দেহদান

বিনোদ ঘোষাল

ঘুম ভেঙে ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল পৃথা। কলিং বেলটা অধৈর্যভাবে বাজছে। জুন মাসের সকাল সাতটার রোদ জানলার পর্দায় বারবার ধাক্কা খেয়ে ঘরের ভিতর ঢুকছে। পৃথা উঠল। নিশ্চয়ই কাকলির মা কাজে এসেছে।

ঘড়ির দিকে তাকাল। কাকলির মা রোজ সাড়ে ছটার মধ্যে রান্না করতে চলে আসে। কখনও লেট করে না। আজ সাতটা দশ। কারণ ভাবতে ভাবতে ড্রয়িংরুমেরর দরজা খুলল পৃথা। আর খুলতেই একরাশ কথা যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল কাকলির মায়ের মুখ থেকে। বউদি শুন নাই, তৃপ্তি কাকি মারা গেছে। কথাটা স্পষ্ট শুনতে পেল না পৃথা। চোখ মুখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, কী-হ? একই কথা রিপিট করল কাকলির মা। পৃথা লাইনটা শুনতে শুনতেই আচ্ছন্নের মতো ফিফথ ফ্লোর থেকে স্লিভলেস নাইটি পরেই হুড়মুড় করে নামতে থাকল।

ফোর্থ ফ্লোরে তৃপ্তিদির ফ্ল্যাট। দরজার সামনে কয়েকজন লোকের ভিড়। সবাই এই অ্যাপার্টমেন্টেরই রেসিডেন্ট। পৃথাকে ওইভাবে ছুটে আসতে দেখে দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়াল ভিড়টা। ঘরে পা দিতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল পৃথা। দরজাটার দিকে তাকাল। ভাঙা হয়েছে। ঘরের মধ্যে আরও কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে। তৃপ্তিদির ঠিকে কাজের মেয়ে লক্ষ্মী জোর গলায় কী সব বলে চলেছে একনাগাড়ে। পৃথা ঘরের সামনে হাঁ করে তাকিয়ে থাকল। ... আমি তো বুঝতেই পারিনি। প্রথমে বেল বাজালাম। দেখি কাকি খুলছে না। তারপর দজ্জা ধাক্কালাম। তাও সাড়া নেই। আমার তখুনি সন্দেহ হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে এই দাদাকে গিয়ে ডেকেছি। বলে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জয়ন্তকে দেখাল লক্ষ্মী। জয়ন্ত এই অ্যাপার্টমেন্টের সিক্সথ ফ্লোরে থাকে। খুব ভালো ছেলে। সকলের বিপদে আপদে আগে ছুটে আসে। জয়ন্ত পৃথাকে দেখেই এগিয়ে এল সামনে। আপনি এদিকে আসুন বউদি।

কেমন একটা সম্মোহিত অবস্থায় জয়ন্তর সঙ্গে দু-তিন পা গেল পৃথা। ড্রয়িং রুমের পরেই ডাইনিং স্পেস। তার এককোণে টয়লেট। টয়লেটের দরজা খোলা। সেখানে শরীরের উপরাংশ টয়লেটের ভিতর আর বাকিটুকু বাইরে রেখে উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছে তৃপ্তিদি। থমকে দাঁড়িয়ে থরথর করে কেঁপে উঠল পৃথা। জয়ন্তও দাঁড়াল। বলল, আপনাকে আর যেতে হবে না বউদি। আপনি এই ঘরে এসে বসুন। মেঝেতে পা ঘষে ঘষে কোনোমতে আবার ড্রইংরুমে এল পৃথা। এখানে বসুন। একটা চেয়ার এগিয়ে দিল জয়ন্ত। পৃথা বসল। শরীর ভীষণ অস্থির লাগছে। জয়ন্ত হাতের ইশারায় লক্ষ্মীকে খাওয়ার জল দিতে বলল। লক্ষ্মী এক গ্লাস জল এনে পৃথার হাতে দিল। গ্লাসটা হাতে নিতে গিয়ে পৃথার চোখ পড়ল থ্রি সি-র আশিস বসুর দিকে। লোকটা একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে পৃথার খোলা কাঁধ, গলা, স্লিভলেস ফরসা হাতদুটোর দিকে। গ্লাসে চুমুক দিল পৃথা। পুরো জলটা খেয়ে ফাঁকা গ্লাসটা লক্ষ্মীর হাতে ফেরত দিল। জয়ন্ত বেশ নীচু গলায় বলল, ঠিক লাগছে বউদি?

নি:শব্দে ঘাড় কাত করল পৃথা।

— আমার মনে হয় এবার কাকিমার রিলেটিভদের খবর দেওয়া উচিত। আপনি কি কাউকে ...

— আমি কাউকে চিনি না জয়ন্ত। ফ্যাঁসফ্যাঁসে ভাঙা গলায় বলে উঠল পৃথা। আসলে এই অ্যাপার্টমেন্টের সকলেই জানে পৃথার সঙ্গে তৃপ্তিদির সম্পর্কটা কত নিবিড়।

টু ডি-র সুলগ্না এসে বলল, কাকিমার কোনও ফোনের ডায়েরি-টায়েরি ...

— আমি কিচ্ছু জানি না। নিজেকে জোর করে সুস্থ রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল পৃথা। পাশের ঘরে তৃপ্তিদি উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছে। দৃশ্যটা মন থেকে রগড়ে তুলে ফেলতে চাইছিল প্রাণপণ।

— তৃপ্তিকাকিমার ফোনটা কোন ঘরে বলবে পৃথাদি? জিজ্ঞেস করল সুলগ্না।

বেডরুমে। নিজের আশ্চর্য শুকনো চোখদুটোকে দু-হাতে একবার ঘসে নিয়ে বলল পৃথা। কান্না পাচ্ছে না কেন? তৃপ্তিদি আর নেই, জেনেও কান্না আসছে না। সব জল কোথায় গেল? অথচ বুকের ভিতর গুড়-গুড় করে মেঘ ডাকার মতো শব্দ হচ্ছে ক্রমাগত। এইভাবে একটা মানুষ চলে যেতে পারে? এত সহজে! আশিস বসু এবার এগিয়ে এলেন। পৃথার দিকে একইভাবে চেটে খাওয়া দৃষ্টি রেখে বললেন, বুঝলে জয়ন্ত আমার কিন্তু মনে হয় না তৃপ্তিদির কোনো রিলেটিভ ছিল। কোনওদিন কাউকে আসতে তো দেখিনি। যা করার তাড়াতাড়ি কর, নইলে যা গরম, এবার বডি নষ্ট হতে শুরু করবে। শিউরে উঠে আশিসের দিকে তাকাল পৃথা। ওদিক থেকে সুলগ্না হঠাৎ বলে উঠল, পেয়েছি। পৃথাদি, তৃপ্তিকাকিমার একজন রিলেটিভ রয়েছে না, যিনি বিদেশে থাকেন?

— হ্যাঁ, বলার সঙ্গে সঙ্গেই পৃথার মনে পড়ল তৃপ্তিদির খুড়তুতো ভাইয়ের ছেলে অরিজিৎ ফ্রাঙ্কফুর্টে থাকে। সাইন্টিস্ট। ওখানেই সেটলড। গত দেড়বছরে একবারের জন্যেও আসেনি। পৃথা কখনও দেখেনি তাকে। তৃপ্তিদির কাছেই ওর সম্পর্কে যেটুকু শুনেছে। জয়ন্ত বলল, একবার ফোনে ট্রাই করে দেখা যাক। বলে মোবাইল বার করে ডায়েরি থেকে নাম্বারটা ডায়াল করে কানে ঠেকাল। কয়েক সেকেন্ড পর, ... হ্যালো ... আচ্ছা আমি কলকাতা থেকে জয়ন্ত ব্যানার্জি বলছি। আপনি কি তৃপ্তি সেনের কাজিন অরিজিৎ কথা বলছেন? আচ্ছা বলছি যে ... কথা বলতে বলতে ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে শুরু করল জয়ন্ত। পৃথা অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিল। গতকাল রাত্রেও তৃপ্তিদির সঙ্গে এই ঘরে বসেই এক ঘণ্টার ওপর গল্প করেছিল। কত কথা। সমবয়সি দুটি নারীর পারস্পারিক মন বিনিময়। যেটুকু সময় তৃপ্তিদির সঙ্গে সময় কাটাত পৃথা, শুধু সেই সময়টুকুতেই মনে হত বেঁচে আছে।

— ও কে, রাখছি। ফোন পকেটে রেখে জয়ন্ত গম্ভীর মুখে ঘরের সবাইকে বলল, অরিজিৎ বললেন ওনার আসতে মিনিমাম তিনদিন সময় লাগবে। ক্রিমেশনের কাজটা আমাদেরই করে নিতে বললেন।

— কিন্তু তৃপ্তিদির তো ক্রিমেশন করা যাবে না। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল পৃথা।

— কেন? প্রশ্নটা নিয়ে ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি মানুষ একসঙ্গে তাকাল পৃথার দিকে।

— তৃপ্তিদি দেহদান করে গেছেন।

— দেহদান? ... কেন? প্রশ্নটা আপসেই মুখ থেকে বেরিয়ে এল জয়ন্তর।

প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পৃথা বলল, কার্ডটা ... দাঁড়াও আমি দিচ্ছি। টিভির পাশে পেরেকে ঝোলানো ল্যামিনেট করা কার্ডটা তুলে এনে জয়ন্তর দিকে বাড়ানোর আগেই হাত বাড়িয়ে নিয়ে নিলেন আশিস বসু। ভুরু কুঁচকে পড়তে থাকলেন।

সুলগ্না জিজ্ঞেস করল, কী লেখা আছে আশিসদা?

— লেখা আছে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির জন্য আমি আমার মরণোত্তর দেহ অবলিক প্রত্যঙ্গ ও কলা ব্র্যাকেটের মধ্যে যথা রক্ত, কানের পর্দা ও হাড়, বৃক্ক, চামড়া, হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, যকৃৎ, অগ্ন্যাশয়, হাড়, মজ্জা ইত্যাদি ব্র্যাকেট ক্লোজ, মুমূর্ষুর প্রয়োজনে দান করিতে স্বেচ্ছায় অঙ্গীকারবদ্ধ হইলাম। একেবারে নীচে লেখা তৃপ্তি সেন, তারপর এই ফ্ল্যাটের ঠিকানা, আর সবার শেষে অর্গানাইজেশনের নাম আর ফোন নাম্বার দেওয়া। থামলেন অশিস। একবার ঠোঁট ওলটালেন। ঘরের দরজার বাইরে যারা দাঁড়িয়ে ছিলেন তারাও কার্ডের লেখা শুনে ঘরের ভেতরে চলে এসেছেন। সকলে চুপ। প্রায় মিনিটখানেক পর জয়ন্ত জিজ্ঞেস করল, কারণটা কী? একইরকম নৈ:শব্দ্য ঘর জুড়ে।

ওয়ান বি-র সৌমেনদা এবার বললেন, যাকগে কারণ যাই হোক, দান করে গেছেন যখন ব্যবস্থা তো একটা কিছু করতেই হবে।

— হুম, কিন্তু ওখানে ফোন করার আগে একটা ডেথ সার্টিফিকেট দরকার। বলে আশিস তাকালেন পৃথার দিকে। পৃথার বুক কেঁপে উঠল এর পরের প্রশ্নটার আশঙ্কায়। আর ঠিক তখনই প্রশ্নটা করে ফেলল জয়ন্ত। পৃথাদি অলোকদা আছে তো? ওনাকে প্লিজ একটু বলে দিন না একটা সার্টিফিকেট করে দেওয়ার জন্য।

পৃথা ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় বলল, হুঁ আছে ... কিন্তু ... আচ্ছা ডেথ সার্টিফিকেট কি খুব দরকার? মানে আমরা তৃপ্তিদিকে তো ...

আশিসবাবু সামান্য বিজ্ঞের হাসি দিয়ে বললেন, তাই আবার হয় না কি? ডাক্তারের সার্টিফিকেট না পেলে বডি আগে যাবে পোস্ট মর্টেমে। আর আমি যদ্দুর জানি পোস্ট মর্টেম হওয়া বডি ডোনেট করা যায় না। বলে ঘরের সকলের দিকে ভারিক্কি চালে তাকালেন উনি। পৃথা বসেছিল চুপ করে। মাথার ভেতর অজস্র কথা হইচই করছে। এই অ্যাপার্টমেন্টে আসার কয়েকদিন পরেই লিফটে পরিচয় হয়েছিল তৃপ্তিদির সঙ্গে। উনিই যেচে আলাপ করেছিলন। তোমরা নতুন এলে? এস না একদিন আমার ফ্ল্যাটে।

— আচ্ছা, বলে ঘাড় নেড়েছিল পৃথা। যায়নি। দু-তিনদিন পর আবার মুখোমুখি হতে একই নিমন্ত্রণ, কই এলে না তো? এস কিন্তু। সারাদিন একা থাকি। কাউকে গল্প করার জন্য পেলে বেশ লাগে। সেদিনেই সন্ধেবেলা তৃপ্তিদির ফ্ল্যাটে গেছিল পৃথা। নিপুণ করে সাজানো অনাড়ম্বর ফ্ল্যাট। ড্রয়িংরুমের দেওয়ালে একজন প্রৌঢ় সুপুরুষ আর্মি অফিসারের বাঁধানো ফটো। পৃথা তাকিয়ে ছিল ফটোটার দিকে। তৃপ্তিদি বলেছিল, আমার কর্তা, কারগিলে পোস্টিং ছিলেন সেই যুদ্ধের সময়। দেশের জন্য প্রাণ দিয়ে এখন সগগে বসে মজা দেখছেন। পৃথা খেয়াল করেছিল, কথাগুলো বলার সময় তৃপ্তিদির গলায় তার শহিদ স্বামীর জন্য অহংকার চুঁইয়ে পড়ছিল। কথায় কথায় গল্পে গল্পে অনেক রাত হয়ে গেছিল সেদিন। নি:সন্তান নি:সঙ্গ একাকী মানুষটির মতো এত সুন্দর মনমুগ্ধ হয়ে গেছিল পৃথা। তৃপ্তি পঁয়ষট্টি আর পৃথা সাঁইত্রিশ। দুজনের বয়সের পার্থক্যটাও ঘুচে গেছিল। কী মিষ্টি গানের গলা ছিল তৃপ্তিদির। পুরাতনী গান বড্ড ভালো গাইত। আজও মনে আছে পরিচয়ের প্রথম দিনে শোনা গানটা। বিধি দিল যদি বিচ্ছেদ যাতনা, প্রেম গেল তবু কেন প্রাণ গেল না। বন্ধুত্ব হয়ে গেছিল সেদিনেই। আর খুব তাড়াতাড়ি পরস্পরের ভিতরে ঢুকে গেছিল দুজনে। হয়তো একাকীত্বই কাছে এনে দিয়েছিল দুটি অসমবয়সি মানুষীকে। তারপর থেকে অলোক বাড়িতে না থাকলেই পৃথা চলে যেত তৃপ্তিদির ঘরে। নিজেদের কথা বলতে বলতে একে অপরের নিশ্বাসের শব্দও শুনতে পেত ওরা। তৃপ্তি জানাতো ওর ছোটোবেলায় মা-বাবা মারা যাওয়া, মামার বাড়িতে মানুষ হওয়া তারপর আর্মি অফিসার দীপ্তাংশু সেনের সঙ্গে বিয়ে। যাযাবরের মতো হিল্লি-দিল্লি পোস্টিং, সন্তানহীনতা। আর সব শেষে কারগিল যুদ্ধে দীপ্তাংশুর শেষ হয়ে যাওয়া। সন্তান না হওয়ার যন্ত্রণা সত্ত্বেও ওরা স্বামী-স্ত্রী দুজনে বড্ড ভালো বন্ধু ছিল। দীপ্তাংশুর কাছেই তৃপ্তি শিক্ষা পেয়েছিল জীবনে কিছু একটা করার। সুযোগ হয়ে ওঠেনি কোনোদিন। সেই দু:খ জারিয়ে রেখেছিল ভিতরে। কথার ফাঁকে তৃপ্তিদি মাঝেমধ্যেই বলত, নিজেকে কুকুর-ছাগলের মতো মনে হয়। নামেই শুধু মানুষ হলাম, মানুষের জন্য তো কিছু করতে পারলাম কই? ও কিন্তু দেখ ঠিক পেরে গেল, আমি ফেল। বলে দীপ্তাংশুর ফোটোটার দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকত। তাকিয়ে থাকতে থাকতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ত তৃপ্তিদি। তারপর এই মাস কয়েক আগে হঠাৎ তৃপ্তিদি ফোন করেছিল পৃথাকে। শিগগির আমার ঘরে আয়, এক্ষুনি।

— এক্ষুনি, কেন?

— আগে আয় তারপর বলছি।

— উফ বড্ড জ্বালাও তুমি, রান্না করছি তো।

— ধুত্তোর রান্নার নিকুচি করেছে। আগে আয় বলছি।

— আসছি আসছি। হাত ধুয়ে ফ্ল্যাটের দরজা লক করে তৃপ্তিদির কাছে গেছিল পৃথা। ঢুকতেই তৃপ্তিদি জানিয়েছিল তার মরণোত্তর দেহদানের কথা। বেঁচে থেকে তো কিছু করতে পারলাম না কারোও জন্য, মরার পর যদি ... হি-হি। এত নীচু গলায় এমন উঁচু ভাবনাকে সহজ হাসতে হাসতে বলেছিল তৃপ্তিদি যে পৃথা আবার মুগ্ধ হয়েছিল, একজন একা মানবীর এই ভাবনায়। এইভাবেও জীবনকে ভাবা যায়! কোথাও যেন নিজের জীবনেও কিছু একটা করার গোপন ইচ্ছে জন্ম নিয়েছিল সেদিন থেকে।

আসলে ইকনমিক্সে গ্র্যাজুয়েশন করে মাস্টার্স করার ইচ্ছে ছিল পৃথার। কিন্তু অলোক তাড়া দিচ্ছিল। বলেছিল, আগে বিয়েটা করে নিই চল, তারপর যত ইচ্ছে পড়াশোনা কোরো। আর আমি তোমাকে ছেড়ে একা একা পারছি না-না-না। এরপর আর না বলতে পারেনি পৃথা। অলোক তখন সবে প্র্যাকটিস শুরু করেছে। বিয়ে হয়ে গেছিল দুজনের। প্রথমে বছর দেড়েক হেসে-ভেসে যাওয়া জীবন কাটানোর পর হঠাৎ করেই অলোক বদলে যেতে শুরু করল। বরাবরই ব্রাইট স্টুডেন্ট ছিল। কাজেই কেরিয়ার শুরু করার কিছুদিনের মধ্যেই হু হু করে উন্নতি। এতদিনের সাদামাটা জীবনে বিশ্বাসী অলোক হঠাৎ অজস্র রোজগারে আর নিজেকে সামলে উঠতে পারল না। রাতবিরেতে বাড়ি ফেরার ঠিক নেই, পার্টি-মদ-ক্লাব। অলোককে চিনতে পারত না পৃথা। তুমুল অশান্তি হত একেকদিন। তারপর মাঝরাত কিংবা কাকভোরে শরীরে শরীর মেখে মিটে গেছে সেই ঝগড়া। কিন্তু গোপনে সম্পর্কের আঠাটা ছেড়ে যাচ্ছিল একটু একটু করে। সব মেনে নিয়ে আবার চেষ্টা করতে শুরু করেছিল পৃথা। ভেবেছিল একটা ইস্যু এসে গেলে হয়তো অলোক আবার আগের মতো হয়ে যাবে। সেই আশা নিয়েই অলোকের অনেক আপত্তি সত্ত্বেও ও একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছিল পৃথা। অরণ্য, নাম দিয়েছিল সেই আত্মজের। কিন্তু তারপরেও অলোক একইরকম। আরও বেশি লাগামহীন জীবনযাত্রা। মাঝেমধ্যেই বাড়ি ফিরত না। বলত কাজ আছে।

— কীসের এত কাজ তোমার? ছেলেটা কি আমার একার? তোমার কোনও রেসপন্সিবিলিটি নেই?

— আমি তো ইস্যু চাইনি। তুমি চেয়েছিলে। সো ... তারপর একদিন ভয়ংকর অশান্তির মধ্যে অলোক নিজেই জানাল ওর সঙ্গে অনুষ্কার সম্পর্কের কথা। অনেক দিনের বন্ধুত্ব ছিল ওদের। অলোকের সঙ্গেই ইনটার্ন করত। তারপর একই নার্সিং হোমে প্র্যাকটিস করে দুজনে। আগে দু-একবার অলোক ওকে এই ফ্ল্যাটেও নিয়ে এসেছিল। পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল পৃথার সঙ্গে। মেয়েটাকে দেখতে মিষ্টি, কিন্তু একটু বেশি গায়ে পড়া ভাব মনে হয়েছিল পৃথার। মনে আছে গল্প করতে করতে অনুষ্কা একবার পৃথাকে বলেছিল, তোমার হাবিকে কিন্তু সামলে রেখ ভাই। যা হ্যান্ডু দেখতে। বাড়িতে তোমার কাছে বোধহয় চুপটি করে থাকে, কিন্তু বাইরে ফ্লার্টিং মাস্টার। কেউ দেখার নেই।

পৃথা হেসে উত্তর দিয়েছিল, কেন, তুমি আছ তো। বাইরে না হয় তুমিই বন্ধুকে নজরে রাখবে। সেই অনুষ্কা। ... তার মানে তুমি আমাকে ঠকিয়েছ অলোক। স্বীকার কর ঠকিয়েছ।

— আই ডোন্ট থিঙক সো।

— কাওয়ার্ড একটা।

— আই নিড এ রিলিফ। ওক্কে?

— যার তার সঙ্গে বিছানায় শুয়ে পড়াটা তোমার কাছে রিলিফ, তাই না?

— কে যার তার? শি ইজ মাই ফ্রেন্ড। আর তুমিও করতে পার। মেকস নো ডিফারেন্স টু মি।

আর সহ্য করতে পারেনি পৃথা। ভেবেছিল সেদিনই অরণ্যকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে কোথাও। কিন্তু তৃপ্তিদি আটকেছিল ওকে। বুঝিয়েছিল, তুই কেন চলে যাবি? দোষ তো তোর নয়। এইভাবে চলে যাওয়া মানে হেরে যাওয়া। অন্যায় না করেও হারবি কেন তুই? তাছাড়া অরণ্যর প্রতি অলোকেরও একটা দায়িত্ব রয়েছে। সে দায়িত্ব ও এড়াতে পারে না। চলে গেলে চলেই যাবি। কারও কিচ্ছু এসে যাবে না। ভালোবাসা না পাস তো নিজের অধিকারটাকে ছাড়বি কেন? তৃপ্তিদির কথা শুনেছিল পৃথা। বুঝেছিল। তাই তারপর থেকে শুধু এক ছাদের নীচে থাকা। আলাদা বেডরুম। ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ঘরে শুত পৃথা। দাঁতে দাঁত চেপে কয়েকটা বছর এইভাবে পার করে অরণ্যকে দার্জিলিং-এ পাঠিয়ে দিয়েছিল ও। ওখানে হস্টেলে থেকেই পড়াশোনা করে। বাবা-মার মধ্যে এই অসীম দূরত্বের আঁচ যাতে ওর গায়ে না পড়ে তাই নিজে পুরো একা হয়ে যাবে জেনেও এই কঠিন সিদ্ধান্তটা নিয়েছিল। এত ঝড়ের পরেও পৃথার শরীর ছিল আগের মতই নির্মেদ টানটান। কোনো পুরুষের চোখ একবার পৃথার দিকে পড়লে এখনও সরে যেতে কষ্ট পায়। এই নিয়েও রাগ অলোকের। কেন পৃথা বিয়ের এতগুলো বছর পার করেও এত সুন্দর? তাই মাঝেমধ্যেই দেহ পুড়িয়ে দেওয়া নোংরা গালিগালাজ, শরীর নিটোল রাখার কারণ নিয়ে কুৎসিত ইঙ্গিত। প্রথম দিকে শব্দগুলো গরম সূচের মতো গায়ে বিঁধত। তারপর একসময়ে সেগুলোও কেমন অভ্যাস হয়ে গেল। কথাগুলো পৃথার কাছেই আর পৌঁছত না যেন। দূর থেকেই ফিরে যেত। আবার কোনোদিন বেহেড হয়ে ফিরে রাত্রে শরীরের খিদে জাগলে পৃথাকে পাওয়ার জন্য পাগলা কুকুরের মতো ওর ঘরের বন্ধ দরজায় বাইরে থেকে আঁচড়াত, ধাক্কাত। কিছুতেই দরজা খুলত না পৃথা। বিছানায় গুটিয়ে নি:শব্দে শুয়ে থাকত। পৃথা বুঝত অলোক আসলে ওর শরীর নয়, আত্মসম্মানকে ছিঁড়েখুঁড়ে দিতে চাইছে। এত কিছুর বিনিময়ে শুধু করুণা আসত লোকটার প্রতি।

— পৃথাদি ... পৃথাদি।

— উঁ ... হ্যাঁ জয়ন্ত বল। ঘোরটা কাটতে থাকল পৃথার।

— আমাদের আর দেরি করা ঠিক হচ্ছে না।

— আমাকে কী করতে বলছ তোমরা?

এবার আশিসবাবু মুখ খুললেন। আপনি প্লিজ একবার অলোকবাবুকে বলে দিন না ডেথ সার্টিফিকেটটা করে দিতে। তাহলে আমরা কাজগুলো এগোতে পারি।

— ওকে? প্রায় শিউরে উঠল পৃথা।

— হ্যাঁ। কেন উনি বাড়িতে নেই?

পৃথা নিজেও জানে অলোকের সঙ্গে ওর তিক্ততা এই অ্যাপার্টমেন্টে শুধুমাত্র তৃপ্তিদিই জানত। বাকি সকলের কাছে যতটা পারা যায় সামাজিক ভদ্র পোশাকে। ঘরের ভিতরে কে কেমন থাকে বাড়ির লোকেরা কেউ জানে না।

— কেন, উনি নেই বাড়িতে?

— উঁ ... আছেন। অন্যমনস্কভাবেই উত্তর দিল পৃথা। বুকের ভেতর আবার অসহ্য শব্দ শুরু হয়েছে।

— প্লিজ তাহলে ওনাকে একবার বলুন। বলেই আশিসবাবু জয়ন্তর দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি তাহলে বডি নেওয়ার ওই প্রতিষ্ঠানটাকে ফোন করে দাও। আর দেরি কোরো না।

— হ্যাঁ আশিসদা করে দিচ্ছি। বলতে বলতে জয়ন্ত আবার নিজের মোবাইল বার করে হাতে ধরা কার্ডটা দেখে নাম্বার টাইপ করল। ... হ্যালো, আচ্ছা আমি বৈদ্যবাটি থেকে জয়ন্ত ব্যানার্জি বলছি।

পৃথা শেষ চেষ্টা করল, আচ্ছা আমি বলছিলাম ও যদি সার্টিফাই... মানে অন্য কোনও ডক্টরকে দিয়ে যদি ...

— কোনো প্রবলেম আছে কী? ভুরু কুঁচকে এবার প্রশ্নটা করলেন টু সি-র ভাস্করবাবু।

— না না প্রবলেম ... তেমন কিছু ... কী বলবে ভেবে পেল না পৃথা। ঘরের মানুষগুলো ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে একদৃষ্টে। কী যেন শুনতে চায় সবাই।

— একে তো এমন একটা জায়গায় থাকি আমরা ডাক্তারই কম। তারপর এখন অন্য ডাক্তার ডেকে নিয়ে এসে তাকে ডিটেল বলে কয়ে সার্টিফাই করাতে যে সময় লাগবে তার থেকে ..., বাট আপনার কোনো সমস্যা থাকলে তো অবশ্যই আমাদের অলটারনেট কিছু ভাবতে হবে। বেশ রসিয়ে রসিয়ে কথাগুলো বললেন আশিস।

তৃপ্তিদির শরীর নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, কথাটা মনে হতেই নিজের শরীরটাকে হিঁচড়ে চেয়ার থেকে তুলল পৃথা। মাথা টলছে। নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে যেন। পা টেনে টেনে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল ও। তৃপ্তিদি আর অলোক, দুটো শরীর ওর চোখের সামনে ছায়াছবির মতো আসা-যাওয়া করছে। সিঁড়ির সামনে এসে দাঁড়াল পৃথা। কী বলবে ও অলোককে? ডেথ সার্টিফিকেট লিখে দাও? যে লোকটাকে ও নিজের আত্মা দিয়ে ঘৃণা করে, তার কাছে আজ কেন চাইবে? আর সে-ই বা দেবে কেন? সামনের দিকে ঝুঁকে নীচু হয়ে খুব ধীরে ধীরে একটা একটা করে সিঁড়ির ধাপ উঠতে থাকল পৃথা। ফ্ল্যাটের দরজা খুলে অলোকের বেডরুমে উঠল। অলোক এখন ঘুম থেকে উঠে বালিশে ঠেস দিয়ে আধশোয়া হয়ে সিগারেট খাচ্ছে। খালি গা। বারমুডা পরে। পৃথার দিকে আলগোছে একবার তাকাল। একটু অবাক হল যেন। তারপর আবার চোখ বুজে সিগারেটে টান দিল। সামনে এসে দাঁড়াল পৃথা। গোটা পৃথিবী জুড়ে অসংখ্য ঝিঁঝি পোকা ডাকছে। কান বন্ধ হয়ে আসছে সেই গর্জনে।

— তুমি কিছু বলবে?

— তৃপ্তিদি মারা গেছে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল পৃথা। চোয়াল কাঁপছে ঠক ঠক করে।

— যাহ। এত প্রিয় বন্ধু তোমাকে একলা ফেলে চলে গেল? এবার কী করবে তাহলে? বলে একবার ব্যাঁকা হাসল অলোক। তারপর বলল, আর কিছু বলার আছে কি? আমি উঠব।

— তৃপ্তিদি দেহদান করে গেছে।

— দেহদান! ওরেব্বাবা, মহান ব্যক্তিত্ব। ভেরি গুড। তা তোমার বন্ধু যখন ...

— একটা ডেথ সার্টিফিকেট ... পর্যন্ত বলে থেমে গেল পৃথা।

— সার্টিফিকেট আমি দেব? কেন? আর ডাক্তার নেই? কথার সঙ্গে সঙ্গে অলোকের চোখদুটো পৃথার মাথার চুল থেকে সরীসৃপের মতো জড়িয়ে জড়িয়ে আঁকা বাঁকা পথে খুব আস্তে আস্তে নামছিল। চোখ বন্ধ করে ফেলল পৃথা। কেমন একটা ঘোর লাগছে। আবছা হয়ে আসছে সবকিছু। ...

— দেবে একটা সার্টিফিকেট? নিজের বলা শব্দগুলোও যেন বহুদূরের কোনো চিৎকার। পাহাড়ে পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে যাচ্ছে এদিক সেদিক।

— ওয়েল ... বাট হাউ উইল ইউ পে ফর ইট? ... স্পিক আউট ... হাউ? কথাগুলো কেটে কেটে বলতে বলতে নিজের শুকনো ঠোঁট চাটল অলোক। পৃথা হঠাৎ গায়ের চামড়া ছাড়ানোর মতো করে টেনে টেনে ছিঁড়তে লাগল পরনের নাইটিটা। ... আমার দেহের প্রতিটি কলা ... রক্ত ... চামড়া ... স্তন ... হৃদযন্ত্র ... যোনি ... ফুসফুস ... সবকিছু ... খোলা শরীরটা থির থির করে কাঁপছে।

— হোয়াট হ্যাপেন্ড? কী বিড়বিড় করছ? হ্যালো ... কী বলার তাড়াতাড়ি বল। বিরক্ত হয়ে উঠল অলোক।

চোখ খুলল পৃথা। তৃপ্তিদির মতো উপুড় হয়ে নয়, অলোক চিৎ হয়ে স্থির শুয়ে আছে।

ঘোরটা কাটতে কয়েক সেকেন্ড, তারপর খুব নিরুত্তাপ গলায় পৃথা বলে উঠল, আমাকে অনুষ্কার ফোন নম্বরটা দেবে? একটা ডেথ সার্টিফিকেট দরকার।

পরমা

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%