মনীষ মুখোপাধ্যায়
শনিবার...
উত্তমার মন খারাপ হয়ে গেল। সে আজ সকালে উঠেই নানান পরিকল্পনা করছিল। আজ অলকেন্দু তাকে দেখা করতে বলেছিল তার বাড়িতে। কিন্তু সকালেই বাবা জানিয়ে দিয়েছেন, আজ কোথাও বেরনো যাবে না। আজ রাতেই তাদের বাড়ি ছেড়ে বেরোতে হবে। একটা দিন অপেক্ষা করলে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হত, সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না। অন্তত সে নিজের মুখে অলকেন্দুকে বলে যেতে পারত তাদের চলে যাওয়ার কথা। সে এই সপ্তাহের শুরুতে অনুমানই করতে পারেনি সপ্তাহটা শেষ হবে এইভাবে। তাকে কেউ কিছুই বলে না। না হলে কবেই দেখা করতে চলে যেতে পারত। নাও যদি দেখা করতে যেত, অন্তত একটা চিঠি তো পাঠাতে পারত সুলতানার হাত দিয়ে। তার শুধু কান্না পাচ্ছে, সে বউদির কাঁধে মাথা রেখে কেঁদেই চলেছে অবিরত।
করুণা অনেকবার উত্তমার কান্না থামানোর চেষ্টা করেছে কিন্তু লাভ হয়নি কিছুই। তাও একটা ফন্দি আঁটল করুণা। সে উত্তমাকে চমকে দিয়ে বলে উঠল, 'বাজার যাওনের নাম করে চল বার হই ঠাকুরঝি। তারপর তুমি মাস্টারের বাড়ি যাবা, আর আমি বাজারে প্রয়োজনীয় কয়ডা জিনিস কিন্যা নিব নে।' করুণা স্বামীর সঙ্গে কথা বলার সময় প্রবল চেষ্টা করে পরিষ্কার বাংলায় কথা বলতে অন্য সময় সে দেশীয় ভাষায় কথা বলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
প্রস্তাব শুনে লাফিয়ে উঠল উত্তমা। বউদিকে তার খুব ভালো লাগে। বউদি দাদার মতো শিক্ষিত না হলেও চমৎকার একজন মহিলা। মাথায় অনেক বুদ্ধি আছে। সাহসও আছে বেশ। বুড়িগঙ্গার পাড়ে শিয়ালের গর্ত দেখে সে ভয় পেলেও বউদি পায় না। উত্তমা হাতটা চেপে ধরল করুণার। 'বাবা জানতে পারলে!'
'জানতে পারব না। আমি সকালেই কইছি আমার কিছু জিনিস কেনোনের আছে।' একটা দুষ্টু হাসি ঝিলিক মারছে করুণার ঠোঁটের কোণে।
'ওহ বউদি ইউ আর গ্রেট!' উত্তমা আনন্দের চোটে জড়িয়ে ধরল বউদিকে।
শ্রীকান্ত সাহেব বৈঠকখানা ঘরে বসে আলবোলার নলে মন দিয়ে টান দিচ্ছিলেন। এইসব বড়লোকি শখ আজই তিনি মিটিয়ে নিতে চান। একেবারে শূন্য অবস্থা থেকে তাঁর দাদা আর তিনি আজ এই জায়গায় এসেছেন। এই বয়সে এসে যখন টাকার অভাব নেই তখন এসেছে এইসব উটকো ঝামেলা। করুণা মাথায় ঘোমটা দিয়ে তাঁর সামনে এসে দাঁড়াল। তিনি মুখ তুলে সেই দিকে চাইলেন একবার। 'কিছু বলবা বউমা?' জিগ্যেস করলেন নিচু স্বরে।
'বাবা! আপনারে কইছিলাম না, একটু বাজার যাওনের আছে।' ছোট্ট কথায় কাজ সারল করুণা।
'একা যাইয়ো না, পথঘাট খারাপ!'
'না, ঠাকুরঝি সঙ্গে যাবে কইছে।'
'ক্যান শামু বাড়িতে নাই?' একটু চিন্তিত দেখাল শ্রীকান্ত সাহেবকে।
'নাহ! সে কাকভোরে বার হইছে। কইছে বারোটা বাজোনের আগেই আইস্যা পড়বে।'
'আচ্ছা সাবধানে যাইও।' অনিচ্ছা সত্ত্বেও মত দিলেন যেন শ্রীকান্ত সামন্ত। এই কঠিন সময় দুজন মেয়ে মানুষ একা রাস্তায় বেরবে, এটা একটু চিন্তারই বিষয়।
শীত শীত ভাবটা এখনও বেশ বজায় রয়েছে বাতাসে। শীত শেষ হয়ে আসার পালা যদিও। এখন সকালের দিকে একটা পাতলা চাদর গায়ে দিয়ে শুলেই চলে। ফেব্রুয়ারি মাস শেষ হতে চলল। গতকালের ওই এক পসলা বৃষ্টিটাই বোধহয় শীতকে আবার যাওয়ার আগে ডেকে আনার কারণ। বউদি আর ননদ একটা হালকা চাদর জড়িয়ে এগিয়ে চলল বক্সিবাজারের দিকে। একটা রিকশা নিলে ভালো হত, কিন্তু তারা সেটা নেয়নি। এই অঞ্চলের প্রত্যেকটা রিকশাওয়ালা শ্রীকান্তকে শুধু চেনেই না, বরং বেশ খাতির যত্নও করে। দিল দরিয়া মানুষ হবার কারণে তিনি বাজার ফেরত কখনো রিকশাওয়ালাকে ভাড়া জিগ্যেস করেন না। যা পকেটে থাকে দিয়ে দেন। এইটাই বোধহয় অতিরিক্ত খাতিরের কারণ! যদি শ্রীকান্তকে তারা বলে দেয়, তাঁর মেয়ে প্রফেসরের বাসায় গেছিল। সেই ভয়ে ওরা হেঁটেই চলল।
বাজারের কাছে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল করুণা। গলার স্বর বেশ নীচে নামিয়ে এনে উত্তমার উদ্দেশে বলল, 'যাও ঠাকুরঝি মাস্টারের বাসায় হইয়া আসো। আমি এহানে কিছুক্ষণ আছি। আধা ঘণ্টায় ফিরার চেষ্টা কইরো।'
উত্তমার মুখটা আনন্দে ঝলমল করে উঠল। সে জানে না আবার এখানে ফেরা হবে কিনা! তাই শেষবারের মতো একবার দেখা করতেই হবে। চিঠিতে যোগাযোগ রাখার কথা বলে আসতে হবে প্রফেসরকে। সময় হলে সে যখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যাবে, তখন বাবার মত না থাকলেও তাদের বিয়ে করতে সমস্যা হবে না।
প্রফেসর অলকেন্দু দাসের বাড়ি বক্সিবাজার বাসস্টপ থেকে পাঁচ মিনিটের রাস্তা। উত্তমা সেদিকে চলল। বক্সিবাজারের মোড় থেকে বেশ কয়েকটা আর্মির ট্রাক পার হল। রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করল উত্তমা। পাকিস্তানি আর্মি ট্রাকের চলন খানিকটা হাতির মতো। ওরা যখন পথ দিয়ে যাওয়া আসা করে, কেউ পথে দাঁড়াবার সাহস পায় না। মুক্তিফৌজের ছেলেরা মাঝে মাঝে ওদের আক্রমণ করার চেষ্টা করে ঠিকই। তবে এখনও যথেষ্ট সঙ্ঘবদ্ধতা দরকার ওদের চাল চলনে। সেটা হলেই স্বাধীন বাংলাদেশ শীঘ্রই গড়ে উঠবে। উত্তমা মনে মনে চায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা। শেখ সাহেবের আদর্শ ছড়িয়ে পড়ুক দিকে দিকে।
এসব কথা ভাবতে ভাবতে কখন যেন সে এসে দাঁড়িয়েছে অলকেন্দুর বাড়ির সামনে। রাস্তাটুকু কেমন যেন সে ঘোরের মধ্যেই হেঁটে এসেছে। দরজার কাছটায় পৌঁছে মন খারাপ হয়ে গেল উত্তমার। দরজায় ঝুলছে মস্ত বড়ো একটা তালা। অলকেন্দু কাছাকাছি কোথাও বেরলে ছোট্ট একটা তালা লাগিয়ে রেখে যায় দরজায়, আর বড়ো তালা লাগায় যখন দূরে কোথাও যায়। এর মানে সে দূরে কোথাও গেছে। মনে মনে ভাবল উত্তমা। দূরে কোথাও গেলে তাড়াতাড়ি ফেরার সম্ভাবনা খুব কম। তাও মিনিট কুড়ি সে দাঁড়িয়েই রইল দরজার কাছে। ওদিকে বউদি তাকে আধঘণ্টার মধ্যে ফিরতে বলেছে। আরও পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করার পর উত্তমার মনে হল শুধু শুধুই সে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এখন অলকেন্দুর ফেরার কোনোই সম্ভাবনা নেই। অগত্যা ব্যাগ থেকে একটা খাতা বার করে তার পাতা ছিঁড়ল ও। তাতে লিখল,
প্রফেসর সাহেব
এখানে থাকা আর ঠিক মনে করছেন না বাবা। আমরা ঢাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছি। কলকাতায় আমার জ্যাঠামশাইয়ের বাসা, আপাতত ওখানেই উঠব আমরা। তারপর একটা ব্যবস্থা করা যাবে। ওখানেই বাদবাকি পড়াশোনা শেষ করার কথা দাদা বলেছে। আমি কলকাতা পৌঁছে জ্যাঠার বাসা থেকে আপনাকে চিঠি লিখবো। ঈশ্বরের ইচ্ছা হলে আমাদের আবার দেখা হবে। আমি আজ সন্ধ্যায় আর আসতে পারছি না। বাবার মানা আছে। তাই এই সকালেই এসেছিলাম, আপনার দেখা পেলাম না। আমি সত্যিই অভাগী। যাওয়ার আগে শেষবার দেখা হল না। যাইহোক, আমি কলকাতা গিয়েই চিঠি দেব। চিঠির উত্তরের আশায় থাকবো।
ইতি
উত্তমা
চিঠি লেখা শেষ করে উত্তমা বাড়িওলাদের ঘরের কড়া নাড়লো। এই বাড়িটা হল রেহান সাহেবের। তিনিও ইউনিভার্সিটির প্রফেসর। তাঁর পড়াবার বিষয় হল বাংলা সাহিত্য। কড়া নাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই দরজা খুলে বেরলেন রেহান সাহেবের স্ত্রী কাজল আপা। মোটাসোটা চেহারার এই ভদ্রমহিলা বেশ ভালো। উত্তমা যখন আগে এ বাড়িতে এসেছে ওকে অনেক খাতির যত্ন করেছেন কাজল।
'আরে উত্তমা! তুমি কতক্ষণ?' বিস্মিত দৃষ্টি মেলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন কাজল ওর দিকে।
'প্রায় আধঘণ্টার কাছাকাছি নীচে অপেক্ষা করছিলাম, কিন্তু প্রফেসর সাহেব ফিরলেন না দেখে...'
উত্তমা কথা শেষ করার আগেই কাজল বলে উঠলেন, 'সে তো গেছে ধানমুন্ডি। তোমার দুলাভাইও সঙ্গে গেছেন। ওদের ফিরতে ফিরতে বৈকাল। তা তুমি এতক্ষণ নীচে খাঁড়ায়াই বা ছিলে কেন! আপার কাছে কি আসতে নাই?'
হাসল উত্তমা। 'আপার কাছে অবশ্যই আসতে আছে। তবে আজ একটু তাড়া ছিল। ভাবলাম তার সঙ্গে দেখা করেই চলে যাব। ওদিকে কেমন করে আধঘণ্টা পার হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না!'
'আরে! বাইরে খাঁড়ায়া না থেকে ঘরে আসো।' কাজল বিচলিত হয়ে উঠলেন।
উত্তমা ছোট্ট চিঠিটা কাজলের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, 'না আপা আজ আর বসব না। এই চিঠিটা সে এলে দিয়ে দেবেন। আজ আমরা ইন্ডিয়া চলে যাচ্ছি।'
'ইন্ডিয়া চলে যাচ্ছ!' কাজলের চোখেমুখে ফুটে উঠেছে বিস্ময়ের ভাব।
'হ্যাঁ আপা।' কথা শেষ করেই দ্রুত ঘড়ি দেখল উত্তমা। আধঘণ্টা হয়ে গেছে। বউদি একা দাঁড়িয়ে থাকবে বাজারে। উত্তমা আসার সময় অনেকগুলো আর্মি ট্রাককে বাজারের সামনে দেখেছে। তার এবার একটু চিন্তা হল বউদির জন্য।
কাজলকে বিস্মিত অবস্থায় রেখেই সে সিঁড়ি দিয়ে হনহন করে নেমে এলো। তার চোখের কোনায় জল চিকচিক করছে। এই মানুষগুলোর আন্তরিকতা, অলকেন্দুর ভালোবাসা, বন্ধু, ইউনিভার্সিটি, সব ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে তাকে। আজই।
দ্রুত বাজারের কাছে পৌঁছে দেখল বউদি একটা গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে বউদির হাত ধরে টান দিল। করুণাও তাকে কিছু জিগ্যেস করতে পারল না। মেয়েটার চোখের কোণ অসম্ভব ফোলা। এতটা রাস্তা বোধহয় সে কাঁদতে কাঁদতে এসেছে।
করুণাও তার স্বামীকে ভালোবাসে। করুণা জানে মনের মানুষকে কাছে না পেলেই মানুষ অমন কাঁদে। হয়তো মেয়েটা আজ দেখাই পায়নি মাস্টারের, অনুমান করল করুণা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন