বিনোদ ঘোষাল
দূরবিনটা গতকাল মেলা থেকে কিনেছিল অতনু। বউ ঊর্মিলা আর সাত বছরের ছেলে অর্ণবকে নিয়ে মেলায় গেছিল সন্ধেবেলায়। পাড়ার কালীপুজো উপলক্ষে মেলা বসে প্রতি বছর। সাইজে ছোটো। তবে ভিড় হয় ভালোই। অর্ণব বায়না করেছিল দূরবিন কিনে দেওয়ার জন্য। সত্তর টাকা দাম। ঊর্মিলা সঙ্গে সঙ্গে না না অত দাম দিয়ে কিনতে হবে না বলে ছেলের হাত ধরে টান দিয়েছিল। অতনু বলেছিল আহা থাক না, এক দিনই তো চাইছে!
কত দাম শুনেছ তুমি? সত্তর টাকা।
হোক গে।
ষাট টাকায় রফা করে দূরবিনটা কিনে ছেলের হাতে দিয়েছিল অতনু, তারপর ঘুগনি, ফুচকা, সস্তার আইসক্রিম খেয়ে অম্বলের ঢেঁকুর তুলতে তুলতে বাড়ি ফিরে এসেছিল।
অতনু মাল। ফাদার্স নেম, লেট গুণময় মাল। ডেট অফ বার্থ ১৭০৮১৯৭২। অ্যাড্রেস, ১৪১ মান্নাপাড়া, বালী, হুগলি। অ্যাকাডেমিক কোয়ালিফিকেশন, বিএ। কমপিউটার প্রাোফিসিয়েন্সি, ওয়ার্ড, এক্সেল। লুকিং ফর, ক্লারিক্যাল অফিস জব। হবি, লিসনিং গুড মিউজিক। এক বিঘৎ মাপের এই বায়োডাটাটা নৌকরি ডট কম থেকে শুরু করে যে-কটা এমপ্লয়মেন্ট ভ্যাকান্সির ওয়েবসাইট রয়েছে এখনও সব কটায় দেখা যাবে। বি এ পাশ করার পর অতনু টানা সাড়ে তিন বছর টিউশন করেছিল। কিন্তু কম্পিটিশনে টিকতে না-পেরে শেষে এক বন্ধুর পরামর্শে এল আইসির এজেন্সি। টিপে টুপে চলে যায়।
বছর আষ্টেক আগে বিয়ে হয়েছিল অতনুর। ঊর্মিলার সঙ্গে। কুলটি-র মেয়ে। বিয়ের আগে টাইটেল ছিল বসু। এইচ এস পাশ। বাবা আচমকা স্ট্রোকে মারা যাওয়ায় বি এ পড়তে পড়তে ছেড়ে দিয়েছিল। তারপর মামাবাড়িতে কিছুদিন। সুন্দরী শ্যামলা ঊর্মিলার আগমনে কিছুদিনের মধ্যেই মামাবাড়ির আশপাশে বিভিন্ন মাপের ছেলেদের যাওয়া আসা বড্ড বেড়ে গেল, তাই মামারা আর দেরি করলেন না। পাড়ার ছেলেদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ভাগ্নির বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগলেন। গুরুদায়িত্ব সন্দেহ নেই। প্রথম সম্বন্ধ এল ছেলের রডের দোকান। লোহালক্কড় নিয়ে কাজ। ঊর্মিলা বেঁকে বসল। দ্বিতীয় সম্বন্ধ কাগজের বিজ্ঞাপন দেখে। পাত্র অতনু মাল। আবার বেঁকতে গেছিল ঊর্মিলা। মামারা বেঁকতে দিল না। বিয়ে হয়ে গেল। অতনু দেখতে শুনতে খারাপ না। স্বভাব চরিত্রও ভালো। বছরে ঠিক চারদিন মদ খায়। তাও বন্ধুরা জোর করে বলে। মাথায় টাক নেই, দাঁত হলুদ নয়। মুখে দুর্গন্ধ নেই। হাঁ করে ঘুমায় না। এবং নিজের জামা-জাঙিয়া সব নিজে কাচে। সুতরাং পাত্র হিসেবে চলেবল। অভাব যেটার তা হল শুধু অর্থের। সেই অভাব মেটানোর জন্য জীবন পাত করে যাচ্ছে অতনু। করেই চলেছে।
বিয়ের কিছুদিন পরেই অতনু বুঝতে পেরেছিল ঊর্মিলা এই বিয়েতে খুব একটা খুশি নয়। খুব স্বাভাবিক। যে কোনও সুন্দরী মেয়েদেরই একটা স্বপ্ন থাকে তার এমন একজন বর হবে যাকে দেখে তাক লেগে যাবে সকলের। মোটা স্যালারি, স্লিম চেহারা, মাঝেমধ্যে ফরেন ট্যুর, শ্বশুরবাড়িতে এলে পাড়ায় হই হই পড়ে যাবে অমুকের বর এসেছে। ঊর্মিলারও খানিকটা এক টাইপের স্বপ্ন ছিল। কিন্তু স্বপ্ন বড়ো মারাত্মক জিনিস। ও জিনিস দেখতে কোনও খরচ লাগে না ঠিকই, তবে বাস্তবে মেলানো অনেকটা আমার সোনার হরিণ চাই-এর মতোই অন্যায় আবদার। ঊর্মিলারও স্বপ্ন মেলেনি। স্বপ্নের আরও একটি দোষ এই যদি বাস্তবে নাও মেলে তবু ছেড়ে যায় না। মানের এককোণে গ্যাঁট হয়ে ঘাপটি মেরে বসে থাকে। আর একলা পেলেই মুখ বাড়িয়ে উঁকিঝুকি দেয়।
অতনু সকাল থেকে রাত অবধি শুধু শিকার খুঁজে বেড়ায়। পৃথিবীর যে কোনো প্রাণীকে দেখলেই তার মনে হয় নিশ্চই তার জীবনবিমা করা নেই। সিনেমা হলের পাশের সিটের থেকে পাবলিক ইউরিনালে পাশের প্যানে কর্মরত প্রত্যেককে তার মনে হয় এল আই সি হীন। কিন্তু সংসারে একেকজন আছে না শুধুই খেটে যায়, বদলে জোটে খুব কম। সেই দলে পড়ে অতনু মাল। কম পেয়েছির আসর। সুন্দরী বউ-এর মনোকষ্ট দূর করতে বিয়ের পর থেকে অতনু শিকার খোঁজার টাইম দুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। আর ছেলে হওয়ার পর তিনগুণ। তাতে রোজগার বাড়ল দেড়গুণ আর নিজের চেহারাটা গিঁট লাগা দড়ির মতো দেখতে হয়ে গেল। রোজ সকাল হলেই বেরিয়ে যায়। গ্রাম থেকে শহর ফেড়ে ফেলে ও। অনেক রাতে বাড়িতে পিঠ ঝুঁকিয়ে যখন বাড়ি ফেরে তখন ছেলে ঘুমিয়ে কাদা। কখনও ঊর্মিলাও ঘুমিয়ে পড়ে, কোনওদিন ঢুলতে ঢুলতে জেগে থাকে। এক ছাদের নীচে তিনটে প্রাণী যে যার নিজের মতো জীবনযাপন।
অতনুর ইচ্ছে ছিল না অর্ণবকে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ানোর। বিস্তর খরচ। কিন্তু ঊর্মিলার জেদে শেষ পর্যন্ত সেই ইংলিশ মিডিয়ামেই ভরতি করতে হয়েছিল। আমাদের যা হওয়ার হয়ে গেছে। ছেলের লাইফটাকে নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। পরে কী কৈফিয়ত দেবে তুমি ওকে। প্রপার এডুকেশন না পেলে ...
কিন্তু বাংলা মিডিয়ামে পড়ে কি ছেলেরা মানুষ হয় না? প্রশ্নটা মনের ভেতরে রেখে দিয়েছিল অতনু। বাইরে আর বার করেনি। মাস গেলে একটা মোটা অ্যামাউন্ট স্কুল ফি-জ, স্কুল বাস, বই খাতা আর প্রাইভেট টিউটরের পেছনে চলে যায়। তারপর গোদের ওপর বিষফোড়া আজ এর বার্থডে গিফট, কাল স্কুলের অমুক ফাংশনের চাঁদা। স্কুলের বড়োলোক বন্ধুদের ঠাটবাটের ছাঁয়া অর্ণবের গায়েও লাগছে। প্রতিদিন চাহিদা বাড়ছে তার। চাওয়া আর পাওয়ার শত্রুতাটা ক্রমশ বাড়ছে দিনদিন।
আজ রবিবার। যদিও অতনুর জীবনে রবিবার বলে কিছু নেই। বরং রোববারগুলোতেই চাপ বেশি। ক্লায়েন্টদের ছুটি থাকে। বাড়িতে ভিজিট করতে যেতে হয়। অর্ণবেরও স্কুল ছুটি। সকালে আয়নার সামনে দাড়ি কামাতে কামাতে অতনু দেখল গতকাল রাতে কিনে দেওয়া দূরবিনটা চোখে লাগিয়ে খাটের ওপর বসে খুব মনোযোগ দিয়ে জানলার বাইরে কী যেন দেখছে। আবার আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের কাজে মন দিল অতনু। নিজেদের পুরোনো বাড়ি। বাবা সিক্সটি এইটে বানিয়েছিল। পৈতৃক সম্পত্তি বলতে এই নোনা খাওয়া দোতলা বাড়িটাই পেয়েছিল ও। বাড়ির দোতলায় ওরা থাকে। দুটো ঘর। সঙ্গে রান্নাঘর, রাথরুম-পায়খানা। ছোটো একটা ছাদ। একতলায় পিতৃদত্ত ভাড়াটে। ভাড়াও পিতৃযুগের। ওঠার নাম নেই। বহুদিন কথা বন্ধ। বাড়ির সামনে একটা ছোট্ট পুকুর। কচুরিপানায় ভরা। স্নানের অযোগ্য বহুদিন। পুকুরের ঠিক ওপারে বিপুলকুমার দাসের বিপুল সাইজের বাড়ি। বিপুল অতনুর ছোটোবেলার বন্ধু। ওর বাবা লোকাল মিউনিসিপ্যালিটিতে চাকরি করত। তখন বাড়িটা এত বড়ো ছিল না। ছোটো থেকেই মেরিটোরিয়াস স্টুডেন্ট ছিল বিপুল। জয়েন্টে ডাক্তারিতে চান্স পেল। এখন এলাকার নাম করা মহিলাদের পেটটেপা গাইনি। চারশো টাকা ভিজিট। ছোটোবেলায় বিপুল অতনুদের বাড়িতে প্রায় রোজই আসত। এখন আর কেউ কারও বাড়িতে যায় না। রাস্তায় দেখা হয়ে গেলে খুব কষ্টে ঘাড় কাত করে অতনুকে জিজ্ঞেস করে, ভালো?
অতনু অনেকটা কাত করে উত্তর দেয়, হ্যাঁ রে। বিপুলকে এতদিনেও অতনু এল আই সি করার কথা বলে উঠতে পারেনি। আশ্চর্য! অথচ বললে যে বিপুল ফেরাবে না সেটা বিশ্বাস করে অতনু। আর তাই বলা হয়ে ওঠে না। যদি ফিরিয়ে দেয় তাহলে-র ভয়টা ঘাড়ের ওপর চেপে বসে। তবে একদিন নিশ্চয়ই বলবে এই অপেক্ষায় অতনুর চোখের সামনে পুকুরের ওপারে বিপুল পুরোনো বাড়িটা প্রায় ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে পেল্লায় সাইজের একটা বাড়ি বানিয়ে ফেলল। গ্যারাজ সমেত। হেব্বি দেখতে পাশের পাড়ার মৌসুমীকে বিয়ে করল। ওরও ছেলে। ভালো নাম বিনায়ক। অর্ণবের থেকে এক বছরের ছোটো। লিলুয়া ডনবস্কোতে পড়ে। বিপুল স্যান্ট্রো নিজে ড্রাইভ করে ছেলেকে স্কুলে দিয়ে আসা নিয়ে আসা করে। এরপর হয়তো ড্রাইভারও রাখবে। রাখতেই পারে। অনে-ক টাকা। তাও কত হতে পারে? বিপুলের বউ সপ্তাহে কয়েকদিন স্টেশনের সামনে বিউটি পার্লারে যায়। ক-দিন যায় ঊর্মিলার কাছে পাকা হিসাব আছে। ঊর্মিলার সঙ্গে রাস্তায় দেখা হলে মৌসুমী কথা বলে। কথার মধ্যে ছেলেদের দুষ্টুমি থেকে স্কুলের চাপ এই আলোচনাটাই বেশি থাকে। তার বেশি আর এগোয় না। এগোনো সম্ভবও নয়। অতনু খেয়াল করে দেখেছে ক্লাস ফোরের অর্ণবের থেকে ক্লাস থ্রি-র বিনায়ক অনেক বেশি স্মার্ট, আপডেট। অথচ অতনুও তো ছেলেকে ইংলিশ মিডিয়ামেই পড়াচ্ছে। প্রাণপাত করেই পড়াচ্ছে। তাহলে?
— কী দেখছিস অত মন দিয়ে? ক্যাজুয়ালি ছেলেকে জিজ্ঞেস করল অতনু। দাড়ি কামানো শেষ।
উত্তর দিল না অর্ণব। খুব মনোযোগ।
কী রে ... ওই।
কী সুন্দর ল্যাপি! ... ওয়াও। বলল অর্ণব।
কী? ভুরু কোঁচকালো অতনু।
অর্ণব আবার উত্তর দিল না।
ল্যাপিটা আবার কী জিনিস? কোথায় দেখলি?
ল্যাপটপ।
কার?
বিনায়কের। উহ কী দারুণ দেখতে!
দেখি, বলে অতনু ছেলের হাত থেকে দূরবিনটা কেড়ে নিয়ে ওতে চোখ রাখল। পুকুরের ওপারে বিপ্লবের বাড়িটা ঝট করে এত কাছে এল চমকে উঠল অতনু। একেবারে নাকের ডগায়। প্যারিস করা ক্রিম কালারের পেল্লায় ড্রইং রুম। মেঝেতে পাথর। দেয়ালে এলসিডি। ঘরের রঙের সঙ্গে মেলানো বিশাল সোফা। সেন্টার টেবিল।
দেখলে বাবা?
উঁ ...
দেখতে পাওনি?
না তো।
ধুৎ, তুমি কোন ঘরটা দেখছ?
উঁ ...
কোন ঘরটা দেখছ!
এই তো সামনেরটা। ধীরে ধীরে বলল অতনু।
না না লেফট সাইডের রুমটা দেখ। বলে বাবার হাতে ধরা দূরবিনটা একটু ঠেলে দিয়ে জিজ্ঞেস করল এবার দেখতে পেয়েছ? বিনায়ক ওর নিজের রুমে। ল্যাপিতে গেম খেলছে। কী দারুণ দেখতে না বাবা ল্যাপিটা? দূরবিনটা চোখ থেকে নামিয়ে অতনু দেখল ওর নিজের ছেলের চোখ দুটো অন্যরকম হয়ে উঠেছে।
বিকেলের মধ্যে কাজ শেষ হয়ে গেল অতনুর। মনটা ভালো নেই। একটা মোটা প্রিমিয়ামের ক্লায়েন্ট একটুর জন্য মিস হয়ে গেল। কিছুতেই ব্যাটাকে কনভিন্স করা গেল না। বাড়ি ফেরার পথে মন খারাপের মধ্যেই আবার সকালের দেখা খুব কাছেই ওই ড্রইংরুমের ছবিটা চোখের সামনে ভুস করে উঠতে আরও খিঁচড়ে গেল মেজাজ। আজ সারাদিন খুব গরম। সন্ধে সাতটার মধ্যে বাড়ি চলে এল অতনু। সিঁড়ি দিয়ে উঠে বারান্দায় উঠে দেখল আলো জ্বালানো হয়নি। অর্ণব নিজের ঘরে তারস্বরে চেঁচিয়ে পড়ছে। বেডরুমটাও অন্ধকার। ব্যাপার কী? ঊর্মিলা কোথায় গেল। ঘরে ঢুকে লাইটটা জ্বালাতেই সামান্য চমকাল। খাটের ওই প্রান্তে জানলার সামনে বসে ঊর্মিলা। হাতে অর্ণবের বায়নাকুলারটা। আলো জ্বলে ওঠাতে ঊর্মিলাও ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে। চোখে মুখে ধরা পড়ে যাওয়ার অভিব্যক্তি। কী করবে ভেবে না পেয়ে ঊর্মিলা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল অতনুর দিকে।
কী গো, কী করছ অন্ধকারে বসে?
নন নাহ কিছু না তো!
দূরবিনটা হাতে নিয়ে কী করছ?
এই দেখছিলাম। বলে কষ্ট করে হাসল ঊর্মিলা।
কী? বলতে বলতে সামনে এল অতনু। জানলার বাইরে পুকুরের ওপারে বিপ্লবের বাড়ির আলো দেখা যাচ্ছে।
কী দেখছিলে?
বিপুলদার বউ-এর কত্ত কসমেটিকস। ড্রেসিং টেবিল ভরতি। একটাও এখানকার নয়। সটান বলল ঊর্মিলা।
অ। তোমাকে বলেছে বুঝি মৌসুমী। বরাবরই খুব চাল মেয়েটার। আজ থেকে তো চিনি না! উত্তর দিল অতনু।
চালের কী আছে? আর আমাকে বলেনি মোটেও। নিজেই দেখতে পেলাম।
তুমি গেছিলে নাকি ওদের বাড়ি?
না। এইটা দিয়ে দেখলাম। বলে ফিক করে হাসল ঊর্মিলা। আর শাড়িগুলোও ...
ছি: ঊর্মি, লোকের বাড়িতে লুকিয়ে দেখছ! লজ্জা হওয়া উচিত তোমার। ভদ্র ঘরের কেউ ...
কী বলতে চাও তুমি, আমি ছোটোলোক? ঊর্মিলা হঠাৎ চিৎকার করে উঠল।
পরের ঘরের শাড়ি-গয়নার দিকে না তাকিয়ে নিজের ঘরের দিকে তাকাও কাজে দেবে। ঝাঁঝিয়ে উঠল অতনু।
কী আছে ঘরে যে দেখব? কী দিয়েছ ... অপদার্থ একটা, বলতে বলতে ডুকরে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ঊর্মিলা।
অতনু চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল ঘরের মাঝখানে। পাশের ঘরে অর্ণবের পড়ার শব্দ বন্ধ হয়ে গেছে। জামা-প্যান্ট ছেড়ে বাথরুমে ঢুকে অনেকক্ষণ ধরে স্নান করল ও। আবার ঘরে এল। ঊর্মিলা রান্নাঘরে। লাইট নিভিয়ে খাটের ওপর টানটান হয়ে শুল। ঘরে ডিম লাইটের ঝাপসা আলো। মেজাজটা ভালো লাগছে না। ফালতু ঝামেলা যত। খাটের কোণে বায়নোকুলারটা চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। আলগোছে তুলল ওটাকে। একটু নেড়ে ঘেঁটে চোখের ওপর রাখল। মুহূর্তে সিলিং ফ্যানটা একেবারে সামনে। এদিক ওদিক ঘোরাতে ঘোরাতে জানলার বাইরে তাকাতেই বিপ্লবের বাড়িটা লাফিয়ে চলে এল অতনুর নাকের ডগায়। সব কিছু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। দূরবিনটা থেকে চোখ সরিয়ে নিতে গিয়েও পারল না অতনু। ড্রয়িং রুমে বিপুল বসে টিভি দেখছে। আর হাতে গ্লাস। সেন্টার টেবিলের ওপর সেভেন ফিফটির বোতল। শালা আয়েস করে আবার মাল খাচ্ছে। কী কপাল মাইরি! দামি বউ, দামি মদ, দামি গাড়ি। খালি ফুটানি শা ... ল ... লাহ! নবটা ঘুরিয়ে আরও কাছে আনতে গেল অতনু, এল না। বরং ভিউটা ঝাপসা হয়ে গেল। ঘরের লাইট জ্বলে উঠল হঠাৎ। অর্ণব এসেছে।
বাবা।
উঁ। দূরবিনটা কায়দা করে আলগোছেই আবার খাটের পাশে রাখতে গেল অতনু। অর্ণব সেটার দিকে দেখল। বাবা আর ছেলের চোখাচুখি হল এক সেকেন্ডের জন্য।
কী বলছিস বল?
খিদে পেয়েছে।
তো মাকে বল।
মা বলল ...
কী?
পারবে না।
অ। বলে একটু চুপ থাকল অতনু। তারপর বলল এদিকে আয়।
অর্ণব পায়ে পায়ে অতনুর কাছে এল। একটু ভয়ে ভয়ে রয়েছে যেন। ও কি দেখতে পেয়েছে কিছু?
বস।
অর্ণব বসল একপাশে।
পড়া হয়ে গেছে?
হুঁ।
অতনু দূরবিনটা তুলে নিয়ে বলল এটা পছন্দ হয়েছে তোর?
খুব। জানো বাবা বিনায়কেরও একটা বায়নোকুলার রয়েছে। খুব দামি। আমি দেখেছি।
হুম। তোর মা কোথায় রে?
রান্নাঘরে। দূরবিনটা হাতে নিয়ে চোখে ঠেকাল অর্ণব। আবার জানলার বাইরে। বাবা দেখ বিনায়কের রুমটা। কী সুন্দর। দেখ। বলে অতনুর দিকে বাড়াতে গেল অমনি আবার বিকট চিৎকার করে উঠল অতনু। যাও নিজের ঘরে যাও। বাড়িতে খেতে পাও না তুমি? হারামজাদা। যা দূর হ। সবকটা ভিকিরির বাচ্চা।
বাবাকে আচমকা এমন বদলে যেতে দেখে থমকে গেল অর্ণব। তারপর ছুট্টে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
রাত্তির সাড়ে নটা। লোডশেডিং। ডাইনিং টেবিলে একটা এমারজেন্সি লাইট জ্বলছে। অনেকক্ষণ জ্বলার জন্য আলো কমে এসেছে বেশ খানিকটা। টেবিলের দু-প্রান্তে অর্ণব আর অতনু। সামনে রুটি তরকারির থালা। খেতে ইচ্ছে করছিল না। রুটি গলা দিয়ে নামছিল না অতনুর। মনটা বিষণ্ণ হয়ে আছে। আজ খাবার টেবিলে ঊর্মিলা নেই। কোথায় রয়েছে কে জানে? খাবারগুলো কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে অর্ণবকে জিজ্ঞেস করল তোর মা কোথায় রে?
ছাদে।
খেয়েছে জানিস?
জানি না। ভয়ে ভয়ে উত্তর দিল অর্ণব।
অতনু ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল, সরি।
বাবার দিকে তাকাল অর্ণব। তারপর আবার নিজের থালার দিকে চোখ রাখল।
তোর খাওয়া হয়ে গেছে?
হুঁ। হাত ধুয়ে আমার ঘর থেকে বায়নোকুলারটাকে নিয়ে আয় তো।
অর্ণব উঠে গিয়ে একটু পরে নিয়ে এল দূরবিনটাকে।
ছাদে চল একবার।
ছেলেকে অনেকদিন পর কোলে নিয়ে ছাদে উঠল অতনু। ছাদের এককোণে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে ঊর্মিলা।
ছেলের সঙ্গে ঊর্মিলার পাশে এসে দাঁড়াল ও। ঊর্মিলা চোখ ফেরাল না। পাথরের মতো স্থির।
তোর দূরবিনটা একবার চোখে লাগিয়ে বিনায়কের ঘরটা দেখ।
বাবার দিকে তাকাল অর্ণব।
কী হল দেখ। আমি বলছি তো। শান্তভাবে বলল অতনু।
দূরবিনটা চোখে ঠেকাল অর্ণব।
কী দেখছিস? বিনায়কের ঘরটা খুব কাছে তাই না? ওর ঘরের জিনিসগুলো তোর একদম সামনে, তাই না?
হ্যাঁ।
এবার দেখ। বলে দূরবিনটা ঘুরিয়ে উলটো করে আবার ছেলের হাতে দিল।
এবার কী দেখতে পাচ্ছিস বল?
কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছি না বাবা। সব এইটুকুন ছোট্ট হয়ে গেছে।
ভালো করে দেখ।
অনেক দূরে হয়ে গেছে বাড়িটা। কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছি না।
অতনু আড়চোখে দেখল ঊর্মিলা তাকিয়ে আছে ওদের দিকে।
আচ্ছা আরেকবার দে ওটাকে। বলে হাত বাড়িয়ে বাইনোকুলারটাকে নিয়ে সোজা করে অর্ণবের চোখে ঠেকিয়ে বলল এবার আকাশের দিকে দেখ।
দূরবিনটাকে আকাশের দিকে উঁচু করে ধরল অর্ণব। আজ আকাশে ভরতি তারা। অর্ণব খুব যেন মজা পেল। বাবার কোল থেকে নেমে আকাশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত সস্তার দূরবিনটা দিয়ে দেখতে থাকল। দেখতে দেখতে আকাশের দিকে হাত বাড়াল ও। তারাগুলো কি ওর খুব কাছে? ঊর্মিলার কাছে ঘেঁষে এল অতনু। কিছু না বলে চুপ করে পাশে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ফিসফিস করে বলল, আমরা তো কেউ মরে যাচ্ছি না। তাহলে?
ঊর্মিলা নিরুত্তর। এতক্ষণ চোখে জমে থাকা জল ছাদের ওপর পড়ল চিবুক বেয়ে।
কী গো?
ছাদের ওপ্রান্ত থেকে অর্ণব চিল্লে উঠল বাবা ... মা আ ... একদম কাছে ... হি হি। বলতে বলতে আবার একটা হাত এমনভাবে শূন্যে বাড়িয়ে দিল যেন ওদের গায়ে হাত বোলাচ্ছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন