বিনোদ ঘোষাল
একটু আগেই খানিকটা বৃষ্টি হয়ে গেল। সারাদিনের গুমোট গরমভাব তাতে খুব একটা কমল না। শুধু রাস্তার এখানে ওখানে একটু জল জমেছে। এখন আগস্ট মাসের বিকেল সোয়া চারটে। অনীক অফিস থেকে বেরিয়ে দ্রুত হাঁটছিল। ওর অফিস মিন্টোপার্কে। অফিস থেকে রবীন্দ্রসদন পর্যন্ত পৌঁছতে মিনিট পনেরো সময় লাগে। তটিনী ঠিক সাড়ে চারটের টাইম দিয়েছে। সুতরাং হাতে আর ঠিক পনেরো মিনিটই রয়েছে আর। হাঁটতে হাঁটতেই পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বার করে একটা ধরিয়ে নিল। মনে মনে নিজের লুকটা একবার ভাবল। অফিস থেকে বেরোনোর আগে টয়লেটে আয়নায় নিজেকে যেমনটা দেখেছিল, এখনও নিশ্চয়ই তেমনই আছে সবকিছু। কথাটা ভাবতেই হাসি পেল অনীকের। পাঁচ মিনিটের মধ্যে একটা স্বাভাবিক মানুষের চেহারা নিশ্চয়ই বদলে যেতে পারে না।
আজ শনিবার। অফিসে ক্যাজুয়াল ড্রেস অ্যালাউ ছিল। ব্ল্যাক শার্ট আর ডেনিমব্লু জিন্স পরেছে অনীক। পায়ে রিবক আর ডানহাতের রিস্টে ঝকঝকে ক্রোনো। কাঁধে ঝোলানো ল্যাপকেস। ঠোঁটে সিগারেট রেখে চুলে হাত বোলাল। মাস ছয়েক হল চাঁদিতে একটা টাক উঁকি দিতে শুরু করেছে। মার্কেটে চলতি বেশ কয়েকটা টাক নিরাময় তেল, শ্যাম্পু কিনে ইউজ করেছে। একটাও ভরসা দেয়নি। বন্ধু-বান্ধব, কলিগ, এমনকি ওর নিজেরও ধারণা অতিরিক্ত টেনশনের জন্যই টাক পড়ছে। অফিসের আগাগোড়া টেকো বিশ্বদ্বীপ শেষ পর্যন্ত একটা পার্মানেন্ট সল্যুশন দিয়েছে, টাকের একমাত্র মেডিসিন হল, টাক সম্পর্কে আর একটুও না ভাবা। যার যতটুকু পড়বার, পড়বেই। ভাবলেও পড়বে, না ভাবলেও পড়বে। বুঝেছি, ভেবেও তবু মন মানে না একেক সময়।
এপাশ-ওপাশ থেকে খানিকটা চুল কাঁচিয়ে টাকের ওপর জমা করল অনীক। এই ব্যাপারটা ওর এখন একটা মুদ্রাদোষের মতন হয়ে গেছে। সত্যিই তো, গত বছর থেকে টেনশন কম যায়নি ওর।
পনেরো মিনিটের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতেই গত বছরে রেট্রোটা আবার মাথায় ভিড় করে এল। লাস্ট ইয়ার মে মাসে ইন্ডিয়ান প্লাস্টো কোম্পানির সিনিয়র সেলস এক্সিকিউটিভ অনীক স্যান্যালের সঙ্গে অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ হয়েছিল বাগনানের বিদিশা ভট্টাচার্যর। দেখতে শুনতে ভালো, কথা বলে কম। বাংলায় অনার্স। স্কুল সার্ভিসের পরীক্ষায় বসে প্রত্যেক বছর। সম্বন্ধটা এনেছিল অফিস কলিগ সৌম্য। ওর বাড়িও বাগনানে। বলেছিল ফ্যামিলিটা ভালো। তোদের সঙ্গে ম্যাচ করবে। দেখতে গিয়ে সব ঠিকঠাকই মনে হয়েছিল অনীকের। বরাবরের কেরিয়ারিস্ট অনীক ভেবেছিল, বাগনানের মেয়ে, দেশপ্রিয় পার্কের সাউথ ফেসিং ব্যালকনিওলা দু-হাজার স্কোয়ার ফিটের টপফ্লোর ফ্ল্যাটে থাকতে পেলে বর্তে যাবে। বউ থাকবে মা-র সঙ্গে, আর অনীক থাকবে তার নিজের উন্নতি আর কেরিয়ার নিয়ে। কিন্তু এই হিসাবটা অনীকের ক্ষেত্রে মিলল না। বিয়ের জন্য ছুটি নিয়েছিল মাত্র পাঁচ দিনের। কিন্তু বউভাতের পরের দিনই সকালে নতুন বউ বিদিশা জিজ্ঞেস করেছিল, কই আমাকে বললে না তো এখনও?
— কী বললাম না?
— হনিমুনে কোথায় যাব আমরা?
— আমি তো হনিমুনের কথা আগে কিছু বলিনি তোমায়! বেশ অবাক হয়ে বলেছিল অনীক।
— সেই জন্যই তো জিজ্ঞেস করছি। বল না কোথায় যাবে ঠিক করেছ?
— নাহ, এখন কোথাও যাওয়ার কথা ভাবিনি। অফিসে খুব প্রেশার। দেখি ডিসেম্বর-জানুয়ারি নাগাদ কাছাকাছি কোথাও একটা ...
— না না প্লিজ প্লিজ ..., পরে আর এখন এক হল?
অনীক নতুন বউ-এর আবদারে অবাক। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েছিল। অফিসে ছুটি এক্সটেন্ড করিয়ে, সাজানো শিডিউল ক্যানসেল করে তৎকালে এনজেপি। তারপর প্যাকেজ ট্যুরে ইউমথাং। মেজাজ গরম ছিল ভেতরে ভেতরে। প্রথম দিন সেটা বুঝতে পারেনি বিদিশা। প্রচণ্ড খুশি ছিল মেয়েটা। তারপর দিন অনীকের রাগ বুঝতে পেরে যথাসম্ভব রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করেছিল। ঝাঁঝিয়ে উঠেছিল অনীক। এইসব বেড়ানো-ফেড়ানোর ফালতু ঝামেলা পরে করলেও চলত, কিন্তু আমার যে ভাইটাল অ্যাপয়েন্টমেন্টগুলো ক্যানসেল হয়ে গেল, সেগুলো আর ফিরে পাব না।—
— কিন্তু আমাদের এই দিনগুলোও কি আর ফিরে আসবে বলো? নীচু গলায় পালটা প্রশ্ন করেছিল বিদিশা। উত্তর দেয়নি অনীক। বিদিশার প্রশ্নটার মানেও বুঝতে পারেনি। ইউমথাং ভ্যালির ঐশ্বর্যের সামনে পাশাপাশি দাঁড়িয়েও কেউ কথা বলেনি কারও সঙ্গে। বিকেলে আবার লাচুং ফিরে এসে রাত্রে হোটেলে স্মার্নঅফের গ্লাসে সিপ দিতে দিতে দামি অ্যাপয়েন্টমেন্টগুলো ক্যানসেল হয়ে যাওয়ার আপশোশ ঢেকুরের মতো বিশ্রী শব্দ করে বেরিয়ে এসেছিল। ভোর রাত্রে ঘুম ভেঙে যেতে অনীক দেখেছিল বিছানায় বিদিশা পাশে নেই। বন্ধ কাচের জানলার বাইরে হু হু ঠান্ডায় একা চুপচাপ ভূতের মতো দাঁড়িয়ে। এত জেদ! থাকুক দাঁড়িয়ে। আবার ঘুমিয়ে পড়েছিল অনীক। পরদিন সকালে বিদিশার তুমুল জ্বর। সেদিনেই ফেরার দিন। জ্বর নিয়েই ফিরেছিল বিদিশা। বাড়ি ফিরেই পরের দিন অফিস জয়েনিং অনীকের। চূড়ান্ত ব্যাস্ততায় ডুবে গেছিল। পাড়ার দোকান থেকে এনে দেওয়া ট্যাবলেটে বিদিশার জ্বর যে একটুও কমেনি সেটা বোঝা গেল তিনদিন পর। অনীক তখন ক্নায়েন্টের কাছে ডেমোতে ব্যস্ত ছিল, মা ফোন করে জানিয়েছিল বিদিশার বাড়াবাড়ি। লোকাল ডক্টর ডেকেছিল মা। ইমিডিয়েট হসপিটালাইজড করতে বলেছেন। অ্যাকিউট নিউমোনিয়া। যে ক-দিন নার্সিংহোমে ছিল বিদিশা, কিছুতেই কোনও ওষুধ খেতে চায়নি। জোর করে গেলাতে হত। এমনকি বাড়িতে যেসব ট্যাবলেটগুলো এনে দেওয়া হয়েছিল সেগুলোও একটাও ছোঁয়নি জানা গেছিল পরে। কারণ কী এইসবের? কীসের জেদ?
পাঁচ দিনের মাথায় বিদিশা চলে গেল। এটা কি অ্যাকসিডেন্ট? না কি সুইসাইড? ... অবশ্যই অ্যাকসিডেন্ট। সেটাই বিশ্বাস করে অনীক। এবং আজীবন করবেও।
বিদিশার বাবা ছিলেন পেইন্টার। তেমন এমিনেন্ট কিছু নয়। ছবি বিক্রিবাটাও তেমন কিস্যু হত না। তবে বিদিশার কাছে শুনেছিল ওর বাবার ছবির নাকি বড়োবড়ো ক্রিটিকরা, আর্টিস্টরা খুব প্রশংসা করে। অনীক দেখেছিল কিছু ছবি। বেশিরভাগ মাথার ওপর দিয়ে গেছিল। তবে শ্বশুরমশাই লোকটা যে বেশ নিরীহ গোবেচারা, ভাবুক গোছের। সেটা বুঝতে পেরে গেছিল। বিয়ের পরের দিন বিদিশাকে নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় মেয়েকে দু-হাতে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন ভদ্রলোক। তারপর অনীকের হাত দুটো ধরে ভাঙা গলায় বলেছিলেন, বড্ড অভিমানী মেয়ে আমার, তোমাকে দিলাম ... দেখো। বলেই চলে গেছিলেন ঘরের ভিতর।
গাড়িতে ফিরতে ফিরতে সেদিন বিদিশা বলেছিল, বাবা আমায় সবচেয়ে ভালোবাসে। ছবির থেকেও। সেই কথার পর প্রায় একবছর হতে চলল।
এক্সাইডের মোড়ে পৌঁছাল অনীক। ট্রাফিক সিগন্যাল আহা তোমার সঙ্গে প্রাণের খেলা-র সঙ্গে খুব সাবধানে রাস্তা ক্রস করতে গিয়ে এতক্ষণের রেট্রোর ঘোরটা কেটে গেল। আজ তটিনীর সঙ্গে দেখা হবে, কথাটা মনে পড়ল আবার। বুক ঢিবঢিব আনন্দ হল ভেবে। শিশির মঞ্চের পাশ দিয়ে নন্দনের পিছনে গাছে ঘেরা চত্বরে পৌঁছানো মাত্র ভীষণ চমকে উঠল অনীক। কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হল ও সম্পূর্ণ বধির হয়ে গেছে। গোটা চত্বরটা কম করে চল্লিশ-পঞ্চাশজন বিভিন্ন বয়সের স্ত্রী-পুরুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারা প্রায় প্রত্যেকেই পরস্পরের সঙ্গে বিচিত্র ভঙ্গিতে তুমুল হাত-পা নেড়ে কথা বলছে, কিন্তু সম্পূর্ণ শব্দহীন। শুধুমাত্র গাছের পাতায় জলের ফোঁটা ঝরার শব্দ আর মাঝে মধ্যে দু-একটা পাখির ডাক ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। অজান্তেই নিজের দু-কানে আঙুল ঢুকিয়ে বারকয়েক খচামখচাম করে নাড়াল অনীক। তারপরেও একইরকম চারপাশ নি:শব্দ। মানুষগুলো নিরুচ্চারে দিব্বি খোশমেজাজে গল্প করছে। এরা কারা? এমন করছে কেন? দেখে তো প্রত্যেককেই মনে হয় সুস্থ। পোশাক-আশাকও ভদ্র। কয়েকটা ইয়ং ছেলে দিব্বি হালফ্যাশনের আউটফিটে চোস্ত। কারও হাতে খাবারের প্যাকেট, কেউ আবার ফাউন্টেন পেপসিতে আয়েশ করে সিপ দিচ্ছে। দুজন ফরেনার ছেলে, সম্ভবত ট্যুরিস্ট, অনীকের মতোই অবাক হয়ে মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল। অনীক গুটি গুটি পায়ে ওদেরকে পাশ কাটিয়ে আমন্ত্রণ স্ন্যাক্স কাউন্টারের সামনে এসে দাঁড়াল। একটা ফরেনার অনীককে লক্ষ্য করছিল। ছেলেটা অনীকের সামনে এসে একটু নীচু গলায় বলল এক্সকিউজ মি। মে আই টক টু ইউ? নিজের কানের শ্রবণশক্তি সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হয়ে অনীক ঠোঁটে হাসি এনে বলল, ওহ শিওর।
— আর দে ডিফ এন্ড ডাম্ব?
— ইয়া, আই গেস সো।
— হোয়াই ডু দে কাম হিয়ার?
— স্যরি, আই ডোন্ট নো স্যার।
— ওক্কে ওক্কে ... থ্যাঙ্ক ইউ, বাই বলে হাত তুলল ছেলেটা।
— বাই। বলে হাসল অনীক, চলে গেল ছেলেটা। গিয়ে সঙ্গীকে কী সব বোঝালো। অনীক দোকানদারকে একটা স্প্রাইট দিতে বলে জিজ্ঞেস করল, এরা কারা দাদা?
— কারা বলতে পারব না। তবে কেমন সে তো দেখছেনই।
— হুম... এখানে কী জন্য এসেছে জানেন?
— নাহ। কোনও প্রোগ্রাম -টোগ্রাম ছিল বোধহয়।
— প্রোগ্রাম, ওদের! ... কোথায়?
— কী জানি? ... হবে রবীন্দ্রসদন-টদন কোথাও একটা। বলে লোকটা ক্যাশ গুনতে ব্যাস্ত হয়ে পড়ল। দোকান থেকে সরে এসে সামনের একটা গাছের নীচে সিমেন্টের গোল বেদিতে বসল অনীক। স্যাঁতসেতে ভিজে গেছে গোটা পরিবেশটা। ঘড়ি দেখল ও। প্রায় পৌনে পাঁচ। এখনও তো এল না তটিনী। আসবে তো আদৌ?... হুঁ ডেফিনিট আসবে। অনীক কনফিডেন্ট। মাস তিনেক আগে ফেসবুকে অনীককে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিল তটিনী মিত্র। অনীকের ফেসবুকে তেমন কোনও ইন্টারেস্ট ছিল না। এ্যাবরডে থাকা বন্ধুদের বারবার ধমক খেয়ে একটা অ্যাকাউন্ট খুলে রেখেছিল। মাঝেমধ্যে সময় পেলে খুলত। অচেনা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাক্সেপ্ট করত না ও। তটিনীর রিকোয়েস্টটাও ইগনোর করতে গিয়েও একবার প্রাোফোইলটা খুলে দেখার ইচ্ছে হয়েছিল এমনিই। ইনফোতে দেখা ছিল —
বার্থ ডে : ১৬ই জুন, ১৯৮০।
কারেন্ট সিটি : কলকাতা।
রিলেশনশিপ : ইটজ কম্পলিকেটেড।
ইন্টারেস্টেড ইন : মেন, ওম্যেন।
বায়ো : স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড।
কলেজ : প্রেসিডেন্সি।
কোম্পানি : এইচ ডি এফ সি।
পোজিশন : এক্সিকিউটিভ।
সব থেকে বড়ো কথা হল প্রাোফাইল ফোটোতে তটিনী দেখতে সত্যিই আকর্ষণীয়। একবার চোখ পড়ে গেলে যে কেউই বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকবে। কিন্তু অনীকের নিজের কোনও প্রাোফাইল ফোটো ছিল না। শুধু একজন স্যুট বুট পরা লোক দু-দিকে দু-হাত টান করে একটা সরু দড়ির ওপর দিয়ে কোনোরকমে ব্যালেন্স মেনটেইন করে হেঁটে যাচ্ছে। পরে অনীক জেনেছে এই অদ্ভুত রকমের প্রাোফাইল ফোটোটাই না কি কৌতূহল জাগিয়েছিল তটিনীকে।
তারপর রাত্রে চ্যাটে কথা বলতে বলতে কথা অনেক দূর। অনীক জানিয়েছে ওর ওয়াইফের অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথ। তটিনী জানিয়েছে তার ডিভোর্সের কথা। এইভাবে কথা এগিয়েছে দিনে দিনে। অনীক ওর অফিস কলিগ কাম বন্ধু বিশ্বদীপকে এই বন্ধুত্বের কথা জানানোর পরে বিশ্বদীপ বলেছে, আরেকটু এগো তাহলে। ঝুটমুট নিজের হোল লাইফটা নষ্ট করবি কেন? এরপর বয়েস হয়ে গেলে তো আর কিছুই ... অনীকও বুঝেছে। প্রচণ্ড কাজের চাপ থেকে সময় বার করে তটিনীকে দেখা করতে আসার রিকোয়েস্ট করেছে। সেও রাজি হয়েছে প্রথম অনুরোধেই। ... হয়তো দুজনেই তাই চায়। তটিনী জিজ্ঞেস করেছিল, কিন্তু আপনাকে রিকগনাইজ করব কী করে? আজ পর্যন্ত একটা নিজের ফোটোগ্রাফ ও দেখালেন না তো। অনীক হেসে উত্তর দিয়েছিল, আমি তো চিনি আপনাকে। তাহলেই যথেষ্ট।
আজ সেই দিন। চারপাশটায় চোখ বুলিয়ে নিয়ে আবার একটা সিগারেট ধরাল ও। এখনও তো এল না। এই আমন্ত্রণের সামনে আসারই কথা হয়েছিল। ওই মানুষগুলো অনবরত নিজেদের ইশারার ভাষায় কথা বলে চলেছে। ভীষণ অস্বস্তিকর। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে শরীর হাঁসফাস করে। দম আটকে আসতে চায়। ... কিন্তু তটিনী কেন এল না এখনও?
মোবাইলে ফোন করে জানারও উপায় নেই। গত পরশু দিনেই মেয়েটা ওর মোবাইলটা হারিয়েছে। অনীককে গত রাত্রেই চ্যাটিং-এ জানিয়ে দিয়েছে সে কথা। আজ কোনো প্রবলেমে পড়ল না তো? ... তাহলে নিশ্চয়ই ফোন করে জানিয়ে দিত। অনীকের নাম্বার নিশ্চয়ই মুখস্থ হয়ে গেছে এতদিনে। মোবাইলে ফেসবুক চ্যাট খুলে দেখল অনীক; তটিনী অফলাইন। এবার একটু অধৈর্য লাগছে। আজকের এই অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য ওকে কোম্পানির একটা ভাইটাল মিটিং-এ অ্যাবসেন্ট থাকতে হয়েছে। এই নিয়ে আবার কোনো কথা না ওঠে। সিগারেটটা মাটিতে ফেলে শ্যু দিয়ে ভালো করে পিষে মুখ তুলতেই ভুরুদুটো আপসে কুঁচকে উঠল অনীকের। ওর থেকে ফুট দশেক দূরে একজন মাঝবয়েসি রোগা লম্বা লোক। মাথায় ছোটোছোটো করে কাটা সাদা চুল, ময়লা পাঞ্জাবি, পাজামা। পায়ে ন্যাতা হয় হয়ে আসা সস্তার চটি। কাঁধে কাপড়ের ঝোলা, হাতে কয়েকটা বই আঁকড়ে ধরা। লোকটা এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। কেমন যেন অস্পষ্ট চেনা চেনা ... তারপর পিছন ফিরে অনীকের মুখোমুখি হতেই ভয়ংকর শিউরে উঠল অনীক। বিদিশার বাবা ... এখানে! ... কেনহ? অনীক অন্যদিকে মুখ ফেরাতে গেল, তার আগেই উনি এগিয়ে এলেন। একেবারে সামনে এসে এমনভাবে অনীকের মুখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে থাকলেন যেন কিছু হাতড়াচ্ছেন। অনীক অতিকষ্টে নিজের ঠোঁট দুটো টেনে বলল, ভালো আছেন? উত্তরে একটু অন্যমনস্কভাবে মাথা নাড়লেন ভদ্রলোক। ভালো ভালো সব-ব ভালো, বিড়বিড় করলেন। অনীককে কি চিনতে পারলেন না উনি? সৌম্যর কাছে অনেক মাস আগে একবার শুনেছিল, বিদিশা মারা যাওয়ার পরে ওর বাবা একটু কেমন যেন হয়ে গেছেন। শুনে খারাপ লেগেছিল, তবে খারাপ লাগাটা খুব বেশিদিন অনীকের সঙ্গে থাকার সময় পায়নি। আজ এতদিন পর ভদ্রলোককে সামনাসামনি দেখে আবার খারাপ লাগল। উনি তাকিয়েই আছেন। একটু ইতস্তত ভাবেই অনীক বলে ফেলল, আমি অনীক। চিনতে পারছেন? এর বেশি কিছু বলার সাহস হল না ওর। বিদিশার বাবা একই রকম অল্প মাথা নেড়ে বিড়বিড় করেই বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ অনীক ... অনীক। আপনি ভালো আছেন তো?
নাহ, মনে হচ্ছে মাথাটা অনেকটাই গেছে। আদৌ চিনতে পারলেন কি না বোঝা গেল না। কিন্তু লোকটা বাগনান থেকে এখানে এসে কী করছে? — আপনি এখানে? ... কোনো কাজে এসেছিলেন?
— হুঁ। ওই যে আমার ম্যাগাজিনটা বেরিয়েছে গতকাল। বন্ধুদের দিতে এসেছি অ্যাকাডেমিতে। আপনি দেখবেন বইটা? থার্ড ইস্যু বার করলাম, বলে হাতে ধরা একগোছা ম্যাগাজিন থেকে একটা বার করে অনীকের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। ম্যাগাজিনের কভারটার দিকে চোখ পড়তেই গোটা গা ইলেকট্রিক শক খাবার মতন ঝিং করে উঠল। ম্যাগাজিনের নাম বিদিশা আর প্রচ্ছদে বিদিশার একটা ব্লাক অ্যান্ড হোয়াইট বাস্ট ফোটো।
— দেখুন না, দেখুন। এইটা থার্ড ইস্যু। আমার কাছে আগের ইস্যু দুটোও আছে, দেখবেন?
হঠাৎ কান দুটো বন্ধ হয়ে গেল অনীকের। ভদ্রলোক কী বলছে, শুনতে পেল না। শব্দগুলো যেন বালি চাপা দেওয়ার মতো করে বুজে দিল কেউ। থর থর করে কাঁপতে থাকা আঙুলে, কেমন সম্মোহিতের মতন নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই বইটার পৃষ্ঠাগুলো ওলটাতে শুরু করল। পাতায় পাতায় বিদিশার ফটো, ওর ছোটোবেলার লেখা কোনো ছড়া, আঁকা ছবি, ছেলেবেলার খেলনাবাটি, পুরোনো ফ্রক, সোয়েটারের ফোটোগ্রাফস। আর বিদিশাকে নিয়ে বিভিন্ন আর্টিস্ট, ইস্কুলের হেডমাস্টার, বন্ধু-বান্ধবদের ছোটো ছোটো লেখা, স্মৃতিচারণ। শরীর ভীষণ অবশ লাগছে অনীকের। বিদিশার বাবা সামনে দাঁড়িয়ে ঠোঁট নাড়ছেন ক্রমাগত। কিচ্ছু কানে ঢুকছে না... কিচ্ছু না! হাত দুটোও নিজের অজান্তে কখন এত অসাড় যে, কানে আঙুল ঢুকিয়ে নাড়ানোর ক্ষমতাও নেই। অসম্ভব ভয় পেয়ে গেল অনীক। লোকটাকে সামনে থেকে দূর হয়ে যাওয়ার জন্য বলতে যেতেই দেখল, নন্দনের পাশ দিয়ে, সব মূক ও বধির মানুষগুলোকে অবাক হয়ে দেখতে দেখতে তটিনী আসছে। ওই মানুষগুলো সব চোখ বড়োবড়ো করে খুব উত্তেজিত হয়ে নিজেদের মধ্যে কীসব বলাবলি করছে এখন। ওদের ভিড়ের মধ্যে অনীককে এদিক ওদিক তাকিয়ে খুঁজছে তটিনী। অনীক হাতে ধরা ম্যাগাজিনটা তুলে ধরে তটিনীকে ডাকতে গেল, হাত উঠল না, আওয়াজও বেরল না গলা দিয়ে। হাঁ করে বিকট চিৎকার করে উঠতে চাইল অনীক। কে যেন ওর গলা চেপে ধরেছে! নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। ... উ ... হ ... একটু শব্দের জন্য বার বার হাঁ করতে থাকল। তটিনী একঝলক আলগোছে তাকাল অনীকের দিকে, তারপর আবার খুঁজতে খুঁজতে অন্যদিকে চলে গেল।
সকালবেলা
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন