মনীষ মুখোপাধ্যায়

'কোন রাস্তা ধরবা! ও আজিজ মিঞা?' একটা ভ্যানের পেছনে ঠাসাঠাসি করে বসে আছেন শ্রীকান্ত সামন্ত। তিনি গলা তুলে প্রশ্নটা করলেন।

শাম্ব, করুণা, উত্তমা আর সামন্ত সাহেব একটা ভ্যানে কোনওমতে বসতে পেরেছেন। ভ্যান চালকের পাশে পা ঝুলিয়ে বসে আছে আজিজ। সে চালককে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে। রাস্তাঘাট সন্ধের পর ভীষণ অন্ধকার হয়েগেছে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ে চলেছে একটানা। তবে এতে গা ভেজে না। নিম্নচাপ এখন অনেকটা দুর্বল হয়ে এসেছে। রাস্তার পাশে নানা পোকামাকড় আর ঝিঁঝি পোকা ডেকে চলেছে একযোগে। বাতাসে একটা শীত শীত ভাব।

'আস্তে কথা কয়েন কত্তা...' ফিসফিস করে বলল আজিজ।

কথাটা শুনে বুকের কাছটা দপ করে উঠল শ্রীকান্ত সাহেবের। তাঁর কোমরের কাছে গামছায় বাঁধা প্রায় পঞ্চাশ হাজার মতো টাকা, বুকের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন রাধা-গোবিন্দের মূর্তিযুগল। সেই যুগলকে মুড়েছেন একটা সাদা কাপড়ে। কাঁধের ছোট্ট ব্যাগে নিয়েছেন সামান্য কটা জামাকাপড়। আজিজের সঙ্গে কথা হয়েছে, নৌকোয় ওঠার আগে হাত বদল করে দেবেন বাড়ির কাগজখানা।

পাহারাগাড়ি চলে যাওয়ার পরে একেবারে ঠিক সময়ে তাদের দরজায় এসে দস্তক দিয়েছিল আজিজ। তাঁরা এক এক করে বেরিয়ে এসেছিলেন। উত্তমা আর করুণা মাথায় ঘোমটা দিয়ে রয়েছে। শাম্বকেও কিছুটা চিন্তিত দেখাচ্ছে।

আজিজ আবার ফিসফিস করেই বলল, 'গাবতলি দিয়া যাব। ওখানে গার্ড ফিট কইরা রাখছি। কুনো চিন্তা কইরেন না। আজিজ যতক্ষণ আছে ততক্ষণ চিন্তার কুনো কারণ নাই।'

এবার যেন একটু নিশ্চিন্ত হলেন সামন্ত সাহেব। শীতের কারণে একটা হালকা চাদর তিনি গায়ে জড়িয়ে নিলেন। বৃষ্টিপাতের কারণে তাঁর মাথায়ও একটা গামছা বাঁধা আছে ঘোমটার মতো করে। আজ যেন কিছুতেই শীত মানছে না। অতিরিক্ত চিন্তার কারণে বা কোনও কারণে ভয় পেলে মানুষের শীত শীত ভাব হয়। সেইরকম কিছুই হয়তো এই শীতের কারণ, মনে মনে ভাবলেন শ্রীকান্ত। নদীর ভেজা বাতাস এসে যেন শীতটা কিছুটা বাড়িয়ে দিল তাঁর। উত্তমার জন্মের পর স্ত্রী মোক্ষদা ওঁকে ছেড়ে চলে গেছিলেন। ছেলে শাম্বর তখন মাত্র ছ'বছর বয়স। তিনি একাই মানুষ করেছেন ছেলে মেয়েকে। ব্যবসা সামলেছেন একাই। এই দেশ তাঁকে অনেক কিছু দিয়েছে। বাপ ঠাকুরদার ভিটে ছেড়ে চলে যেতে হবে এ তিনি স্বপ্নেও কল্পনা করেন নি। কী দিন এলো! একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন শ্রীকান্ত।

ভ্যানটা যতই বুড়িগঙ্গার দিকে এগিয়ে চলেছে কেমন যেন অদ্ভুত একটা নিস্তব্ধতা টের পাওয়া যাচ্ছে। বড়ো বড়ো গাছের ডালে অদ্ভুত স্বরে অচেনা পাখিরা ডেকে উঠছে। সে শব্দ অনেকটা বুড়ো মানুষের কাশির মতো। গলার কাছে শ্বাস আটকে গেলে যেমন ফ্যাসফ্যাসে খসখসে শব্দ বের হয়, এই পাখিদের ডাকও অবিকল সেইরকম। ওই পাখির ডাক, আর দূরে কোনও বাগানে খাবারের খোঁজে বেরিয়ে পড়া শেয়ালদের সমবেত চিৎকার ছাড়া কোনও শব্দ নেই চারিদিকে। প্রকৃতি যেন আরও ঘন কালো অন্ধকারে ঢেকে নিচ্ছে নিজেকে। আকাশের রং রক্তের মতো লাল হয়ে উঠেছে। হঠাৎ প্রবল বৃষ্টি এসে পড়তে পারে।

শ্রীকান্ত অনুভব করলেন হাতে কাপড়ে প্যাঁচানো রাধা-গোবিন্দের মূর্তিযুগল হঠাৎ কেমন যেন অস্বাভাবিক গরম হতে উঠেছে। কাপড় ভেদ করে সেই উত্তাপ যেন হাতের পাতা পুড়িয়ে দিতে চাইছে। তিনি তাঁর ঠাকুরদার কাছে একটা গল্প শুনেছিলেন অনেক ছোটবেলায়। ঠাকুরদা নাকি এই মূর্তিযুগল খুঁজে পেয়েছিলেন গভীর জঙ্গলের ভেতর। তখন তাঁদের অবস্থা খুব খারাপ। ঠাকুরদার বাবা তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন অর্থাভাবে। তিনি ঘুরতে ঘুরতে এক জঙ্গলে গিয়ে পৌঁছলেন। রাত হয়ে আসছিল, তিনি কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। হাঁটতে হাঁটতে একটা মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ চোখে পড়ল তাঁর। রাতটা সেখানেই কাটাবেন বলে মন্দিরের ভেতর ঢুকলেন। অন্ধকারে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলেন না তিনি। আগুন জ্বালতেই চোখে পড়ল এই অসাধরণ সুন্দর মূর্তিযুগল। কিন্তু কাছে যেতেই ভয়ে সারা শরীর অসাড় হয়ে এল তাঁর। এই মূর্তিযুগলকে পাহারা দিচ্ছিলো একজোড়া চন্দ্রবোড়া সাপ। বেশ কিছুক্ষণ সেইদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি। নড়তেও যেন সাহস পেলেন না। সাপদুটো নিজে থেকে সরে গেল একসময়।

দেবদ্বিজে ভক্তি ছিল ঠাকুরদার। তিনি দেখলেন এই এতদূরে কেউ এসে মূর্তির সেবা যত্ন করেন না। আরও আশ্চর্য হলেন মূর্তিটার কাছে গিয়ে। তিনি দেখলেন মূর্তির গলায় জ্বলজ্বল করছে বেশ দামি একটা রত্ন। মানুষের পদধূলি এখানে পড়লে মন্দিরের এই ভগ্নপ্রায় অবস্থা হয় না। চোর ডাকাতও যদি এ তল্লাটে থাকত তাহলে এই রত্ন অক্ষত থাকত না। মূর্তির গায়ে হাত দিয়ে দেখলেন, সেটা অসম্ভব উত্তপ্ত। তিনি সে যাত্রা মূর্তির কথা ভুলে মেঝেতে চাদর বিছিয়ে শুয়ে পড়লেন। সে রাতে তিনি স্বপ্নাদেশ পেলেন। একটা বাচ্চা ছেলে তাঁকে বলছে, 'আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলো। আমি খেতে পড়তে পারি না। তোমাদের আপদে বিপদে আমি রক্ষা করব।'

সকাল হতেই ঠাকুরদা সেই মূর্তির গায়ে হাত দিলেন। ওটা শীতল হয়ে উঠেছে। ঠাকুরদা ওটাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলেন। ফিরে আসার কয়েক দিনের মধ্যেই ফসলের ব্যবসায় বেশ লাভ হল। গরিব পরিবারটা আস্তে আস্তে স্বচ্ছল হয়ে উঠল।

এখন মূর্তিযুগলকে উত্তপ্ত হয়ে উঠতে দেখে সেইসব কথা মনে পড়ে গেল শ্রীকান্তের। মনটা কেমন ছটফট করে উঠল তাঁর। তাহলে কি কোনও বিপদ এগিয়ে আসছে! হাতের পাতায় এত গরম লাগছে কেন!

হঠাৎ ভ্যানওয়ালা দাঁড়িয়ে পড়ল একটা জংলা মতো জায়গার পাশ ঘেঁষে। দূরে জলের শব্দ শোনা যাচ্ছে। অন্ধকারে কিছু বোঝা না গেলেও, এটুকু বোঝা যাচ্ছে সামনেই কোথাও নদী আছে।

'আমরা কি আয়্যা পড়ছি?' ফিসফিস করে শ্রীকান্ত সামন্ত জিগ্যেস করলেন আজিজকে। আজিজ একটা আঙুল নিয়ে শ্রীকান্ত সামন্তের ঠোঁটে ছোঁয়ালো। যার অর্থ হল, কথা বলা বারণ। এই লোকটার কাজকর্ম কিছুই বুঝতে পারছেন না শ্রীকান্ত। প্রথমে লোকটা তাঁকে সাহেব সম্বোধন করেছিল, তারপর বাবু, আর আজ বলছে কর্তা! সপসপ শব্দ করে ডানায় বাতাস লাগিয়ে একটা বাদুড় উড়ে গেল ওদের মাথার ওপর দিয়ে। মূর্তিটাকে এখন আর ধরে রাখা যাচ্ছে না, ওটা এতটাই গরম হয়ে উঠেছে।

আজিজ অতি সন্তর্পণে গলা একেবারে খাঁদে নামিয়ে বলল, 'আমার লগে আয়েন আপনেরা। কুনো শব্দ কইরেন না।'

অন্ধকার হাতড়ে হাতড়ে চলতে লাগল ওরা। পায়ের শব্দও যাতে না হয় সেইদিকে লক্ষ রেখে এগোতে লাগল। পথটা বড্ড পেছল। বেশ কয়েকবার পা হড়কাতে হড়কাতে বেঁচে গেলেন শ্রীকান্ত। করুণা শাম্বর হাতটা ধরার চেষ্টা করল। নদীর পাড়ে একটা পেঁচা ডেকে উঠল বিশ্রী শব্দ করে।

হঠাৎ জ্বলে উঠল বেশ কয়েকটা আলো। কেউ একজন ঝাঁজের সঙ্গে নির্দেশ নিয়ে উঠল, 'ডোন্ট মুভ। যাহা হ্যায় ওহি রহিয়ে, নেহি তো গোলি চল যায়েগি...'

অতগুলো আলো একসঙ্গে জ্বলে ওঠার কারণে চোখ মেলে তাকাতে কষ্ট হচ্ছিলো শ্রীকান্ত সামন্তের। ভ্রূর কাছে একটা হাত এনে বহু কষ্টে তিনি দেখার চেষ্টা করলেন সামনে কী হচ্ছে! যা দেখলেন তাতে তাঁর বুক শুকিয়ে গেল। পাকিস্তানি আর্মির একটা জিপ দাঁড়িয়ে আছে নদীর পাড়ে। তার মাথা থেকে একটা শক্তিশালী আলো ফেলা হয়েছে ওদের দিকে। শাম্বকে একজন আর্মি পিছমোড়া করে ধরে রেখেছে। ঘটনাটা ঘটল সেকেন্ডের ভগ্নাংশে।

'ব্লাডি পিগস, হিন্দুস্তান ভাব রেখে থে! আভি আনজাম দেখো সব।' উনিফর্ম পরা একজন অফিসার এসে শাম্বর পেটে ভারী জুতো দিয়ে একটা লাথি মারলো।

'টেল মি দ্য নেমস অফ ইয়োর ফেলো ফ্রেন্ডস। আই ওয়ান্ট টু নো দ্য অল হোয়্যার অ্যাবাউটস অফ দেম।' কথা বলতে বলতে অফিসার শাম্বর চুলের মুঠিটা টেনে ধরল।

যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল শাম্ব, 'আই ডোন্ট নো। আই অ্যাম নট অ্যা মেম্বার অফ মুক্তি বাহিনী...'

কথা শেষ করার আগেই আরেকটা লাথি এসে পড়ল ওর পেটে। মুখ থেকে কিছুটা রক্ত বেরিয়ে এল ওর। কর্কশ স্বরে অফিসার বলে উঠলেন, 'ব্লাডি লায়ায় আই উইল শ্যুট ইউ...'

করুণা ছুটে গেল সেদিকে। কেঁদে জড়িয়ে ধরল অফিসারের পা। ওকে একটা লাথি মেরে তিন হাত দূরে ফেলে দিল সেই অফিসার। শ্রীকান্ত দৌড়ে যেতে গিয়ে এবার সত্যিই মুখ থুবড়ে পড়ে গেলেন পিছল কাদার মধ্যে। জায়গাটা বেশ অন্ধকার। পিছলের কারণে শাম্ব আর করুণার থেকে একটু পিছিয়েই ছিলেন শ্রীকান্ত। বাবার পিছন পিছন আসছিল উত্তমা।

শ্রীকান্তর হাত থেকে মূর্তিটা ছিটকে পড়ল বেশ কিছুটা দূরে। বাবাকে পড়ে যেতে দেখে সেদিকে এগিয়ে এলো উত্তমা। ভীষণ ব্যথা পেয়েছেন শ্রীকান্ত। বাঁ পা'টা কেমন যেন অসাড় হয়ে যাচ্ছে মনে হল তাঁর। তিনি মেয়ের উদ্দেশে বলে উঠলেন, 'রাধা-মাধবেরে তোল গিয়া আগে।'

উত্তমা সেখানে যাওয়ার আগেই শ্রীকান্ত দেখতে পেলেন, শাম্বকে ছেড়ে পিছিয়ে এসে মূর্তিটা হাতে তুলে নিয়েছে আজিজ। এতক্ষণ ও দলটার আগে ছিল। সমস্যা বুঝে ঠিক পিছিয়ে এসেছে সে। তার মুখে-চোখে খেলা করছে হায়নার হিংস্রতা। আজিজের পেছনে অন্ধকার ঠেলে আরও দুটো ছায়ামূর্তি উদয় হল। শ্রীকান্ত সামন্ত সারা শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা নিয়েও চিৎকার করে উঠলেন, 'শয়তান! তোগো আল্লার শাপ লাগবো...'

কারণ ততক্ষণে এরশাদ জড়িয়ে ধরেছে উত্তমাকে। আর তার পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে মেছকন্দর মিঞা। মেছকন্দর এবার অফিসারের উদ্দেশে চেঁচিয়ে উঠলেন, 'কাপ্তান ছ্যার ওই হারামিডাই হইল মুক্তি বাহিনীর গুপ্তচর।'

আজিজ চোখ টিপ মারল এরশাদের উদ্দেশে। 'এই ছেঁড়িডারে আর্মি দেখতে পায় নাই ওডার মুখ বাইন্দা লুকাইয়া ফ্যাল।'

শ্রীকান্ত সামন্ত চেষ্টা করলেন হামা দিয়ে কোনোরকমে একটু উঠতে। কিন্তু পারলেন না। কাদামাটিতে আবার হড়কে পড়ে গেলেন তিনি। বিড়বিড় করে শুধু বলে উঠলেন, 'তোদের সব দিব...তোরা সব নিস...আমার মাইয়াডারে ছাইড়া দে বাপধনেরা। আমার পোলাডারে মারিস না...'

তিনি দেহের সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, 'ক্যাপ্টেন ছ্যার আমার পোলা নির্দোষ, সে মুক্তি বাহিনী করে না। আমাদের ছাইড়া দ্যান। আমরা আজই ইন্ডিয়া চলে...'

আর কিছু বলার আগেই তিনি দেখতে পেলেন বেশ কয়েকটা বন্দুক একসঙ্গে গর্জে উঠল। ধপ করে শাম্ব মাটিতে পড়ে গেল। করুণা ডুকরে কেঁদে উঠল। পাগলের মতো ছুটে যেতে গেল শাম্বর কাছে। কিন্তু পারল না। তার আগেই কুকুর শেয়ালের মতো তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল কয়েকজন আর্মি।

'হারামির দল। তোগো শ্যাষ অইবই...' একটা ভারী কিছু নেমে এলো শ্রীকান্তর মাথা লক্ষ্য করে। তিনি বাকি কথা আর শেষ করতে পারলেন না। চারিদিক অন্ধকার হয়ে এল তাঁর।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%