লাস্ট ট্রেনে একটি পরি

বিনোদ ঘোষাল

দাদা কটা বাজে?

কথাটা শুনতে পেল না খেটো। একমনে বিড়ি টানতে লাগল। আজ সকাল থেকে প্রচুর খাটনি গেছে। অলরেডি বারোশোর ওপর প্লেট পড়ে গেছে। এখন রাত এগারোটা দশ। আরও দুটো ব্যাচ বসবে। আর ভাল্লাগছে না। অনেকদিন পর দুম করে এতটা খাটনি পড়ায় কোমরটা টাটাচ্ছে। কাল আবার একটা আছে। সিজিনে সবে বউনি হল। এখন পর পর চলবে।

কটা বাজে একটু বলবেন দাদা? মিহি চাপা গলায় আবার একই প্রশ্ন।

এবার ফিরে তাকিয়ে একটু চমকাল খেটো। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা পরিটা জিজ্ঞেস করছে। ভালো করে আবার তাকাল। ইরিহ এটা জ্যান্ত পরি! শ্লা দেখে মনেই হচ্ছিল না এতক্ষণ। পরিটা একদৃষ্টে খেটোর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। সাদা ধপধপে ফুলহাতা ফ্রক। ফ্রক ফেটে এক্ষুনি বুকদুটো বেরিয়ে আসবে মনে হচ্ছে এইসান টাইট। পায়ে নার্সদের মতো লম্বা সাদা মোজা। হাতেও মোজা পরা সাদা রঙের। মাথায় ফুল-ফুল সাদা ফিতে আর হাতে ধরা একটা ছোট্ট লাঠি। সেটার আগায় আবার রুপোলি তারা বসানো। সবথেকে মজার হল পরিটার পিঠে দুটো ফিনফিনে কাপড়ের ডানা। সবমিলিয়ে খেটোর চোখে ধাঁ লেগে গেল। এটা সত্যিই পুতুল নয়! মাইরি চোখের পাতা পর্যন্ত ফেলছে না। পাক্কা পুতুলগুলোর মতো পরিটা ট্যাচু হয়ে বিয়েবাড়ির গেটের সামনে সাঁটিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে এতক্ষণ।

একটা হাই পাওয়ারের নীলচে লাইট ফেলা রয়েছে পরিটার গায়ের ওপর। সাদা ড্রেসে নীল আলো পড়ে ফাটাফাটি লাগছে কিন্তু মাইরি উফফ ... ভেতর পর্যন্ত কুটকুট করে উঠল খেটোর। কিন্তু এইটাই কি জিজ্ঞেস করছে নাকি? সামনে এসে জিজ্ঞেস করল, আমাকে জিজ্ঞেস করলেন?

পরিটা ঠোঁট ফাঁকা না করে চাপা গলায় শুধু বলল, হুঁ।

খেটো রিস্টওয়াচে তাকিয়ে বলল, সোয়া এগারোটা।

ইসস কী দেরি হয়ে গেল! নিজের মনেই বিড়বিড় করল পরিটা। ওর লাল ঠোঁট, গোলাপি গালের ওপর অভ্রকুচি চিমচিক করছে।

এবার বেশ মজা লাগল খেটোর। আরেকটু কাছে এসে জিজ্ঞেস করল আপনি এসছেন কোত্থেকে?

প্রশ্ন শুনে মেয়েটা একবার এদিক ওদিক তাকিয়ে সামনাসামনি কেউ আছে কিনা দেখে নিল। তারপর ঠোঁট চেপে বলল লিলুয়া।

ওহ। আমি তো শিবপুর থাকি। এমন করে বলল খেটো যেন এক উঠোনে পাশের বাড়ি।

ও আচ্ছা। বলে থেমে গেল মেয়েটা। শুধু চোখ ঘুরিয়ে বারবার চারদিকে দেখছে সামনাসামনি কেউ রয়েছে কিনা।

কাউকে খুঁজছেন? জিজ্ঞেস করল খেটো।

না না। আসলে ডিউটির সময়ে আমাদের কথা বলতে নেই তো...

ধেস ... মাইরি কেউ নেই। সব এখন খাবার জায়গায় হামলে পড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দেখুন না গিয়ে। একজন খাচ্ছে আর তার পেছনে মড়া ছুঁইয়ে থাকার মতো করে আরেকজন সিট ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে লোকটা উঠলেই সেই সিটে বসবে বলে। সন্ধেবেলায়, বুঝলেন তো সবকটা মাল এখন খাব না, পরে খাচ্ছি করবে, তারপর একটু রাত হলেই সবকটা মিলে একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়বে। পুরো ভিখিরির মতো খামচাখামচি করে মাইরি। ঠেলেঠুলে সার্ভ করতে জান কয়লা হয়ে যায়। খেটোর কথা বোধহয় শুনলই না মেয়েটা। শুধু বলল, এত রাত্তির হয়ে গেল আজ, কী করে বাড়ি ফিরব বুঝতে পারছি না। এরকম হবে জানলে আমি আজকের ডিউটিটা নিতামই না। পরিটার মুখ নীল আলোয় এবার একটু ফ্যাকাশে লাগল দেখতে।

কেন আপনার সঙ্গে আর কেউ আসেনি?

নাহ। আরেক জনের ডিউটি ছিল আমার সঙ্গে। কেন এল না কে জানে!

তা আপনি আগে চলে গেলেন না কেন?

নিয়ম নেই। লাস্ট ব্যাচ পর্যন্ত ডিউটি থাকে আমাদের।

আরে ধের, লাস্ট ব্যাচ এখনও অনেক দেরি।

আরও দেরি! তাহলে ...? অসহায়ভাবে তাকাল মেয়েটা খেটোর দিকে।

তাহলে আর কী, বাড়ি যান। কেউ এতরাত্তিরে খুঁজবে না আপনাকে। যান যান, মেয়েছেলে এতরাত্তির পর্যন্ত ... বলে থেমে গিয়ে আরেকটা বিড়ি ধরিয়ে পরিটার ফিগার চোখ দিয়ে মাপতে থাকে খেটো। উস ... স বুক তো না, পুরো সরবতি লেবু মাইরি। বাইরে থেকে সাইজ যা দেখাচ্ছে বোঝাই যায় ভিতরে হেব্বি রস হবে। চিক করে মাটিতে থুতু ফেলে খেটো বলল,কী হল ভয় লাগছে নাকি?

এগারোটা চল্লিশে লাস্ট ট্রেনে বলে থেমে গেল মেয়েটা।

খেটো বুঝে গেল মেয়েটা এত রাতে ট্রেনে চাপতে ভয় পাচ্ছে। নিজের শুকনো ঠোঁটদুটো একবার চেটে নিয়ে বলল, এক কাজ করতে পারেন, আমি তো এখন বেরোচ্ছি। আপনি চাইলে আমার সঙ্গে চলে আসতে পারেন।

আপনি যাবেন! মেয়েটা যেন হাতে চাঁদ পেল। আমি এক্ষুণি আসছি ড্রেসটা ছেড়েই। বলে হন হন করে লেডিস টয়েলেটের দিকে হাঁটা লাগাল মেয়েটা। পিঠে সাঁটা ডানাদুটো এমনভাবে হাঁটার তালে লতরপতর দুলতে থাকল যেন এক্ষুনি পাখি ফুড়ুৎ করে উড়ে যাবে। কথাটা ভাবতেই একা একা হি: হি: করে হেসে নিল খেটো। নাহ আর দেরি না, পট করে রাতের খাবারটা প্যাকেট করে নিয়ে ধাঁ মারতে হবে।

খেটো ঘোষ। ভালো নাম গণেশ ঘোষ। লিলুয়া কারশেডের পাশের বস্তিতে জন্ম-বড়ো হওয়া। ছোটোবেলায় ডাকনাম ছিল গনা। ওর ন-বছর বয়েসে বাবা লিলুয়া কারশেডে লোকাল ট্রেনের পার্টস হাপিস করতে গিয়ে জি আর পি-র হাতে সান্টিং হয়ে যায়। বিধবা মা-র তখন আঠাশ উনত্রিশ চলছে। ভরপুর অবস্থা। বছরদেড়েক পার না হতেই শেখ সিরাজুলের সঙ্গে মা আবার সেটিং করে ফেলল। গনার পুরো কুত্তার হাল। নতুন আব্বা সিরাজুলের খৈনি কাটার গুমটি দোকান। ঘরে উৎকট খৈনি পাতার গন্ধ। কয়েকদিনের মধ্যেই গনা বুঝে গেল নিজের রাস্তা নিজেকে দেখতে হবে। সিরাজুল চাইত গনা ওর ব্যবসায় হেল্প করুক। গনা চাইত না। একদিন রাতে সিরাজুল মালমুন্ডা খেয়ে এসে গনা আর ওর মাকে উদুম ক্যালাল। ক্যালানির চোটে চোখে অন্ধকার দেখল গনা। পরদিন মা ঠিক হয়ে গেল, গনা হল না। ঘর ছেড়ে দিল। পাশের পাড়াতেই আকবরের বিড়ির দোকানে জয়েন করল। এলাকায় আকবরের বিড়ি ছিল প্রসিদ্ধ। দোতলা গুমটি। ওপর তলায় শুধু দোকান আর একতলায় কুঁজো হয়ে বসে গনা আর আরও তিনজন মিলে দুবেলা বিড়ি বাঁধত। হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকতে হত একতলায়। সোজা টানটান হয়ে বসারও উপায় ছিল না। তাহলেই ছাদ মাথায় ঠেকবে। সারাদিন ধরে লাল সুতোর আকবর বিড়ির সুতলি পাকাতে পাকাতে কোমর টাটাত; বিনিময়ে দু-বেলা খাবার আর মাসে চারশো টাকা। রাত্রে ওই গুমটির এক তলাতেই পুটকি ছাড়া কোশ্চেন মার্ক হয়ে শুয়ে থাকত গনা।

এইভাবেই তিনবছর। তারপর যখন স্বপ্নে শীলা কি জওয়ানি আসতে শুরু করল তখন শুধু বিড়ি বাঁধতে ভালো লাগল না। শুধু বিড়ি বাঁধার পয়সায় শীলা-লীলা কোনো শালা আসবে না বুঝে গিয়ে রেলস্টেশনের সামনে অনেকদিন বন্ধ লক্ষ্মীমিলের ভেতর চোলা সুভাসের চ্যালা হয়ে গেল গনা। চুল্লুর রমরমা বিজনেস ছিল সুভাসের। সঙ্গে অন্য একটা ব্যাবসা চলত ওই মিলের ভেতরেই লুকিয়ে। খেটো বোম বাঁধার কাজ। পেটোরই ছেটো ভাই খেটো। ওই খেটো সেকশনেই নাম লেখাল গনা। বিড়ির সুতলি বাঁধার অভিজ্ঞতাটা কীভাবে যেন কাজে লেগে গেল এই লাইনে। হু হু করে উন্নতি। সবাই বলতে শুরু করল গনার হাতে জাদু আছে। একটা মালও মিস হয় না। দূর দূর থেকে পার্টি আসতে শুরু করল। সুভাস হেব্বি খুশি। ফ্রিতে একটা ঘর দিয়ে দিল গনাকে থাকার জন্য।

নাম ছড়িয়ে গেল গনার। সবাই ডাকতে শুরু করল খেটো গনা। তারপর একদিন কবে যেন গনাটাও খসে গিয়ে শুধুই খেটো হয়ে গেল ও। দিন রাত কাজ। কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে পড়লে চুল্লু সেকশনের হারান আর বুড়োর বিধবাদুটোর বুকে মাঝেমধ্যে চুমুক দিত ও। হারানের বিধবাটা ছিল মাইরি কচি ডাব। চুমুক দিলেই আহ ... সব ঠান্ডা। গায়ে গাঁদা পাতার মতো বুনো গন্ধ বেরত ভরপুর জওয়ানি মেয়েটার। খেটোর থেকে বয়স বছর কয়েক বেশিই ছিল। তবু মা কসম ওকেই ঘরে তুলবে ভেবেছিল খেটো।

কিন্তু লোচা হয়ে গেল একদিন। বোম বাঁধতে গিয়ে আচমকা স্লিপ করল একটা বাঁধন। মালটা মেঝেতে পড়া মাত্র চেঁচিয়ে উঠল। ব্যস। কপাল জোরে খেটো প্রাণে বাঁচল ঠিকই কিন্তু স্পিলিন্টারে নাকের খানিকটা, নীচের ঠোঁট, ডান হাতের দুটো আর বাঁহাতের একটা আঙুল হাওয়া হয়ে গেল। বোম বাঁধা পাকা আঙুলের কাজ। তো সেই আঙুলই যদি তিন-চার পিস মিসিং থাকে তো চাকরি থাকবে কী করে? চাকরিটা গেল। তবে দয়ালু সুভাস ঘরছাড়া করল না ওকে। হারানের বউটাও মাইরি তারপর কয়েকদিন পিরিতের চুলকানি দেখিয়ে আস্তে আস্তে কাট মেরে গেল।

শীলা কি জওয়ানি বিলা হয়ে যাওয়ার পর পুরো ফ্যা ফ্যা হয়ে গেল খেটো। পাড়া-বেপাড়ার আর কোনও ভদ্দরলোকের মেয়ে-বউ তো দূরের কথা ঝি-ফিগুলোও ফিরে তাকাত না ওর দিকে। সারাক্ষণ রাগে জ্বলত। কিন্তু কিস্যু করার নেই। এমন বিষ থোবড়া কোন মেয়েই বা হজম করবে! বাজারের মেয়েছেলেগুলোর কাছে গিয়েও বেশ কয়েকবার গিয়ে খেটো বুঝেছে ওগুলোও শালা ভিতরে ভিতরে হেব্বি ঘেন্না করে খেটোকে। আঁতে লাগে বলে ওইদিকেও আর যাওয়া ছেড়ে দিয়ে বাধ্য হয়ে একসময় সব মেনে নিতে শুরু করেছিল ও। বেকার বসে থাকতে থাকতে জমানো টাকাগুলো সব ফুরিয়ে গিয়ে হাতে হ্যারিকেন হয়ে যাওয়ার আগেই পাড়ার মনোময়দার ক্যাটারিং-এর কাজে লেগে গেল। ঠাকুরের হেল্পার। মাংস ধোয়া, কিমা করা, আলুর চোকলা ছাড়ানো, ফিস ফ্রাইয়ের পুর তৈরি করা এইসব কাজ। মনে দু:খ লাগত একেক সময়। কিন্তু পাপি পেট কা সওয়াল। পেট শালা বহুৎ হারামি। কোনো প্রেসটিজ-ফেসটিজের ধার ধারে না। অভ্যাস হতে শুরু করল একসময়। পার ডে একশো কুড়ি টাকা হিসেবে সিজিনে মাল্লু খারাপ আসে না। বাকি সময়গুলোতে এই তাই করে গুজেমুজে চালিয়ে দেওয়া। একা পাবলিক। নিজের ঘর আছে, আর কী চাই! এতগুলো বছর পেরিয়ে গেল যখন বাকিটুকুও যাবে।

প্যাকেটের লাস্ট বিড়িটায় লাস্ট টান দিতে দিতে খেটো দেখল মেয়েটা আসছে। ফুলহাতা সবুজ রঙের কলারওলা সালোয়ার। পিঠে ডানাদুটো আর নেই। শেষ সুখটানটা দিয়ে বিড়ি মাটিতে ফেলে হাতের তালুদুটো ভালো করে ঘষে নিল একবার।

রাত এগারোটা পয়ত্রিশ। খাঁ খাঁ প্ল্যাটর্ফম। ডাউন লোকাল ট্রেনটা খানখান শব্দ করতে করতে এসে দাঁড়াল। খেটো আর মেয়েটা উঠল। কামরায় একটা প্রাণীও নেই। চট করে একবার চোখ বুলিয়ে দেখে নিল খেটো। উহ ট্রেন তো না, একেবারে ফুলশয্যার ঘর মাইরি। ভেবেই ফিক করে একবার হাসল ও। শরীরটা হঠাৎ খারাপ লাগছে বলে ঢপ দিয়ে আজ কাট মেরেছে। অবশ্য তা বলে নিজের রাত্রের খাবারটা প্যাকেটে নিতে ভোলেনি। জানলার ধারে মুখোমুখি বসল দুজন। ট্রেন ছাড়ল।

মেয়েটা এবার একগাল হেসে বলল ভাগ্যিস আপনি ছিলেন। নইলে যে কী হত! বলেই একঝলক খেটোর কোলে রাখা খাবারের প্যাকেটটার দিকে তাকাল। ওটাকে পাশে সরিয়ে রেখে মুখে কিছু না বলে শুধু একটু হাসল খেটো।

আমার নাম রীনা।

আমি খে ... ইয়ে গণেশ। বলে আবার খেটো মাপল মেয়েটাকে। পরির ড্রেসগুলো এখন মেয়েটার কাঁধের ঝোলায় ভরা। সাদা ফ্রক আর লাইটিং-এ মেয়েটাকে তখন যেমন ঝক্কাস লাগছিল এখন অনেকটা লোডশেডিং খেয়ে গেছে। তবে মুখের মেকআপটা তোলেনি বলে গালদুটো অভ্রকুচিতে চিকচিক করছে যাত্রা করা মেয়েছেলেগুলোর মতো। ঠোঁটে লাল লিপ্সটিক, চোখে কাজল, বেশ লাগছে কিন্তু। হাতের তালুদুটো আরেকবার ঘষে নিল খেটো। তারপর বলল আমি তো প্রথমে বুঝিইনি যে আপনি মানুষ। ধরতেই পারছিলাম না কে আমাকে টাইম জিজ্ঞেস করছে। হে হে হে।

রীনা হাসল। বলল, আসলে আমাদের প্রফেশনে ডিউটির সময় নড়াচড়া কথাবলা একদম বারণ। পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।

বলেন কী! বাপরে বাপ! এ তো খুব কঠিন কাজ। এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেন কী করে?

প্রথম দিকে খুব কষ্ট হত। তারপর অনেকদিন ট্রেনিং নিয়ে, যোগা করে এখন অভ্যেস হয়ে গেছে।

মশাটসা কামড়ালেও নড়েন না?

টের পাই না। পার্টির সামনে নড়লে ডিউটি পাব না।

ওরেশশালা কী কঠিন কাজ মাইরি!

রীনা হাসল। শুধু আমি নয়, যারা আমাদের মতো কাজ করে সব্বাইকে এমন চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।

ও, তা সবাই কি আপনার মতো পরিই সাজে?

না না তা কেন, কেউ মিকি মাউস, কেউ রাজা, কেউ ভাল্লুক, কেউ জোকার, অনেকরকম সাজে।

সব বিয়েবাড়িতেই?

না-না। জন্মদিন, অন্নপ্রাশন, বিয়ে সব কিছুতেই।

হুঁম। তা মাঝেমধ্যেই তো মনে হচ্ছে আপনার এমন রাত্তির হয়ে যায়, বাড়িতে চিন্তা করে না?

কে চিন্তা করবে? কেউ নেই?

সে কী কেউ নেই? একা থাকেন নাকি?

না একা নয়। মা আছে। বোনেদের বিয়ে দিয়ে দিয়েছি। ভাইও বিয়ের পর আলাদা হয়ে গেছে।

আর আপনি বিয়ে করেননি?

নাহ। আমায় আর কে ... বলে আচমকা থেকে গেল রীনা। কথাটা চেপে দেওয়ার জন্য পালটা জিজ্ঞেস করল আপনারও নিশ্চয়ই দেরি হয় অনেক। বউদি চিন্তা করেন।

হে হে হে বউদি ... হে হে।

হাসছেন কেন?

বিয়েই করিনি তো বউদি আসবে কোত্থেকে? এমনভাবে কথাটা বলল খেটো যেন বিয়ে না করে একটা মহান কাজ করে ফেলেছে।

হাসল রীনা। তারপর বলল, আপনি কিন্তু বেশ ভালো মানুষ।

এই রে, কেন?

এই আমাকে চেনেন না অথচ এতরাত্রে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছেন।

না না এ আর এমন কী? আমারও তো একই দিকে বাড়ি। সেই জন্যই। বলতে বলতে খেটো আরেকবার নিজের ঠোঁট চাটল। মেয়েটা নরম খাচ্ছে আস্তে আস্তে। গোটা বডিতে আরও একবার চোখ বোলালো খেটো। এমনিতে রোগা চেহারা। ভাঙা গলা। হাতের আঙুলগুলো কাঠি কাঠি। টান টান করে খোঁপা বাঁধা চল। সবই দেখা যাচ্ছে, কিন্তু সালোয়ারের ওড়নাটা এমনভাবে চাদরের মতো গায়ে জড়িয়ে রেখেছে যে বুকের সাইজটা এখন মাপা যাচ্ছে না। তবে অ্যাদ্দিনের এক্সপিয়েন্স যা বলছে মাল খারাপ হবে না। জানলার বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। সেই অন্ধকার কাঁপিয়ে ট্রেনের ঝমঝম শব্দ; দুটো স্টেশন পেরিয়ে গেল। কেউ উঠল না।

খেটো গলা খাঁকরে বলল, কিন্তু টাকা ইনকাম করার তো অনেক রাস্তা ছিল, ওসব না করে খামোখা এই লাইনে এলেন কেন? বলতে বলতে রীনার সামনে নিজের মুখটা খানিক এগোল খেটো।

প্রশ্নটায় ফিক করে একটু হাসল রীনা। আর সঙ্গে সঙ্গে খেটোর নাকে চিকেন কষার গন্ধ এসে ধাক্কা মারল। খাবারের প্যাকেট থেকে বেরোচ্ছে। খিদেটা মোচড় দিল আবার।

রীনা আরেকবার ওই গন্ধের উৎসের দিকে তাকিয়ে বলল, একটা কারণে এসেছি, বলব?

হ্যাঁ হ্যাঁ বলো ... এই যাহ তুমি বলে ফেললাম। বলে আবার ছোপ দাঁত বার করল খেটো।

না না ঠিক আছে। তুমিই বলুন। বেশ একটা গদগদ ভাব নিয়ে বলল রীনা।

আচ্ছা ঠিক আছে। হ্যাঁ কারণটা শুনি, বলতে বলতে নিজের সিট ছেড়ে রীনার পাশে এসে বসল খেটো।

রীনা খানিকটা অন্যমনস্ক। কিছু একটা ভাবছে। উত্তেজনায় শীতশীত করছে খেটোর। হাতের তালু ঘামছে। শালা এতদিনের গ্যাপ। সেজন্য এই হাল। আগে তো হারানের বিধবাটাকে এবেলা ওবেলা খেপ দিতেও টেনশন লাগত না।

বলিই তাহলে? জিজ্ঞেস করল রীনা।

আরে আমি তো শুনব বলেই বসে আছি। আগে শুনে নিই।

আমার না সেই ছোট্ট থেকেই সাজগোজের খুব শখ। ইস্কুলে গো এ্যাজ ইউ লাইকে প্রতি বছর ফার্স্ট হতাম। নিজেই সাজতাম।

তাই নাকি? বাহ। তা কী সাজতে?

অনেক কিছু। আসলে দেখতে সুন্দর ছিলাম তো। যা সাজতাম মানিয়ে যেত। সবাই খুব হাততালি দিত। প্রাইজ পেতাম।

শুনে হে হে করে হাসল খেটো। মন বসছে না গল্পে। টাইম পেরিয়ে যাচ্ছে এবার।

হ্যাঁ। আমরা তো তিন ভাই-বোন। বাবা লিলুয়া ওয়ার্কশপে কাজ করত। একদিন রাত্রে মদ খেয়ে কারশেডের ওখানে লাইন পার করতে গিয়ে রেলে কাটা পড়ল। তখন কী অবস্থা আমাদের ...

এই কেলো করেছে! এ তো রামায়ণ খুলে বসল মাইরি! কখন শেষ হবে? খেটো সংক্ষেপে হুঁ বলল।

বাড়িতে আমিই বড়ো মেয়ে। মা আর আমি মিলে একটা টিপ কারখানায় ঢুকলাম। কিন্তু ওতেও আর সংসার চলে না। তারপর কারখানার কয়েকটা ছেলে খুব পেছনে লাগত আমার। দেখতে সুন্দর ছিলাম তো তখন।

শুনে খেটো আবার তাকাল রীনার ওড়না ঢাকা বডিটার দিকে। তারপর বলল, সে তুমি এখনও সুন্দর আছো। বলতে বলতে রীনার গা ঘেঁসে চেপে বসল ও। একটা হাত ছড়িয়ে দিল রীনার পিছনে। সিটের ওপর আড়াআড়ি রাখল হাতটা।

রীনা এবার বেশ আদুরে গলায় বলে উঠল মিথ্যে কথা বলছেন। আমি মোটেই এখন আর সুন্দর দেখতে নই।

না না মিথ্যে বলছি না। মা কসম। ওই পরি সেজে যা লাগছিল না তোমাকে, ফাটাফাটি!

সত্যি বলছেন! রীনার গলায় বিস্ময়।

আলবৎ!

যাহ বাজে কথা। নইলে কব্বে আমার বিয়ে হয়ে যেত। ওই অ্যাকসিডেন্টটার পরে আর ভালো দেখতে নেই আমি জানি।

অ্যাকসিডেন্ট! কী অ্যাকসিডেন্ট! একটু চমকালো খেটো।

ওই একদিন স্টোভে রান্না করতে গিয়ে হঠাৎ স্টোভটা বাস্ট করল। আমি পুড়ে একশা। অনেকদিন হাসপাতালে ছিলাম। খুব ক্যাজুয়ালি বলল রীনা।

পুড়ে! শিউরে উঠল খেটো।

রীনার যেন কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই কিছুতেই। আপন মনে একা একাই খলবল করে বলে যাচ্ছে। সামনে যে খেটো বসে রয়েছে ওর খেয়ালও নেই বোধহয়।

খুব সুন্দর দেখতে ছিলাম তো, তাই বোধহয় ভগবানের সহ্য হয়নি। দিল পুড়িয়ে। প্রাণে বাঁচলাম তো বাঁচলাম। এই গলা থেকে পেটে পর্যন্ত পোড়ার দাগ আর উঠল না।

পুড়ে গেছে ...? সব ...! শব্দগুলো প্রায় আর্তনাদের মতো বেরিয়ে এল খেটোর মুখ থেকে।

সব পুড়লে তো মরে বেঁচে যেতাম একেবারে। না। ... এই গলা থেকে। ... বিয়ে আর হল না। কে করবে এই পোড়াকে? কী কাজ করব ভাবতে ভাবতে একদিন এক বন্ধু আমাকে নিয়ে গেল এই জায়গায়। পরি সাজলে গলা থেকে হাত-পা সব ঢাকা থাকে ... সেই ছোট্টবেলাতেও সাজতাম, আবার সেটাই শুরু হল। বেশ লাগে জানেন। সিজিনে মাস গেলে টাকাও আসে কিছু...

এই তোমার ভয় করছে না তো? ভয় ... করছে না তো? কিছুক্ষণ থমকে রীনার দিকে তাকিয়ে থাকার পর হঠাৎ বেশ জোরে চিৎকার করে বলে উঠল খেটো।

না না ভয় করবে কেন?

হ্যাঁ, কিচ্ছু ভয়ের নেই। আবার জোরে চিল্লাল খেটো। কোনো ভয় নেই। এমন জোরে কথাগুলো বলল যে নিজের কানেই ফুটল বোলতার হুলের মতো। তারপর আচমকা সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হন হন করে ট্রেনের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।

রীনা একটু যেন অবাক হয়েই কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল খেটোর হাফপোড়া মুখটার দিকে। তারপর হঠাৎ বলল ওখানে গিয়ে দাঁড়ালেন কেন?

এমনিই।

ওখানে দাঁড়াবেন না, ঠান্ডা লেগে যাবে। এখানে এসে বসুন। আসুন বলছি।

খেটো ভুরু কুঁচকে তাকাল রীনার দিকে। কেন কে জানে কথাটা শুনতে ইচ্ছে করল খুব। আবার এসে ওর পাশে বসল।

এই সময়ের হাওয়াটা খুব খারাপ।

হুঁ। বলতে বলতে খেটো খেয়াল করল রীনা আবার একদৃষ্টে ওর খাবারের প্যাকেটটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

খেটোর সঙ্গে চোখাচুখি হতেই একটু লজ্জায় যেন অন্যদিকে তাকাল রীনা।

খেটো বলল, এই, তোমার খিদে পেয়েছে?

না-না।

আমি জানি পেয়েছে। খাওনি তো কিছু সন্ধে থেকে।

ও কিছু হবে না। অভ্যেস আছে আমার। বাড়ি গিয়ে খাব।

দেখো তো প্যাকেটায় কী আছে।

এই না না।

যা বলছি শোন। কথাটা বলেই আবার অকারণ নিজের মনেই বলে উঠল, পোড়ার কষ্ট শালা আমি জানি।

খেটোর গলায় কী ছিল কে জানে মেয়েটা আর না বলল না। হাত বাড়িয়ে প্যাকেটটা খুলল। খানিকটা ঠান্ডা বিরিয়ানি, একপাশে চিকেনচাপ, দুটো মাংসের ঝোলমাখা সন্দেশ আর একটা ন্যাতানো ফিশফ্রাই।

খেয়ে নাও।

তাহলে আপনাকেও কিন্তু খেতে হবে। ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল রীনা।

উত্তর দিল না খেটো, হাসল শুধু।

রীনা একমনে প্যাকেটের ওপরের কভারটা ছিঁড়ে খুব মন দিয়ে খাবার সাজাতে লাগল দুই জায়গায়। সিটের ওপর ওই সামান্য খাবারটুকু এমন মমতায় সাজাচ্ছিল যে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ খেটো যেন স্পষ্ট দেখতে পেল সেই ডানাদুটো আবার মেয়েটার পিঠে এসে বসে গেছে। আসল পালকওলা দুটো ডানাই অল্পঅল্প নড়ছে। কোত্থেকে আবার একটা নরম নীল হ্যালোজেন লাইট পড়েছে রীনার গায়ে। সেই ডানার হওয়া লাগছে খেটোর চোখেমুখে। ট্রেন কোথায় যেন ছুটে যাচ্ছে হু হু করে। বাইরে এক পৃথিবী অন্ধকার, ঠান্ডা হওয়া আর তার মধ্যে খু-ব ছোটো দুটো আধপোড়া মানুষ আবার জ্বলে উঠছে একটু একটু করে।

রবি

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%