পরিপূরক

বিনোদ ঘোষাল

ট্রেনে উঠতেই জানলার ধারে ফাঁকা সিট পেয়ে যাবে ভাবতেই পারেনি হিমাদ্রি। সিটে বসে সামনের দিকে তাকাতেই দু-চোখ জুড়ে নরম আলো এসে পড়ল যেন। উলটো দিকের সিটে জানলার ধারেই বসে একটি মেয়ে। হিমাদ্রির মতোই বয়স হবে, কুড়ি-একুশ। ফরসা, হেনা করা চুল। পাতলা ঠোঁট দুটোয় খুব হালকা লিপস্টিক ছোঁয়ানো। চোখে কালো কাচের দামি সানগ্লাস। মেয়েটা একটা হাত জানলার ওপর রেখে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল। আড়চোখে হাতটার দিকে একবার তাকিয়ে ফেলল হিমাদ্রি। একেবারে কার্তিক পালের সরস্বতী ঠাকুরের হাত যেমন হয়, ঠিক তেমনই।

এবছর ঠান্ডা প্রায় পড়েনি। হিমাদ্রি গায়ে জড়ানো শালটা ব্যাগে ভরে রাখল। তারপর উর্দু শায়েরির বইটা বের করল। গতকালই পাড়ায় অসীমদার বুক কর্নার থেকে এটা কিনেছে। কী সুন্দর সব কথা। শব্দগুলোয় চোখ রাখলে মুহূর্তের মধ্যে কোথায় যে চলে যায় মন। লোক উঠছে একে একে। কয়েকজন এসে এদিকেও বসল। তবু অনেক ফাঁকা এবছর। কেন কে জানে। আজ পৌষ সংক্রান্তি, প্রতি বছর আজকের দিনে হাওড়া স্টেশন থেকে এই শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেসে করে বোলপুর যায় হিমাদ্রি। তারপর ওখান থেকে বাসে করে জয়দেব। আজ থেকে তিনদিন চলে বাউলের মেলা। সারারাত ধরে শুধু গান আর গান। সেই ইলেভেনে পড়ার সময় থেকে এমনটা করে আসছে হিমাদ্রি। শুধু একটি রাত্রে সারা বছরের বেঁচে থাকার রসদ দিয়ে দেয় যেন। ছোটো-ছোটো আখড়াগুলোর যে কোনও একটায় ভালো করে চাদর মুড়ি দিয়ে বসে যাও খড়ের উপর, প্রাণ ভরে গান শোনো একতারায়। মেয়েটা যাচ্ছে কোথায় ...! বোলপুর?

কথাটা মাথায় আসতেই মোবাইল বেজে উঠল মেয়েটির। বাঁশি। হ্যালো ... গলার স্বরটাও যেন আর এক বাঁশি, হ্যাঁ মামা, ট্রেনে বসে আছি ... না ছাড়েনি এখনও। হ্যাঁ হ্যাঁ ফোন করে দেব ... আরে বাবা কিচ্ছু চিন্তা নেই, হাসল মেয়েটি, এবছরেই কি আমি প্রথম একা যাচ্ছি নাকি ... হি হি ... না না, হ্যাঁ রাখছি।

ফোন রেখে দিল মেয়েটি। হিমাদ্রি অন্যদিকে তাকাতে ভুলে গিয়েছিল। হাসিটা এখনও একটু লেগে রয়েছে ঠোঁটে। হঠাৎ খেয়াল হতেই বইটা খুলে ফেলল। প্রথম পাতাতেই লেখা রয়েছে, মিলনেকা ওয়াদা উনকে মুহ সে নিকল গয়াপুছি জগহ যো ম্যায়নে, তো বোলে কি খোয়াব মে। হাসি পেল হিমাদ্রির। কী অদ্ভুত কথা। স্বপ্নে দেখা হবে বলে কথা দেওয়া। ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে, ধীর গতি। তারপর আস্তে আস্তে গতি বাড়তে থাকল। মেয়েটি বোধহয় একটু অহংকারী। সানগ্লাস পরে বাইরের দিকেই তাকিয়ে আছে। একবারের জন্যেও ট্রেনে কারও দিকে তাকায়নি এতক্ষণে। সুন্দরী মেয়েরা সাধারণত এরকমই হয়। মনে মনে একটু বিরক্ত হয়ে পড়ায় মন দিতে চেষ্টা করল হিমাদ্রি। কিন্তু কিছুতেই মন বসছে না। বারবার চোখ চলে যাচ্ছে। খুব, খু-উ-ব কথা বলতে ইচ্ছে করছে একবার। কিন্তু যদি উত্তর না দেয়? এমন তো না হিমাদ্রি মেয়ে দেখলেই গলে যায়। আলাপ করতে চায়। কিন্তু এ যেন ... ও নিজেও তো এইচ এস-এ সায়েন্স নিয়ে হাই ফার্স্ট ডিভিশন, দুটো লেটার। কলকাতার নামী কলেজে ফিজিক্স-এ অনার্স নিয়ে ফার্স্ট ইয়ার। দেখতে শুনতেও সকলে বলে যথেষ্ট হ্যান্ডসাম। তবে ... আপনি কি বোলপুর থাকেন? চোখ কান বুজে প্রশ্নটা করেই ফেলল হিমাদ্রি। যা হয় হবে। উত্তর দিলে দেবে, না হয় দেবে না।

হ্যাঁ। রিনরিন করে উঠল উত্তরটা।

কোথায় যাবেন? মানে বোলপুরের কোথায়?

শান্তিনিকেতনে। ওখানে আমার মামাবাড়ি।

বা:, দারুণ জায়গায় মামাবাড়ি তো।

হ্যাঁ, আমার মামা শান্তিনিকেতনে চাকরি করে তো। ওখানেই কোয়ার্টার।

খুব সুন্দর জায়গা। আমিও অনেকবার গিয়েছি ওখানে বেড়াতে, বেশ গর্বের সঙ্গে বলল হিমাদ্রি।

ও আচ্ছা। আপনি কোথায় যাবেন?

আমি যাব জয়দেব।

কেউ থাকেন ওখানে?

না না, আজ থেকে তিনদিন ওখানে কেঁদুলির মেলা হয় না!

জানি তো, কথার মাঝেই বলে উঠল মেয়েটি, মামা অনেকবার গিয়েছে ওখানে। সারারাত নাকি বাউলরা গান গায়। খুব ভালো লাগে, তাই না?

হ্যাঁ দারুণ', জোর দিয়ে বলল হিমাদ্রি, আমি তো প্রতি বছরেই যাই।

সত্যি কী মজা। আমারও খুব ইচ্ছে করে যেতে, বলে থেমে গেল মেয়েটি।

আপনার বাউল গান বুঝি খুব ভাল লাগে?

ভীষণ।

আনন্দে ভরে উঠল হিমাদ্রির বুক, এমনিই। মেয়েটা যে এত সপ্রতিভ, এত সহজ, ভাবতেই পারেনি ও। সানগ্লাসের ভিতরে চোখ দুটোর দিকে তাকাতে ইচ্ছে করছিল। এর মধ্যে বেশ কয়েকটা স্টেশন পার করে ফেলল ট্রেনটা। শীতের নরম রোদ জানলা দিয়ে মেয়েটার হাতে, কোলে লুটিয়ে রয়েছে। কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ। তারপর হিমাদ্রি জিজ্ঞেস করেই ফেলল, আপনার নামটা জানতে পারি?

নিশ্চয়ই, কেন জানবেন না, আমার নাম শ্রীময়ী।

ভারী মিষ্টি নাম তো।

আমার মায়ের দেওয়া। আপনার নাম?

আমার নাম হিমাদ্রি। আপনি কি কলকাতায় থাকেন?

হ্যাঁ, গড়িয়ায়।

আমি কোন্নগর থাকি।

ছুটতে থাকল ট্রেন, চলতে থাকল কথার পর কথা। ট্রেন কখন সবুজ ধান খেতের মধ্যে দিয়ে চলতে শুরু করল, আপনি কখন তুমি হয়ে গেল টেরই পেল না ওরা!

তুমি কী করো শ্রীময়ী?

আমি এই বছর এইচ এস দিয়েছি।

বলে স্কুলের নামটা বলল শ্রীময়ী। কলকাতার খুব নামী গার্লস স্কুল। তারপর হিমাদ্রি নিজের কথা বলল। বলতেই থাকল অনেকক্ষণ ধরে। নিজের সুখের কথা দু:খের কথা, সুখ-অসুখ সব কিছু। ছেলেবেলায় বাবা মারা যাওয়ার পর মা কত কষ্ট করে ওকে আর দিদিকে মানুষ করেছে। দিদির বিয়ে হওয়া, ভাগ্নের নাম নীল যে হিমাদ্রিরই দেওয়া, স-অ-ব কিছু।

শ্রীময়ীও বলল, ও বাবা-মা-র একমাত্র মেয়ে। বাবা বড়ো ব্যবসায়ী। মা ব্যাঙ্কে চাকরি করে। ছোট্ট থেকে ও খুব একা। ভালো লাগে না বাড়িতে, সব সময় মন খারাপ করে। শুধু এই মামাবাড়ি আসার সময় খুব আনন্দ হয়।

তোমার কোনও বন্ধু নেই? জিজ্ঞেস করল হিমাদ্রি।

আছে, তবে ভালো বন্ধু কেউ নেই। তোমার বুঝি অনেক বন্ধু?

উহুঁ, আমার শুধু এই একটাই বন্ধু আছে, বলে হাতের বইটা তুলে দেখাল হিমাদ্রি।

বই! তুমি বই পড়তে ভালোবাস?

ভীষণ। ইচ্ছে করে সারাদিন বইয়ে মুখ রেখে চুপ করে বসে থাকি।

আমারও ভালো লাগে। তবে তোমার মতো অতটা নয়। তার চেয়ে ক্রিকেট দেখতে আমি অনেক বেশি ভালোবাসি। কী পড়তে বেশি ভালো লাগে তোমার? গল্প না কবিতা?

কবিতা।

ও! তোমার হাতের বইটা বুঝি কবিতার?

উঁ-উঁ, প্রায় ওই রকমই বলতে পার। শায়েরির বই।

শায়েরি! আরিব্বাস, ও তো আমারও খুব প্রিয়।

তাই! শুনবে একটা?

হ্যাঁ, হ্যাঁ শোনাও না।

হিমাদ্রি পাতা উলটেপালটে পড়ল।

কৌন আপনায়েঙ্গে মুঝে ইস জাঁহাকে ভিড় মে অ্যায়সা এক খত হুঁ ম্যায়, জিসপে পতা লিখখা হি নেহি।

এর মানে কী গো? জিজ্ঞেস করল শ্রীময়ী।

এই পৃথিবীর ভিড়ে আমি এমনই এক চিঠি, যার ওপর কোনও ঠিকানা লেখা নেই।

ইস কী ভালো। আর একটা বলো।

কৌন কহতা হ্যায় কে মোহব্বত কী জুবাঁ হোতি হ্যায়, ইয়ে হকিকত তো নিগাহোঁ সে বয়াঁ হোতি হ্যায়।

দুজনেই কয়েক মুহূর্ত চুপ। তারপর হিমাদ্রি বলল, এটার মানে বুঝতে পারলে?

একটু একটু।

হিমাদ্রি হেসে বলল, কে বলে ভালোবাসা ভাষায় প্রকাশ পায়, এই রহস্য তো চোখের ভাষায় ব্যক্ত হয়।

কী করে লেখে এমন কথাগুলো। মুগ্ধ হয়ে বলল শ্রীময়ী। শব্দগুলোর ঘোর এখনও মিশে রয়েছে ওর কন্ঠস্বরে।

প্রেম, একমাত্র সমস্ত হৃদয় জুড়ে প্রেম থাকলেই এমন কথা লেখা যায়, বলেই একটু লজ্জা পেয়ে গেল হিমাদ্রি।

শ্রীময়ী কিন্তু খুব সহজভাবেই বলল, আমার কিন্তু মনে হয়, শুধু প্রেম নয়, বিরহ চাই। দহন না থাকলে ... জ্বলতে না পারলে ...

শ্রীময়ীর মুখে আচমকা এমন কথা শুনে অবাক হয়ে গিয়ে হিমাদ্রি বলল, লেতা হুঁ মখতা ইয়ে গম-এ দিল মে সবক হুনুজ লেকিন এহি কহে কে রফত গয়া অউর বুঁদ থা। একই সঙ্গে একই সুরে বলে গেল বাংলাটাও, বিরহের পাঠশালায় আমি শিক্ষানবিশি করছি মাত্র, এখনও পর্যন্ত শুধু দুটি পাঠ মুখস্থ হয়েছে যে, ছিল, এখন আর নেই।

শুনল শ্রীময়ী। মুখে কিছু বলল না। মাথা নীচু করে ফেলল। তারপর গলা নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বলল, এত সুন্দর করে বলতে পারো তুমি!

একটু লজ্জা পেয়ে গেল হিমাদ্রি। শ্রীময়ী বলল, বা রে, এতে লজ্জা পাওয়ার কী আছে। তুমি কি আবৃত্তি করো?

না-না। একটা কথা বলব তোমাকে?

হুঁ, বলো না।

চোখ থেকে ওই সানগ্লাসটা খুলবে একবার? এখন তো আর রোদ্দুর নেই।

বেশ বেশ খুলছি। কালো কাচ দুটো চোখের সামনে থেকে সরিয়ে নিল শ্রীময়ী। আলতোভাবে তাকাল হিমাদ্রির দিকে। মুহূর্তের মধ্যে কী যে হল ... ডুবে গেল হিমাদ্রি ওই দু-চোখে। এত গভীর ... এত মায়া ... এত ... ওমন চোখ দুটো তুমি ঢেকে রেখেছিলে! অস্ফুটে বলল হিমাদ্রি, এমন ডুবিয়ে দেওয়া, ভাসিয়ে দেওয়া চোখ ...

থামবে তুমি!

বেশ থামছি।

ঝালমুড়িওলা উঠেছে ট্রেনে, শ্রীময়ী জিজ্ঞেস করল, খাবে?

উঁ ... খেতে পারি, কিন্তু আমি খাওয়াব।

রাজি।

প্রথমে ঝালমুড়ি, তারপর বাদাম, লেবু লজেন্স।

আমার বন্ধু হবে শ্রীময়ী?

বন্ধু আবার বলে কয়ে হয় নাকি?

তা হলে?

এমনিই হয়ে যায়। দেখছ না আমরা হয়ে গিয়েছি।

আমি বড্ড একা শ্রীময়ী।

আমিও তো তাই।

তা হলে আমার সঙ্গে থাকবে? কথাটা মনে মনে বলল হিমাদ্রি। মুখে বলতে পারল না। ওড়নাটা বুকের উপর ভালো করে জড়াল শ্রীময়ী। সিটের পাশে রাখা বোতল থেকে এক ঢোঁক জল খেয়ে নাকের নীচে ঠোঁটের ওপর জমে ওঠা বিন্দু বিন্দু ঘাম ওড়না দিয়ে মুছল। শীতের দিনেও ঘেমে উঠছে ওই মেয়ে, তবে কী ... ছুটে যাওয়া ট্রেনের জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে শ্রীময়ী হঠাৎ হিমাদ্রির হাত ধরে বলল, উ:? দেখ-দেখ বাইরেটা!

চমকে উঠল হিমাদ্রি। শরীর জুড়ে ঝোরা। তাকাল বাইরের দিকে। আদিগন্ত নীল আকাশ, নীচে ঘন সবুজ ধানখেতের ওপর দিয়ে হাওয়া বইছে। যেন এক মস্ত মখমলের চাদরে ঢেউ দিচ্ছে কেউ। তাকিয়ে থাকল দুজনে, অপূর্ব! হিমাদ্রির মুঠোয় আলতো চাপ দিল শ্রীময়ী। বুকের ভিতর মস্ত ফাঁকা একটা ঘরে গুমগুম শব্দ হচ্ছে হিমাদ্রির!

আমার কী যে ভালো লাগে এই জার্নিটা।

শ্রীময়ীর কথার উত্তর দিতে পারল না হিমাদ্রি। নিজের মুঠোয় চেপে রাখা শ্রীময়ীর হাতের দিকে ও অপলক তাকিয়েছিল। ঝাপসা হয়ে আসছিল দু-চোখ। হিমাদ্রির দিকে হঠাৎ খেয়াল করে তাকাতেই হাত সরিয়ে নিল শ্রীময়ী।

সরিয়ে নিলে কেন?

এমনিই।

কেন বলো?

বলব না।

বেশ, বলো না। মুখের চেয়ে হাত অনেক বেশি কথা বলতে পারে জানো তো?

তাই বুঝি?

হ্যাঁ।

আমার হাতের কথা কী শুনলে?

বলব না।

এবার হেসে উঠল দুজনেই। হিমাদ্রি বলল, তোমার এত সুন্দর চোখ দুটো সানগ্লাসে ঢেকে রাখো কেন? খুব অন্যায়।

আচ্ছা বাবা, আর ঢাকব না, খুশি?

হ্যাঁ খুশি। মেয়েদের চোখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা কিন্তু খুব অন্যায়।

হিমাদ্রি হেসে বলল, গুস্তাকি ম্যায়ঁ করুঙ্গা সির্ফ একবার, জব সব পয়দল হোঙ্গে অউর ম্যায় কন্ধে পে সওয়ার।

মানে আর বলতে হল না। শ্রীময়ী বলল, উ:, খারাপ কথা বলতে নেই, তারপর একটু থেমেই বলল, তুমি খুব ভালো আবৃত্তি করো।

প্রশংসায় আবার একটু লজ্জা লাগল হিমাদ্রির। বলল, থাক, আর অত মিথ্যে বলতে হবে না।

মোটেই মিথ্যে বলছি না। সত্যি-সত্যিই... বলতে বলতে স্থিরভাবে তাকাল হিমাদ্রির দিকে, হিমাদ্রিও তাকিয়ে থাকল। দুজন দুজনের দিকে। কত সময়, কত যুগযুগান্ত ধরে যেন এভাবে তাকিয়েই আছে ওরা...

কেউ আছেন, আমার সামনে? একটা দীর্ঘ ঘুম যেন আচমকা ভেঙে গেল হিমাদ্রির। সামনে বসে থাকা কালো সানগ্লাস পরা মেয়েটি আবার বলল, কেউ আছেন ... কেউ বলবেন এর পর কোন স্টেশন আসছে?

হিমাদ্রি অসহায়ের মতো তাকাল ওর পাশে বসে থাকা মাঝবয়েসি লোকটির দিকে। তারপর মেয়েটির হাতের দিকে। থিরথির করে কেঁপে উঠল একবার। মেয়েটি নিজের রিস্টওয়াচের ডায়ালের কাচটা সরিয়ে ঘড়ির কাঁটায় আঙুল বোলাচ্ছে। লোকটি বলল, এই তো গুসকরা গেল, এর পর পিচকুড়ির ঢাল আসবে।

আমি আসলে বোলপুর নামব। আপনাদের কেউ কাইন্ডলি স্টেশন আসলে আমাকে একটু নামিয়ে দেবেন? কন্ঠে কোনও জড়তা নেই। খুব স্মার্ট, অভ্যস্ত সুরেই বলল কথাটা।

লোকটি বলল, আমি তো পিচকুড়ির ঢালে নেমে যাব, তারপর হিমাদ্রির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, তুমি কোথায় নামবে ভাই?

কথা খেয়াল করল না হিমাদ্রি। ও একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল কালো কাচে ঢাকা দুটো দৃষ্টিহীন শূন্য চোখের দিকে।

ও ভাই কোথায় নামবে তুমি? কাঁধে আলতো টোকা দিল লোকটি।

তাকাল হিমাদ্রি, চুপ করে। কীভাবে, কী বলবে বুঝতে পারছিল না। বুকের ভিতর প্রচণ্ড শব্দ। বোলপুর নামবে?

লোকটির প্রশ্নে ঘাড় কাত করে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।

ওঁকে একটু বোলপুর নামিয়ে দিও কেমন। স্টেশনে নেমে যাবেন কোথায় আপনি?

আমার মামা দাঁড়িয়ে থাকবে ওখানে।

ও আচ্ছা। নিশ্চিত হল লোকটি। তা হলে ঠিক আছে।

কম্পার্টমেন্টটাও আজকে আশ্চর্যজনক ফাঁকা। শুধু তিনটে মানুষ। হু হু করে ধাতব শব্দ করে ছুটে যাচ্ছে ট্রেন। পিচকুড়ির ঢাল আসতে লোকটি নেমে যাওয়ার আগে মেয়েটিকে বলল, আমি নেমে যাচ্ছি। আর একজন আছেন, আপনাকে নামিয়ে দেবেন। কোনও চিন্তা নেই। বলে হিমাদ্রির দিকে তাকিয়ে ইশারা করে নেমে গেল লোকটি। হিমাদ্রির গলার কাছে এক মুঠো শুকনো বালি আটকে রয়েছে। স্টেশন থেকে ছাড়ল ট্রেন। যেভাবে সেই ছেলেবেলা থেকে কাউকে ভালো লাগলেই তার সঙ্গে মনে মনে কথা বলতে শুরু করে দিত, চলতেই থাকত কথা নিজের মনে, আজও সেই স্বপ্নের অভ্যেসটা নষ্ট হল না। কেন যে ... কেন যে ... এই আওয়াজ ছাড়া কথা নিয়ে খেলা! ঘেন্না হয় নিজের ওপর। এভাবে নি:সঙ্গতা ভুলে থাকার ব্যর্থ ছল নিজের সঙ্গে ... ভেদিয়া স্টেশন পার হয়ে গেল। দুজনেই চুপ। গভীর রাতে বালির উপর সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ার শব্দ হচ্ছে হিমাদ্রির বুকে মাথায়, গোটা শরীরে। শরীর ছাপিয়ে উঠছে সেই প্রচণ্ড আওয়াজ। নিশ্চুপ দুটো ছেলে- মেয়ে পরস্পরের মুখোমুখি বসে। বোলপুর স্টেশনে ঢোকার একটু আগে থেকে গতি কমলো ট্রেনের। মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, স্টেশন কি এসে গেল? কোন স্টেশন? কেউ নেই? শুনছেন কেউ? বলতে বলতে উদ্বিগ্ন হয়ে খানিকটা ভয়ে সামনের দিকে দু-হাত বাড়াল মেয়েটি, শুনছেন ... কেউ একটু সাড়া দিন না। জীবনে এই প্রথম একবার, মাত্র একটিবারের জন্য হিমাদ্রির তীব্র ইচ্ছে করছিল বলে উঠতে, আমি আছি। এই তো।

প্লিজ, কেউ কথা বলুন না।

আতঙ্কে মেয়েটি যখন উঠে দাঁড়াতে গেল তখনই নিজের দু-হাত দিয়ে মেয়েটির হাত দুটো আলতো ভাবে ধরল হিমাদ্রি। তারপর মেয়েটির একটা হাত নিজের ঠোঁটে ছুঁইয়ে সেই হাতটায় আঙুল দিয়ে ক্রস লিখল। হাতের আঙুলগুলো কি এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল মেয়েটির? হিমাদ্রির হাতে হাত রেখেই শান্ত হয়ে আবার বসে পড়ল। ভোকাল কর্ডে সামান্য ডিসঅর্ডার নিয়ে জন্মানোর জন্য হিমাদ্রি যে মানুষের মতো কথা বলতে পারে না, শুধু বিকৃত জান্তব শব্দে গোঙাতে পারে, সেকথা এত সহজে বুঝে গেল ওই মেয়ে! হাত যে মুখের চেয়ে অনেক বেশি কথা বলতে পারে!

উনিশ কুড়ি

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%