বিনোদ ঘোষাল
হাওড়ায় সাত নম্বরে দাঁড়িয়ে থাকা রাত সাড়ে দশটার আপ ব্যান্ডেল লোকালের লেডিস কম্পার্টমেন্টের সিটে শালিনী বসতে না বসতেই বেশ জোরে বৃষ্টিটা নেমে গেল। আজকে জানলার ধারে বসার কেউ নেই। বৃষ্টির ছাট এসে সিট ভিজে গেছে। অন্যান্য দিনে এই জানলার ধারে বসা নিয়েও কত কামড়াকামড়ি, খামচাখামচি, মারামারি। আজকে শুধু দুজন মহিলা আগে থেকেই বসে ছিল। একজন বয়স্কা শালিনীর উলটো দিকের সিটে। আরেকজন অল্পবয়সি শালিনীর পাশে জানলার ধারের ভিজে সিটটা ছেড়ে। ভিজের ওপরেই বসে পড়েছিল শালিনী। আজ একটু ভিজলে ক্ষতি নেই।
সকাল থেকেই গুমোট গরম ছিল। গলায় জড়ানো ওড়নার একপ্রান্ত ধরে গলা, ঘাড় ভালো করে মুছল। অফিসে সারাদিন এসির ভেতর থেকে বাইরেটা ভুলে গেছিল একেবারে। ক্যামাক স্ট্রিটে বিপিওর ঝাঁ চকচকে অফিস ফ্লোরে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে কোনও যোগাযোগই থাকে না। শুধু কাজ আর মানুষ। আকাশ, মাটি, গাছ পিসি-র স্ক্রিনসেভারে। আজ সারাদিনে তিনবার কল্লোলের ফোন এসেছিল। শালিনীর শরীরের খবর, মনের খবর জানতে। প্রতিবারেই সবকিছু ভালোই রয়েছে জানিয়েছে ও।
এই উইকে শালিনীর বি শিফট চলছে। দুটো-দশটা। শেষবারের ফোনে কল্লোল ওকে একটু অফিস থেকে আগে বেরোনোর রিকোয়েস্ট করেছিল। হয়তো ওকে কিছু কিনে দিত, শাড়ি কিংবা নাইটি কিংবা ছোটোখাটো কোনো জুয়েলারি, তারপর দামি কোনো রেস্টুরেন্টে গিয়ে ডিনার। কাজের চাপ আছে বলে এড়িয়ে গেছিল শালিনী। বসকে বলে সহজেই আজ আগে বেরোনো যেত। ইচ্ছে করেনি। কী হবে এসব করে, সেই প্রাচীন পদ্ধতি। অফিসের ভেতর থাকলে বাইরের পৃথিবী, মানুষ দেখতে না পাওয়াটাও, ভুলে থাকতে পারাটাও যে মস্ত পাওয়া হতে পারে এই ক-দিনে বুঝেছে শালিনী। লুকিয়ে থাকার স্বস্তি। কল্লোলের সরি শব্দটাও এত ক্লান্তিদায়ক! ঘড়ি দেখল শালিনী। দশটা পঁচিশ। আর পাঁচ মিনিট বাকি।
জানলাটা নামিয়ে দাও না উলটো দিকের সিটে বসা মাঝবয়সি মহিলা বললেন শালিনীকে। হ্যাঁ দিচ্ছি' জলের ছাট এসে শালিনীর কোল, বুক, হাত সব ভিজিয়ে দিয়েছে এর মধ্যেই। খেয়ালই ছিল না। বৃষ্টির শব্দ বেড়েছে অনেক। কাচের জানলাটা টেনে নামিয়ে দিতেই মহিলা বললেন, ভিজতে আরাম লাগে ঠিকই; কিন্তু সারাদিন বেগুন পোড়া হওয়ার পর হুট করে ভিজলে ঠান্ডা লেগে যেতে পারে।
উত্তরে শালিনী অল্প হাসল শুধু।
আর কাণ্ড দেখো, সারাদিনটা ধরে শুধু গুমরাল, আর এখন এই রাত্তিরবেলায় যখন একটু বাড়ি ফিরব, ঠিক তক্ষুনি শুরু হল। ... অত্যাচারের আর সীমা নেই!
মনে মনে হাসল শালিনী। কীসের সীমা আছে? কম্পার্টমেন্টে একদিকটায় ওরা শুধুই তিনজন, আর কেউ নেই। ওদিকে কেউ উঠেছে বলে মনে হচ্ছে না। অবশ্য এত রাত্রে লেডিস কম্পার্টমেন্টে তাও আবার এমন বৃষ্টিবাদলের দিনে এর বেশি কেউ থাকার কথাও নয়। অন্যান্য দিনেও তো ছয়-সাতজনের বেশি হয় না, অফিসের গাড়ি হাওড়া স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে যায়। তারপর নিজের দায়িত্ব। পাশে বসে থাকা মেয়েটার দিকে তাকাল শালিনী। খুব রোগা। রোগা হাত দুটোকে ঢেকে রাখার জন্যই বোধ হয় ফুলস্লিভ সালোয়ার পরেছে। গিঁটওয়ালা রোগা রোগা আঙুলগুলোর দুটোয় রুপোয় বাঁধানো মুক্তো আর গোমেদ। রোদে জ্বলা ফ্যাকাসে গায়ের রং। গালে ফুটো ফুটো দাগ। প্লাক করা ভুরু মুখটায় কিছুমাত্র সৌন্দর্য আনতে পারেনি। বুকের বদলে কন্ঠার হাড় উঁচু হয়ে আছে। তবু বারবার বুকের সামনের ওড়না ঠিক করছিল মেয়েটা। শূন্যতা ঢাকার নিরলস অভ্যাসে। বাঁ হাতে ধরা পুরোনো মডেলের কালো ঢ্যাপ্পোস একশৃঙ্গ মোবাইল। বয়স্কা মহিলা আবার বিরক্তির সুরে বললেন, তুমি একবার ভাবো, সারাটা দিন পড়ে রইল তখন ঢাল, না লোকে সারাদিন প্রাণপাত করে একটু ঘরে ফিরবে যখন, হারামজাদাদের ন্যাকামো শুরু হল। বহুবচন কেন প্রয়োগ হল বুঝল না শালিনী। মেঘ গর্জন, বৃষ্টি, জল জমা, কাদা সবাই মিলে কি? মৃদু ঘাড় নেড়ে মহিলার কথায় সায় দিল শালিনী।
ট্রেনটা এবার ঝাঁকুনি দিল দু-বার। তার মানে ঠিক সময়েই ছাড়বে, যাক। খুব খিদে পেয়েছে। প্ল্যাটফর্ম থেকে কিছু কিনে আনলে হত। তখন খেয়াল ছিল না। আজকে মুড়ি কিংবা বাদামের হকার ওঠারও সম্ভাবনা নেই। ছেড়ে দিল ট্রেন। লিলুয়া কারশেড পর্যন্ত ঢিক ঢিক। তারপর আস্তে আস্তে স্পিড নিল। অন্ধকারে একা একা দাঁড়িয়ে থাকা নিয়ন আলোর পোস্টগুলো মাথা হেঁট করে ভিজছে। আলোর চারপাশ জুড়ে ঝিরিঝিরি। দরজা দিয়ে বৃষ্টির ছাট আসছে। ... কল্লোল কি বেরিয়েছে অফিস থেকে? কথাটা মনে আসতে ব্যাগ খুলে মোবাইল বার করল। কল্লোলের নাম সিলেক্ট করে সবে রিং করতে যাবে তখনই এ- সে গেছি, আমি। মিঠুন চক্রবর্তীর মা।
ফোনটা কেটে দিয়ে তাকাল শালিনী। আমি শ্রীদেবী। আমার বরের নাম ধমেন্দ। ... যে যে আমার লজেন খাবে তার আজকের দিনটা খুব ভালো যাবে। আর যে খাবে না তার খুব খারাপ যাবে। বরের সঙ্গে ঝগড়া হবে। সাত দিন কথা বন্ধ থাকবে। সুর করে টেনে টেনে কথাগুলো বলে গেল যে, তার বয়স বোঝা বেশ কঠিন। চল্লিশ কিংবা পঞ্চাশ, যা খুশি হতে পারে। হাইট বেঁটে বললেই ভালো। বহুযুগের পুরোনো রংচটা একটা ছাপা শাড়ি। ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া সবুজ রঙের ব্লাউজ। কাঁধে ঝোলানো নানা জায়গায় সেলাই করা সুতির ঝোলা, দোমড়ানো কোঁচকানো মুখ, কাঁচাপাকা চুলে লিকলিকে বিনুনির মতোই সরু হাত দুটো। ডান হাতে দুটো কাচের চুড়ি আর বাঁ হাতে বেড় দিয়ে বুকে জড়ানো একটা প্লাস্টিকের বয়াম, বয়ামে কিছু সস্তার লজেন্স।
বয়স্কা মহিলা গজগজ করে উঠলেন, উফ আজকেও শুরু হল! পাগলামো! শালিনী বুঝল বয়স্কা চেনেন শ্রীদেবীকে। শালিনীর দিকে সটান তাকিয়ে শ্রীদেবী বলল, কী রে, এত সেজেছিস কেন? প্রেম করতে গেছিলি বুঝি, বরকে না জানিয়ে, খা লজেন খা। আমার বর ধমেন্দ তো এই লজেন খেয়েই সিনেমা করতে যেত। মিঠুনও তো এই খেয়েই বড়ো হয়েছে। ... ভাবছিস গুল মারছি? খেয়ে দেখ, দেখ না, দেব একটা? বলে বয়াম খুলে গেল শ্রীদেবী।
শালিনী হাতের ইশারায় বারণ করল।
কেন রে, বর বারণ করেছে বুঝি? বিশ্বাস করবি না, একদম পুরুষমানুষকে বিশ্বাস করবি না ... সব শয়তানের ধাড়ি। চোখ সরিয়ে নিয়ে জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল শালিনী। আড়চোখে দেখল বয়স্কা মহিলা বেজায় ভুরু কুঁচকে শ্রীদেবীর দিকে তাকিয়ে আছেন। পাশে বসা শালিনীর বয়সি মেয়েটাও একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে।
সব একেকটা হারামজাদা, বুঝলি। তোকে ভুলিয়ে ভালিয়ে এমনি করে খাবে, তারপর এমনি করে ফেলে দেবে। হাত নাড়িয়ে খেয়ে ফেলে দেওয়ার ভঙ্গি করল শ্রীদেবী।
কী রে, তুই খাবি লজেন? পাশের মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করল।
একটু ঘাবড়ে গিয়েই মেয়েটা বলে উঠল, না-না-না
তা খাবি কেন, এখন অন্য রস খাচ্ছিস যে, বুঝবি বুঝবি ...
এবার ফুঁসে উঠলেন বয়স্কা। অ্যাই, রোজ রোজ এসব বাজে কথা বকো কেন? লজেন্স বিক্রি করছ করো। রোজ রোজ এক ছেলেদের গাল দেওয়া ... এ কী স্বভাব!
বেশ করব দেব, কেন দেব না? তাল ঠুকে খনখন করে উঠল শ্রীদেবী। আমার ঘর পুড়েছে ওদের জন্য।
সে তোমার নিজের দোষে পুড়েছে। সব সময় এমন পাগলামো করলে...
কে বলল আমি পাগল! আমি আগে এমন ছিলাম নাকি? কত্ত ভালো ছিলাম জানো গলা নামাল শ্রীদেবী। মেচেদায় নিজেদের বাড়ি ছিল আমার। বাবা কলের মিস্তিরি ছিল। বলে ওদের সিটের ধারে এদিকে মুখ করে বসে পড়ল শ্রীদেবী। আমি ইশকুলেও পড়েছি, জানো, সিক্স পর্যন্ত। ... বাবার সঙ্গে কাজ করত একটা ছেলে, নাম বলব না বলেই আচমকা হিংস্র হয়ে গিয়ে থু থু করে মেঝেতে থুতু ফেলতে লাগল।
অ্যাই ... অ্যাই ও কী, মেঝেটা নোংরা করছ কেন, আমরা বসে আছি না ধমক দিলেন বয়স্কা।
গম্ভীর হয়ে পা দিয়ে থুতুর দলাগুলো ভালো করে ডলে দিল শ্রীদেবী। দিয়েই খাবে গো লজেন, ... রাগ করছ কেন? — সরাসরি ওঁকেই অ্যাটাক।
না না খাব না।
আবার রাগ করছ বোনের ওপর।
আরে বাবা রাগ করছি না। খিদেতে পেট জ্বলছে। বাড়ি গিয়ে কখন দু-মুঠো পেটে দেব ... ফিসফিস করে নিজের মনেই বললেন বয়স্কা।
তোমার বর আছে? ... কী গো তোমার বর আছে?
চোখের মাথা খেয়েছ নাকি। দেখে বোঝো না ... আশ্চর্য। আবার রেগে গেলেন বয়স্কা। এবারে ভীষণরকম।
শ্রীদেবী নির্বিকারভাবে বলল, ভালো থাকলেই ভালো, চলে গেলে মোটেও ভালো নয় ... থাকে না গো থাকে না নিজের মনে বিড়বিড় করল। লজেন্সের বয়ামটা দুবার ঝাঁকিয়ে আঁচল দিয়ে খুব যত্ন করে মুছল। শালিনীর পাশে বসা মেয়েটা একদৃষ্টে তাকিয়েই ছিল শ্রীদেবীর দিকে। তাকিয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু দেখছে না। ভাবছে অন্য কোনও কথা। বেশ বুঝতে পারছিল শালিনী, জানলার দিকে তাকাতেই অন্ধকার কাচে দৃষ্টি ধাক্কা খেয়ে ফিরে এসে নিজেকে দেখতে পেল আচমকা। সেই রাত্রেই কী যেন বলেছিল কল্লোল, ... ইউ হোর, বিচ ... শব্দগুলো কিছুতেই মাথা থেকে যাচ্ছে না ... কিছুতেই না। ভুলে থাকার আপ্রাণ চেষ্টাটাই যেন আরও বেশি জ্বালিয়ে তুলছে সে দিনের রাত্রিটাকে। অথচ তার পরের প্রায় পনেরো দিনে অন্তত বার সাতেক শরীরে শরীর মিলেছে দুজনের। নির্দ্বিধায়, অসঙ্কোচে। শরীরের তো নিজের কোনও স্মৃতি নেই। অথচ কল্লোল কিন্তু জানত শান্তনু শালিনীর কলিগ ছাড়া আর কেউ নয়। ... আজ আবার আসছে ভাবনাগুলো। সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলে রিং করল কল্লোলকে। একটু পরে ওদিক থেকে রিসিভ করল কল্লোল।
হ্যাঁ বলো প্রায় চিৎকার করে বলল। তুমুল গানবাজনার শব্দ হচ্ছে। ব্যাঙ্কোয়েটে আছে বোধহয়। ফাইভ স্টার হোটেলের ক্যাটারিং সেকশনের চিফ কল্লোল ব্যানার্জি এখন ভীষণ ব্যস্ত।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল শালিনী। সামলে নিয়েই বলল, বলছি বেরোতে দেরি হবে তোমার? ফ্যাঁসফেঁসে শোনাল গলাটা।
হ্যাঁ।
খুব বৃষ্টি হচ্ছে তো।
শুনলাম। দুপুর থেকে এক সেকেন্ডের জন্য বাইরে তাকানোর সময়টাও পাইনি, বহুত প্রেশার আজকে। এমপি-র একমাত্র ছেলের বিয়ের রিসেপশন বলে কথা। ... শা-হ! আজ কিন্তু একটু লিকুইড মেরে ফিরব। নইলে বাড়ি গিয়ে ঘুম হবে না। হেসে জানাল কল্লোল। এমনভাবে বলল যেন শালিনী না বললে ছোঁবেই না। শালিনীও অল্প হেসে বলল, ঠিক আছে। অল্প কিন্তু।
হ্যাঁ হ্যাঁ অল্পই।
আর ভিজো না যেন।
না-না- নো চান্স। তুমি কোথায়? পৌঁছে গেছ?
হাসি পেল শালিনীর। আমি যে ঠিক কোথায় আমি কি জানি?
এই তো ট্রেনে আছি।
সাবধানে ফিরো, পৌঁছে ফোন করো একটা।
শালিনী আচ্ছা রাখছি' কথাটা শেষ করতে না করতেই ওদিক থেকে ফোন কেটে দিল কল্লোল। ব্যস্ত, খুব ব্যস্ত। ফোনটা ব্যাগে ঢোকাতে গিয়ে শালিনী বুঝতে পারল পাশের মেয়েটা ওর দিকে হ্যাঁ করে তাকিয়ে রয়েছে। ফোনের কথা শোনা যে শেষ হয়ে গেছে — খেয়ালই নেই। আচ্ছা বেখেয়ালি মেয়ে তো!
দোষ তো তোমারই বয়স্কা গলায় জোর দিয়ে বললেন শ্রীদেবীকে। ফুল দমে কথা চলছে দুজনের। ট্রেন বালি স্টেশনে এসে দাঁড়াল। কেউ উঠল না, কেউ নামলও না। বৃষ্টি অঝোর।
উহ অমনি আমার দোষ! বললেই হল!
নয় তো কী। বাপ-মায়ের মুখে কালি দিয়ে মাত্র সতেরো বছর বয়সেই পালালে ছেলেটার সঙ্গে।
কী করে বুঝব বলো। তখন কী ভালোবাসত আমাকে। আমি তো বোকা। কিচ্ছু বুঝিনি। সায় নেওয়ার জন্য শালিনীর পাশের মেয়েটার দিকে তাকাল শ্রীদেবী। মেয়েটা হুঁ, হা কিছুই বলল না। হাতে ধরা মোটা পুরোনো মোবাইলটায় আলতো করে আঙুল দিয়ে টোকা দিচ্ছিল। রিষড়ার চটকল আছে না। ওখানে একটা ঘরভাড়া নিয়েছিল ও। এইটুকুন ঘর। কত কষ্ট করে থাকতাম জানো। আমার বাপের বাড়িতে তো এত্ত বড়ো উঠোন, তবু সব মেনে নিয়েছিলাম। ও কল সারানোর কাজ করত। আর আমি বাড়ি বাড়ি গিয়ে লোকের ময়লা জামাকাপড় নিয়ে এসে পুকুরে কেচে ইস্তিরি করতাম। কত্ত কিছু ভেবেছিলাম জানো। ... কিন্তু যেই ছেলেটা পেটে এল অমনি কদিন পরেই আরেকটা মেয়ের সঙ্গে পালাল আমাকে ফেলে।
ওরম অবস্থায় ...! ... কী করলি তখন? বয়স্কার প্রশ্নে ওর দিকে তাকাল শালিনী। গলায় ততটা ঝাঁজ আর নেই।
কী আর করব? চুপ করল শ্রীদেবী।
সেদিন নাইট শিফট ছিল শালিনীর। অ্যাক্যাউন্টস ম্যানেজার অঙ্কিত সিঙ্গানিয়ার বার্থডে অফিসেই সেলিব্রেট করা হবে ঠিক ছিল। কেক আনার দায়িত্ব পড়েছিল শান্তনুর ওপর। চাটার্ড অ্যাকাউনটেন্ট। বাচ্চা বাচ্চা দেখতে। খুব হুল্লোড়বাজ। শালিনীর থেকে এক বছরের ছোটো। বেরোবার সময় হঠাৎ শালিনীকে বলল, এই যে ম্যাডাম, শুধু হ্যাপি বার্থডে বলে হাততালি দিলেই হবে না। কাজ করতে হবে।
কী করতে হবে বলো।
উঁ, উঁ ... আমার সঙ্গে কেক আনতে যেতে হবে।
নট অ্যান ইস্যু, চলো।
অফিসের গাড়িতে সোজা পার্ক স্ট্রিটের মনজিনিস। শান্তনু নিজেই ড্রাইভ করছিল। রাত্রি সাড়ে এগারোটা। বড়োসড়ো একটা কেক কিনে ফেরার সময় ক্যামাক স্ট্রিটের ঠিক বাঁকটায় গাড়ি ঘোরাতে গিয়েই উলটোদিক থেকে দ্রুত আসা একটা টাটা সুমোর মুখোমুখি। দুজনেই একেবারে ঠিক সময় ব্রেক কষেছিল বলে প্রত্যাশিত অ্যাকসিডেন্ট হয়নি ঠিকই, কিন্তু স্টিয়ারিং লাগোয়া গিয়ারে কোমরের ডান পাশে খুব জোরে চোট পেয়েছিল শালিনী। অফিসে ফিরে টয়লেটে গিয়ে আয়নার সামনে সালোয়ার তুলে দেখেছিল কালশিটে দাগ পড়ে গেছে। খুব ব্যথা। পরদিন রাত্রে বিছানায় কল্লোল ওকে নিজের শরীরে মাখবার সময় ওখানে হাত পড়তেই আচমকা ককিয়ে উঠেছিল শালিনী।
কী হল?
ব্যথা।
কেন? — লাইট জ্বালিয়ে ভুরু কুঁচকে শালিনীর কাছে আগের রাত্রের সব ঘটনা শুনে আরও গম্ভীর হয়ে গেছিল কল্লোল। ফরসা কোমরের কালো দাগটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বলেছিল, কালকে কিছু বলোনি কেন?
বলিনি, এমনিই। তুমি টেনশন করবে।
পরদিন মাঝরাতে বেহেড হয়ে ফিরেছিল হোটেল থেকে।
ট্যাক্সির ড্রাইভার ফ্ল্যাটের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে বলেছিল, সামহালিয়ে। ঠিক যেন বস্তায় করে দরজার সামনে চাল নামিয়ে গেছিল দোকানদার। এ কী অবস্থা তোমার। ধরতে গেছিল শালিনী।
ডো-ন্ট-টা-চ— হাত সরিয়ে নিয়েছিল কল্লোল, থমকে গেছিল শালিনী। কল্লোল টলতে টলতে বেডরুমে গিয়ে জামা-জুতো সমেত পিছন পিছন শালিনী গেছিল। এইভাবে কেউ ... রাস্তায় কিছু একটা —
ডো-ন্ট ট্রা-ই টু টিচ মি ... শা-ল-লাহ বিচ। অফিস কলিগের সঙ্গে ছেনালি তো করিনি তোর মতো।
কী বলছ এসব!
চো-প, কী ভাবো, কিছু বুঝি না আমি, ওই কোমরের দাগ কীসের!
মানে-হ কী বলতে চাও তুমি! ফুঁসে উঠেছিল শালিনী।
শা-ন-ত-নু, বাচ্চা ছেলে! ... বাচ্চা-হ-শা-হ ... ইউ স্লেপ্ট উইথ হিম।
ভদ্রভাবে কথা বলো, কল্লোল। আমি তোমার স্ত্রী হই। প্লিজ ... ঠোঁট কামড়ে ধরেছিল শালিনী। নিজের অফিসের গল্পে বেশ কয়েকবার শান্তনুর নাম করেছিল আগে কল্লোলের কাছে। ওর ছোটোদের মতো স্বভাব, মজা করা এইসব নিয়ে।
কল্লোল জিজ্ঞেস করেছিল দেখতে কেমন?
উঁ উঁ ... ভালোই।
আমার চেয়েও?
হ্যাঁ-হ্যাঁ তোমার চেয়েও। হি-হি — একদম ঋত্বিক রোশনের মতো।
ভদ্রতা শেখাচ্ছে আমাকে। ভদ্রতা ... তোর ভদ্রতায় আমি মুতি।
নাটক করি জানো তো। একটু নাটক করতে হয়। না করলে কেউ কিচ্ছু নিতে চায় না। নাটকে সোনালি হয়ে গেছি শ্রীদেবী। হি-হি-হি বলে লজেন্সের বয়ামটা দু-হাতে তুলে ধরে বারকয়েক ঝমঝম শব্দ তুলে ঝাঁকাল শ্রীদেবী। বয়স্কা ব্যাগ খুলে ছোটো একটা জলের বোতল বার করে জিজ্ঞেস করল শালিনীকে, কোন স্টেশন গেল গো?
রিষড়া।
অ। ... অবস্থাটা দেখো একবার। রাতের বেলা এমন দুর্যোগ হলে আমরা মেয়েগুলো কী করে বাড়ি ফিরি বলো তো। রাস্তায় তো একহাঁটু জল জমে গেছে এতক্ষণে। ... কপাল-কপাল! বসে বসে খাওয়ার ভাগ্য করে তো আসিনি জীবনে। বলে নিশ্বাস ছেড়ে বোতল তুলে জল ঢালল গলায়।
আমাকে একটু দেবে গো, গলা শুকিয়ে গেছে একেবারে।
খাবে? ... নাও। বোতলটা নির্দ্বিধায় বাড়িয়ে দিলেন মহিলা।
অল্প খেয়ো কিন্তু।
এক ঢোক খাব।
ঠিক এক ঢোক জল খেয়েই বোতলটা হাত বাড়িয়ে ফেরত দিয়ে দিল। শালিনী খেয়াল করছিল পাশে বসা মেয়েটাকে। শালিনী কল্লোলকে ফোন করার পর থেকেই কেমন উশখুশ করতে শুরু করেছিল। কেমন অস্থিরতা। শ্রীদেবীর দিকেও আর তাকাচ্ছিল না। এদিক-ওদিক আনচান, কী যেন করতে চায় নিজেও বুঝতে পারছিল না যেন। বেশ কিছুক্ষণ এমন করার পর মোবাইলে রাইট মেসেজে গিয়ে কী যেন লিখতে শুরু করল। শালিনী আলতো কৌতূহলে তাকাল মেয়েটার মোবাইলের দিকে। সবুজ আলোতে কালো কালো অক্ষর ফুটে চলেছিল। — জে ঠাকুর, তুমি কি এখন অন ডিউটিতে আছ? থাকলে বাড়ি চলে যাও। ভিজো না। বিকজ তোমার ঠান্ডা লেগে যাবে। আই অ্যাম ইন ট্রেন। এতটুকু লিখে থামল মেয়েটা। একটু ভাবল। তারপর লিখল, আমার অনেক অনেক ভালোবাসা নিয়ো। লিখেই লাইনটা পুরো ডিলিট করে দিয়ে লিখল ইন্দ্রাণী। তারপর আবার ইন্দ্রাণী ডিলিট করে লিখল, আমার ভালোবাসা নিয়ো। আবার মুছল, লিখল ইন্দ্রাণী। লিখে নম্বর সিলেক্ট করে সেন্ড করল। খামে মুড়ে উড়ে গেল চিঠি। মেসেজ পাঠিয়ে দু-হাতের মুঠোয় চেপে ধরল ফোনটা।
বাইরের দিকে তাকাল শালিনী। ভাবছিল, জে ঠাকুর। কী অদ্ভুত সম্বোধন। নাম শুনলেই বোঝা যায় অবাঙালি। বিস্বাদ খিচুড়ির মতো বাংলা আর ইংরেজি মিশিয়ে কাকে চিঠি পাঠাল মেয়েটা! কার জন্য এত চিন্তা ওর? কে হয় সে? শালিনীর ফোন শুনে নিশ্চয়ই মনে পড়ে গেছে তার কথা। কিন্তু ওদের দুজনের মধ্যে সৌজন্যের নি:সঙ্গতা, একাকিত্বকে নিশ্চয়ই ধরতে পারেনি মেয়েটি। নাকি মেয়েটা নিজেও ... কে জানে? শালিনী বুঝতে পারছিল মেয়েটা এখন একটা ফোন আসার জন্য অপেক্ষা করছে। আবার ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে অস্থিরতা। এমনিতে মেয়েটি যে বেশ শান্ত প্রকৃতির, সেটা দেখে খানিকটা আন্দাজ করাই যায়। শান্ত স্থির মানুষরা যখন অস্থির হয়ে পড়ে তখন ভারী অদ্ভুত রকমের দেখতে হয়ে যায় তাদের। ইন্দ্রাণী আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে কাকে যেন মিসড কল করল। পর পর দুবার। নিশ্চয়ই জে ঠাকুরকে। মেসেজটা পেয়েছে কি না কমফার্ম হবার জন্য। আবার অপেক্ষা। ... আমার স্বামী তো দু-বছর ধরে বিছানায় শোয়া। পাকপাড়াতে রং কারখানার আপিসে কাজ করত। হঠাৎ করে একদিন অপিসেই স্ট্রোক। বাঁচানোই যেত না। বাঁচল, কিন্তু আধমরা হয়ে। ডানদিকটা একেবারে পড়ে গেছে। ছেলেমেয়ে তো নেই। দুটোতেই একসঙ্গে মরতে বসেছিলাম। তারপর ওর এক বন্ধু বড়োবাজারে একটা কাপড়ের দোকানে আমাকে ব্যবস্থা করে দিয়েছিল বলে দুটোতে কোনওমতে খেয়েপরে বেঁচে আছি। অফিসের যা টাকাপয়সা পেয়েছিল সেসব তো চিকিৎসাতেই শেষ। এখন শীত-গ্রীষ্ম সারা বছর ভোর পাঁচটায় উঠি। ওকে পায়খানা চান করিয়ে, খাইয়ে তারপর নিজে তৈরি হয়ে সকাল আটটার মধ্যে বের হই। আর রাত ন'টার ট্রেন ধরি। তারপর বাড়ি গিয়ে আবার কাজ। এখন তো কদিন রোজ দোকান থেকে বেরোতে দেরি হচ্ছে। সামনে দুর্গাপুজো না। ... কী অবস্থা দেখো বেড়েই চলেছে। এতটুকু কমার নাম নেই। গড়গড় করে বয়স্কা কথাগুলো বললেন শ্রীদেবীকে। তারপর শালিনী আর ইন্দ্রাণীর দিকেও তাকালেন। নিজের ভারী চেহারাটা অতি কষ্টে নাড়িয়ে সিটের ওপর পা তুলে বাবু হয়ে বসলেন।
লজেন খাবে দিদি? খাও না খাও, পয়সা লাগবে না।
না-না খাব না। আর পয়সা লাগবে না কেন বললে, তোমার পেট নেই?
কী রে, ওই মেয়ে দুটো, তোরা খবি? — খা।
শালিনী আর ইন্দ্রাণী দুজনেই মাথা নাড়ল। মেয়েটা এখনও একদৃষ্টে নিজের মোবাইলের দিকে তাকিয়ে আছে।
বিয়ের আগেও কল্লোল বেশ সন্দেহবাতিক ছিল। সুন্দরী প্রেমিকা শালিনী কোনও ছেলে বন্ধুর সঙ্গে ফোনে কিংবা রাস্তায় দেখা হলে দু-মিনিট কথা বললেই কল্লোল বিরক্ত হয়ে উঠত। এমনকি শালিনী কোনও সিনেমা স্টারের প্রশংসা করলেও হাস্যকরভাবে অসহিষ্ণু হয়ে পড়ত কল্লোল। তখন বেশ মজা লাগত শালিনীর। খানিকটা অহঙ্কারও। কিন্তু গুরুত্ব পাওয়া আর সন্দেহ যে এক নয় বুঝেছিল পরে। সন্দেহ যে এত বীভৎস, শিকড় পোড়ানো হতে পারে! ... পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সরি শব্দটাও যে সেই দহনের কাছে কত অসহায় ... কলেজে পড়ার সময় কল্লোল যখন শালিনীর জন্য পাগল। শালিনীও কিছুতেই রাজি নয়। তখন কল্লোল মাঝেমধ্যেই শালিনীর ডেস্কে কিংবা ওর ব্যাগে, মুখে কিছুটি না বলে এক টুকরো কাগজে চার লাইন গালিব লিখে রেখে যেত। একটাই কথা —ইয়া রব ন সমঝে হে ন সমঝে হে মেরি বাত দে ঔর দিল উনকে জো ন দে মুঝকো জুবাঁ ঔর। প্রথমবার তো বাংলাটাও নীচে লিখে দিয়েছিল — হে ঈশ্বর, হয় আমার কথা বোঝার জন্য তাকে অন্য একটি হৃদয় দাও, নয়তো তাকে বোঝানোর মতো আমাকে অন্য কোনো শব্দ। — এখনও মনে আছে! আলতো চমকে উঠল শালিনী।
ছ-ছটা বছর ধরে ছেলেটাকে বুকে এমনি করে জড়িয়ে বড়ো করেছি' বলে লজেন্সের বয়ামটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে দেখাল শ্রীদেবী। কী করিনি তখন? দুটো পেট চালানোর জন্য। অন্যমনস্কভাবে ট্রেনের ফ্যানের দিকে তাকিয়ে বলে চলেছে শ্রীদেবী। তারপর আমার বরটার এক বন্ধু একদিন বুদ্ধি দিল ছেলেটাকে মিশন ইশকুলে ভরতি করে দিতে। পড়াশুনো শিখলে মানুষ হবে। নইলে তো চটকলের গুন্ডা জোচ্চোর তৈরি হবে। যা জায়গা খারাপ ওখানের, জানো তো না। তাই করলাম। লোকটাই নিজেকে ছেলের বাবা বলে পরিচয় দিয়ে অনেক চেষ্টাচরিত্তির করে লিলুয়ায় একটা মিশন ইশকুলে আছে না, ওখানে ভরতি করে দিল।
কী করতিস তখন কাজকম্ম?
ওই তো সেই কাচাকুচি, ইস্তিরি ... চলে যেত। তারপর থেকে না লোকটা মাঝেমধ্যেই আসত আমার কাছে। কিছু করত না, শুধু গল্প করে কিছু কিনেটিনে দিয়ে চলে যেত। ওর সঙ্গে, কয়েকবার ছেলের সঙ্গে দেখাও করতে গেছি। তারপর একদিন হঠাৎ লোকটা আমাকে চাইল। আমারও একটু একটু ভালোবাসা হয়ে গেছিল ওর ওপর বুঝলে তো। অল্প হেসে বলল শ্রীদেবী। থেকে গেলাম ওর সঙ্গে। মেয়েরা বড্ড বোকা হয়, না? কী করব বলো, আমাকেও তো বাঁচতে হবে বলো, চাদ্দিকে যা সব রাক্ষস ছিল ...
আবার ভুল করলি? অল্প হতাশা মাখানো বিরক্তি বয়স্কার গলায়।
বুঝিনি গো। আমাকে বলেছিল বিয়ে করবে। তখন জানতাম না হারামিটার অন্য আরেকটা বউ রয়েছে, ছেলেমেয়ে আছে। আমি জেনে যাবার পরেও খুব করে বোঝাতে এসেছিল আমাকে। বলেছিল সব খরচ নাকি ওর। আমি বললাম, বেশ তালে বিয়ে কর। তখন শালার ভয়েতে শুকিয়ে গেল। তারপর আর আসেনি। এই জন্য তো সবকটা বাচ্চা মেয়েগুলোকে বলি, শুদ্ধু আমার লজেন খা আর ভালো থাক। সোজা অপিস-ইশকুল যাবি আর বাড়ি ফিরবি। কোনও ছেলের দিকে তাকাবি না। কথা বলবি না। একদম প্রেম করবি না। গলা চড়িয়ে দিল শ্রীদেবী।
এখনও মিশনেই আছে তোমার ছেলে?
না-না মুখ বেঁকিয়ে ফেলল শ্রীদেবী। বাপের বদ রক্ত রয়েছে না। নিজের ছেলে হলই বা। ছেলেই তো। ঠিক কেলাস এইট পর্যন্ত পড়ল, তারপর মিশন থেকে পালিয়ে এসেছে। এখন সারাদিন কতকগুলো গুন্ডাখচ্চরের সঙ্গে মেশে। কোনোদিন বাড়ি আসে শুধু গিলতে। কোনও দিন আসেই না। ... মরবে মরবে। ঘরে একটা পয়সা রাখতে পারি না জানো। ঠিক খুঁজে খুঁজে বার করে ঝেড়ে দেবে। না পেলে আমার কাপড়চোপড় ধরে টান দেয় পয়সা বার করার জন্য। আর কত লুকিয়ে এদিক-ওদিক রাখব!
ফোন বাজল শালিনীর। কল্লোল করেছে।
হ্যাঁ বলো।
পৌঁছেছ?
না।
কোথায়?
বৈদ্যবাটি পেরোল।
পৌঁছে জানিয়ো কিন্তু।
হ্যাঁ।
ছাতা রয়েছে সঙ্গে?
না।
ইস তা-লে তো পুরো ভিজতে হবে। বাড়ি গিয়ে চান করে নিয়ো। বৃষ্টির জলটা গায়ে বসবে না। মনে থাকবে তো। নাকি আমাকে গিয়ে চান করাতে হবে? বলে ওদিক থেকে হাসল কল্লোল।
শালিনীও অল্প হাসতে হাসতে বলল, ঠিক আছে করে নেব। তোমার আর কতক্ষণ?
এই আর ঘণ্টা খানেকের মধ্যে বেরিয়ে যাব।
সাবধানে।
হ্যাঁ, ঠিক আছে। ছাড়লাম। বলার সঙ্গে সঙ্গে ফোন কট। এতক্ষণ বেশ চিৎকার করেই ওদিক থেকে কথা বলছিল কল্লোল। শালিনী নিজের সেটটাকে কান থেকে খানিকটা দূরে রেখেও স্পষ্ট শুনতে পেয়েছে। পাশের মেয়েটাও নিশ্চয়ই শুনেছে ওদের দুজনের কথা। সেদিনের ঘটনাটার পর থেকে কল্লোল হঠাৎ খুব বেশি কেয়ারিং হাজব্যান্ড হয়ে পড়েছে। কোনও ম্যানেজমেন্টের বই পড়ে শিখেছে বোধহয়। সুখী দাম্পত্য জীবন বজায় রাখার কিছু প্রয়োজনীয় টিপস। — তবু এই এসব অভিনয়টুকুর জন্যই কি মানুষ একসঙ্গে থাকে? বাঁচে? চায়? ... অপেক্ষা করে!
ধু-স, লজেনই ভালো — কী বলো?
শ্রীদেবীর কথার উত্তর দিলেন না বয়স্কা। খানিকক্ষণ চুপচাপ বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকলেন, তারপর নিজের ব্যাগের ভেতর থেকে দু-টাকার একটা কয়েন বার করে শ্রীদেবীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, দাও তো দেখি চারটে।
শ্রীদেবী কয়েনটা নিয়ে নিজের ঝোলায় চালান করে দিয়ে, ভেতর থেকে ছোট্ট এক টুকরো খবরের কাগজ বার করল। তারপর বয়াম খুলে চারটে লজেন্স নিয়ে কাগজে মুড়ে বয়স্কার দিকে বাড়িয়ে বলল, এই নাও। বয়স্কা নিজে একটা মুখে দিয়ে বাকিগুলো ওদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, নাও, তোমরা নাও।
ইন্দ্রাণী অল্প হাসি টেনে বলল, আমি খাব না।
আরে খাও তো। কী একেবারে হাতিঘোড়া দিচ্ছি! বলে নিজে হাতে করে ওদের হাতে দুটো গুঁজে দিলেন। বাকি একটা কাগজটায় মুড়ে ব্যাগে ঢোকাতে ঢোকাতে ঠোঁট টিপে হেসে বললেন, আরেকটা রইল কত্তার জন্য। রোজ কিছু না কিছু নিয়ে যেতেই হবে। নইলেই বুড়োর মুখ ভার। কোনোদিন চিঁড়েভাজা, কোনোদিন বাদাম — যা হোক। আজ লজেন্সই খাক। শালিনী ভীষণ চাইছিল ইন্দ্রাণীর মোবাইলটা এক্ষুনি যেন বেজে উঠুক। জে ঠাকুর কি সত্যিই পায়নি মেসেজটা? মিসড কলটা তো অন্তত দেখেছে। তা-লে ...!
আপনার কীসের কানেকশন? জিজ্ঞেস করে ফেলল মেয়েটাকে।
অ্যাঁ ... আমার? এয়ারটেল।
ওহ। দু-দিন ধরে তো এয়ারটেলের টাওয়ারের খুব প্রবলেম চলছে না? লাইনই পাওয়া যাচ্ছে না। বলে যতটা সম্ভব সহজ হেসে তাকাল মেয়েটার চোখের দিকে। মেয়েটা ঠোঁট খুব অল্প ফাঁক করে এমনভাবে মাথা নাড়ল যাতে হ্যাঁ কিংবা না কিছুই বোঝা গেল না। আর কিছু বলতে পারল না শালিনী। মুঠোয় লাল লজেন্সটা চেপে ধরে চোখ বন্ধ করল
পুরো লেডিস কম্পার্টমেন্টটায় শুধু চারজন অসমবয়সি মেয়েলোক। নিকষ অন্ধকার দিয়ে ধাতব শব্দ করে প্রচণ্ড বৃষ্টিকে সঙ্গে নিয়ে ছুটে চলেছে ট্রেন। চারজনেই হঠাৎ করে চুপ। মানকুণ্ডু আর চন্দননগরের মাঝামাঝি লাইন চেঞ্জ করার সময় ট্রেনের আলো আচমকা নিবে গেল। বাইরের অন্ধকার ভেতরে মিশে একাকার। অনন্ত বিস্তৃত ধাতব পথ বেয়ে ঝমঝম ছুটে চলা ট্রেনটাকে মনে হচ্ছিল যেন পৃথিবী ছাড়িয়ে বহুদূরে মহাকাশের অসীম শূন্যতায় ছুটে যাচ্ছে। যার অতীত নেই, ভবিষ্যৎ নেই, স্মৃতি নেই, স্বপ্ন নেই, অন্ধকার ... অন্ধকারে শুধু চারজোড়া চোখ নরম তারার মতো জ্বলে ছিল। তাকিয়ে ছিল পরস্পরের দিকে।
সিনেমা এবং
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন