১২

মনীষ মুখোপাধ্যায়

ভোরবেলা পায়ের যন্ত্রণায় ঘুম ভেঙে গেল মেছকন্দর উদ্দিনের। তখনও আকাশ ফর্সা হয়নি ভালো করে। জানালার লোহার গরাদ ভেদ করে ঘরে এসে পৌঁছচ্ছে একটা হালকা নীল আভা। তার বেগম তখন অন্য পাশ ফিরে ঘুমোচ্ছে। পায়ে এমন যন্ত্রণার কারণ আবিষ্কার করল মেছকন্দর। কাল সন্ধেবেলায় শ্রীকান্ত সাহেবের বাসায় ঢুকতে গিয়ে তার পায়ে কিছু একটা ফুঁটেছিল। কিন্তু সে ব্যথা তো একেবারেই কমে গেছিল! তাহলে হঠাৎ আবার এটা ফিরে এল কেন? ইসস! এই ব্যথাটাকে উপেক্ষা করা একেবারেই ঠিক হয়নি তার। সে ছেলেবেলা থেকে গাঁয়ে গঞ্জে কাটিয়েছে। এইসব কত কিই না ফুঁটেছে তার পায়ে। তবে এখন বয়স বেড়েছে, অবশ্যই আমল দিতে হবে এসব ব্যথা বেদনাকে।

আলো ফোটার অপেক্ষা করতে লাগল মেছকন্দর। কিন্তু ব্যথা যে কেবল বেড়েই যাচ্ছে! হাঁটুর ওপর থেকে কেমন যেন অবশ হয়ে আসছে পা'টা। সে এবার একটা ঠেলা দিল বেগমকে। বেগমও উঠল ধড়মড়িয়ে।

'কী হইসে রাইত থাকতে জাগাও ক্যান?' বিরক্তি নিয়ে প্রশ্ন করল তার বেগম।

'পাওডা বড়ই দরদ করে বুঝছনি! দ্যাহো তো কী হইছে?'

ততক্ষণে আলো ফুটেছে পুব আকাশ লাল করে। সেই আলো ঘরের মধ্যে ঢুকেও পড়েছে জানলার ফাঁক দিয়ে। দুহাতে চোখ কচলে মেছকন্দরের বেগম তার স্বামীর পায়ের দিক তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল, 'আল্লাহ রে!' আজ এই চুয়াল্লিশ বছর বয়স হয়েছে তার, এইরকম মারাত্মক ব্যাধি সে কখনোই দেখেনি। ঘরের আলো জ্বাললো সে। এবার নিজের পা'টা ভালো করে দেখতে পেল মেছকন্দরও। এবং দেখার সঙ্গে সঙ্গে সেও আঁতকে উঠল।

মেছকন্দরের গোড়ালি ফুলে ঢোল হয়ে গেছে। জায়গাটা কেমন যেন রক্তশূন্য ফ্যাকাসে মতো দেখাচ্ছে। আর সবচেয়ে অবাক হওয়ার বিষয় হল, পায়ের প্রত্যেকটা শিরা কয়লার মতো কালো রং ধারণ করেছে। যেন শরীরের সব রক্ত কালো হয়ে পায়ের দিকে নেমে আসতে চাইছে। শিরাগুলো দপদপ করছে কেমন। নিজেদের জায়গা পালটাচ্ছে। যেটা প্রায় অসম্ভব। ওই ভোরেই সবকিছু ভুলে বেগমের কাঁধে ভর দিয়ে মেছকন্দর ছুটল হাকিমের কাছে।

হাকিম অনেক্ষণ ধরে পরীক্ষা করলেন মেছকন্দরের পা'টা। মাঝে মাঝেই সরু হয়ে যাচ্ছে তাঁর চোখ, কুঁচকে যাচ্ছে ভুরুজোড়া। মুখে বারবারই বলছেন, 'ইয়া আল্লাহ... আপনি রহেম করুন...'। হাকিমি বিদ্যা সে তাঁর বংশের ধারায় পেয়েছে। আড়াইশো প্রকারের গাছগাছালির থেকে নানান রকমের ওষুধ তিনি প্রস্তুত করতে পারেন। হাজার রকমের ব্যাধির ওপর সেসব কাজ করে। তিনিই গরিবের ভরসা। কিন্তু আজ যে রোগ তিনি দেখছেন সে রোগ আগে কারও হয়েছে বলে দেখেননি। অবশেষে তিনি মুখ তুলে তাকালেন মেছকন্দরের দিকে। বললেন, 'মিঞা! মনে লয় কাঁটা ফুঁইট্যা পায়ে পচন ধরছে। আমার হাকিমি বিদ্যা ডাহা ফেল। একবার বড়ো ডাক্তারের কাছে যাও।'

দেরি করল না মেছকন্দর। সে একটা রিকশা ডেকে উঠে বসল তাতে। সঙ্গে তার স্ত্রী। ধানমুন্ডির নামকরা ডাক্তার অনেক সময় নিয়ে পরীক্ষা করলেন মেছকন্দরের পা। তারপর বেশ চিন্তিত মুখে বললেন, 'দেখে মনে হচ্ছে গ্যাংরিন ধরে ফেলেছে। হাসপাতালে ভরতি হতে হবে।'

টাকাপয়সার অভাব নেই মেছকন্দরের। সে শুধু উপসম চায়। যন্ত্রণাটা যেন ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এতক্ষণ একটা পা অবশ ছিল এবার দুটো পা'ই অবশ হয়ে গেছে। মাথা ঝিমঝিম করছে তার। শরীর আস্তে আস্তে বল হারাচ্ছে। সে ভরতি হয়ে গেল হাসপাতালে। সেখানের ডাক্তারেরা দেখে সিদ্ধান্ত নিলেন আপাতত ব্যথার ওষুধ চলবে। পরেরদিন পা অপারেশন করতে হবে। অপারেশনের কথা শুনে কিছুটা চিন্তায় পড়ল মেছকন্দর। তবে তা ছাড়া নাকি গতি নেই কোনো। বেলার দিকে একটু একটু করে অচেতন হয়ে এল মেছকন্দরের শরীর। ধূম জ্বর এসেছে তার। পা ফুলে ঢোল হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। বেশ কয়েকবার ডাক্তার পরীক্ষে করে গেল তাকে। জ্বরের ওষুধ দেওয়া হল, জ্বর কমানোর জন্য। কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হল না।

দুপুর গড়িয়ে তখন নেমে আসছে বিকেল। হঠাৎ করেই মেছকন্দরের শরীরটা একেবারে ঝরঝরে হয়ে উঠল। যেন কোনও ব্যথাই নেই তার শরীরে। চোখ খুলল সে, জ্বর নেই একটুও। পায়ের ফোলাগুলোও কমে গেছে কোনো এক দৈবের আদেশে। চোখ খুলেই অবাক হয়ে গেল সে। হাসপাতালের এই ঘরটা এত অন্ধকার কেন! পাশের বেডের রুগীদেরও দেখা যাচ্ছে না এতই অন্ধকার! মেছকন্দর ওঠার চেষ্টা করল। বুকের ওপর চাপ লাগছে ওর। যেন কেউ চেপে ধরে রেখেছে ওকে। পানির পিপাসা লেগেছে, পানি না খেলে মরে যাবে মনে হচ্ছে মেছকন্দরের।

কিন্তু ওরা কারা! অন্ধকারের মধ্যেও কাদের যেন দেখা যাচ্ছে। তারা মেছকন্দরের চারিদিকে গোল হয়ে ঘুরছে। সাক্ষাৎ ইবলিসও অমন ভয়ংকর দেখতে হয় না। কালো ছায়ামূর্তির মতো মানুষগুলোর ধকধক করে চোখ জ্বলছে। পেট অবধি নেমে এসেছে তাদের ফ্যাকাসে বিবর্ণ জিভ। এবার নিজের বুকের দিকে তাকাল মেছকন্দর। একটা ফুটফুটে বাচ্চা বসে আছে ওর বুকের ওপর। এতটুকু বাচ্চাকে কে ওর বুকের ওপর বসিয়ে দিয়ে গেল! বাচ্চাটার চোখের ভাষায় কেমন হাসি হাসি ভাব।

হতচকিত মেছকন্দর নিজের মনেই প্রশ্ন করে উঠল, 'এই পিচ্ছিডা কার গো?'

বাচ্চাটা যেন আস্তে আস্তে চেপে বসতে লাগল মেছকন্দরের বুকের ওপর। কালো ছায়ামূর্তিগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে লাগল ওর দিকে। ওদের বৃত্ত ছোট হয়ে আসছে। গুনগুন করে সুর তুলে ওরা কিছু একটা বলছে। ওদের ফ্যাকাসে বর্ণহীন জিভ স্পর্শ করতে লাগল মেছকন্দরের শরীর। শরীরের যেখানেই সেই জিভের ছোঁয়া লাগছে পুড়ে যাচ্ছে যেন জায়গাটা! চিৎকার করে উঠল মেছকন্দর, 'আমারে এরা মাইরা ফ্যালাবে...' কেউ শুনতে পেল না সেই শব্দ।

বাচ্ছাটা একটা কামড় বসাল মেছকন্দরের বুকে। তারপর শোঁ...শোঁ... শব্দ করে শুষে নিতে লাগল ওর রক্ত। বেশ কিছুক্ষণ ছটফট করতে লাগল ও। শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করল বাচ্চাটাকে। কিন্তু পারল না। ওইটুকু বাচ্চার শরীরে যেন ইবলিসের শক্তি! জোরে জোরে হাত-পা নাড়তে নাড়তে একসময় নিথর হয়ে গেল মেছকন্দরের শরীরটা।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%