বিনোদ ঘোষাল
বিশাল উঁচু সাদা ঝকঝকে বাড়িটা। প্রায় পঞ্চাশ-ষাটতলা হবে। শহরটাও বিদেশের। বড়ির সবথেকে উঁচুতলার মস্ত লম্বা একটা ঘরে অজিত একা একা বড়ো বড়ো পা ফেলে হাঁটছে। কাচের মতন ঝকঝকে পাথর বসানো মেঝে। ঘর ভরতি লাখ লাখ টাকার জিনিসপত্র ছড়ানো। মেঝের ছোঁয়ায় অজিতের পা শিরশির করছে। ঢাক পেটানোর শব্দ হচ্ছে বুকে। উহ কী আনন্দ। কাচের জানলা দিয়ে বাইরে তাকালে হাতের মুঠোয় আকাশ। চাঁদটাকেও মনে হচ্ছে আরেকটু হাত বাড়ালে পেয়ে যাবে। এত কাছে! ... হাত বাড়াতেও যাচ্ছিল জানলা দিয়ে, তখনই পেটের বাঁ পাশে ক্যাঁৎ করে লাথি খেয়ে পুরো স্বপ্নটা লাট খেয়ে গেল অজিতের।
লাথিটা ঝেড়েছে অজিতের পাশে ঘুমিয়ে থাকা মুনু, অজিতের ছয় বছরের ছেলে। ঘুম চটকানো মেজাজে বাঁ হাত দিয়ে মুনুর ঠ্যাংটা একঝটকায় ছুড়ে দিল অজিত। মুনু ঘুমের ঘোরেই বার দুয়েক কোঁৎ পেড়ে আবার তলিয়ে গেল। ওপাশে জয়া হাঁ করে ঘুমুচ্ছে। জানলা দিয়ে গলে আসা ভোরের আলোয় দৃশ্যটা দেখল অজিত। ফুড়ুৎ করে ঠান্ডা মিষ্টি ছোট্ট একটা হাওয়া ঢুকল ঘরের ভেতর। তাতেও মন ভালো হল না। মিনিট কয়েক চাটাইয়ের এপাশ ওপাশ করে উঠে পড়ে জানলার সামনে গিয়ে বাইরে হাঁ করে তাকিয়ে থাকল। আবার আজকের দিনটা খারাপ যাবে।
সেই ছোট্ট থেকে বড়োলোক হবার হেব্বি ইচ্ছে অজিতের। ওর সাত মাস বয়সে মা মারা গেছিল ক্যানসারে। বাবা ছিল রিষড়ার একটা নামকরা মোটর কারখানার ফিটার। ইনকাম খারাপ নয়, বাপ ছেলের সংসার ছুটছিল ভালোই। হঠাৎ কারখানা কুঁজো হতে শুরু করল। দমাদম ছাঁটাই, বদলি। অজিতের বাবার তখন আটচল্লিশ চলছে। অজিত সতেরো। বাবা বেগতিক বুঝে ভি আর এস নিয়ে অজিতকে এদিক ওদিকে ঢোকানোর চেষ্টা করল। কিন্তু অজিত তদ্দিনে রোজগারের সহজ রাস্তা জেনে গেছে। সিগারেটের প্যাকেটে সাট্টার নাম্বার লেখা থেকে শুরু করে পকুর চুল্লুর ঠেকের হেল্পার। প্রায় ডেইলি পকেট চমকানো ইনকাম। বাবার দেখানো রাস্তায় হাঁটল না ও। চোখে অন্য স্বপ্ন সেঁটে গেছে। আরও মাল্লু কামাতে হবে। তারপর কলকাতা কিংবা মুম্বাইতে ঝিংকাস একটা ফ্ল্যাট। প্রীতি জিন্টার মতন সুরুৎ বউ। বাবা প্রচুর বুঝিয়েছিল। অজিত বোঝেনি। শেষে রেলের জি আর পি বোঝাল। পকুর টিমের সঙ্গে ওয়াগন ভাঙতে গেছিল। পুলিশের টর্চ চোখে ঝাপটা মারতেই দৌড়। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। রেল লাইনে পা হড়কে সোজা থানায়। বড়োবাবু রুল হাতে নিয়ে নানাভাবে বোঝালেন, অজিতও বুঝিবুঝি করল, কিন্তু ছাড়া পেতেই আবার যে কে সেই। তবে একটা জিনিস অজিত বুঝে গেছিল এক লাইন শাহ বহুৎ খতরনাক। দুসরা লাইন ভাবতে হবে। লাইন হাতড়াতে থাকল অজিত। তার মধ্যে বাবা কোত্থেকে জয়াকে জুটিয়ে আনল। অজিত কিন্তু কিন্তু করেও শেষ পর্যন্ত না বলতে পারেনি। বেশ ঝিলকি মারা দেখতে। যাক-গেহ, এখন লাথ খাওয়া মার্কেট। আপাতত এইটাই চলুক, পরে রোকড়া চলে এলে ... রোকড়া আর এল না, বছর ঘুরতে না ঘুরতে জয়ার কোলে মুনু এসে গেল। অজিতের হাফ চুল ফরসা। আরও কিছুদিন পর বাবা ফুটে গেল। বাবার জমানো টাকা কটা সুপারলোটো, সাট্টা আর চুল্লুর ঠেকে সাফা করে মাসকয়েকের মধ্যে হাতে হ্যারিকেন। মুনুর খিদের কান্নায় চুপচাপ জয়া মুখ খুলল। তাতে বিশেষ কাজ হল না। আরও মাল খাওয়া বেড়ে গেল অজিতের। অগত্যা জয়া একদিন নিজের পাড়াতুতো দেওরদের ডেকে এনে অজিতের সব বিষ ঝাড়িয়ে দিল। কয়েকদিন পরেই লোন করে রিকশা কিনল অজিত। রিকশার স্পিডে হলেও সংসারটা চলল কয়েক দিন, কিন্তু বছুর ঘুরতে না ঘুরতেই পাড়ায় অটো রিকশা চালু হয়ে যাওয়াতে আবার পেটে লাথ। ফ্যামিলি নিয়ে প্রায় বসে পড়ল অজিত। প্যাসেঞ্জার জোগাড় করতে হাড় কেলিয়ে যায়। জয়ার মুখ আবার বেড়ে গেল। ছেলেটার খিদেও যেন দিনে দিনে রাক্ষসের মতন হয়ে যাচ্ছে।। ... এই এ্যাত্ত কিছুর পরেও বড়োলোক হওয়ার স্বপ্নটা কিছুতেই কাছছাড়া হল না অজিতের। হঠাৎ হঠাৎ ও যেন দেখতে পায় বিশাল লম্বা একটা বাড়ির সবচেয়ে উচু তলায় সুন্দর মস্ত একটা ঘরে ও একা একা খালি পায়ে হাঁটছে। কাচের মতন মার্বেলের মেঝের ঠান্ডা ছোঁয়ায় শিরিশিরি করছে পায়ের পাতা। খাবার টেবিলে দামি দামি সব খাবার রাখা। ঝকঝকে বাথরুম। একেবারে হিন্দি সিনেমায় যেমনটা দেখায়। জিভে চল চলে আসে অজিতের। স্বপ্নটা ভেঙে যায় একসময়, তালগোল পাকিয়ে যায় সব। তারপরেই মোজাজ চটকে কৎবেল।
— মাইরি বলছি, বিশ্বাস কর, শিবু এখন ভালো কামাচ্ছে এই লাইনে। হাতে ছ্যাঁকা খেয়ে বিড়িটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলল বুড়ো। অজিত অন্যমনস্ক হয়ে শুনছিল। জ্যৈষ্ঠ মাসের বেলা সাড়ে বারোটা। চাদ্দিক হিলকে দিচ্ছে। বেলুড় স্টেশন বাজারের পাশে ওদের রিকশা স্ট্যান্ড। এই সময়টায় যে ক-জন লোক ট্রেন থেকে নামে তাদের কেউই প্রায় রিকশা পার্টি নয়। তবু আশা নিয়ে বসেছিল অজিত। যদি লেগে যায়। খালি হাতে ঘরে ফিরলে জয়া বিশ্বাস করবে না। ভাববে সব ফুটিয়ে এসেছে। মনে মনে জয়াকে আরও গোটা চারেক খিস্তি মেরে গামছা দিয়ে ঘাম মুছল ও। বুড়ো নিজের ডান পা-টা সিটের ওপর তুলে কচ কচ করে যাই চুলকাতে চুলকাতে বলল। তুই কিন্তু আমার কথাটা মন দিয়ে শুনলি না।
— শুনলাম তো।
— তালে?
— তালে আবার কী?
— একবার দেখবি না কি?
— কত ইনকাম বললি?
— বলল, ডেইলি আড়াইশ-তিনশো হবে।
টাকাটা প্রথমে শোনেনি অজিত। রিকশার সিটে কেতরে ছিল, এবার পা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসে বলল, সত্যি?
যা বলল ও।
এখন বাড়িতে হবে শিবু?
থাকার তো কথা। এখনই যাবি?
— দেখি একবার।
পিচ গলা রাস্তা চাটতে চাটতে ওর বুড়ো রিকশাটা যখন শিবেনের বাড়ি পৌঁছাল, তখন শিবেন বউ বাচ্চা নিয়ে আয়েস করে টিভি দেখছে। অজিতকে দেখে বাইরে এসে বলল, কীরে তুই?
— একটু দরকার ছিল।
— আয়, ভিতরে আয়।
নাহ, বাইরেই বসি।
শিবেন ঘরের ভিতর একবার তাকিয়ে নিয়ে বলল, আচ্ছা তাই বোস।
— বুড়োর কাছে তোর কথা শুনে এলাম। কথাটা বলেই অজিত আড়চোখে ঘরের ভিতর তাকাল। ছোটো ঘরটা বেশ সাজানো। বেঁটে স্টিল আলমারির মাথায় বসানো পোর্টেবল টিভিটা চলছে। বউটা টেবিল ফ্যানের পাশে বসে হাঁ করে সিরিয়াল গিলছে, বেশ গায়ে গতরে হয়েছে এখন, আগে চিমসানো ছিল। শিবেনের বউ-এর দিকে তাকিয়ে কথা ভুলে গেছিল অজিত। শিবেন গলা খাঁকড়ে বলল, হ্যাঁ বল কী বলবি?
— ওহ, হ্যাঁ হ্যাঁ তুই কোন রং করার কোম্পানিতে কাজে ঢুকেছিস শুনলাম।
— কেন?
— কী নাম রে কোম্পানির?
— ইউনিয়ন পেইন্টস। কেন বলবি তো?
— একজনকে ঢুকিয়ে দিতে পারবি?
— কাকে?
— পারবি কি না বল না?
— না। আমি নিজেই গত পরশু কাজটা ছেড়ে দিলাম।
— সে কী? ... কেন রে? প্রায় আঁতকে উঠল অজিত।
— ধ্যাস শা. হ ... ও মানুষের কাজ!
— কেন? পয়সা-কড়ি তো ভালোই দেয় শুনেছি।
— হুঁহ..ওই পয়সার গোয়া মারি ... ফুল লাইফ রিস্ক।
— কেনহ?
কেন আবার কী? পনেরো-বিশতলা একেকটা বাড়ি। দড়িতে ঝুলে ঝুলে রং করতে হয়। ও আমার পোষাবে না। মাতা ঘোরে নীচে তাকালে।
— পনেরো-বিশ তলা! ... হেব্বি মাল্লুপার্টিরা থাকে না রে?
— নয়তো কি অত্ত উঁচুতে তুই আমি থাকব? বলে একটু থেমে শিবেন বলল, কেন, তুই করবি না কি?
— না নাহ, আমি না। নিজের কেসটায় বেমালুম টেপ মারে অজিত। আসলে আমার একটা বন্ধু খুব করে বলছিল।
— অ। ওকে অন্য লাইন দেখতে বল।
— কীরম দেয় রে রোজ?
— ঠিক নেই। কাজ বুঝে। দুশো, আড়াইশো ... তিনশো ...
— আবার বোম্বে-টম্বেও নিয়ে যায় শুনেছি।
— হ্যাঁ যায়, তবে রেট একই। শুধু থাকা-খাওয়াটা ফ্রি। আর যদি কখনোও ওপর থেকে খসে যাস তবে বউ হাজার পঞ্চাশেক পাবে। বলে শিবেন ঘরের ভেতর একবার চট করে উঁকি দিয়ে চাপা গলায় বলল, তা শালা আমিই ফুটে গেলে তারপর আমার বউ রানি হোক কী রেন্ডি হোক, তাতে আমার কী এসে যায় বলত?
— হুম ঠিকই তো। যাকগেহ ছেলেটা খুব করে আমাকে ধরেছে। তুই ঠিকানাটা আমাকে দিয়ে দে, আমি ধরিয়ে দিয়ে খালাস।
— বোস একটু। বলে শিবেন উঠে গেল। খানিক বাদে একটুকরো কাগজে খ্যাঁচা মারা হাতের লেখায় নাম-ঠিকানা লিখে এনে বলল, নে আমি সব লিখে দিয়েছি। গিয়ে শুধু ম্যানেজার বিকাশবাবুকে আমার নাম বললেই হবে।
— ঠিক আছে, বলে ছোঁ মেরে কাগজটা নিয়ে উঠে পড়ল অজিত। আরেকবার শিবেনের বউ-এর দিকে তাকাল ... নাহ, সত্যি সলিড ফিগার বানিয়েছে। পেটের ভাঁজে জমে ওঠা ঘাম ঝিল্লি মারছে। মুনুটা হবার পর থেকে জয়ার চেহারা সেই যে দু-টাকা প্যাকেটের আমলকির মতন হয়ে গেল আর ঠিক হল না।
— ঠিক আছে, তুই তা-লে আয় এখন।
— হ্যাঁহ চলি রে। বেশ জোরে বলল অজিত। শিবেনের বউ একবার ওর দিকে তাকিয়ে আবার টিভিতে মুখ গুঁজে দিল।
রাস্তায় রিকশা টানতে টানতে অজিত ভাবল টেনশনে মটকা জ্যাম হয়ে গেছে, পকুর ঠেকে আজ একটু প্লাসটিক মারতে হবে। প্লাসটিকের প্যাকেটে সিল করা পকুর চুল্লুর সঙ্গে একসময় অজিতের হেব্বি দোস্তি ছিল। আজ অনেকদিন পর ... জয়াটা খিস্তোবে। খিস্তোক।
— না ভাই কাজটা ঠিক করলে না। রিকশা চালানো এর থেকে ঢের ভালো ছিল। ঠোঙা থেকে একখাবলা মুড়ি মুখে দিয়ে কাঁচা লঙ্কায় কামড় মেরে কালোর কথাটা মন দিয়ে শুনল অজিত। তারপর পালটা প্রশ্ন করল, কেন?
— কেন বুঝবে দু-দিন গেলে। সারাদিন দড়িতে ঝুলতে ঝুলতে টেংরি টাটাবে যখন।
অজিত আর কিছু না বলে মুড়িতে মন দিল। সেদিন বিকেলে গলা পর্যন্ত বাংলা মেরে বাড়ি ফিরেছিল ঠিকই, কিন্তু জয়া ঘরে ঢুকতে দেয়নি। অজিতের টাল খাওয়া হাল দেখে মুখের ওপরেই দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। হাজার ধাক্কাধাক্কিতেও খোলেনি। অজিত রাগের চোটে সেদিনেই সোজা রেলস্টেশন। ট্রেনে চেপে হাওড়া এসে রাতটা প্লাটফর্মে কাটিয়ে পরদিন সকালে ঠিকানা খুঁজে সোজা ইউনিয়ন পেইন্টস। ম্যানেজার বিকাশ পরাশর ফাঁকা গুঠকার প্যাকেট ভাঁজ করে দাঁত খুঁচিয়ে ফুকফুক করে সুপুরির টুকরো ফেলতে ফেলতে বলেছিলেন, রং-এর কাজ করেচো কখনোও?
সেই কোন এককালে সমীরের প্লাস্টার ছাড়া ইটের দোকান চুনকাম করেছিল অজিত। সেইটাকেই মুঠোয় নিয়ে বলেছিল, হ্যাঁ।
— এ কাজে পোচুর রিস্ক আছে কিন্তু।
জানি।
ঠি-ক আছে, করে দেকো। নাম-ঠিকানা খাতায় লিখে নাম সই করে ইউনিয়ন পেইন্টস-এর টেম্পোরারি রং মিস্তিরি হয়ে গেল অজিত। বাড়িতে যে বউ-বাচ্চাকে ফেলে পালিয়ে এসেছে সেটা আর জানাল না কাউকে।
বালিগঞ্জ মে ফেয়ার রোডে পুরোটা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বিশাল উঁচু চারখানা বিল্ডিং-এর বাইরেটা হালকা গোলাপি রং হচ্ছে। প্রত্যেকটা বাড়ি বারোতলা। এত উঁচু বাড়ি! সেই-ই স্বপ্নের মতন। কারা থাকে এইসব বাড়িতে? দেখার জন্য রক্ত ছলছল করে ওঠে অজিতের। মোট তেরো জনের টিম। চারটের মধ্যে একটা বাড়ি এর মধ্যেই পুরোটা কমপ্লিট হয়ে গেছে। সেকেন্ড বাড়িটার বারোতলা থেকে রং করতে করতে এখন তিনতলায় কাজ চলছে। অজিত তিন তলায় ওঠার পারমিশন পেল।
পাগলা করে দেওয়া ঘ্যামা সাজানো বিশাল হল ঘরটার ঠিক মাঝখানে মস্ত সোফার মধ্যে হাতির মতন মোটা লোকটা বসে একা একা মাল খাচ্ছে। কাচের টেবিলে বেশ বড়ো সাইজের বোতল রাখা। তার পাশে খান পনেরো গ্লাস মালে ভরতি। লোকটা একটা করে গ্লাস তুলছে, মালটা গলায় ঢেলেই ফাঁকা গ্লাসটা সটান ছুড়ে দিচ্ছে সামনের দেয়ালে। টুকরো টুকরো হয়ে কাচ ছড়িয়ে পড়ছে মেঝেতে। কী কিম্ভূত ব্যাপার মাইরি! ... এমন সিন অজিত হিন্দি সিনেমাতেও কোনোদিন দেখেনি। আরও চমকাল, পাশের ঘরেই একটা বউ, নিশ্চয়ই এই লোকটারই হবে, দুটো বাচ্চাকে নিয়ে মৌজসে টিভি দেখছে। বরটা যে মাইরি এই ঘরে একা একা বসে লাট খাচ্ছে সেটা কোনও ব্যাপারই না। বেশ কিছুক্ষণ এইভাবে চলার পর জলহস্তির মতন লোকটা টাল খেয়ে সোফার মধ্যেই ধড়াস হল। সঙ্গে সঙ্গে কোত্থেকে দুজন সাদা ড্রেস পরা চাকর গম্ভীর হয়ে এসে বাবুকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে চলল অন্য ঘরে। আরেকটা চাকর এসে হাতে বালতি আর প্লাস্টিকের বড়ো চামচ মতন কী একটা দিয়ে ভাঙা কাচগুলো কাচিয়ে তুলতে থাকল বালতিতে। হেব্বি অবাক হল অজিত। পুরো সিনটা এমনভাবে ঘটল যেন রোজের কেস। জীবনে আজ প্রথম আসল বড়োলোক দেখল অজিত।
দু-নম্বর বিল্ডিংটা কমপ্লিট হয়ে তিন নম্বর শুরু হয়ে বারোতলা থেকে সাততলায় আসার পর চান্স পেল অজিত। তার আগে পর্যন্ত শুধু নীচে থেকে রং গোলা, ছেকে কৌটোয় ভরে দেওয়া হেল্পারের কাজ। বিরক্ত লাগে অজিতের। অবশ্য অন্যান্য সব পাকা মিস্তিরিরাও বলে অজিত কাজ শিখছে খুব দ্রুত। ম্যানেজার বিকাশবাবুও, মুখে কিছু না বললেও হাবেভাবে বুঝিয়ে দেন অজিতের কাজে উনি বেশ খুশি। দড়িতে ঝুলে সাততলায় উঠে দারুণ খুশির মুডে নীচে তাকাল অজিত। মানুষগুলো সব এইটুকু হয়ে গুবরে পোকার মতন সাইজ হয়ে গেছে।
— কী দেখছিস এত মন দিয়ে? ব্রাশ চালানো থামিয়ে জিজ্ঞেস করল কালো।
— নীচের লোকগুলোকে একবার দেখ কালোদা। হি-হি ... শালা গুবরে পোকার মতন লাগছে।
কালো মুচকি হেসে বলল, আবার নীচ থেকে আমাদেরকে এখন মাকড়সার মতন লাগছে জানিস?
কথাটা খুব মন পসন্দ হল না অজিতের। রং-এর কৌটোয় ব্রাশ ডুবিয়ে একপোঁচ মেরেই আবার মুখ ঘুরিয়ে বলল, জানো তো কালোদা, একবার আমার ছেলের সঙ্গে একটা সিনেমা দেখতে গেছিলাম। বইটার নাম ছিল তোমার ... হ্যাঁ, ইসপাইডারম্যান। সেই হিরোটা হল গিয়ে একটা মাকড়সা, বুঝলে। হাতের এইখান দিয়ে না ... এই দেখ, ঠিক এইখান দিয়ে দড়ির মতো জাল ছুড়ে এই রকম উঁচু উঁচু বাড়িগুলোর টং-এ সাঁ-সাঁ উঠে যেত। হেব্বি ছিল বইটা।
কালো পুরোটা শুনল মন দিয়ে। তারপর বলল হুম, তাড়াতাড়ি হাত চালা। বাবু লাস্ট ডেট দিয়ে দিয়েছেন কাজ শেষ করার।
— ঠিক আছে, বলে অজিত কাজে চোখ ফেরালেও মন ফেরাতে পারল না। ওই সিনেমাটা দেখার পর বেশ কয়েক রাত ও দিন হারাম হয়ে গেছিল। চোখ বন্ধ করলেই অজিত দেখতে পেত মাকড়সা ছেলেটার মুখোশ আর গায়ের ছালটা পরে অজিত নিজের হাত থেকে অমন সুড়ুৎ করে জাল ছুড়ে ছুড়ে তরতর করে কোন এক বিদেশি অচেনা শহরের বিশাল উঁচু বাড়িগুলোর ওপর উঠে যাচ্ছে। রাজার মতন বুক ফুলিয়ে ঢ্যাঙা বাড়িগুলোর ছাদে হাঁটছে। ইচ্ছেমতো যে কোনও ঘরে ঢুকে যাচ্ছে। ওহ কী ফাটাফাটি সেই সব ঘর!
— ওরে এবার কাজ কর। হাতটা নাড়া।
— এ্যাহ ... হ্যাঁ হ্যাঁ। স্যাটাস্যাট কয়েকটা পোঁচ মেরে সামনের কাচের জানলা দিয়ে ঘরের ভিতর চোখ চালাল অজিত। উড়-শাহ এটা রান্নাঘর! ধপধপে সাদা ঘরটায় দেওয়াল আলমারিগুলো পর্যন্ত সাদা রঙের। কয়েকশো কাপ-ডিশ, থালা চামচ হাতা দারুণভাবে সাজানো। কত রকমের মেশিন। ওগুলো যে রান্নায় কী কাজে লাগে বুঝল না অজিত। ঘরের ভিতর সাদা জামাপ্যান্ট আর টুপি পরে কয়েকজন লোক ঝড়ের বেগে কাজ করছে। পুরো দামি হোটেলের মতন ব্যাপার। একটা ছেলে, অজিতেরই বয়সি ঢাউস স্টিলের বেসিনে কাপ-ডিশ ধুচ্ছিল, অজিতকে বাইরে ঝুলতে দেখে ভুরু নাচাল। সুবলের সঙ্গে সঙ্গে হাতের ইশারায় ছেলেটার কাছে জল খেতে চাইল। সঙ্গে সঙ্গে ওদিক থেকে ইশারায় উত্তর পেল, হবে না। জগা সুবলের ডানদিকে কাজ করছিল। হেসে বলল, ওদের সঙ্গে খেজুরে করতে হবে না। পাত্তা পাবি না। বড়োলোকের চামচা শালারা। বহুৎ ঘ্যাম।
এর মধ্যে একদিন রাত্রে আচমকা জয়া আর মুনুকে স্বপ্নে দেখল অজিত। তিনজনে মিলে কোথায় যেন বেড়াতে গেছে। প্রাসাদের মতো বিশাল একটা বাড়িতে রয়েছে সবাই। হঠাৎ ওই বাড়ির মধ্যেই অজিত গেল হারিয়ে। কিছুতেই বেরোনোর রাস্তা খুঁজে পাচ্ছে না। অথচ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে জয়া আর মুনু দিব্বি একটা ঘরে বসে নিজেদের মধ্যে আদিখ্যেতা করছে। অজিত যে হারিয়ে গেছে তাই নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। হারামিগুলো স্বপ্নের মধ্যেও জ্বালিয়ে মারল!
কিন্তু এত রাগের মধ্যেও দু-বেলা ছাগলেরও অখাদ্য রান্না খাওয়া কিংবা মেয়েমানুষ সোহাগ করার ইচ্ছে জাগলে, কখনও মুনুর বয়সি কোনো ছোটো ছেলেকে দেখলে আচমকা মনটা বোম মেরে যায়। কিছু ভালো লাগে না তখন।
গতকাল থেকে অজিত যেদিকটায় চলে এসেছে সেখান থেকে সাততলার ফ্ল্যাটটার ভিতর অনেকটা দেখা যায়। সাদা মার্বেলের মেঝে। ফাটাফাটি দেয়ালের রং, বড়ো বড়ো ছবি টাঙানো। একেকটা ঘরে একেকরকমের আলো। ডুমগুলো এমনভাবে লুকোনো থাকে যে শুধুমাত্র আলোটা দেখা যায়। পালিশ করা কাঠের ভুলের ওপর টু সাদা পাথরের, কোথাও পিতলের মূর্তি বসানো রয়েছে। কালোদা বলেছে ওগুলো না কি পাথর নয়, স-ব হাতির দাঁতের। ঝুল বারান্দায় আবার সবুজ ঘাস। অজিত যত দেখে তত হাঁ হয়ে যায়। বন্ধ কাচের জানলার ওপার থেকে ভীষণ ইচ্ছে হয় সামনের ওই মস্ত ঘরটার মেঝেতে একবার দাঁড়াতে। এ ঘর ও ঘর পায়চারি করতে। তুলতুলে গদিওলা ধুমসো চেয়ারগুলোয় বসে ইয়াব্বড় টিভিটা চালিয়ে ইচ্ছেমতো দেখতে। ... নাহ, এরাই মাইরি আসলি মানুষের বাচ্চা। কী নেই!
পুরো দু-দুটো দিন ধরে অজিত এদিক-ওদিক চেটে খেল ফ্যামিলিটাকে। ফ্ল্যাটের বাবু রোজ সকাল দশটা নাগাদ কোট-প্যান্ট পরে অফিসে বেরোন। চাকরে জুতো-মোজা পরিয়ে দেয়। আরেকজন বাবুর ওয়াটার বোতল, ব্যাগ, টিফিনবাক্স বয়ে নিয়ে যায়। নীচে দাঁড়ানো চকচকে কালো রঙের বিদেশি গাড়ি চেপে বাবু অফিস যায়। গাড়ির ড্রাইভারটারও সাদা ড্রেস। বাবু বেরিয়ে যাবার কিছুক্ষণ পরেই বউটা ছম্মকছল্লু ড্রেস মেরে বেরিয়ে পড়ে। মালকিনের গাড়ি লাল রঙের। যা দেখতে! একটা জিনিস অজিত বুঝেছে এই মিঞা-বিবিতে কথা হয় খুব কম। যে যার নিজের তালে থাকে। লোকটা একটু চুপচাপ ধরনের। বউটার পুরো উলটো।
আজ রবিবার। সকাল দশটা নাগাদ ব্রাশ টানতে টানতে প্রায় সাতফুট লম্বা, শ্বেতপাথর বসানো কাঠের টেবিলে এদের ফ্যামিলির সবাইকে একসঙ্গে দেখতে পেল অজিত। স্বামী-স্ত্রী আর ছেলে মিলে টিফিন খাচ্ছে। বউটার ফিগার একটু ধস খাওয়া হলেও এখনও বেশ চটক আছে। গেঞ্জি আর বারমুডা পরে। ফরসা ফরসা পা দুটো। ই কীরে মাইরি! চাকর-বাকর নিজের ছেলের সামনে হাফ প্যান্ট পরে থাকে কেউ? ছেলেটার বয়স মুনুর থেকে একটু বেশিই হবে। তবে বাপের মতন কালচে আর ভোঁতকা। ক্রিকেট খেলার ড্রেস পরে কোঁৎ কোঁৎ করে এটা-ওটা গিলছে। চাকরগুলো বিয়েবাড়ির ক্যাটারিঙের কায়দায় বাবুদের খাবার দিচ্ছিল। যেমন সব খাবার, তেমনই দেবার স্টাইল। বাচ্চাটা একবস্তা খেয়ে গরমজলের বাটিতে হাত চটকে সাদা কাপড়ে হাত মুখ মুছে উঠে পড়ল। একজন চাকর হাতে ব্যাগ আর ব্যাট নিয়ে রেডি। ছেলেটা চাকরকে নিয়ে বেরিয়ে যাবার কিছুক্ষণ পর ওরা দুজনেও উঠল। আজ যেন কত্তা-গিন্নীতে কথা বড্ড বেশি কম। বাবুদের খাইয়ে দাইয়ে চাকরগুলো সব বাইরে চলে গেল। বোধহয় নিজেদের কোয়ার্টারে টিফিন করবে। কিছুক্ষণ পর বোধহয় কেউ কলিংবেল বাজাল, কারণ বউটা হামলে পড়ে নিজে গিয়ে দরজা খুলল। একটা লোক এসেছে। উরিব্বাস ... কী দেখতে! যেমন লম্বা-চওড়া ফিগার তেমনই সাহেবদের মতো গায়ের রং। পুরো ইংরেজি বইয়ের হিরো। ওই লোকটার সামনে বাবুকে পুরো ফিকা লাগছে। বাবুর সামনেই বউটা ওই লোকটার গালে চুমু দিল। শাল্লাহ ... জয়া যদি কারুকে এমন করত না ... অজিত কেলিয়ে তার ইয়ে ভেঙে দিত। আর এই বাবু মাইরি উলটে ওই হিরোটার সঙ্গে হেসে কী সব কথা বলে নিজের ফ্ল্যাটের দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। মিনিট কয়েক বাদে অজিত নীচে তাকিয়ে দেখল বাবু গাড়ি করে কোথায় যেন বেরিয়ে গেল। এদিকে হিরো সোফাতে বসল পা ছড়িয়ে। এর পর কেসটা কী ঘটবে ভালো করে বোঝার আগেই হারামি বউটা নিজে এসে সাঁই করে জানলার পর্দা টেনে দিল অজিতের মুখের ওপর।
— তুই মাইরি কাজকর্ম ছেড়ে সারাক্ষণ ভেতরে কী দেখিস বলত? গরিব মানুষ গরিবকে দেখ। ওইসব দেখিস না। চোখ জ্বলে যাবে।
কালোর কথায় অজিত ফোঁস করে নিশ্বাস ছেড়ে বলল, ঠিকই বলেছ কালোদা। আমরা মাইরি একেবারে ... ইয়ে। নীচে তাকালো অজিত। অনেক নীচে কালো সাপের মতন রাস্তায় ছোটো ছোটো পোকার মিছিল যাচ্ছে।
টিফিনে গোগ্রাসে রুটি-সবজি চিবোচ্ছিল অজিত। মনের ভিতরটা খুব খচমচ করছে। বাবুর ঘরে কী চলছে কে জানে? জগা বলল এখানের কাজ শেষ হলে কয়েকদিন ছুটি পাওয়া যাবে। তুই বাড়ি যাবি তো?
অজিত অন্যমনস্কের মতন উত্তর দিল, দেখি!
— দেখি ফিরে! আচ্ছা সত্যি বলত, তোর কি বউ পালিয়েছে? না কি বউকে ঠিকঠাক পারিস না? এ্যাদ্দিন এখানে আছিস কোনোদিন মেয়েছেলে করার শখও তো দেখলাম না।
কালো পাশ থেকে টোন কাটল, তোর আসল জিনিসটা আদৌ আছে তো? না থাকলে বলিস আমরা আছি। বলেই খিক খিক করে হাসি।
— ধুর আমার ওসব ভাল্লাগে না। বলেই জয়ার মুখটা একবার মনে এল অজিতের। ভেতরে এত চাপা অস্বস্তি হচ্ছে! এখন যা ঘটছে ডেফিনিট বেডরুমে।
শুধু বড়োলোকদের ঘরে ঝাড়ি মারতে ভাল্লাগে নাকি রে? আমার ভালো কথা শোন, এবারে ছুটিতে বউ-এর সঙ্গে দু-দিন গিয়ে থাক। নইলে বউ-কে যখন...
অজিত তড়াক করে উঠে পড়ে। হাত ঝেড়ে বলে, কাজে লাগি। এই জগা তুই আমার সাইডটা দেখ, আমি তোর দিকটা করছি।
— কেন রে?
— এমনিই। অজিতের মুখস্থ জগার দিকটায় বাবুদের বেডরুম। সাঁই সাঁই করে দড়ি বেয়ে সাততলায় উঠে পড়ল। বেডরুমের বড়ো জানলাটার পাশে গিয়ে ভিতরের দিকে উঁকি মারতেই ... ধুসসস শাহ ... এখানেও পর্দা-মারা! মেজাজটা পুরো খিঁচড়ে গেল। ঘরে চোখ চালানোর আর কোনও উপায় নেই জেনেও জানলার পর্দায় চোখ রেখে পাশেই রং তুলি নিয়ে খুটখাট করতে থাকল অজিত। বেশ কিছু সময় পেরোবার পর হতাশ হয়ে রঙের কৌটোয় ভালো করে ব্রাশ ডুবিয়ে টান মারতে যেতেই হাত থেমে গেল অজিতের। এতক্ষণের আন্দাজটা মিলে যাওয়া সত্বেও বুকে ঝিং খেয়ে গেল। জানলার রেশমি কাপড়ের বাহারি রঙের পর্দাটা ঘরের ভেতরের হাওয়ায় কয়েক সেকেন্ডের জন্য দু-এক আঙুল ফাঁক হতেই অজিত দেখতে পেল বাবুর বউ আর সেই হিরোকে। ঠিক যেন একটু আগে খোলস ছাড়া সাদা ধেড়ে দুটো তেলাপোকা বিশাল বিছানায় একটা আরেকটার ওপর চেপে। দুজনেই তুমুল ডানা ঝাপটাচ্ছে। কিছুক্ষণের জন্য চোখে ধা লেগে গেল অজিতের। তারপর হুঁশ ফিরতেই চোখ-মুখ কুঁচকে এল। পর্দা আবার কাচের জায়গায় সেঁটে গেছে।
ভেতরে ভেতরে হাঁফাতে শুরু করেছিল অজিত। আ-র ভাল্লাগছে না। সবই শাল্লা গুয়ের এপিঠ আর ওপিঠ। মুনু আর জয়ার জন্য মনটা খুব অস্থির করছে ক-দিন ধরে। দুটোতে মিলে এতদিন ধরে একা একা কেমন আছে কে জানে? ফ্ল্যাটের ভিতর চোখ চালাতেও ইদানীং আর তেমন ইনটারেস্ট আসে না। তবু স্রেফ আজকের দিনটার জন্য নিজের ভেতরটাকে খুঁচিয়ে শেষ একবার দপ করে জ্বলে উঠতে চাইছিল অজিত। আজ শেষ বিল্ডিংটার কাজ শুরু হবে। একেবারে বারোতলা থেকে। সবথেকে উঁচু। এতদিন পরে সেই স্বপ্নে আজ সত্যি সত্যি পৌঁছাবে অজিত। মেন গেটের সিকিউরিটি গার্ড তেওয়ারিজি এখন অজিতের খাস দোস্ত। ওর কাছেই সব বাবুদের হাঁড়ির খবর শোনে অজিত। সব কিস্যা তেওয়ারির মুখস্থ। ওর কাছে অজিত শুনেছে চার নম্বর বিল্ডিং-এর বারোতলায় থাকেন নবীন সরাফ। এই ফ্ল্যাটগুলো সব নবীনজির জমিতেই তৈরি হয়েছে, গোটা দেশে ওনার নাকি প্রায় দশ বারোটা বড়ো বড়ো ফ্যাক্টরি রয়েছে। নিজের পাঁচটা বিদেশি গাড়ি আর নয় জন চাকর। লোকটা না কি ইন্ডিয়ার প্রথম দশজন বড়োলোকদের মধ্যে একজন। অজিত খুব উৎসাহিত হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল কারা থাকেন ওর সঙ্গে? তেওয়ারি কপালে হাত ঠেকিয়ে উত্তর দিয়েছিল ওহি তো নসিব ভাইয়া। ইতনা আমির, লেকিন বাবু পুরা আকেলা। আপনা রিলেটিভ কোই নেহি হ্যায় সাথমে।
— কেন?
— আরে বাবু দেখনেমে বহুত হি খরাব হ্যায়। বিলকুল ভালুকে তরা। তো ইসিলিয়ে বাবুকা শাদি ভি নেহি হুয়া। অব মাতা-পিতা ভি গুজর গ্যায়া তো রহেগা কৌন? বলে একটু থেমে তেওয়ারি বলেছিল পহলে তো ফিরভি কভি কভি লড়কী লোগ রাতমে আতি থি। পর অব তো উনলোগভি সায়েদ ডরকে মারে আনা বনধ কর দিয়া। এইস্যা ভি হো সকতা হ্যায় কে বাবু খুদ মানা কর দিয়া। সায়দ অউর ইসব আচ্ছা নেহি লাগতা।
— মানে ... ওনাকে এতটাই খারাপ দেখতে কি?
তেওয়ারি মুচকি হেসে উত্তর দিয়েছিল, উপর তো চঢ়োগে, অগর দিখাই মিলেগা তো দেখকে ফির হামকো বাতা না। ... লেকিন হাঁ উনকা জো ঘর হ্যায় ও দেখনে কা চিজ। বাপরে ইতনা বঢ়িয়া ডেকরেশন শালা আকবর বাদশাভি সায়দ নেহি কর সকা। ইৎনা কড়োর রুপেয়া বাবু ঘর সাজানেমে ডালা উনমে সায়দ দুসরা হাবরা বিরিজ বন যাতা। হা-হা।
এতকিছু শুনে অজিতের এনার্জিটা আবার চাগিয়ে উঠেছিল। আজ সব থেকে বড়োলোক দেখবে, সবচেয়ে উঁচুতে উঠবে, আকবর বাদশার মতন মহল দেখবে। ... উহহ!
দড়ির মই বেয়ে আস্তে আস্তে ওপরে উঠছিল অজিত। খানিকটা উঠছিল আর নীচের দিকে তাকাচ্ছিল। ওপরে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নীচের মানুষগুলোর সাইজ যে একটু একটু করে ছোটো হতে থাকে এইটা দেখতে দারুণ মজা লাগে অজিতের। একেবারে বারোতলায় উঠে আবার নীচে তাকাল। ইরি! শুধু সুড়সুড়ি পিঁপড়ের লাইন যাচ্ছে কালো টেলিফোন তারের মতো রাস্তা দিয়ে। চোখ তুলল অজিত। প্রায় হাফ কোলকাতা অজিতের ছোটো ছোটো চোখ দুটোর মধ্যে এঁটে গেছে। হাত-পা শিরশির করছিল আনন্দে। কৌটোয় ব্রাশ ডুবিয়ে এক-দুই পোঁচ মেরে সামনের জানলাটা দিয়ে ঘরের ভিতর চোখ চালাতে গিয়ে যাহ কলা! জানলার কাচ এত অন্ধকার, এত কালো যে বাইরে থেকে কাচে নাক ঠেকিয়েও ভিতরের কিছু দেখাই যায় না। হেব্বি নেতিয়ে পড়ল অজিত। উঁকি দিয়ে দেখল এই দেওয়ালের সবকটা জানলারই একইরকম কাচ। তার মানে কিস্যু দেখা যাবে না। না বাদশা না তার মহল। মন খিঁচড়ে ব্রাশ চালাতে থাকল অজিত। কাজ করতে করতে হয়তো খানিকটা অন্যমনস্ক হয়েই অন্য দেয়ালটার ঠিক মুখের কাছে যেতে হঠাৎ যেন গোটা শরীরে সপাটে চাবুক পড়ল। এই দেয়ালটার মুখেই একটা ছোটোমতো জানলা। জানলার সামনে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। পুরো উদোম। অজিত সরে যেতে গিয়েও পারল না। পা যেন দড়িতে আটকে গেছে। মাত্র ফুটখানেক দূরে থাকা সত্বেও লোকটা যেন অজিতকে দেখতেই পাচ্ছে না! এই জানলাটার কাচ সাদা। জানলায় প্লাস্টিকের খড়খড়ি অনেকটা তুলে দিয়ে বহু নীচের রাস্তার দিকে একভাবে তাকিয়ে আছে লোকটা। অজিত একটু সাহস নিয়ে দড়িতে ঝুলে ওর আরও কাছে এল। প্রায় মুখোমুখি। ভালো করে দেখল মানুষটাকে। কদাকার মুখওলা মুসকো কালো বেঁটে লোকটার গা ভরতি ইয়া বড়োবড়ো লোম।। ... এ্যাহহ ... এই তাহলে আকবর বাদশা! বুনো মাকড়সার মতো লোমশ হাতদুটো বন্ধ কাচের পাল্লার ওপর ছড়িয়ে রেখে দাঁড়িয়ে রয়েছে লোকটা। ঘরটার ভেতর তাকাল অজিত। বেশ বড়ো মাপের আকাশি রঙের ঘর। মেঝের অর্ধেকটায় পালিশ করা কাঠ আর বাকিটায় দুধসাদা মার্বেল। একদিকে দেয়াল জোড়া কাঠের আলমারি। আলমারির একটা পাল্লা খোলা। ওর ভেতরে থরে থরে জামা কাপড় ভাঁজ করে রাখা। অন্যদিকে মস্তবড়ো গোল কাচের আয়না-ড্রেসিং টেবিল। টেবিলটার মধ্যেই গোল একটা বড়ো আকাশি রঙের বেসিন বসানো। তার চারপাশে কত রকমের শিশি-বোতল। সেন্ট-ফেন্ট হবে বোধহয়। আরেক কোণে কাচ দিয়ে ঘেরা একটা চৌকোমতো জায়গা। ওখানে শাওয়ার বসানো। তার পাশেই মুখঢাকা দেওয়া পায়খানা করার প্যান। আর ঘরের ঠিক মাঝখানটায় প্রায় দেড় মানুষ লম্বা আর তিন হাত চওড়া একটা সাদা শাঁখ বসানো। শাঁখটায় জল ভরতি। অজিত খুঁটিয়ে দেখে বুঝল ওটা আসলে সাদা পাথর দিয়ে তৈরি। বাবু শুয়ে চান করে ওখানে। টিভিতে মেয়েরা সাবান মেখে চান করে যেমন ... এটা বাথরুম! স্রেফ হাগামোতা চানের জন্য কত খসিয়েছে!
চোখ ফিরিয়ে লোকটার দিকে তাকাতেই আবার ধক করে জ্বলে ওঠে অজিতের বুক। মানুষটা কখন যেন নীচ থেকে চোখ সরিয়ে অজিতের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। অবশ হয়ে থাকা মোটা কালো ঠোঁট দুটোর মাঝখানে দিয়ে ঘন আটার মতন লালা সুতো হয়ে নীচ পর্যন্ত ঝুলছে। ফ্যানের হাওয়ায় ফিনফিন করে উড়ছে লোকটার গায়ের লোমগুলো। উদোম মানুষটা অজিতের দিকে তাকিয়ে থাকে, ... তাকিয়েই থাকে ... সরে যায় না। কেমন যেন তাকানোটা! ... কেমন যেন ...
কালো চিল্লে ওঠে, এই অজিত, কীরে কী হল ... এই নেমে যাচ্ছিস কেন? আরে ... আস্তে আস্তে নাম, অত হড়বড় করিস না।
অজিত দড়ি বেয়ে হু হু করে নেমে যেতে থাকে। নীচের কয়েকটা মিস্তিরিও চিৎকার করে ওঠে, কী হল রে নামছিস কেন? ... ওই, নামছিস কেন?
দু-দিকের হাঁকডাক শুনে মাঝখানে নেমে যায় অজিত। উঠবে না নামবে বুঝে পায় না। দড়িটা অল্প অল্প দুলতে থাকে।
আবার যুগান্তর
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন