ভাঙাজোড়া

বিনোদ ঘোষাল

বুঝলে তো, মেয়ের আমার এই একটা দোষ। খালি বানাম ভুল করে। এত বলি, তবু কিছুতেই বানাম ঠিক করে লিখতে পারে না।

জয়ের খুব বলতে ইচ্ছে করছিল, কাকিমা, কথাটা বানাম' নয়, বানান। বলতে পারল না। পাগল নাকি? কড়কড়ে সাড়ে তিনশোর কেস। মানে তিনটে একশো, একটা পঞ্চাশের নোট। মানে পঁয়ত্রিশটা দশ টাকা! ধুস, এভাবে বাড়িয়ে লাভ আছে! সাড়ে তিনশো মানে সাড়ে তিনশোই। এক টাকাও বেশি নয়। নতুন টিউশনের যোগাযোগটা প্রদীপ করে দিয়েছে। ক্লাস নাইনের ছাত্রী। শুধু সায়েন্স গ্রুপ। মালদার পার্টি। প্রদীপ বলে দিয়েছিল, একদম সাড়ে তিনশোর নীচে নামবি না। সিলভার চাক্কির খনি। কিন্তু হেভি চিপ্পুস। এমন একটা ব্যাপারে রাজি হতে জয়ের প্রথমে গা ঘিনঘিন করছিল। প্রদীপ ওর মনের অবস্থাটা বুঝতে পেরে বলেছিল, দ্যাখ ভাই, মার্কেটে নাচতে যখন এসেছিস, তখন ঘোমটা টানলে নিজেই ঠকবি। ওসব গুডবয়মার্কা সেন্টুতে কিক করে ফুলদমে লাইনে নেমে পড়।

প্রদীপের কথাগুলোয় দম ছিল। তাই এই বাড়িটায় টিউশনের জন্য কথা বলতে আসা। ঘরে ঢুকেই প্রদীপ বুঝেছিল, এ বাড়িটায় সবই আছে, কিন্তু কিছুই নেই। দামি চাদর পাতা বিশাল বড়ো খাটের উপর একটা মিক্সি মেশিন কেতরে পড়ে আছে। যে চেয়ারটায় ভদ্রমহিলা জয়কে বসতে বলেছিলেন, সেটার উপর একটা লোমওঠা, রংচটা টেডিবিয়ার বসানো। জয়ের খুব জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছিল, ওটার উপর বসব? জিজ্ঞেস করতে পারেনি। ওটাকে নিজেই বাঁ হাত দিয়ে তুলে আলগোছে খাটের উপর রেখে দিয়ে চেয়ারে বসেছিল জয়।

মহিলা খাটে জয়ের মুখোমুখি বসে প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন, তুমি ক্লাস নাইন পড়াও?

না, এই ফার্স্ট, বলতে গিয়েও ঢোক গিলে বেমালুম ঢপটা মারল জয়, হ্যাঁ ... হ্যাঁ পড়াই তো।

সকলেই চায় অভিজ্ঞতা। আনকোরাদের পৃথিবীতে কোনও সুযোগ নেই। আর ক-দিন পর বোধহয় শিশুকে মায়ের পেটে থাকা অবস্থাতেই ইন্টারভিউ নেওয়া হবে, তার সব এক্সপিরিয়েন্স আছে কি না, নইলে ভূমিষ্ঠ হতে দেওয়াই হবে না।

বুঝলে, আমার মেয়ে কিন্তু একটু ডাল, বলতে বলতে ভদ্রমহিলা পানখাওয়া দাঁতগুলো সব একসঙ্গে বের করে প্রকাণ্ড এক হাই তুলে নিলেন। বেলা দশটার সময় কোনও মহিলাকে এই প্রথম হাই তুলতে দেখল জয়।

প্রদীপ বলছিল, তুমি তো হপ্তায় তিনদিনের বেশি সময় দিতে পারবে না। ওটা চারদিন করে দাও না।

এর উত্তরও জয়ের তৈরি ছিল। প্রায় চোখ বুজে বলে গেল, আগে আমি ওর ক্রাইসিসটা বুঝে নিই। তারপর তিনদিন কেন, প্রয়োজনে ছ-দিনও আসব।

ওই মহিলা বললেন, আজ তো আঠাশ হয়ে গেল। তুমি তা হলে সামনের মাস থেকেই শুরু করো। দাঁড়াও, তোমার সঙ্গে ছাত্রীর আলাপ করিয়ে দিই, বলেই উনি হাঁকলেন, রানু, একবার এদিকে আয়।

পাশের ঘর থেকে আসছি, একটা শব্দ শোনা গেল। হাস্কি ভয়েস। জয়ের বুকে হঠাৎ ঢিপঢিপ শুরু হয়ে গেল। প্রদীপ বলেছিল, দেখবি মেয়েটাকে। ব্যাপক দেখতে। রতনদার কোচিংয়ে এরকম একটাও নেই।

প্রদীপের কথায় মনটা ভরে গিয়েছিল জয়ের। এতদিনে বোধহয় আইডিয়াল কোচিং সেন্টারের। রতনদাটাকে এবার টেক্কা দেওয়া যাবে। লোকটা ভাবে কী নিজেকে! তিন-চারটে ঘ্যামা ছাত্রী পেয়ে অহংকারে মাটিতে পা পড়ে না। আর ছাত্রীগুলোও জুটেছে তেমন। স্যার-স্যার বলে একেবারে গায়ে লেপটে যায়। গতবছর তো ওগুলোকে নিয়ে দিঘা পর্যন্ত বেড়াতে গিয়েছিল। সঙ্গে কয়েকটা ছাত্র। সাক্ষীগোপাল। ওখানে কী করেছে, কে জানে। পড়ানোর নামে নেই, অথচ পিলপিল করে নতুন স্টুডেন্ট আসছে তো আসছেই।

এই রানু, আয় এ ঘরে, আবার মায়ের ডাক।

আসছি তো, পাশের ঘর থেকে আবার উত্তর এল।

তারপর ও ঘর থেকে এ ঘরে আলো, থুড়ি কালো করে যে ঢুকল, তাকে দেখে জয়ের মুখ থেকে একটা কাঁচা খিস্তি বেরিয়ে আসছিল। প্রদীপটা এই রকম মুরগি করল! ভয়ংকর মোটা, পিচের মতো কালো, চোখ দুটো হলদেটে, ভাবলেশহীন, লাউডগার মতো লিকলিকে বিনুনি করা একটা মেয়ে মানে, ছাত্রী জয়ের সামনে এসে দাঁড়াল।

আচমকা বিতৃষ্ণায় তেতো হয়ে ওঠা মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে জয় ওকে বলল, বোসো।

মেয়েটা খাটে বসতেই খাটটা যেন দুলে উঠল। ওরে বাপরে বলে চিল্লে উঠল।

জয় আবার তাকাল মেয়েটার দিকে। একটা কমলা রংয়ের স্কিনটাইট (এই মেয়ের সব জামাই স্কিনটাইট হবে) সালোয়ার-কামিজ পরা। ডান হাতে তারকেশ্বরের সুতো। আর বেশি ডিটেলে যেতে চাইল না জয়। জিজ্ঞেস করল, কী নাম তোমার?

অমৃতা সাহা।

ছাত্রীর মা বললেন, তোমরা কথা বলো। আমি চা-টা নিয়ে আসছি।

জয় আবার প্রশ্নে ফিরল, তোমার কোন সাবজেক্ট পড়তে ভাল লাগে না?

মেয়েটা ফিক করে হেসে গদার মতো দুটো গজদাঁত বের করে বলল, অঙ্ক আর ইতিহাস।

আর পড়তে ভালো লাগে কোনগুলো?

বাংলা।

শুধু বাংলা?

হ্যাঁ।

গতবছর রেজাল্ট কেমন হয়েছিল?

ছাত্রী চুপ। জয়ও চুপ। খানিকক্ষণ পরে আবার জিজ্ঞেস করল জয়, কী, রেজাল্ট খুব খারাপ হয়েছিল?

এই সময় ছাত্রীর মা হাতে চায়ের কাপ নিয়ে ঢুকে বললেন, কেন, প্রদীপ তোমায় কিছু বলেনি?

জয় ভুরু কুঁচকে বলল, ও বলেছিল, জাস্ট পাশ করেছে।

ছাত্রীর মা একগাল লাজুক হেসে, টি-টেবিলটাকে বাঁ হাত দিয়ে হিড়হিড় করে টেনে জয়ের সামনে এনে, তার ওপর চায়ের খটাং করে কাপটা রেখে বললেন, পাশ আর কোথায়! ষোলো নম্বর কম ছিল। তারপর ওর বাবা গিয়ে হেডমাস্টারের সঙ্গে অনেক কথাটথা বলে নাইনে তুলেছেন।

শয়তান প্রদীপ একথাটাও চেপে গিয়েছে। জয় মুখ গোমড়া করে চায়ের কাপের দিকে হাত বাড়াতে গিয়ে দেখল, ইয়া মোটা সস্তার কাপ-প্লেট। কাপের হাতলের ফুটোটা এত ছোটো যে, আঙুল গলবে না। পুরো হাতলটাকে চেপে ধরে খেতে হবে। চা ছলকে ডিশের পাশে দুটো মেরি বিস্কুটের ওয়ান ফোর্থ ভিজে গিয়েছে। এদের শুধু পয়সাটাই আছে, কোনও কালচার নেই। এটা একজন মাস্টারকে চা দেওয়ার ধরন? আর বেকারকে কে-ই বা মাস্টার হিসেবে ধরে! জয় কাপটা তুলে মুখের সামনে আনল। ... আহ, প্রথম চুমুকেই ... ঠিক যেমনটা আন্দাজ করেছিল। গরম চিরতার জলে দু-খাবলা চিনি আর দুধ গুলে ছেড়ে দিয়েছে। এ মাল পুরোটা গেলা অসম্ভব। দু-তিন চুমুক খেয়েই কাপটাকে নামিয়ে রাখল।

মহিলা দাঁত বের করে বললেন, বিস্কুট খেলে না?

জয় বলল, আমি বিস্কুট খাই না। এমনিতে চা-ও খাই না। এই আজকেই একটু ...

এ মাল বেশিদিন খেলে আর খুব বেশিদিন আলো দেখতে হবে না। প্রসঙ্গ পালটে বলল এর আগে ও কারও কাছে পড়ত?

হ্যাঁ পড়ত তো স্বরূপাদির কোচিংয়ে। জগৎজননী উত্তর দিলেন।

কিন্তু জানত না কোচিংয়ে পড়লে আদায় করতে জানতে হয়। মেয়েটা আমার এতই লাজুক মুখ ফুঠে কিছু বলতেই পারত না। সেজন্যই তো এই অবস্থা।

লজ্জার জন্য কী অবস্থা সেটা বোঝার জন্য আরেকবার তাকাল জয়। ফেল করা না এমন তিনশো পাউন্ড ওজন বানানো, কোনটা লজ্জা পেয়ে হয়েছে? বুঝল না। বলল ঠিক আছে আমি উঠি আজকে সামনের মাস থেকে আসব।

মহিলা বললেন, তোমার মাইনের কথাটা বললে না তো।

জয় উঠতে গিয়ে আবার বসে পড়ল, কেন প্রদীপ কিছু বলেনি?

হ্যাঁ, ও তো বলেছে সাড়ে তিনশো। অত কী করে পারি বলো তো। একটু কমসম করো।

জয়ের খুব ইচ্ছা হল বলে সপ্তাহ তিনদিন করে আপনার সাজানো এই চিড়িয়াখানা দেখতে আসতে হবে সেজন্যই তো শুধু মাসে সাড়ে তিন দেওয়া উচিত। মেয়েটার সামনে দরদাম করতে ইচ্ছে করছে না। হাজার হোক ছাত্রী। কিন্তু মহিলা নিজেই যখন মেয়ের সামনে কথাটা তুললেন, জয় হেসে বলল, না, ওটা ঠিক পারব না। ওঠাই আমার রেট। রেট শব্দটা দিয়ে নিজের থেকে উঠল। কীসের রেট?

মহিলা আর কথা বাড়ালেন না। বেশ কী আর করা যাবে? কোন সময় আসবে তালে?

এই-ই বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ' বলে জয় উঠে পড়ল।

একটু নিজের মতো করে বেশি সময় ধরে দিয়ে ... হে হে এমনভাবে বললেন যেন কন্যা সম্প্রদান করে জামাইকে বলছেন।

বেরিয়ে এল জয়। বলল প্রদীপের অনেক গরম গরম পাওনা আছে।

সুমির চোখে চোখ রেখে কথা বলতে এখন কেমন যেন অস্বস্তি হয় জয়ের। দু-বছরের টগবগে প্রেম ইদানীং ঠান্ডা খেয়ে ন্যাতানো মুড়ির মতো হয়ে গেছে। এখন পাশাপাশি কোথাও বসলে বা দাঁড়ালে যতটা না কথা হয়, তার চেয়ে চুপ করে থাকা হয় অনেক বেশি। জয় বোঝে। সুমি বলতে চায় বয়স তো গড়াচ্ছে। গড়িয়ে তোমার প্রায় পঁচিশ। এভাবে আর কদ্দিন! এবার সিরিয়াস কিছু একটা ভাবো। কিন্তু মুখে কিছু বলে না। বড়ো বেশি রিজার্ভ। একেকজন চুপ থেকেই বুঝিয়ে দিতে পারে সবকিছু। জয় বোঝে ওর এই টিউশনির প্রফেশনটাকে সুমি একেবারে পছন্দ করে না। জয় দু-একবার মত্তকা পেয়ে অনেক যুক্তি দিয়ে সুমিকে বুঝিয়েও ছিল। কোনো লাভ হয়নি। সুমির বাবা সরকারি ব্যাঙ্কের চাকুরে। ভালোই কামায়। একটাই মেয়ে। এখন বি.এস.সি পার্ট টু। কলেজে জয়ের সঙ্গে যখন পরিচয় হয়েছিল তখন জয় বি.কম পার্ট টু আর সুমি সবে কলেজে ঢুকেছে। দুজনে একই জায়গার হলেও পরিচয় হয়েছিল কলেজে। কলেজ কমপ্লিট করে আর পড়াশোনা টানেনি জয়। পড়তে পড়তে যে টুকটাক দুটো একটা টিউশনি করত। কলেজ ছাড়া পর সেটাকেই বাড়িতে নিয়ে আসে। কারণ বাবা রিটায়ার করে গেছে। মা সারাজীবনের অসুস্থ। চাকরির চেষ্টা দু-একবার করেই হাল ছেড়ে দিয়েছিল। বন্ধুরা বলে তোর তো কিছু না করলেও চলে। বিয়ের পরেই তো ফুল রাজত্ব সমেত রাজকন্যা। জয় অতটা ভাবে না। অন্য লোকের সম্পত্তিকে নিজের ভাবতে ঘেন্না করে। রুচিতে বাধে।

সন্ধেবেলা কচকের চায়ের দোকানে বসেছিল জয়। সুমির আসার কথা। সাতটার সময়। টিউশন এ্যাডজাস্ট করে সময় বার করে রেখেছিল। এভাবেই এতদিন ধরে দেখা করে আসছে। আর সুমি দেখা করে কোচিংয়ে পড়তে যাবার নাম করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে। সুমিকে আসতে দেখেই কচকে চা ছাঁকতে ছাঁকতে বলল, এসে গেছে রে যা যা।

সাইকেল নিয়ে সুমির কাছে এল জয়। বড়ো রাস্তা দিয়ে খানিকটা গিয়ে ডানদিকে একটা লম্বা গলি। নির্জন। একদিকে লম্বা উঁচু পাঁচিল, অন্যদিকে সার সার বাড়ির পিঠের দেয়াল। একটা মাত্র ষাট ওয়াটের ল্যাম্প জ্বলে বলে গোটা রাস্তাটায় অদ্ভুত আলো-আঁধারি। সারাদিন গলিটার নাম সত্যেন বোস লেন। সন্ধের পর লাভার্স লেন হয়ে যায়। ক-হাত অন্তর বেশ কয়েক জোড়া সার সার দাঁড়িয়ে থাকে পাঁচিল ঘেঁষে। ফিসফিস হাসি। গুজগুজ কথা। এ্যাই কী হচ্ছে, পাজি ... উ ... উ ... অসভ্য। সবকটা ছেলে-মেয়েই লোকাল বলে এলাকার লোকজন কেউ কিছু বলে না। প্রত্যেকের নির্দিষ্ট জায়গা। কেউ একঘণ্টা, কেউ আধঘণ্টা। বছরখানেক আগে জয় সুমির সঙ্গে এই গলিটায় এসেছিল একেবারেই আচমকা। নইলে অন্ধকার গলিতে দাঁড়ানোর মেন্টালিটি ওদের দুজনের কারওরই নেই। কথা বলতে হলে সোজা রাস্তায় নয় কেন? আলোতে নয় কেন? এত লুকোনো কেন? পাপ তো কিছু করিছি না দুজনে। কিন্তু সেদিন খানিকক্ষণ দুজনে এখানে দাঁড়িয়ে কথা বুঝেছিল এ শুধু লুকোনোর জন্য নয়। এই নির্জনতা এই আবছা আলো ভালোবাসাকে অনেকটা আকাশ দেয়। সেটা যেন রাস্তার ভিড় হই-চইতে হয়ে ওঠে না। তার পর থেকে এখানেই। সেই সঙ্গে হঠাৎ হঠাৎ রক্ত ছলাৎ করে দেওয়া দুষ্টুমি তো আছেই। মাঝেমধ্যে পুলিশের ভ্যান যায় গলি দিয়ে। যাও যাও বাড়ি যাও, এখানে কী ব্যাপার? এর বেশি কিছু বলে না। জয় আর সুমি যেখানটায় দাঁড়ায় তার থেকে হাত কয়েক দূরে দাঁড়ায় আরেক জোড়া ছেলেমেয়ে। জয়দেরই বয়সি হবে। মেয়েটা লোকাল। তবে বাড়িটা ঠিক কোন পাড়ার জানে না জয়। ছেলেটা এলাকার নয়। রোগা, লম্বা। ভাঙা বাংলা শুনেই বোঝা যায় নন বেঙ্গলি। মেয়েটা বাঙালি। শর্ট হাইট। ছেলেটা রোজ আগে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। মেয়েটা আসে বেশ কিছুক্ষণ পর। রোজ রোজ লেট। জয় হলে খচে যেত। ছেলেটা কিন্তু কোনোদিন একটুও অভিযোগ করে না। লেডিবার্ড চালিয়ে আসে মেয়েটা। সাইকেলটিকে পাঁচিলে হেলান দিয়ে সিটে ঠেস দিয়ে দাঁড়ায়। ছেলেটা পাঁচিলে একটা হাত রেখে মেয়েটার মুখোমুখি ঝুঁকে দাঁড়ায় একই স্টাইলে। কথায় কথায় খুব হাসে দুজনে। মাঝেমধ্যে অল্পস্বল্প দুষ্টুমি। জয় তাকিয়ে থাকলে সুমি ওর গালে হাত দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে দেয়, বলে উঁ ওভাবে দেখতে নেই। ক-দিন হল সুমি একটু বেশি থম মেরে আছে। তিনটে কথার পর একবার সংক্ষেপে উত্তর দেয়। জয় কায়দা করে আসল কারণটা জানার আপ্রাণ চেষ্টা করেও কোনো ফল পায়নি। বিরক্ত হয়ে গিয়ে আজকে মনে মনে ঠিক করে এসেছিল জয় এমন গুমোট পরিবেশ রোজ রোজ ভাল্লাগছে না। একটা এসপার ওসপার করতেই হবে। নিজেদের জায়গাতে দাঁড়াতেই জয় বেশ কয়েকমুঠো সাহস জোগাড় করে ভারিক্কি গলায় বলল, তোমার কী হয়েছে বলো তো?

কী আমার হবে?

ক-দিন ঠিকমতো কথা বলছ না যে!

সবসময় কথা বলে যেতে হবে!

জয় চুপ করে গেল। মাথাটা গরম হয়ে উঠেছে ট্যাড়াট্যাড়া উত্তরে। আরও কয়েকমুঠো সাহস খাবলে গলার সামনে তুলে ধরে বলে ফেলল। সত্যি কথা বলো তো সুমি, তোমার কি আমাকে আর ভালো লাগছে না!

সোজা চোখের দিকে তাকাল সুমি হঠাৎ এ প্রশ্ন?

মনে হচ্ছে বলে।

সুমি চুপ।

তুমি কি রিলেশনটা আর টানতে চাইছ না?

ওর কথার উত্তর না দিয়ে সুমি জিজ্ঞেস করল, কটা ট্যুশন করছ এখন?

আট-নটা হবে।

ভবিষ্যৎটা এভাবে নষ্ট করবে!

জয় ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল, ভূতের আবার ভবিষ্যৎ।

চাকরির চেষ্টা তাহলে করবে না?

চাকরি কোথায় মার্কেটে?

ইয়ার্কি করো না। চাকরি কি তোমার কাছে উড়ে আসবে?

জয় চুপ থাকল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, দেখো সুমি, আমি পাতি বি.কম পাশ। আমার মতো কয়েক লাখ মাল বাজারে ফ্যা ফ্যা করছে। এই কোয়ালিফিকেশনে ম্যাক্সিমাম হাজার চারেকের বেশি স্যালারির চাকরি আমার জুটবে না। তার চেয়ে এটা ক্ষতি কী? পয়সা আছে। মার্কেটটাও জমে উঠেছে আস্তে আস্তে।

সুমি এবার ফেটে পড়ল। তুমি যে কী পরিমাণে পালটে যাচ্ছ জয় ... নিজে যদি বুঝতে ... আচমকা ভিজে উঠল গলা, প্লিজ জয় এমনটা কোরো না। ... আমার বাড়িতে কিন্তু মেনে নেবে না।

কী? প্রাইভেট টিউটর জামাই?

সুমি চুপ।

না নিলেই বা হল কী? দেখ না ওদের। বলে ওই ছেলেমেয়ে দুটোর দিকে আঙুল তুলে বলল, দুজনের ভাষা, কালচার, কাস্ট সব আলাদা, এই রিলেশনটা ওদের কোনো বাড়ি থেকে মেনে নেবে ভেবেছ? তবু তো ওরা ...

ওদের কথা আমি জানি না, জানতে চাইও না। আমি শুধু আমার কথা জানি।

গুম হয়ে গেল জয়। মনে মনে বলল, হ্যাঁ শুধু নিজেরটাই জানো। আমার রিটায়ার্ড বাবা আর রুগ্ন মা-কে নিয়ে গুঁতো খেতে খেতে চলা সংসারটা তো জান না। রোজগার ছেড়ে চাকরি খোঁজার ধৈর্য কিংবা সময় কোনোটাই আর নেই আমার। তাতে তুমি থাক বা ...

আরও কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল দুজনে পাশাপাশি। সম্পূর্ণ অপরিচিতের মতো তাকিয়ে থাকল ওই ছেলেমেয়ে দুটোর দিকে। কী একটা কথায় দুজনেই খুব হাসছে। শ্যাওলা স্যাঁতসেঁতে পাঁচিলের গায়ে লাইন দেওয়ার সার সার সুখ-দু:খ দাঁড়িয়ে। চুপচাপের অস্বস্তিটা বাড়তে জয় বলল, চলো।

সুমি উত্তর না দিয়ে যন্ত্রের মতো হাঁটতে শুরু করল। পিছনে জয়।

ওদুটোতে তখনও খুনসুটিতে ব্যস্ত।

কীরে কেমন লাগছে নতুন ছাত্রী? কচকের দায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে ভাঁড়ে একটা চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করল প্রদীপ।

তোর মতো খচ্চর শালা ... আমি ... এভাবে মুরগি বানালি ... জয় দাঁত কিড়মিড় করল।

এখনও খচে আছিস। তবে ছাত্রী তোর রতনদার কোচিংয়ের মতো না হলেও হরাপাত্তি তো বাবা কিছু কম পাচ্ছিস না।

পয়সাটাই সব হল, শালা, বাড়িটার কোনো কালচার নেই। মেয়েটার মাথায় ঘিলু বলতে কিস্যু নেই। শুধু আছে ...

জয়ের কথা থামিয়ে দিয়ে প্রদীপ বলল, তুই তো বলুদার ছেলেটাকেও পড়াস না?

হ্যাঁ।

জয়দের পাড়ার মডার্ন হেয়ার কাটিং-এর বুলুদার ছেলে দীপু জয়ের সবচেয়ে প্রিয় ছাত্র। ক্লাস সেভেনে পড়ে। প্রত্যেক বছর ক্লাসে স্ট্যান্ড করে। যেমন শার্প ব্রেন তেমনি জানার আগ্রহ।

পয়সাকড়ি তো নিস না শুনেছি।

নাহ নীচু গলায় বলল জয়।

আসলে বুলুদার সেলুনটার নাম মডার্ন হেয়ার কাটিং হলে কী হবে। শুধু পাড়ার বুড়োরাই সেখানে চুল-দাড়ি কামাতে চায়। তা দিয়ে কোনোমতে গ্যাটিস মেরে সংসার চলে বুলুদার।

তা ভাই শুধু চ্যারিটি করলেই হবে! মাল্লুটাও তো কামাতে হবে সেই সঙ্গে। নইলে চ্যারিটির জন্য প্রয়োজনীয় একান্ত পুষ্টি কোত্থেকে আসবে?

প্রদীপের কথায় চুপ করে থাকল জয়।

চল, ওই যে এসে গেছে। যারে।

জয় তাকিয়ে দেখল সুমি আসছে। ধীরে সুস্থে উঠল জয়। আগে যেমন সুমিকে দূর থেকে দেখলেই ঝিং করে উঠত বুক। এখন তেমন আর হয় না। বরং কেমন যেন একটা অস্থিরতা বাড়ছে সেই সঙ্গে সুমির সঙ্গে দূরত্বটাও। দিনে দিনে যে যার নিজস্ব একটা গর্তে ঢুকে পড়ছে ওরা। এখন পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে আচমকা আঙুলে আঙুল কিংবা গায়ে গা ঠেকে গেলে আর রক্ত ছলাৎ শব্দ করে ওঠে না। অন্যমনস্কের মতো নিছক অভ্যাসে হাঁটতে থাকে দুটো অনুভূতিহীন শরীর। তবুও দেখা হয়। সেই গলির শ্যাওলা ধরা উঁচু পাঁচিলের পাশে কথার চেয়ে চুপ করে থাকা হয় বেশি। দুজনেই পরস্পরের চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে আয়ু নিভে আসছে এ সম্পর্কের। ভেতরে ভেতরে এক দু:সহ পীড়া আর নিস্পৃহতা একই সঙ্গে কাজ করে। পাশাপাশি চুপচাপ হাঁটতে হাঁটতে গলিতে ঢুকল দুজন। কয়েকদিন ধরে সেই ছেলে-মেয়ে দুটোকে দেখা যাচ্ছে না। ওরা সাধারণত কামাই করে না। কিছুক্ষণ চুপচাপ সময় কাটানোর পর জয় বলল, ওই ছেলে আর মেয়েটাকে দেখছি না ক-দিন।

হুঁ।

কেন বলত?

আমি কী করে জানব?

ওভাবে কথা বলছ কেন? বিরক্ত হয়ে জয়।

কীভাবে বললাম, অবাক হয় সুমি। ওরা কেন আসছে না আমি কী করে জানব বলো। কেউই তো আমার পরিচিত নয়।

জয় চুপ করে গেল। সত্যিই তো। ঠিক কথাটাই স্পষ্টভাবে বলছে সুমি। অথচ প্রথমে দপ করে কেন যে মাথাটা গরম হয়ে গেল! মনে হল যেন ব্যাঁকাভাবে উত্তর দিচ্ছে। সম্পর্ক ভাঙতে থাকলে সব কথাই কি তীর্যক শোনায়?

আরও বেশ কিছুক্ষণ দুজনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার পর সুমি বলল চলো।

এখনই চলে যাবে?

হ্যাঁ একটু তাড়া আছে।

তোমার তো আজকাল রোজই তাড়া থাকে। এত তাড়া থাকলে আস কেন?

কী বলতে চাইছ কী তুমি? একটু পরিষ্কার করে বলবে? সুমি সোজা তাকাল জয়ের দিকে।

হ্যাঁ বলতে তো চাই। কিন্তু তোমার শোনার সময় থাকলে তো? সোজা জবাব দিল জয়। ততক্ষণে দুজনে গলি পেরিয়ে মেন রাস্তায়। ভিড়ভাট্টা হইচই, রিকশা-অটোর প্যাঁকপোঁক।

সুমি বলল, কালকে সন্ধে সাড়ে সাতটা নাগাদ একবার আসতে পারবে?

না পারার তো কিছু নেই। আমরা লাথখোর বেকার। সময়ই ফাঁকা। বলেই সাইকেলে চেপে প্যাডেলে প্রচণ্ড জোরে চাপ দিয়ে হু হু করে বেরিয়ে গেল গলি ছেড়ে। ওর চলে যাওয়ার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকল সুমি।

জয়ের গোঁয়ার্তুমি আর রূঢ় ব্যবহারটা যেন দিনে দিনে ভীষণ বেড়ে উঠেছে। কত হজম করা যায়! এত অবুঝ হলে ... হাঁটতে থাকে সুমি।

অস্থির, ভীষণ অস্থির লাগছে ভিতরটা। অনেক ভোরবেলা ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। কাল রাতেও ঘুম হয়নি। মাথার ভিতরটায় কিলবিল করছে লক্ষ-লক্ষ পোকা। কামড়াচ্ছে, হুল ফোটাচ্ছে। সকালে একটা টিউশন করে বাড়ি ফিরে এসেছে জয়। ভালো লাগছে না। মাকে বলেছে, শরীরটা ভালো নেই। আজ সন্ধেবেলা যে কথাগুলো বলবে, সারাদিন ধরে সেই কথাগুলোই মনে-মনে আওড়াচ্ছিল জয়। কিছুতেই গুছিয়ে বলে উঠতে পারছিল না। এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। মনে পড়ে যাচ্ছিল, ওদের দুজনের প্রথম আলাপের দিনটার কথা। সেদিনও জয় কিছুতেই কথাগুলো গুছিয়ে বলতে পারছিল না। গুলিয়ে ফেলেছিল। ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি রেখে মজা পাচ্ছিল সুমি। সেই মুখটা এখনও মনে আছে জয়ের। এতবার রিহার্সালেও কিছুতেই মুখস্থ হচ্ছে না। বলতে গেলেই বুকের ভিতর কী সব যেন ঝুরঝুর করে খসে পড়ছে। তবু বলতে হবে। হবেই। আর সত্যিই তো জয়ের জন্য সুমির মতো একটা ব্রাইট ফিউচারের মেয়ে কেনই বা নিজের জীবনটা নষ্ট করবে। একবার ভুলের পর সারাজীবন ধরে আপশোশ করার চেয়ে এই ভালো। তা ছাড়া এই সম্পর্কের শেষ সুখের হবে না। কিন্তু একটা সুন্দর মুহূর্তে ছেড়ে দেওয়ার মতো সুযোগ পাওয়া গেল না, এইটুকু যা দু:খ। হয়তো এটাও দুজনে ভুলে যাবে একদিন। আচ্ছা, একই রাস্তায় দুজনের আচমকা দেখা হয়ে গেলে? কথা হবে? নাকি দুজনে অচেনা হওয়ার ভান করে যে যার মতো চলে যাবে। ধুর ... আর পারছে না। অত ভাবতে নেই। এখনকার দিনে সবচেয়ে বেশি হিসেব-নিকেশ হয় ভালোবাসায়। নিজেকে বুঝিয়ে মন দিয়ে ডায়লগ আওড়াতে থাকে জয়, শোনো, আমার মনে হয়...

হাঁ করে সুমি আর জয় তাকিয়ে ছিল ছেলেটার দিকে। সেই ঢ্যাঙামতো অবাঙালি ছেলেটা। বেশ কিছুদিন পর আজ আবার এসেছে। ছেলেটা সেই একই স্টাইলে পাঁচিলে হেলান দিয়ে মেয়েটার সাইকেলের দিকে ঝুঁকে কথা বলছে। আজ অনবরত বলছে। মাঝেমধ্যে হা হা করে হেসে উঠছে। সব একইরকম। কিন্তু অন্যান্য দিনের চেয়ে আজকের পার্থক্য এইটুকুই, ছেলেটা রয়েছে, কিন্তু মেয়েটা নেই। ছেলেটা স্রেফ একা-একা কথা বলে চলেছে। এমনভাবে বলছে, যেন দুজনে কথা বলছে। অন্য ছেলে-মেয়েগুলোও তাকিয়ে ছিল ছেলেটার দিকে, হাসছিল। চাপা হাসির শব্দে ভরে গিয়েছিল গলিটা। কিন্তু ছেলেটার কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই।

বেশ কিছুক্ষণ জয় আর সুমি ওদিকে তাকিয়ে থাকার পর জয় বলে ফেলল, মাথায় ছিট রয়েছে নাকি? আগে বুঝিনি তো।

সুমি উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে বলল, কী বলবে বলো।

ফ্যাসফ্যাসে গলা। ঠান্ডা লেগেছে নাকি? জয় কিছু না ভেবেই চোখ বন্ধ করে বলে ফেলতে যাচ্ছিল, তখনই গলিতে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল সাত-আটটা ইয়ং ছেলে। ওই তো, ওই তো, বলে ওরা ছুটে গেল ছেলেটার দিকে। কলার ধরে সামনে টেনে এনে কিছু বোঝার আগেই বেধড়ক মারতে শুরু করল, পকেটমারকে যেভাবে মারে পাবলিক। ছেলেটা টুঁ শব্দ করছিল না। মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে গেল। অবিশ্রান্ত লাথি-ঘুসি। শালা খুনি ... চোর ... মার ... ব্যাটাকে।

জয় আর সুমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়েছিল ওদের দিকে। অন্য ছেলে-মেয়েগুলো মুহূর্তে হাওয়া।

এদের গ্রুপেরই একটা ছেলে মারে অংশ না নিয়ে দাঁড়িয়ে শুধু মাঝে-মাঝে খিস্তি করছিল ছেলেটাকে। জয় সাহস করে জিজ্ঞেস করল ছেলেটাকে, ব্যাপার কী দাদা?

ছেলেটা প্রথমে ভুরু কুঁচকে জয়ের দিকে তাকাল। তারপর সুমির দিকে চোখ পড়তেই একটু নরম সুরে বলল, আরে, এ শালা মহা হারামি ছেলে। আমাদের পাড়ার ভাল মেয়েটাকে ফাঁসিয়ে মারল। তারপর আজ ওদের বাড়িতে ঢুকে সাইকেলটা পর্যন্ত ঝেড়ে দিয়েছে। শালা পালাবে কোথায়?

মেয়েটা মানে? কোন মেয়ে?

ও আমাদের পাড়ার পায়েল। এই খচ্চরটা পটিয়েছিল। রোজ হিন্দমোটর থেকে আসত শালা লাইন মারতে। আমরা সবই জানতাম। কিন্তু কিছু বলিনি। পায়েলের বাবা জানার পর আমাদের হেল্প চায়। আমরা ছেলেটাকে ধরে হালকা পালিশ করে এদিকে আর আসতে বারণ করে দিয়েছিলাম। পায়েলেরও বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কয়েকদিন ঠিকঠাকই ছিল। তারপর গত পরশু মেয়েটা বাথরুমে রাখা এক বোতল অ্যাসিড পুরো...

খবরটা শুনেছিল জয়। কিন্তু সে যে এই মেয়েটা, ভাবতে পারেনি জয়। সুমি খামচে ধরল জয়ের জামা। হাত কাঁপছে তিরতির করে। জয়ের বুকেও প্রচণ্ড দপদপ শব্দ।

এমন একটা ছোটোলোক নীচ ... মাইরি জম্মে দেখিনি। আজ একটু আগে ওদের বাড়িতে লুকিয়ে ঢুকে পায়েলের সাইকেলটা চুরি করে পালাচ্ছিল। আমাদের ও চেনে না। ঠিক দেখেছি। কতটা জানোয়ার হলে এরকম করতে পারে। বলে একদলা থুতু ফেলে তীব্র আক্রোশে ছেলেটা ওদের দিকে এগিয়ে গেল। জয় আর সুমি অসহায়ের মতো ওদিকে তাকিয়ে। ক্রমাগত মার চলেছে এখনও। আর একটু পরে ছেলেটা নিশ্চয়ই মরে যাবে।

সুমি কাঁপা-কাঁপা গলায় বলল, প্লিজ জয়, কিছু একটা করো। ও মরে যাবে।

জয়ের দু-পা যেন মাটি কামড়ে ছিল। কোনওমতে পা দুটোকে তুলে এগিয়ে যেতে লাগল ছেলেগুলোর দিকে ... আপনারা থামুন প্লিজ ... ওকে ছেড়ে দিন এবার ... মরে যাবে...

জয়ের কথায় কেউ কান দিল না, একটু পরেই এখান দিয়ে পুলিশের ভ্যান যাবে। রোজ যায়। ছেলেটা মরলে কিন্তু আপনাদের প্রবলেম হয়ে যাবে, এই কথাটা যেন মন্ত্রের মতো কাজ করল। খুব অনিচ্ছাসত্বেও দ্রুত সরে এল ছেলেগুলো। আরও দু-একটা লাথি কষিয়ে থাক শালা এখানে পড়ে, বলে সাইকেলটাকে নিয়ে নিমেষে হাওয়া হয়ে গেল সকলে।

ছেলেটা রাস্তায় মুখ গুঁজে পড়ে আছে। রক্তে ভিজে গিয়েছে রাস্তা। সুমি ছুটে এল, জয়, কী করবে? বলতে-বলতে ছেলেটার দিকে তাকাতেই চোখ স্থির হয়ে গেল ওর। চোখ-মুখ ক্ষতবিক্ষত। রক্তে-কাদায় মাখামাখি। পাঁচিল ধরে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল ও। আর বারবার পড়ে যাচ্ছিল। অনেকক্ষণের চেষ্টায় একসময় পাঁচিলে হাতে ভর দিয়ে কোনওরকমে উঠে দাঁড়াল, ঠিক সেই আগের মতো সামনে ঝুঁকে। মুখ ঘুরিয়ে একবার তাকাল জয়দের দিকে, যেন বলতে চাইল, তোমরা নিজেদের জায়গায় যাও। দেখছ না, আমি আর পায়েল এখন গল্প করব। আমাদের কথা আজীবন, অনন্তকাল ধরে ...

জয়, সরে এসো। ওকে ... বলতে-বলতে জয়ের হাতের তালুতে হাত রাখল সুমি। ঘামে ভিজে উঠেছে দুজনের হাতের তালু। ঠিক আগের মতো, উষ্ণ...

উনিশ কুড়ি

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%