ইছামতী

বিনোদ ঘোষাল

পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই এখনও সুখী। কথাগুলো বলতে গিয়ে হলদেটে দাঁতগুলো আরও যেন বড়ো হয়ে উঠল অরুণের।

তোর এটা মনে হয়?

ইয়েস।

তোর এটা কেন মনে হয়? তুই কি দীর্ঘকাল বাড়ির বাইরে বেরোস না?

আমাকে দেখে কি তোর কোনোভাবে মনে হয় সে কথা?

এরপর কী উত্তর দেব আমি বুঝে পেলাম না।

আমি যেটা বলছি সেটাই ট্টু এবং সেই সুখী মানুষদের মধ্যে তুইও পড়িস। কথাগুলো এমনভাবে বলল অরুণ যেন এক মুহূর্তের জন্য মনে হল আমি খুব সুখী এবং সেই কারণে অরুণের কাছে অপরাধী। আমি খুব দ্রুত এই বোধটা কাটিয়ে উঠলাম। এবং অরুণকে পালটা প্রশ্ন ছুড়লাম, বেশ আমি যদি তোর কথা অনুযায়ী মেনে নিই যে আমি পৃথিবীর অন্যতম একজন সুখী মানুষ, তাতে অপরাধটা কোথায়?

নাহ ... অপরাধের কথা তো আমি বলিনি। আমি জাস্ট ফ্যাক্ট বললাম। বাট আমি সুখে নেই। বলে সেই পুরোনো স্টাইলে টেবিল চাপড়ে অরুণ বলল, বাই দ্য ওয়ে, তুই কি সিগারেট খাস? তাহলে আমাকে একটা দিতে পারিস।

আমি সামান্য হেসে ডেস্কের ড্রয়ার টেনে সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটারটর ওর দিকে বাড়িয়ে দিলাম।

অরুণ ক্লাসিকের প্যাকেটটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। তারপর খোঁচা খোঁচা লালচে গোঁফ-দাড়ির ফাঁক দিয়ে হেসে বলল, ক্লাসিক! সুখী মানুষদের অন্যতম ব্র্যান্ড। প্যাকেট খুলে একটা সিগারেট বার করে ধরিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বলল, বড্ড লাইট। আমি এখনও হরিবোল টানি বুঝলি।

হরিবোল মানে ফিলটারলেস চারমিনার?

ইয়েস। তোর এখনও মনে রয়েছে দেখছি টার্মটা।

না থাকার কী আছে? ওটাও মনে আছে কলেজে চার্মিনারের এমন নামকরণ তুইই করেছিলি।

থ্যাঙ্কস। বলে সিগারেটে আবার একটা টান দিয়ে চুপ থাকল অরুণ।

আমি একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলাম অরুণের দিকে। অনেকদিন পর দেখা হল ওর সঙ্গে। আগেও যেমন খানিকটা পাগলাটে ছিল, এখনও তেমনিই। বরং আগের থেকে একটু বেশিই মনে হচ্ছে।

কী ভাবছিস? হঠাৎ এতদিন পর কেন এসে উদয় হলাম তোর কাছে? উদ্দেশ্যটা কী হতে পারে, তাই না?

ওর কাছে সত্যি কথা লুকিয়ে কোনো লাভ নেই আমার। তাই স্পষ্টই বললাম, হুম. তা খানিকটা ভাবছি বই-কি।

শুনে খুক খুক করে হাসল অরুণ। বলল, খুব স্বাভাবিক। আমাদের মধ্যে অন্তত ছ-সাত বছর দেখা হয়নি। তাই না?

হতে পারে। তবে সময়টা অনেকটাই দীর্ঘ। বলে আমি আবার অরুণের দিকে তাকালাম। ও কী কারণে এসেছে হয়তো এবার বলবে।

আচ্ছা পুষ্কর তোর কি মনে হয় আমি একজন সুখী মানুষ? অ্যাপারেন্টলি আমাকে দেখে যা তোর মনে হচ্ছে তাই-ই বলবি।

আমি ডেস্কের ওপর রাখা ময়লা রংচটা পাঞ্জাবির হাতার ভিতর থেকে গাছের শুকনো মরা ডালের মতো বেরিয়ে আসা অরুণের হাত দুটোর দিকে তাকালাম। প্রশাখার মতো ওর আঙুলগুলোর হলদেটে বড়ো বড়ো নখে কালো ময়লা জমে রয়েছে। ওর তোবড়ানো গাল, আধ ইঞ্চি গর্তে ঢোকা ড্যাবড্যাবে চোখ, অযত্নের শুকনো একমাথা চুল দেখে নিয়ে ঠোঁট চেটে ধীরে সুস্থে বললাম, দেখ এভাবে কোনও মানুষকে বাইরে থেকে দেখে তো চট করে বলা যায় না যে সুখী না অসুখী।

আমি জানতাম তুইও উত্তর দিতে ভয় পাবি। মুচকি হেসে বলল অরুণ। অথচ আমি জানি যে তুই আমাকে দেখে আন্দাজ করতে পারছিস যে আমি সুখে নেই।

এবার আমি একটা চেয়ারে সোজা হয়ে বসলাম। বুঝতে শুরু করেছিলাম যে অরুণের বেশ খানিকটা মাথার স্ক্রু ঢিলে হয়েছে। গলা খাঁকরে বললাম, তুই কী বলতে চাইছিস বল!

তুই কি বিরক্ত হচ্ছিস? চলে যাব? বলে সিগারেটটা অ্যাসট্রেতে নিবিয়ে দিল।

না। তবে জানতে চাইছি।

বেশ তাহলে দেখ, বলে হঠাৎ পাঞ্জাবির বুকের বোতামগুলো পটাপট খুলে দিয়ে আমাকে বুকটা দেখিয়ে বলল কিছু বুঝতে পারছিস?

আমি হতভম্ব। এসবের মানে কী? অরুণের বুকের মধ্যে পাঁচ-ছটা লোম আর চামড়া ঢাকা ছ-সাতটা পাঁজর ছাড়া আমি আর কিছু দেখতে পেলাম না

বুঝলি কিছু?

আমি উত্তর না দিয়ে ঘড়ি দেখলাম। বিকেল সাড়ে চারটে বাজে। পৌনে চারটে নাগাদ অরুণ এসেছে।

আমার আর ওর সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগছে না। বললাম, এই অরুণ ...

আমার কথা শেষ না হতে দিয়ে অরুণ বলল, আমার বুকের ভিতর আর কোনো ভালোবাসা নেই রে পুষ্কর। আমি ফিনিশ।

এমন একটা কথায় আমি একটু চমকে উঠলাম। তারপর হঠাৎ জিজ্ঞেস করে ফেললাম ইছামতী ... ও কেমন আছে? অনেকদিন পর ইছামতী নামটা উচ্চারণ করলাম আমি।

ভালো নেই। ও ভালো নেই। নিজের মনেই যেন বিড়বিড় করে উঠল অরুণ। আমি আর ভালোবাসতে পারি না। ও-ও পারে না। কথাগুলো বলে হঠাৎ আমার হাতদুটো চেপে ধরল অরুণ। তুই তো এককালে ইছাকে ভালোবাসতিস। তাই তোর কাছে এলাম।

আমি কোনো উত্তর দিলাম না। শুধু ওর মুঠোয় ধরা আমার আঙুলগুলো একটু শিরশির করে উঠল।

এখন হয়তো আর বাসিস না। কিন্তু আরেকবার চেষ্টা করবি?

মানে! আমি চমকে উঠে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিলাম। কী উলটো-পালটা বলছিস অরুণ! তোর মাথার ঠিক নেই। তুই ওঠ এবার।

মাইরি বলছি পুষ্কর। আমার ইছামতী ভালোবাসা ছাড়া মরে যাচ্ছে। তুই জানিস না নদী ভালোবাসা ছাড়া শুকিয়ে যায়। আমার ইছামতীও ... ওকে বাঁচা।

আমি! আমি কী করে ...

তুই ওকে ভালোবাস। তুই সুখী মানুষ। তুই পারবি। আমি ছাড়া আর কেউ জানবে না। প্লিজ পুষ্কর। ভালোবাসা ছাড়া ইচ্ছা মারা যাচ্ছে।

তুই এখন ওঠ অরুণ। আমার অনেক কাজ রয়েছে। আর পারলে একটা ডাক্তার দেখা।

অরুণ আমার কথায় উত্তর না দিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল আমার দিকে। তারপর হেরে যাওয়ার হাসি হেসে বলল, ভালোবাসার ভ্রুণ কোনোদিন মরে না রে। খুঁজে দেখিস এখনও তোর মধ্যে কোথাও ইছামতী বসে রয়েছে। বলে উঠে দাঁড়াল। তারপর আবার ঝপ করে বসে বলল, একটা কাগজের টুকরো আর পেন দিবি?

আমি এগিয়ে দিলাম। যত তাড়াতাড়ি বিদায় করা যায় ততই মঙ্গল। অরুণ খস খস করে কিছু লিখল। তারপর আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, এখানে আমার ঠিকানা আর ফোন নাম্বার লিখে দিলাম। পারলে আসিস। আমি অপেক্ষা করব। খুব বেশি দেরি করিস না। আমি আর বেশিদিন অসুখী থাকব না। পারলে তার আগেই ... আমি এই ব্রাঞ্চে আছি তোকে কে জানাল?

তথাগত। ওর ফ্ল্যাট আমার বাড়ির খুব কাছেই তো।

হুম।

চলি বুঝলি। বলে চলে গেল অরুণ। আর পেছনে তাকাল না।

চলে যাওয়ার পর আমি কাগজের টুকরোটা গুটলি পাকিয়ে ওয়েস্ট পেপার বিন-এ ফেলে দিতে গিয়েও কী খেয়ালে ড্রয়ারের ভিতর ওই গোল্লা পাকানো অবস্থাতেই গড়িয়ে দিলাম।

তারপর মোবাইলে ধরলাম তথাগতকে।

আমি পুষ্কর বসু। নাইনটি টু-র মাধ্যমিক ব্যাচ। একটি সরকারি ব্যাঙ্কের ক্যাশিয়ার। ধর্মতলার ব্রাঞ্চে আছি বছর চারেক হল। মানিকতলার কাছে একটা ফ্ল্যাট কিনেছি। আমার একত্রিশ বছর বয়েসি বউ-এর নাম সাহানা এবং ক্লাস ওয়ানে কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পড়া ছেলের নাম প্রীতম। আমি যদ্দুর জানি আমি এখন মধ্যবিত্ত সুখী মানুষ। ফলে বিশ্বাস করি আমার ছেলে-বউও সুখী। আমার বউ চাকরি করে না। জিওগ্রাফি অনার্স কমপ্লিট করার পর মাস্টার্স করার ইচ্ছে ছিল, বাড়ির সদিচ্ছায় পাত্র চাই পাত্রী চাই দেখে এক গোধূলি লগ্নে আমার সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায়। মাস্টার্স না করতে পারার তেমন কোনো দু:খ আমি এযাবৎ ওর মধ্যে দেখিনি। আর আমি সাইন্স গ্র্যাজুয়েট পাশ কম্পিটিটিভ এগজামে পাশ করা আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল। ব্যাঙ্কে চাকরি পেয়ে আমি লক্ষ্যভেদ করেছি। তারপর দিন থেকে আমি সুখী।

অরুণ আমার ব্যাচমেট। কলেজে ফার্স্ট ইয়ার থেকে ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব। আমার মতো অরুণের অনেক বন্ধু ছিল। অনে-ক। কলেজের জি এস ছিল ও। ছাত্র রাজনীতির অ্যাকটিভ মেম্বার ছিল। ওর সঙ্গে অনেকবার আমাকে বাধ্য হয়ে মিটিং-মিছিলে একসময়ে উপস্থিত থাকতে হয়েছে। ডান কিংবা বাম কোনোপ্রকার রাজনৈতিক মতাদর্শ আমাকে কোনোদিনই টানত না। আমি ওসবে কোনো ইন্টারেস্ট পেতাম না। তবে আমাকে যা টানত, যে কারণে আমি নেহাত অনিচ্ছাতেও অরুণের ডাকে সাড়া দিয়ে অনেক মিটিং-মিছিলে থেকেছি, গলাও মিলিয়েছি, তা হল ইছামতী।

হ্যাঁ, ইছামতী। সাউথ ইন্ডিয়ান নায়িকাদের মতো ভরাট চেহারা। চাপা গায়ের রং। ঝকঝকে দাঁত। টানটান বিনুনি করা ঘন কালো কোমর পর্যন্ত চুল। নেহাত সাধারণ শাড়ি, যার রং মনে থাকে না কারও আর দুই ভুরুর মাঝখানে খুব ছোট্টো তিলের মতো একটা কালো টিপ। এই হল ইছামতী। আমাদের কলেজেই বাংলা অনার্স পড়ত ইছামতী। আর অরুণকে ভালোবাসত। কেন বাসত জানা যায়নি। যেভাবে অনেক কিছুর ব্যাখ্যা হয় না, ঠিক সেইরকম কোনো কারণেই ভালোবাসত। অরুণও বাসত। কলেজে অরুণের নেতৃত্বে যে কোনো মিটিং মিছিলে সব সময় পাশে থাকত ইছামতী। অরুণের সমস্ত দায়িত্ব যেন ও কলেজ থেকেই নিতে শুরু করে দিয়েছিল। বন্ধুরা ইয়ার্কি করে বলত অরুণের বিড়ি-দেশলাইও ইছামতীর কাছে থাকে। অরুণ ছিল একেবারেই ভ্যাদভ্যাদে মিডলক্লাস ফ্যামিলির ছেলে। বরং ইছামতীর বাবা সে তুলনায় রহিস ব্যক্তি ছিলেন। দোতলা বাড়িতে অ্যালসেশিয়ান পুষত ওরা।

ইছামতীকে আমি ভালোবাসতাম। পাগলের মতো ভালোবাসতাম। অনেক দূর থেকে ওর গায়ের, চুলের, শাড়ির আঁচলের গন্ধ পেতাম আমি। ইছামতী হাসলে আনন্দে আমার কান্না পেত। ও গম্ভীর থাকলে আমার ভয় লাগত খুব। শীত শীত করত। ইছামতীর কোমর, শাড়িতে ঢাকা বুক, কাঁধ দেখলে আমি অদৃশ্য দেয়ালে ক্রমাগত মাথা ঠুকতাম রক্ত বের না হওয়া অবধি। অথচ ইছামতী আমাকে বলেছিল, না পুষ্কর, প্লিজ তুমি আমার খুব কাছের বন্ধু। সঙ্গে থেকো।

এইভাবে কেউ না বলতে পারে আমাকে ভাবতে পারিনি। আমি দেখতে শুনতে অরুণের থেকে শতগুণে ভালো সেটা আমিও জানতাম। এছাড়া আমার কেরিয়ারও যে ভবিষ্যতে খুব খারাপ হবে না সেটাও যে কেউ আন্দাজ করতে পারত। অথচ ইছামতী আমাকে না বলেছিল। প্রেমে প্রত্যাখ্যান যে আমার ক্ষেত্রে নতুন তা নয়। বহু ঘটেছে অনেকের সঙ্গেই। তবে আমারটা আমার গায়েই লেগেছিল খুব। নতুন করেই।

অরুণ ছবি আঁকত। সেলফ-টট আর্টিস্ট। খুব আহামরি কিছু আঁকত না। তবে বাড়ির দেয়ালে-পাঁচিলে পার্টির হয়ে চুনকালি দিয়ে বেশ লিখতে পারত। কিন্তু এটা কি কোনো কোয়ালিটির মধ্যে পড়ে?

সব থেকে আশ্চর্য লাগত ইছামতীকে নিয়ে অরুণ কোনোরকম প্রেম প্রেম ভাব করত না। খুব যে একটা সময় দেওয়া-টেওয়া তাও দেখিনি। কিন্তু ইছামতী মাছির মতো অরুণের সঙ্গে সেঁটে থাকত। কলেজে থাকাকালীন আমি অন্তত পনেরোশোবার ইছামতীকে আর ভাবব না ভেবেও পরের দিন ওকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়েছি। কোনো ছুতোয় ওকে একটু ছোঁয়ার সুযোগ খুঁজেছি। অরুণ এসব বুঝতে পারত কি না জানি না। তবে একদিন সব বন্ধুদের মধ্যে হঠাৎ আমাকে পুরো অপদস্থ করে ও বলে উঠেছিল পুষ্কর তো ইছামতীকে খুবই ভালোবাসে।

এর উত্তরে আমি কী বলব বুঝে পাচ্ছিলাম না। ক্যাবলার মতো হেসেছিলাম শুধু। তবে আমি ওদের খারাপ চেয়েছিলাম। সেদিন সন্ধেবেলা চেয়েছিলাম ওদের সম্পর্কটা চুরমার হয়ে যাক।

হয়নি। ঠিক সেদিনই রাত্রে আড্ডা দিয়ে ফেরার পথে হঠাৎ অরুণ আমাকে বলল, আমার জরুরি কাজ আছে, তুই ইছাকে একটু এগিয়ে দিস। বলেই সাইকেল চেপে হাওয়া।

অন্ধকার রাস্তায় আমি আর ইছামতী। আমার মনে তখনও সন্ধের অপমানটা লাল হয়ে রয়েছে।

আমি আচমকা ইছামতীর হাত ধরে জিজ্ঞেস করে ফেলেছিলাম, একটা লাস্ট প্রশ্নের উত্তর দেবে আমাকে?

ইছা নিজের হাত না সরিয়ে বলেছিল, বল?

কী দেখলে অরুণের মধ্যে? আমার রিয়েলি খুব জানতে ইচ্ছে করে।

একজন মেয়ে যা দেখে তাই দেখেছি।

কী? সেটাই তো জানতে চেয়েছি।

ভালোবাসা।

আমি কি ভালোবাসতে পারি না! ধক ধক করে জ্বলে উঠছিলাম আমি।

জানি না।

আমি কিন্তু সত্যিই জানতে চাই ইছা।

আমার গলায় হয়তো এমন কিছু ছিল যে ইছামতী এক পলকের জন্য তাকিয়েছিল আমার দিকে। তারপর শান্তভাবে বলেছিল অরুণ বড্ড পুরুষমানুষ পুষ্কর। পুরুষমানুষরা ভীষণ ভালোবাসতে পারে।

মানে! তাহলে আমি কী?

তুমি কী জানি না। তবে বেশিরভাগই সব ব্যাটাছেলে। ওরা ভালোবাসতে জানেই না।

পুরুষমানুষ আর ব্যাটাছেলে আলাদা নাকি? কী বলছ এসব?

কিছু না ছাড়ো। বলে অল্প হেসে হাঁটতে শুরু করেছিল ইছামতী। আমার হাত কখন যে খসে গেছিল ওর হাতের থেকে খেয়ালই নেই।

এরপর থেকেই আমি ওদের দুজনকে এড়াতে শুরু করেছিলাম। আপ্রাণ। আমার দিনে রাত্রে চোখের সামনে ইছামতীর শরীর নদীর মতো ঢেউ তুলত। অসহায় লাগত নিজেকে। আমি পালাচ্ছিলাম। একদিন তথাগত খবর দিল অরুণ আর ইছামতী রেজিস্ট্রি করছে। আমারও নেমন্তন্ন। আমি যাইনি। অথচ আশ্চর্য সেদিন আমার রাগও হয়নি একটু। কারণ আমি জানতাম এই খবরটা একদিন না একদিন আমাকে শুনতেই হবে। তবে আমি চেয়েছিলাম ওরা যেন সুখী না হয়।

এরপর যা হয়, আমি চাকরি পেলাম। বিয়ে হল। ছেলে হল। সংসার সামলাতে সামলাতে অনেক কিছুই ভুলে গেলাম। যেভাবে আর পাঁচটা মানুষ শিশুর মতোই অনেক কিছু ভুলে যায়। ইছামতী, অরুণও হারিয়ে গেল আমার স্মৃতি থেকে। সেই হারিয়ে যাওয়ার প্রায় সাত বছর পর আবার গতকাল অরুণ এসে অনেক কিছু মনে পড়িয়ে দিল।

গতকাল থেকে পুরোনো অনেক কথা ভাবছিলাম আমি। অরুণ চলে যাওয়ার পরেই আমি তথাগতকে ফোন করেছিলাম। ও-ও একমত যে অরুণের মাথাটা একটু গেছে। সঙ্গে আরও একটা খবর দিল যে অরুণের সিরোসিস অফ লিভার। সঙ্গে সঙ্গে আমার ইছামতীর মুখটা-শরীরটা ঝাপসা মনে এসেছিল। আমি তথাগতকে জিজ্ঞেস করেছিলাম অরুণ আমার সঙ্গে কেন দেখা করতে চেয়েছিল তার কারণ কিছু বলেছে?

উত্তর পেয়েছিলাম, না।

শুনে আমি নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম।

তথা আমাকে এরপর বলেছিল খুব বেশি এন্টারটেইন করিস না অরুণকে। আমি তো আর আসতে বারণ করে দিয়েছি। মাথাটা একেবারেই গেছে ওর।

আমি ওর কথায় সায় দিয়ে ফোন রেখে দিয়েছিলাম। এবং বহুদিন আগে সবার সামনে অরুণ যেভাবে বলেছিল পুষ্কর তো ইছামতীকে খুবই ভালোবাসে, এই কথার অপমানটা আবার খুব হালকা ভাবে জ্বলে উঠেছিল আমার ভিতরে। ভেবে আরাম লাগছিল সেই ভালোবাসার ভিক্ষা চাইতেই সেই অরুণ আমার কাছে এসেছে। এর থেকে আরামের আর কী থাকতে পারে। হ্যাঁ অরুণ অপ্রকৃতস্থ। তো? মানুষটা তো একই আছে। সুতরাং ইছামতীকে ভালোবেসে দয়া করার বলিষ্ঠ একটা উত্তেজনা অনুভব করেছিলাম ভিতরে ভিতরে।

সাহানার সঙ্গে আমার সাত বছরের দাম্পত্যজীবন ঠিক কেমন কেউ যদি এককথায় উত্তর চায় আমি বলতে পারব না। আর পাঁচটা বাঙালি মধ্যবিত্ত দাম্পত্য যেমন হয়। সুখী-অসুখী কোনওটাই নয়। কেমন যেন। ঠিক তেমনই। আসলে বাঙালির জীবনে কোনো অ্যাডভেঞ্চার নেই বলে সব কিছুই খুব দ্রুত পুরোনো আর একঘেয়ে হয়ে যায়। কথাটা অরুণই বলেছিল একসময় একটা পার্টি মিটিং-এ। ওর কথাটা যে দাম্পত্যের ক্ষেত্রেও খুব খাঁটি সেটা ফিল করি এখন। ঠান্ডা বিরিয়ানির মতো আমার আর সাহানার সংসার। দেখতে সুন্দর, খেতে বিস্বাদ। এইভাবেই চলছে, আরও চলবে বাকি জীবন। আমরা আমাদের ভবিতব্য জানি।

বেশ কিছুদিন আমার ইছামতীর কথা ভীষণভাবে মনে পড়ল। ওকে দেখতে ইচ্ছে করল খুব। ও যে সুখে নেই সেটা অরুণের কথাতেই আন্দাজ করেছিলাম। কিন্তু এতদিন পরেও ও কতটা অসুখী সেটা জানার জন্য অস্থির হয়ে পড়েছিলাম। ও কি বিপথে চলে গেছে? নইলে অরুণ ওইভাবে কেন বলল তুই ওকে ভালোবেসে বাঁচা। ভালোবাসার কি কোনো সহজ পথ বেছে নিয়েছে ইছামতী? যেমন অনেক মেয়েরাই বেছে নেয় অভাবে। হতেই পারে। কিছুটা করুণা হল আর কিছুটা আরাম। কিন্তু আমি এতদিন পর এই নিয়ে এত কেন ভাবছি? তবে কি অরুণের সেদিনের কথাটাই ঠিক? ভালোবাসার ভ্রণ কখনও মরে না! ধু ... স! কয়েকদিন ভাবাভাবির পর আমি সত্যিই ভুলে গেলাম।

প্রায় মাসখানেক পরে হঠাৎ একদিন আমার মোবাইলে অচেনা নম্বর থেকে ফোন।

কী রে পুষ্কর। চিনতে পারছিস?

অরুণ?

যাক, গলাটা মনে রয়েছে তাহলে।

হুঁ। বল।

বলছি একবার আসতে পারবি আমার বাড়িতে!

আমি উত্তর না দিয়ে চুপ থাকলাম।

কিছু বল। পারবি আসতে? একটা দারুণ প্ল্যান করেছি বুঝলি। হেব্বি সাকসেস। শুধু তোকেই বলব।

কী প্ল্যান?

সেটা সামনাসামনি বললেই ভালো হয়। শুধু এইটুকু বলি তোকে। ইছামতী এখন খুব ভালো আছে।

কথাটা শুনেই আমার মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, ও কোথায় এখন?

এখন তো সেন্টারে গেছে। বিকেল নাগাদ ফেরে।

আমি ভেবেছিলাম ইছামতী বোধহয় আর ওর সঙ্গে থাকে না। কিন্তু শুনে একটু মন খারাপ হল। জিজ্ঞেস করলাম সেন্টার মানে?

ওহ তোকে সেদিন বলতে ভুলে গেছিলাম, আমি তো রোগটা ধরা পড়ার পর থেকে আর তেমন বেরোতে পারি না। ইছা একটা কাজ পেয়েছে হেলথ সেন্টারে। তুই কি আসবি? অরুণের গলায় চাপা উত্তেজনা।

বললাম, দেখি।

এটা আমার মোবাইল নম্বর। সেভ করে রাখ। আর পারলে একটু তাড়াতাড়ি আসিস। আমি থাকতে থাকতে। কবে আছি কবে নেই ঠিক তো নেই। রাখি রে। বলে ফোন কেটে দিল অরুণ। আমি কিছুক্ষণ থম মেরে বসে রইলাম নিজের ডেস্কে। তারপর ড্রয়ার টেনে সেই দলাপাকানো ঠিকানাটা বার করলাম। ট্যাংরার ঠিকানা।

আমি এর আগে কোনোদিন বস্তিতে ঢুকিনি। একেবারে প্রপার বস্তি। আমার কলেজ লাইফের বন্ধু এবং আমার প্রেমিকাকে দেখার জন্য আমি সরকারি ব্যাঙ্কের ক্যাশিয়ার পুষ্কর বসু মার্চ মাসের বিকেল পাঁচটা পঁয়তাল্লিশে ট্যাংরা অঞ্চলের এক ভয়ংকর ঘিঞ্জি বস্তির গোলকধাঁধায় ঘুরছি। ঘুরছি কারণ বাড়িটা থুড়ি অরুণের খুপরিটা কিছুতেই লোকেট করতে পারছি না। অথচ আমাকে খুঁজে বার করতেই হবে। কারণ আমার মধ্যে বেশ কয়েকটা বিষয়ে কৌতূহল গিজ গিজ করছে। তাদেরকে না মিটিয়ে আমার জীবনে আর কোনো সুখ নেই। যেমন অরুণ কী বলতে চায়? যেমন ইছামতী এখন কতটা দু:খে আছে। ওকে কতটা খারাপ দেখতে হয়েছে এখন? ওর এখনের ভালোবাসার পথটা কী?

আমি জানি এই প্রশ্নগুলো উত্তর না পেয়েও আমার জীবন এতকাল আরামেই কেটেছে, ভবিষ্যতেও এর উত্তর পেয়ে আমার কোনো লাভ হবে না। কিন্তু তবু এই অকারণ প্রশ্নগুলোকে আমি এই ক-দিন আপ্রাণ ভুলতে চেষ্টা করেও এড়াতে পারিনি। আমার গায়ে জোঁকের মতো কামড়ে পড়ে রয়েছে এই প্রশ্নগুলো। ছটা পনেরোর সময় আমি অরুণের বাড়ি থুড়ি ঘরটা খুঁজে পেলাম। একটা চৌকো উঠোনকে ঘিরে চারদিকে পরপর বেশ কয়েকটা ঘর। বোঝাই যায় সাত ভাড়াটের বাড়ি। প্রতিটা ঘরের গঠন একইপ্রকার। সামনে একচিলতে করে বারান্দা। এমনই এক বারান্দার এক কোনে স্টোভে জল বসিয়ে চুপচাপ বসে ছিল ইছামতী। আমি এক ঝলক দেখেই ওকে চিনতে পেরে ভীষণ বিরক্ত এবং বিস্মিত হলাম। আজ এত বছর পরেও ইছামতী আশ্চর্যভাবে প্রায় একইরকম রয়েছে দেখতে! সেই শরীর, সেই চুল, সেই মুখ। অরুণ বলেছিল ভালোবাসা ছাড়া ইছামতী নাকি শুকিয়ে যাচ্ছে। কোথায়? বরং আগের থেকেও ...! দারিদ্র্য কাউকে জীর্ণ করে তোলে আর কাউকে করে তোলে আগের থেকেও উজ্জ্বল, এমন একটা বোধ আমার মধ্যে কাজ করল। আমাকে চিনতে পারল না ইছা। উঠে দাঁড়িয়ে বুকের আঁচল ঠিক করে জিজ্ঞেস করল। কাউকে খুঁজছেন?

আমাকে চিনতে পারলে না! কথাটা মুখ থেকে বেরিয়েই গেল আমার। কিছুটা অপমানিত লাগল।

না ঠিক ...

আমি পুষ্কর। তোমাদের ব্যাচমেট। অরুণ আছে?

পু-ষ্ক-র। কী আশ্চর্য, তুমি! এক মুখ সহজ হাসি ছড়িয়ে পড়ল এবার ইছামতীর ঠোঁটে। এসো ভিতরে এসো। আমি ইছার সঙ্গে ঘরের ভিতর ঢুকলাম। একটা খয়াটে টিউবের আলোয় চারদিক তাকিয়ে দেখলাম ঘরে জিনিস বলতে একটা চৌকি, এককোণে একটা স্তুপীকৃত জামাকাপড়ের আলনা, মেঝেতে রাখা দু-তিনটে বাক্স আর চৌকির পাশে একটা টেবিলের ওপর ছড়ানো-ছেটানো বেশ কিছু কাগজ, রং তুলি, প্যালেট।

অরুণ, দেখো পুষ্কর এসেছে।

চৌকির এককোণে সেঁদিয়ে পড়েছিল অরুণ। ইছামতী আর আমাকে দেখে উঠে বসল। আয় আয়।

আমি খানিকটা চিবিয়ে হেসে বললাম তাও ভালো, তুই একবারে চিনেছিস। ইছা তো চিনতেই পারেনি।

তার জন্য দোষ মোটেই আমার নয়, হেসে বলল ইছা। তোমার মাথার চুল প্রায় ফাঁকা করে ফেলেছ, আবার মোটাও হয়েছ অনেকটা। এতদিন পর হঠাৎ দেখলে কী করে চিনব বলো?

কী করব, আমার বয়স তো আর তোমার মতো থেমে নেই, ইছামতীর শরীরের দিকে তাকিয়ে বললাম আমি। এইরকম একটা ঘরে থেকেও যে একজন মানুষের শরীরে এত আলো থাকতে পারে আমি দেখেও বিশ্বাস করতে চাইছিলাম না। আমার নিখাদ কষ্ট হচ্ছিল।

বসো। বলে একটা ছোট্টো টুল এগিয়ে দিল ইছামতী।

আমি বসলাম।

ইছা বসল চৌকির ওপর অরুণের গা ঘেঁষে।

খুব ভালো লাগছে তুই এসেছিস বলে। বলল অরুণ।

এতদিন পরে যে হঠাৎ মনে পড়ল।

আমি উত্তরটা দেওয়ার জন্য একবার অরুণের দিকে তাকাতেই দেখলাম অরুণ এক সেকেন্ডের ইশারায় আমাকে সত্যিটা বলতে বারণ করছে।

আমি কথা ঘুরিয়ে বললাম, আসলে তথাগতর কাছ থেকে সেদিন তোমাদের কথা শুনলাম। মনে পড়ল তোমাদের। তাই ঠিকানা জেনে চলে এলাম।

বেশ করেছ।

অরুণ কেমন আছিস তুই?

এই তো চলে যাচ্ছে। কী খাবি বল?

কিচ্ছু না।

ঠিক আছে কিছু খাস না তাহলে, এই ইছা একটু সিঙাড়া আনবে?

না না থাক।

থামো তো তুমি। বলে ইছা বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

আমি অরুণের দিকে তাকালাম। এর মধ্যে ও আরও শুকিয়েছে। কাঠির মতো হাত-পা। পেটটা বিচ্ছিরি টাইপের উঁচু।

আমার দিকে তাকিয়ে অরুণ বলল এই মাসে আর হল না, দেখি নেক্সট মান্থে একবার ট্যাব করতে হবে।

সমুদ্রের মতো জল জমে বুঝলি পেটে। দু-মাস পরপরই ট্যাব করে বার করতে হয়।

আমি ওর কথার উত্তর না দিয়ে বললাম, কেন তোর পার্টি কিছু হেল্প-টেল্প ...

আমি অনেকদিন আগেই পলিটিক্স ছেড়ে দিয়েছি বুঝলি। এত নোংরামো আর সহ্য হচ্ছিল না।

তাহলে?

এতদিন ফ্রিল্যান্সে ইলাস্ট্রেশনের কাজটাজ করতাম কয়েকটা ম্যাগাজিনে। এখন আর পারি না। কষ্ট হয়।

আমি চুপ করে বসে রইলাম। এরপর কী বলব? অরুণ কি টাকা চাইবে আমার কাছে? যদি চায় নিশ্চয়ই দেব। দিতে আমার ভালো লাগবে। তবে টাকার কথা আমি নিজের থেকে বলব না। আগে ওকে চাইতে হবে আমার কাছে। তারপর।

তোকে যে কারণে ডেকেছিলাম ইছা ফিরে আসার আগে বলে ফেলি। বলেই বালিশের তলা থেকে একটা মোবাইল বার করল অরুণ।

এটা দেখ পুষ্কর। ডবল সিমওলা মোবাইল।

আমি কিছু না বুঝতে পেরে বললাম, ভালোই তো।

ফোনটা আমার কাছে অনেকদিন আগে থেকেই ছিল বুঝলি। তবে একটাই সিমকার্ড ছিল। তুই তো জানিস ইছামতীর জীবন আমাকে ছাড়া বৃথা। ও আমার ভালোবাসা ছাড়া বাঁচতে পারে না। কিন্তু আমার এই রোগটা হওয়ার পর থেকে আমিই যেন ওর থেকে একটু একটু করে দূরে সরে যেতে চাইলাম। আসলে কেন জানি না আমার মনে হতো ইছার ভালোবাসায় করুণা মিশছে আমার প্রতি। সহ্য হত না আমার। ঝগড়া করে ফেলতাম। তবু মেয়েটা বারবার কাছে আসতে চাইত আমার। কেন কে জানে আমার এমন একটা কুৎসিত চেহারাকেও এতটুকু ঘৃণা করত না ও। এটা আমাকে খুব যন্ত্রণা দিত। খালি মনে হত করুণা করছে। আমার ইছামতী অসুখী জীবন নিয়ে বাঁচছে এটা আমার পক্ষে মেনে নেওয়া খুব কষ্টের ছিল, তাই প্রাণপণ চাইতাম ও আবার কাউকে ভালোবাসুক। ভালোবাসা ছাড়া মানুষ বাঁচে, তুই বল? আর আমাকে দেখে তোর মনে হয় যে কেউ আমাকে ভালোবাসতে পারে এখন? যদি বাসে তবে সেটা ভান, মমতা। বলে অরুণ থামল। ভীষণ হাঁপাচ্ছে। ওর চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসছে যেন। কথার সময় মুখ থেকে থুতু ছিটকাচ্ছে অবিরাম।

আমি পাথরের মতো স্থির হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছি।

বোতল থেকে কয়েক ঢোঁক জল খেয়ে বলল, আমি আপ্রাণ চাইছিলাম ও কারও প্রেমে পড়ুক। ওর জীবন থেকে ভালোবাসা চলে যাচ্ছিল। আমি টের পাচ্ছিলাম। সারাদিন সেন্টারের কাজ। বাড়ি ফিরে রুগির সেবা। ওর এই অক্লান্ত পরিশ্রম আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না। একদিন হঠাৎ মনে পড়ল তোর কথা। তুই ওকে একসময় ভালোবাসতিস।

গেলাম তোর কাছে। বললাম। পরে মনে হল এটা সঠিক পথ নয়। তা ছাড়া তোরও একটা জীবন আছে। সংসার আছে। আর ইছার তোকে পছন্দ নাও হতে পারে। ভালো নাও বাসতে পারে।

আমি বুঝতে পারছি আমার চোখের পলক পড়া বন্ধ হয়ে গেছে। একদৃষ্টে তাকিয়ে অরুণের কথা শুনে যাচ্ছি আমি। একটা আধাপাগলের নাটুকে প্রলাপ আমাকে কেন জানি না শুনতেই হচ্ছে।

একদিন আচমকা একটা প্ল্যান এসে গেল বুঝলি। ইছাকে না জানিয়ে আরেকটা সিমকার্ড নিলাম। তারপর ও কাজে বেরিয়ে গেলে ওকে সেই নম্বরটা থেকে মেসেজ পাঠাতে শুরু করলাম। একেবারে প্রেমের মেসেজ।

আমি চমকে উঠলাম। কী বলছিস!

হ্যাঁ। প্রথম দিকে ইছা কোনও রিপ্লাই করত না। কিংবা ধমক দিয়ে লিখত আমি যদি ওকে এই ধরনের মেসেজ আবার পাঠাই তাহলে ও পুলিশে খবর দেবে। হা হা, ভাব একবার। পুলিশে খবর দিলে কী কেলেঙ্কারিটাই হত! ও তো জানে না সেই মেসেজ পাঠানেওয়ালা ব্যক্তি স্বয়ং আমি।

আমি সম্মোহিতের মতো জিজ্ঞেস করলাম তারপর?

তারপর একদিন-দুদিন এই নম্বরে ও ফোনও করেছিল। তুলিনি। হা: হা:

তারপর?

তারপরে একদিন ও-ও রিপ্লাই পাঠাল আমাকে। সেদিন কী যে আনন্দ হয়েছিল আমার তোকে কী বলব!

আমার মুখের ভিতর থুতু জমে উঠেছিল। সুরুৎ করে টানতেই বিস্বাদ হয়ে উঠল মুখের ভেতরটা।

বললাম তোর মাথাটা একেবারেই গেছে অরুণ। এভাবে ঠকাচ্ছিস কেন ইছাকে?

কী করব বল? ওকে বাঁচাতে তো হবে আমাকে!

এটা কোনও বাঁচানোর পথ হল!

তুই জানিস না পুষ্কর আমার ইছামতী শুধু ভালোবাসায় বাঁচে।

এই এক প্যানপ্যানানি আমার মাথাটাকে গরম করে দিল। বললাম, থাম। তোদের এসব আঁতলামো আমাকে আর শোনাস না প্লিজ।

অরুণ কিছু বলল না। একটু হাসল। তারপর বলল, জানিস এখনও রোজ অন্তত আমাকে সারাদিনে পঞ্চাশটা এসএমএস করে। কী সুন্দর করে লেখে ভালোবাসার কথা। আমিও লিখি। ও উত্তর দেয়। তবে ও বাড়িতে ফেরার আগেই আমি মনে করে সব মেসেজ ডিলিট করি। ও-ও করে। আমি চেক করে দেখেছি। হে: হে:

ভালো। আমি এবার উঠি।

সিঙাড়া খাবি না?

নাহ। পরে কোনোদিন খাব, বলে আমি উঠে দাঁড়ালাম।

তুই কি সত্যিই পরে কোনোদিন আসবি? বলে সামান্য হাসল অরুণ।

আমিও ইঙ্গিতপূর্ণ হেসে বললাম একদিন হলেও ডেফিনিট আসব।

জানি কোনদিন। যেদিন আমি মরে যাওয়ার খবর পাবি।

আমি সে কথার উত্তর না দিয়ে বললাম, চলি।

আয়। একটা কথা, যদিও জানি তুই বলবি না তবু বলে রাখলাম, ইছাকে এসব কিছু জানাস না।

আমি মুখটা সামান্য বিকৃত করে বললাম তোদের ব্যাপারে আমার কোনোরকম আগ্রহ নেই অরুণ। তুই নিশ্চিন্তে থাক। আমি এই বস্তির থেকে বেরোনো মাত্র সব ভুলে যাব। কথাগুলো বলতে পেরে খুব আরাম হল আমার। ঘর থেকে বেরোতে গিয়েই ইছার মুখোমুখি। ওর হাতে কয়েকটা ছোটো-বড়ো ঠোঙা।

এ কী চলে যাচ্ছ কেন?

থাকব বলে তো আসিনি। দায়সারা হেসে উত্তর দিলাম আমি।

চিরকাল না থাকো, অন্তত দুটো সিঙাড়া আর চা খাওয়ার টাইমটুকু অন্তত থেকে যাও।

আজ ইচ্ছে করছে না। অন্য কোনোদিন।

বন্ধুর সঙ্গে এতদিন পর দেখা হয়েও ঝগড়া হল না কি?

না — না। খামোখা ঝগড়া হবে কেন! এমনিই। একটা দরকারি কাজ রয়েছে।

বেশ কী বলব আর। আবার এসো একদিন।

ভিতর থেকে অরুণ বলল ওকে একটু বস্তিটা পার করে দাও ইছা। নইলে বেচারা পাক খেয়ে মরবে।

কথাটা কি আমাকে খোঁচা দিয়ে বলল অরুণ, বোঝার আগেই ইছামতী বলল চলো।

বেরোলাম দুজনে। দীর্ঘ বছর পর আবার ইছামতী আমার পাশে। একইরকম দেখতে। কী করে হয়?

খাজুরাহোর মূর্তির মতো আজও একইরকম কী করে রয়েছে ও? ভালোবাসায়? ধেত! আমিও এইসব ভাবছি!

কী ভাবছ তুমি?

উঁ নাহ, কিছু না। উত্তর দিলাম আমি। সন্ধেবেলার বস্তি একটা অন্য পৃথিবী। ভেতরে না ঢুকলে ঠিক বোঝা যায় না। তোমার ছেলেমেয়ে ক-টি?

একটাই ছেলে। তোমার? পালটা প্রশ্ন করলাম আমি?

হয়নি।

আমি চুপ। সেই জন্যই কি এখনও এমন শরীরের বাঁধন। আশ্চর্য, আমি কেন বারবার এর উত্তর খুঁজছি?

হাঁটতে হাঁটতে বেশ কয়েকবার ইছার গা ছুঁয়ে গেল আমার হাত। প্রতিবার যেন শিউরে উঠলাম। হঠাৎ ইছাকে কাছে পেতে ভীষণ ইচ্ছে করল আমার। সেই আগের মতো। আমি আড়চোখে তাকালাম ওর দিকে। একটা আধমড়ার জন্য ও নিজের জীবনটাকে এইভাবে নষ্ট করে দিচ্ছে ভেবেই দুম করে রাগ হয়ে গেল আমার। মনে হল অরুণ ওকে ঠকাচ্ছে এটা ওর জানা দরকার।

বস্তির বাইরে এসে ইছা বলল, এখান থেকে তুমি বাস-ট্যাক্সি পেয়ে যাবে।

আচ্ছা, একটা কথা জিজ্ঞেস করব তোমাকে?

হ্যাঁ কর।

কেমন আছ তুমি?

এই তো যেমন দেখছ।

এইভাবে থাকতে পারছ?

এসব কথা থাক পুষ্কর।

না থাকবে না। তুমি যার জন্য নিজের জীবন ঢেলে দিচ্ছ সে যে তোমাকে ঠকাচ্ছে তা কি জানো?

ইছা অবাক হয়ে তাকাল আমার দিকে। বলল, কে ঠকাচ্ছে আমাকে? অরুণ?

হ্যাঁ, তুমি কি জানো যে ... বলে আমি গুছিয়ে সবে ওকে মোবাইলের কথাটা বলতে যাব ইছা অলসভাবেই তার আগে বলল, তোমাকে কি ও মোবাইলের এস এম এস-এর গল্পটা বলেছে?

চমকে উঠলাম আমি। তুমি জানো!

না জানার কী আছে। বলে আবার সহজ হেসে বলল ইছা, ওকে তো আজ থেকে চিনি না। তুমিও তো জানো ও চিরকালই এমন পাগল। আমাকে ভালোবাসতে না দেখলে ও আরও পাগল হয়ে যায়।

আমি আবার বলে উঠলাম তুমি জানো! তাও ...

প্রথম দু-একদিন বুঝতে পারিনি সত্যি। পরে একদিন বুঝে গেলাম। কিন্তু জানতে দিইনি ওকে। এখন বেশ লাগে জানো এইভাবে এস এম এস-এ অনেক না বলা কথা, অনেক হারিয়ে যাওয়া কথা আবার বলতে পেরে অদ্ভুত একটা ভালো লাগে।

আরও কীসব যেন বলে যাচ্ছিল ইছামতী। আমি শুনতে পাচ্ছিলাম না। ওখান থেকে পালাতে চাইছিলাম। একটা ট্যাক্সি এসে দাঁড়াল। আমি দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতেই হঠাৎ ইছামতী বলে উঠল জানি তুমি কখনই বলবে না, তবু বলছি অরুণকে মোবাইলের ব্যাপারটা আমি জানি সেটা বোলো না প্লিজ।

আমি দাঁত ঘষে উত্তর দিতে যাচ্ছিলাম, এই বস্তি থেকে বেরোনো মাত্র ... কিন্তু কিছু বলার আগেই ছেড়ে দিল ট্যাক্সিটা।

শারদীয় সিনেমা এবং

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%