১৩

মনীষ মুখোপাধ্যায়

এরশাদের আজ খুব মজা। আর্মি ব্যারাকের থেকে মাংসের অর্ডার এসেছে ওর কাছে। বেশ কিছু টাকা পাওয়া যাবে আজকে। একের পর এক মুরগি সে হালাল করে চলেছে। পায়ের তলায় চেপে ধরে মুরগিগুলোর ছটফটানি দেখে তার ভারী আনন্দ হচ্ছে। এরপরেই ধারালো চপারটা দিয়ে দক্ষ হাতে সে কেটে ফেলছে প্রাণীগুলোর গলা। পচাত করে কিছুটা রক্ত বেরিয়ে ছিটছে তার পায়ে লাগছিল। এতে যেন আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছিল তার। আজ সন্ধেয় মেছকন্দর মিঞা তাকে দোকানে দেখা করতে বলেছে। সামন্তদের বাড়ির অংশের ভাগ বাঁটোয়ারা হবে। গতকাল সকালের পরে যদিও একবারের জন্যও দেখা হয়নি মেছকন্দর মিঞার সঙ্গে। লোকটা ঘুঘু ব্যবসায়ী, এদিক ওদিক কিছু করলে ওর গলাটা নামাতেও বেশি সময় নেবে না এরশাদ। মনে মনে কথাটা ভাবতে ভাবতেই হাসি পেল এরশাদের। বিকেল হয়ে আসছে। হাতের কাজ তাড়াতাড়ি সেরে মাংসগুলো পৌঁছে দিতে হবে ব্যারাকে। ব্যারাক বলতে তো ওই স্কুলবাড়ি! তারপরই এরশাদ দেখা করতে যাবে মেছকন্দরের সঙ্গে।

দূর থেকে এরশাদকে দেখছিল অলকেন্দু। আজ বিকেলের মধ্যেই একটা শয়তানের শেষ হবে, মনে মনে ভাবছিল সে। ওর মাথায় চলছে একটা অন্য চিন্তা। কীভাবে এই মাংসওয়ালার রক্ত ঝরানো যায়! হঠাৎ মাথায় খেলে গেল বুদ্ধিটা। অলকেন্দু আজ সাইকেলে চড়ে এসেছে বাজারে। তিনজনের ওপরেই কয়েকদিন যাবৎ নজর রাখছে সে। গতকাল সন্ধেবেলা যেমন মেছকন্দরের ক্ষেত্রে একটা সুযোগ পেয়েছিল সে, আজও নিশ্চয়ই একটা সুযোগ পাবে। গতকালকের ব্যাপারটা যদিও একেবারে পরিকল্পনা মাফিকই হয়েছিল। দরজা দিয়ে ঢুকতে গিয়ে যেকোনো একটা কাঁটায় ওই লোকটা পা দিতই। তবে আজ এই মাংসওয়ালার ক্ষেত্রে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। তবে যে বুদ্ধিটা এখনই মাথায় এল সেটায় কাজ হতে পারে।

সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিল অলকেন্দু। বেশ জোরে চালাতে শুরু করল সাইকেলটা। ও দেখে নিয়েছে এরশাদের দোকানের আগেই দাঁড়িয়ে আছে একটা বুড়োলোক। তারদিকে বেশ গতি নিয়ে এগিয়ে গেল ও। আর একটু হলেই ধাক্কা লাগবে। ঠিক সেই মুহূর্তে টাল সামলাতে গিয়ে একেবারে এরশাদের দোকানের সামনে হুড়মুড় করে সাইকেল নিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল অলকেন্দু। ঘটনাটা এতটাই দ্রুত ঘটল, যে ঘাবড়ে গিয়ে বাঁ-হাতের বুড়ো আঙুলে সামনের অংশে বেখেয়ালে চপার চালিয়ে বসল এরশাদ। জায়গাটা থেকে রক্ত বেরোতে লাগল অঝোরে। এরশাদের মতো কঠিন লোক নিজের রক্ত দেখে সামান্য মুখ বিকৃত করল। যেন কিছুই হয়নি। তারপর অলকেন্দুর উদ্দেশে গলা চড়িয়ে বলল, 'চক্ষের মাথা খাইছেন নি?'

কাদামাখা গায়ে উঠে দাঁড়াল অলকেন্দু। এমনভাবে পড়ে যাওয়ার কারণে তার নিজের কনুইয়ের কাছটাও ছড়ে গেছে। সে এরশাদের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, 'আসলে এই দাদুরে বাঁচাইতে গিয়া। কিছু মনে করবেন না।' তারপর এরশাদের হাতের দিকে তাকিয়ে আক্ষেপের সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল, 'ইসস! দেখেন দেখি। আমার কারণে আপনার হাতটা। দাঁড়ান...' কথা শেষ করেই একটা রুমাল বের করে সে এরশাদের ক্ষতটায় বেঁধে দিল। তারপর ক্ষমার সুরে বলল, 'চলেন ভাই ডাক্তারের কাছে যাই।'

'আপনাগো মতো আমাগো শইল মোমের লয়। রক্ত আপনিই বন্ধ হইয়া যাইব।' বিরক্তি নিয়ে কথাটা বলল এরশাদ।

এরশাদ দেখতেও পেল না অলকেন্দু একটা ছোট্ট কাপড়ে ততক্ষণে ওর আঙুল থেকে গড়িয়ে পড়া রক্তের কিছুটা মুছে নিয়ে নিজের পকেটে ভরেছে। সে বুদ্ধি করে এরশাদকে বলল, 'খুব ভুল হয়ে গেছে আমায় মাফ করে দ্যান।' মাথা নিচু করে দাঁড়াল অলকেন্দু। একটা তাচ্ছিল্যের শব্দ করে হাত নাড়ল এরশাদ। অলকেন্দু সাইকেলটা মাটি থেকে তোলার অছিলায় এরশাদের জুতোর তলা থেকে কিছুটা কাদা নিয়ে আরেকটা কাপড়ের মধ্যে ভরে নিল। ব্যস! কাজ হয়ে গেছে।

আজ আর শ্রীকান্ত সামন্তকে সঙ্গে নেয়নি অলকেন্দু। সে একাই এসেছে সিদ্ধেশ্বরীর কাছে ওই বাড়িটাতে। কিন্তু একী! আজ কালীপ্রসাদের ঘর বন্ধ কেন? বেশ কিছুক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করল সে। প্রায় ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করার পর অলকেন্দু দেখতে পেল কালীপ্রসাদকে। লোহার ভাঙা ফটকটা ঠেলে ঢুকছেন তিনি। কোলে জড়ানো কাপড়ের একটা পুঁটলি। আলোআঁধারিতে চোখ সয়ে আসতেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল অলকেন্দু। কালো কাপড়ের বাইরে কালীপ্রসাদের শরীরের যেটুকু অংশ দেখা যাচ্ছে, তাতে লেগে আছে চাপচাপ রক্ত। কোলের পুঁটলিটার সাদা কাপড়েও লেগে আছে রক্তের ছিটে।

দরজা খুলতে খুলতে অলকেন্দুর দিকে তাকালেন কালীপ্রসাদ। বাঁকা হাসি হাসলেন। কারোর প্রতি বিদ্রূপ ছুঁড়ে দিচ্ছে যেন সে হাসি। উনি বেশ আনন্দের সঙ্গেই বললেন, 'একটা কাজ হয়ে গেছে বুঝলে মাস্টার... বেটি আমার সব রক্ত খেয়ে সাফ করে দিয়েছে।'

'মানে?' অবাক চোখে তাকাল অলকেন্দু কালীপ্রসাদের দিকে।

'মানে তোমাকে জানতে হবে না। বরং তুমি কী কারণে এখানে এসেছ সেটা বলো।' দরজা খুলে ভেতরে ঢুলে গেলেন কালীপ্রসাদ কথা বলতে বলতে।

অলকেন্দুও তার পেছন পেছন ঢুকল ঘরের মধ্যে। এই ঘরটাকে ছেড়ে রাতের নিকষ ছায়া যেন নড়তে চায় না কোথাও। চির অন্ধকারের দেশ যেন এই ঘরটা। কাদের ফিসফিসানি কান পাতলেই শোনা যায়। ভারী হাওয়ায় যেন কারা স্পর্শ করতে চায় অলকেন্দুর শরীর।

অলকেন্দু দেখল ওই সাদা কাপড়ের পুঁটলিটা নিয়ে দোলনাটার কাছে থামলেন কালীপ্রসাদ। তারপর সেটা থেকে বের করে আনলেন ওই ছোট্ট শিশুটাকে। এই শিশুটা যেন কেমন অদ্ভুত! আজ নিয়ে এই তিনদিন হল সে এই শিশুটাকে দেখছে। কিন্তু একে সে কখনো কাঁদতে দেখেনি। শিশুটাকে দোলনায় রেখে একটা কাপড় দিয়ে তাকে পরিষ্কার করতে লাগলেন কালীপ্রসাদ। পরিষ্কার করতে করতেই রেকর্ডে সেই বিষাদের সুর বাজিয়ে দিলেন তিনি। বাচ্চাটা হাত-পা নেড়ে সেই সুরের মজা নিতে লাগল। যেন ওটা ওর মায়ের ঘুমপাড়ানি গান। একটা গামলায় বাচ্চাটার গা মোছানো জল নিংড়ে দিতে লাগলেন কালীপ্রসাদ। সেই জলটার দিকে তাকিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল অলকেন্দুর। রক্তে লাল হয়ে উঠেছে জলটা।

হঠাৎ ভারী গলার শব্দ পাওয়া গেল, 'আর বেশিক্ষণ এখানে থেকো না মাস্টার। বেটি আমার ঘুমোবে। অনেকদিন পর ও খেতে পেয়েছে। ওর আসল খাবার ও খেতে পেয়েছে...'

অলকেন্দু পকেট থেকে বের করল রক্ত লাগা কাপড়ের টুকরোটা আর সেই কাদা মাখা কাপড়টা। তারপর খুব যত্নের সঙ্গে জিনিস দুটো সে রাখল কালীপ্রসাদের টেবিলের ওপর। মাথা নিচু করে বলল, 'কালীদা! এটা এরশাদের... ' তারপর মাথা নিচু করেই সে বেরিয়ে এল ঘরের বাইরে।

সিদ্ধেশ্বরীর ফাঁকা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আজ গা'টা কেমন ছমছম করে উঠল অলকেন্দুর। মনে হল কারা যেন ওর সঙ্গে সঙ্গে চলছে। পায়ে পায়ে কারা যেন এগিয়ে আসছে ওর দিকে। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে রাস্তাঘাট। কিন্তু বারবার পেছন ঘুরেও কাউকে দেখতে পেল না সে। এই গরমেও আজ কেমন একটা শীতলতার ছোঁয়া লেগেছে। গাছে গাছে ঘষা লেগে কেমন যেন শব্দ হচ্ছে চারিদিকে। রাস্তার পাশে ঝোপেঝাড়ে কোথাও যেন একটা তক্ষক ডেকে চলেছে একভাবে টক্কো... টক্কো...। সেই শব্দ যেন বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিতে চায়। কালীপ্রসাদের গল্পের ডাইনিরাই যেন নেমে এসেছে এই ফাঁকা রাস্তায়!

দুহাত বুকের কাছে এনে চলতে লাগল অলকেন্দু, ওর ভীষণ শীত করছে। অথচ এখানে আসার সময় ভীষণ গরম লাগছিল। এইসব পিশাচবিদ্যা জানা লোকেদের সংস্পর্শে থাকলে মনে নানারকমের ভ্রম তৈরি হয়। তাই ব্যাপারটাকে আমল না দিয়ে এগোতে লাগল সে। কিন্তু বেশিদূর এগোতে পারল না অলকেন্দু। রাস্তার ওপর একটা বড়ো পাথরে পা আটকে হোঁচট খেয়ে পড়ল। ভীষণ চোট পেল ও। কবজিটা ব্যথায় আড়ষ্ট হয়ে গেল। পতনের সময় হাত দিয়ে নিজেকে বাঁচাতে চেষ্টা করেছিল অলকেন্দু। উঠে দাঁড়াল বহু কষ্টে। আর একটু এগিয়ে গেলেই রিকশা পেয়ে যাবে। এগোতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে হল ওকে। সামনের গাছতলাটায় কে যেন বসে আছে! তার সামনে হেঁটেচলে বেড়াচ্ছে একটা কিছু। দেখতে অনেকটা ছোটখাটো কুমিরের মতো!

চাঁদের আলোয় ভালো করে দেখার চেষ্টা করল অলকেন্দু সামনে ওটা কে বসে আছে! আর তার সামনেই বা কী হেঁটে বেড়াচ্ছে! চোখ সয়ে আসতেই আতঙ্কে চোখগুলো বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইল ওর। এটা তো গোসাপ! গাছতলায় যে বসে আছে তার হাতে ধরা একটা দড়ি। সেই দড়ির একটা প্রান্ত ছায়ামূর্তিটার হাতে ধরা আর অন্য প্রান্তটা দিয়ে গোসাপটার গলাটা ভালো করে বাঁধা।

'আপনি কে?' ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করল অলকেন্দু।

চাঁদের আলো পড়েছে গাছতলায় বসে থাকা ছায়ামূর্তির ওপর। এবার প্রায় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে সবকিছু। সেই ছায়ামূর্তির মুখটা দেখা গেল এবার। কপাল থেকে ঝুলে পড়েছে কয়েক থোকা সাদা চুল। মুখের মাংসগুলো ঝুলে নেমেছে, এই কারণে চোখনাক কিছুই আলাদা করে বোঝা যাচ্ছে না ওটার। বুকের কাছে বিরাট একটা ক্ষত। ছায়ামূর্তিটার হাতে ধরা একটা লাঠি। যেটার মাথায় রয়েছে একটা পাখির খুলি। জ্যোৎস্নায় দেখা যাচ্ছে খুলিটার একজোড়া জ্বলন্ত চোখ।

সে হিসহিসে স্বরে বলল, 'আমাদের বাচ্চাকে ও নিয়ে এসেছে... ওই শয়তানের বাচ্চা মানুষের রক্তের স্বাদ পেয়েছে... এবার কেউ বাঁচবে না... বাচ্চাটাকে মেরে ফ্যালো। মেরে ফ্যালো ওকে।'

ভয়ে সারা শরীর অসাড় হয়ে আসতে লাগল অলকেন্দুর। এই মূর্তিমান বিভীষিকা কে! কেনই বা তার সামনে এসে এইসব কথা বলছে! সে কোনও উত্তরই জানে না। ও আবার বহু কষ্টে বলল, 'আপনি কে? কেন আমায় এসব কথা বলছেন?'

বিকট হাসির শব্দ ভেসে আসতে লাগলো গাছতলা থেকে। সেই ছায়ামূর্তি কেটে কেটে উচ্চারণ করল, 'আমি আহুরা... ডাইনিদের মধ্যে আমি উগ্রা নামে পরিচিত। ওই নামটাই আমার গুরদেব আমাকে দিয়েছিলেন।' গাছতলা থেকে উঠে দাঁড়াল সে। এক পা এক পা করে এগিয়ে আসতে লাগল অলকেন্দুর দিকে। ভয়ে আর আতঙ্কে নিজের চোখে হাত চাপা দিল অলকেন্দু। চোখ চাপা দেওয়ার আগের মুহূর্তে ও দেখতে পেল পৃথিবীর সমস্ত খিদে জিভের ডগায় নিয়ে সাপটা এগিয়ে আসছে ওরদিকে। চিৎকার করে উঠল ও। ফাঁকা রাস্তায় ওর স্বর প্রতিধ্বনি তুলে আবার ওর কাছেই ফিরে এল। সেই শব্দেই ও চোখ খুলে তাকাল আবার। নাহ, সামনে কেউ নেই! গায়ে প্রবল জ্বর নিয়ে সে রাতে বাড়ি ফিরল অলকেন্দু। যাকে একটু আগে সে দেখল, তার কথা সে কোথাও শুনেছে বলে মনে হল। খুব বেশি সময় লাগল না ওর উত্তর খুঁজে পেতে। এইরকম একটা ডাইনির কথা দিন কয়েক আগেই সে শুনেছে কালীপ্রসাদের মুখে। হ্যাঁ তো! তার নামও তো উগ্রাই ছিল!

ওর অমন চেহারা দেখে আঁতকে উঠলেন শ্রীকান্ত। খুব সাবধানে শুয়ে দিলেন ওকে খাটের ওপর। জ্বরে বেহুঁশ হয়ে পড়ল অলকেন্দু একটা সময়। সারারাত জলপট্টি দিতে লাগলেন শ্রীকান্ত ওর মাথার কাছে বসে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%