বিনোদ ঘোষাল
সাত সের মাংস, তাহার অর্ধেক পরিষ্কার মাংসের ক্কাথ, সাড়ে তিন সের ঘৃত, এক সের ছাড়ানো লখত, দুই সের পেঁয়াজ, আধ সের লবণ, একপোয়া কাঁচা আদা, গোলমরিচ, দারুচিনি ও ছোটো এলাচি একদাম, ইহার সহিত কিশমিশ ও বাদাম এবং পরিমাণ মতো পেস্তা। সিদ্ধ করিবার সময় যদি জলের প্রয়োজন হয়, তবে জল না দিয়া বেদানার রস দিতে হইবে'— এ পর্যন্ত পড়ে বই থেকে মুখ তুলল সৌরভ। সুজিতদা ওর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। বিকাশ একমনে রুটি চিবিয়ে যাচ্ছে। এই টুকরোটা ও প্রায় মিনিট পনেরো আগে মুখে ঢুকিয়েছিল। এখনও সাইজ করতে পারেনি। রোজই টিফিনে ভয়ঙ্কর চিমড়ে রুটি নিয়ে আসে। শুধু আঙুল দিয়ে ছেঁড়া যায় না। দাঁত চিপে ছিঁড়তে হয়। আটাতে ফেবিকল মিশিয়ে মাখে কিনা প্রশ্নটা করব করব করেও করা হয়ে ওঠেনি। এখনও চিবিয়েই চলেছে। রুটির সঙ্গে আলুর মলম। সুজিতদা লাঞ্চ বাইরে সারে। শুকনো মুখ। সৌরভের বাক্সে রুটিভাজা আর আলুপটলের তরকারি। আর সামনে রাখা মটর পনির এবং রায়তা। এ দুটো আইটেম রায়বাবুর দেওয়া। প্রতিদিনই যেমন দিয়ে থাকেন।
কী বুঝলেন রায়বাবু, হে-হে। সুজিতদা হেসে জিজ্ঞেস করল, চেয়ারে হেলান দিয়ে মাথার পিছনে দু-হাত রেখে চোখ বুজে সৌরভের কথা শুনছিলেন রায়বাবু। কৃষ্ণকান্ত রায়, সংক্ষেপে লেখেন কে. কে. রায়। মুখে মৃদু হাসি এনে সৌরভের দিকে তাকিয়ে বললেন, আইটেমটা খারাপ না; তবে ভেজ ডিশ কিছু লেখেনি।
হুঁ আছে তো। বলেই সৌরভ পাতা ওলটালো। একটু চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল, এটার নাম জর্দ্দ বিরিঞ্চ। দশ সের চাউল, পাঁচ সের মিছরি, সাড়ে তিন সের ঘৃত, আধ সের কিশমিশ, এক সের বাদাম, এক সের পেস্তা, এক পোয়া লবণ, আধ পোয়া আদা, দেড়গ্রাম জাফরান, আড়াই নিস্কল দারুচিনি — এইসব একত্র করিয়া যে আহার্য্য সামগ্রী প্রস্তুত হইত তাহারই নাম জর্দ্দ বিরিঞ্চ। অনেক সময় ইহার সহিত মাংসের ক্কাথও মেশানো হইত। সৌরভের বলা শেষ হতে না হতেই বিকাশ বলে উঠল, এত এত কী করে খেত রে লোকটা। সবই পাঁচ সের আর দশ সের।
রায়বাবু সামান্য ভুরু কুঁচকে বিকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, তো, আকবর বাদশার রান্না কি এইটুকু হবে। একবাটি! আমার মতো সামান্য মানুষের বাড়িতেই এখনও রোজ যা রান্না হয় তাতে আরও দু-তিনজন লোক অনায়াসে পেট ভরে খেতে পারে।
সুজিতদা বলল, সে তো আপনিও একই লাইনের বলে। নইলে আমাদের মতো বাড়িতে এই বাজারে যা রান্না হয় তাতে বউ বাচ্চা নিয়ে খাবার পর ভাতের থালা আর না মাজলেও চলে। কী বলিস সৌরভ। বলে হা-হা করে হাসলেন সুজিতদা।
আইনি আকবরির বাংলা সংস্করণটা হঠাৎ গতকাল রাত্রে বোনের পড়ার টেবিলে দেখতে পেয়েছিল সৌরভ! পাতা উলটেপালটে বেশ ইন্টারেস্ট লেগে গেছিল। কতরকমের ব্যাপার। ইতিহাস বই পড়ে এসব জানাই যায় না। তখনই ভেবেছিল বইটা অফিসে নিয়ে এসে ওদেরও খানিকটা শোনাবে। লাঞ্চ আওয়ারে। এইসব গল্প হলেও সত্যি সবাইকে অবাক করে দিয়ে বলতে বেশ মজা লাগে। মাটনের আইটেম আর কী কী আছে রে। সুজিতদা জিজ্ঞেস করল।
অনেকগুলো আছে। কাবুলি, দে বজদ বেরিয়াম, সওয়া বাখরা হেরেসা। ব্যস ব্যস' রুটির শেষ টুকরোটা মুখে দিয়ে ক্লান্ত গলায় বিকাশ জিজ্ঞেস করল, আকবর রুটি খেত না?
হ্যাঁ খেত, এই লিখেছে পাদশাহের জন্য একখানি বড়ো রুটি তৈয়ারি হইত। দশ সের ময়দা, পাঁচ সের দুধ দেড় সের ঘি, একপোয়া লবণ, ইহার সহিত কিঞ্চিত আঙুর বা বেদানার রস। বাদাম, পেস্তা ও কিশমিশ মেশানো থাকিবে। ইহাই রুটির আকারে প্রস্তুত করিয়া তন্দুরে সিদ্ধ করিতে হইবে।
বিকাশ মুখ বেঁকিয়ে বলল, সেই, এইরকমই কিছু একটা আন্দাজ করেছিলাম।
সৌরভ হেসে বলল, রায়বাবু কী বুঝলেন?
ভালোই — খারাপ না। বলে উঠে পড়ে বললেন, চল চল টাইম হয়ে গেছে। কাজ শুরু কর।
সৌরভ আর বিকাশ রায়বাবুর দেওয়া পনির আর রায়তার ফাঁকা বাটি দুটো প্যান্ট্রি থেকে ধুয়ে এনে ফেরত দিল। এটাই দস্তুর।
মাস কয়েক আগে সৌরভ যখন আয়রন স্টিল কোম্পানির জুনিয়ার অ্যাকাউন্টান্ট হিসেবে ছ-হাজার মাইনেয় জয়েন করেছিল; প্রথম দিনেই চোখ চলে গেছিল ধপধপে ফর্সা, প্রৌঢ় মানুষটার দিকে। পাঁচফুটের মতো হাইট। মাথার সামনের দিকে টাক। দাড়ি-গোঁফ কামানো লাল রঙের গাল, কপালটাও লাল রঙের। ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা একচিলতে অদ্ভুত হাসি। ছিপছিপে চেহারা। পাতলা চুল কটায় কড়া কলপ। হাল্কা হলুদ রঙের ফুলহাতা শার্ট আর কালো ট্রাউজার। পালিশ করা জুতো। সৌরভ ভেবেছিল অফিসার র্যাঙ্কের কেউ হবেন। নিজেই এসে পরিচয় করেছিলেন, হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন হ্যাল্লো ইয়ংম্যান, কী নাম তোমার?
সৌরভ ঘোষাল।
ঘোষাল? বাৎসগোত্র। গোত্রের মধ্যে শ্রেষ্ঠ জান তো?
সৌরভ হেসে উত্তর দিয়েছিল না, জানতাম না।
জানা উচিত। নিজের বংশমর্যাদা নিজেকেই রক্ষা করতে হবে না!
সৌরভ আরেকবার হেসে ঘাড় কাত করেছিল।
দামি পারফিউমের হালকা গন্ধ বের হচ্ছিল। তুমি দেখতে ভেরি হ্যান্ডসাম। এটা বজায় রেখো। আমার নাম বলেছি?
না।
কে. কে রায়। সবাই রায়বাবু বলে ডাকে।
আচ্ছা, আমিও তাই ডাকব তাহলে।
ওকে। কাজ কর।
সৌরভ ভেবেছিল এবার উনি চলে যাবেন। গেলেন না। সৌরভের পিছনে উলটো দিকের দেয়ালে মুখ করে রাখা চেয়ারটা টেনে বসে পড়েছিলেন উনি। কী সব ফাইল ঘাঁটাঘাঁটি করলেন, সুজিতদা আর সুমনকে এনতার ইনস্ট্রাকশান দিয়ে গেলেন। দুপুর দুটোর সময় সৌরভের দিকে ফিরে বললেন এখানে দুটো থেকে আড়াইটা লাঞ্চ আওয়ার। লাঞ্চ এনেছ না বাইরে যাবে?
না এনেছি।
গুড, বাইরের খাবার যত পারবে অ্যাভয়েড করবে। আজ থেকে তুমিও আমাদের লাঞ্চ পার্টনার।
প্যান্ট্রি থেকে পিওন এসে কাচের প্লেট, বাটি, চামট দিয়ে গেল রায়বাবুর জন্য। নিজের ডেস্কের ওপর সাদা কাপড়ের ন্যাপটা পাতলেন ব্যাগ থেকে বার করে। তারপর টিফিন ক্যারিয়ার খুলে চামচে করে প্রত্যেকের টিফিন বাক্সে খানিকটা করে চিলি পনির আর রায়তা দিলেন। তারপর নিজে খেতে বসলেন। সৌরভ সেদিনই বুঝেছিল এই লাঞ্চ ডিস্ট্রিবিউট করাটা ওনার রোজের ব্যাপার। সুজিতদা যথেষ্ট অভ্যস্ত সুরেই বলেছিল কালকের চানা মশলাটা এখনও জিভে লেগে রয়েছে। বউদির হাত সত্যিই সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে দেওয়া উচিত।
কয়েক দিনের মধ্যেই অনেক কিছু বুঝে নিয়েছিল সৌরভ। রায়বাবু এক অদ্ভুত চরিত্র। অফিসে সামান্য সি গ্রেড ক্লার্ক হলে হবে কী, ঠাটবাট একেবারে রাজার মতন। নিজের মুডের রাজা। ট্যাক্সি ছাড়া যাতায়াত করেন না। বুকপকেটে ফিল্টার উইলসের প্যাকেট। শার্টে দামি পারফিউম। পকেটে সব সময় লজেন্স বা চকোলেট। যখন যাকে ইচ্ছে হয় পকেট থেকে একটা বার করে হাতে দিয়ে দেন। ওনার চারপাশে এমন একটা ব্যক্তিত্ব স্প্রে করা থাকে যে সামনে আসলে সম্ভ্রম জাগে! অফিসের বসরাও বেশ খাতির করেন ওনাকে। কিন্তু মাইনে মাত্র সাড়ে চার হাজার। সৌরভের খুব জানতে কৌতূহল হতো এত কম টাকায় এমন লাইফস্টাইল মেনটেন করেন কীভাবে!
কয়েকদিনের মধ্যেই সুজিতদাকে পকিয়ে ফেলে। একদিন শনিবার হাফছুটির পর বাইরে বেরিয়ে সুজিতদার হাতে একটা মিঠেপান ধরিয়ে জিজ্ঞেস করল সৌরভ, আচ্ছা সুজিতদা, এই রায়বাবু লোকটা কিন্তু দারুণ ইন্টারেস্টিং, তাই না। সুজিতদা পানের প্রথম পিকটা পেলে দেবে কিনা ভেবে কোঁত করে গিলে নিয়ে বলল, ও বাবা ওনার অনেক কেস। যে সে মানুষ নয়। রাজার নাতি।
তাই? কেমন?
সুজিতদা বলল, সবটাই অবশ্য কিছুটা ওনার মুখে কিছুটা এর ওর কাছ থেকে শোনা। ওর দাদু ছিলেন এখন বাংলাদেশে যে কুমিল্লা আছে না, সেখানকার রাজা। তারপর দেশভাগ হয়ে গেলে রাজপাট সব গেলে এদেশে চলে আসেন ওরা। এখানে এসে নাকি কী সব ইমপোর্ট-এক্সপোর্টের ব্যবসা শুরু করেছিলেন। সেটাও ভালো দাঁড়িয়ে গেছিল। সেই ব্যাবসার সূত্রেই এই কোম্পানির মালিকের সঙ্গে রায়বাবুর পরিচয় ছিল। কিন্তু একে দেখ তো কেমন মুডের লোক। তার ওপর আবার শুনেছি দুটো ম'-এর দোষ ছিল খুব।
দুটো বলতে?
আরে বাবা মদ আর মেয়েমানুষ। ওতেই সব ফুটিয়ে দিয়ে পুরো ভিখিরির হাল হয়ে গেছিল। তার ওপর আবার শেয়ারটেয়ারে অনেক টাকা ঢেলেছিলেন, যেগুলোও চৌপাট হয়ে যাওয়ায় একেবারে হাতে হ্যারিকেন। তখন আমাদের মালিক ওনাকে নিজের কোম্পানিতে চাকরি দিয়ে বাঁচান। চাকরি মানে ওই আর কী জাস্ট ইনডায়রেক্টলি হেল্প করা। কাজকম্ম তো ওনার দেখাই। কিছুই প্রায় করতে জানেনও না। করেনও না। ওই টুকটাক ফাইলিং আর ব্যাঙ্ক-ট্যাঙ্কে মাঝেমধ্যে যান। বয়সটাও তো হয়েছে না।
কিন্তু স্যালারি সিটে দেখলাম ওনার মাইনে তো খুবই কম। এর মধ্যে ফ্যামিলি চালিয়ে এই স্ট্যাটাস মেনটেন ...
আরে ধুস, সংসারের খরচ ওনাকে এক পয়সাও দিতে হয় না। ওনার ওয়াইফ তো সব কাজকর্ম করেন। সেই সংসার চালান। ইনি শুধু নিজের রাজকীয় লাক্সারি চালান স্যালারির টাকায়। স্যার নাকি মাইনা ছাড়াও ওকে আরও কিছু টাকা দেন প্রতি মাসে।
যা বাব্বা। স্ত্রী সংসার চালান!
হ্যাঁ, তাও আবার সাউথ ইন্ডিয়ান স্ত্রী। অনেক বয়সে বিয়ে।
সাউথ ইন্ডিয়ান! কীভাবে হল?
কে জানে কী ডিসপুট ... হ্যাঁ-হ্যাঁ ... তবে লোকটার দরাজ দিল। লোককে খাওয়াতে দাওয়াতে খুব মন। সামান্য যা কিছু আসবে আগে সবাইকে দেবে, তারপর নিজে।
তা ঠিক। পারসোনালিটিও খুব।
হ্যাঁ। সেই সঙ্গে বদরাগও আছে। হাইপ্রেসার। এমনিতে রামচন্দ্র। কিন্তু খচে গেলে একেবারে রাবণ। সঙ্গে আরেকটা দোষও আছে। মাঝে মধ্যেই বড্ড গুল মারে।
সে কি রাজকীয় গুল?
হ্যাঁ ... হ্যাঁ-হ্যাঁ
বাড়ি কোথায় ওনার?
পার্ক স্ট্রিট।
বাবা। সে তো পশ-এরিয়া?
হ্যাঁ। আবার পৈতৃক ভিটে।
বাড়িতে গেছেন কখনও?
উহুঁ। সেদিকে সেয়ানা। কোনওদিন কাউকে বাড়িতে নিয়ে যাননি। কেন কে জানে!
হ্যাঁ রে তোর আকবরের বইটা সঙ্গে আছে? রায়বাবু জিজ্ঞেস করলেন। সুজিতদা আর বিকাশ সিটে ছিল না। সৌরভ ডেটা এনট্রি করছিল। মুখ ঘুরিয়ে বলল, হ্যাঁ, আছে। কেন?
দে তো আমায় একবার চট করে।
সৌরভ ব্যাগ থেকে বার করে বইটা হাতে দিতে গেল।
উঁহু ওই খাবারদাবারের চ্যাপ্টারটা বার করে দে।
ব্যাপার কী বলুন তো?
যা বলছি কর না।
পাতা উলটে বার করে দিল সৌরভ। বই হাতে নিয়ে চলে গেলেন রায়বাবু। একটু পরে ফিরে এসে বললেন, এই নে। বইটা ফেরত নিতে গিয়ে সৌরভ দেখল রায়বাবুর অন্য হাতে একগাদা জেরক্স করা কাগজ।
আপনি এগুলো জেরক্স করলেন না কি?
চোখ ছোটো করে স্বভাবসুলভ মিটিমিটি হাসলেন রায়বাবু। বললেন চুপ, এখন কাউকে কিছু বলিস না।
তার মানে শিগগিরই আপনার বাড়ি থেকে আসল আকবরি খানা আসবে আমাদের জন্য।
দেখি, হোম মিনিস্টারকে তো বলেছি। এখন এর পর উনি কী করেন।
সাব্বাস।
এখন কিন্তু চুপ। সারপ্রাইজ থাকুক।
হ্যাঁ-হ্যাঁ, কোনও চিন্তা নেই।
তবে যতই তোরা আকবর আকবর বলে লাফালাফি করিস, আসল কিন্তু হল তোর শাহজাহান।
কেন?
প্রেম, প্রেম, প্রেমের বাদশা, তাজমহল দেখেছিস?
হুঁ, টিভিতে।
দুর ব্যাটা, টিভি দেখে কী বুঝবি! চাঁদনি রাতে তাজমহল দেখলে না, এই দেখ গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। কতদিন আগে ওয়াইফের সঙ্গে দেখতে গেছিলাম। ভাবলে এখনও রোমাঞ্চ হয়। চোখের সামনে আলোয় মাখা একটা প্রেম। ইতিহাস বলে মনেই হয় না। মনে হয় যেন এখনও জীবন্ত। যে দেখবে তারই আবার প্রেমে পড়তে ইচ্ছে করবে। প্রত্যেকটা পাথরের ভাঁজে ভাঁজে ভালোবাসা মাখানো রয়েছে।
সে তো বুঝলাম। কিন্তু শাহজাহান তো মমতাজকে একটা গোটা তাজমহল দিয়ে গেছে। আপনি আপনার মিসেসকে কী দেবেন?
দেব রে ভাই দেব। চোখ ছোটো করে হেসে গলা নামিয়ে ঝুঁকলেন রায়বাবু। বললেন, আমাদের বাড়ির উলটো দিকে একটা ফ্ল্যাট উঠছে। বারোশো স্কোয়ার ফিট। প্রায় কমপ্লিট। গিন্নীর নামে চুপিচুপি একটা বুক করে দিয়েছি। সামনের ম্যারেজ অ্যানিভারসারিতে গিফট করব।
আরে বাবা। এ তো দারুণ খবর।
হ্যা। এখন কাউকে বলিস না।
বেশ।
আজকে লাঞ্চ আওয়ারে রায়বাবু ছিলেন না। ব্যাঙ্কে গেছিলেন। লাঞ্চ করতে সৌরভ, সুজিত আর বিকাশের সঙ্গে অনন্তদাও বসেছিল। সিনিয়র অ্যাকাউন্টেন্ট। সৌরভ বলেই ফেলল, সুজিতদা, রায়বাবু তো নিজের ওয়াইফের জন্য নতুন প্ল্যান করেছেন। ম্যারেজ অ্যানিভারসারিতে গিফট করবেন বলে, বলবেন না যেন কিছু। আমাকে বারণ করেছেন বলতে।
সুজিতদা বলল, যা বাবা, তোকেও শোনানো হয়ে গেছে। আমি তো ভাবলাম, কথাটা আমাকেই শুধু বলেছে। ফ্ল্যাটের ভিত গাঁথা থেকে ধারাবিবরণী শুনে আসছি রোজ। পিলার হল, ছাদ ঢালাই হল, প্লাস্টার, জানলা-দরজা, মার্বেল বসানো। সব শুনতে হয়েছে। লাস্ট কী পোজিশন বলল তোকে?
রং হচ্ছে। হোয়াইট।
আমিও তদ্দুরই শুনেছি।
অনন্তদা সুজিতদার দিকে তাকিয়ে বলল, মদ খাওয়াটা বোধহয় কমিয়ে দিয়েছে রায়বাবু? কাজ-টাজও ইদানীং বেশ মন লাগিয়ে করেন। আগের মতো সেই ঝাঁঝটাও এখন আর নেই।
সুজিতদা ঘাড় কাত করে বলল, হ্যাঁ, ঠিকই। তবে পুরোটা মেজাজ যায়নি, আর চেয়ারের মোহ।
হেসে উঠল সবাই, সৌরভও জানে নিজের চেয়ারখানি রায়বাবুর প্রাণ। অন্য কেউ বসা কিংবা অন্যত্র সরালে তো দূরের কথা, একটু হাত রাখলেই বিরক্ত হয়ে যান।
বিকাশ বলল, রাজা কি আর সিংহাসনের অধিকার ছাড়ে!
সৌরভ বলল, একটা কাজ করলে হয়, চলুন সবাই মিলে একদিন ওনাকে চেপে ধরি ওর বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
অনন্তদা হেসে বলল, ও বাবা, ও চেষ্টা বহুবার করা হয়েছে, বলে লাভ নেই। ঠিক পাশ কাটিয়ে গেছেন।
সৌরভ বলল, দাঁড়ান না, সুযোগ ঠিক আসবেই।
ঠিক পনেরো দিনের মাথায় অফিসে দুপুরের দিকে হাতে মিষ্টির একটা বড়ো প্যাকেট নিয়ে রায়বাবু। সৌরভের হাতে একটা মোটা সন্দেশ দিয়ে বললেন, নে প্রসাদ খা।
কীসের পুজো?
কিছু মনে করিস না। হাসলেন রায়বাবু। এখন কাউকে বলতে পারলাম না। একটু গুছিয়ে গাছিয়ে নিই, তারপর নতুন বাড়িতে অফিসের সবাইকে নেমন্তন্ন করে খাওয়াব।
মানে? সন্দেশ মুখে দিয়ে হাঁ করে থাকল সৌরভ। কাল নতুন ফ্ল্যাটে চলে গেলেন। এটা, কী হল!
শোন না। আসলে কাল ছিল ম্যারেজ অ্যানিভারসারি। সেই সঙ্গে বাংলায় দিনটাও পড়ে গেছিল শুভ। সেই জন্য গৃহপ্রবেশ আর গিফট এক ঢিলে দুই পাখি হয়ে গেল।
বা-বা খুব ভালো। বাদশাহি খানার জেরক্স গেল তাও রেজাল্ট পেলাম না, আবার গৃহপ্রবেশের নেমন্তন্নও লস গেল।
সব হবে, সব হবে।
গোটা অফিস ফ্লোরে নিজে হাতে সবাইকে সন্দেশ বিতরণ করলেন। সুজিতদা বলল, তার মানে এই কেসটা সত্যিই। আমি তো ভেবেছিলাম ... হে- হে। বিকেলে একটা সরকারি ব্যাঙ্ক থেকে চারজন অডিটর এলেন। সৌরভ ওই ব্যাঙ্কের ট্র্যানস্যাকশনগুলো এন্ট্রি করে বলে দুজনকে সৌরভের কাছে পাঠিয়ে দিলেন তাদের কয়েকটা ক্যোয়ারি ক্লারিফাই করার জন্য। অডিটরদের একজন সৌরভের পাশে রাখা ফাঁকা চেয়ারটায় বসলেন। অন্যজন রায়বাবুর চেয়ারটা টেনে নিয়ে এসে বসে পড়লেন।
এই রে! ... অবশ্য বাঁচোয়া রায়বাবুকে অন্য একটা কোম্পানিতে পাঠানো হয়েছে লেজার আনার জন্য। ফিরতে ফিরতে সন্ধে তো হবেই। তার মধ্যে নিশ্চয়ই কাজটা কমপ্লিট হয়ে যাবে। সেই ভেবে আর কিছু বলল না। কিন্তু মিনিট কুড়ি পরেই রায়বাবু এসে হাজির। এসে নিজের চেয়ার দখল দেখেই সৌরভের কাছে এসে সটান বললেন,
কী ব্যাপার আমার চেয়ার নেওয়া হয়েছে কেন?
আসলে ... মানে আপনি তো ছিলেন না। ওনারা ...
ছিলাম না মানে? না থাকলেই যে কেউ এসে সিটে এসে বসে পড়বে। অডিটর দুজন যথেষ্ট বিরক্তি নিয়ে ভুরু কুঁচকে ওদের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। এরা চটলে সাংঘাতিক বিপদ। সৌরভ বলল, রায়বাবু আপনি প্লিজ একবার এদিকে একটু শুনুন।
আমার কোনওদিকে যাবার দরকার নেই। তুমি আমার কথার জবাব দাও। গলা চড়িয়ে দিলেন রায়বাবু।
এবারে আর ধৈর্য রাখতে পারল না সৌরভ। বলে উঠল, আপনি কী ভাবছেন কী? এরা কে জানেন?
আমার কিছু জানার দরকার নেই, তুমি কে হে ছোকরা, দুদিন এসেই বড়ো বড়ো কথা বলছ! চোখ মুখ টকটকে লাল। থরথর করে কাঁপছেন রায়বাবু। ব্যাঙ্কের লোক দুজন এবার উঠে দাঁড়িয়েছেন। সৌরভ প্রমাদ গুনল। এই ব্যাঙ্ক থেকে কোম্পানিতে কোটি কোটি টাকার লোন আসে। এইসব ঘটনা যদি স্যারের কানে যায়, রায়বাবুর চাকরি তো যাবেই সৌরভেরটাও যাবে। অফিসের সবাই এদিকে ভিড় জমিয়ে ফেলেছেন। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়ে এবার সৌরভ আঙুল তুলল, ইউ, গেট লস্ট।
তুমি ... তুমি ... এতদূর স্পর্ধা! আর পারলেন না। কাঁপতে কাঁপতে কাটা কলাগাছের মতো মাটিতে পড়ে যাচ্ছিলেন রায়বাবু। সৌরভ শেষ মুহূর্তে ধরে ফেলল।
ডাক্তার এসেছিল। ভাইটাল কিছু নয়। প্রেশারটা বেড়ে গেছে শুধু। অফিসের কমনরুমের বেডে শুয়ে আছেন রায়বাবু। কথা বলছেন অল্প অল্প। সৌরভ আস্তে আস্তে সামনে এগিয়ে এল। নিজেকে খানিকটা হলেও অপরাধী বলে মনে হচ্ছে। হুট করে তখন একটা কিছু অঘটন ঘটে গেলে ... বসের কানে নিশ্চয় গোটা ঘটনাটাই চলে গেছে এতক্ষণে। কী আছে কপালে, কে জানে?
ঠিক লাগছে একটু? জিজ্ঞেস করল সৌরভ।
বাচ্চাদের মতো শুধু ঘাড় কাত করলেন রায়বাবু। ভুরু কুঁচকেই রয়েছে। তেওয়ারীজি এসে খবর দিলেন ট্যাক্সি আ গ্যায়া।
সৌরভ বিকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, আমার সঙ্গে একটু যেতে হবে তোকে। ওনাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে।
না-না। আমাকে কাউকে পৌঁছে দিতে হবে না। আমি নিজে চলে যেতে পারব। একইভাবে অন্যদিকে তাকিয়েই বললেন রায়বাবু। তার কথায় কেউ পাত্তা দিল না। বিকাশ জিজ্ঞেস করল, উঠতে পারবেন? আসুন আমার হাত ধরুন।
বিকাশের হাতে ভর দিয়ে উঠতে গিয়ে প্রথমবার টাল খেয়ে বসে পড়লেন। তারপর আবার উঠলেন। আমায় শুধু ট্যাক্সিতে তুলে দে। আমি নিজেই চলে যেতে পারব।
ওর প্রস্তাবে কেউ উত্তর করল না। বেকবাগানের এই অফিস থেকে মল্লিকবাজার পার্ক স্ট্রিট একটুখানি রাস্তা। কিন্তু কলামন্দির স্টপেজ আসতেই রায়বাবু ট্যাক্সিওলাকে সিটে মাথা এলিয়ে রেখেই বললেন রিপন স্ট্রিটে ঢুকতে। বিকাশ আর সৌরভ অবাক হলেও কিছু বলল না। গাড়ি টার্ন নিয়ে ঢুকল। ঘিঞ্জি রাস্তা। একটু যাবার পরেই ট্যাক্সি থামতে বলে রায়বাবু বিকাশকে বললেন, আমি এখানেই নেমে যাচ্ছি।
সে কী? কেন?
ওই তো ফ্ল্যাট আমার। সাদা, ঝকঝকে নতুন প্রায় সাত-আট তলা ফ্ল্যাটটার দিকে দেখিয়ে বললেন, রায়বাবু।
আপনাকে দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিই। পড়ে-টড়ে গেলে ...
কিছু হবে না। ঠিক আছি। তোরা চলে যা।
বিকাশের দিকে তাকিয়েই কথা বলছিলেন উনি। এখনও সৌরভের ওপর থেকে রাগটা কমেনি। তবে সৌরভ জানে এই রাগ দু-দিনের বেশি থাকবে না। মানুষটার স্বভাবই এমন। আগেও দেখেছে।
কোন ফ্লোর আপনার?
সিক্সথ।
উঠবেন কী করে?
লিফট আছে। তোরা যা। কাজের ক্ষতি হচ্ছে। বলে নিজেই হাঁটা লাগালেন। ট্যাক্সি ঘুরিয়ে নিল ড্রাইভার। গাড়ি চলতে শুরু করল। বিকাশ বলল, আজব মানুষ। সৌরভ পিছন ফিরে দেখল রায়বাবু ফ্ল্যাটের সামনে পৌঁছে ওদের ট্যাক্সিটার দিকে তাকিয়ে আছেন।
রায়বাবুর চাকরিটা যে আর থাকবে না সেটা ভালোমতোই আন্দাজ করে ফেলেছিল সৌরভ। আজকে বস ওকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন নিজের চেম্বারে। ডিটেলে সব জানালেন। তারপর বললেন এইসব বোগাস স্টাফেদের জন্য কোম্পানির গুডউইল নষ্ট হয়। হি শ্যুড বি কিকড অফ। কার সঙ্গে কেমন বিহেভ করা উচিত এটুকু সিভিক সেন্স পর্যন্ত নেই। কোম্পানিকে লিখিতভাবে ক্ষমা চাইতে হয়েছে ব্যাঙ্কের কাছে। কতটা অপমানের ব্যাপার। সৌরভ চুপ করে মাথা নীচু করে শুনে গেল কথাগুলো। তারপর বলল, সেদিনের জন্য আমি এক্সট্রিমলি সরি স্যার।
না তোমার সরি বলার কিছু নেই। ইউ আর নট গিল্টি।
রুম থেকে বেরিয়ে এসে বিকাশ আর সুজিতদাকে বলল সব কথা। সুজিতদা মুখ কুঁচকে বলল, ইসস। আমি জানতাম এটাই ঘটবে। গেল চাকরিটা। লোকটার সব ভালো। শুধু অদ্ভুত ইগো আর মেজাজের জন্য ...
এখন উনি আছেন কেমন কিছু জানেন?
সকালে ফোন করেছিলাম। মোবাইল সুইচড অফ ছিল। ল্যান্ড লাইন তো নেই।
আজ শনিবার। অফিস চারটেয় ছুটি। অফিস থেকে বেরিয়ে একটা বাস ধরে কলামন্দির স্টপেজে নামল সৌরভ। সেখান থেকে অটো ধরে রিপন স্ট্রিটে রায়বাবুর ফ্ল্যাটের সামনে। লিফট করে সিক্সথ ফ্লোরে উঠে দেখল দুটো মুখোমুখি দরজার একটার নেমপ্লেটে লেখা জে বি আরোরা। অন্যটায় ড. কে. খান (চর্মবিশেষজ্ঞ) কে. কে. রায় নামে কোনও নেমপ্লেট নেই। তারপর প্রত্যেকটা ফ্লোর পায়ে হেঁটে প্রত্যেকটা দরজা দেখতে দেখতে নামল সৌরভ। কোনোটায় এখনও লোক আসেনি। বাইরে দিকে তালা দেওয়া। অথবা নেমপ্লেটে অন্য নাম। ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়েই ডানদিকে একটা পান-সিগারেটের গুমটি। দোকানদার বয়স্ক মুসলিম। সিগারেট কিনল সৌরভ। তারপর ধরিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, কৃষ্ণকান্ত রায়ের বাড়ি কোনটা বলতে পারেন?
নেহি মালুম। এক কথায় উত্তর দিল লোকটা।
কিন্তু এখানেই তো বাড়ি বলেছিল।
পাতা ক্যায়া হ্যায়?
সে তো জানি না। লেকিন আগের দিন এহি ছোড়া থা উনকো।
নামটা কী বোললেন?
কৃষ্ণকান্ত রায়।
রাই ... ওহ রাইকো ঢুনতে হ্যায় আপ। উনার ঘর তো এই ফ্ল্যাট মে নেহি উয়ো হ্যায়। বলে আঙুল তুলে রাস্তার ঠিক উল্টো দিকে বহু পুরনো প্লাস্টার খসা দাঁত বার করা একটা বাড়ির দিকে আঙুল তুলল লোকটা।
সৌরভ আরও কনফার্ম হবার জন্য বলল, রায়বাবুকা বিবি সাউথ ইন্ডিয়ান হ্যায়।
হাঁ-হাঁ মালুম হ্যায় ... হুঁ-হুঁ বিবি! আপ কৌন হ্যায় রাইকা?
রায়বাবুকে এই সামান্য দোকানদারটা শুধু রাই বলে সম্বোধন করছিল শুনে বেশ অস্বস্তি হচ্ছিল সৌরভের। বলল, আমরা একই অফিসে চাকরি করি।
আচ্ছা আচ্ছা। যাইয়ে।
সৌরভ সিগারেট ফেলে দিয়ে পা বাড়াতে গেল। লোকটা পিছন থেকে বলল, ছুট্টা লেকে যাইয়ে। খুচরোটা ফেরত নিয়ে দাঁড়াল সৌরভ। একগাল হেসে দোকানিকে জিজ্ঞেস করল, ও আদমি আচ্ছা হ্যায়। না?
হাঁ হাঁ বহুৎ আচ্ছা হ্যায়। মেরা দুকানমে সাড়ে তিন হাজার রূপেয়া বাকি হ্যায় উনকা। সির্ফ সিগারেটকা। আবতক এক প্যাইসা চুকায়া নেহি। জেব মে ফুটি কড়ি নেহি ঔর উপরসে রাজা কা চাল মারতা হ্যায়। উয়ো ঔরৎ হ্যায় ইসি লিয়ে অভিতক জিন্দা হ্যায় আদমি।
কে ওনার ওয়াইফ?
আরে ছাড়ুন ওয়াইফ। বকেয়া সিগারেটের দামের কথা মনে পড়ে যাওয়ায় ভয়ঙ্কর উত্তেজিত হয়ে পড়ল লোকটা। বিবি-ফিবি কুছ নেহি। হামি সব কুছ জানি। দশ-বারা সাল পহলে উস নাচনেওয়ালিকো কেরলকা কৌন কোঠে সে ভাগাকে লেআয়া থা উয়ো বুডঢা। উ সব জাগাই তো পহলে দিনরাত পড়া রহতা থা উয়ো আদমি। রাইকা উমর সে ভি বঢ়ি হ্যায়। মহল্লাকা সব লোগ ওয়াকিফ হ্যায় রাইকা কারনামে সে।
এখন কী করেন রায়বাবুর ইয়ে ...
আখুন তো কৌন বাচ্চাদের স্কুলমে ডান্সটিচার হ্যায়। সল্টলেক মে সায়দ। ফ্যামিলি তো ওহি চালাতি হ্যায়। গলা একটু নামল লোকটার। ঠোঁট বেঁকিয়ে ব্যঙ্গের সুরে বলল, শাহলা। লেকিন এক বাত তো হ্যায়। বহুত পেয়ার হ্যায় দোনোমে। একদম এক দুজে কে লিয়ে। ইস উমর মে ভি ... রাই তো জওয়ানি বাহার লুটাকে বুঢ়াপে মে আকে পেয়ার মে ফাঁস গ্যায়া। বহুৎ খেয়াল রাখতি হ্যায় দোনো দোনোকো।
সৌরভও জানে রায়বাবু ওনার স্ত্রী ... বা যাই হোক তাকে খুব ভালোবাসে। সারাদিনে তিন-চারবার ফোন করে খোঁজ নেয়। একবার তার কী সর্দিজ্বর মতো হয়েছিল তাতেও চিন্তায় মাথা খারাপের মতো হয়ে গেছিল রায়বাবুর। পাক্কা তিনদিন অফিসে আসেননি। সৌরভ আঙুল তুলে বলল, কোন তলায় ওনার ঘর?
দেতল্লাহ।
ঠিক আছে। রাস্তা ক্রস করে কাঠের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে দোতলায় যাওয়ার কাঠের সিঁড়ি অবধি পৌঁছানো পর্যন্ত প্যাসেজটায় এই বিকেলের মধ্যেই অন্ধকার হয়ে গেছে। ড্যাম্পের ভ্যাপসা গন্ধ নাকে নিয়ে সিমেন্ট চটা, কাঠের রেলিং দেওয়া সিঁড়ি বেয়ে উঠল সৌরভ। উঠেই ছোট্ট একটা বারান্দা। বারান্দায় মেঝেতে গ্যাসের ওভেনের সামনে একজন প্রৌঢ়া মহিলা বসে কিছু রান্না করছেন। কাঁচা-পাকা ঘন কোচকানো চুল। রঙিন শাড়ি। শীর্ণ হাতে অনেক চুড়ি, নাকে নথ। সৌরভ বুঝতে পারল ইনি কে। সৌরভকে খেয়াল করেননি মহিলা। ও গলা খাঁকরে জিজ্ঞেস করল, বলছি, এখানে কি রায়বাবু থাকেন?
আচমকা অচেনা একজন লোককে সামনে দেখে প্রথমে একটু থতমত খেয়ে গেলেন মহিলা। ধড়মড় করে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, এ্যাঁ ... হ্যাঁ ... আপনি?
আমি ওনার সঙ্গে এক অফিসে কাজ করি। ফোন করে যোগাযোগ করতে পারছি না। সেজন্য কেমন আছেন জানতে এলাম একবার।
ও আচ্ছা। একটু ভালো আছেন। এখন তো ঘুমোচ্ছেন বোধহয় ...
ঠিক আছে, তাহলে অন্য একদিন আসব। ডাকতে হবে না। বলে পিছন ফিরে নামতে গেল সৌরভ। মহিলা বললেন, একটু দাঁড়ান ... আচ্ছা আসুন আমার সঙ্গে। সিঁড়ির সামনে জুতো খুলে বারান্দায় উঠল সৌরভ। বারান্দা লাগোয়া একখানাই ঘর। দরজায় পর্দা ঝোলানো। বারান্দার শেষ মাথায় নীল রঙের টিনের দরজা দেখা যাচ্ছে, বাথরুম বোধহয়। পর্দা সরিয়ে ঘরের ভেতরে উঁকি দিলেন মহিলা। তারপর সৌরভকে বললেন, আপনি ভিতরে আসুন। আমি তুলে দিচ্ছি ওকে।
না-না থাক।
উহুঁ, না ডাকলে পরে শুনবে যখন আমার ওপর রাগ করবেন।
পর্দা সরিয়ে রায়বাবুর ঘরের ভেতর পা দিল সৌরভ। ছোট্ট ঘর। বহুদিন আগে কখনও আকাশি রং করা ছিল। এখন নীল উঠে ভেতরের সাদা চুন, কোথাও নোনা ধরে প্লাস্টার বেরিয়ে এসেছে। দেয়ালে ওয়্যারিং ছাড়া তার এমনি ঝুলছে। কালো হয়ে যাওয়া প্রাচীন সুইচ বোর্ডের প্লাগে গোঁজা একটা অলআউট। আর প্রায় ঘরটার সিংহভাগ জুড়ে বহু পুরোনো কুচকুচে কালো কাঠের বিশাল উঁচু একটা মস্ত পালঙ্ক। এখনও চকচকে পালিশ। দেখলেই বোঝা যায় রোজ সযত্নে ঝাড়পোঁছ হয়। পালঙ্কের শিয়রের দিকে ছোট্ট ঘুলঘুলির মতো একটা জানলা। কাঠের গরাদ। সেই পালঙ্কে জানলার দিকে মাথা দিয়ে খুব দারুণ কারুকাজ করা পুরোনো আমলের খানদানি মখমলের চাদর গায়ে দিয়ে অকাতরে ঘুমোচ্ছেন কৃষ্ণকান্ত রায়। বসে যাওয়া গালে কদিনের না কামানো সাদা দাড়ি। চাদরের ভেতরে শরীরটা এই কদিনে আরও শীর্ণ হয়ে গেছে বুঝতে পারল সৌরভ। ছোটো জানলাটা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাতেই চমকে উঠল। রাস্তার ওপারেই দুধসাদা বিশাল ফ্ল্যাটটা জানলার একেবারে মুখোমুখি। যার গৃহপ্রবেশের মিষ্টি খাইয়েছিল এ মানুষটা। আকবর না, হঠাৎ শাহজাহানের কথা মনে এল সৌরভের।
পরশ পাথর
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন