শুনেছি একেকটা বনসাই গাছের নাকি একশো সোয়াশো বছরও বয়েস হয়।
হতে পারে, তবে আমার কাছে নেই।
তোর কাছে যে কয়েকটা বট গাছ দেখলাম সেগুলোর তো ঝুড়ি নেমে গেছে ওগুলোর তাহলে ...
আমার মুখের কথা থামিয়ে নিয়ে খিক হিক করে হেসে উঠল, তুইকি ভেবেছিস ওগুলোর অনেক বয়স। ধুর পাগল। ম্যাক্সিমাম সাত থেকে আট।
এর মধ্যেই ঝুড়ি নেমে গেছে!
এক ধরনের হরমোন পাওয়া যায় বুঝলি। খুব ভারী গলায় বলল ও। সেগুলো গাছে দিলে হুড়মুড় করে বয়েস বাড়তে থাকে ওদের। সাত-আট বছরের মধ্যেই পুরো বুড়ো হাবড়া হে: হে: হে: ঝুড়িটুড়ি নেমে একাকার। ভাব এমন একটা হরমোন যদি মানুষকে ... হি: হি: হি: পাঁচ বছরের মধ্যেই খেল খতম। বলে আবার চিক করে থুতু ফেলল।
আমি এবার বলেই ফেললাম। আমি এবার ফিরব রে শুভময়।
সে কি কেন? রাত্রে থেকে যা।
না না কাল সকালে ক্লাস রয়েছে।
আরে রাখ তোর ক্লাস। আমি জানি তুই কিন্তু থাকবি বলেই এসেছিস। থেকে যা থেকে যা। একটা রাত্তির থাকলে কিছু হবে না। ভালো স্কচ রয়েছে।
আমি কী বলব ভেবে পেলাম না। কিন্তু পরিবেশটা আমার একটুও ভালো লাগছিল না। বারবার মনে হচ্ছিল অন্য কোনো পৃথিবীতে এসে পড়েছি।
জানিস একসময় রাজা-রাজরারা তাদের ক্রিতদাসদের ছেলেমেয়েদের জন্মের পর থেকেই নাকি হাঁড়িতে ভরে রাখত সারাক্ষণ, যাতে আকারে বাড়তে না পারে। সব বামন তৈরি হত সেগুলো। তারপর সেগুলোর বয়েস বাড়লে তাদের দিয়ে ফাইফরমাশ খাটাত। কেন জানিস?
আমার উত্তর দেওয়ার সময় দিল না শুভময়। নিজেই বলে উঠল, কারণ বামনণা বিপ্লব করতে পারে না। আজ পর্যন্ত ইতিহাসে কখনও শুনবি না যে ডোয়ার্ফরা কোনো বিপ্লব করেছে। সাহিত্যেও করেনি। তারা শুধু জোকার হতে পারে আর কিছু না। বাট ইট কান্ট বি নো লংগার।
তুই কী চাস শুভময়? প্রশ্নটা করেই ফেললাম ওকে।
নাথিং। কিছু চাই না আর। যা চাওয়ার পেয়ে গেছি আমি। গাছ বেচে ভালো রোজগার করি। বনসাইপ্রিয় মানুষের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে অর্ক। সবাই কিনছে।
কেন?
অ্যাকোরিয়ামে হাঙর কিংবা পিরানহা মাছ পোষে যে কারণে। একটা অদ্ভুত রোমাঞ্চ হয়। তোর ঘরের মধ্যেই সাক্ষাৎ একটা ভয়ংকর প্রাণী তোরই আশ্রয়ে রয়েছে। ঘুরছে ফিরছে নিশ্বাস নিচ্ছে তোর দয়ার জলে, খাদ্যে। ব্যাপারটা কেমন থ্রিলিং না। আরে সহজ কথা হল যা তোর থেকে অনেক বড়ো, অনেক বেশি ক্ষমতাশালী তাকে অসহায় বানিয়ে এমনিভাবে মুঠোয় আনাটাই তো মানুষের সভ্যতার ইতিহাস।
এমনভাবে টানা কথাগুলো বলে গেল যেন আমি অভিনেতার মুখস্থ করা ডায়লগ শুনছি। আমি ওকে এমন সব কথা থেকে বিরত করার জন্যই বললাম, নাটক আর করিস না? ছেড়েই দিলি?
না ব্রাদার। প্রতিদিন রিহার্সাল হয়। স্টেজ হয়। শোও হবে একদিন। এন্ড আই ইউল বি দ্য ডিরেক্টর দ্য শো।
কিসের নাটক আর কিসের রিহার্সাল আমি আর জিজ্ঞেস করলাম না। ভালোয় ভালোয় রাতটা পার করে কেটে পড়তে পারলে বাঁচি। কী কুক্ষনে যে এসেছিলাম। এ শালা পুরো পাগল হয়ে গেছে। কথাবার্তাও একেবারে নাটুকে সংলাপের মতো।
সামনে পূর্ণিমা নাকি রে?
হুঁ। সংক্ষেপে উত্তর দিল শুভময়।
এখন রাত্তির সাড়ে নটা। শুভময়ের বাগান, বাড়ির সামনের লন। বারান্দা, আর পাঁচিলের বাইরের লম্বা লম্বা নারকেল গাছগুলো চাঁদের আলোয় পুরো ভেসে যাচ্ছে। আমাদের দুজনেরই চার পেগ চলছে। সঙ্গে আলুর চপ।
কলকাতায় পূর্ণিমা বোঝা যায় না। বললাম আমি। আমি মাঝে মাঝে ড্রিঙ্ক করলেও পরিমাণ খুব অল্প। কিন্তু আজ এমন একটা পরিবেশের মধ্যে বসে মদ খেতে ভালো লাগছিল।
কলকাতায় বসে কিছু বোঝা যায় না। এই যেমন তুই কি কলকাতায় থেকে কোনোদিন ভাবতে পারতিস যে তোর ছোটোবেলার বন্ধু দ্য গ্রেট শুভময় বোস যাকে সবাই বামন অবতার বলে টিটকিরি দিত সে একটা আস্ত পাগলছাগল হয়ে গেছে। না না তুই লজ্জা না পেয়েই বল ... পারতিস ভাবতে? টেনে টেনে বলল শুভময়।
আমারও যে কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। টের পাচ্ছিলাম। বললাম, তোকে এখানে সবাই পাগলা বসু বলে চেনে হে: হে: বলে গ্লাসে চুমুক দিলাম আমি।
ইয়েস পাগলা বসু। আই নো। দে সে বিকজ দে নো আয়্যাম আ জিনিয়াস। ইয়েস আ জিনিয়াস। এন্ড পাগল ছাড়া কেউ বিপ্লব করে না ভাই।
তুই কি বিপ্লব করছিস?
ইয়েস। কেন তোর সন্দেহ আছে? ফুল মহড়া চলছে। যেদিন বুঝব প্রত্যেকে প্রস্তুত পুরো ঝাঁপিয়ে পড়ব একসঙ্গে।
কিছু মনে করিস না মাইরি তুই আগেই হাফ ছিটিয়ালি ছিলি এখন ফুল হয়ে গেছিস। শালা খন্যানের গ্রামের বসে কিসের বিপ্লবের মহড়া মারাচ্ছিস তুই? মুখ খুলে ফেলাম আমি। সকাল থেকে ওর একটানা বাতেলা আর সহ্য হচ্ছিল না।
আমার এমন কথায় থমকাল শুভময়। কয়েক মিনিট চুপ থাকল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, বনসাইয়ের ইতিহাস কত বছরের জানিস অর্ক? দু-হাজার বছরের। ইয়েস, টু থাউজেন্ড বছর ধরে মানুষ এইসব প্রকাণ্ড বৃক্ষগুলোকে নিজেদের আনন্দের জন্য বামন বানিয়ে রেখেছে। জানিস অর্ক আমার বাগানের গাছগুলো যখন পাঁচিলের বাইরের ওই লম্বা লম্বা গাছগুলোকে দেখে ওরা কী চিৎকার করে কাঁদে তুই ভাবতে পারবি না। আমি শুনতে পাই। কোনো পাখি এসে বসে না ওদের ডালে, একটা বাসাও তৈরি করে না। কারণ ওরা বামন, ঝড়ে ওদের মাথা দোলে না কারণ ওরা বনসাই। কী কষ্ট তুই যদি দেখতিস ... বলে একদলা থুতু থকাস করে ফেলল শুভময়।
শুভময়ের ভয়েজ মড্যুলেশন সমেত সংলাপ শুনে আমি বললাম, বড়ো বড়ো জ্ঞান ঝাড়ছিস তুই নিজেও তো শালা ...
মিথ্যে কথা বলেছি তোকে। পুরো মিথ্যে বলেছি। আমি বনসাই বানাই না। শুধু কিনি। এখান থেকে ওখান থেকে যেখানে পারি সেখান থেকে কিনি।
কিনিস! চমকে উঠলাম আমি। কেন?
কিনে রিহার্সাল দিই। রোজ রাত্রে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে আমি রিহার্সাল দিই ওদের নিয়ে। যখন দেখি সব শিখিয়ে ফেলতে পেরেছি ওদের তখন বিক্রি করে দিই। সেই টাকায় আবার নতুন বনসাই কিনি। আবার তাদের শেখাই। একদিন সবাইকে যখন আমার মন্ত্রটা শিখিয়ে দিতে পারব সেদিন প্রথম শো হবে গোটা পৃথিবী জুড়ে।
আমি কী বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না।
আমি উঠলাম অর্ক। রিহার্সালের টাইম পেরিয়ে যাচ্ছে। টেবিলে খাবার রয়েছে। খেয়ে নিস। বলে উঠে দাঁড়াল শুভময়। টেবিলে ফাঁকা গ্লাস রেখে টলমল করতে এগিয়ে গেল লন বেয়ে ওর বাগানের দিকে। আর অনভ্যাসের চারপেগ পেটে নিয়ে চাঁদের আলোয় আমি স্পষ্ট দেখলাম শুভময় বসু নামের একটা নারকেল গাছের মতো লম্বা মানুষ সাদা পাঞ্জাবি পাজামা পরে কিংকং-এর মতো পা ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে ওর বাগানের দিকে। আর তুমুল একটা অদ্ভুত শব্দের শোরগোল তৈরি হচ্ছে বাগানের ভেতরে। শব্দটা বাড়তে থাকছে। আর আকাশের চাঁদ তার সমস্ত আলো নিয়ে স্পটলাইট হয়ে ঠিক সেই বাগানের ওপর।
ছুটি, সংবাদ প্রতিদিন
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন