বিনোদ ঘোষাল
— কী নাম বললি?
— সূর্যদ্বীপ।
— দ্বীপ?
— ওই দ্বীপের মতোই। চল গেলেই দেখতে পাবি। সাইকেল চালাচ্ছিল দুজনেই। পশ্চিমের ন'পাড়া ছাড়িয়ে মাঠের গা দিয়ে আলপথ। অ-নে-ক দিন পর আসা হল এদিকটায়। আগে এদিকে বাড়িঘর অনেক কম ছিল। এখন বেশ কিছু হয়েছে। আলপথ পার করে একটা ফাঁকা জমি। তারপর জল। সাইকেল থামাল সুমন।
— দাঁড়া, এর পর আর সাইকেলে যাওয়া যাবে না। এখানেই লক করে রেখে দে।
— চুরি হবে না তো? অঙ্কুশ জিজ্ঞাসা করল।
প্রাোবাবলি না। আমি তো বার কয়েক এসেছি, আজও হবে না। বলে সুমন আঙুল তুলল সামনের দিকে।
— ওই যে বাঁশটা জলের ওপর আড়াআড়ি দেখছিস। ওটা ধরেই কিন্তু ওপাড়ে যেতে হবে।
সাইকেল রেখে বাঁশে ওঠার আগে চারদিকে ভালো করে তাকাল অঙ্কুশ। দ্বীপটা এখান থেকে দেখা যাচ্ছে না। শুধু থইথই জল। কোথাও টলটলে, কোথাও পানিফলের চাষে ঢাকা। তার ওপর দিয়ে দিয়ে বাঁশের সাঁকো। সাঁকো মানে মারাত্মক সাঁকো। জলের মধ্যে মধ্যে একজোড়া বাঁশ ক্রস করে পোঁতা। আর তার মাঝখান দিয়ে শোওয়ানো একটা করে বাঁশ। আর ওই বাঁশটার ওপর দাঁড়ালে কোমরের কাছাকাছি নীচেরটার প্যারালাল আরেকটা বাঁশ বাঁধা। ওপরেরটাকে ধরে ধরে নীচেরটায় অতি সাবধানে পা ফেলে এগোতে হবে। এভাবেই অনেকটা পথ যেতে হবে এখন। সুমন আগে উঠল। বাঁশে পচ পচ শব্দ হল।
— কী রে ভেঙে যাবে না তো? ভয় পেল অঙ্কুশ শব্দটা শুনে।
— ক্যা জানে! উঠে তো আয়। পা টিপে টিপে হাঁটতে শুরু করল দুজনে। অনেকক্ষণ ধরে এই সার্কাস রাস্তা পার করে একসময় পৌঁছাল ওপাড়ে।
নেমেই অঙ্কুশ একটু দম নিয়ে জিজ্ঞেস করল — হ্যাঁরে, মানুষজন থাকে তো দ্বীপটায়? কাউকেই তো দেখছি না।
চল্লিশটা ফ্যামিলি। প্রায় দেড়শোর মতো লোক। থাকে না মানে? তুই ভাই আমার কাজটা শুধু করে দে। একবার কেসটা ছড়িয়ে গেলে ব্যস।
অঙ্কুশ এদিক-ওদিক তাকাল। চারদিকটা সবুজে সবুজ। মাথার ওপর আকাশটা নীলে গোলা। বিশ্বাসই হচ্ছিল না বাড়ি থেকে মাত্র একঘণ্টার সাইকেলপথ দূরত্বে রয়েছে ও।
সুমন, সরকার-বিরোধী পার্টির লোকাল কমিটির মেম্বার। আর অঙ্কুশ খবরের কাগজে ফ্রিল্যান্স করে। পার্টি থেকে সুমনকে বলা হয়েছে নতুন কিছু ইস্যু খুঁজতে। আর কাগজ থেকে অঙ্কুশকে জানানো হয়েছে আরে নতুন কিছু বিষয়ে কভার করুন। নতুন স্টোরি। সুমন আর অঙ্কুশ এক পাড়ার ছোটোবেলার বন্ধু। ক-দিন আগে চায়ের দোকানের আড্ডায় সুমন অঙ্কুশকে দিয়েছিল প্রস্তাবটা।
— তুই তো স্টোরি খুঁজছিস। একটা জায়গায় যাবি? দারুণ স্টোরি পেতে পারিস, কেউ জানে না।
— কী? কোথায়?
পুরো ব্যাপারটা সংক্ষেপে জানিয়েছিল সুমন। এই রিষড়াতেই প্রায় চল্লিশ বছরের পুরোনো একটা আয়রন স্টিল কোম্পানি বহুদিন ধরে ধুঁকতে ধুঁকতে এখন প্রায় বন্ধের মুখে। ফ্যাক্টরিটার মোট জমির পরিমাণ প্রায় পাঁচশো একর। ফ্যাক্টরির অংশটুকু বাদ দিলে বেশির ভাগ জলা জমিই দীর্ঘকাল ধরে পড়ে রয়েছে। সেই ফাঁকা জমির কিছু অংশে আজ থেকে প্রায় কুড়ি বছর আগে বাংলাদেশ থেকে আসা বেশ কিছু উদ্বাস্তু থাকতে শুরু করে। কুড়ি বছর পার হয়ে যাওয়া সত্বেও রাজ্য সরকার তাদের ভোট পাবার জন্য ভোটার কার্ড দিয়েছে। জমি তাদের নামে হয়নি, কিন্তু জমিতে ফলানো ফসল কিংবা মাছের ওপর বখরা নিয়ে এসেছে। প্রায় বছর খানেক আগে স্টিল কোম্পানিটা তাদের সবকিছু বিক্রি করে দিয়েছে অন্য একটি কোম্পানিকে। তারা এই জমিতে একটি উপনগরী তৈরি করবে। সুতরাং রুলিং পার্টির যেসব দাদারা এতদিন ধরে উদ্বাস্তু লোকগুলোর কাছ থেকে ভোট, ভেট সব নিয়ে এসেছিল, এখন তারাই নতুন কোম্পানির পয়সা খেয়ে এদের সবাইকে ভিটে ছাড়া করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। আর এই সুযোগটাই নিতে চায় অ্যান্টি পার্টি। উদ্বাস্তুগুলোকে এককাট্টা করে, মিটিং-মিছিল করে রুলিং পার্টির জোনাল লেভেলে যতটা ভাবমূর্তি নষ্ট করা যেতে পারে। সব থেকে বড়ো কথা হল কাজ কতটুকু হবে জানা নেই, কিন্তু এই সুযোগে সুমনের ভাবমূর্তি যে নিজের পার্টির কাছে খানিকটা চকচকে হবে সেটা স্পষ্ট। তুই তো কাগজে লিখিসটিখিস। এটা নিয়ে যদি একটা স্টোরি করতে পারিস তোরও লাভ আমারও লাভ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর সরল সাদাসিধে মানুষের ওপর রাজ্য সরকারের কালো হাত। লিখতে পারলে জমে যাবে। দেখবি নাকি? সবটা বুঝে অঙ্কুশও আর দ্বিধা করেনি। ওরও এটা একটা সুযোগ হতে পারে কোনও নিউজপেপারে জয়েনিং অফার। যদি লেখাটা ক্লিক করে যায়। সেজন্য আজ আসা। খানিকটা হাঁটার পর দু-চারটে ঘর চোখে পড়তে লাগল। ছোটো ছোটো ঘর। টিন আর কাঠ দিয়ে তৈরি। সুমন বলল ব্যস, এসে পড়েছি। এবড়োখেবড়ো মাটির সরু এ রাস্তা। দুধারে টলটলে জল। বেশ গভীর। দুটো বাচ্চা একটা ছোট্ট নৌকা চালাচ্ছে জলে। একটা বছর পঞ্চাশের লোক শালতি টানছিল। ওদের দেখে কাছে এল, সুমনকে দেখে একগাল হেসে বলল,
— দাদায় আইসেন।
— হ্যাঁ। আপনি এক কাজ করুন। সবাইকে একবার ডাকুন। কথা আছে।
— আইচ্ছা। আপনে কমলের ঘরে গিয়া বয়েন। আমি ডাকতাসি।
— ঠিক আছে। আমরা এখানেই দাঁড়াচ্ছি। আপনি আসুন।
লোকটা হাঁইপাঁই করে শালতি টানতে লাগল।
— অ খোকন, ... কমলের ঘরে আয়। বহনের আছে। — হেইই বাদল — বাদল, ডাকতে ডাকতে চলে গেল লোকটা।
সুমন বলল এখানে এই লোকটাই বলতে পারিস প্রধান, সব থেকে বয়স্ক। সবাই শোনে।
— নাম কী ওনার?
— সোহাগ বৈরাগী। ওর ঘরে যা একখানা জিনিস আছে না, ওহ।
— কী?
— চল। গেলে দেখতে পাবি। শাঁসে ভরা ডাব। যদি কেসটা ঠিকঠাক ছাড়াতে পারিস তোর পুরো চামচ ডুবে যাবে শাঁসের ভেতর। বলে খিক খিক করে হাসল সুমন।
একটু পরেই সোহাগ বৈরাগী এসে বলল — চলেন। অহনই আইয়া পড়ব হগ্গলে। শালতিটা দড়ি দিয়ে ডাঙায় বাঁশের খুঁটিতে বেঁধে উঠে পড়ল সোহাগ। এই দাদারে তো চিনলাম না। আপনাগো লোক?
— না-না , এর কথাই তো সেদিন বলেছিলাম আপনাকে। আমার বন্ধু। খবরের কাগজে চাকরি করে। আপনাদের সব কথা ও কাগজে লিখবে। আপনাদের দু:খ-কষ্ট সব কিছু।
স-ও-ব-ই বলে অঙ্কুশের দিকে তাকাল সোহাগ। সব কি আর কওন যায়, না লেখন যায়? বলে নিজে একটু হাসল। সাবধানে আয়েন।
অঙ্কুশ হাঁটতে হাঁটতে এদিক-ওদিক দেখছিল। জায়গাটা সত্যি বিচিত্র। একটা বিশাল জলকে এলোপাথারি সরু সুতোর মতো মাটির আল দিয়ে যেন চিড়ে দেওয়া। আলগুলো উঁচু-নিচু-পিছল, কোথাও মাটি দেখা যায়, কোথাও বা ঘন ঘাসে ঢাকা।
অঙ্কুশ জিজ্ঞাসা করল — কদ্দিন আছেন আপনারা এখানে?
তাও প্রায় বিশ বচ্ছর হইল। পেরথমে আইসিলাম তিরিশজনা। অহন চল্লিশ ঘর, প্রায় দ্যাড়শো মানুষ। বলে কালো দাঁতগুলো বার করল সোহাগ, অহংকারে।
কোথা থেকে এসেছিলেন?
বরিশাল। আইয়্যাতো থাকনের জাগা পাই না। হ্যাসে খোঁজতে খোঁজতে এহানে পাইলাম। তহন তো শুধুই জল। কত কষ্ট করছি ঘর বানাইতে।
কাজ কেমন কী করেন সবাই?
এই-ই পানিফল চাষ দেই, মাছ ধরি, খানিকটা শাক-সবজি ধানজমিও আছে। চইল্যা যায়। আমাগো একার কিস্যু নাই। বেবাক সকলের।
সুমন জিজ্ঞেস করল — আর সূর্যদ্বীপ নামটা দিয়েছিল কে?
সোহাগ বলল — আমার ভাই। বেহাগ। এখান থিক্যা প্রথম সূর্য ওঠা দেহন যায় বইল্যা।
—সে কোথায়?
— নাই। প্রায় দশ বছর হইল মরছে। সাপে কাটছিল। এহানে খুব সাপ।
অঙ্কুশ বলল — আপনাদের যাওয়া-আসা করার যা রাস্তা দেখলাম, কারও শরীর খারাপ হলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান কীভাবে?
— যেভাবে আপনারা আইলেন। বাঁচতে গ্যালে কষ্ট তো করতে হইব, না কি?
— হুম ঠিকই। বলে সুমন একটু হেসে বলল কিন্তু ছেলে-মেয়ের বিয়ে-থা দিলে বরযাত্রী-কন্যাযাত্রী আসে কীভাবে?
— আমরা বাইরে মাইয়্যা দিই না। বিয়া-শাদি সব আমাগো এহানের মধ্যেই। এই কইর্যাই তো পরিবারটা বড়ো হইছে, বলে আবার হাসল সোহাগ। অহংকারে। অঙ্কুশ দেখছিল এখানে জলের মাঝেমাঝে প্রতিটি বাড়ির জন্য একটি করে মাটির ঢিবি। ঢিবির ওপর প্রতিটি বাড়ি একলা। তাই এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে নৌকোয় করে যেতে হয়।
— আইয়া পড়ছি। একটা ঢিবির ওপর উঠল তিনজন। সোহাগ বলল — এইডা কমলের ঘর। অঙ্কুশ দেখল ঘরের পিছনে অনেকটা জমি। অনেকরকম শাক-সবজি ফলেছে। বেগুন-লঙ্কা-টম্যাটো, পেঁপে, আর একদিকে শুধু হলুদ আর হলুদ। গাঁদার বাগান। গাঁদার বুনো গন্ধে ভরে আছে জায়গাটা।
— দারু, নারে? সুমন বলল।
অঙ্কুশ উত্তর দিল না।
এইডা হইল আমাগো সবজি বাগান, যার যা ঠেকা লাগে এখানে আইয়্যা নিয়া নিই সকলের একটাই জমি?
হ উপায় কি? আর জাগা কই। বেশি হইলেই তো ভাগাভাগি, তাই না? বলে সোহাগ টিনের ঘরটায় ঢুকে এক প্যাকেট বিড়ি বার করে নিয়ে এল।
— ঘরে নেই কেউ?
— নাহ কমল একাই থাহে। বে-থা করে নাই। পাগলা পোলাডা। বড়ো ভালো। অহন কাজে গেছে, আইয়্যা পড়ব।
— কীজ কাজ?
মাছ ধরতে।
— আপনারা আমাদের ওদিকে যান না? অঙ্কুশ জিজ্ঞেস করল।
— নাহ। তেমন ঠেকা লাগে না।
অঙ্কুশ গাঁদা বাগানটার কাছে এল। হলুদ ছোটো ছোটো প্রজাপতি ফিনফিন করছে ফুলের ওপরে। দিদির সঙ্গে ছোটোবেলায় দত্তকাকুদের বাড়ির পিছনের মস্ত গাঁদা বাগানটায় প্রতি বছর শীতকালের সকালে কত লুকোচুরি খেলেছে ও। বাড়ি ফেরার পরেও সেই বুনো গন্ধ গা-ময় লেগে থাকত। দিদি ঘুমিয়ে পড়লে ওর গায়ের গন্ধ শুঁকত অঙ্কুশ। দিদিকেও তখন মনে হত একটা গাঁদা গাছ। অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল ও।
— চলেন দাদা। আইয়্যা পড়ছে সকলে।
অঙ্কুশ পিছনে ফিরে দেখল প্রায় গোটাকুড়ি বিভিন্ন বয়সের লোক।
প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে মানুষগুলোর অভাব-অভিযোগ-সওয়াল জবাবের পর সুমন উঠে দাঁড়িয়ে বলল, — ঠিক আছে, আপনাদের সব কথা আমার এই বন্ধু আজ শুনলেন। ও কাগজে আপনাদের সব কথা লিখে সরকারকে জানাবে। আশা করি আপনারা সুবিচার পাবেন। আপনারা ভরসা রাখুন। এই জমি আপনাদের। আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করব যাতে আপনাদের এখান থেকে কেউ সরাতে না পারে। আমাদের পার্টি থেকে আমরা যতটা সম্ভব চেষ্টা করব। আপনারা ধৈর্য রাখুন।
একটা লোক বলে উঠল — ভয় লাগে দাদা। ওগো লোক রোজই আইয়্যা ধমকায়। কয় জমি ছাইড়্যা না দিলে আমাগো খুন করব।
বললেই হল, কোনও ভয় নেই। এবার আপনাদের কথা গোটা দেশের লোক জানবে, দেশের সরকার জানবে, আমার এই বন্ধু জানাবে।
শুনে সবাই এমন ভাবে তাকাল অঙ্কুশের দিকে যে অঙ্কুশ অস্বস্তিতে পড়ে গেল। অন্য দিকে তাকাল ও।
সোহাগ বলল — বেশ, আজ এইখানেই মিটিং শ্যাষ হইল। দাদারা এট্টু বিশ্রাম করুক। তুমরা কামে যাও গিয়া। সবাই উঠে ফেরার সময় কেউ কেউ সুমন আর অঙ্কুশকে নমস্কার করল।
সোহাগ বলল — নৌকায় আয়েন। আর হাঁইট্যা কাম নাই। জলের ধারে বাঁধা ছোট নৌকোটায় সোহাগ আগে উঠে বাশের লগিটা তুলে জলে গুঁজে দিয়ে বলল আস্তে নামেন। ভয় নাই। উঠল দুজনে। জঙ্গল ঝোপঝাড় ভরা আলরাস্তার গা দিয়ে জলের মধ্যে সরসর শব্দে এগোতে থাকল নৌকোটা। নভেম্বর মাসের বেলা বারোটার রোদ্দুর জলের মধ্যে ঝলমল করছে। কিন্তু রোদ্দুরের তাপ গা পোড়াচ্ছে না। সুমন অঙ্কুশের কানে কানে বলল — এইবার দেখবি আসলি জিনিস।
আইয়্যা পড়ছি আমার ঘরে। নামেন দাদারা। সাবধানে। সোহাগ নৌকো ডাঙায় ঠেকাল। ঢিবির ওপর একলা ঘরটা ছোটো। উঠে সোহাগ হাঁকল — মণি - অ মণিই, দুখান পিঁড়া দিয়া যারে মা।
ঘরের ভেতর থেকে দু-হাতে দুটো পিঁড়ি নিয়ে বেরিয়ে এল বছর বাইশ-তেইশের একটা মেয়ে। চমকে উঠল অঙ্কুশ। মেয়েটা পিঁড়ি রেখে বলল — বয়েন, জল দিতাছি।
ঘোর লেগে গেল অঙ্কুশের। সদ্য ডাঙায় তোলা শোল মাছের মতো রোদ্দুরে ঝিলিক দিচ্ছে মেয়েটা।
সুমন ডাকল — কীরে?
— হুঁ।
— বস।
মেয়েটা ঘরে চলে গেল। বসল তিনজনেই। সোহাগ বলল, আমার মাইয়্যা, অর মায়ে চইল্যা যাবার পর থিক্যা আমারে মাইয়াডাই বাঁচাইয়া রাখছে।
ওহ ... আপনার স্ত্রী — বলে থেমে গেল সুমন।
সাতদিনের জ্বরে চইল্যা গেল। তাও পেরায় বছর বারো হইল, কতদি-ন ... একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল সোহাগ। তখনই মেয়েটা দুহাতে দুটো জলের গ্লাস নিয়ে আসল। মুড়ি খাবা তো তোমরা? সহজ প্রশ্ন।
এ্যাঁ - ন ন না- না এখন মুড়ি খাব না। তোতলাল অঙ্কুশ।
— চা? খাবা?
— না-না আজ কিছু খাব না।
সুমন হেসে বলল — আজ শুধু জলই থাক। বরং আরেক দিন এসে তোমার রান্না খেয়ে যাব কেমন!
হাসল মেয়েটা। নিশ্চয়ই আইবা।
অঙ্কুশ গোগ্রাসে তাকিয়ে ছিল মণির দিকে। হঠাৎ খেয়াল হল সোহাগ ওর দিকে তাকিয়ে দেখছে। চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল — গাঁদা ফুলের বাগানটা খুব সুন্দর লাগল।
মণি জিজ্ঞেস করল — কোনডা? কমলকাকার বাগান?
— হুঁ।
আর আমার বাগান দেখ নাই তোমরা? বা- রে!
সোহাগ হা- হা করে হেসে উঠল— নারে মা, আইজ তরটা দেখাইন্যে পারি নাই।
— ক্যান দ্যাখাও নাই। আমার বাগান ভাল্লাগে না তোমার। আমারে খালি মিছা কও।
— না রে পাগলি, তর বাগান সগ্গের মতন সুন্দর।
উ-হ খালি মিছা কথা। ঠোঁট বেঁকাল মণি।
অঙ্কুশ জিজ্ঞেস করল — কোথায় তোমার বাগান?
মণি আঙুল তুলে বলল — ওই তো খইল ঘরটার পিছনে।
অঙ্কুশ উঠে দাঁড়িয়ে বলল — চল, তোমার বাগানটাও দেখে আসি। চল সুমন।
সুমন বলল — আমি আরেকদিন দেখব। আজ তুই-ই বাগান দেখে আয়। বলে হাসল। সোহাগ কপট রাগ দেখাল। দাদারে জ্বালাইলি দেখছি। আপনি পাগলির কথায় যা না দাদা। অঙ্কুশের কেমন যেন মনে হল সোহাগের ইচ্ছে অঙ্কুশ মণির সঙ্গে যাক। ঠিক আছে। একবার দেখেই আসি।
মণির চোখ-মুখ খুশিতে উজ্জ্বল। আঁচলটাকে টেনে কোমরে গুঁজল। আরও টানটান হয়ে উঠল মেয়েটার কিলবিলে শরীর। মণি হাঁটা লাগাল। পেছনে অঙ্কুশ। অল্প হাওয়া বইল। হাওয়াতে মণির ঘামের গন্ধ পেল যেন অঙ্কুশ। বিনুনি পিঠের খাঁজ বরাবর গিয়ে কোমরের নীচে থেমে গেছে। বাঁশের সাঁকোতে উঠল মণি। হাত উঁচু করে আরেকটা বাঁশ ধরল। ঘামে ভেজা ব্লাউজ দেখল অঙ্কুশ। সাবধানে আস। তবে জলে কুমীর নাই। ভয় পাইও না। হি - হি। মণি তরতর করে ওপারে চলে গিয়ে দাঁড়াল। অঙ্কুশ সাবধানে পা টিপেটিপে হাঁটতে থাকল। অনন্ত পথ যেন। ফুরোতেই চায় না। ওপারে মণি। বাঁশের ওমাথায় পৌঁছাতে মণি হাত বাড়াল। নাও হাতটা ধর। লাফাইও না, পিছলাইবা। অঙ্কুশ নিশপিশ হাত মণির হাত ধরে লাফ দিয়ে নামতেই, যাহ ... ঝুপ করে কেমন পালটে গেল। সব সিনেমার দৃশ্যের মতন। গাঁদা ফুলের বাগানটা। বুক ... না না প্রায় গলা অবধি উঁচু। অঙ্কুশ হাফপ্যান্ট, পাশে ফুলছাপ সাদা টেপজামা পরা দিদি বলছে — অকু, ভেতরে ঢুকব। অনেক প্রজাপতি। তাড়াতাড়ি আয়। বলে দিদি ঢুকে গেল গাঁদা বাগানে, অঙ্কুশও ঢুকল। ঘনঘন গাছগুলো। দিদিকে দেখা যাচ্ছে না। দিদি - এ্যাই দিদি — কই। দিদি ভয় করছে।
— অকু ফুল ছিঁড়বি না কিন্তু। ন্যাড়া হয়ে যাবে গাছটা। আমি কিন্তু দেখতে পাচ্ছি তো।
কই গেলি দিদি এই -ই।
— ক্যামন আমার বাগান?
— এ্যাঁহ ... হ্যাঁ- হ্যাঁ ভালো-ভালো। মাথা ঝিমঝিম করছে অঙ্কুশের। চল এবার ফিরি।
এবার সাঁকোতে প্রথমে উঠল অঙ্কুশ। পিছনে মণি। বাহ এইত তড়বড় কইর্যা যাইতাছ। টেপজামা পরা মেয়েটাকে কি দেখা যাচ্ছে? অকু আমায় ধরিস কিন্তু।
অঙ্কুশ নীচে নেমে হাত বাড়ল। মণির হাত ধরে ঝপাং করে নামতেই আবার সেই বুনো ঘামের গন্ধটা নাক বেয়ে তলপেট পর্যন্ত সেঁদিয়ে গেল অঙ্কুশের। প্রায় টলতে টলতে ও সোহাগের ঘরের সামনে গেল। মণি ততক্ষণে পৌঁছে গিয়ে অঙ্কুশের যে ওর বাগান ভালো লেগেছে সে বিষয়ে বলতে শুরু করে দিয়েছে।
সুমন মুচকি হেসে বলল — দেখলি? ইঙ্গিতটা অন্যদিকে।
অঙ্কুশ গম্ভীর হয়ে ঘাড় কাত করল।
সুমন বলল, জানিস ওরা রাত্রে চাঁদের আলোয় মাছ ধরে। দৃশ্যটা ভাব একবার।
অঙ্কুশ বলল — তাই?
— হ, বাবা তো রাতে ঠাওর পায় না। আমিই ধরি।
সোহাগ দাঁত বার করে বলল — কইলাম না, মাইয়া আমার ডাকাইত। ভয়ডর কিস্যু নাই।
আমিও আসব একদিন, মাছ ধরা দেখতে।
বেশ তো আয়েন না। সামনের পূর্ণিমাতেই আয়েন। বৈকালে চইল্যা আইবেন। রাতে এহানেই দুইটা ডাইল-ভাত খাইবেন হনে।
সুমন বলল — বেশ, আজ তালে উঠি। মণি আসলাম।
মণি হাসল। সুন্দর হাসি।
লম্বা সাঁকোটার মুখে এসে সোহাগ অঙ্কুশের হাতটা চেপে ধরে বলল, এট্টু দ্যাখবেন আমাগো। কেউ শোননের নাই। থাকনের জমিটুকু চইল্যা গেলে ... এতগুলি মানুষ ... থেমে গেল সোহাগ। ওর গলায় কান্নার বাষ্প।
অঙ্কুশ বলল — আমি নিশ্চয়ই চেষ্টা করব। আসি।
পাঁচিলের গায়ে মস্ত পোস্টার। বলিউডের একজন চোখ ঝলসে দেওয়া নায়িকা ঘাগরা চোলি পরে নাচের ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে। তার পাশে ভিলেন আর নায়কের রক্তমাখা বিকৃত হিংস্র মুখ। পোস্টারের নায়িকার গায়ে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে পেচ্ছাপ করছে। নায়িকার আধখোলা বুকে, নাভিতে লক্ষ্য করে পেচ্ছাপ ফেলছে ছেলেটা। দৃশ্যটা দেখতে দেখতে সাইকেল চালাচ্ছিল অঙ্কুশ। লাইব্রেরি যাচ্ছিল। লাইব্রেরির সামনে এসে সাইকেলটা থামিয়ে পাঁচিলের গায়ে হেলান দিয়ে রাখতে গিয়ে চোখ পড়ল একটা খালি ভাঙা ফিনাইলের বোতলের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে ঝিনঝিন করে উঠল গোটা শরীর। বছর তিনেক আগে পুরো দু-বোতল ফিনাইল খেয়েছিল দিদি। ফাল্গুন মাসে। দোলের আগের দিন। তেইশ বছরের দিদি কনসিভ করেছিল। অঙ্কুশ জানে পার্থদাই সেই সম্ভাব্য সন্তানের জন্মদাতা। আর কেউ হতে পারে না। কিন্তু পার্থদা অস্বীকার করেছিল। আর দিদি অস্বীকার করেছিল বেঁচে থাকতে। প্রায় ছ-বছরের সম্পর্ক ছিল ওদের। পার্থদা ইঞ্জিনিয়ার। শুনেছে পার্থদা এখন মুম্বাইতে। ঘোরতর সংসারী। দেড় বছরের একটা ছেলে রয়েছে। অঙ্কুশদের বাড়িতে আর ফিনাইল ঢোকে না। দিদি সবচেয়ে বন্ধু ছিল অঙ্কুশের। অকু বলে ডাকত অঙ্কুশকে। লাইব্রেরিতে গোটা সন্ধেটা এলোমেলো ম্যাগাজিনের পাতা ওলটালো। কোনও কিছুতেই মন বসছে না। কয়দিন ধরে সারাক্ষণ চোখের সামনে একটা মেয়ের শরীর ভেসে উঠছে। অঙ্কুশ জানে সেই শরীরটা কার। লম্বা বিনুনি, ঘাসের মতো গন্ধের ঘাম। বাইশ বছরের অঙ্কুশ কোনোদিন প্রেমে পড়েনি। কুকুরের গুয়ের মতো ঘেন্না লাগে শব্দটাকে।
— তুমি ঘরে গিয়া বস আমি দুটা ডুব দিয়া আইতাসি। নাকি যাবা আমার লগে?
— কোথায়? জিজ্ঞেস করল অঙ্কুশ।
— কোথায় আবার, যেহানে আমি যাইতাসি — চানে, হি-হি। পাগলা একখান। বলে খিলখিলিয়ে হাসে মণি। আজ সকালে খানিকটা আনমনেই কখন যে এখানে চলে এসেছে অঙ্কুশ নিজেও জানে না। কেন এল? কে জানে? সুমন জানে না। সোহাগ ঘরে নেই। মণি বলেছে আজ সে অনেকটা দূরে গেছে মাছ ধরতে। ফিরতে সন্ধে হবে। ঘরে মণি ছিল একা। অনেক গল্প সারা বেলা। দুপুর গড়াতে মণি বলল এহানে দুমুঠ খাইয়্যা যাইও।
— না-না আমি বাড়ি ফিরব। উঠে দাঁড়াল অঙ্কুশ।
— থাউক আর নাটক করতে লাগব না। বাবায় নাই তো রইলা ক্যান, তহনি চইল্যা যাইতা। কত ফিরতে চাও জানা আছে আমার। হাত-মুখ ধুইয়্যা বস। আমি দুখান ডুব দিয়াই আইতাছি। বলে একটা গামছা নিয়া হাঁটা লাগাল মণি। হাঁটতে হাঁটতে পিছন ফিরে অঙ্কুশের দিকে তাকিয়ে আবার একবার হাসল। মণির কথাগুলো ঠিক ধরতে পারছিল না অঙ্কুশ। কিন্তু সত্যি কেন যে এল। কয়েকজন এর মধ্যে এসে দেখাও করে গেছে। কাগজে তাদের কথা কবে ছাপা হবে জিজ্ঞেস করেছে। অঙ্কুশ উত্তর দিয়েছে খুব শিগগিরই। কবে যে লিখবে ও নিজেও জানে না। লিখলেই যে কাগজ ছাপবে তাও জানে না ও। সোহাগের ঘরের সামনে একটা কুল গাছ। তার নিচে পিঁড়ির ওপর আবার বসে পড়ল ও। অদ্ভুত শান্ত চারদিক। মাঝেমধ্যে কাছে-দূরের ঢিবির ঘরগুলো থেকে কয়েকটা মেয়ে-বউ-এর মুখ দেখা যাচ্ছে। অঙ্কুশকে কেউ দু-একবার দেখছে। কেউ আবার নিজের কাজে ব্যস্ত। ফিরেও তাকাচ্ছে না। সামনের আলটায় গোটা পনেরো হাঁস এলোমেলো ঘুরপাক খাচ্ছে। জলে ভল্ট দিচ্ছে। ওদের আচমকা সমবেত ডাকে নৈ:শ্যব্দ চিরে যাচ্ছে মাঝেমধ্যে। কেন এল আবার ভাবতে চাইল অঙ্কুশ। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবনাটাকে ভাগাল। হাঁসগুলো পাড়ে উঠে যে যার গা খোঁচাচ্ছে ঠোঁট দিয়ে। তাকিয়ে থাকল অঙ্কুশ। কখন যেন হাঁসের পিছনে মণি এসেছে। ভিজে গায়ে গামছা জড়ানো। কাছে এসে হাসল। চিবুক বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ছে। চইল্যা আইছি। খুব খিদা লাগছে না? মুখখান শুকাইয়া গেছে। এক্ষুনি হইয়া যাইব।
অঙ্কুশ বলল — আমার কিন্তু সত্যি সত্যিই খুব খিদে পেয়েছে।
— তাই! এত খিদা লাগছে! বলে ঠোঁট টিপল মণি। আমি শাড়ি ছাড়তাসি ঘরে। আবার উঁকি মাইরো না যেন। মণির হঠাৎ এমন একটা কথায় চমকাল অঙ্কুশ।
— এই অকু, ঘরে আসবি না কিন্তু। যা মার কাছে যা।
— কী করছিস তুই?
— আহ বললাম না মা ডাকছে, যা দেখ গিয়ে কী বলছে।
মণি ঘরে ঢুকে গেল হুস করে। ভেতরে ঢুকে বলল আমাগো দরজায় হুড়কা নাই। দেইখ, খুইল্যা না যায়। হি- হি।
অঙ্কুশ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল ভেজানো দরজাটার দিকে। হাওয়াতে অল্প অল্প দুলছে। ... ওই তো একটু ফাঁক হল যেন ... হল? উফ নিশ্বাস নিতে এত কষ্ট হচ্ছে কেন? আরও একটু ফাঁক হল। ঝুপ করে খুলে গেল দরজা। মণি এসে দাঁড়াল বাইরে। একটা মস্ত নিশ্বাস বের হল অঙ্কুশের ভেতর থেকে। মণির গায়ে শুকনো শাড়ি-ব্লাউজ। মাথার খোঁপায় জড়ানো ভিজে গামছা। শরীর অবশ লাগছে অঙ্কুশের।
ভাত, কলমিশাক আর শোল মাছের ঝোল। গপগপ করে গিলছিল অঙ্কুশ। মণি বলল, — আহা রে, খুব খিদা লাগছিল না তোমার? আট্টু ভাত দেই।
প্রায় অর্ধেকের নীচে নেমে যাওয়া ভাতের হাঁড়িটার দিকে আড়চোখে দেখে নিয়ে অঙ্কুশ বলল — আরেব্বাবা, আর পারব না। প্লিজ, এবার তুমি খেতে বস। অনেক বেলা হয়ে গেছে।
আগে তুমি খাইয়া নাও। আইচ্ছা বাড়িতে কে কে আছে তোমার?
— মা, বাবা।
— ভাই, বইন কেউ নাই?
মুখ নাড়ানো বন্ধ করল অঙ্কুশ।
— কী হইল? তুমি কি বাপ-মায়ের একটাই? ...
না, আমার দিদি — বলে থেমে গেল অঙ্কুশ।
— অ, দিদি আছে। কত বড়ো তোমার থিক্যা?
— জানি না।
— ধুর পাগলা, দিদির বয়স জান না?
— না বললাম তো।
আমার থিক্যাও বড়ো কি? ... আরেহ, কী হইল উইঠ্যা পড়লা ক্যান? পুরাটা খাইলা না?
— অহ বুঝছি। দিদির লগে ঝগড়া নাকি? হি - হি
মুখ-হাত ধুয়ে এসে অঙ্কুশ বলল — আমি চলি।
— না, যাবা না।
অঙ্কুশ কিছু না বলে ভুরু কুঁচকাল।
— অহন যাইতে লাগব না। বৈকালে একখান জিনিস দেইখ্যা ফিরবা।
— কী জিনিস?
— তহনি দেখবা। আমি জানি তোমার ভালো লাগব। বলে ঘরের ভেতর থেকে একটা চাটাই আর বালিশ নিয়ে এসে কুল গাছের নীচে বিছিয়ে দিয়ে বলল — তুমি একটু গড়াইয়া নাও।
— না। ঠিক আছে।
— যা কইলাম শোন। নইলে আমার লগেও ঝগড়া হইব কিন্তু।
বালিশটা মাথায় দিয়ে এক পা ভাঁজ করে অন্য পা-টা তার ওপর তুলে দিয়ে চিৎ হয়ে শুল অঙ্কুশ। পাশে পিঁড়ির ওপর বসল মণি। মাথা নীচু করে পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে মাটি খুঁড়তে থাকল মণি। ও কি কিছু বলতে চায়? কথাটা জিজ্ঞেস করতে গিয়েও গিলে নিল অঙ্কুশ। আরও একটু ঝুঁকতে গিয়ে বুকের আঁচল সরল মণির। অঙ্কুশ কেঁপে উঠে অন্যদিকে তাকাল। মণি আঁচল ঠিক না করে হেসে বলল — কী হইল, আমার লগে কথা কবা না?
হুঁ কেন বলব না?
অল্প কথা আর বেশিক্ষণ চুপচাপ মিলিয়ে প্রায় মিনিট চল্লিশ পার হতেই আকাশ ভরতি সাদা কালো বিন্দু। পাখি আর পাখি। হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ, ঝাঁকে ঝাঁকে। পাক খেয়ে উড়তে উড়তে নেমে দ্বীপের গাছগুলোতে এসে বসেছে। ফুরোতে বসা দিনের হলুদ আলোতে পাখিগুলোকে কেমন অদ্ভুত লাগছিল। নি:শব্দ দ্বীপটা আচমকা কোটি কোটি পাখির ডাকে জেগে উঠেছে যেন।
অঙ্কুশ হাঁ হয়ে গেছিল।
মণি বলল — এইডা দেখাইন্যের ছিল। এরাও আমাগো মতোই সূর্যদ্বীপের মালিক। আমাগো কথা যহন কাগজে লিখবা অগো কথাও লিখো কিন্তু। ভুইল্যো না। আমাগো থাকনের জাগা গেলে পাখিগুলোরও যাইব। কোথাই যাইব কও দেহি, এতগুলি পাখি। ... কী ... লিখবা তো?
অঙ্কুশ অবশভাবে বলল। হুঁ। আবার কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে বলল — চলি।
— হ। পূর্ণিমার দিন আইবা তো?
— দেখি।
— বাবার লগে দেখা হইল না আইজ। বাবারে পরদিন কইও আমি তোমার সেবায় কিন্তু খামতি দিই নাই। কি দি-সি?
— নাহ তো।
হাসল মণি। বলল, বাবায় হুকুম দিসে তুমি আইলে যেন ভালো খাতির করি।
— কেন?
— বারে, তুমি যে আমাগো কথা হগলরে কইবা। আমাগো ভিটা ... থেমে গিয়ে মণি বলল। তোমারে এট্টু আগাইয়া দিই। দুজনে সাঁকো পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে অঙ্কুশ আগে বাঁশে উঠল। হাতখান বাড়াও বলে মণি হাত বাড়াল। তারপর ঝাঁকুনি দিয়ে সাঁকোতে উঠতেই অঙ্কুশের আঙুলে মণির বুকের ছোঁয়া লাগল। শিউরে উঠে মণির হাত ছেড়ে দিল অঙ্কুশ।
— কী হইল?
— কিছু না।
— হি-হি পাগলা একখান। ভিতুর ডিম।
বাঁশ ধরে হুড়মুড় করে এগোতে শুরু করল অঙ্কুশ। এই অকু, আস্তে যা। এবার মার লাগাব বলছি। পিছনে ফিরল অঙ্কুশ, কিছু বললে?
মণি হাঁটতে হাঁটতে বলল — না তো, অত হড়বড় কইর্যা আগাও ক্যান? পিছল খাইয়্যা পড়বা তো অন্ধকারে।
অঙ্কুশ নীচে নেমে আর পিছন ফিরল না। মাথার ভেতরটা তালগোল পাকিয়ে গেছে।
লাস্ট চুমুকটা দিয়ে ভাঁড়টা রাস্তায় ছুঁড়ে দিয়ে সুমন বলল — সেদিন সূর্যদ্বীপে গেছিলি শুনলাম। মণির সঙ্গে সারাদিন ছিলি। তা কাজকম্ম কিছু এগোলো?
— কী কাজ? তেতো গলায় জিজ্ঞাস করল অঙ্কুশ।
— কী কাজ আবার, যে কাজে গেছিলি।
— ওহ লেখার কথা বলছিস? নারে এখনও ধরিনি। নোট নিচ্ছি।
— আরে শুধু লেখা নয়। আমি মাপজোকের কথাও বলছি। বলে খিক খিক করে হাসল সুমন। তবে আমার কথাও একটু মাথায় রাখিস। পার্টি অফিস থেকে আমাকে প্রায় প্রত্যেক দিন জিজ্ঞেস করছে সূর্যদ্বীপের স্টোরি কবে বের হবে। হ্যাঁরে, আদৌ লিখবি তো মাইরি? ঝোলাস না কিন্তু আমাকে। শুধু ওখানে গিয়ে মধু খেয়ে আসলে কিন্তু আমার ঝার হয়ে যাবে। পার্টি আর ওই দ্বীপটার লোকগুলো, দু-দিক থেকেই বাটাম খাব। যাকগে, মণিকে কেমন লাগছে বল?
— আহ সুমন। বাদ দে না ওসব ফালতু কথা। আমি চললাম, বলে দোকানে হেলান দিয়ে রাখা সাইকেলটা হাতে নিল অঙ্কুশ।
সুমন এবার একটু গম্ভীর হয়ে বলল — দেখ ভাই, তুই ফ্রিতে যা করছিস কর। আমার কিছু বলার নেই, ইভেন কোনও প্রবলেমেও পড়বি না তার জন্য। ওখানে আমার বলা আছে, কিন্তু আমার কাজটা যেন হয়।
অঙ্কুশ কোনও উত্তর না দিয়ে সাইকেলে বসে প্যাডেলে চাপ দিল। সুমন জানল কী করে ও সেদিন সূর্যদ্বীপ গেছিল? অবশ্য জানতেই পারে। পার্টির লোক বলে কথা। ওদের হাজারটা চোখ হয়। আজ পূর্ণিমা। আজকেও ওখানে যাওয়ার কথা। সারারাত থেকে মাছ ধরা দেখার ছিল। ধু-স আর যাব না। ভাবল অঙ্কুশ। তখনি মনে পড়ল মণির পূর্ণিমার দিন আইবা তো? না আসব না আর আসব না — বিড়বিড় করল ও।
আরেহ আইসেন, আয়েন আয়েন। অ মণি দেখ দাদায় আইসে। আরজন কই? সোহাগের মুখে একগাল হাসি।
অঙ্কুশ অল্প হেসে বলল — সুমন আসেনি আজ। আমিই এলাম।
আইচ্ছা যাউক গিয়া। পরে আইবেনখন। আমার মন কইতাছিল আপনে নিশ্চয় আইবেন। মণি বেরিয়ে এল ঘরের ভেতর থেকে। কপালে টিপ। টানটান করে চুল বাঁধা। পরনে শাড়ি। হাতে লম্ভ। আগুনের শিখায় মণির মুখ তিরতির করছে। মণি এসে জিজ্ঞেস করল — চাড্ডি মুড়ি দেই?
— হুঁ দাও। এক মিনিট। আমি একটু চানাচুর নিয়ে এসেছি। বলে পাঞ্জাবির পকেট থেকে চানাচুরের প্যাকেটটা বের করে মণির দিকে বাড়াল। মণি হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকে গেল। সোহাগের পাশে বসল অঙ্কুশ। মনটা ভীষণ অস্থির হয়ে আছে। আসব না আসব না করেও কেন যে চলে এল নিজেই বুঝতে পারছে না। সোহাগ কী যেন একটা গান করছে গুনগুন করে। অস্বস্তিটা কাটানোর জন্যই অঙ্কুশ বলল, গানটা করুন না, শুনি।
— আরে না- না। সুর আর নাই। বয়স হইসে তো। পলাইছে আমারে ছাইড়্যা।
— খানিকটা তো রয়েছে। তাই-ই শুনি।
— শোনেন তাইলে। সোহাগ গলা খাঁকড়ে বলল — পদ হইল ভ্রমর কইও গিয়া, শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদে আমার অঙ্গ যায় জ্বলিয়া রে। চোখ বুজে গান ধরল সোহাগ ভাঙা গলায়। দ্বীপের হাওয়ায় ভাসতে থাকল সে গান। চাঁদে রং লাগতে শুরু করল একটু একটু করে। রাত হচ্ছে।
কইও কইও কইও ভ্রমর কৃষ্ণেরে বুঝাইয়া।
মুই রাধা মইর্যা যামুরে এ - এ- হে - এ
কৃষ্ণহারা হইয়ারে এ ভ্রমর কইও গিয়া
গান থামল কিছুক্ষণ পর। কেন কে জানে গানটা ভালো লাগছিল না অঙ্কুশের। সোহাগ বলল — কইলাম না সুর আর নাই।
— যা আছে যথেষ্ট।
শুনে হাসল সোহাগ। কীই যে কয়েন। তয় মণির গলাখান মিঠা হইসে ভারী।
— তাই?
— উঁ-হ মিঠা না ছাই! হাতে মুড়ির বাটি নিয়ে আসল মণি। সোহাগকে একটা বাটি দিয়ে অন্যটা অঙ্কুশকে দিল। অঙ্কুশ তাকাল মণির দিকে। মণিও তাকাল। চোখাচুখি হতে ফিক করে হাসল মণি। বলল — পাগলা!
গোটা দ্বীপটার ছোটো ছোটো ঘরগুলোতে হ্যারিকেন, লম্ভর আলো জোনাকির মতো জ্বলছে। হাওয়া আর চাঁদের আলোয় কিলবিল করছে চারদিকের জল। অদ্ভুত আশ্চর্য চারদিকটা।
— দ্যাশে আমাগো পাড়ায় এক গোঁসাই ছ্যালো, তার থিক্যা অনেক গান শিখছিলাম এক সময়। স-ব গ্যাছে গিয়া। যাউক। কিস্যুই তো থাহে না। বেবাক ফেলাইয়া থুইয়া যাইতে হয়। চুপ করল সোহাগ।
ঘড়ি দেখল অঙ্কুশ। রাত প্রায় আটটা।
— অ মণি ভাত বসাইলি?
— হ।
রাতে কতক্ষণ মাছ ধরে সবাই? — জিজ্ঞাসা করল অঙ্কুশ।
সোহাগ বলল ঠিক নাই। যার যেমনি মনে নেয়। মণি বেশিক্ষণ থাহে না। মাইয়্যাতো। ঘুম চইল্যা আহে অর।
ঘরের ভেতর থেকে ভাত ফোটার গন্ধ আসছে।
ডাল, ভাত, বেগুনভাজা, আর রুইমাছের ঝাল খেয়ে উঠে পড়ল অঙ্কুশ। প্রায় সোয়া নটা বাজে। মণি ওদের দুজনকে খাইয়ে নিজে খেল। খেয়েদেয়ে এঁটো বাসনগুলো সামনে খালের জলে ধুয়ে ঘরে ঢুকল আবার। সোহাগ বিড়িতে টান দিতে দিতে আকাশে চাঁদের দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ অঙ্কুশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল — দাদা একটা কথা কমু?
— হ্যাঁ বলুন।
— কিসু মনে কইরেন না কিন্তু।
— না- না। বলুন না।
— আমার তো আর কিস্যু নাই আপনারে দেওনের মতন। এট্টু দেইখেন আমাগো। এই এত্তগুলি মানুষ আমার ওপর ভরসা কইর্যা আছে। আর আমি আপনারে ... গলা বুজে এল সোহাগের। গলা খাঁকড়ে বলল — যা রে মা।
— তুমি ঘরে গিয়া শুইও কিন্তু। বাইরে ঠান্ডা লাগব তোমার — বলে মণি লম্ভ হাতে হাঁটা লাগাল। সোহাগের কথাগুলো অঙ্কুশের কানে ফিসফিস করছিল বার বার। আর কিস্যু নাই মানে? কী বলতে চায় লোকটা?
খালের সামনে বাঁধা নৌকোয় উঠল মণি। অঙ্কুশ উঠতে যাবে। খালপাড়ে বসে থাকা দুটো ছেলে দেখল ওকে।
হেসে বলল — দাদায় মাছ ধরবেন নাকি পাগলির লগে?
— ভালো হইব না বাসুদা আমারে পাগলি বললে।
হো-হো করে হাসল ছেলেটা। অঙ্কুশের দিকে তাকিয়ে বলল — আপনার লগে এট্টু কথা ছিল দাদা।
— হ্যাঁ বলুন।
— অহন না। পরে কথা হইব। কাইল সকালে। মণি ধমকাল ওঠেন দেহি।
নৌকায় উঠল অঙ্কুশ। ভেসে গেল নৌকো। ভাসতে ভাসতে নৌকো জলের মাঝখানে। দুজনেই চুপ। শুধু ফিনফিনে হাওয়া কথা বলছিল জ্যোৎস্নার সঙ্গে। মণি হঠাৎ বলল — তোমার আমারে ভালো লাগছে, তাই না? সত্যি কও।
— উঁ আচ্ছন্নের মতো সাড়া দিল অঙ্কুশ।
— আমার কথাও লিখবা কাগজে?
উত্তর দিল না অঙ্কুশ।
— কী হইল? কইলা না তো!
— কী বলব?
মণি হেসে বলল — আমি জানি, তুমি শুধু চাঁদ দ্যাখতে আস নাই।
— তাহলে?
— আমারেও দ্যাখতে আইস। ঠিক কিনা? সুমন দাও দ্যাখতে চাইছিল। আমি দিই নাই। শালা হারামি একটা।
মাথা নীচু করে ঝিলমিলে জলের দিকে তাকিয়ে ছিল অঙ্কুশ।
কোন হানে দ্যাখবা কও? ... কী হইল ... এহানেই? আইচ্ছা, তয় দেহ — বলে মণি বুকের আঁচলে হাত দিতেই অঙ্কুশ মাথা তুলে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল — এক বোতল ফিনাইল পুরোটা খেলে কী হয় জান?
মণি একটু অবাক হয়ে থেমে গেল। ফিসফিস করে বলল— হুঁ জানি তো। মাইনস্যে ... কথাটা শেষ করার আগেই অঙ্কুশ উঠে দাঁড়িয়ে সপাটে এক চড় মারল মণির গালে। দুলে উঠল নৌকো। আশ্চর্য! কিছু বলল না মণি। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল সেই ছেলেটার দিকে, যে এখন দু-হাতে নিজের মুখ চাপা দিয়ে ফুঁপিয়ে উঠছে। আর চাঁদ নিজের আলোয় ভরিয়ে দিচ্ছে ওর শরীর।
দেশ
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন