মনীষ মুখোপাধ্যায়

চোখে হঠাৎ জলের ঝাপটা লাগায় জ্ঞান ফিরল শ্রীকান্ত সামন্তের। সারা শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে তাঁর। ডান হাতের পেশিগুলো অবশ হয়ে গেছে। সেখানে যেন একটা বিষাক্ত পোকা ক্রমাগত হুল ফোঁটাচ্ছে, এমন অনুভূতি হচ্ছে তাঁর। চোখ মেলে দেখলেন সামনে একজন বুড়ো মতো মানুষ বসে আছে। তার হাতে একটা জল খাওয়ার ঘটি। তাঁকে চোখ মেলতে দেখে বুড়োর মুখে হাসি ফুটল। জ্ঞান ফিরতেই সব কথা মনে পড়ে গেল তাঁর।

তিনি ধড়মড়িয়ে উঠে বসতে গেলেন কিন্তু পারলেন না। যন্ত্রণায় পুরো শরীরটা কুঁকড়ে গেল। ডান হাতে কেউ একটা গামছা বেঁধে দিয়েছে বেশ শক্ত করে। গামছা উপচে বেরিয়ে এসেছে রক্ত। বাঁ হাত দিয়ে তিনি ব্যথার জায়গায় হাত দিয়ে দেখলেন সেখানে অসম্ভব যন্ত্রণা করছে। পাশ থেকে বুড়ো লোকটা বলে উঠল, 'গুলি ছুঁইয়া বার হয়্যা গেছে কত্তা। ভিতরে ঢোকে নাই।'

শ্রীকান্ত সামন্ত গুঙিয়ে উঠলেন, 'আমার পোলা-মাইয়ারা কোথায় গেল!'

বুড়ো মানুষটা কোনও উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে ফেলল। শ্রীকান্ত আবার জিজ্ঞেস করলেন, 'জবাব দাও না ক্যান। ওদের হইল কী?'

যন্ত্রণার কারণেই হয়তো প্রথমটা মনে পড়ল না তাঁর। শাম্বকে আর্মির লোকেরা খুব কাছ থেকে গুলি করেছে একটু আগেই। আর তাঁর মেয়েকে ওই শয়তান আজিজ আর এরশাদ আর্মির কাছ থেকে আড়াল করে সরিয়ে নিয়ে গেছে।

বুড়ো উসখুস করল কিছুক্ষণ। তারপর বলতে লাগল, 'কত্তা! আমি হইলাম গিয়া সহদেব মাঝি। নাও পারাপার করাই। ঢাহা শহরের মানুষদের আমিই ওপার করি। আজ যা দ্যাখলাম, তা আগে দেখি নাই। পাকিস্তানি আর্মি পাহারা দেয় ঠিকই। কিন্তু আজিজরে...' সে আর কিছু বলতে পারল না।

এতক্ষণে হয়তো পরিস্থিতি কী হয়েছে সেটা আন্দাজ করতে পারলেন শ্রীকান্ত সামন্ত। তিনি উন্মাদের মতো শব্দ করে কেঁদে উঠলেন 'শামুরে... এ...এ..., ও আমার উত্তমা মা-রে...এ...এ...'

এক সন্তান হারানো পিতার আর্তনাদ বুড়ো সহদেব মাঝি, গাঙের পাড়ের পোকামাকড় আর মৃতদেহের গন্ধে ছুটে আসা ক্ষুধার্ত শেয়াল ছাড়া কেউই শুনতে পেল না।

বুড়ো সহদেব এবার গলা নামিয়ে বলল, 'কত্তা আপনার পোলার লাশটা ওরা ফেলাইয়া গেছে আর বউমায়েরে গাঙে ভাসায়া দিছে। আর...'

'আর কী? চুপ কইরা গেলে ক্যান?' যন্ত্রণাকীষ্ট শরীর নিয়েও গর্জে উঠলেন শ্রীকান্ত।

'আপনার মাইয়া ওই ঝোপের আড়ালে আছে। কুত্তাগুলা ওর কাপড়-চোপড়... শেষে আমি আমার পরনের একখান লুঙ্গি দিয়া ঢাইক্কা দিছি।' সহদেবের চোখ ছলছল করে উঠল।

দাঁতে দাঁত চেপে সহদেবের কাঁধে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করলেন শ্রীকান্ত। নাহ! তিনি পেরে উঠছেন না। পা'টা বোধহয় ভেঙেছে। তাও একবার শেষ চেষ্টা করলেন। মনে মনে রাধা-মাধবকে স্মরণ করে শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন তিনি।

সহদেব তাঁকে ধীরে ধীরে নিয়ে চলল ঝোপটার দিকে। ঝোপের কাছে গিয়ে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলেন শ্রীকান্ত। 'ওঃ ভগবান! ওরা কি মানুষ?'

ঝোপের ঠিক মাঝখানটাতে পড়ে আছে উত্তমা। ওর গলা চিরে বেরিয়ে আসছে চাপা একটা গোঙানি। ও যন্ত্রণায় ছটফট করছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে ওর চারিপাশ। সহদেবের সাহায্যে এগিয়ে গিয়ে তিনি মাটিতে ধপ করে বসে পড়লেন তারপর মেয়ের মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিলেন।

ছেলেবেলা থেকে যে বাপ কোলেপিঠে করে মেয়েকে মানুষ করেছেন, তাঁর স্পর্শ অনুভব করতে পারল মেয়ে। সে চোখ খুলতে না পারলেও, অতি কষ্টে বাবাকে বলল, 'বাবা! আজিজ আর মাংসওয়ালা এরশাদ আমার কী হাল করেছে দেখো...ওরা...ওরা...জানোয়ার, বাবা। আমার সর্বস্ব নিয়েও ওদের জ্বালা মেটেনি। ওরা বাঁশের বাঁখারি দিয়ে...'

আর কিছু বলতে পারল না উত্তমা। এরচেয়ে বেশি একটা মেয়ে তার বাবাকে আর কিছু বলতে পারেও না। সে হাঁফাতে লাগল। হাঁফাতে হাঁফাতেই বলল, 'বাবা! একটু জল দেবে। তেষ্টায় বুকটা ফেটে যাচ্ছে।'

সহদেব তার জলের ঘটিটা শ্রীকান্তর দিকে বাড়িয়ে দিল। মেয়ের মুখে জল দেওয়ার আগেই সে বলে উঠল, 'এর প্রতিশোধ তুমি নিও বাবা...বক্সিবাজার বাসস্ট্যান্ডের কাছে আমার এক মাস্টারমশাই থাকেন। তুমি তাকে গিয়ে সব বোলো। সে আর তুমি এর বিহিত কোরো বাবা...'

মুখে জল পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই কেমন নিস্তেজ নিথর হয়ে এলো উত্তমার শরীরটা। আর কোনও সাড়া শব্দ শোনা গেল না। যেন বাপের কোলে মাথা রেখে বাপের হাতের জল পাওয়ার জন্যই তার প্রাণটা এতক্ষণ আটকে ছিল।

বেশ কয়েকবার চিৎকার করে ডাকলেন শ্রীকান্ত তাঁর মেয়েকে। কিন্তু ততক্ষণে সে এই যন্ত্রণা আর হানাহানির পৃথিবী ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেছে। বাচ্চা ছেলের মতো ডুকরে কেঁদে উঠলেন তিনি। তাঁর পিঠে এসে হাত রাখল সহদেব। 'কত্তা! আফনে হিন্দু, পোলা আর মাইয়ার মুখে আগুন দিয়া গাঙে ভাসায়া দ্যান। অহন পোড়াইতে গেলে বিরাট ফ্যাচাং বাঁধবো। আর আর্মির লোকে জানে আফনেও মরছেন। ওরা গুলি করছিল। ওরা বোঝে নাই হেইডা আফনার হাত ছুঁইয়া বার অইয়া যাইব। মাইয়ার কথা রাখনের জন্য আফনার বাঁচনের প্রয়োজন।' কথা কটা কেমন দার্শনিকের মতো বলল সহদেব।

শ্রীকান্ত সামন্তের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা ছিল না। কিন্তু মনের জোর! ছেলেমেয়ের মৃত্যু দারুণভাবে শক্ত করে দিয়েছে তাঁকে। কোনোমতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সহদেবের সহযোগিতায় শাম্ব আর উত্তমার মুখে একটা পোড়া গাছের ডাল ছোঁয়ালেন তিনি। হঠাৎ করেই যেন তাঁর চোখের জল শুকিয়ে গেছে। দুঃখ, আবেগ, যন্ত্রণাকেও যেন ভাসিয়ে দিতে চাইলেন বুকের পাঁজরের দুটো হাড়ের সঙ্গেই। কাদার মধ্যে টেনে টেনে মৃতদেহ দুটো বয়ে নিয়ে গিয়ে জলে ফেলে দিল সহদেব। প্রথমে কিছুক্ষণ দৃশ্যটা একভাবে দেখে গেলেন শ্রীকান্ত, তারপর আর ফিরেও চাইলেন না সে দিকে। তিনি সহদেবকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'আমারে ধইরা সূর্যকান্ত ডাক্তারের কাছে ফ্যালায়া দাও মাঝিভাই। উনি মানুষ ভালো।'

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%